alt

সাময়িকী

অমর স্রষ্টা

অদ্বৈত মল্লবর্মণ

শ্যামল নাথ

: বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১
image

অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রতিকৃতি : চারু পিন্টু

অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলাদেশে জন্মেছিলেন। তাঁর শিক্ষাদীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এখানেই। তাঁর সাহিত্যভাবনা ও গবেষণার মৌল-উপাদান উপকরণও সংগৃহীত হয়েছে পূর্ব বাংলার জীবন ও জগৎ থেকে। শিল্প-স্রষ্টার যে মনন অদ্বৈতর, তাও গড়ে ওঠে বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে। জগৎ ও জীবনের একান্ত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এই রূপকল্প বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অসামান্য। অথচ বাংলাদেশ থেকে অদ্বৈত মল্লবর্মণের কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। তাঁর চিন্তাচর্চার জন্য গড়ে ওঠেনি জাতীয় পর্যায়ের কোনো সংগঠন। কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাঙালি সাহিত্যকদের মধ্যে অদ্বৈত নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন। রবীন্দ্র-নজরুল-অদ্বৈত কেবল একটি নাম নয়, এখন তাঁরা এক একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলা সাহিত্যে এমন সম্মান লাভকারী কবি-সাহিত্যকদের নাম খুঁজতে গেলে দুইশ’ বছরের মধ্যে কজনকে পাওয়া যাবে? রবীন্দ্রনাথের পূর্বে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র এবং পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্র ছাড়া আর কাকে আনা যায় যে, একক একটি নামের পতাকাতলে গোটা বাংলাভাষী মানুষের বৃহদাংশ সমবেত হয়েছেন বা জমায়েত হতে ভালোবেসেছেন? কিন্তু এই স্মরণীয়দের মধ্যেও অদ্বৈত ছিলেন হতদরিদ্র, অব্যবস্থিত, ঐতিহ্যহীন পরিবারের ছেলে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদী সংলগ্ন গোকর্ণঘাট গ্রামে নিঃস্ব-রিক্ত ‘জেলে’-পিতা অধরচন্দ্র মলল্লবর্মণের পর্ণকুটিরে ১ জানুয়ারি ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশবেই তিনি পিতা-মাতা ও ভাইবোনকে হারিয়ে চরম মর্মন্তুদ এতিম-এ পরিণত হন। অর্থ-বিত্ত-ঐতিহ্য আত্মীয়-পরিজনহীন অদ্বৈতর বাল্য ও কৈশরকাল অতিক্রম করা এবং শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে কী রকম নিদারুণ করুণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা সহজে অনুমেয়। অসীম ধৈর্য সহকারে প্রচণ্ড মেধাবী, মরমীমনের, সৃজনশীল প্রতিভা অদ্বৈত নিজেকে চিনিয়েছিলেন বলেই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে তিনি অতিক্রম করে গিয়েছিলেন নিজের পরিবেশকে। ‘মানুষ শুধুই প্রাকৃতিক নিয়ম-শৃঙ্খলে বাধা অবস্থার দাস নয়। মানুষের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই শক্তিও, যে শক্তির বলে মানুষ অবস্থার প্রভুও হতে পারে।’ অদ্বৈত এই মহাজন বাক্যকে বাস্তবে পরিণত করেছিলেন। জীবন শিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণের সামাজিকে ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা তেমন হয়নি বললেই চলে। কিন্তু অদ্বৈত রচনার বিষয়বস্তু, চরিত্রাবলী ও সংলাপ এর মতো তাঁর সামাজিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। কর্মজীবনে সাংবাদিক বা সম্পাদক ব্রত নিয়ে লিখিত ‘সাহিত্য’কর্মের মধ্যে এ পর্যন্ত কেবল ‘নবশক্তির’ সম্পাদকীয় স্তম্ভগুলো, তিনটি উপন্যাস, কতিপয় কবিতাসহ আরো কিছু লেখালেখি করেছেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লিখে বাংলা সাহিত্যে অমরতা লাভ করেছেন। কিন্তু ১৯৫১ সালে মৃত্যুরও প্রায় এক যুগ পর পর্যন্ত তিনি বিস্মৃতির অন্তরালেই ছিলেন। ১৯৫৬ সালে গ্রন্থাকারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছেপে বের করার পর এটি সুধীজনের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে

