alt

সাময়িকী

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

: সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

১০. আশা- একমাত্র ভেলা

আমাদের ভিতরে নানা রকম আশাবাদের চাষ হতে থাকে। এর ভিতরে বেশ কিছু কুসংস্কারও ঢুকে পড়ে। আসলে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। আমাদের ঘরের সাথে একটা জাম গাছ ছিল। জামগাছের একটি ডাল আমাদের চালের উপর ঝুঁকে পড়েছে। বাতাস উঠলে টিনের চালের সাথে ঘর্ষণ লেগে বেশ বিশ্রি একটা শব্দ হয়। মা অনেক দিন বাবাকে বলেছে ডালটা কেটে ফেলার জন্য। ডালটা আর কাটা হয়নি। মূল গাছ বেয়ে এই ডালটি দিয়ে আমি সহজেই ঘরের চালে উঠে যেতে পারতাম। সে কারণেই হয়তো ডালটি কাটা হয়নি। এছাড়া ডালটিতে প্রচুর জামও ধরত। একদিন গাছটিতে উঠে দেখি প্রতিটি পাতার পিঠে একটা করে রক্তাক্ত দাগ। এটা কিসের দাগ? আমি চিন্তায় পড়ে যাই। এর আগে তো আমি এ ধরনের কোনো দাগ জামপাতায় দেখিনি। দাগগুলো বাইম মাছের পিঠের মতো পাতার পিছনে ফুলে উঠেছে। মানুষের গায়ে জালি বেত জোরে দিয়ে বারি মারলে যে রকম দাগ পড়ে অনেকটা সে রকম দাগ।

আমি দ্রুত নেমে আসি গাছ থেকে। কয়েকটা জামপাতা ছিড়ে নিয়ে আসি সাথে করে। পাতাগুলো আমার বন্ধুদেরকে দেখাই। তারা পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। আমি মনে করেছিলাম তারা পাতাগুলো দেখে বিস্মিত হবে। তারা কোনো রকম বিস্ময় প্রকাশ না করে পাতাগুলো ছুড়ে ফেলে দেয় নিস্পৃহভাবে যেনো এটি কোনো ঘটনাই না। এরকম ঘটনা তাদের জীবনে অহরহই ঘটছে। তাদের এই নিস্পৃহতা আমার কাছে খারাপ লাগে।

তুই জানস না? তারা আমাকে প্রশ্ন করে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। কী জানব আমি আর জানলে জামপাতা নিয়ে আমি তাদের কাছে যাবো কেন?

কী জানবো? আমি তাদেরকে পাল্টা প্রশ্ন করি।

জাম ফকিরের ঘটনা তুই জানস না! সারা দেশের মানুষ জানে।

সারা দেশের মানুষ জানলে আমারও তো জানার কথা। কারণ আমিও তো দেশের ভিতরেই থাকি। আমার চোখের ভাষায় আমি প্রশ্ন ছুড়ে দেই তাদের মুখে। তারা আমার প্রতি প্রসন্ন হয় এবং একজন দয়া করে মুখ খুলে।

এটা জাম ফকিরের গায়ের বেতের দাগ।

জাম ফকির! আমি আবার বিপন্নবোধ করি। জাম ফকিরকে চিনি না বললে এরা আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে। আমাদের এলাকাটি সাধু-ফকিরদের এলাকা। সিলেটের কাছাকাছি হওয়ার কারণেই কি না সাধু-ফকিরদের প্রতি আমাদের এলাকার লোকজনের বেশ একটা ভাব-ভক্তি আছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ফকির আসে আমাদের বাড়িতে। কেউ জটাধারী, দাড়ি গোঁফের আড়ালে আসল আসল চেহারা দেখা যায় না, কেউবা অর্ধনগ্ন। কেউ কথা বলে না তো কেউ কেউ আবার উল্টাপাল্টা রহস্যজনক কথা বলে লোকজনকে ভড়কিয়ে দেয়। লোকজন ভয়ে সাহায্য-ভিক্ষা দিয়ে দেয়।

