alt

সাময়িকী

ওবায়েদ আকাশের বাছাই ৩২ কবিতা

: রোববার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৪

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/21Jan24/news/shilpy-poet.jpg

বিনির্মাণ

আমাকে ডেকো না। যা কিছু শুকিয়ে গেছে রৌদ্রে, তার
সতর্ক দৃষ্টিতে খুঁজে নিয়েছি তোমাকে—

ভেতরে ভেতরে কিছু গরমিল তোমার প্রশান্ত সবুজ ফর্মুলা
ঐ অতীত থেকে লাভ দিয়ে গূঢ়ার্থ বিশ্বাস ভেঙে গেছে

এখন চাইলে প্রাজ্ঞ শিক্ষার্থী হয়েও মনস্ক বিজ্ঞানী হতে পারো না

এখন যা কিছু স্পর্শ করো অভিমানে লাল হয়ে যায়—
প্রতিটি বিকেলবেলা ঘাসে ঘাসে প্রবন্ধ রচনা করে
দীর্ঘশ্বাস পাড়ি দিতে এসে যে শহর জলে ডুবে গেল
তুমি তার ভাঙা ঢেউ কুড়িয়ে-বাড়িয়ে কতটা মহৎ হতে পারো?

আমাকে ডেকো না। নদীতীরে চৈতালি শস্যের দিকে
দৃষ্টি চলে যায়। কেউ নাকি মৃত ফসলের সুখে ভালবাসার নোঙর
বসিয়েছে। ভেবো না ওখানে ছিলাম বা থাকবো কখনো

তোমার শুকনো হাত-পা দুহাতে ধরে বুঝি, তারো বহু আগে
আমারই হৃৎপিণ্ড ভেঙে একঝাক শালিখের বেঁচে থাকা
নিশ্চিত হয়েছে। আবার কুমার নদে ভাসা কঙ্কালের
সারাংস পড়ে কিছু মাছ শিক্ষিত ও সদর্থ হয়েছে

আমাকে ডেকো না। প্রতিটি স্বর্ণ গোধূলি সাক্ষী

আমাদের কোনো অতীত ছিল না
আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোথাও কোনো ইশতেহার রচিত হয়নি

আমাকে ডেকো না। সুদূরে তাকাও। দেখো ঠিকরে বেরুচ্ছে রোদ
ও দুটি আমার হারিয়ে যাওয়া চোখ, তোমাকে দেখার স্পর্ধা

রূপনগর

রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস... এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল—এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।... রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে

বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ রোড নামকরণ হলো

আমার নাম দাও শিবপোকা। শিবপোকা মানে, একটি নতুন পোকার নামকরণের ক্ষমতা।... তুমি করো দোয়েলের চাষ। দোয়েল কি পরিযায়ী নাম? ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো সেবার বর্ষায় ছিল সাদারঙ হয়ে। আমি জানি, এ প্রকার জলসাদা ব্যাঙ পৃথিবীতে কখনো ছিল না। এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম। কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে।... তুমি করো দোয়েলের চাষ।... ভাল ছাইরঙ বোঝো।... মেটে কলসি, লাউয়ের খোঁড়লে কী গভীর সুর তুলে আনো। তোমাকে জানাই তাহলে, আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযত্নেরাখি ঘরের নিভৃত কোণে। তুমি তো জানো, কতটা বেসুরো হলে হাটের গুঞ্জন ওড়ে আকাশে বাতাসে

প্রকৃতিপুত্র

ভাবতে গেলে তুমিই একদিন
আমাদের হারানো শেকড়, হারানো চুল, বয়সভেদে
ছোট হয়ে আসা পরিত্যক্ত পোশাকের ধরন, ছায়াভিত্তিক
ঘাসের আকৃতি, বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকা মাঠ

আলের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ধানক্ষেতে পড়ে যাবার স্মৃতি—

একদিন ডেওয়া ফলের ঘ্রাণের মতো ফিরিয়ে দিতে পারো

যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম
মাছেদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রবাহ দেখে মনে হতো
ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাক্সের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ
আর যত্রতত্র অশ্বদৌড় দেখে মনে পড়ত
সেই সকল ক্রীতদাস ব্যবস্থার প্রবর্তক, যাদের
ঐসব দুরন্ত অশ্বের লেজে জুড়ে দিয়ে
ঘোরানো হচ্ছে কাঁটাঝোপ, বনবাদাড়, তপ্ত মরুভূমি—
একদিন আলোছায়ার নক্ষত্রের মতো
তুমিই তার ভালমন্দ, উঁচুনিচু শিখিয়ে নিতে পারো

যখন মাথার ওপর সুস্নিগ্ধ মেঘের পরিচ্ছদ দেখে
মনে হতো প্রাগৈতিহাসিক কুশলীরাজ কিংবা প্রাচীন গ্রীসীয়
স্থাপত্যপ্রেমিক কোনো রাজরাজড়ার মহান কীর্তির কথা—
কিংবা মনে পড়ে যেত—গাছে গাছে বিবিধ কূজন আর বর্ণালি ফলের
আস্ফালন দেখে ইবনে বতুতার চোখে অপ্সরী ও গন্ধর্বের পরম সংসার; আর
অতল সুখের এই পলিধৌত সুশীল রাজ্যের মতো স্বর্গীয় মাতৃভূমির কথা

ভাবতে গেলে একদিন তুমিই তার আগাপাছতলা দেখে ফেলেছিলে
আজ আবার পুনরুদ্ধারিত গৌরবের মতো

তারই কিছু গ্রহণ বর্জন সুখ স্মৃতি অনায়াসে তুলে ধরতে পারো জানি

গগণ ঠাকুর : গণিতজ্ঞ

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন
লিটল ম্যাগাজিনের দুর্মূল্য খাঁচায় তার নাম
যাদুঘরের প্রহরী বেষ্টিত উজ্জ্বল হয়ে আছে

জীবনে প্রথম তিনি ভাষাবিজ্ঞান থেকে নেমে
লোকসংস্কৃতির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন রিক্সার চাকা
তারপর নাটক সরণির মুখোশের কেনাবেচায়
গণিত বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন

এবং যে কোনো বাহাস কিংবা প্রথম প্রথম কবিতার খাতায়
ব্যাকরণ থেকে জ ফলা কিংবা নৈতিকতা থেকে ঐ ফলাগুলো
ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন বলে
একদা এ্যান্টি এশটাবলিশমেন্টের কয়েকজন তরুণ কর্মী
তাকে গভীর উৎসাহে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়

বলে, যে কোনো স্কুলিংয়ের নির্জনতায় জনসভার উত্তেজনা
কিংবা কফি হাউসের ছায়ায় সরাইখানার পরাপাঠ
রটিয়ে দিতে পারলেই তবে মুক্তি

কোনোদিন মুক্তি নেননি গগণ ঠাকুর
বরং দীর্ঘ কারাবাস কালে এ্যালজ্যাবরার প্লাসগুলো একদিকে
এবং বন্দিজীবনের নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তিগুলো একদিকে রেখে
প্রতিদিন ঘুমোতে অভ্যস্ত ছিলেন
একদিন যোগের সঙ্গে ভাগ এবং নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তির সঙ্গে
গুণীতকের গভীর সখ্যের দরুন তারা মধ্যরাতে হাত ধরে পালিয়ে চলে গেল

অথচ তিনি প্লাসের সঙ্গে মরালিটি এবং
মাইনাস ও একাকিত্বের সঙ্গে হিউম্যানিটির সমন্বয়গুলো
গভীর কাছ থেকে ভেবে এসেছিলেন—

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন। এ-মতো গাণিতিক সমস্যা
জীবনে এটাই প্রথম বলে তার মীমাংসা হেতু
নতুন কোনো লিটল ম্যাগাজিনের খাঁচার দিকে তাকিয়ে আছেন

মেটামরফসিস : মনিরুজ্জামান

ছিপি খুলে ঘুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মনিরুজ্জামান

কারা যেন দীর্ঘ ঘুম মুড়ি দিয়ে পড়েছিল চিলেকোঠার খাটে
এবং প্রস্থান কালে ঘুমের মুখে ছিপি এঁটে
পেরিয়ে গেছে প্রমোদ সরণি

আমাদের মনিরুজ্জামান তাতে আটকা পড়ে
কতগুলো পুকুরের চারা এবং অরণ্যের ডিম
সফল প্রজনন হেতু ফেলে এসেছে; এবং পুকুরের গায়ে
জলপাই শ্যাওলার এক প্রকাণ্ড চাদর প্রান্ত ধরে টেনে

শরীরে মুড়িয়ে লোকালয়ে ফিরে এসেছে

আজকাল তার সন্তানের প্রতি সিংহের মতোস্নেহ এবং
স্ত্রীর প্রতি ইঁদুরের মতো নিষ্কণ্টক ভালবাসা দেখে
কেউ কেউ তার নাম পাল্টে ফেরারি রেখেছে

গাঁগঞ্জের ফেরারি-মন মানুষেরা উঠতে-বসতে ঘুরতে-ফিরতে
সারাক্ষণ তাকে বন্দি করে রাখে
এবং ব্যক্তি মানুষেরা তার মতো আকস্মিক বদলে যেতে
কেউ বাঘের মতো কেউ ছারপোকার মতো অভিনয় করে
তার মনোযোগ খুঁজতে থাকে

শুধু মনে মনে ভাবে মনিরুজ্জামান:
এক জীবনে আর কতবার হারালে
একদিন শীতল বৃষ্টির মতো আকাশের করুণা কুড়নো যাবে!

একটি সাম্প্রতিক কবিতার খসড়া

গত শরতের দিকে

যথার্থই ভল লোক বলে তোমাদের নিমন্ত্রণ পেলাম
হাঁড়ি-কলসির নিশ্ছিদ্র সাজানো ফটকে
তোমাদের অভ্যর্থনা পায়ে পড়ে গেল
বলা হলো—

জাহাজ ছুটছে
ঢোল বাজছে
রুটিতেই আপনার প্রচণ্ড আসক্তি, তাই তো?
বললাম, ‘না’
তাহলে ভেতরে ঢুকুন
জানেন তো, কেরোসিনের ফলন ভাল
এ নিয়েই দুটো কথা বলা হোক

দেখছ যে, সিঁদুর রাঙানো ষাঁড়
ও থেকে আমরা রোজ কেরোসিন দুহাই
কেরোসিন খাই...

ট্রেন এসে যাচ্ছে, আমার শ্যাম্পুর পাতা?
এ সবই মায়ের জন্য উপহার
মা বলেন, ‘খ্যাতি নেই খাদ্য নেই
পারফিউমের গন্ধে আমার
উঁট্কি আসে বাবা’

যা দিনকাল, আপনারা সরুন তো
সুঘ্রাণ আসছে
সুঘ্রাণের জন্মদিন ছিল
আমার নেমন্তন্ন ছিল
সংবর্ধনা পায়ে পড়েছিল...

খাতায় মার্জিন টানুন... আমাদের ছবির মাপ নিন
আমার মায়ের নাম : কেওড়াজল
বাবা : গন্ধবণিক
পেশা : দিগ্বিজয়
—এভাবে ক্যাপশন দিন

...চলুন কাস্টমসের দিকে
সঙ্গে হোমিওপ্যাথ
বাবা ডাক্তার ছিলেন
ভাল মেয়ে দেখতে পারেন

স্যার, আমার ফাইলপত্রে
এক ডজন সুন্দরী বেড়াতে এসেছেন
গায়ে ডেটলের ঘ্রাণ, লাইকলি ইমিগ্রান্ট

ভাগ্যটা খুলে নিন স্যার

দ্রুত ফিরে চলুন, বাংলার টিচার
রোল-কল হবে
নো লেট-মার্ক
—টিচার, আপনার ছাত্রীদের ডাকে ধর্মঘট
কাল আসবো না
বাসায় বেড়াতে যাবো, থাকবেন টিচার?
সঙ্গে সংবর্ধনা
সুঘ্রাণ
বাবা-মা থাকবেন

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/07Jan24/news/selected-32-2.jpg

শিল্পী: কামরুল হাসান

আফিমের ঘ্রাণ পাচ্ছ?
দোতলার ছাদে আফিমের চাষ হয় খুব
ডবলডেকারে ওঠে
স্কুলে যায়
ভাল শিস্ দেয় মিনি স্কাট
ছাদে রোদ এলে পত্ পত্ ওড়ে পাজামার ফিতে

আর মনে পড়ে পঙ্কজ উদাস

হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া
জলতরঙ্গ...
বিটোফেন...
মোৎসার্ট
‘বেলা বোস তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?’
ডব্লিউ ডব্লিউ ডট অঞ্জন দত্ত ডট...
আহা প্রতুল-দা আলু ছোলা বেচে উজাড় করেছেন

কফি হাউসের রোদে
ফোলা ফোলা গাল বসে থাকে
মরুভূমির নাভি

ধারী ধারী পাছা
কাল আপনাকে দেবদাস ছবিতে দেখেছি
সংবর্ধনাকে ভাল চিনবার কথা আপনার
‘ইয়েস অনলি শি ইজ!’
চলুন মা’র কাছ থেকে ছুটি নিয়ে আসি

এত হাসি হাসি কথা কী করে বলেন?
আপনার বোগলের ঘ্রাণে বমি বমি লাগে
—কোলে তুলে নিন, ওজনে পাতলা
ভাল স্বাস্থ্য
একহারা
পছন্দ : এ্যাশ টি শার্ট
ব্ল্যাক জিন্স
হানড্রেড পাইপারস
প্রিন্স ইগোর
এ্যাবস্যুলুট
হোয়াইট মিশ্চেল
জ্যাক ড্যানিয়েল...
আর
ফোলা ফোলা গাল

একটি রং নাম্বার ডায়াল, হাসপাতাল!
রিয়েলি লোনলি ডাক্তার
পেইন কিলার প্লিজ...

—সিস্টার [নার্স] আপনার ফ্রকের হুঁকগুলো খুলে যাচ্ছে কেন?
—ম্যাডাম [ডাক্তার] আপনার এ্যাপ্রোনটি ভীষণ উড়ছে বাতাসে
আমার চশমাটা খুলুন
মাইনাস থ্রী পয়েন্ট ফাইভ [—৩.৫]
পূর্বপুরুষের ছিল
চশমাটা ভেঙে দিন, আপনার শুশ্রূষা
বড় প্রয়োজন
আরও শীঘ্র ভাল করে দিন

মা বকবেন
তিনি তো অফিস যান না কতদিন

সকাল সকাল শেভ হয়ে যাচ্ছে
ধোঁয়া উঠছে চায়ে
(মধ্য দুপুর... জলপাই-রং জীপ... হ্যান্ডকাপ...)

অভিযোগ :ক. রঙধনু দেখা
খ. দেদার গঙ্গার প্রবাহ অঙ্কন
গ. শীতবস্ত্রহীন
ঘ. বুকপকেটে প্রেমিকার চুম্বনের ছাপ
চ. শালপাতার বিড়ি



আমাকে গেট অব্দি পৌঁছে দিন
যাবজ্জীবন, সশ্রম...

প্রিয় শোক:
১. জীবনানন্দ দাশ
২. সমুদ্র ভ্রমণের দিনগুলি

বালাগাল উলাবে কামালিহি...
আপনাকে খুব সুফি সুফি লাগে
আপনি হারামির মতো মুখ ভার করে হাসেন
আপনি খুব পর্নো পড়েন
কিছুটা ঘুমিয়ে নিন
আপনার কিছু ঘুমের প্রয়োজন আছে
ঘুমের মধ্যে আপনি খুব মন খারাপ করেন

কেউ ফুটপাত ধরে হাঁটছে
যাবজ্জীবন ঘুমের কথা আপনার মনে পড়ছে নাতো!

বিসর্পিল প্ররোচনা

পুকুর থেকেই এই মাছ অনাস্থা দেখাল
রসুইঘর উত্তপ্ত বেহেশ্ত, আরাকান মাছি
সমুদ্রপাড় ডানায় তুলে ওড়ে; হাউস মেটাতে যারা বীচে যায়
এক ঠ্যাং উর্ধে তুলে তটের বেঞ্চিকে বলে, ‘তুমি শিরস্ত্রাণ’
তারাই জলধি সেচে—ব্যাগভর্তি নিয়ে যায় ডলফিন-চারা

ত্রিমাত্রিক রিবতিতে শরৎটা কেটে কেটে তুলে দিই পথে
একদিকে বুলেটের নখ ও সুচ্যগ্র স্তন, কামার্ত কম্পিত ভয়
একটা বিপুল তটরেখা ছিল, আর নেই, এই বিভক্ত শারদে

অনর্থ সাগরে টেনে আনা, দেহক্ষণে হোটেলের ঘ্রাণ, সঙ্গমের নুন
বহুকালের প্রাচীন প্রশ্নে সুঠাম নাবিক, অর্থে কেনা যৌনতার দিকে
উঁচিয়ে তুলছে ত্রাস, বিক্রিত রমণীর গোপন বিষাক্ত ব্যথায়
পোড়ে সহজিয়া, তবু শুভ্রতাও একাল-ওকাল ধরে জাগছে রসিকজনে

অর্বাচীন আবহাওয়া প্রকার, আর আমাদের মুদ্রিত মুখস্থ যাত্রা
কখনো বিভক্ত নয়; ঋতু আসে, আজকাল চরিত্রের অধিক ঋতুর অবক্ষয়

কাশফুলের বাসনা ফেলে একা কেন সঘন সৈকতে আসি?
আরাকান শোকেরাও বোঝে; সুইমিং বার্ড সন্তরণ ছাড়া
আর কোনো মীমাংসা বোঝে না তো

মুদ্রাঙ্কিত প্রতিটি মাছের আঁশটের নিচে সভ্যতার বিসর্পিল প্ররোচনা
একদিকে সূর্যোদয়—বিপরীতে জনপদ—কোলাহলে অস্থির জল্পনা

মুক্তি

আমার বিছানাসঙ্গীর গায়ের ওপর থেকে
চাদর সরিয়ে দেখি, সে ওখানে নেই!
একটি প্রাপ্তবয়স্ক আত্মজীবনী পড়ে আছে

কে যেন আমার দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাসের সঙ্গে
শয্যাসঙ্গীর অনুপস্থিতির বিবাহ পরিয়ে দিল—
তারা যখন তুমুল সঙ্গমে ব্যস্ত, আমি আত্মজীবনীর
একটি একটি পাতা খুলছি আর
নতুন নতুন পাতা এসে ভারি করে তুলছে স্মৃতি—

তারা আমাকে সঙ্গমে আহ্বান করছে—আর
আমি তাদের মুক্তির কথা ভেবে
পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো ছিঁড়ে
উন্মুক্ত উচ্ছ্বাসে উড়িয়ে দিচ্ছি

অভ্যাসবশত ভোরবেলা—আমাদের সন্তান যখন
আমার গায়ের চাদর ধরে টান দিল—
দেখল, আমাদের দু’জনের কেউই তখন
নেই ওখানে!

