alt

উপ-সম্পাদকীয়

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

মোহাম্মদ আবু নোমান

: বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

ইভ্যালি কি এক দিনে তৈরি হয়েছে? মন্ত্রী থেকে আমলা, সেলিব্রিটি থেকে খেলাধুলা, টিভি চ্যানেল থেকে পত্রিকার পাতা, কারা ছিল না সঙ্গে? দুই দিন আগেও বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পন্সর ছিল ইভ্যালি। আমাদের ক্রিকেটাররা ইভ্যালি লেখা জার্সি গায়ে জড়িয়ে যখন মাঠে নামেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে কী বার্তা যায়? অথচ ইভ্যালি ছিলো শুভঙ্করের ফাঁকি। অসম্ভবকে পাওয়ার দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ। নতুন গ্রাহকদের ওপর দায় চাপিয়ে পুরাতন গ্রাহকদের আংশিক অর্থ ফেরত অথবা পণ্য ফেরত দিতেন অনলাইনে পণ্য সরবরাহকারী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। দায় ট্রান্সফারের দুরভিসন্ধিমূলক অপকৌশল চালিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রতারণার অভিযোগে এক গ্রাহকের করা মামলায় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার তো করা হলো তাদের, এখন প্রতারিত হাজার হাজার বিনিয়োগকারী তাদের টাকা কবে, কীভাবে ফেরত পাবেন? আদৌ পাবেন কী?

করোনা মহামারীতে অনেকেরই চাকরি চলে গেছে। রাইড শেয়ারিংয়ে চালানোর জন্য মোটরসাইকেল কিনতে অনেকেই ধার-দেনা করে টাকা দিয়েছিলেন ই-কমার্সে। পণ্য, টাকা কোনোটিই না পেয়ে পথে বসতে হয়েছে অনেককে। সংশ্লিষ্টদের চরম দায়িত্বহীনতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন দুমড়ে মুচড়ে নিঃশেষ হয়ে গেলো। তাতে হয়তো সরকার বা প্রশাসনের কিছুই আসবে যাবে না। নানা ভঙ্গিতে বিজ্ঞাপনের অফারে ভাগ্যাহত মানুষ ‘স্বর্ণ’ ভেবে হাত দিয়ে জীবনের সব সম্বল দিয়ে পুঁজি খাঁটিয়ে এখন সব ‘ছাই’ হয়ে গেলো! গত একযুগ ধরে কতবার কতভাবে জনগণের টাকা লোপাট হলো? আহারে! ভাবতেও অবাক লাগে! কেন আমার সমাজ, আমার দেশটি দিন দিন এমন হয়ে যাচ্ছে? এত কষ্ট করে দেশটিকে হানাদার পাকিস্তানি থেকে মুক্ত করে, ফের কেন বারবার ধোঁকা ও অন্যায়ের শিকলে বাঁধা পড়ছি আমরা? এত কেলেঙ্কারি কী সরকারের অগোচরেই হয়ে গেল? এটাই আমরা বিশ্বাস করব? প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তো আমরা দেখি প্রতারণা চূড়ান্ত হলে, জনগণ নিঃস্ব হলে, গ্রেপ্তারের ‘মহা-দক্ষতা’ দৃশ্যমান ...! দিনশেষে গ্রাহকরা শুধু এভাবে ধরা খেতেই থাকবে! সমস্যাটা কিসে বা কোথায়?

প্রতারকরা কেউই কিন্তু লুকিয়ে কিছুই করেনি। অতীতে বড় বড় আর্থিক কোন কেলেঙ্কারিই লুকিয়ে হয়নি। আজকের ইভ্যালি রীতিমতো জাতীয় ক্রিকেট দলের এক্সক্লুসিভ স্পন্সর হয়ে মার্কেটিং করে গেছে। তাহলে বলতেই হবে ইভ্যালিকে টাকার বিনিময়ে প্রমোট করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এবং নাটকের প্রযোজকরা।

