alt

সাময়িকী

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

রামেন্দু মজুমদার

: বুধবার, ০৬ অক্টোবর ২০২১

“লেখার পাশাপাশি জাতীয় জীবনের সবিশেষ কত জরুরি কাজও সমুখে আমি দেখতে পাচ্ছি। দু’হাজার কুড়ি সালে বাংলার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, দু’হাজার একুশেতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী- শুধু স্বদেশেই নয়, এই দুটি উৎসবের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান গঠনেও আমার এ সামান্য হাত থাকবে, এমন আশা কি আমাকে ততদিনের আয়ু দেবে না? জীবন হ্রস্ব হলেও এতটা হ্রস্ব নিশ্চয় হবে না।

চোখ ফেলে আছি মহাত্মা লালনের দিকে, তিনি একশ’ আঠারো বছর আয়ু পেয়েছিলেন। আমি অপার হয়ে সেই দীর্ঘ জীবনের দিকে তাকিয়ে আছি। এখনো অপেক্ষায় কত কবিতা কত নাটক কত গল্প। করোটির ভেতরে শব্দের কী অবিরাম গুঞ্জন। কলমের গর্ভে এখনো তো আমার রক্ত অফুরান। দৃষ্টিভূমিতে এই দেশ ও এই মানুষেরই দীর্ঘ ছায়া লয়ে আমি আমার লেখার টেবিলে ॥”

সৈয়দ শামসুল হকের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণের শেষাংশে সব্যসাচী লেখক এ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। মরণব্যাধি তাঁর আশা পূর্ণ হতে দেয় নি। মহাত্মা লালনের দীর্ঘ জীবন তিনি পান নি।

তিনি জানতের তাঁর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু এত যে দ্রুত সেটা হয়ত ভাবেন নি। লন্ডনে ও ঢাকায় রোগশয্যায় তিনি হ্যামলেট-এর অনুবাদ ছাড়াও ১৬০টির মতো কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ৮টি গল্প। নাটক লেখা শুরু করেছিলেন। কখনো শুয়ে শুয়ে কাঁপা হাতে বা ল্যাপটপে, কখনো মুখে বলে গেছেন, আনোয়ারা ভাবি তা লিখে নিয়েছেন। আমি যখন তাঁর মৃত্যুর দিন দশেক আগে হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যাই, তিনি বলছিলেন, ৪টা নাটক লেখার পরিকল্পনা আছে তাঁর মাথায়। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ইংরেজিতে লিখবেন একটা নাটক- In Search of Bangabandhu। একসাথে তিনি অনেক কিছু করতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশে কাব্যনাট্যককে একটা শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন সৈয়দ হক। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় দিয়ে তার যাত্রা শুরু। তাঁর প্রয়াণের পর প্রথম গত ২৫শে অক্টোবর গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসবে যখন আমরা নাটকটি মঞ্চস্থ করি, দর্শকদের বিপুল সমাগম দেখে আমরা মুগ্ধ হই। আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর যত নাটক রচিত হয়েছে, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল। ২৫শে নভেম্বর ২০১৬ পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় অভিনয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষায় লেখা আর দারুণ সব উপমায় ভরা এ নাটক। গ্রামীণ জীবন থেকে বেছে নিয়েছেন এসব উপমা। যদিও আজকাল অনেকেই সে জীবনের সাথে পরিচিত নন। আমাদের বিশ্বাস সমকালকে অতিক্রম করে নাটকটি চিরকালীন হয়ে থাকবে বাংলা সাহিত্যে। এটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের নাটক নয়। ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি, কুসংস্কার থেকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে এ নাটকে। একই কথা বলা যায় তাঁর অপর কাব্যনাট্য নূরলদীনের সারা জীবন সম্পর্কেও। রংপুরের এক কৃষক বিদ্রোহের নেতার স্বল্পজ্ঞাত জীবনের উপর ভিত্তি করে তিনি রচনা করেছেন এ মানুষ-জাগানিয়া নাটক। বিশিষ্ট অভিনেতা, আজকের সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের কণ্ঠে যখন নাটকটির প্রস্তাবনা অংশের আবৃত্তি শুনি তখন রক্তে যেন নাচন লাগে। সৈয়দ হকের ঈর্ষা বা এখানে এখন কাব্যনাট্য দুটিও মানবিক সম্পর্কের কথা বলে। শেক্সপীয়রের জুলিয়াস সীজারকে অবলম্বন করে রচনা করেছেন গণনায়ক। প্রথম দু’অংকের পর তিনি স্বাধীনভাবে লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিয়োগান্ত পরিণতি নিয়ে। জুলিয়াস সীজারের সাথে তুলনা করেছেন বঙ্গবন্ধুর। দু’জনেই ষড়যন্ত্রের শিকার, দু’জনেই ট্রাজেডির নায়ক।