মা বলে- জঙ্গলও খালি নয়, ফকিরও খালি নয়। অর্থাৎ জঙ্গলে যেমন বাঘ-সিংহ থাকতে পারে তেমন এ সকল ফকিরের মধ্যে অনেক আসল ফকির, সাধু থাকতে পারে। তাদের সাথে কোনো খারাপ আচরণ করা যাবে না। করলে তাদের ‘ডাক’ লেগে জীবন ছারখার হয়ে যাবে। আমি ফকিরদের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকি। তাঁদের কেরামতিতে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস না করলে বিপদ হতে পারে। যেমন এক লোক বেয়দবি করেছিল এক পির সাহেবের সাথে। লোকটি ছিল খুব অহংকারী। তাঁকে মানা করা হয়েছিল জুতা না নিয়ে মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে। তখন লোকটা না কি বলেছিল- আগে বললে তো পাটা-ই বাসায় রেখে আসতাম। লোকটি তার দুটি পা নিয়ে আর বাসায় ফিরতে পারেননি। মাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বেবিটেক্সি দুর্ঘটনায় লোকটি একটি পা হারান। এ ঘটনাটি আমি অনেকবার শুনি অনেকের কাছে। পির ফকিরদের ব্যাপারে আমি অনেক সাবধান থাকি।

অনেক কসরত করে তাদের কাছ থেকে যা জানা গেল তা হলো কোনো এক গ্রামের জামবাগানে এক ফকির থাকত। জামবাগানে থাকতো বলে তাঁর নাম জাম ফকির। তো সেই জাম ফকির একবার পাকিস্তানী সৈন্যদের সামনে পড়ে যান। পাকিস্তানী সৈন্যরা তো আর জাম ফকিরকে চেনে না। অর্ধ উলঙ্গ ফকিরকে নিয়ে তার ঠাট্টা তামাশা করতে শুরু করে। তারা ফকিরকে কলমা জিঙ্গেস করে, ফকির কলমা বলতে পারে না। বিড়বিড় করে কী যেনো একটা কিছু বলে যাচ্ছে। বার বার জিঙ্গেস করেও তার নাম ধাম ঠিকানা উদ্ধার করতে পারেনি সৈন্যরা। ফকির শুধু বিড়বিড় করে যাচ্ছে। এতে বিরক্ত হয়ে সৈন্যদের নেতাটি তার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে ফকিরের গায়ে জোরে বারি মারে। কিন্তু বারিটা ফকিরের গায়ে না লেগে বাতাসে শুধু মাত্র একটা শিস্ কাটতে সক্ষম হয়। ফকির ততক্ষণে গায়েব। রক্তবমি করতে করতে সৈন্যদলের নেতাটি সেখানেই মারা পড়ে। সেদিন থেকেই সকল জাম পাতায় রক্তাক্ত দাগ দেখা দিতে শুরু করে। কচু ফকিরের গায়েও এরা হাত তুলেছে। এজন্য কচু পাতার গায়েও নাকি লাল মোটা দাগ দেখা দিয়েছে। আমরা কয়েকটি কচু গাছের পাতা উল্টিয়ে মোটা মোটা রক্তাক্ত দাগ আবিষ্কার করি।

দেশ স্বাধীন হতে আর বেশি দেরি নয়। কারণ ফকিরের গায়ে এরা হাত তুলেছে। আমাদের একজন বলল। তার কথায় আমরা সাঁই দেই। আমাদের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে জাম ফকিরের বদ দোয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা কামনা করতে থাকি এরা এ ধরনের আরও ভুল তারা করতে থাকুক, আমফকির, বটফকির, গাবফকির, ন্যাংটা ফকিরকে এরা মারুক। এ সকল ফকিরের বদ দোয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী তাহলে তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে।