বাংলাদেশের কতিপয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুই করে ভেজাল, দুই নম্বরি ও ধান্দাবাজির বাসনা নিয়ে। অনেকেই কয়েক মাস বা বছরের মধ্যে ধান্দাবাজি, দুই নাম্বারি করে কোটিপতি হতে চায়। বিপরীতে সাধারণ জনগণও কেনো লোভ সামলাতে পারে না? ১০ টাকায় ২০ টাকা পাবো বলে লগ্নি করছি! সোজা কথায় জুয়া খেলছি! ইভ্যালির বিভিন্ন লোভনীয় অফারগুলো ছিল-সাইক্লোন অফার (বাজার মূল্যের অর্ধেক মূল্যে পণ্য বিক্রয়); ক্যাশব্যাক অফার (মূল্যের ৫০-১৫০% ক্যাশব্যাক অফার); আর্দ্রকুয়েক অফার, প্রায়োরিটি স্টোর, ক্যাশ অন ডেলিভারি। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবেও ছিল জমজমাট অফার, যেমন- বৈশাখী, ঈদ অফার ইত্যাদি। পরিণতিতে ইভ্যালির সাইক্লোন আফারের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা বাতাসে উড়ে গেল!

লোভনীয় নানা রকম ডিসকাউন্ট কিংবা ক্যাশব্যাকের অফার দিয়ে দ্রুত ক্রেতা টেনেছে ইভ্যালি। লোভে পড়ে ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন তাদের পণ্য কেনার অর্ডার দিতে। আর এ সুযোগটিই নিয়েছেন চতুর রাসেল। শুরুতে একটি দুটি অর্ডার দ্রুত ডেলিভারি দিয়ে ক্রেতার আস্থা অর্জন করেন, কিন্তু পরবর্তীতে শুরু হয় প্রতারণা। লোভে পড়ে একেকজন গ্রাহক কেউ ২০ হাজার, ৫০ হাজার, এক লাখ, পাঁচ লাখ কিংবা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নেয়া হতো ক্রেতা দেয়ার জন্য সেসব মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানেরও টাকা শোধ করেননি রাসেল। এভাবে এক রকম ‘মাছের তেলে মাছ ভেজে’ শত শত কোটি টাকা লুটেছে ইভ্যালি।

প্রতারণা ব্যবসা এদেশে বড় জাঁকজমক হয়ে থাকে রাজনৈতিক নেতাদের দেকভাল ও সেলিব্রেটদের কারণে। ডেসটিনি, যুবক, নিউওয়ে, এহসান গ্রুপ, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জকে অনেক আগেই থামিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। আইনের তোয়াক্কা না করে অথবা ম্যানেজ করে ওরা নিজের আখের গুছিয়েছে। এখন লাখ লাখ মানুষ তাদের কষ্টের টাকা কিভাবে ফেরত পাবেন? এ দায় কি শুধুই রাসেলের? যেসব সেলিব্রেটিরা বিশাল অর্থের বিনিময়ে ইভ্যালি, এহেসান গ্রুপ, আর ই-অরেঞ্জের মতো বাটপারি ই-কমার্স ব্যবসার অ্যাম্বাসেডর হয়ে তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে কন্ট্রিবিউট করেছেন তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। কারণ তারা এই নষ্ট সিস্টেমের অন্যতম সহযোগী। তারা তাদের নিজস্ব জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে এসব ব্যবসার মার্কেট সৃষ্টিতে কাজ করেছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিঃসন্দেহে প্রতারণা। ভবিষ্যতে কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে সেলিব্রিটিরা দশবার ভাবতে হবে।

ই-কমার্সগুলো এই দেশে লুকিয়ে লুকিয়ে বিজনেস করেনি। তারা ঢাক ঢোল পিটিয়ে সব মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেদের প্রচার করেছে। ক্রিকেট দলের স্পন্সর হয়েছে। ঢাকার প্রত্যেকটা পুলিশ বুথ ইভ্যালির বিজ্ঞাপনে ঢেকে গিয়েছিল। সরকারের মন্ত্রী এমপিরা বিভিন্ন সময় তাদের পক্ষে কথা বলেছে। দোষ কি শুধু সাধারণ মানুষের? সাধারণ গ্রাহক সরকারের নিবন্ধিত ই-কমার্স থেকে পণ্য ক্রয় করেছে। এক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতা ভুক্তভোগী হলে সরকারও এই দায় এড়াতে পারে না। এদের মনিটরিং করার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। গত বছর ইভ্যালির ব্যাংক একাউন্ট এক মাসের জন্য জব্দ করে দেয়া হলো। সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একমাস পর আবার অ্যাকাউন্ট ওপেন করে দিল। এতে প্রমাণিত হয় ইভ্যালির মধ্যে কোন সমস্যা নেই। এর মাধ্যমে আল্টিমেটলি সরকার ইভ্যালিকে গ্রিন সার্টিফিকেট দিয়ে দিল। আলেশা মার্ট নামে আরেক ই-কমার্সের উদ্বোধন করলেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর এ ছবি আলেশা মার্ট ফলাও করে প্রচার করেছে। মানুষের থেকে টাকা কালেকশন করেছে। তারাও এখন ডেলিভারি দিতে পারছে না। এখানে কি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দায় নেই? সাধারণ মানুষের কি সাধ্য আছে এত বড় কোম্পানির ভেতরে ঢুকে খোঁজখবর নেয়ার?