মনে মনে ভাবলাম, প্রত্যেকের মুক্তির জন্য
কেউ-না-কেউ একজন থাকেই প্রান্তরে

ধীরেন্দ্র আর ভুশার নস্টালজিয়া

‘ধিরে, সুখ নাই।’
[ভুশার একমাত্র ঘোড়াটি গতরাতে চুরি হয়ে গেছে। কিংবা ধারণা করা যায়, এ মুষল বৃষ্টিতে ঘোড়াটির দুরন্ত শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়।]

‘কেন?’ —বলল ধীরেন্দ্র।
আবার ধীরেন্দ্র কয়, ‘তোর থেকে ত্রি-দন্ত চতুর কেউ একজন ঘোড়াটির আজকাল খোঁজখবর নেয়।’

‘ধিরে, এখন কী করি?’
‘যত দূর জানা আছে, তার কিছু তথ্য বের করি।’
[তথ্যে বেরিয়ে পড়ে, এ ভরা শ্রাবণে, তিনিও ঘোড়ায় চেপে হঠাৎই ছুটছেন নাকি সোমত্ত কৈশোরের দিনে।]

‘মাঝি, কোন ঘাটে ভিড়বে তোমার তরী?’
[নদীতীরে ধীরেন্দ্র আর ভুশা, তাদেরও শৈশবের দু’টি টিকিট যদি মেলে!]
মাঝি বলে, ‘আপনারা ব্যাটা নাকি ছেলে?’
এ ওর দিকে চায়, তারপর ধীরেন্দ্র বলে— ‘মুশকিলে পড়িলে ভুশা, মাঝিও মনের কথা রঙ ধরিয়ে বলে।’

অভিনেতা তীর্থঙ্কর

তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে

তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে
চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে

সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়
তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক
সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়
তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো:
ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল

আর এখন তাতে ফল ধরবে—যা পেড়ে খেতে
তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের

নয়াশতাব্দি

সুবাস্তিনা, গৌরবর্ণ, ত্রিভাষী, সুচ্ছায়া—
ব্যাকরণ বিষয়ক তর্কে ডিলিট, অবিশ্বাস্যইমেজারি, আদতে মঙ্গোলীয়
আমার সমস্ত দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে

ভাঁজ খোলার আগেই জানাচ্ছে কার্বণসমতে তার হৃদয়স্থ—

শরীর থেকে সুলতানপুরের সমস্ত গন্ধ খুলে জানতে চাই
একুশ শতকের পর গ্রামবাংলার রূপরূপান্তর!

সুবাস্তিনা, দশ তলায় ডবল ডেকার থেকে হাত তুলছে
তাকে সবাই ভাবছে, বজ্রনিরোধক সুখ, কালপুরুষ—
জানাচ্ছে, বৃক্ষের পরে বৃক্ষ সাজাতে গেলেকোমরে করাত লাগে
শতবর্ষী কাণ্ডের উন্মুক্ত স্তনের উষ্ণতা লাগে দরজার চৌকাঠে

এবং যেভাবে দশতলায় গাছের পাতা ঝরছে, বর্ষায় জমির আল
ভেসে যাচ্ছে, কদম ফুলের পাপড়িতে গড়াগড়ি খাচ্ছে শৈশব
কী আর বলি, ওখানে আমিও ছিলাম চল্লিশ বছর পিছনের
রিমোট কন্ট্রোলে— এভাবে সমস্ত ঋতু শরবতের মতো গিলে নিচ্ছে নীলাকাশ

সুবাস্তিনা, পিঠে কৈ মাছের ঝাঁক, কাতরাচ্ছে
পাললিক সম্ভাবনার স্বপ্নে সয়ে যাচ্ছে একান্ত ব্যথা

আজ সমস্ত রাত অন্তত পঁচিশ তলা উঁচুতে বিমান বন্দর
সাঁঝবাতি জ্বলে ওঠার আনন্দে নক্ষত্র ফুটিয়েছে প্রতিটি গ্রাম
প্লেন উঠছে নামছে, গঞ্জের হাটে বিকিকিনি হচ্ছে ইলিশ, ডেওয়া ফলের ওম

একুশ শতক ফুরোবার আগেই সুবাস্তিনাসর্বোচ্চ ভবন লাফিয়ে মাটিতে পড়ে গেল
তার হাতের মুঠোয় পাকুড়-জঙ্গল, নদীমাতৃকতা, ধান-ফসলের অপার বাংলাদেশ

যে যার মতো কৈশোরে ফিরে জানাল—নয়াশতাব্দির সরল সম্ভাবনা!

বৃষ্টির জন্য

বৃষ্টির ওপর ঘোড়া চাপিয়ে
বিদ্যালয় ঘরে নিয়ে এলো বাবা

মায়ের উৎকণ্ঠা তখন
টিফিনের মাছগুলো ভিজে জলে নেমে গেলে
আজ অনাহারে থাকত ছেলেটা!

বাবা ভাবছে, আর এমন হলে
মাছের ছেলেমেয়েগুলো
পুনর্বার ফিরে পেত তাদের বাবা-মায়ের ওম

এমন বৈপরীত্য সত্ত্বেও আজ
দীর্ঘকাল পর পেছনের জংধরা শাহী দরজাটা
বৃষ্টির জন্য খুলে দিল তারা

গৃহবন্দি

মধ্যরাতে কে যেন এসে আমাদের বাড়ির ঘরগুলো
হাত-পা মুড়ে বেঁধে রেখে গেছে এবং
বারান্দাগুলো লুকিয়ে রেখেছে অদৃশ্য ছায়ায়

ভোর হতে না হতেই লোকজন আসছে, চেনাজানা আত্মীয়-পরিজন
তারা চোরের মতো বাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ ফিরে যায়
কেউবা বিস্মিত হয়ে অদৃশ্য ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লে
পায়ের নিচ থেকে কঁকিয়ে ওঠে লুকানো বারান্দাগুলো

যখন ঘরের দিকে এগিয়ে এসে শক্ত করে বাঁধা
রশিগুলো খুলতে যাচ্ছে, ভেতর থেকে হৈ হৈ করে হাসছে
গৃহবন্দি পরিবারের বাপ-মা, শিশু-যুবা—তাবত মানুষ

তারা ফিঙের মতো ঘর থেকে লাফিয়ে বেরুচ্ছে আনন্দে এবং
ঘরগুলোর যত্রতত্র যেসব ক্ষতে রক্ত ঝরছে
জলে ধুয়ে লাগিয়ে দিচ্ছে কবরেজের দেয়া আরোগ্য-মলম
ব্যক্তিগত ব্যবহৃত ঘরে টেনে তুলে জুড়ে নিচ্ছে শায়িত অলিন্দমালা

আমি শুধু একমাত্র জন ইঁদুরের গর্তে পা আটকে যাওয়ায়
শত চেষ্টাতেও ঘর থেকে বেরুতে পারছি না

বাড়ির মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত হয়েছে, খাচ্ছেদাচ্ছে
ঘুমাচ্ছে-জাগছে—শুধু একই ঘরে থেকে
আমার গগনবিদারি চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না

এ-সংসারের রক্তমাংসের একজন মানুষ আছে কি নেই
কতকাল হলো কারও কিছু মনেই পড়ছে না

জাতিসংঘের মরচেধরা চাবির জন্য কবি আবুল হাসানের কোনোই দুঃখ ছিল না

ভাল আছি, খুব ভাল আছি? আবুল হাসান। রাত্রিদিন পৃথক পালঙ্কে শুয়ে অচিকিৎস্য আরোগ্যের পাশে তোমাকে দেখাচ্ছে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। রাজা যায় রাজা আসে আর আমাদের মাঠভর্তি ধানক্ষেত দীর্ঘকাল অরক্ষিত থেকে এবার বানের জলে ভাসে। যে তুমি হরণ করো তার টিকিটি ধরে একবার পচাডোবা এঁদো পুকুরের জলে নিক্ষেপ করে প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিলে— এইবার দীর্ঘদিন তোমার লক্ষ্মী বোনটিকে নিরুপদ্রবে লাল শাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে বৈকি। অথচ তার নগ্ন নিমিত্ত দেখো : একদিন তোমার নিজের চিবুকের কাছেও ভীষণ একা হয়ে গেলে। আর একদিন এইসব অসহ্য সুন্দর তোমাকে মানিয়ে গেলেও— জাতিসংঘ তোমাকে মেনে নিতে পারেনি কখনো। আর সেই থেকে ভাবতে বসে গেলে : দুঃখের কোনো মাতৃভাষা থাকতে নেই কেন। কেবলই লাবণ্য ধরে— এমন পাথর, তার হিতাহিত ধরে টান দিতে গিয়ে একদিন মৃত্যু এসে তোমাকে নিয়ে গেল আবুল হাসান। তোমার বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, ততদিন তোমার বাংলায় কোনো মৃত সুন্দরীকে গোর দিতে দেখেছিলে বলে মনে করতে পারছ না ভেবে— পুলিশ ও মানুষের মধ্যে যথার্থ বৈষম্যজ্ঞান তোমার আমৃত্যুই থেকে গিয়েছিল। তোমার উদিত দুঃখের দেশে পানপাতা হলুদ হতে হতে আমরা তো ভুলে গেছি নিসর্গের প্রকৃত বানান। তবু ভেবে দেখি, বেশ ভাল আছি (?), তুমি কেমন আছ আবুল হাসান!

কবি উৎপলকুমার বসু প্রতিদিন রেলগাড়ির জানালা দিয়ে দেখা একের পর এক অভাবিত দৃশ্যে বাংলা কবিতার পারম্পর্য খোঁজেন

অরণ্য টিলার উপরে মাছবাজারে বসে কবি উৎপলকুমার বসু হেরিকেনের দরদাম করেন। দীর্ঘকাল সামুদ্রিক মফস্বলে থেকে পরার্থপর মৃত্তিকার দিগন্ত নির্দেশে আজ তাঁকে বাংলা কবিতার হাল ফ্যাশনের চিরনৈমিত্তিক গাউনে আবৃত দেখা যায়। আফিম বীজের চেয়ে পরিণতিহীন লক্ষ্যে ভ্রমণের এই অনিবার্য দিনগুলি তাঁর কখনো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অপার সিন্ধুর জলে তেরো বার স্নান করে ওঠে। আর সেই থেকে দৃশ্যত ধাতুর গলানো চাঁদ তরল ফোঁটায় ঝরে পর্বতচূড়ায়। উৎপলকুমার বসু প্রতিদিন গরিয়াহাট পিছনে ফেলে শিয়ালদা হয়ে হাওড়া আবার হাওড়া থেকে শিয়ালদা অব্দি ঘুরতে ঘুরতে নতুন কোনো আততায়ীর খোঁজে উঠে বসেন ট্রেনের কামরায়, এবং জানালা গলিয়ে একের পর এক অভাবিত নতুন দৃশ্যে যারপরনাই হারিয়ে ফেলেন কবিতার গাণিতিক পারম্পর্য। এই এক ভাবনাবিচ্ছিন্ন কবি— বসন্তে— কেবল পাতার শব্দে জেগে উঠে আগুপিছু কিছু না ভেবেই চিরঅজ্ঞাত লোচনদাস কারিগরের হাতে ছেড়ে দেন তাঁর সমস্ত কবিতার ভার। এবং তৎক্ষণাৎ অবজ্ঞাত হন যে, একমাত্র টুসুই তাঁর চিন্তারাজ্যের ভবিষ্য সম্রাজ্ঞী। একদিন হাসপাতাল ঘেঁটে সমগ্র বাংলা কবিতা থেকে পশ্চিমবঙ্গীয় কঙ্কালগুলো খুলে নিলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে আবার কবিতায় ইংরেজের রাজত্ব ফিরে আসে— অগত্যা এই দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ড প্রবাসকালে কবিতার প্রতিটি শব্দের জন্য তিনি বাংলাকেই নিরাপদ আশ্রয় ভেবে নিলেন— যেমন মায়ের কোলে শিশু। একবার ভরদুপুরে ভাতঘুমের প্রস্তুতিকালে শেক্সপিয়র তাঁর হাত ধরে এই অবসরে কোনো বীমা কোম্পানির দালাল হবার পরামর্শ দিলে আত্মাপমানে প্রায় বছর কুড়ি কাল তিনি পঞ্চাশের কবিতার মধ্যবিত্ত বারান্দা থেকে আপাত অবসরে যান। তৎক্ষণাৎ কতিপয় অনাথ বালক তাদের কোনো অভিভাবকের নিখোঁজ হওয়া সন্দেহে গভীর অরণ্য চারণে আগ্রহী হলে— হঠাৎ লতার আড়াল থেকে ডাক আসে— কুহু। আর তাকে নির্ঘাৎ গুপ্তচর ভেবে বালকেরা সোল্লাসে ঘোষণা করে— স্নিগ্ধ তুমি, প্রথম রাত্রির চাঁদ— অস্তে ভ্রমাকুল। বকের পালকে লেখা আবার পুরী সিরিজ থেকে উদ্ধৃত করে উৎপলদা বলেন— এবার বসন্তে দেখো— পেয়ে যাবো সেলাই মেশিন। পৃথিবীর মহত্ত্বম অস্থিরতা সংকলনে পুরী সিরিজের কিছু হাড়মাংস পোড়াবার কালে জেগে ওঠে তাঁর হস্তচালিত প্রাণতাঁত, মেশিনলুম। মুখোমুখি, ঘাসের জঙ্গলে পড়ে থাকা নিরক্ষর বেশ্যাদের চিঠিগুলি থেকে এই সব পোড়াগন্ধ অনেকে আন্দাজ করে নাক চেপে কিছুক্ষণ বাগানে ঘোরেন। কিংবা অদূরে ঘুম আর বোঝাপড়ার মাঝখানে ধ্বনিবহুল ধানক্ষেতের আড়াল তুলে উড়ে যায় যুদ্ধক্লান্ত মানুষের খণ্ডবৈচিত্র্যের দিন। আজকাল সালমাজরির কাজ বুঝে নিয়ে যারা কিছু একটা করেকেটে খায়— হঠাৎ পরিদর্শনে আগত পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষাধিকারিক বাথরুমে গেলে নাইটস্কুলের খোলা চত্বরে তাদের জন্য যথার্থই উপভোগ্য হয় কহবতীর নাচ। একা একা কিংবা অদৃশ্য শরীরচিহ্নে যে সকল সুখ দুঃখের সাথী ধূসর আতাগাছ ঘিরে একপ্রকার এক্সিবিশন পরিকল্পনা করে— আমাদের নিজস্ব সংবাদ প্রতিবেদক বর্ষার রূপমুগ্ধ হয়ে— বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে— জলে নেমে মীনযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ায়— পৃথিবীর কোনো সংবাদ মাধ্যমেই এ সংবাদ পরিবেশিত হতে দেখা যায় না। কতিপয় বিদুৎচালিত তাঁত এবং দরিদ্র জনপদ ঘিরে আভাঁগার্দ কবিদের শ্রবণ ও ঘ্রাণেন্দ্রিয় বিদ্যুতের তাপে মেপে নিতে গিয়ে সৌরলতায় জ্বলে গেছে সমস্ত সংসার। তারো বহু আগে— নিয়মিত বিরতির পর কাঁপা হাতে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি বয়ে এনেছিলেন পৃথিবীতে অহিংস মানবধার্মিক— অন্নদাতা জোসেফ

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় শেষ জীবনে স্ত্রীদের মাইনেরওপর নির্ভরতা কমাতে বলেছিলেন

কাছেপিঠে কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই একটি সোনার মাছি খুন করে পাড়াময় পুলিশের রামরাজ্য কায়েম করে বসেন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের চেয়েও মহান কোনো অভিভাবক। একবার তাঁর ডান হাতে ধারালো ছুরি বসিয়ে বিভাজন করে দেখেছি— তিনি অনর্গল শেকল ছিঁড়তে পারেন, ঘুমাতে পারেন কাটা হাত নিয়ে এবং ঘুমাতে যাবার আগে-পরে যখন নিয়ম করে কবিতা লিখতে যান— তাঁর বিভাজিত হাত মেঘমুক্ত আকাশের মতো অজস্র তারকায় ভরে ওঠে। তাঁর চোখ দুটো রিক্ত হ্রদের মতো কৃপণ করুণ বলে কেউ প্রশ্ন করলে আত্মাভিমানে বাড়ি ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে পড়ে অচেনা দরজায় কড়া নেড়ে বলেন— অবনি বাড়ি আছ? তারপর হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাথ বদল হলে পানশালার মানুষগুলো বমি-করা গা মুছে নিয়ে বহুদূর বাড়ির দিকে যায়। এমন প্রচ্ছন্ন স্বদেশ— কেবল পাতালে টেনেছে বলে যারা ভাববার শুধু ভাবে— ভাত নেই, পাথর রয়েছে কেবল— এই দেশে তবু কবিতার তুলো ওড়ে? আর যারা আনন্দের বিহ্বল ঘোড়ায় চড়ে বলে, সুখে আছি, ছিন্নবিচ্ছিন্ন আছি— তারা তো সেই— যারা ধর্মেও থাকেন জিরাফেও থাকেন। যাদের পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি একদিন ঝড় এসে শূন্যে মিলিয়ে নিয়ে যায়— পরক্ষণেই শোনা যায়— প্রভু নষ্ট হয়ে যাই। আর একদিন যখন ঈশ্বর থাকেন জলে, কক্সবাজারে সন্ধ্যা নেমে এলে আমরা ও কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘ও চির প্রণম্য অগ্নি’ বলে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি গভীর ভাটায়; এবং পরস্পর হিতাহিত হারিয়ে ফেলে কেউ যখন শুনি— কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছে— আর, চাঁদ ও চিতাকাঠ ডাকে আয় আয়— বলি, যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো? ঘরে যে চির প্রতীক্ষায় আছে সন্তানের মুখ