দেশ স্বাধীন হবে কি হবে না এ নিয়ে আরও নানা ধরনের পরীক্ষা আমাদের মাঝে চলতে থাকে। সে পরীক্ষার কোনো কোনোটা আমাদের কাছে অলৌকিক বলে মনে হতে থাকে। সে পরীক্ষাসমূহের ফলাফল আমাদেরকে বলে দেয় দেশ স্বাধীন হবেই হবে। এর মধ্যে একটা হলো বদনা-পাটা পরীক্ষা। সে এক মজার পরীক্ষা। আমরা মসলা-মরিচ বাটার একটা পাটা নেই। পাটাটিকে মাঝ উঠানে রাখি, তার পর এর এর মাঝ বরাবর পুকুরের কিছু কাদামাটি রেখে দেই। এবার একটা পিতলের বদনা নেই। পিতলের বদনাটির নিচের খাঁজকাটা অংশটুকু সেই কাদার ভিতরে ঢুকিয়ে দেই। তারপর শুরু হয় আসল খেলা। বদনার কানা দুহাতে ধরে জয় বাংলা’ বলে বদনাটি উঁচু করে ধরি। অবাক কাণ্ড! পাটাটি বদনার সাথে উপরে উঠে আসে। পাটাটি যথেষ্ট ভারি। এটি কাদামাটির মাধ্যমে বদনার সাথে সংযুক্ত হয়ে উপরে উঠে আসার কথা নয়। এতে নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু একটা আছে। আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই দেশ স্বাধীন হবে।

আমরা নিশ্চিত হলে কি হবে আমাদের বড়রা তো এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না। জামফকিরের ঘটনাটিকে তারা পাত্তাই দচ্ছে না। তারা মনে করে এটা জাম গাছের পাতার একটা রোগ এবং প্রায় বছরেই পাতার গায়ে এ ধররে দাগ পড়ে। সুতারাং এতে কোনো বুজুরকির কিছু নেই। তাদের কথায় আমরা হতাশ হই। বদনা পাটার পরীক্ষার বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই। তারা বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না আবার নিচ্ছেও। মাঝে মাঝে তারাও ব্যাপারটিকে বিশ্বাস করতেই চাচ্ছে বলেই মনে হয়। সংসার সায়রে আশাই একমাত্র ভেলা কি না।

১১. একটি হত্যাকা-

মৃত মানুষ দেখেছি কিন্তু মারা হয়েছে এমন কোনো মানুষ তখন পর্যন্ত দেখিনি। সময়টা তখন বোধ হয় মে জুন মাস হবে। কোনো এক সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শুনি বড়রা ফিসফিস করে কথা বলছে। কী হয়েছে? মাঝে মাঝেই বড়রা ফিসফিস করে কথা বলে। কী বলছে জিজ্ঞেস করলে ধমক মারে না হয় কথার উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আমাদের মন খারাপ হয়। মনে মনে বলি আমরাও একদিন ফিস ফিস করে কথা বলব। তখন দেখি আমাদেরকে কে কী জিজ্ঞেস করতে আসে।

সেদিন বড়রা আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিল। আব্বা মিয়াকে মেরে ফেলেছে মুক্তিরা। খবরটা বলার সময় তাদের কণ্ঠে এক ধরনের চাপা আনন্দ বিরাজ করে। তারা আব্বা মিয়াকে দেখে এসেছে। আব্বা মিয়ার সাথে আরও এক জনকে মেরে ফেলা হয়েছে। দুজনকে মেরে কুলারবন্দের খালে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। সে লাশ আনা হয়েছে গ্রামে।

