alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক রচনা : ছয়

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

: শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৮.

এ যুদ্ধের মহানায়ক কোথায় এই যুদ্ধের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঠিক কোনো খোঁজখবর নেই। তাঁকে নাকি বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি কি জীবিত? নাকি তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে? অনেকেই মনে করেন তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। আবার কারো কারো মতে না, তাঁকে মেরে ফেলা হয় নাই। পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময়ে তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে। তাঁকে ছোট্ট একটা কুট্টুরিতে আটকে রাখা হয়েছে। সেই কুঠুরির পাশেই একটা কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে। সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হবে। বিচারে তাঁর ফাঁসি হবে। তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে এবং এদেশের উৎপাদিত পাটের দড়িতেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। বাংলার পাট দিয়ে বাঙালি জাতির নেতার ফাঁসি! পাটের উপর আমাদের ক্রোধ বেড়ে যায়। পারলে আমরা পাটক্ষেত কেটে ফানা ফানা করে ফেলি আর কি! চুলোয় যাক সোনালি আঁশ।

তাঁর ব্যাপারে আরো নানা রকম খবর বাতাসে ভাসতে থাকে। শেখ মুজিবকে যে কুঠরিতে বন্দী করে রাখা হয়েছে সেটি খুবই ছোট। তিনি কোনো রকমে ওখানে নিজের শরীর নাড়াচাড়া করতে পারেন মাত্র। তাঁর মাথার উপর অনেকগুলি ইলেক্ট্রিক বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। এতে তাঁর রুম এবং মাথা গরম হয়ে যাবে এবং তিনি পাগল হয়ে যাবেন। আর পাগল হয়ে গেলে তাঁকে দিয়ে একটা কিছু লিখিয়ে নিতে পারবে ভুট্টো। ইলেকট্রিক বাল্ব সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। কারণ, তখনো আমরা ইলেক্ট্রিক বাল্ব দেখি নাই। শুনি বিনা তেলে এই যন্ত্রটি আলো দিতে পারে। বিনা তেলে আলো দেয়া যন্ত্রটির উপর আমাদের রাগ বেড়ে যায়। হাতের কাছে পেলে সেই বাল্বের চৌদ্দগুষ্টি ভেঙে চুরমার করে দেই।

আমাদের দাদি-নানি স্থানীয় মহিলারা প্রতিবার নামাজ শেষে শেখ মুজিবের জন্য দোয়া পাঠ করতে থাকেন। কেউ কেউ নফল রোজা রাখেন, রোজা মানত করে কেউ কেউ কেউ পীরের দরগায় মানত করেন শিন্নি। শেখ মুজিব পাকিস্তানীদের কবল হতে বের হয়ে আসতে পারলে হযরত শাহজালাল-শাহ পরাণের দরগা আর খড়মপুরের বাবা কেল্লা শহীদের দরগায় শিন্নি দেয়া হবে। কেউ এক টাকা মানত করে, কেউ পাঁচসিকা, কেউবা মুরগি। আমাদের শিন্নি দেয়ার কোনো সামর্থ্য নেই, আমরা বড়দের সাথে মাঝে মাঝে মোনাজাতে হাত ওঠাই। আল্লাহ শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখো।

আমরা শুনি আমাদের পক্ষ নিয়েছে ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার নেতা ইন্দিরা গান্ধী। তিনি শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসবেন পাকিস্তানিদের হাত থেকে। বড়রা আশংকা প্রকাশ করছে- তিনি কি পারবেন শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসতে? অনেকেই সংশয় প্রকাশ করতে থাকে। কারণ, ’৬৫’র যুদ্ধে ইন্ডিয়ানরা পাকিস্তানিদের সাথে নাকি কুলিয়ে উঠতে পারেনি। আর তিনি তো এক মহিলা।

‘তিনি গান্ধীর মেয়ে, অবশ্যই পারবেন’ কেউ কেউ বলাবলি করতে থাকে।

আমাদের মুরুব্বীদের প্রায় সবাই গান্ধীর নাম জানেন দেখি। আমি গান্ধীর ছবি দেখেছি। ধুতি পরা, চোখে গোল একটা চশমা। শরীরের প্রায় সব হাড্ডি বের হয়ে এসেছে। গতরের উপরের অংশ প্রায়ই উদোম থাকে আর হাঁটে লাঠি ভর দিয়ে। সেই লোকের মেয়ে আর কতটুকু যুদ্ধ করতে পারবে?

আমাদের মনে একটা বিরাট সংশয় কাজ করতে থাকে।

বাবাকে আমি গান্ধী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। বাবা দেখি গান্ধী সম্পর্কে বেশ কিছু জানেন। বাবা বললেন- গান্ধী এক বিরাট নেতা ছিলেন। তিনি কোনো যুদ্ধটুদ্ধ না করে শুধু আন্দোলন করে ইংরেজদেরকে এদেশ থেকে তাড়িয়েছেন। এই আন্দোলনের নাম অহিংস আন্দোলন। বাবার কথা আমার বিশ্বাস করতে মন চায় না। বিনা যুদ্ধে ইংরেজদের তিনি তাড়িয়েছেন! হাড় জিরজিরে এই বৃদ্ধ? তাঁরই মেয়ে আমাদের পক্ষ হয়ে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়বে?

