alt

সাময়িকী

ছলম

: সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

আমার আর আমার বউয়ের রুচির ফারাক প্রকট। রোজ সকালে আমি রেডিওতে খবর শুনি, তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত। পারিবারিক অভ্যাস। আমি বুঝি প্রীতির এসব ভালো লাগে না। ওর ভালো লাগে আধুনিক গান। প্রিয় চৌধুরীর গান ওর পছন্দ। প্রিয় আমার বন্ধু হওয়ায় বোধহয় কিছুটা আলগা খাতিরও আমার আছে।

তার মানে এই নয় যে, আমার আর আমার বউয়ের সম্পর্ক ভালো না। আমাদের বিয়ে হয়েছে চার মাস আগে। পারিবারিক দেখাশোনার বিয়ে হলেও খুব ভালোবাসি আমি বউকে। সেও বোধহয় তাই। বিয়ের আগে পরিবারিক ব্যবস্থায়ই দু’একবার আমরা বাইরে দেখা করেছি। ও খুব উচ্ছল, আমার মতো মুখচোরা নয়। তখন থেকেই, মানে বিয়ের আগে থেকেই বউকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।

প্রিয়র কথা ও প্রথম শুনেছে তখন, বিয়ের আগেই। খুব খুশি। এরকম একজন বিখ্যাত গায়ক আমার বন্ধু! বলেছিলো বিয়েতে প্রিয় এলে যেন একসাথে ছবি তুলে দেই। সেটা অবশ্য হয়নি। প্রিয় এখন ভিআইপি। সব জায়গায় ও হুট করে যেতে পারে না। আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত। আমাদের আয়োজনও তাই সেরকমই। বিয়ের অনুষ্ঠান, খাওয়া দাওয়া সব হয়েছে মন্দিরে। সেখানে প্রিয় আসবে কী করে? আমার অন্য বন্ধুরা এসেছিলো। প্রিয় অবশ্য পরে একদিন দাওয়াত করেছিলো আমাদের, ওর পরীবাগের ফ্ল্যাটে।

প্রীতির সেদিন এলোমেলো অবস্থা। সকাল থেকেই কী পরবে তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বড় দিদির কাছ থেকে দামী কাতান এনেছিলো ধার করে। আমাকেও পাঠিয়েছিলো, বাবার তসরের পাঞ্জাবি আনতে। আমার এসব ভালো না লাগলেও কিছু বলিনি। থাক ছোট মানুষ। সেলিব্রিটির বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার এইটুকু ঝামেলা মেনে নিয়েছি। উবার নিয়ে বনগ্রাম থেকে পরীবাগ গিয়েছি সেদিন।

প্রিয়র ফ্ল্যাটটা বিশাল। দুই হাজার স্কয়ার ফিটের কম হবে না। চমৎকার সাজানো। দক্ষিণ দিক খোলা। হু হু বাতাস। বিয়ে করেনি এখনো। একাই থাকে। আমাদের দাওয়াত উপলক্ষে ক্যাটারিং থেকে খাবার এসেছে। সাথে দুই-চারজন বেয়ারা শ্রেণির লোক। ওরাই দেখাশোনা করেছে।

প্রিয় অবশ্য অনেক আন্তরিক। আমাদের অনেক সমাদর করলো। প্রায় বছরখানেক পর দেখা। দরজা খুলেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো। হ্যান্ডশেক করার সময় দেখলাম ওর হাত একই রকম আছে। শক্ত, খসখসে। আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জন জবরজং পোশাক পরলেও আমার বন্ধুটি পরেছিলো সাধারণ জিন্স আর টি-শার্ট। অনেক গল্প করলাম আমরা। বসার ঘরে ওর নিজের বিরাট একটা ছবি বাঁধানো। তার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো ছবি তুললাম। বেশিরভাগই অবশ্য প্রিয়র সাথে প্রীতির। বিদায়ের সময় দারুণ একটা পারফিউম সেট গিফ্ট করলো ও আমার বউকে। বললো গত মাসে মালয়েশিয়া থেকে প্রোগ্রাম সেরে ফেরার সময় কিনেছে।

নিশ্চয়ই অনেক দাম! আমার একটু লজ্জাই লাগলো। ‘এতো দামী গিফ্ট না কিনলেও পারতি।’ বলেই ফেললাম।

প্রিয় গাঢ় গলায় বললো, ‘তোদের কাছে আমার অনেক ঋণ। এটুকু করতে দে’। তারপর কথা ঘুরিয়ে স্বাভাবিকভাবে বললো, ‘এতো সুন্দর বউদির জন্য এ তো অতি সামান্য।’

আমার বউ এসবে লজ্জা পায় না। সেও পাল্টা বললো, ‘আপনিও কত হ্যান্ডসাম। বিয়ে করবেন কবে?’

‘করবো বউদি। সব গুছিয়ে ফেলেছি। এবার ভালো একটা মেয়ে দেন, বিয়ে করে ফেলি।’

ফেরার সময় প্রিয় ওর গাড়িতে নামিয়ে দিতে চাইলো। যদিও ড্রাইভার আছে, তবু খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো। কী করে না করি! প্রীতি বুঝলো এবং খুবই সুন্দর ম্যানেজ করলো। বললো গাড়িতে ওর মাথা ঘোরে।

পরীবাগ থেকে আমরা নিউ মার্কেট গেলাম। ফুচকা খেলাম। প্রীতি যে খুব খুশি তা বেশ বোঝা যাচ্ছিলো। ওইটুক পথে রিক্সায় আসতে আসতে প্রিয়র সাথে ওর আর আমার ছবির ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়া শেষ। লাইক, কমেন্ট, ফোনের লাইন লেগে গেলো।

বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। সিএনজি নিতে চেয়েছিলাম। প্রীতিই বললো ভেঙে ভেঙে রিক্সায় যাবে।

ইউনিভার্সিটির ভিতরে ঢুকে রিক্সায় বসে আমার ভালো লাগছিলো। নিজের বউ হলেও পাশাপাশি সেজেগুঁজে বসে কেমন শিহরন লাগছিলো। তাকিয়ে দেখলাম। বউটা আমার সত্যিই অনেক সুন্দর।

‘কী দেখ?’ মুচকি হাসে প্রীতি।

‘তোমাকে।’ বেহায়ার মতো বলি। তারপর অন্যদিকে তাকাই।

‘রাগ করেছো?’