‘ডাবল ভাউচার’ অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেয় ই-অরেঞ্জ। অফারের ভাষ্য ছিল, কেউ এক লাখ টাকা জমা দিলে দুই লাখ টাকার ভাউচার পাবেন। ওই ভাউচার দিয়ে আমানতকারী প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্য কিনতে পারবেন। কিন্তু দ্বিগুণ অর্থের পণ্য কেনা তো দূরের কথা বরং মূল অর্থেই গ্রাহকরা পণ্য বুঝে পাচ্ছেন না। বর্তমানে পৃথিবীটিতে অনলাইন শপিং একটি দারুণ কম্পিটিশন মার্কেট। কোন কোম্পানি কত দ্রুত প্রোডাক্ট ডেলিভারি ও সেবা দিবে এ প্রতিযোগিতা। বিশ্বে অনলাইন ব্যবসায়ীরা সততা, আস্থা, স্বচ্ছতা ও দ্রুত হস্তান্তরের কম্পিটিশন করে। আর আমরা আছি চুরি আর ফাঁদের কম্পিটিশন নিয়ে! আমরা বলতে চাই, ই-অরেঞ্জ ও ইভ্যালিকে কোন মান ও দিক দিয়ে ই-কমার্স বলে মনে করা যায় কী? বিশ্বে এমন কোনো ই-কমার্স কোম্পানি আছে যারা ২ মাস, ৬ মাসে পণ্য ডেলিভারি দেয়? আবার কোন কেন ক্ষেত্রে বছর ফুরিয়ে গেলেও পণ্য ডেলিভারি দিতে অপারগ। তাছাড়া এমন কোথাও আছে কী, যারা নতুনদের টাকায় পুরোনোদের পণ্য দেয়? আমরা আশা করছি গ্রাহকদের স্বার্থে দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্ব-প্রণোদিত হয়ে ডেসটিনি, যুবক, নিউওয়ে, এহসান গ্রুপ, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ ধান্ধা ও ধোঁকাবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। এই মুহূর্তে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ খোয়ানো সাধারণ গ্রাহকদের বাঁচানোর একমাত্র অক্সিজেন হলো হাইকোর্ট। গ্রেপ্তার কোন সমাধান নয়, গ্রাহক কীভাবে তার লগ্নিকৃত টাকা ফেরত পাবে সরকার ও হাইকোর্টকে সে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ফল উৎপাদনে সাফল্য

সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা

আত্মকর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা অর্জনে সমবায়

নীরবতার সংস্কৃতি ও মানব মুক্তির দর্শন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দিবস

আর নয় শিশুশ্রম

স্বাধীনতার প্রথম গণনাট্য ‘এক নদী রক্ত’ ও শেখ কামাল

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল নিয়ে প্রশ্ন

সেই শব্দের একটা সীমিত মাত্রা থাকে

মঙ্গার স্থায়ী নির্বাসন

তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা

ভূলণ্ঠিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

ভোঁতা অনুভূতি চাই

সম্প্রীতির মায়াকান্না

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের প্রতিক্রিয়া

ছবি

প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দ্রব্যমূল্যের প্রভাব

সাইবার অপরাধ

ছবি

জহুরুল ইসলাম : আপন মহিমায় ভাস্বর

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

ছবি

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন

রাজধানী লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ির অত্যাচার থেকে মুক্ত হবে কবে?