বাবা বললেন, ইন্দিরা গান্ধী, গান্ধীর মেয়ে নয়। নামের শেষে গান্ধী পদবী থাকায় অনেকেই ইন্দিরাকে গান্ধী পরিবারের মেয়ে বলেই জানেন। দীর্ঘদিন আমিও এটাই জানতাম। আসলে তিনি তাঁর স্বামী ফিরোজ গান্ধী থেকে গান্ধী উপাধি নিয়েছেন। তাঁর বাবার নাম প-িত জওহরলাল নেহরু। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর পরিবাবের সাথে তাঁর কোনো বংশীয় সংযোগ নেই।

ইন্দিরা গান্ধী যে পারবেন কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রমাণিত হলো। কারণ, তাঁর বেজায় বুদ্ধি আছে। শেখ মুজিব বেঁচে আছেন কিনা তা জানা দরকার। শেখ মুজিব জীবিত নাকি মৃত তা নিয়ে পাকিস্তানিরা কিছুই বলছে না। ইন্দিরা গান্ধী এক মতলব আঁটলেন। তিনি বললেন, তাঁর কাছে খবর আছে পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে। পাকিস্তানীরা কয়েকদিন চুপচাপ থাকল। দেখা গেল সারা বিশ্বের লোক মুজিব হত্যার খবরে নিন্দার ঝড় তুলছে। তখন পাস্তিানের পক্ষ থেকে জানানো হলো শেখ মুজিব বেঁচে আছেন এবং বেশ ভালোই আছেন। টিভিতে নাকি শেখ মুজিবেকে দেখানো হয়েছে। এ খবরে সারা দেশে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

যুদ্ধের সময় আমাদের কাছে বেশ কয়েকটি দেশের নাম পরিচিত হয়ে ওঠে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামের একটি রাষ্ট্র। এরা আমাদের বিরোধিতা করছে। চীনের নামও তখন আমরা জানতে পারি কারণ এই চীনও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানিকে সাহায্য করছে। যে রাষ্ট্রটি আমাদেরকে সাহায্য করছে তার নাম রাশিয়া। আর শুনি লন্ডনের কথা। কারণ ওখান থেকে বড়রা সব খবরাখবর পায় বিবিসির মাধ্যমে।

৯.

আমাদের কাজ কিচ্ছা শোনা

আমাদের কোনো পড়াশোনা নেই, না দিনে, না রাতে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার সময় আমাদের পাড়ার কারোর উঠোনে গল্পের আসর বসে। আমাদের গল্পের মধ্যমণি হলো আল্লাদি বু। আল্লাদি বু’র তিনকূলে তেমন কেউ নেই। পাড়ার ছেলেমেয়েরাই তার নাতি-নাতনি, আপনজন।

আল্লাদি বু আমাদেরকে মাঝে মাঝেই কিচ্ছা শোনায়। আপন দুলালের গল্প আর কোড়া শিকারী বিনন রাজার কিচ্ছা। আপন আর দুলাল দুই ভাই। মা মারা গেলে তাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আপন দুলালের সৎ মা চান ছেলে দুটিকে মেরে ফেলতে। তাদেরকে মারার জন্য সৎ মা নানা ফন্দি-ফিকির করতে থাকে। কখনো সৎমা’র হার কুড়মুড়ে রোগ হয়, কখনোবা গা-জ্বলনি রোগ। সে রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র দাওয়াই হলো আপন দুলাল দুই ভাইয়ের গায়ের হাড়গোড় কিংবা রক্ত। গল্প শুনে আমাদের গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায়। এতো কষ্ট আপন দুলালের! ইচ্ছে হয় ডাইনি সৎমাটিকে গলাটিপে মেরে ফেলতে। আবার ভয় হয় আমাদের কারো অবস্থা যদি আপন দুলালের মতো হয়। আমাদের কারো মা যদি মারা যায় আর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন তাহলে আমাদের অবস্থা কি আপন দুলালের মতোই হবে না?