আব্বা মিয়া লোকটা এ গ্রামের কেউ নয়। সে বিয়ে করেছিল এগ্রামে। সে নিজে একটা চোর কিংবা ডাকাত জাতীয় লোক। লোকটাকে আমি দেখেছি। অনেক লম্বা আর ডিংডিংয়ে একটা লোক। বেশ শৌখিন আর জামাকাপড়ে ফিটফাট। সে যে একটা ডাকাত কিংবা চোর দেখলে তা মনে হতো না। বাড়ি অন্য কোনো থানায় হবে। যে পাড়ায় বিয়ে করেছিল লাশ এনে তাদের বাড়িতেই রাখা হয়েছে। আমরা দৌড়ে গেলাম সেখানে। উঠানে চিৎ হয়ে পড়ে আছে আব্বা মিয়া। খালি গা, পরনে লুঙ্গি। গুলিটা কোথায় লেগেছিল আমার মনে নেই। তবে লোকটার মুখ আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না। তার সারামুখে চষা খেতের মাটি মাখানো। দাঁতে আর মুখে মাটি লেগে আছে। মরণের সময় মনে হয় সে মাটি কামড়ে ধরেছিল। তার দুহাতে মাঠি আর ঘাস লেগে আছে। খুব যন্ত্রণা পেয়ে কি লোকটা মারা গিয়েছে? মৃত্যুর সময় লোকটা কি কাউকে কাছে পেতে চেয়েছিল? কাউকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল? আমার ভিতরে লোকটির জন্য এক ধরনের মায়া জেগে ওঠে। হোক না খারাপ লোক, চুরি ডাকাতি করে। তাকে এভাবে মেরে ফেলতে হবে? আমার কিশোর মন যুদ্ধ আর মারামারির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায় না। মুক্তিরাই তাকে মেরেছে। আরো কয়েকজনকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা আছে তাদের বলে বড়রা বলাবলি করছে। কারণ এরা চুরি-ডাকাতি করে। এখন সুযোগ পাওয়া গিয়েছে, সুতারাং সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। বছর খানেক আগে গ্রামের বেশ কিছু বাড়িঘর ছাত্র জনতা পুড়িয়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এরা চোর। সালটা বোধ হয় ঊনসত্তর কিংবা সত্তর। তখন দেশটা চলে গিয়েছে ছাত্র জনতার হাতে। প্রতিদিনই তখন মিটিং আর মিছিল চলছে। আর সে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছে গোকর্ণ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে আমাদের গ্রামের আর পাশের গ্রামে পড়ুয়া ছাত্ররা। ছাত্রদের মাঝে কেউ কেউ তখন বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ত মনে হয়। এটা কি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্ব? আমার তাই মনে হয়। আব্বা মিয়ার মৃত্যু আমাকে বিচলিত করে। এই প্রথম আমাদের দিকে মনে হয় একটা হত্যাকা- সংঘটিত হয়। আরো কি হত্যাকা- হবে? হতে পারে। যাদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছে তারা সহজ লোক নয়। পুরো এলাকার লোকজন তাদেরকে ভয় করে। এরা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পেলে সহজে ছেড়ে দেবে? গ্রামবাসীদের মনে এক ধরনের আশংকা কাজ করতে থাকে। তবে ভরসার কথা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। অদৃশ্য থেকে থেকে তাঁরা ছোট ছোট অপারেশন চালাচ্ছে। ক্রমশ...

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

১০. আশা- একমাত্র ভেলা

আমাদের ভিতরে নানা রকম আশাবাদের চাষ হতে থাকে। এর ভিতরে বেশ কিছু কুসংস্কারও ঢুকে পড়ে। আসলে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। আমাদের ঘরের সাথে একটা জাম গাছ ছিল। জামগাছের একটি ডাল আমাদের চালের উপর ঝুঁকে পড়েছে। বাতাস উঠলে টিনের চালের সাথে ঘর্ষণ লেগে বেশ বিশ্রি একটা শব্দ হয়। মা অনেক দিন বাবাকে বলেছে ডালটা কেটে ফেলার জন্য। ডালটা আর কাটা হয়নি। মূল গাছ বেয়ে এই ডালটি দিয়ে আমি সহজেই ঘরের চালে উঠে যেতে পারতাম। সে কারণেই হয়তো ডালটি কাটা হয়নি। এছাড়া ডালটিতে প্রচুর জামও ধরত। একদিন গাছটিতে উঠে দেখি প্রতিটি পাতার পিঠে একটা করে রক্তাক্ত দাগ। এটা কিসের দাগ? আমি চিন্তায় পড়ে যাই। এর আগে তো আমি এ ধরনের কোনো দাগ জামপাতায় দেখিনি। দাগগুলো বাইম মাছের পিঠের মতো পাতার পিছনে ফুলে উঠেছে। মানুষের গায়ে জালি বেত জোরে দিয়ে বারি মারলে যে রকম দাগ পড়ে অনেকটা সে রকম দাগ।

আমি দ্রুত নেমে আসি গাছ থেকে। কয়েকটা জামপাতা ছিড়ে নিয়ে আসি সাথে করে। পাতাগুলো আমার বন্ধুদেরকে দেখাই। তারা পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। আমি মনে করেছিলাম তারা পাতাগুলো দেখে বিস্মিত হবে। তারা কোনো রকম বিস্ময় প্রকাশ না করে পাতাগুলো ছুড়ে ফেলে দেয় নিস্পৃহভাবে যেনো এটি কোনো ঘটনাই না। এরকম ঘটনা তাদের জীবনে অহরহই ঘটছে। তাদের এই নিস্পৃহতা আমার কাছে খারাপ লাগে।

তুই জানস না? তারা আমাকে প্রশ্ন করে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। কী জানব আমি আর জানলে জামপাতা নিয়ে আমি তাদের কাছে যাবো কেন?