পূর্ববঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত নিম্নবর্গের হিন্দু হিসেবে তাঁর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণ ও ধর্ম বৈষম্যবোধ বা বিকার বিকৃতি সৃষ্টি করতে পারেনি। এক অসামান্য নির্লিপ্ততায় তিনি হিন্দু ও মুসলিম সমাজের হত দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, জলমজুর ও বিত্তহীন অশিক্ষিতদের উন্নতি কামনা করেছেন। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে মুসলিম জাগরণের কালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র হিন্দু গবেষক ও ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক ইংরেজ লেখকদের অনুকরণে লিখিত মুসলিম শাসনামলের ইতিহাসের পুনর্বিচার করা হয়। মোহাম্মদী গোষ্ঠী তথা মুসলিম সম্প্রদায় ১৯৪০-এর কিছু আগে পরে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার স্মৃতিবার্ষিকী পালনের ব্যবস্থা করেন। বিভিন্ন পত্রিকা তরফে ‘সিরাজ স্মৃতি’ সংখ্যাও প্রকাশ করা হয়। এই সকল সংকলনে অদ্বৈত কতো লিখেছিলেন তার হদিস পাওয়া যায় না। তবে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার ‘সিরাজ স্মৃতি’ সংখ্যায় (আষাঢ়, ১৩৪৭) তিনি নামে ও বেনামে যে রচনাসূমহ প্রকাশ করেন, তাতেই পাওয়া যায় তাঁর মুক্ত বিচারবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টির সুপরিচয়। এই বোধের স্বাক্ষর পর্যাপ্ত পাওয়া যায় তাঁর স্ব-সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘নবশক্তি’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধেও। মাসিক মোহাম্মদীর উপযুক্ত ‘সিরাজ-স্মৃতি সংখ্যা’য় ‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ’ বিভাগে ‘সিরাজের কাল’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি আলোচনা লেখেন সাধু-রীতির গদ্যে। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি তাঁর একান্তই স্বকীয় প্রতিভাদীপ্ত। শক্তিশালী প্রাবন্ধিক রূপেও তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতো যদি আরো কিছু প্রবন্ধ, আলোচনা-সমালোচনা তিনি লিখে যাবার অবসর পেতেন, কিংবা যৎকিঞ্চিৎ লিখিত রচনাগুলোও যদি সব উদ্ধার করা সম্ভব হতো। ‘সিরাজের কাল’ শীর্ষক রচনাটি অদ্বৈত আরম্ভ করেছিলেন এভাবে : “ইতিহাস সাহিত্যেরই অঙ্গীভূত। ইতিহাসের মধ্য দিয়া এমন কোন ব্যক্তি বা জাতির অবমাননা করিলে সেই অবমাননার জন্য দায়ী সাহিত্যই। সাহিত্য ইতিহাসকে বুকে করিয়া রাখিয়াছে, কাজেই সে বুকে করিয়া রাখয়াছে ইতিহাসজাত সত্য-মিথ্যার সকল দ্বায়িত্বকে। সিরাজের প্রতি বিদেশীয়গণের সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশীয় ঐতিহাসিকগণেরও কেহ কেহ ঘোরতর অবিচার করিয়াছেন। এই জন্য এদেশীয় সাহিত্যের লজ্জার অধোবদন হওয়া উচিত।” অদ্বৈত মন্তব্য করেন, সিরাজউদ্দৌলা সম্বন্ধে যিনিই আলোচনা করুন না কেন, তাঁর প্রতি ইতিহাসের অবিচার-প্রসঙ্গে দেশীয় ঐতিহাসিক বা সাহিত্যিকগণও তাঁর কৃতকর্মের ফিরিস্তি দেবেনই।

দুই.

অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লিখে বাংলা সাহিত্যে অমরতা লাভ করেছেন। কিন্তু ১৯৫১ সালে মৃত্যুরও প্রায় এক যুগ পর পর্যন্ত তিনি বিস্মৃতির অন্তরালেই ছিলেন। ১৯৫৬ সালে গ্রন্থাকারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছেপে বের করার পর এটি সুধীজনের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ উপন্যাস উৎপল দত্তের পরিচালনায় বিজন ভট্টাচার্য ও সোভা সেনের সাড়া জাগানো অভিনয়ে নাটক হিসেবে কলকাতার মিনার্ভা মঞ্চে ১৯৬৩ সনের ১০ মার্চ থেকে শততম রজনী প্রদর্শিত হয়। এতেই তাঁর খ্যাতি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ব্যাপকতর বিস্তৃতি ঘটে ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনাধীন চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ১৯৭৩ সালে মুক্তিলাভের পর। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৯০-এর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর লেখক খ্যাতি আবদ্ধ থাকে উচ্চস্তরের বিদগ্ধ পাঠক-শ্রোতা ও পণ্ডিত সমাজের মধ্যে। বাংলা সাহিত্যের দুই খ্যাতিমান গবেষক, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ ও সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলা উপন্যাসের কালান্তর’-এ অনেকখানি জায়গা দিয়ে উচ্চমূল্যে গ্রন্থখানির আলোচনা লেখেন। এ সকল গ্রন্থে তিতাস-এর রচনাশৈলী ও বিষয়বস্তুর মৌলিকত্ব স্বীকৃতি লাভ করায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠিত ও বিশ্লেষিত হওয়ার সম্মান লাভ করেন। বর্হিবিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্যসমাজেও অদ্বৈত চর্চা নব্বইয়ের দশকেই সুবিস্তৃত হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্ব-সম্প্রদায়ের সামার্থ্যবান শিক্ষিত সুধীজনেরা, যথা রণবীর সিংহ বর্মণ প্রমুখ ১৯৬৯ সালে অদ্বৈতকে স্মরণ-বরণ করার লক্ষ্যে গঠন করেন ‘পশ্চিমবঙ্গ মৎস্যজীবী সমিতি’। কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি স্মরণ-সভা তথা ‘তিতাস সন্ধ্যা’র আয়োজন করে তাঁরা বৃহত্তর বিদ্বৎ ও সুধী সমাজের কাছ থেকে অদ্বৈতের সম্মান ও স্বীকৃতি আদায়ের সফল আন্দোলন করেন। ১৯৯৫ সালে তাঁরা গঠন করেন ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ এডুকেশনাল এ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি’। ‘ভাসমান’ নামের দুটি বার্ষিকী প্রকাশ ছাড়াও তাঁদের অন্যতম সদস্য সুশান্ত হালদার অদ্বৈতের ‘রাঙামাটি’ উপন্যাসটি সম্পাদনা করে ১৯৯৭ সালে পুঁথিঘর থেকে প্রকাশ করেন। আরেক সদস্য দেবীপ্রসাদ ঘোষ ‘সাপ্তাহিক নবশক্তি’ ও সাপ্তাহিক ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজার’-এর পাতা থেকে নাতিদীর্ঘ রচনা ‘বারোমাসী গান ও অন্যান্য’ শিরোনামে ১৯৯০ সালে প্রকাশ করেন। অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস ও অন্যরা মিলে ‘চতুর্থ দুনিয়া’ পত্রিকার ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ বিশেষ সংখ্যা : ১৯৯৪’ প্রকাশ করেন ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা’র ব্যানারে। ফলে অদ্বৈতসংক্রান্ত অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়ে সম্প্রচার লাভ করে। অচিন্ত্য বিশ্বাস অদ্বৈতর ‘শাদা হাওয়া’ (১৯৯৬), ‘রাঙামাটি’ (১৯৯৭) ও ‘তিতসি একটি নদীর নাম’ (১৯৯৮) সম্পাদনাপূর্বক প্রকাশ করেন। এই সময়ের (১৯৯২) সেরা কাজ কল্পনা বর্ধনের অনুবাদে ‘পেঙ্গুইন বুকস’ থেকে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর ইংরেজি সংকলন প্রকাশ পায়।

উপর্যুক্ত সূত্রসমূহে ক্রমাগত অদ্বৈত সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগৃহীত, সঙ্কলিত ও বিশ্লেষিত এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার পাতা থেকে তাঁর কতিপয় রচনা সঙ্কলিত হয়। এই উদ্যোগ বাংলাদেশেও দেখা যায়।

তিন.

যে কোনো খ্যাতিমানের জীবনকথার মতো অদ্বৈতর খ্যাতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপরও লেখালেখির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হঠাৎ বৃদ্ধিও অসতর্ক মুহূর্তে অদ্বৈত সম্পর্কে আমাদের সাহিত্য সমাজে নানা ‘মিথ্যা’ ও ‘মিথ’ গড়ে উঠেছে। তথাপি অদ্বৈত মল্লবর্মণ যে মানের ও ভাষার লেখা লিখে গেছেন তা তাঁর পরবর্তী সময়ে কিংবা তাঁর কালেও বিরল এক প্রতিভা- এটা বলতে আমার দ্বিধা নেই। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অমর শিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সজীবনে অবহেলিত, অ-মূল্যায়িত ছিলেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো একজন মহৎ-শিল্পীর ওপর প্রকাশিত পুস্তক ও প্রবন্ধের সংখ্যা আঙুলে গুনে শেষ করা যাবে। অথচ তার সম্পর্কে লেখা বইয়ের সংখ্যা হওয়া উচিত ছিল সীমাপরিসীমাহীন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ১৯৫৬ সালে অদ্বৈতর বন্ধু সুবোধ চৌধুরী ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মুখবন্ধে লিখেন : “আজ এই গ্রন্থ প্রকাশের দিনে আমরা আমাদের প্রিয়বন্ধু অদ্বৈত মল্লবর্মণকে বেদনার্ত চিত্তে স্মরণ করি। কাঁচড়াপাড়া যক্ষা হাসপাতালে যাইবার পূর্বে তিনি এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি আমাদিগকে দিয়া গিয়াছিলেন। তাহার জীবৎকালে ইহা আমরা প্রকাশ করতে পারি নাই। লেখকের মৃত্যুর পর কয়েকটি বছরই কাটিয়া গেল।... ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ প্রথমত মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হইতেছিল। গ্রন্থটির কয়েকটি স্তবক মুদ্রিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহা রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমন সময়ই এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি রাস্তায় হারাইয়া যায়। বলাবাহুল্য, অদ্বৈতর জীবনে এই ঘটনাটি সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক। বন্ধুবান্ধব এবং পাঠকদের আগ্রহাতিশয্যে লেখক আবার ভগ্নহৃদয়ে তিতাসের কাহিনী লইয়া বসিলেন” ইত্যাদি।

চার.

অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষে এসে অদ্বৈত মল্লবর্মণের রচনাবলী নিয়ে এরকম একটি কাজ সত্যি প্রশংসার দাবিদার। ড. ইসরাইল খান এটি সংগ্রহ ও সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে অসংখ্য দুর্লভ তথ্যসহ এই রচনাবলীকে সমৃদ্ধ করেছেন। তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ আমাদের দেশে পাঠ্যসূচিতে পঠিত রয়েছে। তথাপি তাঁর অপরাপর রচনাসূমহকে অগ্রাহ্য করার কোনো কারণ নেই। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসখানি যে মানের ও ভাষার, এবং ভাবের উজ্জ্বলতা দেখিয়েছে তা বাংলা সাহিত্যে হাতেগোনা নিশ্চয় কয়েকেটি উপন্যাসের পর্যায়ে পড়বে। তাঁর উপন্যাস ‘সাদা হাওয়া’, ‘রাঙামাটি’, অনুবাদ ‘জীবন-তৃষ্ণা’ পড়লে অনুধাবন করা যায় যে তিনি আসলে কত বড় সাহিত্যক ছিলেন। এছাড়া গল্প, কবিতা কিংবা প্রবন্ধেও তিনি ছিলেন সমধিক সক্রিয়। এই সক্রিয়তা এত অল্প সময়ে পেয়েছেন যে, যা আমাদের সাহিত্যের জন্য সত্যি পরিতাপের বিষয়। কিন্তু ‘দেশ’ পত্রিকায় চাকরি করার সূত্রে অদ্বৈত সম্পর্কে খ্যাতিমান সাহিত্যিক বিমল মিত্রের বক্তব্য : “ছোট আকারের শরীর, ততোধিক ছোট একটা টেবিলে বসে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ‘দেশ’ সাপ্তাহিকের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতেন। বেশিরভাগ দিনই তাঁকে দেখা যেত না। কারণ আমরা যারা বাইরের লোক তারা বেশিরভাগই বিকেলের দিকে গিয়ে হাজির হতাম। তখন তিনি কাজ শেষ করে বাড়ি চলে গেছেন। এক একজন মানুষ থাকে যারা সব সময় নিজেকে আড়াল করতেই ব্যস্ত। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন আসলে সেই জাতীয় মানুষ। তাই বিকেল বেলার দিকে যে আমাদের লেখকদের জমায়েত হতো, তাতে তিনি নিয়মিতভাবেই অনুপস্থিত থাকেন। শুনেছিলাম উত্তর কলকাতার একটা বাড়ির ছোট একটা ঘর ভাড়া নিয়ে তিনি পুরোনো বই এর পাহাড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে পুরাতত্ত্ব নিয়ে অবসর সময়টুকু যাপন করতেন। কিন্তু তিনি যে ভিতরে ভিতরে উপন্যাস লিখছেন তা জানতুম না। নিজে চাকুরী করতেন ‘দেশ’ পত্রিকায়। কিন্তু একদিন অন্য একটি অখ্যাত পত্রিকায় (মোহাম্মদীকে ‘অখ্যাত’ বলছেন। অথচ মোহাম্মদী নামটি সবসময় বিখ্যাত ছিল।) তাঁর একটি উপন্যাস ধারাবাহিক প্রকাশিত হতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সে উপন্যাসটির নাম ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম- এত কাগজ থাকতে আপনি ঐ পত্রিকায় লিখছেন যে? অদ্বৈত মল্লবর্মণ বলেছিলেন- ওঁরা চাইলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওটা তাঁর সত্যভাষণ নয়।... অদ্বৈতকে দেখে আমার মনে হতো তিনি যেন সব সময় নিজেকে নিয়ে বিব্রত কিংবা নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে বিড়ম্বিত। অথচ তাঁর এমন সাহস ছিল না যে, সেই দুর্ভাগ্যের বিবরণ অন্য কাউকে শুনিয়ে নিজের বোঝা লাঘব করেন।...” ( সূত্র : দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৮১, পৃ. ৯৭-১১২)। অদ্বৈত মল্লবর্মণ মৃত্যুর পরেও দীর্ঘকাল স্মৃতির অন্তরালে অবেহেলা অনাদরে পত্র-পত্রিকার পাতার মধ্যে আটকা পড়ে ছিলেন। সেই দিক বিবেচনা করলে অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই রচনাবলী ব্যাপক গুরুত্ব বহন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