বিনন রাজার গল্পটাও বেশ করুণ। রাজা বিনন মায়ের একমাত্র পুত্র। তার শখ কোড়া পাখি শিকার করা। বিনন রাজার মা বিননকে কোড়া শিকারে যেতে বাধা দেয়। কারণ, কোড়া শিকার করতে গিয়ে অনেক শিকারীই সাপের দংশনে মারা যায়। বিনন রাজার মায়ের আশংকা, তার ছেলেও কোড়া শিকার করতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারা যাবে। বিনন রাজার মা এটি স্বপ্নে দেখেছে।

শত বারণ সত্বেও একদিন বিনন রাজা কোড়া শিকারে মাঠে যায়। জংলী কোড়ার সাথে বিনন রাজার কোড়ার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। লড়াই যখন তুঙ্গে বিনন রাজা তখন বুকে হেঁটে হেঁটে গিয়ে জংলী কোড়াটিকে ধরতে যায়। ধানক্ষেতের আইলে ঘাঁপটি মেরে থাকা কাল নাগ তখন বিননকে ছোবল মারে। বিনন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিনন রাজা তখন আহাজারি করতে থাকে কেন সে মায়ের নিষেধ অমান্য করে কোড়া শিকারে আসল। বিননের কান্নায় গাছের পাতা ঝরতে থাকে। তার পরিণতিতে আমরা খুব দুঃখ পাই। আমাদের চোখ বিনন আর তার মায়ের জন্য বাষ্পাকুল হয়ে পড়ে। দুয়েকজন ফুফিয়ে কান্না শুরু করে দেয়।

আল্লাদি বু তখন গান ধরে-

‘কাল রাতে স্বপ্নে দেখছি

নাগে খাইছে তোরে রে

কোড়া শিকারী

মায়ের বিনন রে,

ও রে...।’

আল্লাদি বু’র গলার সুর চারিদিকের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কেমন যেনো একটা বিষাদময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। অবশ্য এই বিষাদ বেশিক্ষণ থাকে না। অনেক ওঝা-বৈদ্য বিননকে সুস্থ করতে ব্যর্থ হলেও বিননের সতী-সাধ্বী স্ত্রী বিননকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে সুস্থ করে তোলে।

আল্লাদি বু তার খনখনে গলায় আবার গান ধরে-

‘আদ্য মন্ত্র দিয়ে গো বধু কোন কর্ম করিল-

বিননের গায়ে তখন পানি ছিটা দিল,

মায়ের নাম বলিয়া

বিনন উঠিয়া বসিল,

কোড়া শিকারী মায়ের বিনন রে।’

আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ি। বিনন তাহলে এ যাত্রায় বেঁচে গেলো তার সতী-সাধ্বী বৌয়ের কল্যাণে।

আল্লাদি বু এ দুটি ছাড়া আর কোনো কিচ্ছা জানতো বলে মনে হয় না। অন্তত তার মুখ থেকে অন্য কোনো কিচ্ছা শুনেছি বলে মনে পড়ে না।

সেদিন ছিল চান্নিপহর রাত। ধবল জ্যোস্না নেমে এসেছে সাদা মাটির উঠোনে। চাটাই বিছিয়ে আমরা বসে আছি গল্প শুনব বলে। আল্লাদি বু-ই আমাদের একমাত্র গল্প বলিয়ে। এক গল্প হাজারবার শুনলেও আমাদের আগ্রহের কোনো অভাব হয় না কিংবা ক্লান্তি লাগে না। আল্লাদি বু’র গল্প বলার ধরনটাও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পানের বাটা নিয়ে আল্লাদি বু পাটির মাঝখানটায় বসল। যথারীতি পিচিক করে পানের পিক ফেলে আল্লাদি বু কিচ্ছা বলার প্রস্তুতি নিল।

আজকে তোদেরকে অন্য একটা কিচ্ছা শোনাব, যুদ্ধের কিচ্ছা। আল্লাদি বু বলল।

আমরা খুব খুশি হয়ে যাই। যুদ্ধের গল্প শুনতে আমাদের খুব ভালো লাগে। আমার বাবা পুঁথি পড়েন। বেশিরভাগই যুদ্ধের পুঁথি। বিষাদ সিন্ধু, খয়বরের জঙ্গনামা, আমীর হামজা, গাজী কালু চম্পাবতী ইত্যাদি। গাজী কালু চম্পাবতী পুঁথির ঐ জায়গাটুকু আমার বেশ ভালো লাগে যেখানে গাজী পীর ভাই তাঁর সাগরেদ বাঘ বাহিনীকে নিয়ে চম্পাবতীর বাবাকে আক্রমণ করতে যায়। বাঘ বাহিনীর কা-কীর্তি শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যেতো। বাঘবাহিনীর হাতে চম্পাবতীর বাবা নাজেহাল হয়ে কালুর সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে বাধ্য হন। ইমাম হোসেন, কাসেম, আমীর হামজার বীরত্বের কথা শুনে গর্বে আম আদের বুকের ছাতি ফুলে দশ হাত হয়ে যেতো। আমরা এসব পুঁথি পাঠের সময় বড়দের মাঝে বসে শুনতে পারতাম। কিন্তু গাজী কালু চম্পাবতী কিংবা ছয়ফল মুলক বদিউজ্জামান পাঠের সময় আমাদের কাছে যাওয়া মানা ছিল। তবু লুকিয়ে লুকিয়ে ঐ দুটি পুথির কাহিনীও শোনার চেষ্টা করি। অনেক কিছুই আমরা বুঝি না।

যুদ্ধের গল্পের কথা শুনে আমরা লাফিয়ে উঠি। আল্লাদি বু মনে হয় আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের কোনো একটা গল্প শোনাবে। আমরা আমাদের ভিতরে টানটান উত্তেজনা বোধ করি।

মতির নাম শুনছস তোরা? আল্লাদি বু আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে মারে। আমাদের গ্রামে মতি নামের লোকের ছড়াছড়ি। ডেঙা মতি, বাইটা মতি, কালো মতি, ফর্সা মতি আরো অনেক মতি আছে। আল্লাদি বু কোন মতির কথা বলছে কে জানে?