ছবি

শিশুর জন্য নিরাপদ হয়ে উঠুক পৃথিবী

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

‘ঘটনাচক্রে শিক্ষক’ কেন তৈরি হচ্ছে

ছবি

নয়ন সমুখে তুমি নেই

ছবি

স্মরণ:কিংবদন্তি সাধক ফকির লালন শাহ

বজ্রপাতে মৃত্যু ও বিলুপ্ত তালগাছ

হায় হায় কোম্পানির ফাঁদ

ধর্মনিরপেক্ষতা, বামফ্রন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার

ছবি

যিনি আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের রূপ, রস, বর্ণ ও গন্ধ চিনিয়েছেন

বেশি মজুরি তত্ত্বে অর্থনীতির নোবেল

‘বেতন আলোচনা সাপেক্ষ’

বর্গী সেনাপতি ভাস্কর পন্ডিতের অসমাপ্ত দুর্গাপূজা

ছবি

এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব

tab

উপ-সম্পাদকীয়

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

মোহাম্মদ আবু নোমান

বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

ইভ্যালি কি এক দিনে তৈরি হয়েছে? মন্ত্রী থেকে আমলা, সেলিব্রিটি থেকে খেলাধুলা, টিভি চ্যানেল থেকে পত্রিকার পাতা, কারা ছিল না সঙ্গে? দুই দিন আগেও বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পন্সর ছিল ইভ্যালি। আমাদের ক্রিকেটাররা ইভ্যালি লেখা জার্সি গায়ে জড়িয়ে যখন মাঠে নামেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে কী বার্তা যায়? অথচ ইভ্যালি ছিলো শুভঙ্করের ফাঁকি। অসম্ভবকে পাওয়ার দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ। নতুন গ্রাহকদের ওপর দায় চাপিয়ে পুরাতন গ্রাহকদের আংশিক অর্থ ফেরত অথবা পণ্য ফেরত দিতেন অনলাইনে পণ্য সরবরাহকারী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। দায় ট্রান্সফারের দুরভিসন্ধিমূলক অপকৌশল চালিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রতারণার অভিযোগে এক গ্রাহকের করা মামলায় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার তো করা হলো তাদের, এখন প্রতারিত হাজার হাজার বিনিয়োগকারী তাদের টাকা কবে, কীভাবে ফেরত পাবেন? আদৌ পাবেন কী?

করোনা মহামারীতে অনেকেরই চাকরি চলে গেছে। রাইড শেয়ারিংয়ে চালানোর জন্য মোটরসাইকেল কিনতে অনেকেই ধার-দেনা করে টাকা দিয়েছিলেন ই-কমার্সে। পণ্য, টাকা কোনোটিই না পেয়ে পথে বসতে হয়েছে অনেককে। সংশ্লিষ্টদের চরম দায়িত্বহীনতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন দুমড়ে মুচড়ে নিঃশেষ হয়ে গেলো। তাতে হয়তো সরকার বা প্রশাসনের কিছুই আসবে যাবে না। নানা ভঙ্গিতে বিজ্ঞাপনের অফারে ভাগ্যাহত মানুষ ‘স্বর্ণ’ ভেবে হাত দিয়ে জীবনের সব সম্বল দিয়ে পুঁজি খাঁটিয়ে এখন সব ‘ছাই’ হয়ে গেলো! গত একযুগ ধরে কতবার কতভাবে জনগণের টাকা লোপাট হলো? আহারে! ভাবতেও অবাক লাগে! কেন আমার সমাজ, আমার দেশটি দিন দিন এমন হয়ে যাচ্ছে? এত কষ্ট করে দেশটিকে হানাদার পাকিস্তানি থেকে মুক্ত করে, ফের কেন বারবার ধোঁকা ও অন্যায়ের শিকলে বাঁধা পড়ছি আমরা? এত কেলেঙ্কারি কী সরকারের অগোচরেই হয়ে গেল? এটাই আমরা বিশ্বাস করব? প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তো আমরা দেখি প্রতারণা চূড়ান্ত হলে, জনগণ নিঃস্ব হলে, গ্রেপ্তারের ‘মহা-দক্ষতা’ দৃশ্যমান ...! দিনশেষে গ্রাহকরা শুধু এভাবে ধরা খেতেই থাকবে! সমস্যাটা কিসে বা কোথায়?