কী জানবো? আমি তাদেরকে পাল্টা প্রশ্ন করি।

জাম ফকিরের ঘটনা তুই জানস না! সারা দেশের মানুষ জানে।

সারা দেশের মানুষ জানলে আমারও তো জানার কথা। কারণ আমিও তো দেশের ভিতরেই থাকি। আমার চোখের ভাষায় আমি প্রশ্ন ছুড়ে দেই তাদের মুখে। তারা আমার প্রতি প্রসন্ন হয় এবং একজন দয়া করে মুখ খুলে।

এটা জাম ফকিরের গায়ের বেতের দাগ।

জাম ফকির! আমি আবার বিপন্নবোধ করি। জাম ফকিরকে চিনি না বললে এরা আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে। আমাদের এলাকাটি সাধু-ফকিরদের এলাকা। সিলেটের কাছাকাছি হওয়ার কারণেই কি না সাধু-ফকিরদের প্রতি আমাদের এলাকার লোকজনের বেশ একটা ভাব-ভক্তি আছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ফকির আসে আমাদের বাড়িতে। কেউ জটাধারী, দাড়ি গোঁফের আড়ালে আসল আসল চেহারা দেখা যায় না, কেউবা অর্ধনগ্ন। কেউ কথা বলে না তো কেউ কেউ আবার উল্টাপাল্টা রহস্যজনক কথা বলে লোকজনকে ভড়কিয়ে দেয়। লোকজন ভয়ে সাহায্য-ভিক্ষা দিয়ে দেয়।

মা বলে- জঙ্গলও খালি নয়, ফকিরও খালি নয়। অর্থাৎ জঙ্গলে যেমন বাঘ-সিংহ থাকতে পারে তেমন এ সকল ফকিরের মধ্যে অনেক আসল ফকির, সাধু থাকতে পারে। তাদের সাথে কোনো খারাপ আচরণ করা যাবে না। করলে তাদের ‘ডাক’ লেগে জীবন ছারখার হয়ে যাবে। আমি ফকিরদের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকি। তাঁদের কেরামতিতে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস না করলে বিপদ হতে পারে। যেমন এক লোক বেয়দবি করেছিল এক পির সাহেবের সাথে। লোকটি ছিল খুব অহংকারী। তাঁকে মানা করা হয়েছিল জুতা না নিয়ে মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে। তখন লোকটা না কি বলেছিল- আগে বললে তো পাটা-ই বাসায় রেখে আসতাম। লোকটি তার দুটি পা নিয়ে আর বাসায় ফিরতে পারেননি। মাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বেবিটেক্সি দুর্ঘটনায় লোকটি একটি পা হারান। এ ঘটনাটি আমি অনেকবার শুনি অনেকের কাছে। পির ফকিরদের ব্যাপারে আমি অনেক সাবধান থাকি।

অনেক কসরত করে তাদের কাছ থেকে যা জানা গেল তা হলো কোনো এক গ্রামের জামবাগানে এক ফকির থাকত। জামবাগানে থাকতো বলে তাঁর নাম জাম ফকির। তো সেই জাম ফকির একবার পাকিস্তানী সৈন্যদের সামনে পড়ে যান। পাকিস্তানী সৈন্যরা তো আর জাম ফকিরকে চেনে না। অর্ধ উলঙ্গ ফকিরকে নিয়ে তার ঠাট্টা তামাশা করতে শুরু করে। তারা ফকিরকে কলমা জিঙ্গেস করে, ফকির কলমা বলতে পারে না। বিড়বিড় করে কী যেনো একটা কিছু বলে যাচ্ছে। বার বার জিঙ্গেস করেও তার নাম ধাম ঠিকানা উদ্ধার করতে পারেনি সৈন্যরা। ফকির শুধু বিড়বিড় করে যাচ্ছে। এতে বিরক্ত হয়ে সৈন্যদের নেতাটি তার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে ফকিরের গায়ে জোরে বারি মারে। কিন্তু বারিটা ফকিরের গায়ে না লেগে বাতাসে শুধু মাত্র একটা শিস্ কাটতে সক্ষম হয়। ফকির ততক্ষণে গায়েব। রক্তবমি করতে করতে সৈন্যদলের নেতাটি সেখানেই মারা পড়ে। সেদিন থেকেই সকল জাম পাতায় রক্তাক্ত দাগ দেখা দিতে শুরু করে। কচু ফকিরের গায়েও এরা হাত তুলেছে। এজন্য কচু পাতার গায়েও নাকি লাল মোটা দাগ দেখা দিয়েছে। আমরা কয়েকটি কচু গাছের পাতা উল্টিয়ে মোটা মোটা রক্তাক্ত দাগ আবিষ্কার করি।