তুমি কোন মতির কথা বলছ বু, ডেঙা মতির কথা? ও তো এখানেই আছে। দেওয়ান আলি বলল।

না, রে। আমি বলছি একজন মতিউরের কথা যে বিমান চালায়। যে পাকিস্তানীদের একটা বিমান দখল করে দেশে আসার পথে প্রাণ হারায়। আল্লাদি বু গল্পটা তেমন জমিয়ে বলতে পারে না। কারণ গল্পটা আল্লাদি বু পুরোপুরি হয়তো জানতো না। বিমান জিনিসটা মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখেছে কিন্তু বিমান কীভাবে চালাতে হয় সে বৃত্তান্ত জানা না থাকায় আল্লাদি বু গল্পটা জমিয়ে বলতে পারে না।

গল্পের কাহিনিটা এরকম- মতিউর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন অফিসার। ছুটি নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন পরিবারের সাথে সময় কাটাবেন বলে। এরই মধ্যে বেধে যায় যুদ্ধ। তিনি পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করে চলে যান দেশের বাড়ি নরসিংদিতে। নরসিংদির কাছেই ভৈরব। সেখানে মুক্তিবাহিনীর একটা ক্যাম্প খুলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। পরে তিনি পাকিস্তানে নিজ বাহিনীর কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে গিয়ে তিনি পরিকল্পনা করতে থাকেন কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধ বিমানের প্রশিক্ষক। তাঁর এক ছাত্র ছিল নাম রাশেদ মিনহাজ। রাশেদ একদিন তার বিমান নিয়ে আকাশে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আকাশে বিমানটি উড়াল দেবে দেবে করছে। এমন সময় মতিউর বিমানটি থামাতে বললেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাশেদ বিমানটি থামালেন। মতিউর বিমানে উঠে দ্বিতীয় সিটটিতে বসে রাশেদ মিনহাজের নাকে ক্লোরোফরম চেপে ধরলেন। রাশেদ অজ্ঞান হয়ে পড়লে তিনি বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারতের উদ্দ্যেশে রওয়ানা দিলেন। ততক্ষণে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি পাকিস্তানীদের কাছে জানাজানি হয়ে যায়। চার চারটি বিমান নিয়ে তারা মতিউরের বিমানটিকে ধাওয়া করে। মতিউর খুব নিচ দিয়ে বিমানটি নিয়ে উড়ছিলেন যাতে পাকিস্তানী রাডারে বিমানটি ধরা না পড়ে। ইন্ডিয়ার আকাশে পৌঁছতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। এ সময় ক্লোরোফর্মের ঘোর কাটিয়ে রাশেদ উঠে বসেছে। সে আবার মতিউরের সাথে ধস্তা-ধস্তি শুরু করল। রাশেদ এক পর্যায়ে বিমানের ইনজেক্ট সুইচ চেপে দিতে সক্ষম হলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে দুজনই মারা যান। ঘটনাটি ঘটে ২০ আগস্ট, ১৯৭১ সালে আর ঘটনাস্থল ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাই দূরে থাট্রা নামক স্থানে।

শহীদ মতিউরকে সমাধীস্থ করা হয় করাচির মাসরুর ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কবরস্থানে। তাঁর কবরের গায়ে লেখা হয়- ‘ইঁদার শু রাহা হে এক গাদ্দার’ অর্থাৎ এখানে শুয়ে আছে এক বেঈমান।

আমাদের হীরার টুকরা বীরকে এরা বেঈমান বলে অভিহিত করে। সরকার শহীদ মতিউরকে তাঁর অকুতোভয় বীরত্ব আর সাহসিকতার জন্য বীর শ্রেষ্ঠ খেতাব প্রদান করে। ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট মতিউর রহমান সাত বীর শ্রেষ্ঠর একজন। ২০০৬ সালে মতিউরের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে তুলে এনে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মতিউরের কাহিনী শুনে আমরা শিহরিত হই। বাঙালিদের মধ্যে এমন বড় বড় বীর আছে! সুতারাং আমাদের জয় হবেই হবে। বড়রা যখন এসকল বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন তখন আমরা আশায় বুক বাঁধি। একদিন আমরা পাকিস্তানীদের পরাভূত করে স্বাধীন দেশের নাগরিক হবো ইনশাআল্লাহ।

ক্রমশ...