প্রতারকরা কেউই কিন্তু লুকিয়ে কিছুই করেনি। অতীতে বড় বড় আর্থিক কোন কেলেঙ্কারিই লুকিয়ে হয়নি। আজকের ইভ্যালি রীতিমতো জাতীয় ক্রিকেট দলের এক্সক্লুসিভ স্পন্সর হয়ে মার্কেটিং করে গেছে। তাহলে বলতেই হবে ইভ্যালিকে টাকার বিনিময়ে প্রমোট করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এবং নাটকের প্রযোজকরা।

বাংলাদেশের কতিপয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুই করে ভেজাল, দুই নম্বরি ও ধান্দাবাজির বাসনা নিয়ে। অনেকেই কয়েক মাস বা বছরের মধ্যে ধান্দাবাজি, দুই নাম্বারি করে কোটিপতি হতে চায়। বিপরীতে সাধারণ জনগণও কেনো লোভ সামলাতে পারে না? ১০ টাকায় ২০ টাকা পাবো বলে লগ্নি করছি! সোজা কথায় জুয়া খেলছি! ইভ্যালির বিভিন্ন লোভনীয় অফারগুলো ছিল-সাইক্লোন অফার (বাজার মূল্যের অর্ধেক মূল্যে পণ্য বিক্রয়); ক্যাশব্যাক অফার (মূল্যের ৫০-১৫০% ক্যাশব্যাক অফার); আর্দ্রকুয়েক অফার, প্রায়োরিটি স্টোর, ক্যাশ অন ডেলিভারি। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবেও ছিল জমজমাট অফার, যেমন- বৈশাখী, ঈদ অফার ইত্যাদি। পরিণতিতে ইভ্যালির সাইক্লোন আফারের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা বাতাসে উড়ে গেল!

লোভনীয় নানা রকম ডিসকাউন্ট কিংবা ক্যাশব্যাকের অফার দিয়ে দ্রুত ক্রেতা টেনেছে ইভ্যালি। লোভে পড়ে ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন তাদের পণ্য কেনার অর্ডার দিতে। আর এ সুযোগটিই নিয়েছেন চতুর রাসেল। শুরুতে একটি দুটি অর্ডার দ্রুত ডেলিভারি দিয়ে ক্রেতার আস্থা অর্জন করেন, কিন্তু পরবর্তীতে শুরু হয় প্রতারণা। লোভে পড়ে একেকজন গ্রাহক কেউ ২০ হাজার, ৫০ হাজার, এক লাখ, পাঁচ লাখ কিংবা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নেয়া হতো ক্রেতা দেয়ার জন্য সেসব মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানেরও টাকা শোধ করেননি রাসেল। এভাবে এক রকম ‘মাছের তেলে মাছ ভেজে’ শত শত কোটি টাকা লুটেছে ইভ্যালি।

প্রতারণা ব্যবসা এদেশে বড় জাঁকজমক হয়ে থাকে রাজনৈতিক নেতাদের দেকভাল ও সেলিব্রেটদের কারণে। ডেসটিনি, যুবক, নিউওয়ে, এহসান গ্রুপ, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জকে অনেক আগেই থামিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। আইনের তোয়াক্কা না করে অথবা ম্যানেজ করে ওরা নিজের আখের গুছিয়েছে। এখন লাখ লাখ মানুষ তাদের কষ্টের টাকা কিভাবে ফেরত পাবেন? এ দায় কি শুধুই রাসেলের? যেসব সেলিব্রেটিরা বিশাল অর্থের বিনিময়ে ইভ্যালি, এহেসান গ্রুপ, আর ই-অরেঞ্জের মতো বাটপারি ই-কমার্স ব্যবসার অ্যাম্বাসেডর হয়ে তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে কন্ট্রিবিউট করেছেন তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। কারণ তারা এই নষ্ট সিস্টেমের অন্যতম সহযোগী। তারা তাদের নিজস্ব জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে এসব ব্যবসার মার্কেট সৃষ্টিতে কাজ করেছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিঃসন্দেহে প্রতারণা। ভবিষ্যতে কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে সেলিব্রিটিরা দশবার ভাবতে হবে।