কবি জীবনানন্দ দাশ প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে ট্রামের লাইনে চমৎকার চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন

কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ ঘুরে মধ্যরাতে স্ত্রী লাবণ্য দাশের তৎকালীন নারী জীবনের স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। শোনা যায় : বিদূষী লাবণ্য দাশ উনুনের পাশে শুয়েবসে কী করে শীতরাত্রির গল্প ফেঁদে কাঁচামাটির পাত্রের মতো আগুনে পুড়িয়ে নিতে পারতেন। আর পুরোটা জীবনের এ দীর্ঘ অবসরে জীবনানন্দ দাশ অভাবিত সোনার ডিম উনুনে তুলে কিছু তাঁর জীবদ্দশায় আর বাকিগুলো তাঁর মৃত্যুর পর আপামর পাঠকের জন্য পরিবেশন করে যান। আমরা তাঁর কাছে বনলতা সেনের অনেক গল্প শুনি। তবু, কোনো এক মানবীর মনে তাঁর ঠাঁই না হবার অপার বেদনার কথায় এতোটুকু বিচলিত কেউ নই; কারণ, একবার সুরঞ্জনা অন্য যুবকের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে বনলতা বিষয়ে এক গভীর জটিলতা তৈরি করে বসেন। আর তাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, ভাবনার পূর্ব থেকেই তিনি কখনো বনলতাকে একক মানবীর মর্যাদা দিতে পারেননি। কলকে পাড় শাড়িতে জড়িয়ে যে কিশোরী সন্ধে হলে ঘরে ধূপ দিতে যায় প্রতিদিন; অথবা যে অনিবার্য মানবী এক শোভনা, সুদূর দিল্লিতে বসে উজানের স্রোতের তীব্রতায় টানেন সর্বদা নিমগ্ন খুব পুরুষ হৃদয়— বরং তাকে ঘিরেই তাঁর জীবনে নারীপ্রেম সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা করা যায়। এবং ধারণা করা যায় যে, এরই পরিণতিতে তিনি হায় চিল নামের কবিতাটি লিখে থাকতে পারেন, এবং আমার সকল গান তবু তোমারেই লক্ষ্য করে— বলে তাঁর ভালোবাসার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটান। আশৈশব তিনি জলসিড়ি, বিশালাক্ষীর তীরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন— আমার মতন আর নাই কেহ! আমার পায়ের শব্দ শোনো— নতুন এ— আর সব হারানো— পুরনো। যেহেতু তিনিই কেবল ঘাইহরিণীর প্রতি অপার মমতা হেতু একদিন ক্যাম্পে লিখে গভীর সমালোচিত হন; নির্জন খড়ের মাঠে পৌষ সন্ধ্যায় হেঁটে হেঁটে রচনা করেন বাঙালির পরিভাষা— রূপসী বাংলার প্রগাঢ়তা আর তুমুল হেমন্ত ভাষা। সেই হেতু এই মহাপৃথিবীতে যার যেখানে সাধ চলে গেলেও তিনি এই বাংলার ’পরেই আমৃত্যু থেকে যেতে অভিলাষী হন। আবার বছর কুড়ি পরে— হারানো মানুষীর সাথে দেখা হয়ে গেলে— এই কাশ-হোগলার মাঠের ভেতরেই যেন দেখা যায় তারে— অথবা হাওয়ার রাতে— যেন দেখা হয় এশিরিয়ায়, মিশরে-বিদিশায় মরে যাওয়া রূপসীরা যখন এই বাংলার আকাশে কাতারে কাতারে নক্ষত্রের সমুজ্জ্বল সংসার রচনা করে— তেমনি তারার তিমিরে। আবার আট বছর আগের একদিন— কল্পনার নক্ষত্রচূড়ায় এক মৃতের গল্প রচনা করে বলেন— তবু জানি— নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ— নয় সবখানি;— অর্থ নয় কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয়— আরো এক বিপন্ন বিস্ময়— আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে— খেলা করে;— আমাদের ক্লান্ত করে— ক্লান্ত— ক্লান্ত করে। জীবনানন্দ দাশ নিশিথের অন্ধকারে সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ঘুরে ঘুরে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ বিবেচনা করে বলেন— ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে... ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে... উপেক্ষা সে করেছে আমারে— অথবা জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র অধ্যাপনা ও সম্পাদনা জীবনের প্রগাঢ় বেদনাময় মুহূর্তে নিতান্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাঁর কিছু উৎকৃষ্ট রচনার নামকরণ ধূসর পাণ্ডুলিপি করে অনায়াসে পাড়ি দেন বাংলা কবিতার ঊষর উদ্যান। একবার খুঁজতে খুঁজতে নক্ষত্রতিমিরে— জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা— বলে যখন সরোজিনীর অবস্থান নির্ণয়ে একপ্রকার ধোঁয়াশায় পতিত হন— আত্মাভিমানে নিজেও ঝরা পালকের মতো ঝরে যেতে চান শুকনো পাতা ছাওয়া ঘাসে— জামরুল হিজলের বনে— কিংবা নক্ষত্র সকাশে। এই তাঁর ঝরে যাবার অভিলাষ হয় আমগ্ন কাব্য জীবনের এক অনিবার্য টান। যেহেতু তাঁর ট্রামের নিচের জীবন এমনই ইশতেহার রচনা করেছে যে, যে জীবন দোয়েলের শালিখের— মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা— ফলে, কার্তিকের নরম নরম রোদে— এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক সাদা বক— এই দৃশ্য দেখে ফেলে যে, আমাদের গহন গভীরের কবি জীবনানন্দ দাশ— এবার মানুষ নয়, ভোরের ফড়িং তারে দেখা যায়— উড়ে উড়ে খেলা করে বাংলার মুখর আঙিনায়—

হাসপাতাল

সারাক্ষণ অশ্রু ছলছল হাসপাতালের অনিশ্চিত দু’চোখ

হাসপাতালে যেতে কারও জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না
হাসপাতালের বাহু দীর্ঘ প্রসারিত আর
দৃষ্টিগুলো স্নিগ্ধ পুকুরের জলে পদ্মপাতার মেঘ

হাসপাতালের যাবতীয় লেনদেন শেষ করে দেখি
পড়ে আছে হলুদ বিছানার মতো দীর্ঘ দুটি মাস
সেখানে অতীত এসে গল্প জুড়ত, মৃত্যু এসে খেলা করত
আর সব কিছু ছাপিয়ে বেড়াত স্ত্রী-পুত্র সংসারের মায়া

প্রায়শই মধ্যরাতে হাসপাতাল আমাকে টেনে তুলে
এক নিভৃত কোণে নিয়ে বলত:
আমি কি এখনও মায়া হরিণের মতো কারও দিকে তাকালেই সে
হু হু করে কান্না করে ওঠে? কিংবা কখনও
গভীর রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি হাসপাতাল ছেড়ে
শান্ত দিঘির জলে গা ডুবিয়ে
একপ্রকার নির্বাসিত জীবনযাপনের কথা ভাবছি?

তখন হাসপাতালের কাঁধে হাত রেখে—যাকে বলে
গলায় গলায় বন্ধুত্ব করে, সারাজীবনের কবিতায়
উন্মোচিত শৈশবের দিকে ইঙ্গিত করে নিয়ে যেতে থাকি

তারপর দুরন্ত যৌবনে শাহবাগ, জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি
চারুকলা, টিএসসির মোড় হয়ে মধ্যরাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
গাজার পুরিয়া খুলে টানতে টানতে কখন যে ভোর হয়ে যায়!

দেখি ভোর হতে না হতেই অজস্র মৃত্যু আর আরোগ্যের বোঝা মাথায় করে
নিরহঙ্কার মানুষের মতো চুপচাপ বিনিদ্র থাকে হাসপাতাল

বদলি

এখান থেকে বদলি হয়ে গেলে
পড়ে থাকবে কিছু আসবাবপত্র, দেয়ালের মায়া
যেমন হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবার পর
সমস্ত অসুখ পড়ে থাকে

অসহ্য গরমের ভেতর লেবুর শরবত হাতে
ধানের গন্ধ, পুবালি বাতাসের গন্ধ এঁকে এঁকে

পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে তুলছ খাতায়

কেউ কেউ জানে—কিছু উড়ন্ত পাখির পালক
খসে-পড়া দেখে এরকম বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছি

যা নিয়ে এখন তুমুল তর্কবিতর্ক উঠছে
দোয়েল খুন করছে ফিঙেকে
রবীন্দ্রনাথ খুন করছে বর্ষাকে আর
আলেকজান্ডার নিজেই নিজের দিকে তরবারি তুলে
ঘেমে উঠছে ক্লিওপেট্রাকে ভেবে

হয়তো এই অনাকাক্সিক্ষত বদলির সিদ্ধান্তের কথা ভেবে
আমার চারদিক দিয়ে গড়ে তুলছ মোমের বাগান

আজ আমার নতুন জন্মদিন
সন্ধেবেলায় জ্বালানো হবে সকল মোমবাতি
আর পরক্ষণেই নিভে যাবে পৃথিবীতে আমার
সকল আলোর উপহার

রক্তের ধারা

মাছবাজারে যে মাছটির দরদাম নিয়ে
কথা কাটাকাটি হাতাহাতির দিকে যাচ্ছিল—
তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা
আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেল

তখন মস্তকবিহীন কাতলের অবশিষ্ট দেহের দিকে তাকাতেই
আমার সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে গেল

কাতলের যিনি প্রকৃত ক্রেতা ছিলেন
মানিব্যাগ থেকে মূল্য পরিশোধ করে বললেন—

“এ নিয়ে কিছু ভাববেন না হে
আজকাল মাছেরা যেভাবে রক্তপাত করতে শুরু করেছে
এভাবে চললে আপনি-আমি সবাই এমন রক্তে নেয়ে যাবো”

আর তৎক্ষণাৎ বাজারের সকল মৎস্যবিক্রেতা যার যার রক্তের ধারা
আবিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে গেল

কেউ বলল: আমি সেন বংশজাত, আমি পাল বংশোদ্ভূত, আমি...

এবং দেখা গেল, বাজারে যে ক’জন ক্রেতা ছিলেন
শুধু তারাই ছিলেন মীনবংশজাত

যারা নিজেরাই নিজেদের মাংস ভক্ষণ করতে
বাজারে এসে কথা কাটাকাটি থেকে রক্তারক্তি পর্যন্ত চলে যেতে পারে

ভাঙা টুল, সিংহাসন ও স্ত্রীবিষয়ক

এবার ঈদে তেমন কোনো আনন্দ নাই!

তাই আমার স্ত্রী
এবার বাংলা ফেলে
চাইনিজ রানছে
আর একা একা রান্নাঘরের ভেতরে বসে কাঁপছে—

এদিকে উনুনে গরম পানি, লেবুর রস
এক পেয়ালা মধু, আদার কুচি, লবণজলের গড়গড়া
আর ফুটন্ত পানির ভাপ...
তারা রান্নাঘরের সমস্ত চাইনিজ-প্রকার উল্টে দিয়ে
এক রকম ধোঁয়ার সিংহাসন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে

আমাকে দেখেই আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় স্ত্রী
তার ভাঙা টুলটি দেখিয়ে প্রচণ্ড ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল:
“এসব বদলাতে পারো না?
বসতে গেলেই খালি কটমট করে
জামা ছেঁড়ে, ওড়না ফাড়ে
আর সারাক্ষণ কেমন পড়ে যাবার ভয়!”

আমি তাকে শান্ত হতে বলি
বলি যে, আচ্ছা অন্তত আজকের দিনটা...
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরো খানিক খেঁকিয়ে উঠে বলে:
“এসব গাঁজাখুরি সংসার আমার ভাল্লাগে না, বুঝছ!
খালি নিজেরটা বুঝো
এই তুমিই-না একদিন কইছিলা— ‘শোনো, ভাঙা টুল আর
সিংহাসন—চরিত্রে একই রকম হয়!
সারাক্ষণই খালি পড়ে যাবার ভয়!’
এইবার বুঝছি তোমার চালাকি
তুমিও আমারে টুল থিক্যা ফালায়া হাত-পা ভাঙতে চাও
আর সিংহাসনচ্যুত রাজার মতো দুনিয়ার হতভাগা আর একা বানাতে চাও

আর সেই চান্সে একা একা তুমি মনের মতো গাছে গাছে পোস্টার ঝুলাবা জানি:
‘আহা কী নিঃসঙ্গতা’! ‘ও পরম একাকিত্ব’! ‘হে কবিতা’!”

সারল্যের চিত্রকল্প

এক পৃষ্ঠা কাগজ নিপুণ ভাঁজ করে
আমাদের পাঁচ বছর বয়সী কন্যা
আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল:

‘বলো তো বাবা, কী আছে এর ভিতর!’
আমি অনেক ভেবেচিন্তে বলার ভান করে, গম্ভীর
মুখভঙ্গি করে কিছুটা সময় নিয়ে বললাম—

‘জানি, একটি সকালবেলা আছে, দুটি ঘর আছে
ঘুমভাঙা আছে, তিনটি গাছ আছে’

সে আমাকে বললো, ঠিক। তবে গাছের কিন্তু চোখ আছে’
আমি সবিস্ময়ে দেখলাম, সত্যি সত্যি একটি গাছের ভেতর
উজ্জ্বল দুটি চোখ কী নির্ভার তাকিয়ে আছে!

পাশাপাশি দুটি ঘরের ছবি দেখিয়ে বললো:
‘দেখো ঘরেরও দুটি চোখ, চোখ দিয়ে তারা হাসে
আর গাছ দুটো আসলে ভূত, ভূতেরাও হাসে চোখ দিয়ে’

এসব কথা হয়তো আমরাও বলেছি শিশুবেলা: যেমন
মেয়েটি ছবিটা আঁকছিলো আর গুনগুন করে বলছিলো:
‘একটি সকালবেলা, দুজন ঘুমভাঙা মানুষ, দুটি ঘর
আর তিনটি গাছ’—যা আমি ওর মুখ থেকেই শুনেছি

আমরা কতো কথাই তো বলেছি মেয়েটির মতো
কিন্তু মনে রাখিনি কিছুই

আজকাল কবিতায় নতুন নতুন চিত্রকল্প বসাতে
ঘাম ঝরিয়ে দিই, কতো যে দুর্বোধ্য করে ভাবি!
কিন্তু কখনো কি ভাবি, গাছেরাও তাকিয়ে দেখতে পারে কিংবা
ঘরের মাথায় শোভা পেতে পারে মনোহর দুটি চোখ?

নিরন্তর হাসির সৌন্দর্য বাড়াতে মানুষ কতো রকম পরিচর্যা করে
একবার দাঁতের, একবার ঠোঁটের!
কিন্তু চোখ দিয়ে হাসির কথাটা কখনো কি ভেবে দেখে তারা?

অথচ মেয়েটি এই সব অসামান্য চিত্রকল্প মুহূর্তে এঁকে দিলো
শুধুই শিশুর সারল্য দিয়ে!

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/07Jan24/news/selected-32-3.jpg

শিল্পী: মনিরুল ইসলাম

অক্ষরেরা উড়ে উড়ে পাখি

কবিতায় পদ্য মেশাতে গিয়ে যে লোকটি ধরা পড়ে গেলো
দীর্ঘকাল ধরে তাকে আর দেখাই গেলো না

অথচ তার স্ত্রী বলছে, লোকটি ভালো মানুষের মতো ছিলো!
কন্যা বলছে, বাবার হাত যেন চন্দ্র-সূর্যেরস্রষ্টা!
আর প্রতিবেশি একদল পুরুষ:
যাদের কারো উঁচু বুক, লম্বা চুল, শার্ট ও কামিজের মাঝামাঝি পরিধেয় পরে
প্রতিদিনের মীমাংসা ঘটান
শুধু তারাই লোকটির প্রতিপক্ষ আজ!

সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যারা
মধ্যরাতে লোকটির কাছে খাবার পৌঁছে দেয়
তাদেরও আছে লোকলজ্জা, পুলিশের ভয়—

একদিন আমি নিশি রাইতে তাদের সঙ্গী হতে চাইলে
এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে আমাকে বলে:
‘ঘুমের সঙ্গে রাত্রি কিংবা দিনের সঙ্গে নিদ মেশানোর দায়ে
ধরা পড়ে যাবেন! মেনে নিতে হবে নির্বাসন!’

এসব কথার আগামাথা না বুঝেই আমি দুপাশে তাকিয়ে দেখি:
একদিকে জীবনানন্দ দাশ আর অন্যদিকে শক্তিদা’র মুখ
কেমন নির্ভার চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

আমারও দুঃসাহস বাড়ে
তাদের পিছে পিছে মধ্যরাতে ধরাপড়া লোকটির কাছে যাই
আমাকে দেখেই লোকটি হোহ হোহ করে প্রাণ খুলে হাসে, হাসে
এবং কাশে—
আর আমি তাকে বলি:

‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’!