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক রচনা : ছয়

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৮.

এ যুদ্ধের মহানায়ক কোথায় এই যুদ্ধের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঠিক কোনো খোঁজখবর নেই। তাঁকে নাকি বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি কি জীবিত? নাকি তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে? অনেকেই মনে করেন তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। আবার কারো কারো মতে না, তাঁকে মেরে ফেলা হয় নাই। পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময়ে তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে। তাঁকে ছোট্ট একটা কুট্টুরিতে আটকে রাখা হয়েছে। সেই কুঠুরির পাশেই একটা কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে। সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হবে। বিচারে তাঁর ফাঁসি হবে। তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে এবং এদেশের উৎপাদিত পাটের দড়িতেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। বাংলার পাট দিয়ে বাঙালি জাতির নেতার ফাঁসি! পাটের উপর আমাদের ক্রোধ বেড়ে যায়। পারলে আমরা পাটক্ষেত কেটে ফানা ফানা করে ফেলি আর কি! চুলোয় যাক সোনালি আঁশ।

তাঁর ব্যাপারে আরো নানা রকম খবর বাতাসে ভাসতে থাকে। শেখ মুজিবকে যে কুঠরিতে বন্দী করে রাখা হয়েছে সেটি খুবই ছোট। তিনি কোনো রকমে ওখানে নিজের শরীর নাড়াচাড়া করতে পারেন মাত্র। তাঁর মাথার উপর অনেকগুলি ইলেক্ট্রিক বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। এতে তাঁর রুম এবং মাথা গরম হয়ে যাবে এবং তিনি পাগল হয়ে যাবেন। আর পাগল হয়ে গেলে তাঁকে দিয়ে একটা কিছু লিখিয়ে নিতে পারবে ভুট্টো। ইলেকট্রিক বাল্ব সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। কারণ, তখনো আমরা ইলেক্ট্রিক বাল্ব দেখি নাই। শুনি বিনা তেলে এই যন্ত্রটি আলো দিতে পারে। বিনা তেলে আলো দেয়া যন্ত্রটির উপর আমাদের রাগ বেড়ে যায়। হাতের কাছে পেলে সেই বাল্বের চৌদ্দগুষ্টি ভেঙে চুরমার করে দেই।

আমাদের দাদি-নানি স্থানীয় মহিলারা প্রতিবার নামাজ শেষে শেখ মুজিবের জন্য দোয়া পাঠ করতে থাকেন। কেউ কেউ নফল রোজা রাখেন, রোজা মানত করে কেউ কেউ কেউ পীরের দরগায় মানত করেন শিন্নি। শেখ মুজিব পাকিস্তানীদের কবল হতে বের হয়ে আসতে পারলে হযরত শাহজালাল-শাহ পরাণের দরগা আর খড়মপুরের বাবা কেল্লা শহীদের দরগায় শিন্নি দেয়া হবে। কেউ এক টাকা মানত করে, কেউ পাঁচসিকা, কেউবা মুরগি। আমাদের শিন্নি দেয়ার কোনো সামর্থ্য নেই, আমরা বড়দের সাথে মাঝে মাঝে মোনাজাতে হাত ওঠাই। আল্লাহ শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখো।

আমরা শুনি আমাদের পক্ষ নিয়েছে ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার নেতা ইন্দিরা গান্ধী। তিনি শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসবেন পাকিস্তানিদের হাত থেকে। বড়রা আশংকা প্রকাশ করছে- তিনি কি পারবেন শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসতে? অনেকেই সংশয় প্রকাশ করতে থাকে। কারণ, ’৬৫’র যুদ্ধে ইন্ডিয়ানরা পাকিস্তানিদের সাথে নাকি কুলিয়ে উঠতে পারেনি। আর তিনি তো এক মহিলা।

‘তিনি গান্ধীর মেয়ে, অবশ্যই পারবেন’ কেউ কেউ বলাবলি করতে থাকে।

আমাদের মুরুব্বীদের প্রায় সবাই গান্ধীর নাম জানেন দেখি। আমি গান্ধীর ছবি দেখেছি। ধুতি পরা, চোখে গোল একটা চশমা। শরীরের প্রায় সব হাড্ডি বের হয়ে এসেছে। গতরের উপরের অংশ প্রায়ই উদোম থাকে আর হাঁটে লাঠি ভর দিয়ে। সেই লোকের মেয়ে আর কতটুকু যুদ্ধ করতে পারবে?

আমাদের মনে একটা বিরাট সংশয় কাজ করতে থাকে।

বাবাকে আমি গান্ধী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। বাবা দেখি গান্ধী সম্পর্কে বেশ কিছু জানেন। বাবা বললেন- গান্ধী এক বিরাট নেতা ছিলেন। তিনি কোনো যুদ্ধটুদ্ধ না করে শুধু আন্দোলন করে ইংরেজদেরকে এদেশ থেকে তাড়িয়েছেন। এই আন্দোলনের নাম অহিংস আন্দোলন। বাবার কথা আমার বিশ্বাস করতে মন চায় না। বিনা যুদ্ধে ইংরেজদের তিনি তাড়িয়েছেন! হাড় জিরজিরে এই বৃদ্ধ? তাঁরই মেয়ে আমাদের পক্ষ হয়ে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়বে?