তাঁর ডকু-ড্রামা যুদ্ধ এবং যুদ্ধ গদ্যে রচিত। নাটকটি করে আমরা খুব তৃপ্তি পেয়েছি। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, তখন এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক শহীদ অধ্যাপকের স্ত্রী জীনাতের কণ্ঠে সাহসী উচ্চারণ দর্শক-শ্রোতার বিবেককে নাড়া দিতে পেরেছে:

“রাজাকারকে তোরা ক্ষমা করতে পারিস, আমি পারি না? রাজাকারকে তোরা মন্ত্রী করতে পারিস, আমি স্বামী করতে পারি না? একাত্তরের দালালকে স্বাধীনতার পদক দিতে পারিস, একাত্তরের দালালের গলায় আমি মালা দিতে পারি না? আমি করলেই অপরাধ? আর তোদের বেলায় সেটা উদারতা? ... ... এই আমার যুদ্ধ, আমার ব্যক্তিগত যুদ্ধ, আমার একার যুদ্ধ। তোরা যে ভুলে গেছিস, তোদের আবার সব মনে করিয়ে দেবার যুদ্ধ, তোরা শিউরে উঠবি, তোরা চমকে উঠবি, অপমানে তোরা জ্বলে উঠবি, তাই আমার যুদ্ধ। আমি যে মেয়ে, আমি যে মায়ের জাত, মায়ের মুখে কালি না পড়লে ছেলে কেঁদে উঠবে কেন?”

যখন সংলাপগুলো উচ্চারিত হতো, তখন দর্শক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে বক্তব্যকে সমর্থন জানাত।

দুটি শেক্সপীয়র অনুবাদের জন্যে সৈয়দ শামসুল হক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন- ম্যাকবেথ ও টেম্পেস্ট। চিরায়ত সাহিত্যের চিরায়ত অনুবাদ। শেক্সপীয়রের অন্য দু’জন দক্ষ অনুবাদক- মুনীর চৌধুরী ও উৎপল দত্ত। সৈয়দ হক তাঁর অনূদিত সংলাপে তৎসম শব্দ ব্যবহার করেছেন অনেক, কিন্তু সংলাপ উচ্চারণে তা আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। পরে অনুবাদ করেছেন ত্রয়লাস ও ক্রেসিদা। রোগশয্যায় শেষ করেছেন হ্যামলেট- যেটি শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনায় শিগ্গিরই মঞ্চে আসবে।

ভাষার উপর সৈয়দ হকের দখল ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁর একটি গ্রন্থ কথা সামান্যই তেমন একটা আলোচিত হয় নি আমাদের দুর্ভাগা দেশে। শব্দ বা বাক্যাংশ আমরা কতভাবে ব্যবহার করি, কত অর্থে, কখনো ভুলভাবে- সেসব কথা নিয়ে এ বই। আমাদের নিত্যচেনা ও নিত্যবলা কিছু শব্দ নিয়ে লতায় পাতায় নানা কথা বলা হালকা চালে। একদিকে যেমন শিক্ষণীয়, অন্যদিকে উপভোগ্য লেখাগুলো। মার্জিনে মন্তব্য তেমনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। তিনটি আলাদা আলাদা কলাম- মার্জিনে মন্তব্য, গল্পের কলকব্জা ও কবিতার কিমিয়া নিয়ে এ বই। যাঁরা লেখালেখি করেন, তাঁদের নিত্যসঙ্গী হওয়া উচিত গ্রন্থটি। গল্পের কলকব্জায় তিনি বিখ্যাত লেখকদের গল্প ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন, গল্প লেখার একটা কারিগরি দিকও আছে। তাঁর মতে ‘মহৎ বক্তব্য মহৎ শিল্পে অনূদিত হয় শুধু কারিগরি দক্ষতা ও উদ্ভাবন বলে।’

২০০৭ সালের ২৪ আগস্ট লন্ডনে বসে সৈয়দ শামসুল হক ‘সমাধিফলক’ শীর্ষক একটি সমাধিলিপি রচনা করেছিলেন:

‘তেরোশত নদীর এ দেশ পলিসমৃদ্ধ নিশ্চয়।

পলি পড়ে। পালল-শিলায় লেখে গল্পটা সময়।

মানুষের সব গল্প? নাকি আছে তারও নির্বাচন?