দিনান্তবেলায়

ছবি

বাংলা সঙ্গীতের আধুনিকায়নে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

ছবি

নূরুল হকের অপ্রকাশিত কবিতা

ছবি

মালা থেকে খসে পড়া একটি ফুল একজন নূরুল হক

ছবি

অন্তরালের কবি নূরুল হক

ছবি

কবি নূরুল হক তাঁর স্মৃতি ও কবিতা

ছবি

শেষ চুমুকের আগে : জীবনের বাইপাসে ব্যক্তিগত ভ্রমণ

ছবি

শিকিবু

ছবি

শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে

ছবি

স্বপ্নের হাতি

ছবি

বর্ষামঙ্গল ও শৈলজারঞ্জন মজুমদার

ছবি

ডিগ্রি ডাক্তার ও কর্পোরেশনের দাঁত

ছবি

বর্ষা ও বিবিধ কাব্য

ছবি

গণমানুষের অর্থনীতি ও বঙ্গবন্ধু

ছবি

শূন্যস্থান

ছবি

দিনান্তবেলায়

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

অ্যান্ড্রু মোশনের প্রোজ পোয়েট্রি

ছবি

সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অর্জন

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

মুগ্ধপাঠ: একটি প্রবন্ধ সংকলন

সাবলীল বর্ণনায় অন্তর্গত দুঃখগাথা

ছবি

দিনান্তবেলায়

ছবি

বিন্দু ও বৃত্তে

ছবি

ফুলের আর্তনাদ

ছবি

মোম জোছনার সিলসিলা

ছবি

মান্টোর সঙ্গে একদিন

ছবি

জীবনবৃত্ত নয়, জাতীয় জীবনের প্রামাণ্য বৃত্তান্ত

ছবি

অরবিন্দ পোদ্দার স্মরণে

ছবি

শিকিবু

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কার্লোস হুগো গ্যারিডো চালেন-এর কবিতা

tab

সাময়িকী

অমর স্রষ্টা

অদ্বৈত মল্লবর্মণ

শ্যামল নাথ

image

অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রতিকৃতি : চারু পিন্টু

বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১

অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলাদেশে জন্মেছিলেন। তাঁর শিক্ষাদীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এখানেই। তাঁর সাহিত্যভাবনা ও গবেষণার মৌল-উপাদান উপকরণও সংগৃহীত হয়েছে পূর্ব বাংলার জীবন ও জগৎ থেকে। শিল্প-স্রষ্টার যে মনন অদ্বৈতর, তাও গড়ে ওঠে বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে। জগৎ ও জীবনের একান্ত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এই রূপকল্প বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অসামান্য। অথচ বাংলাদেশ থেকে অদ্বৈত মল্লবর্মণের কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। তাঁর চিন্তাচর্চার জন্য গড়ে ওঠেনি জাতীয় পর্যায়ের কোনো সংগঠন। কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাঙালি সাহিত্যকদের মধ্যে অদ্বৈত নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন। রবীন্দ্র-নজরুল-অদ্বৈত কেবল একটি নাম নয়, এখন তাঁরা এক একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলা সাহিত্যে এমন সম্মান লাভকারী কবি-সাহিত্যকদের নাম খুঁজতে গেলে দুইশ’ বছরের মধ্যে কজনকে পাওয়া যাবে? রবীন্দ্রনাথের পূর্বে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র এবং পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্র ছাড়া আর কাকে আনা যায় যে, একক একটি নামের পতাকাতলে গোটা বাংলাভাষী মানুষের বৃহদাংশ সমবেত হয়েছেন বা জমায়েত হতে ভালোবেসেছেন? কিন্তু এই স্মরণীয়দের মধ্যেও অদ্বৈত ছিলেন হতদরিদ্র, অব্যবস্থিত, ঐতিহ্যহীন পরিবারের ছেলে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদী সংলগ্ন গোকর্ণঘাট গ্রামে নিঃস্ব-রিক্ত ‘জেলে’-পিতা অধরচন্দ্র মলল্লবর্মণের পর্ণকুটিরে ১ জানুয়ারি ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশবেই তিনি পিতা-মাতা ও ভাইবোনকে হারিয়ে চরম মর্মন্তুদ এতিম-এ পরিণত হন। অর্থ-বিত্ত-ঐতিহ্য আত্মীয়-পরিজনহীন অদ্বৈতর বাল্য ও কৈশরকাল অতিক্রম করা এবং শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে কী রকম নিদারুণ করুণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা সহজে অনুমেয়। অসীম ধৈর্য সহকারে প্রচণ্ড মেধাবী, মরমীমনের, সৃজনশীল প্রতিভা অদ্বৈত নিজেকে চিনিয়েছিলেন বলেই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে তিনি অতিক্রম করে গিয়েছিলেন নিজের পরিবেশকে। ‘মানুষ শুধুই প্রাকৃতিক নিয়ম-শৃঙ্খলে বাধা অবস্থার দাস নয়। মানুষের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই শক্তিও, যে শক্তির বলে মানুষ অবস্থার প্রভুও হতে পারে।’ অদ্বৈত এই মহাজন বাক্যকে বাস্তবে পরিণত করেছিলেন। জীবন শিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণের সামাজিকে ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা তেমন হয়নি বললেই চলে। কিন্তু অদ্বৈত রচনার বিষয়বস্তু, চরিত্রাবলী ও সংলাপ এর মতো তাঁর সামাজিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। কর্মজীবনে সাংবাদিক বা সম্পাদক ব্রত নিয়ে লিখিত ‘সাহিত্য’কর্মের মধ্যে এ পর্যন্ত কেবল ‘নবশক্তির’ সম্পাদকীয় স্তম্ভগুলো, তিনটি উপন্যাস, কতিপয় কবিতাসহ আরো কিছু লেখালেখি করেছেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লিখে বাংলা সাহিত্যে অমরতা লাভ করেছেন। কিন্তু ১৯৫১ সালে মৃত্যুরও প্রায় এক যুগ পর পর্যন্ত তিনি বিস্মৃতির অন্তরালেই ছিলেন। ১৯৫৬ সালে গ্রন্থাকারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছেপে বের করার পর এটি সুধীজনের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে

পূর্ববঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত নিম্নবর্গের হিন্দু হিসেবে তাঁর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণ ও ধর্ম বৈষম্যবোধ বা বিকার বিকৃতি সৃষ্টি করতে পারেনি। এক অসামান্য নির্লিপ্ততায় তিনি হিন্দু ও মুসলিম সমাজের হত দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, জলমজুর ও বিত্তহীন অশিক্ষিতদের উন্নতি কামনা করেছেন। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে মুসলিম জাগরণের কালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র হিন্দু গবেষক ও ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক ইংরেজ লেখকদের অনুকরণে লিখিত মুসলিম শাসনামলের ইতিহাসের পুনর্বিচার করা হয়। মোহাম্মদী গোষ্ঠী তথা মুসলিম সম্প্রদায় ১৯৪০-এর কিছু আগে পরে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার স্মৃতিবার্ষিকী পালনের ব্যবস্থা করেন। বিভিন্ন পত্রিকা তরফে ‘সিরাজ স্মৃতি’ সংখ্যাও প্রকাশ করা হয়। এই সকল সংকলনে অদ্বৈত কতো লিখেছিলেন তার হদিস পাওয়া যায় না। তবে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার ‘সিরাজ স্মৃতি’ সংখ্যায় (আষাঢ়, ১৩৪৭) তিনি নামে ও বেনামে যে রচনাসূমহ প্রকাশ করেন, তাতেই পাওয়া যায় তাঁর মুক্ত বিচারবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টির সুপরিচয়। এই বোধের স্বাক্ষর পর্যাপ্ত পাওয়া যায় তাঁর স্ব-সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘নবশক্তি’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধেও। মাসিক মোহাম্মদীর উপযুক্ত ‘সিরাজ-স্মৃতি সংখ্যা’য় ‘সাহিত্য-প্রসঙ্গ’ বিভাগে ‘সিরাজের কাল’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি আলোচনা লেখেন সাধু-রীতির গদ্যে। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি তাঁর একান্তই স্বকীয় প্রতিভাদীপ্ত। শক্তিশালী প্রাবন্ধিক রূপেও তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতো যদি আরো কিছু প্রবন্ধ, আলোচনা-সমালোচনা তিনি লিখে যাবার অবসর পেতেন, কিংবা যৎকিঞ্চিৎ লিখিত রচনাগুলোও যদি সব উদ্ধার করা সম্ভব হতো। ‘সিরাজের কাল’ শীর্ষক রচনাটি অদ্বৈত আরম্ভ করেছিলেন এভাবে : “ইতিহাস সাহিত্যেরই অঙ্গীভূত। ইতিহাসের মধ্য দিয়া এমন কোন ব্যক্তি বা জাতির অবমাননা করিলে সেই অবমাননার জন্য দায়ী সাহিত্যই। সাহিত্য ইতিহাসকে বুকে করিয়া রাখিয়াছে, কাজেই সে বুকে করিয়া রাখয়াছে ইতিহাসজাত সত্য-মিথ্যার সকল দ্বায়িত্বকে। সিরাজের প্রতি বিদেশীয়গণের সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশীয় ঐতিহাসিকগণেরও কেহ কেহ ঘোরতর অবিচার করিয়াছেন। এই জন্য এদেশীয় সাহিত্যের লজ্জার অধোবদন হওয়া উচিত।” অদ্বৈত মন্তব্য করেন, সিরাজউদ্দৌলা সম্বন্ধে যিনিই আলোচনা করুন না কেন, তাঁর প্রতি ইতিহাসের অবিচার-প্রসঙ্গে দেশীয় ঐতিহাসিক বা সাহিত্যিকগণও তাঁর কৃতকর্মের ফিরিস্তি দেবেনই।

দুই.

অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লিখে বাংলা সাহিত্যে অমরতা লাভ করেছেন। কিন্তু ১৯৫১ সালে মৃত্যুরও প্রায় এক যুগ পর পর্যন্ত তিনি বিস্মৃতির অন্তরালেই ছিলেন। ১৯৫৬ সালে গ্রন্থাকারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছেপে বের করার পর এটি সুধীজনের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ উপন্যাস উৎপল দত্তের পরিচালনায় বিজন ভট্টাচার্য ও সোভা সেনের সাড়া জাগানো অভিনয়ে নাটক হিসেবে কলকাতার মিনার্ভা মঞ্চে ১৯৬৩ সনের ১০ মার্চ থেকে শততম রজনী প্রদর্শিত হয়। এতেই তাঁর খ্যাতি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ব্যাপকতর বিস্তৃতি ঘটে ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনাধীন চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ১৯৭৩ সালে মুক্তিলাভের পর। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৯০-এর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর লেখক খ্যাতি আবদ্ধ থাকে উচ্চস্তরের বিদগ্ধ পাঠক-শ্রোতা ও পণ্ডিত সমাজের মধ্যে। বাংলা সাহিত্যের দুই খ্যাতিমান গবেষক, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ ও সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলা উপন্যাসের কালান্তর’-এ অনেকখানি জায়গা দিয়ে উচ্চমূল্যে গ্রন্থখানির আলোচনা লেখেন। এ সকল গ্রন্থে তিতাস-এর রচনাশৈলী ও বিষয়বস্তুর মৌলিকত্ব স্বীকৃতি লাভ করায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠিত ও বিশ্লেষিত হওয়ার সম্মান লাভ করেন। বর্হিবিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্যসমাজেও অদ্বৈত চর্চা নব্বইয়ের দশকেই সুবিস্তৃত হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্ব-সম্প্রদায়ের সামার্থ্যবান শিক্ষিত সুধীজনেরা, যথা রণবীর সিংহ বর্মণ প্রমুখ ১৯৬৯ সালে অদ্বৈতকে স্মরণ-বরণ করার লক্ষ্যে গঠন করেন ‘পশ্চিমবঙ্গ মৎস্যজীবী সমিতি’। কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি স্মরণ-সভা তথা ‘তিতাস সন্ধ্যা’র আয়োজন করে তাঁরা বৃহত্তর বিদ্বৎ ও সুধী সমাজের কাছ থেকে অদ্বৈতের সম্মান ও স্বীকৃতি আদায়ের সফল আন্দোলন করেন। ১৯৯৫ সালে তাঁরা গঠন করেন ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ এডুকেশনাল এ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি’। ‘ভাসমান’ নামের দুটি বার্ষিকী প্রকাশ ছাড়াও তাঁদের অন্যতম সদস্য সুশান্ত হালদার অদ্বৈতের ‘রাঙামাটি’ উপন্যাসটি সম্পাদনা করে ১৯৯৭ সালে পুঁথিঘর থেকে প্রকাশ করেন। আরেক সদস্য দেবীপ্রসাদ ঘোষ ‘সাপ্তাহিক নবশক্তি’ ও সাপ্তাহিক ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজার’-এর পাতা থেকে নাতিদীর্ঘ রচনা ‘বারোমাসী গান ও অন্যান্য’ শিরোনামে ১৯৯০ সালে প্রকাশ করেন। অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস ও অন্যরা মিলে ‘চতুর্থ দুনিয়া’ পত্রিকার ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ বিশেষ সংখ্যা : ১৯৯৪’ প্রকাশ করেন ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা’র ব্যানারে। ফলে অদ্বৈতসংক্রান্ত অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়ে সম্প্রচার লাভ করে। অচিন্ত্য বিশ্বাস অদ্বৈতর ‘শাদা হাওয়া’ (১৯৯৬), ‘রাঙামাটি’ (১৯৯৭) ও ‘তিতসি একটি নদীর নাম’ (১৯৯৮) সম্পাদনাপূর্বক প্রকাশ করেন। এই সময়ের (১৯৯২) সেরা কাজ কল্পনা বর্ধনের অনুবাদে ‘পেঙ্গুইন বুকস’ থেকে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর ইংরেজি সংকলন প্রকাশ পায়।

উপর্যুক্ত সূত্রসমূহে ক্রমাগত অদ্বৈত সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগৃহীত, সঙ্কলিত ও বিশ্লেষিত এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার পাতা থেকে তাঁর কতিপয় রচনা সঙ্কলিত হয়। এই উদ্যোগ বাংলাদেশেও দেখা যায়।

তিন.