‘না তো!’

কী মনে করে কিছুক্ষণ পর প্রায় আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রীতি বললো, ‘তোমার বন্ধুটা সেলিব্রেটি হলেও ভালো। ওর অনেক টাকা। কিন্তু আমার ওসব চাই না। আমি তোমাকেই ভালোবাসি।’

বুঝলাম, ও ভাবছে কোনো কারণে আমি ইনফিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছি কিনা। সেটা না হলেও ওর কথার উত্তরে কী বলবো! খুশি হলেও তাই চুপ করে রইলাম। প্রীতিই কথা বলছিলো। কিন্তু অনেক কথাই আর খেয়াল করতে পারছিলাম না।

কার্জন হলের সামনের রাস্তাটা আমার অনেক প্রিয়, সেটা প্রীতি জানে। সেখানে গিয়েও যখন আনমনা রইলাম তখন প্রীতি সত্যি সত্যি ভাবলো আমি মন খারাপ করেছি। আমি ওর ভুল ভাঙাতেই বললাম, ‘আরে না। আসলে ঘুরেফিরে কেন যেন আজ প্রিয়দের গ্রামের কথা মনে পড়ছে।’

‘কেন খুব সুন্দর!’

‘হ্যাঁ একেবাবে সাহিত্যের বর্ণনার মতো। মনে হয়েছিলো তারাশঙ্কর এই গ্রাম দেখেই কবি উপন্যাস লিখেছিলেন। আমাদের দারুণ লেগেছে।’

‘তাই! চলো না যাই।’

প্রীতিরাও ঢাকার স্থানীয়। আমাদের কোনো গ্রামের বাড়ি নেই। গ্রাম সম্বন্ধে তাই আমাদের দু’জনেরই অবসেশন আছে। চুপ করে আছি বলে প্রীতি বুঝলো উল্টো। সেটা বুঝে আমি বললাম, ‘শোনো, বাড়ির সাথে প্রিয়র কোনো সম্পর্ক নেই।’

‘কী! কেন?’

‘সে তো অনেক ঘটনা।’

‘বলো না প্লিজ।’

বাধ্য হয়েই বললাম, ‘প্রিয় চৌধুরী ওর আসল নাম নয়। আসল নাম পরিতোষ পাল।’

প্রীতি চমকে গেল, ‘মানে?’

‘হ্যাঁ শোনো। আমরাও জানতাম না। স্কুলে একসাথেই পড়তাম। সবাই স্থানীয় ছেলে। শুধু প্রিয়ই বাইরের। ও কেমন এক দুসম্পর্কের কাকার সাথে মেসে থাকতো। এসএসসি দিয়ে প্রথম আমরা দল বেঁধে ওদের গ্রামে যাই। প্রিয় রাজি ছিলো না। আমরা জোর করে রওনা হই। তখন থেকেই ও মনমরা হয়ে ছিলো। ওর গ্রামে গিয়ে জানতে পারি ওর আসল নাম আর পদবি। বাবা মনীন্দ্র পাল। যক্ষার রোগী। প্রতিমা বানানো তার পেশা। জমিটমি নেই। পূজা পার্বণ ছাড়া কোনো কাজও নেই। হতদরিদ্র। বাড়ি বলতে একটা ঘর। পড়ো পড়ো। বাথরুম পিছনের কচু বনে। দুই বাঁশের পা-দানী দেয়া আছে শুধু। তাও নড়ে। কোনো ঘেরা নেই। কচুবনের আড়ালে বসে পড়তে হয়। স্নান পাঁচ মিনিট দূরের নদীতে। আমরা বুঝলাম একটা টাকা বাড়ি থেকে ও সাহায্য পায়নি। ঢাকায় থেকে টিউশুনি করে ও যে পড়লো সেটাই তো বিরাট এক যুদ্ধ। আমরা প্রথমেই কেমন হকচকিয়ে গেলাম। আর পরিতোষ লজ্জায় কেমন মাটিতে মিশে গেলো।’

প্রীতি বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে শুনতে লাগলো।

‘কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য আমরা সব স্বাভাবিক করে নিলাম। দুই দিন ছিলাম ওদের বাড়িতে। গরমের দিন বলে বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়েছি। কচুবনে গিয়েছি। কী আর করা। কিন্তু বন্ধুকে মন খারাপ করতে দেইনি।’

‘আপনাগের কষ্ট হলো।’ ফেরার সময় কাকাবাবু বলেছিলেন। আমরা হইহই করে উঠেছিলাম। ‘কিসের কষ্ট!’ বলেছিলাম সামনের দূর্গাপূজায় আবার যাবো। কিন্তু আর যাইনি।’