ই-কমার্সগুলো এই দেশে লুকিয়ে লুকিয়ে বিজনেস করেনি। তারা ঢাক ঢোল পিটিয়ে সব মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেদের প্রচার করেছে। ক্রিকেট দলের স্পন্সর হয়েছে। ঢাকার প্রত্যেকটা পুলিশ বুথ ইভ্যালির বিজ্ঞাপনে ঢেকে গিয়েছিল। সরকারের মন্ত্রী এমপিরা বিভিন্ন সময় তাদের পক্ষে কথা বলেছে। দোষ কি শুধু সাধারণ মানুষের? সাধারণ গ্রাহক সরকারের নিবন্ধিত ই-কমার্স থেকে পণ্য ক্রয় করেছে। এক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতা ভুক্তভোগী হলে সরকারও এই দায় এড়াতে পারে না। এদের মনিটরিং করার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। গত বছর ইভ্যালির ব্যাংক একাউন্ট এক মাসের জন্য জব্দ করে দেয়া হলো। সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একমাস পর আবার অ্যাকাউন্ট ওপেন করে দিল। এতে প্রমাণিত হয় ইভ্যালির মধ্যে কোন সমস্যা নেই। এর মাধ্যমে আল্টিমেটলি সরকার ইভ্যালিকে গ্রিন সার্টিফিকেট দিয়ে দিল। আলেশা মার্ট নামে আরেক ই-কমার্সের উদ্বোধন করলেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর এ ছবি আলেশা মার্ট ফলাও করে প্রচার করেছে। মানুষের থেকে টাকা কালেকশন করেছে। তারাও এখন ডেলিভারি দিতে পারছে না। এখানে কি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দায় নেই? সাধারণ মানুষের কি সাধ্য আছে এত বড় কোম্পানির ভেতরে ঢুকে খোঁজখবর নেয়ার?

‘ডাবল ভাউচার’ অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেয় ই-অরেঞ্জ। অফারের ভাষ্য ছিল, কেউ এক লাখ টাকা জমা দিলে দুই লাখ টাকার ভাউচার পাবেন। ওই ভাউচার দিয়ে আমানতকারী প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্য কিনতে পারবেন। কিন্তু দ্বিগুণ অর্থের পণ্য কেনা তো দূরের কথা বরং মূল অর্থেই গ্রাহকরা পণ্য বুঝে পাচ্ছেন না। বর্তমানে পৃথিবীটিতে অনলাইন শপিং একটি দারুণ কম্পিটিশন মার্কেট। কোন কোম্পানি কত দ্রুত প্রোডাক্ট ডেলিভারি ও সেবা দিবে এ প্রতিযোগিতা। বিশ্বে অনলাইন ব্যবসায়ীরা সততা, আস্থা, স্বচ্ছতা ও দ্রুত হস্তান্তরের কম্পিটিশন করে। আর আমরা আছি চুরি আর ফাঁদের কম্পিটিশন নিয়ে! আমরা বলতে চাই, ই-অরেঞ্জ ও ইভ্যালিকে কোন মান ও দিক দিয়ে ই-কমার্স বলে মনে করা যায় কী? বিশ্বে এমন কোনো ই-কমার্স কোম্পানি আছে যারা ২ মাস, ৬ মাসে পণ্য ডেলিভারি দেয়? আবার কোন কেন ক্ষেত্রে বছর ফুরিয়ে গেলেও পণ্য ডেলিভারি দিতে অপারগ। তাছাড়া এমন কোথাও আছে কী, যারা নতুনদের টাকায় পুরোনোদের পণ্য দেয়? আমরা আশা করছি গ্রাহকদের স্বার্থে দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্ব-প্রণোদিত হয়ে ডেসটিনি, যুবক, নিউওয়ে, এহসান গ্রুপ, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ ধান্ধা ও ধোঁকাবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। এই মুহূর্তে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ খোয়ানো সাধারণ গ্রাহকদের বাঁচানোর একমাত্র অক্সিজেন হলো হাইকোর্ট। গ্রেপ্তার কোন সমাধান নয়, গ্রাহক কীভাবে তার লগ্নিকৃত টাকা ফেরত পাবে সরকার ও হাইকোর্টকে সে ব্যবস্থা নিতে হবে।

back to top