দেশ স্বাধীন হতে আর বেশি দেরি নয়। কারণ ফকিরের গায়ে এরা হাত তুলেছে। আমাদের একজন বলল। তার কথায় আমরা সাঁই দেই। আমাদের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে জাম ফকিরের বদ দোয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা কামনা করতে থাকি এরা এ ধরনের আরও ভুল তারা করতে থাকুক, আমফকির, বটফকির, গাবফকির, ন্যাংটা ফকিরকে এরা মারুক। এ সকল ফকিরের বদ দোয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী তাহলে তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে।

দেশ স্বাধীন হবে কি হবে না এ নিয়ে আরও নানা ধরনের পরীক্ষা আমাদের মাঝে চলতে থাকে। সে পরীক্ষার কোনো কোনোটা আমাদের কাছে অলৌকিক বলে মনে হতে থাকে। সে পরীক্ষাসমূহের ফলাফল আমাদেরকে বলে দেয় দেশ স্বাধীন হবেই হবে। এর মধ্যে একটা হলো বদনা-পাটা পরীক্ষা। সে এক মজার পরীক্ষা। আমরা মসলা-মরিচ বাটার একটা পাটা নেই। পাটাটিকে মাঝ উঠানে রাখি, তার পর এর এর মাঝ বরাবর পুকুরের কিছু কাদামাটি রেখে দেই। এবার একটা পিতলের বদনা নেই। পিতলের বদনাটির নিচের খাঁজকাটা অংশটুকু সেই কাদার ভিতরে ঢুকিয়ে দেই। তারপর শুরু হয় আসল খেলা। বদনার কানা দুহাতে ধরে জয় বাংলা’ বলে বদনাটি উঁচু করে ধরি। অবাক কাণ্ড! পাটাটি বদনার সাথে উপরে উঠে আসে। পাটাটি যথেষ্ট ভারি। এটি কাদামাটির মাধ্যমে বদনার সাথে সংযুক্ত হয়ে উপরে উঠে আসার কথা নয়। এতে নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু একটা আছে। আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই দেশ স্বাধীন হবে।

আমরা নিশ্চিত হলে কি হবে আমাদের বড়রা তো এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না। জামফকিরের ঘটনাটিকে তারা পাত্তাই দচ্ছে না। তারা মনে করে এটা জাম গাছের পাতার একটা রোগ এবং প্রায় বছরেই পাতার গায়ে এ ধররে দাগ পড়ে। সুতারাং এতে কোনো বুজুরকির কিছু নেই। তাদের কথায় আমরা হতাশ হই। বদনা পাটার পরীক্ষার বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই। তারা বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না আবার নিচ্ছেও। মাঝে মাঝে তারাও ব্যাপারটিকে বিশ্বাস করতেই চাচ্ছে বলেই মনে হয়। সংসার সায়রে আশাই একমাত্র ভেলা কি না।

১১. একটি হত্যাকা-

মৃত মানুষ দেখেছি কিন্তু মারা হয়েছে এমন কোনো মানুষ তখন পর্যন্ত দেখিনি। সময়টা তখন বোধ হয় মে জুন মাস হবে। কোনো এক সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শুনি বড়রা ফিসফিস করে কথা বলছে। কী হয়েছে? মাঝে মাঝেই বড়রা ফিসফিস করে কথা বলে। কী বলছে জিজ্ঞেস করলে ধমক মারে না হয় কথার উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আমাদের মন খারাপ হয়। মনে মনে বলি আমরাও একদিন ফিস ফিস করে কথা বলব। তখন দেখি আমাদেরকে কে কী জিজ্ঞেস করতে আসে।