বাবা বললেন, ইন্দিরা গান্ধী, গান্ধীর মেয়ে নয়। নামের শেষে গান্ধী পদবী থাকায় অনেকেই ইন্দিরাকে গান্ধী পরিবারের মেয়ে বলেই জানেন। দীর্ঘদিন আমিও এটাই জানতাম। আসলে তিনি তাঁর স্বামী ফিরোজ গান্ধী থেকে গান্ধী উপাধি নিয়েছেন। তাঁর বাবার নাম প-িত জওহরলাল নেহরু। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর পরিবাবের সাথে তাঁর কোনো বংশীয় সংযোগ নেই।

ইন্দিরা গান্ধী যে পারবেন কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রমাণিত হলো। কারণ, তাঁর বেজায় বুদ্ধি আছে। শেখ মুজিব বেঁচে আছেন কিনা তা জানা দরকার। শেখ মুজিব জীবিত নাকি মৃত তা নিয়ে পাকিস্তানিরা কিছুই বলছে না। ইন্দিরা গান্ধী এক মতলব আঁটলেন। তিনি বললেন, তাঁর কাছে খবর আছে পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে। পাকিস্তানীরা কয়েকদিন চুপচাপ থাকল। দেখা গেল সারা বিশ্বের লোক মুজিব হত্যার খবরে নিন্দার ঝড় তুলছে। তখন পাস্তিানের পক্ষ থেকে জানানো হলো শেখ মুজিব বেঁচে আছেন এবং বেশ ভালোই আছেন। টিভিতে নাকি শেখ মুজিবেকে দেখানো হয়েছে। এ খবরে সারা দেশে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

যুদ্ধের সময় আমাদের কাছে বেশ কয়েকটি দেশের নাম পরিচিত হয়ে ওঠে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামের একটি রাষ্ট্র। এরা আমাদের বিরোধিতা করছে। চীনের নামও তখন আমরা জানতে পারি কারণ এই চীনও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানিকে সাহায্য করছে। যে রাষ্ট্রটি আমাদেরকে সাহায্য করছে তার নাম রাশিয়া। আর শুনি লন্ডনের কথা। কারণ ওখান থেকে বড়রা সব খবরাখবর পায় বিবিসির মাধ্যমে।

৯.

আমাদের কাজ কিচ্ছা শোনা

আমাদের কোনো পড়াশোনা নেই, না দিনে, না রাতে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার সময় আমাদের পাড়ার কারোর উঠোনে গল্পের আসর বসে। আমাদের গল্পের মধ্যমণি হলো আল্লাদি বু। আল্লাদি বু’র তিনকূলে তেমন কেউ নেই। পাড়ার ছেলেমেয়েরাই তার নাতি-নাতনি, আপনজন।

আল্লাদি বু আমাদেরকে মাঝে মাঝেই কিচ্ছা শোনায়। আপন দুলালের গল্প আর কোড়া শিকারী বিনন রাজার কিচ্ছা। আপন আর দুলাল দুই ভাই। মা মারা গেলে তাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আপন দুলালের সৎ মা চান ছেলে দুটিকে মেরে ফেলতে। তাদেরকে মারার জন্য সৎ মা নানা ফন্দি-ফিকির করতে থাকে। কখনো সৎমা’র হার কুড়মুড়ে রোগ হয়, কখনোবা গা-জ্বলনি রোগ। সে রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র দাওয়াই হলো আপন দুলাল দুই ভাইয়ের গায়ের হাড়গোড় কিংবা রক্ত। গল্প শুনে আমাদের গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায়। এতো কষ্ট আপন দুলালের! ইচ্ছে হয় ডাইনি সৎমাটিকে গলাটিপে মেরে ফেলতে। আবার ভয় হয় আমাদের কারো অবস্থা যদি আপন দুলালের মতো হয়। আমাদের কারো মা যদি মারা যায় আর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন তাহলে আমাদের অবস্থা কি আপন দুলালের মতোই হবে না?