প্রাকৃতিক সত্য

মায়ের মুখ থেকে শোনা প্রতিটি গল্পই
প্রাকৃতিক সত্যে ভরপুর

আমার মায়ের প্রতিটি উচ্চারণ এখন
কোথাও না কোথাও গভীর অরণ্য কিংবা
সামুদ্রিক অবয়ব নিয়ে বেঁচে আছে

জানি যে তাঁর প্রতিটি কথা কিংবা
একটিও বাক্যাংশ আমার স্মরণে থাকবার কথা নয়
কিন্তু তাঁর কবরের পাতাবাহার ও শেফালিফুলেরা
প্রত্যহ নিয়ম করে
বিচিত্র রঙ ও গন্ধ পাঠিয়ে থাকে—

ভেবে তাদের বলি—বলো দেখি প্রতিটি সূর্যাস্তকালে
আমার মায়ের মুখ কত দূরব্যাপী বিস্তৃত থাকে?

তখন কেউ কেউ যেমন তাঁর হাতের রান্নার
শংসা রচনা করে, কেউ কেউ আবার
মায়ের মুখে শোনা গল্পে পৃথিবীকে প্রাকৃতিক করে তোলে

শামসুল, হেমন্ত ও প্রাচীন জীর্ণ ঘড়ি

সমস্ত দিনের নিবিড় তাড়না ভাঁজ করে
সন্ধ্যার আপেক্ষিকতায় শামসুল আমাকে বসতে দিয়েছে নকশিকাথায়

আমি গুড়ের পট ধরে কালো পিঁপড়েদের উপরে ওঠার দৃশ্যে
নিজেকে মিলিয়ে নিয়ে যেই শামসুলকে হারিয়ে ফেললাম—
সে আমার সম্মুখে চার পা-ওয়ালা এক টেবিলের
জড় জীবনের ওপর দেয়াল ঘড়িটি খুলে এলোমেলো ছড়িয়ে দিলো

বললো, ঘড়িটির যন্ত্র-যন্ত্রাংশের ধুলায় হাত পড়লেই
ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে আমাদের মার্বেল খেলার দিন!
প্রতিটি কাঁটার তীক্ষ্ণতায় হাত পড়লেই রক্তাক্ত হয় কুয়াশাকূজন

যখন হেমন্ত সন্ধ্যার প্রথাঋদ্ধ চলায়
ঘুমন্ত নলখাগড়ায় ঝোপে
মুছে যেতে থাকে কুমার নদে টাটকিনি রেখায় ধরা পড়ার দিন—
তদ্রুত শামসুলের হাতে সকাল-বিকাল মধ্যাহ্নে
গাছগাছালির ছায়া ধরে আমাদের আশৈশব ক্ষণ গণনার দিনের একটি
চিত্র ধরিয়ে দিই; এবং সগর্বে বলি:

এখনো অঘ্রানে মাথায় মাফলার জড়িয়ে
সন্ধে হলে বোনের বাড়িতে নেমন্তন্নে যাই; আর ভোর হলে
ঘাসের শিশিরে পা না ভিজলে সূর্যই ওঠে না ব্যাপক সুলতানপুর

শামসুল আমাকে সান্ধ্যচাতালে ধানের মলনের পাশে
পুনর্বার দাঁড়াতে বলে জীর্ণ ঘড়িটি দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়

মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি

মিশেল ফুকো পাগলাগারদের বৃত্তান্ত বোঝেন
তার প্রতিটি অস্থিসন্ধির প্রলাপ—ভিসুভিয়াসের উত্তপ্ততায়
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে অকৃত্রিম অনুরাগীকুলে

পাশ্চাত্য-যৌনতার উন্মুক্ততা ও অবদমন বিষয়ক তর্ক কিংবা
স্বভাব মনোবিকলনকালে, যখন তিনি হেঁটে হেঁটে
আমাদের মধ্যরাত্রিক চেতনার উদ্যানজুড়ে বসিয়ে দেন মীমাংসা;—
আমরা কি তখন ততটাই প্রলাপমুখর গভীর তন্দ্রায়?

কিংবা আমাদের প্রতিদিনের কারাগারের অবিশ্বাস্য বোঝাপড়ায়
যখন মিশেল ফুকো দাম্পত্যে, প্রেমে, রান্নাঘরে, বাথরুমে
অফিসে, বক্তৃতায়, সংগ্রামে, সৈকতে—ঘরে ঘরে পাঠ্য হয়ে ওঠেন—
আমরা তখন ফুকোর চকচকে টাক উঠোনের আমগাছের ছায়ায়
বিছিয়ে নিয়ে দল বেঁধে দিবানিদ্রায় যাই—

আজ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যে দর্শন ও শল্যচিকিৎসার
করুণ পরিণতিজুড়ে একদিন আমাদেরও খোয়াবনামায়
জুড়ে বসেছিল মিশেল ফুকোর আসমান-সমান প্রকাণ্ড ছায়া

তবু ফুকো আমাদের প্রতিদিনের আসবাবপত্র ঝাড়মোছ
ঘষামাজায় কতটা কি যোগান না যোগান, তার চেয়ে বড়
তিনি আমাদের অগণিত প্রধান সড়কের পাশে পদ্মপাতার
অসংখ্য শুশ্রূষালয় ফেরি করে ফেরেন ফরাসি ভাষায়—

তখন আমি আমাদের অসামান্য কথাকার, মনোচিকিৎসক
মামুন হুসাইনের শরণাপন্ন হলে—তিনি আমাকে তার উপন্যাস
ও গল্পের বিভাষায় একটি টাকা আটকানোর রাবার বাঁহাতে লাগিয়ে
চলতেফিরতে ও সময়মতো টেনে আবার শরীরে ছুড়ে মারতে বলেন!
তাতে আমি যেমন চিৎকার করে সুস্থ হয়ে উঠি;
তেমনি দিনদিন মামুন হুসাইনের অন্ধ ভক্ত হয়ে—প্রতিদিন তার
কোলেপিঠে চড়ে মিশেল ফুকোর বেবাক গল্প শুনি

মায়াটান

মায়াটান একাই বেড়াতে আসে, হাসে—
তোমার কি বড়সড় ঘর, চোখমুখ, গ্রীবাকাঁধ সঙ্গে নিয়েই
ভ্রমণবিলাসী হওয়া যাবে?

দীর্ঘায়ু মুঠো করে আলোয় উড়িয়ে দেয়া মনোবল
এখনো কি বোতলে নিবদ্ধ জারক, মেঘের রুপালি জলে
অবিকল ফিরে পাওয়া যাবে?

এক হাতে বাঁশি আর তৃষ্ণা দুধে ভাতে
বলো তো পরিচ্ছন্ন ঘুমে স্বপ্নেরা খেয়েপরে
ঘুম ভেঙে বৈকালিক ভ্রমণে আসে কুমার নদের তীরে?

আমগাছ দীঘিতে ঝাঁপিয়ে পড়ায়, পাকুড়পাতা-নাও আর
ডিঙি নায়ে মাছ ধরে ঘরে ফিরে জ্বরের প্রকোপে পড়া—
এসব পুরনো খেলায় মায়াটান উদাস পোশাক পরে
শুয়ে আছে ঘুমের কঙ্কাল খুঁড়ে

বৃষ্টি তো কাপালিক নয়, বললাম
আর আমাদের কপাল ভিজিয়ে দিয়ে নদের কিনারে জিরিয়ে নেবে বেলা
তোমারও কত খেলা
দেখে দেখে এই মায়া এই অভ্যাসবশতা যা গলগ্রহ ছাড়া অন্য কিছু নয়
অন্তত তোমার কাছে

যখন এসেই পড়েছে, মায়াটান
ও যাদুবাস্তবতা তোমার চোখের ওপর আঙুল বুলিয়ে যাক
আর ওপরে তাকাও, দেখো কী কী ছুঁতে চায় মন
আর পড়ে যেতে যেতে তোমার দেহের কী হাল হলো...
তার চে’ বরং এই বেলা আবার মায়ায় জড়ানো যাক
কথা রাখো

যে গাঁয়ে সবাই রাজা

লাটিম নিয়ে খেলতে গিয়ে
পরাজয় থেকে আঁকতে শিখেছি বাঘ

অথচ কোনোদিন বাঘ বাঘ খেলিনি আমরা

আমাদের প্রহরা থাকত সুলতানপুর
ডালিমের মতো ভোর, মানুষে মানুষে মায়াবী প্রহর

ময়রা পট্টির সন্দেশ বিকোবার ঠোঙায়
সুদৃশ্য ভরাট শূন্য আঁকা ছিল—

গারোয়ানের শৈশবের খাতায় শূন্য দেখে
ঘরে ফিরে এঁকে ফেলি বিকল্প চাবুক

অথচ ঘোড়া ও চাবুক কোনোদিন খেলিনি আমরা

কত কী খেলে গেছি ‘প্রযত্নে : সুলতানপুর’ লিখে!
অনর্গল ফুটফাট, নামে-ধর্মে কত কী কাটাকুটি ছিল!

অথচ কাটাকুটিজুড়ে রক্তপাত ছিল না কোথাও

কী ভীষণ রাজায় রাজায় যুদ্ধ করেছি
অথচ সুলতানপুরের সিংহাসন
কখনো রাজার প্রয়োজনে ছিল না

সুলতানপুর, ১৯৭৭

ঘুমের ভেতর চিৎকার দিলে
বুকে টেনে নেন মা
আর মধ্যরাতের টিউকল থেকে অঝরে জল ঝরে পড়ে

আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি
ভোরবেলা জেগে উঠে মা’র জন্য হাহাকার করি রোজ
কলপাড়ে যাই, কান্নাভেজা চোখ ধুয়ে মাকে পৌঁছে দেই মালতী-শেফালী

মা আমার কবরের গভীরে শুয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে
বাড়িভর্তি আলো-হাওয়ায় একাকার হয়ে যান—

সন্ধেনাগাদ মিশে যান অন্ধকারের দেহে

আজো দেখি ঈশ্বরের সান্নিধ্যের চেয়ে
সন্তানের স্পর্শ অধিক ভালবাসেন মা

আর তাই সন্তানের দেখভালহেতু
প্রতিটি দিনরাত্রিকে কেমন বশ মানিয়ে নিয়েছেন

শূন্য বাড়ি পেলে—এ-ঘরে ও-ঘরে যান

মায়ের এপিটাফজুড়ে যতই উজ্জ্বল থাকুক
হাজেরা বেগম, সুলতানপুর
মৃত্যু : জানুয়ারি ১৯৭৭

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/07Jan24/news/selected-32-4.jpg

শিল্পী: কাইয়ুম চৌধুরী

ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই

বকুলফুল কুড়িয়ে এনে
মঙ্গলবারের অপেক্ষায় সোমবারের উঠোনে এসে দাঁড়াতাম

সোমবার ছিল আদরণীয় আর
মঙ্গলবার ঘিরে প্রচলিত ছিল নানা অমঙ্গলের কথা

শিশুমনে এই প্রথম অসামঞ্জস ঘটে যেতে দেখি—

বিদ্যায়তনের পাঠ একদিন কৈশোরক আঙুল উঁচিয়ে বলে
‘সবার উপরে মানুষ সত্য’

অথচ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি
মানুষের কোনো জীবনী তাতে নেই

পড়তে হয় সেন পাল মুঘল বাদশাহের প্রসিদ্ধ জীবনী

পৃথিবীতে এত এত সুলতানের কথা শুনি
অথচ সুলতানপুরে একজনও সুলতান মেলে না

বুকের ভেতর বাদানুবাদ ঘটে যেতে দেখি—

সুলতানপুরে থোকা থোকা হাড়জিরজিরে
অনাহারী, অর্ধাহারী মানুষের মুখ দেখে ভাবি
বৈপরীত্য লেখা থাকে যে কোনো স্বখ্যাত নামে

বাগানে ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই
অথচ ঝরে পড়ার আছে করুণ মর্মর ধ্বনি

সম্পাদকীয় নোট

কৃষ্ণচূড়ার বেদিতে যখন
একক বক্তৃতা দিতে দাঁড়াতাম

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায় শ্রোতা হতো
ভাতশালিক-দোয়েলের অঢেল কথকতা
এভাবে রচিত হতো সুলতানপুরের ক্যানভাসে
সম্পাদকীয় নোট

বৃক্ষপত্রে-বাকলে পত্রিকার শিরোনাম হতো
কানাকুয়োর কানকথা, ডাহুকের প্রসব বেদনা

আর আলোকচিত্র জুড়ে বসতো
ময়না-সারস টিয়ে-মাছরাঙার প্রেম

ফুলেদের জীবন ফুরাত দেবতার নৈবেদ্যে
আর মানুষ নিজেকে হারাত জনহিততায়

একক বক্তৃতার কোনো ধারাবিবরণী
কখনো কি ঠাঁই পেয়েছিল পাখিদের প্রচারযন্ত্রে!

ওবায়েদ আকাশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। ২৫ বছর ধরে একই পেশায় কাজ করছেন। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (বর্তমান সময়, ২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৩), দুরারোগ্য বাড়ি (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (বিশাকা, ২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (আগামী, ২০০৬), তারপরে, তারকার হাসি (আগামী, ২০০৭), শীতের প্রকার (বৃক্ষ, ২০০৮), ঋতুভেদে, পালকের মনোবৃত্তিগুলি (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০০৯), বিড়ালনৃত্য, প্রেতের মস্করা (শুদ্ধস্বর, ২০০৯), যা কিছু সবুজ, সঙ্কেতময় (ইত্যাদি, ২০১০), স্বতন্ত্র ৬০টি কবিতা (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (ইত্যাদি, ২০১১), ওবায়েদ আকাশের কবিতা ॥ আদি পর্ব (কাব্য সংকলন, জনান্তিক, ২০১১), শুশ্রূষার বিপরীতে (ধ্রুবপদ, ২০১১), রঙ করা দুঃখের তাঁবু (ইত্যাদি, ২০১২), বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, ইত্যাদি, ২০১৩), তৃতীয় লিঙ্গ (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, শুদ্ধস্বর, ২০১৩), উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল (বাংলা একাডেমি কর্র্তৃক প্রকাশিত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৩), হাসপাতাল থেকে ফিরে (কলকাতা, উদার আকাশ, ২০১৪), ৯৯ নতুন কবিতা (ইত্যাদি, ২০১৪) এবং বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল (বৃক্ষ, ২০১৪), পাতাগুলি আলো (ইত্যাদি, ২০১৬), মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি (ঐহিক, কলকাতা, ২০১৭), তথ্যসূত্র পেরুলেই সরোবর (মাওলা, ২০১৮), বাছাই কবিতা (নির্বাচিত কবিতা সংকলন, বেহুলা বাংলা ২০১৮), স্বতন্ত্র কবিতা (নির্বাচিত কবিতা সংকলন, ভাষাচিত্র ২০১৮) সর্বনামের সুখদুঃখ (ইত্যাদি, ২০১৯), শ্রেষ্ঠ কবিতা (বাছাই করা কবিতার সংকলন, অভিযান, কলকাতা, ২০১৯), পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর (অরিত্র, ২০২০) নির্জনতা শুয়ে আছে সমুদ্র প্রহরায় (শালুক, ২০২১) এবং কাগুজে দিন, কাগুজে রাত (বেহুলা বাংলা, ২০২২), নকশিকাঁথায় তুলেছিলে জাতকের মুখ (অভিযান, ২০২৩)।

অনুবাদ :

‘ফরাসি কবিতার একাল / কথারা কোনোই প্রতিশ্র“তি বহন করে না’ (ফরাসি কবিতার অনুবাদ, জনান্তিক, ২০০৯)
‘জাপানি প্রেমের কবিতা/ এমন কাউকে ভালবাস যে তোমাকে বাসে না’ (জাপানি প্রেমের কবিতা, জনান্তিক, ২০১৪)
গদ্যগ্রন্থ : ‘ঘাসের রেস্তরাঁ’ (বৃক্ষ, ২০০৮) ও ‘লতাপাতার শৃঙ্খলা’ (ধ্রুবপদ, ২০১২)

সম্পাদনা গ্রন্থ :
দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা (শিখা, ২০১২)
পাঁচ দশকে বাংলাদেশ : সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ ভাবনা / বিশিষ্ট কবি লেখক বুদ্ধিজীবীর সাক্ষাৎকার সংকলন (অরিত্র, ২০১৮)
সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন : শালুক (১৯৯৯-)। এ যাবত প্রকাশিত সংখ্যা ২৩টি।

পুরস্কার ও সম্মাননা:
‘শীতের প্রকার’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি পুরস্কার ২০০৮’;
‘শালুক’ সম্পাদনার জন্য ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯’।
এবং সামগ্রিক কাজের জন্য লন্ডন থেকে ‘সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১২’।
ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা পদক, কলকাতা, ২০১৬।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি লিটল ম্যাগাজিন সম্মাননা ২০২২। নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সম্মাননা ২০২৩।

ছবি

দূরের তারাটিকে

ছবি

একটি দুর্বিনীত নাশকতার অন্তিম চিৎকার

ছবি

যেদিন সুবিমল মিশ্র চলে গেলেন

ছবি

ফিরবে না তা জানি

ছবি

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’

ছবি

স্মৃতির অতল তলে

ছবি

দেহাবশেষ

ছবি

যাদুবাস্তবতা ও ইলিয়াসের যোগাযোগ

ছবি

বাংলার স্বাধীনতা আমার কবিতা

ছবি

মিহির মুসাকীর কবিতা

ছবি

শুশ্রƒষার আশ্রয়ঘর

ছবি

সময়োত্তরের কবি

ছবি

নাট্যকার অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৭৪

ছবি

মহত্ত্বম অনুভবে রবিউল হুসাইন

‘লাল গহনা’ উপন্যাসে বিষয়ের গভীরতা

ছবি

‘শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা’

ছবি

স্মৃতির অতল তলে

ছবি

মোহিত কামাল

ছবি

আশরাফ আহমদের কবিতা

ছবি

‘আমাদের সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণে আমাদেরই আগ্রহ নেই’

ছবি

ছোটগল্পের অনন্যস্বর হাসান আজিজুল হক

‘দীপান্বিত গুরুকুল’

ছবি

নাসির আহমেদের কবিতা

ছবি

শেষ থেকে শুরু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

স্মৃতির অতল তলে

ছবি

রবীন্দ্রবোধন

ছবি

বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি হয়ে ওঠার দীর্ঘ সংগ্রাম

ছবি

হাফিজ রশিদ খানের নির্বাচিত কবিতা আদিবাসীপর্ব

ছবি

আনন্দধাম

ছবি

কান্নার কুসুমে চিত্রিত ‘ধূসরযাত্রা’

সাময়িকী কবিতা

ছবি

ফারুক মাহমুদের কবিতা

ছবি

পল্লীকবি জসীম উদ্দীন ও তাঁর অমর সৃষ্টি ‘আসমানী’

ছবি

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’

ছবি

পরিবেশ-সাহিত্যের নিরলস কলমযোদ্ধা

tab

সাময়িকী

ওবায়েদ আকাশের বাছাই ৩২ কবিতা

রোববার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৪

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/21Jan24/news/shilpy-poet.jpg

বিনির্মাণ

আমাকে ডেকো না। যা কিছু শুকিয়ে গেছে রৌদ্রে, তার
সতর্ক দৃষ্টিতে খুঁজে নিয়েছি তোমাকে—

ভেতরে ভেতরে কিছু গরমিল তোমার প্রশান্ত সবুজ ফর্মুলা
ঐ অতীত থেকে লাভ দিয়ে গূঢ়ার্থ বিশ্বাস ভেঙে গেছে

এখন চাইলে প্রাজ্ঞ শিক্ষার্থী হয়েও মনস্ক বিজ্ঞানী হতে পারো না

এখন যা কিছু স্পর্শ করো অভিমানে লাল হয়ে যায়—
প্রতিটি বিকেলবেলা ঘাসে ঘাসে প্রবন্ধ রচনা করে
দীর্ঘশ্বাস পাড়ি দিতে এসে যে শহর জলে ডুবে গেল
তুমি তার ভাঙা ঢেউ কুড়িয়ে-বাড়িয়ে কতটা মহৎ হতে পারো?