সেদিন বড়রা আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিল। আব্বা মিয়াকে মেরে ফেলেছে মুক্তিরা। খবরটা বলার সময় তাদের কণ্ঠে এক ধরনের চাপা আনন্দ বিরাজ করে। তারা আব্বা মিয়াকে দেখে এসেছে। আব্বা মিয়ার সাথে আরও এক জনকে মেরে ফেলা হয়েছে। দুজনকে মেরে কুলারবন্দের খালে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। সে লাশ আনা হয়েছে গ্রামে।

আব্বা মিয়া লোকটা এ গ্রামের কেউ নয়। সে বিয়ে করেছিল এগ্রামে। সে নিজে একটা চোর কিংবা ডাকাত জাতীয় লোক। লোকটাকে আমি দেখেছি। অনেক লম্বা আর ডিংডিংয়ে একটা লোক। বেশ শৌখিন আর জামাকাপড়ে ফিটফাট। সে যে একটা ডাকাত কিংবা চোর দেখলে তা মনে হতো না। বাড়ি অন্য কোনো থানায় হবে। যে পাড়ায় বিয়ে করেছিল লাশ এনে তাদের বাড়িতেই রাখা হয়েছে। আমরা দৌড়ে গেলাম সেখানে। উঠানে চিৎ হয়ে পড়ে আছে আব্বা মিয়া। খালি গা, পরনে লুঙ্গি। গুলিটা কোথায় লেগেছিল আমার মনে নেই। তবে লোকটার মুখ আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না। তার সারামুখে চষা খেতের মাটি মাখানো। দাঁতে আর মুখে মাটি লেগে আছে। মরণের সময় মনে হয় সে মাটি কামড়ে ধরেছিল। তার দুহাতে মাঠি আর ঘাস লেগে আছে। খুব যন্ত্রণা পেয়ে কি লোকটা মারা গিয়েছে? মৃত্যুর সময় লোকটা কি কাউকে কাছে পেতে চেয়েছিল? কাউকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল? আমার ভিতরে লোকটির জন্য এক ধরনের মায়া জেগে ওঠে। হোক না খারাপ লোক, চুরি ডাকাতি করে। তাকে এভাবে মেরে ফেলতে হবে? আমার কিশোর মন যুদ্ধ আর মারামারির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায় না। মুক্তিরাই তাকে মেরেছে। আরো কয়েকজনকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা আছে তাদের বলে বড়রা বলাবলি করছে। কারণ এরা চুরি-ডাকাতি করে। এখন সুযোগ পাওয়া গিয়েছে, সুতারাং সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। বছর খানেক আগে গ্রামের বেশ কিছু বাড়িঘর ছাত্র জনতা পুড়িয়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এরা চোর। সালটা বোধ হয় ঊনসত্তর কিংবা সত্তর। তখন দেশটা চলে গিয়েছে ছাত্র জনতার হাতে। প্রতিদিনই তখন মিটিং আর মিছিল চলছে। আর সে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছে গোকর্ণ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে আমাদের গ্রামের আর পাশের গ্রামে পড়ুয়া ছাত্ররা। ছাত্রদের মাঝে কেউ কেউ তখন বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ত মনে হয়। এটা কি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্ব? আমার তাই মনে হয়। আব্বা মিয়ার মৃত্যু আমাকে বিচলিত করে। এই প্রথম আমাদের দিকে মনে হয় একটা হত্যাকা- সংঘটিত হয়। আরো কি হত্যাকা- হবে? হতে পারে। যাদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছে তারা সহজ লোক নয়। পুরো এলাকার লোকজন তাদেরকে ভয় করে। এরা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পেলে সহজে ছেড়ে দেবে? গ্রামবাসীদের মনে এক ধরনের আশংকা কাজ করতে থাকে। তবে ভরসার কথা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। অদৃশ্য থেকে থেকে তাঁরা ছোট ছোট অপারেশন চালাচ্ছে। ক্রমশ...

back to top