‘কেন?’ প্রীতি প্রশ্ন করলো।

একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘যাইনি মানে যাওয়া হয়নি। তাছাড়া পরিতোষও চাইতো না। এমনকি ও আমাদের রীতিমতো অনুনয় করেছিলো যাতে ওর নামের পরিবর্তন, বাড়ির অবস্থা এসব আর কাউকে না বলি। আমরা কথা রেখেছিলাম। ঢাকা ফিরে আবার ‘প্রিয়’ হয়ে উঠলো ও। কলেজেও পড়েছি একসাথে। তারপর ভার্সিটি। প্রিয় আস্তে আস্তে গানে ঝুঁকে পড়লো এবং নাম করলো। ওর শত শত ফ্যান আর গোটা কতক প্রেমিকা দেখে আমরা ঈর্ষা বোধ করতাম। তখনও তেমন নাম করেনি, একজনের সাথে ওর প্রায় ঝামেলা হয়ে গিয়েছিলো। বিয়ে না করলে মানসম্মান যায় আর কি।’

‘বলো কী? একেবারে ভেজা বেড়াল। ওকে দেখে তো ওরকম মানে খারাপ মনে হয় না।’

‘না না ও খারাপ নয়। ও শুধু প্রাণপনে চাইতো ওর অতীতটা মুছে ফেলে নতুন পরিচয়ে বাঁচতে। আসলে দারিদ্র্য ওর পছন্দ ছিলো না।’

‘তাই বলে পদবী অস্বীকার করবে? আর বাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে মানে কী?’

প্রিয়র দেয়া পারফিউমের ব্যাগটা প্রীতির হাতে ধরা। রাগ করে আবার ফেলেটেলে দেবেনা তো। ডান হাত দিয়ে ব্যাগটা আমার হাতে নিলাম। বাম হাত ঘুরিয়ে পিছন দিক দিয়ে প্রীতির কোমড় ধরলাম।

‘হ্যা তা ঠিক। তবে অনেকেই তো নাম পাল্টায়। কয়টা লেখকের আসল নাম বলো।’ বন্ধুর হয়ে সাফাই গাইলাম।

‘যাই বলো। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগলো না। তারপর কী হলো? ওই মেয়েটা কই যার সাথে উনি ইয়ে করলো?’

‘তারপর আর কী! সেসব কীভাবে যেন ম্যানেজ করলো ও-ই। বিরাট কানেকশন, বুঝো না? আর এখন তো দেখছোই কী পরিবর্তন। জনপ্রিয় গায়ক প্রিয় চৌধুরী।’

‘কিন্তু মানুষ যেমনই হোক ওর গানের গলা সত্যিই ভালো।’

‘হুম।’

‘হুম কী? আবার কী ভাবো?’

‘ছলম বোঝ?’

‘না। কী?’

‘সাপের খোলস পাল্টানো।’

‘মানে কী?’

‘সাপের পুরনো খোলস বা চামড়া শুকিয়ে খড়খড়ে হয় একসময়। নিচে নতুন চামড়া গজাতে থাকে। তখন সাপের গা জ্বলে। সে রেগে থাকে। ফোঁসফোঁস করে। একসময় চোখা কোন কাঁটা বা বেড়ার গায়ে গা ঘষে সে পুরনো চামড়া খসিয়ে ফেলে। ব্যাপারটা খুব কষ্টের বুঝলে।’

‘এর সাথে সাপের খোলসের কী সম্পর্ক?’

‘ছোটবেলা থেকেই প্রিয়র হাত খুব খসখসে আর শক্ত। আজকেও দেখলাম এখনো একই রকম আছে। আর খুব চামড়া উঠতো। আমরা জিজ্ঞেস করলে বলতো ওর নাকি সাপের শরীর। ছলম উঠবে। পুরো চামড়া উঠে গেলে ওর নতুন জীবন। এটা অবশ্য বলতো ফান করে। ও নিজে এই চামড়া ওঠা খসখসে হাত নিয়ে অস্বস্তিতে থাকতো। নতুন পরিচয়ে কারো সাথে হাত মেলাতে বিব্রত বোধ করতো। কলেজে উঠে অনেক ডাক্তারও দেখিয়েছে। লাভ হয়নি।’

তারপর আরো এটা সেটা কী কী অর্থহীন কথা যেন বললাম দু’জনে। আমি তো অন্তত আমাকে চিনি। এতো কথা বলার লোকই না আমি, তবু প্রীতির সাথে আমার কথা ফুরায় না। গুলিস্থান থেকে রিক্সা পাল্টে আরেক রিক্সায় বনগ্রাম যাওয়ার পথে রাতের জন্য চিকেন বিরানী নিলাম দুই প্যাকেট, যাতে প্রীতিকে আজ আর রান্না করতে না হয়।

বাড়ি ফিরেই আমার খুব ইচ্ছা করছিলো। প্রীতিও সাড়া দিলো। তারপর সব পোশাক টোশাক পাল্টে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে শুতে গেলাম। প্রীতি ফেসবুকে রোজই বন্ধুদের সাথে এইসময় চ্যাটিং করে। আমিও ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে থাকি। একসময় ঘুমিয়েও পড়ি। আজও রুটিন শুরু হলো। ফেসবুক জুড়ে শুধু প্রিয় আর প্রিয়। কত যে লাইক, কমেন্টস! প্রীতি খুশিতে অস্থির। কতবার যে আমাকে থ্যাংকস দিলো। আমার ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিলো না।

একসময় উঠে ঘাড়ে পানি দিয়ে এলাম। তারপর মটকা মেরে পড়ে রইলাম প্রীতির পাশে। লাভ হলো না। বরং ও-ই একসময় ঘুমিয়ে পড়লো। আমি জেগে রইলাম। আমার চোখ কটকট করতে লাগলো। আলগোছে উঠে বসে ঘুমন্ত প্রীতিকে দেখলাম। ও সুন্দর সন্দেহ নেই। কিন্তু...