আমাকে ডেকো না। নদীতীরে চৈতালি শস্যের দিকে
দৃষ্টি চলে যায়। কেউ নাকি মৃত ফসলের সুখে ভালবাসার নোঙর
বসিয়েছে। ভেবো না ওখানে ছিলাম বা থাকবো কখনো

তোমার শুকনো হাত-পা দুহাতে ধরে বুঝি, তারো বহু আগে
আমারই হৃৎপিণ্ড ভেঙে একঝাক শালিখের বেঁচে থাকা
নিশ্চিত হয়েছে। আবার কুমার নদে ভাসা কঙ্কালের
সারাংস পড়ে কিছু মাছ শিক্ষিত ও সদর্থ হয়েছে

আমাকে ডেকো না। প্রতিটি স্বর্ণ গোধূলি সাক্ষী

আমাদের কোনো অতীত ছিল না
আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোথাও কোনো ইশতেহার রচিত হয়নি

আমাকে ডেকো না। সুদূরে তাকাও। দেখো ঠিকরে বেরুচ্ছে রোদ
ও দুটি আমার হারিয়ে যাওয়া চোখ, তোমাকে দেখার স্পর্ধা

রূপনগর

রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস... এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল—এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।... রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে

বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ রোড নামকরণ হলো

আমার নাম দাও শিবপোকা। শিবপোকা মানে, একটি নতুন পোকার নামকরণের ক্ষমতা।... তুমি করো দোয়েলের চাষ। দোয়েল কি পরিযায়ী নাম? ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো সেবার বর্ষায় ছিল সাদারঙ হয়ে। আমি জানি, এ প্রকার জলসাদা ব্যাঙ পৃথিবীতে কখনো ছিল না। এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম। কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে।... তুমি করো দোয়েলের চাষ।... ভাল ছাইরঙ বোঝো।... মেটে কলসি, লাউয়ের খোঁড়লে কী গভীর সুর তুলে আনো। তোমাকে জানাই তাহলে, আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযত্নেরাখি ঘরের নিভৃত কোণে। তুমি তো জানো, কতটা বেসুরো হলে হাটের গুঞ্জন ওড়ে আকাশে বাতাসে

প্রকৃতিপুত্র

ভাবতে গেলে তুমিই একদিন
আমাদের হারানো শেকড়, হারানো চুল, বয়সভেদে
ছোট হয়ে আসা পরিত্যক্ত পোশাকের ধরন, ছায়াভিত্তিক
ঘাসের আকৃতি, বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকা মাঠ

আলের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ধানক্ষেতে পড়ে যাবার স্মৃতি—

একদিন ডেওয়া ফলের ঘ্রাণের মতো ফিরিয়ে দিতে পারো

যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম
মাছেদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রবাহ দেখে মনে হতো
ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাক্সের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ
আর যত্রতত্র অশ্বদৌড় দেখে মনে পড়ত
সেই সকল ক্রীতদাস ব্যবস্থার প্রবর্তক, যাদের
ঐসব দুরন্ত অশ্বের লেজে জুড়ে দিয়ে
ঘোরানো হচ্ছে কাঁটাঝোপ, বনবাদাড়, তপ্ত মরুভূমি—
একদিন আলোছায়ার নক্ষত্রের মতো
তুমিই তার ভালমন্দ, উঁচুনিচু শিখিয়ে নিতে পারো

যখন মাথার ওপর সুস্নিগ্ধ মেঘের পরিচ্ছদ দেখে
মনে হতো প্রাগৈতিহাসিক কুশলীরাজ কিংবা প্রাচীন গ্রীসীয়
স্থাপত্যপ্রেমিক কোনো রাজরাজড়ার মহান কীর্তির কথা—
কিংবা মনে পড়ে যেত—গাছে গাছে বিবিধ কূজন আর বর্ণালি ফলের
আস্ফালন দেখে ইবনে বতুতার চোখে অপ্সরী ও গন্ধর্বের পরম সংসার; আর
অতল সুখের এই পলিধৌত সুশীল রাজ্যের মতো স্বর্গীয় মাতৃভূমির কথা

ভাবতে গেলে একদিন তুমিই তার আগাপাছতলা দেখে ফেলেছিলে
আজ আবার পুনরুদ্ধারিত গৌরবের মতো

তারই কিছু গ্রহণ বর্জন সুখ স্মৃতি অনায়াসে তুলে ধরতে পারো জানি

গগণ ঠাকুর : গণিতজ্ঞ

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন
লিটল ম্যাগাজিনের দুর্মূল্য খাঁচায় তার নাম
যাদুঘরের প্রহরী বেষ্টিত উজ্জ্বল হয়ে আছে

জীবনে প্রথম তিনি ভাষাবিজ্ঞান থেকে নেমে
লোকসংস্কৃতির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন রিক্সার চাকা
তারপর নাটক সরণির মুখোশের কেনাবেচায়
গণিত বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন

এবং যে কোনো বাহাস কিংবা প্রথম প্রথম কবিতার খাতায়
ব্যাকরণ থেকে জ ফলা কিংবা নৈতিকতা থেকে ঐ ফলাগুলো
ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন বলে
একদা এ্যান্টি এশটাবলিশমেন্টের কয়েকজন তরুণ কর্মী
তাকে গভীর উৎসাহে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়

বলে, যে কোনো স্কুলিংয়ের নির্জনতায় জনসভার উত্তেজনা
কিংবা কফি হাউসের ছায়ায় সরাইখানার পরাপাঠ
রটিয়ে দিতে পারলেই তবে মুক্তি

কোনোদিন মুক্তি নেননি গগণ ঠাকুর
বরং দীর্ঘ কারাবাস কালে এ্যালজ্যাবরার প্লাসগুলো একদিকে
এবং বন্দিজীবনের নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তিগুলো একদিকে রেখে
প্রতিদিন ঘুমোতে অভ্যস্ত ছিলেন
একদিন যোগের সঙ্গে ভাগ এবং নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তির সঙ্গে
গুণীতকের গভীর সখ্যের দরুন তারা মধ্যরাতে হাত ধরে পালিয়ে চলে গেল

অথচ তিনি প্লাসের সঙ্গে মরালিটি এবং
মাইনাস ও একাকিত্বের সঙ্গে হিউম্যানিটির সমন্বয়গুলো
গভীর কাছ থেকে ভেবে এসেছিলেন—

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন। এ-মতো গাণিতিক সমস্যা
জীবনে এটাই প্রথম বলে তার মীমাংসা হেতু
নতুন কোনো লিটল ম্যাগাজিনের খাঁচার দিকে তাকিয়ে আছেন

মেটামরফসিস : মনিরুজ্জামান

ছিপি খুলে ঘুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মনিরুজ্জামান

কারা যেন দীর্ঘ ঘুম মুড়ি দিয়ে পড়েছিল চিলেকোঠার খাটে
এবং প্রস্থান কালে ঘুমের মুখে ছিপি এঁটে
পেরিয়ে গেছে প্রমোদ সরণি

আমাদের মনিরুজ্জামান তাতে আটকা পড়ে
কতগুলো পুকুরের চারা এবং অরণ্যের ডিম
সফল প্রজনন হেতু ফেলে এসেছে; এবং পুকুরের গায়ে
জলপাই শ্যাওলার এক প্রকাণ্ড চাদর প্রান্ত ধরে টেনে

শরীরে মুড়িয়ে লোকালয়ে ফিরে এসেছে

আজকাল তার সন্তানের প্রতি সিংহের মতোস্নেহ এবং
স্ত্রীর প্রতি ইঁদুরের মতো নিষ্কণ্টক ভালবাসা দেখে
কেউ কেউ তার নাম পাল্টে ফেরারি রেখেছে

গাঁগঞ্জের ফেরারি-মন মানুষেরা উঠতে-বসতে ঘুরতে-ফিরতে
সারাক্ষণ তাকে বন্দি করে রাখে
এবং ব্যক্তি মানুষেরা তার মতো আকস্মিক বদলে যেতে
কেউ বাঘের মতো কেউ ছারপোকার মতো অভিনয় করে
তার মনোযোগ খুঁজতে থাকে

শুধু মনে মনে ভাবে মনিরুজ্জামান:
এক জীবনে আর কতবার হারালে
একদিন শীতল বৃষ্টির মতো আকাশের করুণা কুড়নো যাবে!

একটি সাম্প্রতিক কবিতার খসড়া

গত শরতের দিকে

যথার্থই ভল লোক বলে তোমাদের নিমন্ত্রণ পেলাম
হাঁড়ি-কলসির নিশ্ছিদ্র সাজানো ফটকে
তোমাদের অভ্যর্থনা পায়ে পড়ে গেল
বলা হলো—

জাহাজ ছুটছে
ঢোল বাজছে
রুটিতেই আপনার প্রচণ্ড আসক্তি, তাই তো?
বললাম, ‘না’
তাহলে ভেতরে ঢুকুন
জানেন তো, কেরোসিনের ফলন ভাল
এ নিয়েই দুটো কথা বলা হোক

দেখছ যে, সিঁদুর রাঙানো ষাঁড়
ও থেকে আমরা রোজ কেরোসিন দুহাই
কেরোসিন খাই...

ট্রেন এসে যাচ্ছে, আমার শ্যাম্পুর পাতা?
এ সবই মায়ের জন্য উপহার
মা বলেন, ‘খ্যাতি নেই খাদ্য নেই
পারফিউমের গন্ধে আমার
উঁট্কি আসে বাবা’

যা দিনকাল, আপনারা সরুন তো
সুঘ্রাণ আসছে
সুঘ্রাণের জন্মদিন ছিল
আমার নেমন্তন্ন ছিল
সংবর্ধনা পায়ে পড়েছিল...

খাতায় মার্জিন টানুন... আমাদের ছবির মাপ নিন
আমার মায়ের নাম : কেওড়াজল
বাবা : গন্ধবণিক
পেশা : দিগ্বিজয়
—এভাবে ক্যাপশন দিন

...চলুন কাস্টমসের দিকে
সঙ্গে হোমিওপ্যাথ
বাবা ডাক্তার ছিলেন
ভাল মেয়ে দেখতে পারেন

স্যার, আমার ফাইলপত্রে
এক ডজন সুন্দরী বেড়াতে এসেছেন
গায়ে ডেটলের ঘ্রাণ, লাইকলি ইমিগ্রান্ট

ভাগ্যটা খুলে নিন স্যার

দ্রুত ফিরে চলুন, বাংলার টিচার
রোল-কল হবে
নো লেট-মার্ক
—টিচার, আপনার ছাত্রীদের ডাকে ধর্মঘট
কাল আসবো না
বাসায় বেড়াতে যাবো, থাকবেন টিচার?
সঙ্গে সংবর্ধনা
সুঘ্রাণ
বাবা-মা থাকবেন

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/07Jan24/news/selected-32-2.jpg

শিল্পী: কামরুল হাসান

আফিমের ঘ্রাণ পাচ্ছ?
দোতলার ছাদে আফিমের চাষ হয় খুব
ডবলডেকারে ওঠে
স্কুলে যায়
ভাল শিস্ দেয় মিনি স্কাট
ছাদে রোদ এলে পত্ পত্ ওড়ে পাজামার ফিতে

আর মনে পড়ে পঙ্কজ উদাস

হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া
জলতরঙ্গ...
বিটোফেন...
মোৎসার্ট
‘বেলা বোস তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?’
ডব্লিউ ডব্লিউ ডট অঞ্জন দত্ত ডট...
আহা প্রতুল-দা আলু ছোলা বেচে উজাড় করেছেন

কফি হাউসের রোদে
ফোলা ফোলা গাল বসে থাকে
মরুভূমির নাভি

ধারী ধারী পাছা
কাল আপনাকে দেবদাস ছবিতে দেখেছি
সংবর্ধনাকে ভাল চিনবার কথা আপনার
‘ইয়েস অনলি শি ইজ!’
চলুন মা’র কাছ থেকে ছুটি নিয়ে আসি

এত হাসি হাসি কথা কী করে বলেন?
আপনার বোগলের ঘ্রাণে বমি বমি লাগে
—কোলে তুলে নিন, ওজনে পাতলা
ভাল স্বাস্থ্য
একহারা
পছন্দ : এ্যাশ টি শার্ট
ব্ল্যাক জিন্স
হানড্রেড পাইপারস
প্রিন্স ইগোর
এ্যাবস্যুলুট
হোয়াইট মিশ্চেল
জ্যাক ড্যানিয়েল...
আর
ফোলা ফোলা গাল

একটি রং নাম্বার ডায়াল, হাসপাতাল!
রিয়েলি লোনলি ডাক্তার
পেইন কিলার প্লিজ...

—সিস্টার [নার্স] আপনার ফ্রকের হুঁকগুলো খুলে যাচ্ছে কেন?
—ম্যাডাম [ডাক্তার] আপনার এ্যাপ্রোনটি ভীষণ উড়ছে বাতাসে
আমার চশমাটা খুলুন
মাইনাস থ্রী পয়েন্ট ফাইভ [—৩.৫]
পূর্বপুরুষের ছিল
চশমাটা ভেঙে দিন, আপনার শুশ্রূষা
বড় প্রয়োজন
আরও শীঘ্র ভাল করে দিন

মা বকবেন
তিনি তো অফিস যান না কতদিন

সকাল সকাল শেভ হয়ে যাচ্ছে
ধোঁয়া উঠছে চায়ে
(মধ্য দুপুর... জলপাই-রং জীপ... হ্যান্ডকাপ...)

অভিযোগ :ক. রঙধনু দেখা
খ. দেদার গঙ্গার প্রবাহ অঙ্কন
গ. শীতবস্ত্রহীন
ঘ. বুকপকেটে প্রেমিকার চুম্বনের ছাপ
চ. শালপাতার বিড়ি



আমাকে গেট অব্দি পৌঁছে দিন
যাবজ্জীবন, সশ্রম...

প্রিয় শোক:
১. জীবনানন্দ দাশ
২. সমুদ্র ভ্রমণের দিনগুলি

বালাগাল উলাবে কামালিহি...
আপনাকে খুব সুফি সুফি লাগে
আপনি হারামির মতো মুখ ভার করে হাসেন
আপনি খুব পর্নো পড়েন
কিছুটা ঘুমিয়ে নিন
আপনার কিছু ঘুমের প্রয়োজন আছে
ঘুমের মধ্যে আপনি খুব মন খারাপ করেন

কেউ ফুটপাত ধরে হাঁটছে
যাবজ্জীবন ঘুমের কথা আপনার মনে পড়ছে নাতো!