হে মাতঃ বাংলার মাটি, করজোড়ে করে সম্ভাষণ

তোমার সন্তান কবি, পদচ্ছাপ রেখো মা শিলায়।

যদি রাখো, কী আছে জীবন যদি মাটিতে মিলায়!

আমিও তোমার স্তনে দুগ্ধ টেনে উঠেছি একদা

লোকে ভোলে ভুলে যাক, তুমি যেন ভুলো না সে কথা,

তোমারই সময়-কথা আমিও তো বলেছি ভাষায়-

তোমারই ভাষায়, মা গো। পুরস্কার সামান্য মাষায়

যদি কিছু পেয়ে থাকি তাকে গণ্য করেছি মোহর।

আমি তো মরণশীল, আমাদের তুমি যে অমর!

আশা করি আমারও কুড়ানো ফুল নিয়েছিলে তুমি,

দেখেছিলে শ্রম ঘাম এ কবির, মা গো, মাতৃভূমি ॥’

লেখাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র সমাধিলিপির সেই অমর পংক্তিগুলো ‘দাঁড়াও, পথিক-বর জন্ম যদি তব বঙ্গে...।’ কবি তাঁর সমাধিস্থলকে তুলনা করেছিলেন জননীর কোলের সাথে। সৈয়দ হকও বাংলার মাটিকে মাতৃ সম্বোধন করে প্রার্থনা করেছেন ‘তোমার সন্তান কবি, পদচ্ছাপ রেখো মা শিলায়।’

তাঁর সমাধিস্থল নির্ধারণের প্রশ্ন উঠলে অনেকে চেয়েছিলেন, তাঁকে ঢাকায় সমাহিত করা হোক্- যাতে তাঁকে সহজেই শ্রদ্ধা জনানো যায়। কিন্তু আনোয়ারা ভাবি ও দ্বিতীয় এ ব্যাপারে অনড় ছিলেন যে, কুড়িগ্রামেই সৈয়দ হকের পছন্দ করা জায়গায় তাঁর শেষ শয্যা রচিত হবে। সিদ্ধান্তটি ছিল পুরোপুরি ঠিক। কবি শামসুর রাহমান শুয়ে আছেন বনানীতে। আমরা কতজন তাঁর সমাধি দেখতে যাই?

সৈয়দ শামসুল হক জন্মেছিলেন কুড়িগ্রামে। তাঁর জন্ম অঞ্চলকে ঘিরে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক কল্পিত স্থান- জলেশ্বরী। তাঁর গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটকে ফিরে ফিরে এসেছে জলেশ্বরী। ব্যবহার করেছেন বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ভাষা। মাতৃভূমির প্রতি প্রচ- ভালবাসা থেকেই সৈয়দ হক চেয়েছিলেন, যে ভূমিতে তাঁর জন্ম, সেখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন। এর চেয়ে আর কোনো উত্তম সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ হকের গুণী জীবনসঙ্গী ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের কথা যদি উল্লেখ না করি, তবে আমার এ লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। আনোয়ারা ভাবি নিজেও কৃতি গল্পকার, ঔপন্যাসিক। হক সাহেবের ক্ষয় রোগের সময় তাঁর সাথে পরিচয়, ক্যানসারে বিচ্ছেদ। ভাবি যেভাবে ছায়াসঙ্গীর মতো সর্বক্ষণ তাঁর পাশে পাশে থেকেছেন, অসুস্থ থাকাকালীন দিনরাত সেবা করেছেন, তার দৃষ্টান্ত বিরল। শেষ মুহূর্তেও দেখেছি কীভাবে তিনি স্বামীর কষ্ট লাঘবের প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমাদের অনেক কৃতজ্ঞতা আনোয়ারা ভাবির প্রতি।

সৈয়দ শামসুল হক, আমাদের প্রিয় মানুষ, চলে যাবার পর আমরা অনুভব করছি, আমাদের ব্যক্তি জীবনে, জাতীয় জীবনে কতটা জায়গা জুড়ে ছিলেন তিনি। তিনি যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন- এই প্রার্থনা করি।