উঠে বারান্দায় গেলাম। আজ কেন যে শুধু প্রতিমার কথা মনে পড়ছে!

প্রতিমা পাল পরিতোষের বোন। আসল প্রতিমা ঠাকুরের মতো বড় বড় চোখ। মুখটাও পানপাতা গড়নের। এতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। প্রথম যখন ওদের গ্রামে গেছি তখন ও ছোটই। সিক্সে পড়ে। গ্রামের স্কুলে। তখনই অবশ্য বোঝা যাচ্ছিলো কালে ও সুন্দরী হবে। কিন্তু বিত্তহীনদের যা হয়। কোন আব্রু নেই। সুরক্ষা নেই। এসব ব্যাপারে পরিতোষেরও যেন করার কিছু নেই। আর কাকুর তো উপায়ই নেই।

প্রীতিকে মিথ্যা বলেছি। ওই গ্রামে আমি আরও তিনবার গেছি। একা।

প্রথমবার এইচএসসির পর। প্রিয়র বাবার মৃত্যু সংবাদে। প্রিয় কিছুতেই গেলো না। শ্রাদ্ধ মুখাগ্নি কীভাবে হলো যে জানে। ও তখন পাড়ার ফাংশনে গান গায়। কিছু বাড়তি উপার্জন হয় তাতে। আমাদের পীড়াপীড়িতেই ও বাধ্য হলো কিছু টাকা দিতে রাজি হওয়ায়। কিন্তু নিজে যেতে রাজি হলো না। ও কিছুতেই সংসারের ঘানি টানতে চাইতো না। আমাদের সাথে এ নিয়ে অনেক কথা কাটাকাটি রাগারাগীও হয়েছে।

বাধ্য হয়ে আমিই গেলাম। গ্রামটা তখন আমার কাছে আরো শ্রীহীন মনে হলো। আর প্রতিমাকে অপ্সরী। দেখে আমি চমকে গিয়েছিলাম। ওটা ঠিক প্রেম নয়, করুনা কিছুটা থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা তো নয়ই। মোহ হতে পারে। কিন্তু এমন অবস্থা যে, ওকে দেখলেও মাথা ঘোরে, বেশিক্ষণ চোখের আড়ালে থাকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, অস্থির লাগে। কোন রকমে ঢাকা ফিরলাম।

কিন্তু শান্তি নেই। পনের কি বিশ দিন পর লুকিয়ে প্রতিমাদের গ্রামে গেলাম আবার। শুধু ওকে দেখতে। প্রিয় কেন, কাউকেই বলিনি সেকথা। প্রিয়র মা মরলো আমি থাকতেই। প্রতিমা শুধু তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে। আর ওর চোখ দিয়ে জল পড়তো। আমার কাছে যা টাকাপয়সা ছিলো তা দিয়েই কী কী যেন করলাম। শূন্য ঘরে ফিরে দেখি প্রতিমা নেই। দাওয়ায় বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি ও ফিরছে স্নান সেরে। ভেজা শাড়িতে পুরোটা শরীর স্পষ্ট দেখে কী যেন হলো আমার। প্রথম কিছুক্ষণ পায়ে পায়ে চেপে লুকিয়ে রাখলাম। তারপর একসময় লজ্জায় পালিয়ে এলাম।

তারপর আবার গেলাম তিনদিন পর। ভূতগ্রস্তের মতো। মনে হলো প্রতিমা আমারই অপেক্ষায় ছিলো। আমি ওকে জাপটে ধরে...

সেই রাত আমি ভুলবো না কোনদিন। শূন্য ঘর। ঝিঁঝিঁর ডাক। কেউ কোনো জোর করিনি। অন্ধকারে কতবার কতভাবে যে আমরা শান্ত করেছি নিজেদের! সারারাত ঘুমাইনি। শেষরাতের দিকে প্রতিমা বলেছিলো, ‘আমাকে ফেলে যাবেনা তো?’ ফেলে যাবো কি! প্রতিমাকে ছাড়া তখন বাঁচাই অর্থহীন মনে হলো। বললাম, ‘না।’ তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম পাশাপাশি। প্রতিমা সারাটা রাত আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইলো। কত কী যে ভাবলাম। একসময় হাসফাস লাগতে লাগলো।

ভোরের দিকে প্রতিমা কচুবনে গেলো। আর আমি, কী হলো পালিয়ে এলাম।

মাস তিনেক পর প্রিয়ই খবর দিলো প্রতিমা আত্মহত্যা করেছে। না শুনি না শুনি করেই শুনলাম। বন্ধুরা প্রিয়কে সান্ত্বনা দিতে গেলো। ও শুধু বললো, ‘বাদ দে। ভালোই হলো। আমি কি ওকে দেখেশুনে রাখতে পারতাম! ভগবান ভালোই করেছে। আমার কোনো পিছুটানও রইলো না।’

কয়দিন পর প্রিয় তার প্রথম বিদেশ ফাংশন করতে চলে গেলো দুবাই। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, প্রতিমার আত্মহত্যা যেন প্রিয়র মতো আমাকেও তেমন করে স্পর্শ করলো না। আমি যেন বেঁচে গেলাম। আমার সব আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে গেলো। আমি বিয়ে করলাম। সুন্দরী বউ পেলাম। বউকে ভালোও বাসি। আজ কেন যেন প্রতিমার কথাটা খুব মনে পড়ছে আর কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। খেয়াল করলাম রাতের এই সময়েই ওকে কথা দিয়েছিলাম ছেড়ে না যাওয়ার।