বিসর্পিল প্ররোচনা

পুকুর থেকেই এই মাছ অনাস্থা দেখাল
রসুইঘর উত্তপ্ত বেহেশ্ত, আরাকান মাছি
সমুদ্রপাড় ডানায় তুলে ওড়ে; হাউস মেটাতে যারা বীচে যায়
এক ঠ্যাং উর্ধে তুলে তটের বেঞ্চিকে বলে, ‘তুমি শিরস্ত্রাণ’
তারাই জলধি সেচে—ব্যাগভর্তি নিয়ে যায় ডলফিন-চারা

ত্রিমাত্রিক রিবতিতে শরৎটা কেটে কেটে তুলে দিই পথে
একদিকে বুলেটের নখ ও সুচ্যগ্র স্তন, কামার্ত কম্পিত ভয়
একটা বিপুল তটরেখা ছিল, আর নেই, এই বিভক্ত শারদে

অনর্থ সাগরে টেনে আনা, দেহক্ষণে হোটেলের ঘ্রাণ, সঙ্গমের নুন
বহুকালের প্রাচীন প্রশ্নে সুঠাম নাবিক, অর্থে কেনা যৌনতার দিকে
উঁচিয়ে তুলছে ত্রাস, বিক্রিত রমণীর গোপন বিষাক্ত ব্যথায়
পোড়ে সহজিয়া, তবু শুভ্রতাও একাল-ওকাল ধরে জাগছে রসিকজনে

অর্বাচীন আবহাওয়া প্রকার, আর আমাদের মুদ্রিত মুখস্থ যাত্রা
কখনো বিভক্ত নয়; ঋতু আসে, আজকাল চরিত্রের অধিক ঋতুর অবক্ষয়

কাশফুলের বাসনা ফেলে একা কেন সঘন সৈকতে আসি?
আরাকান শোকেরাও বোঝে; সুইমিং বার্ড সন্তরণ ছাড়া
আর কোনো মীমাংসা বোঝে না তো

মুদ্রাঙ্কিত প্রতিটি মাছের আঁশটের নিচে সভ্যতার বিসর্পিল প্ররোচনা
একদিকে সূর্যোদয়—বিপরীতে জনপদ—কোলাহলে অস্থির জল্পনা

মুক্তি

আমার বিছানাসঙ্গীর গায়ের ওপর থেকে
চাদর সরিয়ে দেখি, সে ওখানে নেই!
একটি প্রাপ্তবয়স্ক আত্মজীবনী পড়ে আছে

কে যেন আমার দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাসের সঙ্গে
শয্যাসঙ্গীর অনুপস্থিতির বিবাহ পরিয়ে দিল—
তারা যখন তুমুল সঙ্গমে ব্যস্ত, আমি আত্মজীবনীর
একটি একটি পাতা খুলছি আর
নতুন নতুন পাতা এসে ভারি করে তুলছে স্মৃতি—

তারা আমাকে সঙ্গমে আহ্বান করছে—আর
আমি তাদের মুক্তির কথা ভেবে
পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো ছিঁড়ে
উন্মুক্ত উচ্ছ্বাসে উড়িয়ে দিচ্ছি

অভ্যাসবশত ভোরবেলা—আমাদের সন্তান যখন
আমার গায়ের চাদর ধরে টান দিল—
দেখল, আমাদের দু’জনের কেউই তখন
নেই ওখানে!

মনে মনে ভাবলাম, প্রত্যেকের মুক্তির জন্য
কেউ-না-কেউ একজন থাকেই প্রান্তরে

ধীরেন্দ্র আর ভুশার নস্টালজিয়া

‘ধিরে, সুখ নাই।’
[ভুশার একমাত্র ঘোড়াটি গতরাতে চুরি হয়ে গেছে। কিংবা ধারণা করা যায়, এ মুষল বৃষ্টিতে ঘোড়াটির দুরন্ত শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়।]

‘কেন?’ —বলল ধীরেন্দ্র।
আবার ধীরেন্দ্র কয়, ‘তোর থেকে ত্রি-দন্ত চতুর কেউ একজন ঘোড়াটির আজকাল খোঁজখবর নেয়।’

‘ধিরে, এখন কী করি?’
‘যত দূর জানা আছে, তার কিছু তথ্য বের করি।’
[তথ্যে বেরিয়ে পড়ে, এ ভরা শ্রাবণে, তিনিও ঘোড়ায় চেপে হঠাৎই ছুটছেন নাকি সোমত্ত কৈশোরের দিনে।]

‘মাঝি, কোন ঘাটে ভিড়বে তোমার তরী?’
[নদীতীরে ধীরেন্দ্র আর ভুশা, তাদেরও শৈশবের দু’টি টিকিট যদি মেলে!]
মাঝি বলে, ‘আপনারা ব্যাটা নাকি ছেলে?’
এ ওর দিকে চায়, তারপর ধীরেন্দ্র বলে— ‘মুশকিলে পড়িলে ভুশা, মাঝিও মনের কথা রঙ ধরিয়ে বলে।’

অভিনেতা তীর্থঙ্কর

তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে

তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে
চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে

সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়
তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক
সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়
তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো:
ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল

আর এখন তাতে ফল ধরবে—যা পেড়ে খেতে
তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের

নয়াশতাব্দি

সুবাস্তিনা, গৌরবর্ণ, ত্রিভাষী, সুচ্ছায়া—
ব্যাকরণ বিষয়ক তর্কে ডিলিট, অবিশ্বাস্যইমেজারি, আদতে মঙ্গোলীয়
আমার সমস্ত দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে

ভাঁজ খোলার আগেই জানাচ্ছে কার্বণসমতে তার হৃদয়স্থ—

শরীর থেকে সুলতানপুরের সমস্ত গন্ধ খুলে জানতে চাই
একুশ শতকের পর গ্রামবাংলার রূপরূপান্তর!

সুবাস্তিনা, দশ তলায় ডবল ডেকার থেকে হাত তুলছে
তাকে সবাই ভাবছে, বজ্রনিরোধক সুখ, কালপুরুষ—
জানাচ্ছে, বৃক্ষের পরে বৃক্ষ সাজাতে গেলেকোমরে করাত লাগে
শতবর্ষী কাণ্ডের উন্মুক্ত স্তনের উষ্ণতা লাগে দরজার চৌকাঠে

এবং যেভাবে দশতলায় গাছের পাতা ঝরছে, বর্ষায় জমির আল
ভেসে যাচ্ছে, কদম ফুলের পাপড়িতে গড়াগড়ি খাচ্ছে শৈশব
কী আর বলি, ওখানে আমিও ছিলাম চল্লিশ বছর পিছনের
রিমোট কন্ট্রোলে— এভাবে সমস্ত ঋতু শরবতের মতো গিলে নিচ্ছে নীলাকাশ

সুবাস্তিনা, পিঠে কৈ মাছের ঝাঁক, কাতরাচ্ছে
পাললিক সম্ভাবনার স্বপ্নে সয়ে যাচ্ছে একান্ত ব্যথা

আজ সমস্ত রাত অন্তত পঁচিশ তলা উঁচুতে বিমান বন্দর
সাঁঝবাতি জ্বলে ওঠার আনন্দে নক্ষত্র ফুটিয়েছে প্রতিটি গ্রাম
প্লেন উঠছে নামছে, গঞ্জের হাটে বিকিকিনি হচ্ছে ইলিশ, ডেওয়া ফলের ওম

একুশ শতক ফুরোবার আগেই সুবাস্তিনাসর্বোচ্চ ভবন লাফিয়ে মাটিতে পড়ে গেল
তার হাতের মুঠোয় পাকুড়-জঙ্গল, নদীমাতৃকতা, ধান-ফসলের অপার বাংলাদেশ

যে যার মতো কৈশোরে ফিরে জানাল—নয়াশতাব্দির সরল সম্ভাবনা!

বৃষ্টির জন্য

বৃষ্টির ওপর ঘোড়া চাপিয়ে
বিদ্যালয় ঘরে নিয়ে এলো বাবা

মায়ের উৎকণ্ঠা তখন
টিফিনের মাছগুলো ভিজে জলে নেমে গেলে
আজ অনাহারে থাকত ছেলেটা!

বাবা ভাবছে, আর এমন হলে
মাছের ছেলেমেয়েগুলো
পুনর্বার ফিরে পেত তাদের বাবা-মায়ের ওম

এমন বৈপরীত্য সত্ত্বেও আজ
দীর্ঘকাল পর পেছনের জংধরা শাহী দরজাটা
বৃষ্টির জন্য খুলে দিল তারা

গৃহবন্দি

মধ্যরাতে কে যেন এসে আমাদের বাড়ির ঘরগুলো
হাত-পা মুড়ে বেঁধে রেখে গেছে এবং
বারান্দাগুলো লুকিয়ে রেখেছে অদৃশ্য ছায়ায়

ভোর হতে না হতেই লোকজন আসছে, চেনাজানা আত্মীয়-পরিজন
তারা চোরের মতো বাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ ফিরে যায়
কেউবা বিস্মিত হয়ে অদৃশ্য ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লে
পায়ের নিচ থেকে কঁকিয়ে ওঠে লুকানো বারান্দাগুলো

যখন ঘরের দিকে এগিয়ে এসে শক্ত করে বাঁধা
রশিগুলো খুলতে যাচ্ছে, ভেতর থেকে হৈ হৈ করে হাসছে
গৃহবন্দি পরিবারের বাপ-মা, শিশু-যুবা—তাবত মানুষ

তারা ফিঙের মতো ঘর থেকে লাফিয়ে বেরুচ্ছে আনন্দে এবং
ঘরগুলোর যত্রতত্র যেসব ক্ষতে রক্ত ঝরছে
জলে ধুয়ে লাগিয়ে দিচ্ছে কবরেজের দেয়া আরোগ্য-মলম
ব্যক্তিগত ব্যবহৃত ঘরে টেনে তুলে জুড়ে নিচ্ছে শায়িত অলিন্দমালা

আমি শুধু একমাত্র জন ইঁদুরের গর্তে পা আটকে যাওয়ায়
শত চেষ্টাতেও ঘর থেকে বেরুতে পারছি না

বাড়ির মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত হয়েছে, খাচ্ছেদাচ্ছে
ঘুমাচ্ছে-জাগছে—শুধু একই ঘরে থেকে
আমার গগনবিদারি চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না

এ-সংসারের রক্তমাংসের একজন মানুষ আছে কি নেই
কতকাল হলো কারও কিছু মনেই পড়ছে না

জাতিসংঘের মরচেধরা চাবির জন্য কবি আবুল হাসানের কোনোই দুঃখ ছিল না

ভাল আছি, খুব ভাল আছি? আবুল হাসান। রাত্রিদিন পৃথক পালঙ্কে শুয়ে অচিকিৎস্য আরোগ্যের পাশে তোমাকে দেখাচ্ছে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। রাজা যায় রাজা আসে আর আমাদের মাঠভর্তি ধানক্ষেত দীর্ঘকাল অরক্ষিত থেকে এবার বানের জলে ভাসে। যে তুমি হরণ করো তার টিকিটি ধরে একবার পচাডোবা এঁদো পুকুরের জলে নিক্ষেপ করে প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিলে— এইবার দীর্ঘদিন তোমার লক্ষ্মী বোনটিকে নিরুপদ্রবে লাল শাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে বৈকি। অথচ তার নগ্ন নিমিত্ত দেখো : একদিন তোমার নিজের চিবুকের কাছেও ভীষণ একা হয়ে গেলে। আর একদিন এইসব অসহ্য সুন্দর তোমাকে মানিয়ে গেলেও— জাতিসংঘ তোমাকে মেনে নিতে পারেনি কখনো। আর সেই থেকে ভাবতে বসে গেলে : দুঃখের কোনো মাতৃভাষা থাকতে নেই কেন। কেবলই লাবণ্য ধরে— এমন পাথর, তার হিতাহিত ধরে টান দিতে গিয়ে একদিন মৃত্যু এসে তোমাকে নিয়ে গেল আবুল হাসান। তোমার বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, ততদিন তোমার বাংলায় কোনো মৃত সুন্দরীকে গোর দিতে দেখেছিলে বলে মনে করতে পারছ না ভেবে— পুলিশ ও মানুষের মধ্যে যথার্থ বৈষম্যজ্ঞান তোমার আমৃত্যুই থেকে গিয়েছিল। তোমার উদিত দুঃখের দেশে পানপাতা হলুদ হতে হতে আমরা তো ভুলে গেছি নিসর্গের প্রকৃত বানান। তবু ভেবে দেখি, বেশ ভাল আছি (?), তুমি কেমন আছ আবুল হাসান!

কবি উৎপলকুমার বসু প্রতিদিন রেলগাড়ির জানালা দিয়ে দেখা একের পর এক অভাবিত দৃশ্যে বাংলা কবিতার পারম্পর্য খোঁজেন

অরণ্য টিলার উপরে মাছবাজারে বসে কবি উৎপলকুমার বসু হেরিকেনের দরদাম করেন। দীর্ঘকাল সামুদ্রিক মফস্বলে থেকে পরার্থপর মৃত্তিকার দিগন্ত নির্দেশে আজ তাঁকে বাংলা কবিতার হাল ফ্যাশনের চিরনৈমিত্তিক গাউনে আবৃত দেখা যায়। আফিম বীজের চেয়ে পরিণতিহীন লক্ষ্যে ভ্রমণের এই অনিবার্য দিনগুলি তাঁর কখনো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অপার সিন্ধুর জলে তেরো বার স্নান করে ওঠে। আর সেই থেকে দৃশ্যত ধাতুর গলানো চাঁদ তরল ফোঁটায় ঝরে পর্বতচূড়ায়। উৎপলকুমার বসু প্রতিদিন গরিয়াহাট পিছনে ফেলে শিয়ালদা হয়ে হাওড়া আবার হাওড়া থেকে শিয়ালদা অব্দি ঘুরতে ঘুরতে নতুন কোনো আততায়ীর খোঁজে উঠে বসেন ট্রেনের কামরায়, এবং জানালা গলিয়ে একের পর এক অভাবিত নতুন দৃশ্যে যারপরনাই হারিয়ে ফেলেন কবিতার গাণিতিক পারম্পর্য। এই এক ভাবনাবিচ্ছিন্ন কবি— বসন্তে— কেবল পাতার শব্দে জেগে উঠে আগুপিছু কিছু না ভেবেই চিরঅজ্ঞাত লোচনদাস কারিগরের হাতে ছেড়ে দেন তাঁর সমস্ত কবিতার ভার। এবং তৎক্ষণাৎ অবজ্ঞাত হন যে, একমাত্র টুসুই তাঁর চিন্তারাজ্যের ভবিষ্য সম্রাজ্ঞী। একদিন হাসপাতাল ঘেঁটে সমগ্র বাংলা কবিতা থেকে পশ্চিমবঙ্গীয় কঙ্কালগুলো খুলে নিলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে আবার কবিতায় ইংরেজের রাজত্ব ফিরে আসে— অগত্যা এই দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ড প্রবাসকালে কবিতার প্রতিটি শব্দের জন্য তিনি বাংলাকেই নিরাপদ আশ্রয় ভেবে নিলেন— যেমন মায়ের কোলে শিশু। একবার ভরদুপুরে ভাতঘুমের প্রস্তুতিকালে শেক্সপিয়র তাঁর হাত ধরে এই অবসরে কোনো বীমা কোম্পানির দালাল হবার পরামর্শ দিলে আত্মাপমানে প্রায় বছর কুড়ি কাল তিনি পঞ্চাশের কবিতার মধ্যবিত্ত বারান্দা থেকে আপাত অবসরে যান। তৎক্ষণাৎ কতিপয় অনাথ বালক তাদের কোনো অভিভাবকের নিখোঁজ হওয়া সন্দেহে গভীর অরণ্য চারণে আগ্রহী হলে— হঠাৎ লতার আড়াল থেকে ডাক আসে— কুহু। আর তাকে নির্ঘাৎ গুপ্তচর ভেবে বালকেরা সোল্লাসে ঘোষণা করে— স্নিগ্ধ তুমি, প্রথম রাত্রির চাঁদ— অস্তে ভ্রমাকুল। বকের পালকে লেখা আবার পুরী সিরিজ থেকে উদ্ধৃত করে উৎপলদা বলেন— এবার বসন্তে দেখো— পেয়ে যাবো সেলাই মেশিন। পৃথিবীর মহত্ত্বম অস্থিরতা সংকলনে পুরী সিরিজের কিছু হাড়মাংস পোড়াবার কালে জেগে ওঠে তাঁর হস্তচালিত প্রাণতাঁত, মেশিনলুম। মুখোমুখি, ঘাসের জঙ্গলে পড়ে থাকা নিরক্ষর বেশ্যাদের চিঠিগুলি থেকে এই সব পোড়াগন্ধ অনেকে আন্দাজ করে নাক চেপে কিছুক্ষণ বাগানে ঘোরেন। কিংবা অদূরে ঘুম আর বোঝাপড়ার মাঝখানে ধ্বনিবহুল ধানক্ষেতের আড়াল তুলে উড়ে যায় যুদ্ধক্লান্ত মানুষের খণ্ডবৈচিত্র্যের দিন। আজকাল সালমাজরির কাজ বুঝে নিয়ে যারা কিছু একটা করেকেটে খায়— হঠাৎ পরিদর্শনে আগত পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষাধিকারিক বাথরুমে গেলে নাইটস্কুলের খোলা চত্বরে তাদের জন্য যথার্থই উপভোগ্য হয় কহবতীর নাচ। একা একা কিংবা অদৃশ্য শরীরচিহ্নে যে সকল সুখ দুঃখের সাথী ধূসর আতাগাছ ঘিরে একপ্রকার এক্সিবিশন পরিকল্পনা করে— আমাদের নিজস্ব সংবাদ প্রতিবেদক বর্ষার রূপমুগ্ধ হয়ে— বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে— জলে নেমে মীনযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ায়— পৃথিবীর কোনো সংবাদ মাধ্যমেই এ সংবাদ পরিবেশিত হতে দেখা যায় না। কতিপয় বিদুৎচালিত তাঁত এবং দরিদ্র জনপদ ঘিরে আভাঁগার্দ কবিদের শ্রবণ ও ঘ্রাণেন্দ্রিয় বিদ্যুতের তাপে মেপে নিতে গিয়ে সৌরলতায় জ্বলে গেছে সমস্ত সংসার। তারো বহু আগে— নিয়মিত বিরতির পর কাঁপা হাতে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি বয়ে এনেছিলেন পৃথিবীতে অহিংস মানবধার্মিক— অন্নদাতা জোসেফ

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় শেষ জীবনে স্ত্রীদের মাইনেরওপর নির্ভরতা কমাতে বলেছিলেন