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

রামেন্দু মজুমদার

বুধবার, ০৬ অক্টোবর ২০২১

“লেখার পাশাপাশি জাতীয় জীবনের সবিশেষ কত জরুরি কাজও সমুখে আমি দেখতে পাচ্ছি। দু’হাজার কুড়ি সালে বাংলার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, দু’হাজার একুশেতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী- শুধু স্বদেশেই নয়, এই দুটি উৎসবের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান গঠনেও আমার এ সামান্য হাত থাকবে, এমন আশা কি আমাকে ততদিনের আয়ু দেবে না? জীবন হ্রস্ব হলেও এতটা হ্রস্ব নিশ্চয় হবে না।

চোখ ফেলে আছি মহাত্মা লালনের দিকে, তিনি একশ’ আঠারো বছর আয়ু পেয়েছিলেন। আমি অপার হয়ে সেই দীর্ঘ জীবনের দিকে তাকিয়ে আছি। এখনো অপেক্ষায় কত কবিতা কত নাটক কত গল্প। করোটির ভেতরে শব্দের কী অবিরাম গুঞ্জন। কলমের গর্ভে এখনো তো আমার রক্ত অফুরান। দৃষ্টিভূমিতে এই দেশ ও এই মানুষেরই দীর্ঘ ছায়া লয়ে আমি আমার লেখার টেবিলে ॥”

সৈয়দ শামসুল হকের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণের শেষাংশে সব্যসাচী লেখক এ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। মরণব্যাধি তাঁর আশা পূর্ণ হতে দেয় নি। মহাত্মা লালনের দীর্ঘ জীবন তিনি পান নি।

তিনি জানতের তাঁর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু এত যে দ্রুত সেটা হয়ত ভাবেন নি। লন্ডনে ও ঢাকায় রোগশয্যায় তিনি হ্যামলেট-এর অনুবাদ ছাড়াও ১৬০টির মতো কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ৮টি গল্প। নাটক লেখা শুরু করেছিলেন। কখনো শুয়ে শুয়ে কাঁপা হাতে বা ল্যাপটপে, কখনো মুখে বলে গেছেন, আনোয়ারা ভাবি তা লিখে নিয়েছেন। আমি যখন তাঁর মৃত্যুর দিন দশেক আগে হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যাই, তিনি বলছিলেন, ৪টা নাটক লেখার পরিকল্পনা আছে তাঁর মাথায়। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ইংরেজিতে লিখবেন একটা নাটক- In Search of Bangabandhu। একসাথে তিনি অনেক কিছু করতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশে কাব্যনাট্যককে একটা শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন সৈয়দ হক। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় দিয়ে তার যাত্রা শুরু। তাঁর প্রয়াণের পর প্রথম গত ২৫শে অক্টোবর গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসবে যখন আমরা নাটকটি মঞ্চস্থ করি, দর্শকদের বিপুল সমাগম দেখে আমরা মুগ্ধ হই। আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর যত নাটক রচিত হয়েছে, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল। ২৫শে নভেম্বর ২০১৬ পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় অভিনয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষায় লেখা আর দারুণ সব উপমায় ভরা এ নাটক। গ্রামীণ জীবন থেকে বেছে নিয়েছেন এসব উপমা। যদিও আজকাল অনেকেই সে জীবনের সাথে পরিচিত নন। আমাদের বিশ্বাস সমকালকে অতিক্রম করে নাটকটি চিরকালীন হয়ে থাকবে বাংলা সাহিত্যে। এটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের নাটক নয়। ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি, কুসংস্কার থেকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে এ নাটকে। একই কথা বলা যায় তাঁর অপর কাব্যনাট্য নূরলদীনের সারা জীবন সম্পর্কেও। রংপুরের এক কৃষক বিদ্রোহের নেতার স্বল্পজ্ঞাত জীবনের উপর ভিত্তি করে তিনি রচনা করেছেন এ মানুষ-জাগানিয়া নাটক। বিশিষ্ট অভিনেতা, আজকের সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের কণ্ঠে যখন নাটকটির প্রস্তাবনা অংশের আবৃত্তি শুনি তখন রক্তে যেন নাচন লাগে। সৈয়দ হকের ঈর্ষা বা এখানে এখন কাব্যনাট্য দুটিও মানবিক সম্পর্কের কথা বলে। শেক্সপীয়রের জুলিয়াস সীজারকে অবলম্বন করে রচনা করেছেন গণনায়ক। প্রথম দু’অংকের পর তিনি স্বাধীনভাবে লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিয়োগান্ত পরিণতি নিয়ে। জুলিয়াস সীজারের সাথে তুলনা করেছেন বঙ্গবন্ধুর। দু’জনেই ষড়যন্ত্রের শিকার, দু’জনেই ট্রাজেডির নায়ক।