আনমনে হাতের কনুইয়ের চামড়া তুলতে লাগলাম।

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

ছলম

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

আমার আর আমার বউয়ের রুচির ফারাক প্রকট। রোজ সকালে আমি রেডিওতে খবর শুনি, তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত। পারিবারিক অভ্যাস। আমি বুঝি প্রীতির এসব ভালো লাগে না। ওর ভালো লাগে আধুনিক গান। প্রিয় চৌধুরীর গান ওর পছন্দ। প্রিয় আমার বন্ধু হওয়ায় বোধহয় কিছুটা আলগা খাতিরও আমার আছে।

তার মানে এই নয় যে, আমার আর আমার বউয়ের সম্পর্ক ভালো না। আমাদের বিয়ে হয়েছে চার মাস আগে। পারিবারিক দেখাশোনার বিয়ে হলেও খুব ভালোবাসি আমি বউকে। সেও বোধহয় তাই। বিয়ের আগে পরিবারিক ব্যবস্থায়ই দু’একবার আমরা বাইরে দেখা করেছি। ও খুব উচ্ছল, আমার মতো মুখচোরা নয়। তখন থেকেই, মানে বিয়ের আগে থেকেই বউকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।

প্রিয়র কথা ও প্রথম শুনেছে তখন, বিয়ের আগেই। খুব খুশি। এরকম একজন বিখ্যাত গায়ক আমার বন্ধু! বলেছিলো বিয়েতে প্রিয় এলে যেন একসাথে ছবি তুলে দেই। সেটা অবশ্য হয়নি। প্রিয় এখন ভিআইপি। সব জায়গায় ও হুট করে যেতে পারে না। আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত। আমাদের আয়োজনও তাই সেরকমই। বিয়ের অনুষ্ঠান, খাওয়া দাওয়া সব হয়েছে মন্দিরে। সেখানে প্রিয় আসবে কী করে? আমার অন্য বন্ধুরা এসেছিলো। প্রিয় অবশ্য পরে একদিন দাওয়াত করেছিলো আমাদের, ওর পরীবাগের ফ্ল্যাটে।

প্রীতির সেদিন এলোমেলো অবস্থা। সকাল থেকেই কী পরবে তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বড় দিদির কাছ থেকে দামী কাতান এনেছিলো ধার করে। আমাকেও পাঠিয়েছিলো, বাবার তসরের পাঞ্জাবি আনতে। আমার এসব ভালো না লাগলেও কিছু বলিনি। থাক ছোট মানুষ। সেলিব্রিটির বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার এইটুকু ঝামেলা মেনে নিয়েছি। উবার নিয়ে বনগ্রাম থেকে পরীবাগ গিয়েছি সেদিন।

প্রিয়র ফ্ল্যাটটা বিশাল। দুই হাজার স্কয়ার ফিটের কম হবে না। চমৎকার সাজানো। দক্ষিণ দিক খোলা। হু হু বাতাস। বিয়ে করেনি এখনো। একাই থাকে। আমাদের দাওয়াত উপলক্ষে ক্যাটারিং থেকে খাবার এসেছে। সাথে দুই-চারজন বেয়ারা শ্রেণির লোক। ওরাই দেখাশোনা করেছে।

প্রিয় অবশ্য অনেক আন্তরিক। আমাদের অনেক সমাদর করলো। প্রায় বছরখানেক পর দেখা। দরজা খুলেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো। হ্যান্ডশেক করার সময় দেখলাম ওর হাত একই রকম আছে। শক্ত, খসখসে। আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জন জবরজং পোশাক পরলেও আমার বন্ধুটি পরেছিলো সাধারণ জিন্স আর টি-শার্ট। অনেক গল্প করলাম আমরা। বসার ঘরে ওর নিজের বিরাট একটা ছবি বাঁধানো। তার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো ছবি তুললাম। বেশিরভাগই অবশ্য প্রিয়র সাথে প্রীতির। বিদায়ের সময় দারুণ একটা পারফিউম সেট গিফ্ট করলো ও আমার বউকে। বললো গত মাসে মালয়েশিয়া থেকে প্রোগ্রাম সেরে ফেরার সময় কিনেছে।

নিশ্চয়ই অনেক দাম! আমার একটু লজ্জাই লাগলো। ‘এতো দামী গিফ্ট না কিনলেও পারতি।’ বলেই ফেললাম।

প্রিয় গাঢ় গলায় বললো, ‘তোদের কাছে আমার অনেক ঋণ। এটুকু করতে দে’। তারপর কথা ঘুরিয়ে স্বাভাবিকভাবে বললো, ‘এতো সুন্দর বউদির জন্য এ তো অতি সামান্য।’

আমার বউ এসবে লজ্জা পায় না। সেও পাল্টা বললো, ‘আপনিও কত হ্যান্ডসাম। বিয়ে করবেন কবে?’

‘করবো বউদি। সব গুছিয়ে ফেলেছি। এবার ভালো একটা মেয়ে দেন, বিয়ে করে ফেলি।’

ফেরার সময় প্রিয় ওর গাড়িতে নামিয়ে দিতে চাইলো। যদিও ড্রাইভার আছে, তবু খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো। কী করে না করি! প্রীতি বুঝলো এবং খুবই সুন্দর ম্যানেজ করলো। বললো গাড়িতে ওর মাথা ঘোরে।

পরীবাগ থেকে আমরা নিউ মার্কেট গেলাম। ফুচকা খেলাম। প্রীতি যে খুব খুশি তা বেশ বোঝা যাচ্ছিলো। ওইটুক পথে রিক্সায় আসতে আসতে প্রিয়র সাথে ওর আর আমার ছবির ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়া শেষ। লাইক, কমেন্ট, ফোনের লাইন লেগে গেলো।

বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। সিএনজি নিতে চেয়েছিলাম। প্রীতিই বললো ভেঙে ভেঙে রিক্সায় যাবে।

ইউনিভার্সিটির ভিতরে ঢুকে রিক্সায় বসে আমার ভালো লাগছিলো। নিজের বউ হলেও পাশাপাশি সেজেগুঁজে বসে কেমন শিহরন লাগছিলো। তাকিয়ে দেখলাম। বউটা আমার সত্যিই অনেক সুন্দর।

‘কী দেখ?’ মুচকি হাসে প্রীতি।

‘তোমাকে।’ বেহায়ার মতো বলি। তারপর অন্যদিকে তাকাই।

‘রাগ করেছো?’