বিনন রাজার গল্পটাও বেশ করুণ। রাজা বিনন মায়ের একমাত্র পুত্র। তার শখ কোড়া পাখি শিকার করা। বিনন রাজার মা বিননকে কোড়া শিকারে যেতে বাধা দেয়। কারণ, কোড়া শিকার করতে গিয়ে অনেক শিকারীই সাপের দংশনে মারা যায়। বিনন রাজার মায়ের আশংকা, তার ছেলেও কোড়া শিকার করতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারা যাবে। বিনন রাজার মা এটি স্বপ্নে দেখেছে।

শত বারণ সত্বেও একদিন বিনন রাজা কোড়া শিকারে মাঠে যায়। জংলী কোড়ার সাথে বিনন রাজার কোড়ার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। লড়াই যখন তুঙ্গে বিনন রাজা তখন বুকে হেঁটে হেঁটে গিয়ে জংলী কোড়াটিকে ধরতে যায়। ধানক্ষেতের আইলে ঘাঁপটি মেরে থাকা কাল নাগ তখন বিননকে ছোবল মারে। বিনন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিনন রাজা তখন আহাজারি করতে থাকে কেন সে মায়ের নিষেধ অমান্য করে কোড়া শিকারে আসল। বিননের কান্নায় গাছের পাতা ঝরতে থাকে। তার পরিণতিতে আমরা খুব দুঃখ পাই। আমাদের চোখ বিনন আর তার মায়ের জন্য বাষ্পাকুল হয়ে পড়ে। দুয়েকজন ফুফিয়ে কান্না শুরু করে দেয়।

আল্লাদি বু তখন গান ধরে-

‘কাল রাতে স্বপ্নে দেখছি

নাগে খাইছে তোরে রে

কোড়া শিকারী

মায়ের বিনন রে,

ও রে...।’

আল্লাদি বু’র গলার সুর চারিদিকের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কেমন যেনো একটা বিষাদময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। অবশ্য এই বিষাদ বেশিক্ষণ থাকে না। অনেক ওঝা-বৈদ্য বিননকে সুস্থ করতে ব্যর্থ হলেও বিননের সতী-সাধ্বী স্ত্রী বিননকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে সুস্থ করে তোলে।

আল্লাদি বু তার খনখনে গলায় আবার গান ধরে-

‘আদ্য মন্ত্র দিয়ে গো বধু কোন কর্ম করিল-

বিননের গায়ে তখন পানি ছিটা দিল,

মায়ের নাম বলিয়া

বিনন উঠিয়া বসিল,

কোড়া শিকারী মায়ের বিনন রে।’

আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ি। বিনন তাহলে এ যাত্রায় বেঁচে গেলো তার সতী-সাধ্বী বৌয়ের কল্যাণে।

আল্লাদি বু এ দুটি ছাড়া আর কোনো কিচ্ছা জানতো বলে মনে হয় না। অন্তত তার মুখ থেকে অন্য কোনো কিচ্ছা শুনেছি বলে মনে পড়ে না।

সেদিন ছিল চান্নিপহর রাত। ধবল জ্যোস্না নেমে এসেছে সাদা মাটির উঠোনে। চাটাই বিছিয়ে আমরা বসে আছি গল্প শুনব বলে। আল্লাদি বু-ই আমাদের একমাত্র গল্প বলিয়ে। এক গল্প হাজারবার শুনলেও আমাদের আগ্রহের কোনো অভাব হয় না কিংবা ক্লান্তি লাগে না। আল্লাদি বু’র গল্প বলার ধরনটাও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পানের বাটা নিয়ে আল্লাদি বু পাটির মাঝখানটায় বসল। যথারীতি পিচিক করে পানের পিক ফেলে আল্লাদি বু কিচ্ছা বলার প্রস্তুতি নিল।

আজকে তোদেরকে অন্য একটা কিচ্ছা শোনাব, যুদ্ধের কিচ্ছা। আল্লাদি বু বলল।

আমরা খুব খুশি হয়ে যাই। যুদ্ধের গল্প শুনতে আমাদের খুব ভালো লাগে। আমার বাবা পুঁথি পড়েন। বেশিরভাগই যুদ্ধের পুঁথি। বিষাদ সিন্ধু, খয়বরের জঙ্গনামা, আমীর হামজা, গাজী কালু চম্পাবতী ইত্যাদি। গাজী কালু চম্পাবতী পুঁথির ঐ জায়গাটুকু আমার বেশ ভালো লাগে যেখানে গাজী পীর ভাই তাঁর সাগরেদ বাঘ বাহিনীকে নিয়ে চম্পাবতীর বাবাকে আক্রমণ করতে যায়। বাঘ বাহিনীর কা-কীর্তি শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যেতো। বাঘবাহিনীর হাতে চম্পাবতীর বাবা নাজেহাল হয়ে কালুর সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে বাধ্য হন। ইমাম হোসেন, কাসেম, আমীর হামজার বীরত্বের কথা শুনে গর্বে আম আদের বুকের ছাতি ফুলে দশ হাত হয়ে যেতো। আমরা এসব পুঁথি পাঠের সময় বড়দের মাঝে বসে শুনতে পারতাম। কিন্তু গাজী কালু চম্পাবতী কিংবা ছয়ফল মুলক বদিউজ্জামান পাঠের সময় আমাদের কাছে যাওয়া মানা ছিল। তবু লুকিয়ে লুকিয়ে ঐ দুটি পুথির কাহিনীও শোনার চেষ্টা করি। অনেক কিছুই আমরা বুঝি না।

যুদ্ধের গল্পের কথা শুনে আমরা লাফিয়ে উঠি। আল্লাদি বু মনে হয় আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের কোনো একটা গল্প শোনাবে। আমরা আমাদের ভিতরে টানটান উত্তেজনা বোধ করি।

মতির নাম শুনছস তোরা? আল্লাদি বু আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে মারে। আমাদের গ্রামে মতি নামের লোকের ছড়াছড়ি। ডেঙা মতি, বাইটা মতি, কালো মতি, ফর্সা মতি আরো অনেক মতি আছে। আল্লাদি বু কোন মতির কথা বলছে কে জানে?