তাঁর ডকু-ড্রামা যুদ্ধ এবং যুদ্ধ গদ্যে রচিত। নাটকটি করে আমরা খুব তৃপ্তি পেয়েছি। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, তখন এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক শহীদ অধ্যাপকের স্ত্রী জীনাতের কণ্ঠে সাহসী উচ্চারণ দর্শক-শ্রোতার বিবেককে নাড়া দিতে পেরেছে:

“রাজাকারকে তোরা ক্ষমা করতে পারিস, আমি পারি না? রাজাকারকে তোরা মন্ত্রী করতে পারিস, আমি স্বামী করতে পারি না? একাত্তরের দালালকে স্বাধীনতার পদক দিতে পারিস, একাত্তরের দালালের গলায় আমি মালা দিতে পারি না? আমি করলেই অপরাধ? আর তোদের বেলায় সেটা উদারতা? ... ... এই আমার যুদ্ধ, আমার ব্যক্তিগত যুদ্ধ, আমার একার যুদ্ধ। তোরা যে ভুলে গেছিস, তোদের আবার সব মনে করিয়ে দেবার যুদ্ধ, তোরা শিউরে উঠবি, তোরা চমকে উঠবি, অপমানে তোরা জ্বলে উঠবি, তাই আমার যুদ্ধ। আমি যে মেয়ে, আমি যে মায়ের জাত, মায়ের মুখে কালি না পড়লে ছেলে কেঁদে উঠবে কেন?”

যখন সংলাপগুলো উচ্চারিত হতো, তখন দর্শক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে বক্তব্যকে সমর্থন জানাত।

দুটি শেক্সপীয়র অনুবাদের জন্যে সৈয়দ শামসুল হক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন- ম্যাকবেথ ও টেম্পেস্ট। চিরায়ত সাহিত্যের চিরায়ত অনুবাদ। শেক্সপীয়রের অন্য দু’জন দক্ষ অনুবাদক- মুনীর চৌধুরী ও উৎপল দত্ত। সৈয়দ হক তাঁর অনূদিত সংলাপে তৎসম শব্দ ব্যবহার করেছেন অনেক, কিন্তু সংলাপ উচ্চারণে তা আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। পরে অনুবাদ করেছেন ত্রয়লাস ও ক্রেসিদা। রোগশয্যায় শেষ করেছেন হ্যামলেট- যেটি শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনায় শিগ্গিরই মঞ্চে আসবে।

ভাষার উপর সৈয়দ হকের দখল ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁর একটি গ্রন্থ কথা সামান্যই তেমন একটা আলোচিত হয় নি আমাদের দুর্ভাগা দেশে। শব্দ বা বাক্যাংশ আমরা কতভাবে ব্যবহার করি, কত অর্থে, কখনো ভুলভাবে- সেসব কথা নিয়ে এ বই। আমাদের নিত্যচেনা ও নিত্যবলা কিছু শব্দ নিয়ে লতায় পাতায় নানা কথা বলা হালকা চালে। একদিকে যেমন শিক্ষণীয়, অন্যদিকে উপভোগ্য লেখাগুলো। মার্জিনে মন্তব্য তেমনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। তিনটি আলাদা আলাদা কলাম- মার্জিনে মন্তব্য, গল্পের কলকব্জা ও কবিতার কিমিয়া নিয়ে এ বই। যাঁরা লেখালেখি করেন, তাঁদের নিত্যসঙ্গী হওয়া উচিত গ্রন্থটি। গল্পের কলকব্জায় তিনি বিখ্যাত লেখকদের গল্প ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন, গল্প লেখার একটা কারিগরি দিকও আছে। তাঁর মতে ‘মহৎ বক্তব্য মহৎ শিল্পে অনূদিত হয় শুধু কারিগরি দক্ষতা ও উদ্ভাবন বলে।’

২০০৭ সালের ২৪ আগস্ট লন্ডনে বসে সৈয়দ শামসুল হক ‘সমাধিফলক’ শীর্ষক একটি সমাধিলিপি রচনা করেছিলেন:

‘তেরোশত নদীর এ দেশ পলিসমৃদ্ধ নিশ্চয়।

পলি পড়ে। পালল-শিলায় লেখে গল্পটা সময়।

মানুষের সব গল্প? নাকি আছে তারও নির্বাচন?