‘না তো!’

কী মনে করে কিছুক্ষণ পর প্রায় আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রীতি বললো, ‘তোমার বন্ধুটা সেলিব্রেটি হলেও ভালো। ওর অনেক টাকা। কিন্তু আমার ওসব চাই না। আমি তোমাকেই ভালোবাসি।’

বুঝলাম, ও ভাবছে কোনো কারণে আমি ইনফিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছি কিনা। সেটা না হলেও ওর কথার উত্তরে কী বলবো! খুশি হলেও তাই চুপ করে রইলাম। প্রীতিই কথা বলছিলো। কিন্তু অনেক কথাই আর খেয়াল করতে পারছিলাম না।

কার্জন হলের সামনের রাস্তাটা আমার অনেক প্রিয়, সেটা প্রীতি জানে। সেখানে গিয়েও যখন আনমনা রইলাম তখন প্রীতি সত্যি সত্যি ভাবলো আমি মন খারাপ করেছি। আমি ওর ভুল ভাঙাতেই বললাম, ‘আরে না। আসলে ঘুরেফিরে কেন যেন আজ প্রিয়দের গ্রামের কথা মনে পড়ছে।’

‘কেন খুব সুন্দর!’

‘হ্যাঁ একেবাবে সাহিত্যের বর্ণনার মতো। মনে হয়েছিলো তারাশঙ্কর এই গ্রাম দেখেই কবি উপন্যাস লিখেছিলেন। আমাদের দারুণ লেগেছে।’

‘তাই! চলো না যাই।’

প্রীতিরাও ঢাকার স্থানীয়। আমাদের কোনো গ্রামের বাড়ি নেই। গ্রাম সম্বন্ধে তাই আমাদের দু’জনেরই অবসেশন আছে। চুপ করে আছি বলে প্রীতি বুঝলো উল্টো। সেটা বুঝে আমি বললাম, ‘শোনো, বাড়ির সাথে প্রিয়র কোনো সম্পর্ক নেই।’

‘কী! কেন?’

‘সে তো অনেক ঘটনা।’

‘বলো না প্লিজ।’

বাধ্য হয়েই বললাম, ‘প্রিয় চৌধুরী ওর আসল নাম নয়। আসল নাম পরিতোষ পাল।’

প্রীতি চমকে গেল, ‘মানে?’

‘হ্যাঁ শোনো। আমরাও জানতাম না। স্কুলে একসাথেই পড়তাম। সবাই স্থানীয় ছেলে। শুধু প্রিয়ই বাইরের। ও কেমন এক দুসম্পর্কের কাকার সাথে মেসে থাকতো। এসএসসি দিয়ে প্রথম আমরা দল বেঁধে ওদের গ্রামে যাই। প্রিয় রাজি ছিলো না। আমরা জোর করে রওনা হই। তখন থেকেই ও মনমরা হয়ে ছিলো। ওর গ্রামে গিয়ে জানতে পারি ওর আসল নাম আর পদবি। বাবা মনীন্দ্র পাল। যক্ষার রোগী। প্রতিমা বানানো তার পেশা। জমিটমি নেই। পূজা পার্বণ ছাড়া কোনো কাজও নেই। হতদরিদ্র। বাড়ি বলতে একটা ঘর। পড়ো পড়ো। বাথরুম পিছনের কচু বনে। দুই বাঁশের পা-দানী দেয়া আছে শুধু। তাও নড়ে। কোনো ঘেরা নেই। কচুবনের আড়ালে বসে পড়তে হয়। স্নান পাঁচ মিনিট দূরের নদীতে। আমরা বুঝলাম একটা টাকা বাড়ি থেকে ও সাহায্য পায়নি। ঢাকায় থেকে টিউশুনি করে ও যে পড়লো সেটাই তো বিরাট এক যুদ্ধ। আমরা প্রথমেই কেমন হকচকিয়ে গেলাম। আর পরিতোষ লজ্জায় কেমন মাটিতে মিশে গেলো।’

প্রীতি বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে শুনতে লাগলো।

‘কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য আমরা সব স্বাভাবিক করে নিলাম। দুই দিন ছিলাম ওদের বাড়িতে। গরমের দিন বলে বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়েছি। কচুবনে গিয়েছি। কী আর করা। কিন্তু বন্ধুকে মন খারাপ করতে দেইনি।’

‘আপনাগের কষ্ট হলো।’ ফেরার সময় কাকাবাবু বলেছিলেন। আমরা হইহই করে উঠেছিলাম। ‘কিসের কষ্ট!’ বলেছিলাম সামনের দূর্গাপূজায় আবার যাবো। কিন্তু আর যাইনি।’