কাছেপিঠে কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই একটি সোনার মাছি খুন করে পাড়াময় পুলিশের রামরাজ্য কায়েম করে বসেন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের চেয়েও মহান কোনো অভিভাবক। একবার তাঁর ডান হাতে ধারালো ছুরি বসিয়ে বিভাজন করে দেখেছি— তিনি অনর্গল শেকল ছিঁড়তে পারেন, ঘুমাতে পারেন কাটা হাত নিয়ে এবং ঘুমাতে যাবার আগে-পরে যখন নিয়ম করে কবিতা লিখতে যান— তাঁর বিভাজিত হাত মেঘমুক্ত আকাশের মতো অজস্র তারকায় ভরে ওঠে। তাঁর চোখ দুটো রিক্ত হ্রদের মতো কৃপণ করুণ বলে কেউ প্রশ্ন করলে আত্মাভিমানে বাড়ি ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে পড়ে অচেনা দরজায় কড়া নেড়ে বলেন— অবনি বাড়ি আছ? তারপর হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাথ বদল হলে পানশালার মানুষগুলো বমি-করা গা মুছে নিয়ে বহুদূর বাড়ির দিকে যায়। এমন প্রচ্ছন্ন স্বদেশ— কেবল পাতালে টেনেছে বলে যারা ভাববার শুধু ভাবে— ভাত নেই, পাথর রয়েছে কেবল— এই দেশে তবু কবিতার তুলো ওড়ে? আর যারা আনন্দের বিহ্বল ঘোড়ায় চড়ে বলে, সুখে আছি, ছিন্নবিচ্ছিন্ন আছি— তারা তো সেই— যারা ধর্মেও থাকেন জিরাফেও থাকেন। যাদের পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি একদিন ঝড় এসে শূন্যে মিলিয়ে নিয়ে যায়— পরক্ষণেই শোনা যায়— প্রভু নষ্ট হয়ে যাই। আর একদিন যখন ঈশ্বর থাকেন জলে, কক্সবাজারে সন্ধ্যা নেমে এলে আমরা ও কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘ও চির প্রণম্য অগ্নি’ বলে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি গভীর ভাটায়; এবং পরস্পর হিতাহিত হারিয়ে ফেলে কেউ যখন শুনি— কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছে— আর, চাঁদ ও চিতাকাঠ ডাকে আয় আয়— বলি, যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো? ঘরে যে চির প্রতীক্ষায় আছে সন্তানের মুখ

কবি জীবনানন্দ দাশ প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে ট্রামের লাইনে চমৎকার চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন

কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ ঘুরে মধ্যরাতে স্ত্রী লাবণ্য দাশের তৎকালীন নারী জীবনের স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। শোনা যায় : বিদূষী লাবণ্য দাশ উনুনের পাশে শুয়েবসে কী করে শীতরাত্রির গল্প ফেঁদে কাঁচামাটির পাত্রের মতো আগুনে পুড়িয়ে নিতে পারতেন। আর পুরোটা জীবনের এ দীর্ঘ অবসরে জীবনানন্দ দাশ অভাবিত সোনার ডিম উনুনে তুলে কিছু তাঁর জীবদ্দশায় আর বাকিগুলো তাঁর মৃত্যুর পর আপামর পাঠকের জন্য পরিবেশন করে যান। আমরা তাঁর কাছে বনলতা সেনের অনেক গল্প শুনি। তবু, কোনো এক মানবীর মনে তাঁর ঠাঁই না হবার অপার বেদনার কথায় এতোটুকু বিচলিত কেউ নই; কারণ, একবার সুরঞ্জনা অন্য যুবকের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে বনলতা বিষয়ে এক গভীর জটিলতা তৈরি করে বসেন। আর তাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, ভাবনার পূর্ব থেকেই তিনি কখনো বনলতাকে একক মানবীর মর্যাদা দিতে পারেননি। কলকে পাড় শাড়িতে জড়িয়ে যে কিশোরী সন্ধে হলে ঘরে ধূপ দিতে যায় প্রতিদিন; অথবা যে অনিবার্য মানবী এক শোভনা, সুদূর দিল্লিতে বসে উজানের স্রোতের তীব্রতায় টানেন সর্বদা নিমগ্ন খুব পুরুষ হৃদয়— বরং তাকে ঘিরেই তাঁর জীবনে নারীপ্রেম সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা করা যায়। এবং ধারণা করা যায় যে, এরই পরিণতিতে তিনি হায় চিল নামের কবিতাটি লিখে থাকতে পারেন, এবং আমার সকল গান তবু তোমারেই লক্ষ্য করে— বলে তাঁর ভালোবাসার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটান। আশৈশব তিনি জলসিড়ি, বিশালাক্ষীর তীরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন— আমার মতন আর নাই কেহ! আমার পায়ের শব্দ শোনো— নতুন এ— আর সব হারানো— পুরনো। যেহেতু তিনিই কেবল ঘাইহরিণীর প্রতি অপার মমতা হেতু একদিন ক্যাম্পে লিখে গভীর সমালোচিত হন; নির্জন খড়ের মাঠে পৌষ সন্ধ্যায় হেঁটে হেঁটে রচনা করেন বাঙালির পরিভাষা— রূপসী বাংলার প্রগাঢ়তা আর তুমুল হেমন্ত ভাষা। সেই হেতু এই মহাপৃথিবীতে যার যেখানে সাধ চলে গেলেও তিনি এই বাংলার ’পরেই আমৃত্যু থেকে যেতে অভিলাষী হন। আবার বছর কুড়ি পরে— হারানো মানুষীর সাথে দেখা হয়ে গেলে— এই কাশ-হোগলার মাঠের ভেতরেই যেন দেখা যায় তারে— অথবা হাওয়ার রাতে— যেন দেখা হয় এশিরিয়ায়, মিশরে-বিদিশায় মরে যাওয়া রূপসীরা যখন এই বাংলার আকাশে কাতারে কাতারে নক্ষত্রের সমুজ্জ্বল সংসার রচনা করে— তেমনি তারার তিমিরে। আবার আট বছর আগের একদিন— কল্পনার নক্ষত্রচূড়ায় এক মৃতের গল্প রচনা করে বলেন— তবু জানি— নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ— নয় সবখানি;— অর্থ নয় কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয়— আরো এক বিপন্ন বিস্ময়— আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে— খেলা করে;— আমাদের ক্লান্ত করে— ক্লান্ত— ক্লান্ত করে। জীবনানন্দ দাশ নিশিথের অন্ধকারে সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ঘুরে ঘুরে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ বিবেচনা করে বলেন— ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে... ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে... উপেক্ষা সে করেছে আমারে— অথবা জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র অধ্যাপনা ও সম্পাদনা জীবনের প্রগাঢ় বেদনাময় মুহূর্তে নিতান্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাঁর কিছু উৎকৃষ্ট রচনার নামকরণ ধূসর পাণ্ডুলিপি করে অনায়াসে পাড়ি দেন বাংলা কবিতার ঊষর উদ্যান। একবার খুঁজতে খুঁজতে নক্ষত্রতিমিরে— জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা— বলে যখন সরোজিনীর অবস্থান নির্ণয়ে একপ্রকার ধোঁয়াশায় পতিত হন— আত্মাভিমানে নিজেও ঝরা পালকের মতো ঝরে যেতে চান শুকনো পাতা ছাওয়া ঘাসে— জামরুল হিজলের বনে— কিংবা নক্ষত্র সকাশে। এই তাঁর ঝরে যাবার অভিলাষ হয় আমগ্ন কাব্য জীবনের এক অনিবার্য টান। যেহেতু তাঁর ট্রামের নিচের জীবন এমনই ইশতেহার রচনা করেছে যে, যে জীবন দোয়েলের শালিখের— মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা— ফলে, কার্তিকের নরম নরম রোদে— এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক সাদা বক— এই দৃশ্য দেখে ফেলে যে, আমাদের গহন গভীরের কবি জীবনানন্দ দাশ— এবার মানুষ নয়, ভোরের ফড়িং তারে দেখা যায়— উড়ে উড়ে খেলা করে বাংলার মুখর আঙিনায়—

হাসপাতাল

সারাক্ষণ অশ্রু ছলছল হাসপাতালের অনিশ্চিত দু’চোখ

হাসপাতালে যেতে কারও জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না
হাসপাতালের বাহু দীর্ঘ প্রসারিত আর
দৃষ্টিগুলো স্নিগ্ধ পুকুরের জলে পদ্মপাতার মেঘ

হাসপাতালের যাবতীয় লেনদেন শেষ করে দেখি
পড়ে আছে হলুদ বিছানার মতো দীর্ঘ দুটি মাস
সেখানে অতীত এসে গল্প জুড়ত, মৃত্যু এসে খেলা করত
আর সব কিছু ছাপিয়ে বেড়াত স্ত্রী-পুত্র সংসারের মায়া

প্রায়শই মধ্যরাতে হাসপাতাল আমাকে টেনে তুলে
এক নিভৃত কোণে নিয়ে বলত:
আমি কি এখনও মায়া হরিণের মতো কারও দিকে তাকালেই সে
হু হু করে কান্না করে ওঠে? কিংবা কখনও
গভীর রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি হাসপাতাল ছেড়ে
শান্ত দিঘির জলে গা ডুবিয়ে
একপ্রকার নির্বাসিত জীবনযাপনের কথা ভাবছি?

তখন হাসপাতালের কাঁধে হাত রেখে—যাকে বলে
গলায় গলায় বন্ধুত্ব করে, সারাজীবনের কবিতায়
উন্মোচিত শৈশবের দিকে ইঙ্গিত করে নিয়ে যেতে থাকি

তারপর দুরন্ত যৌবনে শাহবাগ, জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি
চারুকলা, টিএসসির মোড় হয়ে মধ্যরাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
গাজার পুরিয়া খুলে টানতে টানতে কখন যে ভোর হয়ে যায়!

দেখি ভোর হতে না হতেই অজস্র মৃত্যু আর আরোগ্যের বোঝা মাথায় করে
নিরহঙ্কার মানুষের মতো চুপচাপ বিনিদ্র থাকে হাসপাতাল

বদলি

এখান থেকে বদলি হয়ে গেলে
পড়ে থাকবে কিছু আসবাবপত্র, দেয়ালের মায়া
যেমন হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবার পর
সমস্ত অসুখ পড়ে থাকে

অসহ্য গরমের ভেতর লেবুর শরবত হাতে
ধানের গন্ধ, পুবালি বাতাসের গন্ধ এঁকে এঁকে

পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে তুলছ খাতায়

কেউ কেউ জানে—কিছু উড়ন্ত পাখির পালক
খসে-পড়া দেখে এরকম বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছি

যা নিয়ে এখন তুমুল তর্কবিতর্ক উঠছে
দোয়েল খুন করছে ফিঙেকে
রবীন্দ্রনাথ খুন করছে বর্ষাকে আর
আলেকজান্ডার নিজেই নিজের দিকে তরবারি তুলে
ঘেমে উঠছে ক্লিওপেট্রাকে ভেবে

হয়তো এই অনাকাক্সিক্ষত বদলির সিদ্ধান্তের কথা ভেবে
আমার চারদিক দিয়ে গড়ে তুলছ মোমের বাগান

আজ আমার নতুন জন্মদিন
সন্ধেবেলায় জ্বালানো হবে সকল মোমবাতি
আর পরক্ষণেই নিভে যাবে পৃথিবীতে আমার
সকল আলোর উপহার

রক্তের ধারা

মাছবাজারে যে মাছটির দরদাম নিয়ে
কথা কাটাকাটি হাতাহাতির দিকে যাচ্ছিল—
তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা
আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেল

তখন মস্তকবিহীন কাতলের অবশিষ্ট দেহের দিকে তাকাতেই
আমার সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে গেল

কাতলের যিনি প্রকৃত ক্রেতা ছিলেন
মানিব্যাগ থেকে মূল্য পরিশোধ করে বললেন—

“এ নিয়ে কিছু ভাববেন না হে
আজকাল মাছেরা যেভাবে রক্তপাত করতে শুরু করেছে
এভাবে চললে আপনি-আমি সবাই এমন রক্তে নেয়ে যাবো”

আর তৎক্ষণাৎ বাজারের সকল মৎস্যবিক্রেতা যার যার রক্তের ধারা
আবিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে গেল

কেউ বলল: আমি সেন বংশজাত, আমি পাল বংশোদ্ভূত, আমি...

এবং দেখা গেল, বাজারে যে ক’জন ক্রেতা ছিলেন
শুধু তারাই ছিলেন মীনবংশজাত

যারা নিজেরাই নিজেদের মাংস ভক্ষণ করতে
বাজারে এসে কথা কাটাকাটি থেকে রক্তারক্তি পর্যন্ত চলে যেতে পারে

ভাঙা টুল, সিংহাসন ও স্ত্রীবিষয়ক

এবার ঈদে তেমন কোনো আনন্দ নাই!

তাই আমার স্ত্রী
এবার বাংলা ফেলে
চাইনিজ রানছে
আর একা একা রান্নাঘরের ভেতরে বসে কাঁপছে—

এদিকে উনুনে গরম পানি, লেবুর রস
এক পেয়ালা মধু, আদার কুচি, লবণজলের গড়গড়া
আর ফুটন্ত পানির ভাপ...
তারা রান্নাঘরের সমস্ত চাইনিজ-প্রকার উল্টে দিয়ে
এক রকম ধোঁয়ার সিংহাসন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে

আমাকে দেখেই আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় স্ত্রী
তার ভাঙা টুলটি দেখিয়ে প্রচণ্ড ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল:
“এসব বদলাতে পারো না?
বসতে গেলেই খালি কটমট করে
জামা ছেঁড়ে, ওড়না ফাড়ে
আর সারাক্ষণ কেমন পড়ে যাবার ভয়!”

আমি তাকে শান্ত হতে বলি
বলি যে, আচ্ছা অন্তত আজকের দিনটা...
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরো খানিক খেঁকিয়ে উঠে বলে:
“এসব গাঁজাখুরি সংসার আমার ভাল্লাগে না, বুঝছ!
খালি নিজেরটা বুঝো
এই তুমিই-না একদিন কইছিলা— ‘শোনো, ভাঙা টুল আর
সিংহাসন—চরিত্রে একই রকম হয়!
সারাক্ষণই খালি পড়ে যাবার ভয়!’
এইবার বুঝছি তোমার চালাকি
তুমিও আমারে টুল থিক্যা ফালায়া হাত-পা ভাঙতে চাও
আর সিংহাসনচ্যুত রাজার মতো দুনিয়ার হতভাগা আর একা বানাতে চাও

আর সেই চান্সে একা একা তুমি মনের মতো গাছে গাছে পোস্টার ঝুলাবা জানি:
‘আহা কী নিঃসঙ্গতা’! ‘ও পরম একাকিত্ব’! ‘হে কবিতা’!”

সারল্যের চিত্রকল্প

এক পৃষ্ঠা কাগজ নিপুণ ভাঁজ করে
আমাদের পাঁচ বছর বয়সী কন্যা
আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল:

‘বলো তো বাবা, কী আছে এর ভিতর!’
আমি অনেক ভেবেচিন্তে বলার ভান করে, গম্ভীর
মুখভঙ্গি করে কিছুটা সময় নিয়ে বললাম—

‘জানি, একটি সকালবেলা আছে, দুটি ঘর আছে
ঘুমভাঙা আছে, তিনটি গাছ আছে’

সে আমাকে বললো, ঠিক। তবে গাছের কিন্তু চোখ আছে’
আমি সবিস্ময়ে দেখলাম, সত্যি সত্যি একটি গাছের ভেতর
উজ্জ্বল দুটি চোখ কী নির্ভার তাকিয়ে আছে!

পাশাপাশি দুটি ঘরের ছবি দেখিয়ে বললো:
‘দেখো ঘরেরও দুটি চোখ, চোখ দিয়ে তারা হাসে
আর গাছ দুটো আসলে ভূত, ভূতেরাও হাসে চোখ দিয়ে’

এসব কথা হয়তো আমরাও বলেছি শিশুবেলা: যেমন
মেয়েটি ছবিটা আঁকছিলো আর গুনগুন করে বলছিলো:
‘একটি সকালবেলা, দুজন ঘুমভাঙা মানুষ, দুটি ঘর
আর তিনটি গাছ’—যা আমি ওর মুখ থেকেই শুনেছি

আমরা কতো কথাই তো বলেছি মেয়েটির মতো
কিন্তু মনে রাখিনি কিছুই

আজকাল কবিতায় নতুন নতুন চিত্রকল্প বসাতে
ঘাম ঝরিয়ে দিই, কতো যে দুর্বোধ্য করে ভাবি!
কিন্তু কখনো কি ভাবি, গাছেরাও তাকিয়ে দেখতে পারে কিংবা
ঘরের মাথায় শোভা পেতে পারে মনোহর দুটি চোখ?

নিরন্তর হাসির সৌন্দর্য বাড়াতে মানুষ কতো রকম পরিচর্যা করে
একবার দাঁতের, একবার ঠোঁটের!
কিন্তু চোখ দিয়ে হাসির কথাটা কখনো কি ভেবে দেখে তারা?

অথচ মেয়েটি এই সব অসামান্য চিত্রকল্প মুহূর্তে এঁকে দিলো
শুধুই শিশুর সারল্য দিয়ে!

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/07Jan24/news/selected-32-3.jpg

শিল্পী: মনিরুল ইসলাম

অক্ষরেরা উড়ে উড়ে পাখি

কবিতায় পদ্য মেশাতে গিয়ে যে লোকটি ধরা পড়ে গেলো
দীর্ঘকাল ধরে তাকে আর দেখাই গেলো না

অথচ তার স্ত্রী বলছে, লোকটি ভালো মানুষের মতো ছিলো!
কন্যা বলছে, বাবার হাত যেন চন্দ্র-সূর্যেরস্রষ্টা!
আর প্রতিবেশি একদল পুরুষ:
যাদের কারো উঁচু বুক, লম্বা চুল, শার্ট ও কামিজের মাঝামাঝি পরিধেয় পরে
প্রতিদিনের মীমাংসা ঘটান
শুধু তারাই লোকটির প্রতিপক্ষ আজ!

সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যারা
মধ্যরাতে লোকটির কাছে খাবার পৌঁছে দেয়
তাদেরও আছে লোকলজ্জা, পুলিশের ভয়—

একদিন আমি নিশি রাইতে তাদের সঙ্গী হতে চাইলে
এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে আমাকে বলে:
‘ঘুমের সঙ্গে রাত্রি কিংবা দিনের সঙ্গে নিদ মেশানোর দায়ে
ধরা পড়ে যাবেন! মেনে নিতে হবে নির্বাসন!’

এসব কথার আগামাথা না বুঝেই আমি দুপাশে তাকিয়ে দেখি:
একদিকে জীবনানন্দ দাশ আর অন্যদিকে শক্তিদা’র মুখ
কেমন নির্ভার চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

আমারও দুঃসাহস বাড়ে
তাদের পিছে পিছে মধ্যরাতে ধরাপড়া লোকটির কাছে যাই
আমাকে দেখেই লোকটি হোহ হোহ করে প্রাণ খুলে হাসে, হাসে
এবং কাশে—
আর আমি তাকে বলি:

‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’!

প্রাকৃতিক সত্য

মায়ের মুখ থেকে শোনা প্রতিটি গল্পই
প্রাকৃতিক সত্যে ভরপুর

আমার মায়ের প্রতিটি উচ্চারণ এখন
কোথাও না কোথাও গভীর অরণ্য কিংবা
সামুদ্রিক অবয়ব নিয়ে বেঁচে আছে

জানি যে তাঁর প্রতিটি কথা কিংবা
একটিও বাক্যাংশ আমার স্মরণে থাকবার কথা নয়
কিন্তু তাঁর কবরের পাতাবাহার ও শেফালিফুলেরা
প্রত্যহ নিয়ম করে
বিচিত্র রঙ ও গন্ধ পাঠিয়ে থাকে—

ভেবে তাদের বলি—বলো দেখি প্রতিটি সূর্যাস্তকালে
আমার মায়ের মুখ কত দূরব্যাপী বিস্তৃত থাকে?

তখন কেউ কেউ যেমন তাঁর হাতের রান্নার
শংসা রচনা করে, কেউ কেউ আবার
মায়ের মুখে শোনা গল্পে পৃথিবীকে প্রাকৃতিক করে তোলে

শামসুল, হেমন্ত ও প্রাচীন জীর্ণ ঘড়ি

সমস্ত দিনের নিবিড় তাড়না ভাঁজ করে
সন্ধ্যার আপেক্ষিকতায় শামসুল আমাকে বসতে দিয়েছে নকশিকাথায়

আমি গুড়ের পট ধরে কালো পিঁপড়েদের উপরে ওঠার দৃশ্যে
নিজেকে মিলিয়ে নিয়ে যেই শামসুলকে হারিয়ে ফেললাম—
সে আমার সম্মুখে চার পা-ওয়ালা এক টেবিলের
জড় জীবনের ওপর দেয়াল ঘড়িটি খুলে এলোমেলো ছড়িয়ে দিলো

বললো, ঘড়িটির যন্ত্র-যন্ত্রাংশের ধুলায় হাত পড়লেই
ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে আমাদের মার্বেল খেলার দিন!
প্রতিটি কাঁটার তীক্ষ্ণতায় হাত পড়লেই রক্তাক্ত হয় কুয়াশাকূজন

যখন হেমন্ত সন্ধ্যার প্রথাঋদ্ধ চলায়
ঘুমন্ত নলখাগড়ায় ঝোপে
মুছে যেতে থাকে কুমার নদে টাটকিনি রেখায় ধরা পড়ার দিন—
তদ্রুত শামসুলের হাতে সকাল-বিকাল মধ্যাহ্নে
গাছগাছালির ছায়া ধরে আমাদের আশৈশব ক্ষণ গণনার দিনের একটি
চিত্র ধরিয়ে দিই; এবং সগর্বে বলি:

এখনো অঘ্রানে মাথায় মাফলার জড়িয়ে
সন্ধে হলে বোনের বাড়িতে নেমন্তন্নে যাই; আর ভোর হলে
ঘাসের শিশিরে পা না ভিজলে সূর্যই ওঠে না ব্যাপক সুলতানপুর

শামসুল আমাকে সান্ধ্যচাতালে ধানের মলনের পাশে
পুনর্বার দাঁড়াতে বলে জীর্ণ ঘড়িটি দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়

মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি

মিশেল ফুকো পাগলাগারদের বৃত্তান্ত বোঝেন
তার প্রতিটি অস্থিসন্ধির প্রলাপ—ভিসুভিয়াসের উত্তপ্ততায়
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে অকৃত্রিম অনুরাগীকুলে

পাশ্চাত্য-যৌনতার উন্মুক্ততা ও অবদমন বিষয়ক তর্ক কিংবা
স্বভাব মনোবিকলনকালে, যখন তিনি হেঁটে হেঁটে
আমাদের মধ্যরাত্রিক চেতনার উদ্যানজুড়ে বসিয়ে দেন মীমাংসা;—
আমরা কি তখন ততটাই প্রলাপমুখর গভীর তন্দ্রায়?

কিংবা আমাদের প্রতিদিনের কারাগারের অবিশ্বাস্য বোঝাপড়ায়
যখন মিশেল ফুকো দাম্পত্যে, প্রেমে, রান্নাঘরে, বাথরুমে
অফিসে, বক্তৃতায়, সংগ্রামে, সৈকতে—ঘরে ঘরে পাঠ্য হয়ে ওঠেন—
আমরা তখন ফুকোর চকচকে টাক উঠোনের আমগাছের ছায়ায়
বিছিয়ে নিয়ে দল বেঁধে দিবানিদ্রায় যাই—

আজ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যে দর্শন ও শল্যচিকিৎসার
করুণ পরিণতিজুড়ে একদিন আমাদেরও খোয়াবনামায়
জুড়ে বসেছিল মিশেল ফুকোর আসমান-সমান প্রকাণ্ড ছায়া

তবু ফুকো আমাদের প্রতিদিনের আসবাবপত্র ঝাড়মোছ
ঘষামাজায় কতটা কি যোগান না যোগান, তার চেয়ে বড়
তিনি আমাদের অগণিত প্রধান সড়কের পাশে পদ্মপাতার
অসংখ্য শুশ্রূষালয় ফেরি করে ফেরেন ফরাসি ভাষায়—

তখন আমি আমাদের অসামান্য কথাকার, মনোচিকিৎসক
মামুন হুসাইনের শরণাপন্ন হলে—তিনি আমাকে তার উপন্যাস
ও গল্পের বিভাষায় একটি টাকা আটকানোর রাবার বাঁহাতে লাগিয়ে
চলতেফিরতে ও সময়মতো টেনে আবার শরীরে ছুড়ে মারতে বলেন!
তাতে আমি যেমন চিৎকার করে সুস্থ হয়ে উঠি;
তেমনি দিনদিন মামুন হুসাইনের অন্ধ ভক্ত হয়ে—প্রতিদিন তার
কোলেপিঠে চড়ে মিশেল ফুকোর বেবাক গল্প শুনি

মায়াটান

মায়াটান একাই বেড়াতে আসে, হাসে—
তোমার কি বড়সড় ঘর, চোখমুখ, গ্রীবাকাঁধ সঙ্গে নিয়েই
ভ্রমণবিলাসী হওয়া যাবে?

দীর্ঘায়ু মুঠো করে আলোয় উড়িয়ে দেয়া মনোবল
এখনো কি বোতলে নিবদ্ধ জারক, মেঘের রুপালি জলে
অবিকল ফিরে পাওয়া যাবে?

এক হাতে বাঁশি আর তৃষ্ণা দুধে ভাতে
বলো তো পরিচ্ছন্ন ঘুমে স্বপ্নেরা খেয়েপরে
ঘুম ভেঙে বৈকালিক ভ্রমণে আসে কুমার নদের তীরে?

আমগাছ দীঘিতে ঝাঁপিয়ে পড়ায়, পাকুড়পাতা-নাও আর
ডিঙি নায়ে মাছ ধরে ঘরে ফিরে জ্বরের প্রকোপে পড়া—
এসব পুরনো খেলায় মায়াটান উদাস পোশাক পরে
শুয়ে আছে ঘুমের কঙ্কাল খুঁড়ে

বৃষ্টি তো কাপালিক নয়, বললাম
আর আমাদের কপাল ভিজিয়ে দিয়ে নদের কিনারে জিরিয়ে নেবে বেলা
তোমারও কত খেলা
দেখে দেখে এই মায়া এই অভ্যাসবশতা যা গলগ্রহ ছাড়া অন্য কিছু নয়
অন্তত তোমার কাছে

যখন এসেই পড়েছে, মায়াটান
ও যাদুবাস্তবতা তোমার চোখের ওপর আঙুল বুলিয়ে যাক
আর ওপরে তাকাও, দেখো কী কী ছুঁতে চায় মন
আর পড়ে যেতে যেতে তোমার দেহের কী হাল হলো...
তার চে’ বরং এই বেলা আবার মায়ায় জড়ানো যাক
কথা রাখো

যে গাঁয়ে সবাই রাজা

লাটিম নিয়ে খেলতে গিয়ে
পরাজয় থেকে আঁকতে শিখেছি বাঘ

অথচ কোনোদিন বাঘ বাঘ খেলিনি আমরা

আমাদের প্রহরা থাকত সুলতানপুর
ডালিমের মতো ভোর, মানুষে মানুষে মায়াবী প্রহর

ময়রা পট্টির সন্দেশ বিকোবার ঠোঙায়
সুদৃশ্য ভরাট শূন্য আঁকা ছিল—

গারোয়ানের শৈশবের খাতায় শূন্য দেখে
ঘরে ফিরে এঁকে ফেলি বিকল্প চাবুক

অথচ ঘোড়া ও চাবুক কোনোদিন খেলিনি আমরা

কত কী খেলে গেছি ‘প্রযত্নে : সুলতানপুর’ লিখে!
অনর্গল ফুটফাট, নামে-ধর্মে কত কী কাটাকুটি ছিল!

অথচ কাটাকুটিজুড়ে রক্তপাত ছিল না কোথাও

কী ভীষণ রাজায় রাজায় যুদ্ধ করেছি
অথচ সুলতানপুরের সিংহাসন
কখনো রাজার প্রয়োজনে ছিল না

সুলতানপুর, ১৯৭৭

ঘুমের ভেতর চিৎকার দিলে
বুকে টেনে নেন মা
আর মধ্যরাতের টিউকল থেকে অঝরে জল ঝরে পড়ে

আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি
ভোরবেলা জেগে উঠে মা’র জন্য হাহাকার করি রোজ
কলপাড়ে যাই, কান্নাভেজা চোখ ধুয়ে মাকে পৌঁছে দেই মালতী-শেফালী

মা আমার কবরের গভীরে শুয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে
বাড়িভর্তি আলো-হাওয়ায় একাকার হয়ে যান—

সন্ধেনাগাদ মিশে যান অন্ধকারের দেহে

আজো দেখি ঈশ্বরের সান্নিধ্যের চেয়ে
সন্তানের স্পর্শ অধিক ভালবাসেন মা

আর তাই সন্তানের দেখভালহেতু
প্রতিটি দিনরাত্রিকে কেমন বশ মানিয়ে নিয়েছেন

শূন্য বাড়ি পেলে—এ-ঘরে ও-ঘরে যান

মায়ের এপিটাফজুড়ে যতই উজ্জ্বল থাকুক
হাজেরা বেগম, সুলতানপুর
মৃত্যু : জানুয়ারি ১৯৭৭

https://sangbad.net.bd/images/2024/January/07Jan24/news/selected-32-4.jpg

শিল্পী: কাইয়ুম চৌধুরী

ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই

বকুলফুল কুড়িয়ে এনে
মঙ্গলবারের অপেক্ষায় সোমবারের উঠোনে এসে দাঁড়াতাম

সোমবার ছিল আদরণীয় আর
মঙ্গলবার ঘিরে প্রচলিত ছিল নানা অমঙ্গলের কথা

শিশুমনে এই প্রথম অসামঞ্জস ঘটে যেতে দেখি—

বিদ্যায়তনের পাঠ একদিন কৈশোরক আঙুল উঁচিয়ে বলে
‘সবার উপরে মানুষ সত্য’

অথচ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি
মানুষের কোনো জীবনী তাতে নেই

পড়তে হয় সেন পাল মুঘল বাদশাহের প্রসিদ্ধ জীবনী

পৃথিবীতে এত এত সুলতানের কথা শুনি
অথচ সুলতানপুরে একজনও সুলতান মেলে না

বুকের ভেতর বাদানুবাদ ঘটে যেতে দেখি—

সুলতানপুরে থোকা থোকা হাড়জিরজিরে
অনাহারী, অর্ধাহারী মানুষের মুখ দেখে ভাবি
বৈপরীত্য লেখা থাকে যে কোনো স্বখ্যাত নামে

বাগানে ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই
অথচ ঝরে পড়ার আছে করুণ মর্মর ধ্বনি

সম্পাদকীয় নোট

কৃষ্ণচূড়ার বেদিতে যখন
একক বক্তৃতা দিতে দাঁড়াতাম

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায় শ্রোতা হতো
ভাতশালিক-দোয়েলের অঢেল কথকতা
এভাবে রচিত হতো সুলতানপুরের ক্যানভাসে
সম্পাদকীয় নোট

বৃক্ষপত্রে-বাকলে পত্রিকার শিরোনাম হতো
কানাকুয়োর কানকথা, ডাহুকের প্রসব বেদনা

আর আলোকচিত্র জুড়ে বসতো
ময়না-সারস টিয়ে-মাছরাঙার প্রেম

ফুলেদের জীবন ফুরাত দেবতার নৈবেদ্যে
আর মানুষ নিজেকে হারাত জনহিততায়

একক বক্তৃতার কোনো ধারাবিবরণী
কখনো কি ঠাঁই পেয়েছিল পাখিদের প্রচারযন্ত্রে!

ওবায়েদ আকাশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। ২৫ বছর ধরে একই পেশায় কাজ করছেন। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (বর্তমান সময়, ২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৩), দুরারোগ্য বাড়ি (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (বিশাকা, ২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (আগামী, ২০০৬), তারপরে, তারকার হাসি (আগামী, ২০০৭), শীতের প্রকার (বৃক্ষ, ২০০৮), ঋতুভেদে, পালকের মনোবৃত্তিগুলি (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০০৯), বিড়ালনৃত্য, প্রেতের মস্করা (শুদ্ধস্বর, ২০০৯), যা কিছু সবুজ, সঙ্কেতময় (ইত্যাদি, ২০১০), স্বতন্ত্র ৬০টি কবিতা (কাব্য সংকলন, বৃক্ষ, ২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (ইত্যাদি, ২০১১), ওবায়েদ আকাশের কবিতা ॥ আদি পর্ব (কাব্য সংকলন, জনান্তিক, ২০১১), শুশ্রূষার বিপরীতে (ধ্রুবপদ, ২০১১), রঙ করা দুঃখের তাঁবু (ইত্যাদি, ২০১২), বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, ইত্যাদি, ২০১৩), তৃতীয় লিঙ্গ (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, শুদ্ধস্বর, ২০১৩), উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল (বাংলা একাডেমি কর্র্তৃক প্রকাশিত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৩), হাসপাতাল থেকে ফিরে (কলকাতা, উদার আকাশ, ২০১৪), ৯৯ নতুন কবিতা (ইত্যাদি, ২০১৪) এবং বর্ষণসিক্ত হাসপাতাল (বৃক্ষ, ২০১৪), পাতাগুলি আলো (ইত্যাদি, ২০১৬), মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি (ঐহিক, কলকাতা, ২০১৭), তথ্যসূত্র পেরুলেই সরোবর (মাওলা, ২০১৮), বাছাই কবিতা (নির্বাচিত কবিতা সংকলন, বেহুলা বাংলা ২০১৮), স্বতন্ত্র কবিতা (নির্বাচিত কবিতা সংকলন, ভাষাচিত্র ২০১৮) সর্বনামের সুখদুঃখ (ইত্যাদি, ২০১৯), শ্রেষ্ঠ কবিতা (বাছাই করা কবিতার সংকলন, অভিযান, কলকাতা, ২০১৯), পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর (অরিত্র, ২০২০) নির্জনতা শুয়ে আছে সমুদ্র প্রহরায় (শালুক, ২০২১) এবং কাগুজে দিন, কাগুজে রাত (বেহুলা বাংলা, ২০২২), নকশিকাঁথায় তুলেছিলে জাতকের মুখ (অভিযান, ২০২৩)।

অনুবাদ :

‘ফরাসি কবিতার একাল / কথারা কোনোই প্রতিশ্র“তি বহন করে না’ (ফরাসি কবিতার অনুবাদ, জনান্তিক, ২০০৯)
‘জাপানি প্রেমের কবিতা/ এমন কাউকে ভালবাস যে তোমাকে বাসে না’ (জাপানি প্রেমের কবিতা, জনান্তিক, ২০১৪)
গদ্যগ্রন্থ : ‘ঘাসের রেস্তরাঁ’ (বৃক্ষ, ২০০৮) ও ‘লতাপাতার শৃঙ্খলা’ (ধ্রুবপদ, ২০১২)

সম্পাদনা গ্রন্থ :
দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা (শিখা, ২০১২)
পাঁচ দশকে বাংলাদেশ : সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ ভাবনা / বিশিষ্ট কবি লেখক বুদ্ধিজীবীর সাক্ষাৎকার সংকলন (অরিত্র, ২০১৮)
সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন : শালুক (১৯৯৯-)। এ যাবত প্রকাশিত সংখ্যা ২৩টি।

পুরস্কার ও সম্মাননা:
‘শীতের প্রকার’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি পুরস্কার ২০০৮’;
‘শালুক’ সম্পাদনার জন্য ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯’।
এবং সামগ্রিক কাজের জন্য লন্ডন থেকে ‘সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১২’।
ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা পদক, কলকাতা, ২০১৬।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি লিটল ম্যাগাজিন সম্মাননা ২০২২। নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সম্মাননা ২০২৩।

back to top