হে মাতঃ বাংলার মাটি, করজোড়ে করে সম্ভাষণ

তোমার সন্তান কবি, পদচ্ছাপ রেখো মা শিলায়।

যদি রাখো, কী আছে জীবন যদি মাটিতে মিলায়!

আমিও তোমার স্তনে দুগ্ধ টেনে উঠেছি একদা

লোকে ভোলে ভুলে যাক, তুমি যেন ভুলো না সে কথা,

তোমারই সময়-কথা আমিও তো বলেছি ভাষায়-

তোমারই ভাষায়, মা গো। পুরস্কার সামান্য মাষায়

যদি কিছু পেয়ে থাকি তাকে গণ্য করেছি মোহর।

আমি তো মরণশীল, আমাদের তুমি যে অমর!

আশা করি আমারও কুড়ানো ফুল নিয়েছিলে তুমি,

দেখেছিলে শ্রম ঘাম এ কবির, মা গো, মাতৃভূমি ॥’

লেখাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র সমাধিলিপির সেই অমর পংক্তিগুলো ‘দাঁড়াও, পথিক-বর জন্ম যদি তব বঙ্গে...।’ কবি তাঁর সমাধিস্থলকে তুলনা করেছিলেন জননীর কোলের সাথে। সৈয়দ হকও বাংলার মাটিকে মাতৃ সম্বোধন করে প্রার্থনা করেছেন ‘তোমার সন্তান কবি, পদচ্ছাপ রেখো মা শিলায়।’

তাঁর সমাধিস্থল নির্ধারণের প্রশ্ন উঠলে অনেকে চেয়েছিলেন, তাঁকে ঢাকায় সমাহিত করা হোক্- যাতে তাঁকে সহজেই শ্রদ্ধা জনানো যায়। কিন্তু আনোয়ারা ভাবি ও দ্বিতীয় এ ব্যাপারে অনড় ছিলেন যে, কুড়িগ্রামেই সৈয়দ হকের পছন্দ করা জায়গায় তাঁর শেষ শয্যা রচিত হবে। সিদ্ধান্তটি ছিল পুরোপুরি ঠিক। কবি শামসুর রাহমান শুয়ে আছেন বনানীতে। আমরা কতজন তাঁর সমাধি দেখতে যাই?

সৈয়দ শামসুল হক জন্মেছিলেন কুড়িগ্রামে। তাঁর জন্ম অঞ্চলকে ঘিরে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক কল্পিত স্থান- জলেশ্বরী। তাঁর গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটকে ফিরে ফিরে এসেছে জলেশ্বরী। ব্যবহার করেছেন বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ভাষা। মাতৃভূমির প্রতি প্রচ- ভালবাসা থেকেই সৈয়দ হক চেয়েছিলেন, যে ভূমিতে তাঁর জন্ম, সেখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন। এর চেয়ে আর কোনো উত্তম সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ হকের গুণী জীবনসঙ্গী ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের কথা যদি উল্লেখ না করি, তবে আমার এ লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। আনোয়ারা ভাবি নিজেও কৃতি গল্পকার, ঔপন্যাসিক। হক সাহেবের ক্ষয় রোগের সময় তাঁর সাথে পরিচয়, ক্যানসারে বিচ্ছেদ। ভাবি যেভাবে ছায়াসঙ্গীর মতো সর্বক্ষণ তাঁর পাশে পাশে থেকেছেন, অসুস্থ থাকাকালীন দিনরাত সেবা করেছেন, তার দৃষ্টান্ত বিরল। শেষ মুহূর্তেও দেখেছি কীভাবে তিনি স্বামীর কষ্ট লাঘবের প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমাদের অনেক কৃতজ্ঞতা আনোয়ারা ভাবির প্রতি।

সৈয়দ শামসুল হক, আমাদের প্রিয় মানুষ, চলে যাবার পর আমরা অনুভব করছি, আমাদের ব্যক্তি জীবনে, জাতীয় জীবনে কতটা জায়গা জুড়ে ছিলেন তিনি। তিনি যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন- এই প্রার্থনা করি।

back to top