‘কেন?’ প্রীতি প্রশ্ন করলো।

একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘যাইনি মানে যাওয়া হয়নি। তাছাড়া পরিতোষও চাইতো না। এমনকি ও আমাদের রীতিমতো অনুনয় করেছিলো যাতে ওর নামের পরিবর্তন, বাড়ির অবস্থা এসব আর কাউকে না বলি। আমরা কথা রেখেছিলাম। ঢাকা ফিরে আবার ‘প্রিয়’ হয়ে উঠলো ও। কলেজেও পড়েছি একসাথে। তারপর ভার্সিটি। প্রিয় আস্তে আস্তে গানে ঝুঁকে পড়লো এবং নাম করলো। ওর শত শত ফ্যান আর গোটা কতক প্রেমিকা দেখে আমরা ঈর্ষা বোধ করতাম। তখনও তেমন নাম করেনি, একজনের সাথে ওর প্রায় ঝামেলা হয়ে গিয়েছিলো। বিয়ে না করলে মানসম্মান যায় আর কি।’

‘বলো কী? একেবারে ভেজা বেড়াল। ওকে দেখে তো ওরকম মানে খারাপ মনে হয় না।’

‘না না ও খারাপ নয়। ও শুধু প্রাণপনে চাইতো ওর অতীতটা মুছে ফেলে নতুন পরিচয়ে বাঁচতে। আসলে দারিদ্র্য ওর পছন্দ ছিলো না।’

‘তাই বলে পদবী অস্বীকার করবে? আর বাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে মানে কী?’

প্রিয়র দেয়া পারফিউমের ব্যাগটা প্রীতির হাতে ধরা। রাগ করে আবার ফেলেটেলে দেবেনা তো। ডান হাত দিয়ে ব্যাগটা আমার হাতে নিলাম। বাম হাত ঘুরিয়ে পিছন দিক দিয়ে প্রীতির কোমড় ধরলাম।

‘হ্যা তা ঠিক। তবে অনেকেই তো নাম পাল্টায়। কয়টা লেখকের আসল নাম বলো।’ বন্ধুর হয়ে সাফাই গাইলাম।

‘যাই বলো। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগলো না। তারপর কী হলো? ওই মেয়েটা কই যার সাথে উনি ইয়ে করলো?’

‘তারপর আর কী! সেসব কীভাবে যেন ম্যানেজ করলো ও-ই। বিরাট কানেকশন, বুঝো না? আর এখন তো দেখছোই কী পরিবর্তন। জনপ্রিয় গায়ক প্রিয় চৌধুরী।’

‘কিন্তু মানুষ যেমনই হোক ওর গানের গলা সত্যিই ভালো।’

‘হুম।’

‘হুম কী? আবার কী ভাবো?’

‘ছলম বোঝ?’

‘না। কী?’

‘সাপের খোলস পাল্টানো।’

‘মানে কী?’

‘সাপের পুরনো খোলস বা চামড়া শুকিয়ে খড়খড়ে হয় একসময়। নিচে নতুন চামড়া গজাতে থাকে। তখন সাপের গা জ্বলে। সে রেগে থাকে। ফোঁসফোঁস করে। একসময় চোখা কোন কাঁটা বা বেড়ার গায়ে গা ঘষে সে পুরনো চামড়া খসিয়ে ফেলে। ব্যাপারটা খুব কষ্টের বুঝলে।’

‘এর সাথে সাপের খোলসের কী সম্পর্ক?’

‘ছোটবেলা থেকেই প্রিয়র হাত খুব খসখসে আর শক্ত। আজকেও দেখলাম এখনো একই রকম আছে। আর খুব চামড়া উঠতো। আমরা জিজ্ঞেস করলে বলতো ওর নাকি সাপের শরীর। ছলম উঠবে। পুরো চামড়া উঠে গেলে ওর নতুন জীবন। এটা অবশ্য বলতো ফান করে। ও নিজে এই চামড়া ওঠা খসখসে হাত নিয়ে অস্বস্তিতে থাকতো। নতুন পরিচয়ে কারো সাথে হাত মেলাতে বিব্রত বোধ করতো। কলেজে উঠে অনেক ডাক্তারও দেখিয়েছে। লাভ হয়নি।’

তারপর আরো এটা সেটা কী কী অর্থহীন কথা যেন বললাম দু’জনে। আমি তো অন্তত আমাকে চিনি। এতো কথা বলার লোকই না আমি, তবু প্রীতির সাথে আমার কথা ফুরায় না। গুলিস্থান থেকে রিক্সা পাল্টে আরেক রিক্সায় বনগ্রাম যাওয়ার পথে রাতের জন্য চিকেন বিরানী নিলাম দুই প্যাকেট, যাতে প্রীতিকে আজ আর রান্না করতে না হয়।

বাড়ি ফিরেই আমার খুব ইচ্ছা করছিলো। প্রীতিও সাড়া দিলো। তারপর সব পোশাক টোশাক পাল্টে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে শুতে গেলাম। প্রীতি ফেসবুকে রোজই বন্ধুদের সাথে এইসময় চ্যাটিং করে। আমিও ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে থাকি। একসময় ঘুমিয়েও পড়ি। আজও রুটিন শুরু হলো। ফেসবুক জুড়ে শুধু প্রিয় আর প্রিয়। কত যে লাইক, কমেন্টস! প্রীতি খুশিতে অস্থির। কতবার যে আমাকে থ্যাংকস দিলো। আমার ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিলো না।

একসময় উঠে ঘাড়ে পানি দিয়ে এলাম। তারপর মটকা মেরে পড়ে রইলাম প্রীতির পাশে। লাভ হলো না। বরং ও-ই একসময় ঘুমিয়ে পড়লো। আমি জেগে রইলাম। আমার চোখ কটকট করতে লাগলো। আলগোছে উঠে বসে ঘুমন্ত প্রীতিকে দেখলাম। ও সুন্দর সন্দেহ নেই। কিন্তু...