তুমি কোন মতির কথা বলছ বু, ডেঙা মতির কথা? ও তো এখানেই আছে। দেওয়ান আলি বলল।

না, রে। আমি বলছি একজন মতিউরের কথা যে বিমান চালায়। যে পাকিস্তানীদের একটা বিমান দখল করে দেশে আসার পথে প্রাণ হারায়। আল্লাদি বু গল্পটা তেমন জমিয়ে বলতে পারে না। কারণ গল্পটা আল্লাদি বু পুরোপুরি হয়তো জানতো না। বিমান জিনিসটা মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখেছে কিন্তু বিমান কীভাবে চালাতে হয় সে বৃত্তান্ত জানা না থাকায় আল্লাদি বু গল্পটা জমিয়ে বলতে পারে না।

গল্পের কাহিনিটা এরকম- মতিউর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন অফিসার। ছুটি নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন পরিবারের সাথে সময় কাটাবেন বলে। এরই মধ্যে বেধে যায় যুদ্ধ। তিনি পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করে চলে যান দেশের বাড়ি নরসিংদিতে। নরসিংদির কাছেই ভৈরব। সেখানে মুক্তিবাহিনীর একটা ক্যাম্প খুলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। পরে তিনি পাকিস্তানে নিজ বাহিনীর কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে গিয়ে তিনি পরিকল্পনা করতে থাকেন কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধ বিমানের প্রশিক্ষক। তাঁর এক ছাত্র ছিল নাম রাশেদ মিনহাজ। রাশেদ একদিন তার বিমান নিয়ে আকাশে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আকাশে বিমানটি উড়াল দেবে দেবে করছে। এমন সময় মতিউর বিমানটি থামাতে বললেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাশেদ বিমানটি থামালেন। মতিউর বিমানে উঠে দ্বিতীয় সিটটিতে বসে রাশেদ মিনহাজের নাকে ক্লোরোফরম চেপে ধরলেন। রাশেদ অজ্ঞান হয়ে পড়লে তিনি বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারতের উদ্দ্যেশে রওয়ানা দিলেন। ততক্ষণে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি পাকিস্তানীদের কাছে জানাজানি হয়ে যায়। চার চারটি বিমান নিয়ে তারা মতিউরের বিমানটিকে ধাওয়া করে। মতিউর খুব নিচ দিয়ে বিমানটি নিয়ে উড়ছিলেন যাতে পাকিস্তানী রাডারে বিমানটি ধরা না পড়ে। ইন্ডিয়ার আকাশে পৌঁছতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। এ সময় ক্লোরোফর্মের ঘোর কাটিয়ে রাশেদ উঠে বসেছে। সে আবার মতিউরের সাথে ধস্তা-ধস্তি শুরু করল। রাশেদ এক পর্যায়ে বিমানের ইনজেক্ট সুইচ চেপে দিতে সক্ষম হলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে দুজনই মারা যান। ঘটনাটি ঘটে ২০ আগস্ট, ১৯৭১ সালে আর ঘটনাস্থল ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাই দূরে থাট্রা নামক স্থানে।

শহীদ মতিউরকে সমাধীস্থ করা হয় করাচির মাসরুর ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কবরস্থানে। তাঁর কবরের গায়ে লেখা হয়- ‘ইঁদার শু রাহা হে এক গাদ্দার’ অর্থাৎ এখানে শুয়ে আছে এক বেঈমান।

আমাদের হীরার টুকরা বীরকে এরা বেঈমান বলে অভিহিত করে। সরকার শহীদ মতিউরকে তাঁর অকুতোভয় বীরত্ব আর সাহসিকতার জন্য বীর শ্রেষ্ঠ খেতাব প্রদান করে। ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট মতিউর রহমান সাত বীর শ্রেষ্ঠর একজন। ২০০৬ সালে মতিউরের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে তুলে এনে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মতিউরের কাহিনী শুনে আমরা শিহরিত হই। বাঙালিদের মধ্যে এমন বড় বড় বীর আছে! সুতারাং আমাদের জয় হবেই হবে। বড়রা যখন এসকল বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন তখন আমরা আশায় বুক বাঁধি। একদিন আমরা পাকিস্তানীদের পরাভূত করে স্বাধীন দেশের নাগরিক হবো ইনশাআল্লাহ।

ক্রমশ...

back to top