উঠে বারান্দায় গেলাম। আজ কেন যে শুধু প্রতিমার কথা মনে পড়ছে!

প্রতিমা পাল পরিতোষের বোন। আসল প্রতিমা ঠাকুরের মতো বড় বড় চোখ। মুখটাও পানপাতা গড়নের। এতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। প্রথম যখন ওদের গ্রামে গেছি তখন ও ছোটই। সিক্সে পড়ে। গ্রামের স্কুলে। তখনই অবশ্য বোঝা যাচ্ছিলো কালে ও সুন্দরী হবে। কিন্তু বিত্তহীনদের যা হয়। কোন আব্রু নেই। সুরক্ষা নেই। এসব ব্যাপারে পরিতোষেরও যেন করার কিছু নেই। আর কাকুর তো উপায়ই নেই।

প্রীতিকে মিথ্যা বলেছি। ওই গ্রামে আমি আরও তিনবার গেছি। একা।

প্রথমবার এইচএসসির পর। প্রিয়র বাবার মৃত্যু সংবাদে। প্রিয় কিছুতেই গেলো না। শ্রাদ্ধ মুখাগ্নি কীভাবে হলো যে জানে। ও তখন পাড়ার ফাংশনে গান গায়। কিছু বাড়তি উপার্জন হয় তাতে। আমাদের পীড়াপীড়িতেই ও বাধ্য হলো কিছু টাকা দিতে রাজি হওয়ায়। কিন্তু নিজে যেতে রাজি হলো না। ও কিছুতেই সংসারের ঘানি টানতে চাইতো না। আমাদের সাথে এ নিয়ে অনেক কথা কাটাকাটি রাগারাগীও হয়েছে।

বাধ্য হয়ে আমিই গেলাম। গ্রামটা তখন আমার কাছে আরো শ্রীহীন মনে হলো। আর প্রতিমাকে অপ্সরী। দেখে আমি চমকে গিয়েছিলাম। ওটা ঠিক প্রেম নয়, করুনা কিছুটা থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা তো নয়ই। মোহ হতে পারে। কিন্তু এমন অবস্থা যে, ওকে দেখলেও মাথা ঘোরে, বেশিক্ষণ চোখের আড়ালে থাকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, অস্থির লাগে। কোন রকমে ঢাকা ফিরলাম।

কিন্তু শান্তি নেই। পনের কি বিশ দিন পর লুকিয়ে প্রতিমাদের গ্রামে গেলাম আবার। শুধু ওকে দেখতে। প্রিয় কেন, কাউকেই বলিনি সেকথা। প্রিয়র মা মরলো আমি থাকতেই। প্রতিমা শুধু তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে। আর ওর চোখ দিয়ে জল পড়তো। আমার কাছে যা টাকাপয়সা ছিলো তা দিয়েই কী কী যেন করলাম। শূন্য ঘরে ফিরে দেখি প্রতিমা নেই। দাওয়ায় বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি ও ফিরছে স্নান সেরে। ভেজা শাড়িতে পুরোটা শরীর স্পষ্ট দেখে কী যেন হলো আমার। প্রথম কিছুক্ষণ পায়ে পায়ে চেপে লুকিয়ে রাখলাম। তারপর একসময় লজ্জায় পালিয়ে এলাম।

তারপর আবার গেলাম তিনদিন পর। ভূতগ্রস্তের মতো। মনে হলো প্রতিমা আমারই অপেক্ষায় ছিলো। আমি ওকে জাপটে ধরে...

সেই রাত আমি ভুলবো না কোনদিন। শূন্য ঘর। ঝিঁঝিঁর ডাক। কেউ কোনো জোর করিনি। অন্ধকারে কতবার কতভাবে যে আমরা শান্ত করেছি নিজেদের! সারারাত ঘুমাইনি। শেষরাতের দিকে প্রতিমা বলেছিলো, ‘আমাকে ফেলে যাবেনা তো?’ ফেলে যাবো কি! প্রতিমাকে ছাড়া তখন বাঁচাই অর্থহীন মনে হলো। বললাম, ‘না।’ তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম পাশাপাশি। প্রতিমা সারাটা রাত আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইলো। কত কী যে ভাবলাম। একসময় হাসফাস লাগতে লাগলো।

ভোরের দিকে প্রতিমা কচুবনে গেলো। আর আমি, কী হলো পালিয়ে এলাম।

মাস তিনেক পর প্রিয়ই খবর দিলো প্রতিমা আত্মহত্যা করেছে। না শুনি না শুনি করেই শুনলাম। বন্ধুরা প্রিয়কে সান্ত্বনা দিতে গেলো। ও শুধু বললো, ‘বাদ দে। ভালোই হলো। আমি কি ওকে দেখেশুনে রাখতে পারতাম! ভগবান ভালোই করেছে। আমার কোনো পিছুটানও রইলো না।’

কয়দিন পর প্রিয় তার প্রথম বিদেশ ফাংশন করতে চলে গেলো দুবাই। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, প্রতিমার আত্মহত্যা যেন প্রিয়র মতো আমাকেও তেমন করে স্পর্শ করলো না। আমি যেন বেঁচে গেলাম। আমার সব আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে গেলো। আমি বিয়ে করলাম। সুন্দরী বউ পেলাম। বউকে ভালোও বাসি। আজ কেন যেন প্রতিমার কথাটা খুব মনে পড়ছে আর কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। খেয়াল করলাম রাতের এই সময়েই ওকে কথা দিয়েছিলাম ছেড়ে না যাওয়ার।

আনমনে হাতের কনুইয়ের চামড়া তুলতে লাগলাম।

back to top