যে কোনো খ্যাতিমানের জীবনকথার মতো অদ্বৈতর খ্যাতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপরও লেখালেখির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হঠাৎ বৃদ্ধিও অসতর্ক মুহূর্তে অদ্বৈত সম্পর্কে আমাদের সাহিত্য সমাজে নানা ‘মিথ্যা’ ও ‘মিথ’ গড়ে উঠেছে। তথাপি অদ্বৈত মল্লবর্মণ যে মানের ও ভাষার লেখা লিখে গেছেন তা তাঁর পরবর্তী সময়ে কিংবা তাঁর কালেও বিরল এক প্রতিভা- এটা বলতে আমার দ্বিধা নেই। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অমর শিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সজীবনে অবহেলিত, অ-মূল্যায়িত ছিলেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো একজন মহৎ-শিল্পীর ওপর প্রকাশিত পুস্তক ও প্রবন্ধের সংখ্যা আঙুলে গুনে শেষ করা যাবে। অথচ তার সম্পর্কে লেখা বইয়ের সংখ্যা হওয়া উচিত ছিল সীমাপরিসীমাহীন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ১৯৫৬ সালে অদ্বৈতর বন্ধু সুবোধ চৌধুরী ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মুখবন্ধে লিখেন : “আজ এই গ্রন্থ প্রকাশের দিনে আমরা আমাদের প্রিয়বন্ধু অদ্বৈত মল্লবর্মণকে বেদনার্ত চিত্তে স্মরণ করি। কাঁচড়াপাড়া যক্ষা হাসপাতালে যাইবার পূর্বে তিনি এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি আমাদিগকে দিয়া গিয়াছিলেন। তাহার জীবৎকালে ইহা আমরা প্রকাশ করতে পারি নাই। লেখকের মৃত্যুর পর কয়েকটি বছরই কাটিয়া গেল।... ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ প্রথমত মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হইতেছিল। গ্রন্থটির কয়েকটি স্তবক মুদ্রিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহা রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমন সময়ই এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি রাস্তায় হারাইয়া যায়। বলাবাহুল্য, অদ্বৈতর জীবনে এই ঘটনাটি সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক। বন্ধুবান্ধব এবং পাঠকদের আগ্রহাতিশয্যে লেখক আবার ভগ্নহৃদয়ে তিতাসের কাহিনী লইয়া বসিলেন” ইত্যাদি।

চার.

অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষে এসে অদ্বৈত মল্লবর্মণের রচনাবলী নিয়ে এরকম একটি কাজ সত্যি প্রশংসার দাবিদার। ড. ইসরাইল খান এটি সংগ্রহ ও সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে অসংখ্য দুর্লভ তথ্যসহ এই রচনাবলীকে সমৃদ্ধ করেছেন। তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ আমাদের দেশে পাঠ্যসূচিতে পঠিত রয়েছে। তথাপি তাঁর অপরাপর রচনাসূমহকে অগ্রাহ্য করার কোনো কারণ নেই। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসখানি যে মানের ও ভাষার, এবং ভাবের উজ্জ্বলতা দেখিয়েছে তা বাংলা সাহিত্যে হাতেগোনা নিশ্চয় কয়েকেটি উপন্যাসের পর্যায়ে পড়বে। তাঁর উপন্যাস ‘সাদা হাওয়া’, ‘রাঙামাটি’, অনুবাদ ‘জীবন-তৃষ্ণা’ পড়লে অনুধাবন করা যায় যে তিনি আসলে কত বড় সাহিত্যক ছিলেন। এছাড়া গল্প, কবিতা কিংবা প্রবন্ধেও তিনি ছিলেন সমধিক সক্রিয়। এই সক্রিয়তা এত অল্প সময়ে পেয়েছেন যে, যা আমাদের সাহিত্যের জন্য সত্যি পরিতাপের বিষয়। কিন্তু ‘দেশ’ পত্রিকায় চাকরি করার সূত্রে অদ্বৈত সম্পর্কে খ্যাতিমান সাহিত্যিক বিমল মিত্রের বক্তব্য : “ছোট আকারের শরীর, ততোধিক ছোট একটা টেবিলে বসে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ‘দেশ’ সাপ্তাহিকের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতেন। বেশিরভাগ দিনই তাঁকে দেখা যেত না। কারণ আমরা যারা বাইরের লোক তারা বেশিরভাগই বিকেলের দিকে গিয়ে হাজির হতাম। তখন তিনি কাজ শেষ করে বাড়ি চলে গেছেন। এক একজন মানুষ থাকে যারা সব সময় নিজেকে আড়াল করতেই ব্যস্ত। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন আসলে সেই জাতীয় মানুষ। তাই বিকেল বেলার দিকে যে আমাদের লেখকদের জমায়েত হতো, তাতে তিনি নিয়মিতভাবেই অনুপস্থিত থাকেন। শুনেছিলাম উত্তর কলকাতার একটা বাড়ির ছোট একটা ঘর ভাড়া নিয়ে তিনি পুরোনো বই এর পাহাড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে পুরাতত্ত্ব নিয়ে অবসর সময়টুকু যাপন করতেন। কিন্তু তিনি যে ভিতরে ভিতরে উপন্যাস লিখছেন তা জানতুম না। নিজে চাকুরী করতেন ‘দেশ’ পত্রিকায়। কিন্তু একদিন অন্য একটি অখ্যাত পত্রিকায় (মোহাম্মদীকে ‘অখ্যাত’ বলছেন। অথচ মোহাম্মদী নামটি সবসময় বিখ্যাত ছিল।) তাঁর একটি উপন্যাস ধারাবাহিক প্রকাশিত হতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সে উপন্যাসটির নাম ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম- এত কাগজ থাকতে আপনি ঐ পত্রিকায় লিখছেন যে? অদ্বৈত মল্লবর্মণ বলেছিলেন- ওঁরা চাইলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওটা তাঁর সত্যভাষণ নয়।... অদ্বৈতকে দেখে আমার মনে হতো তিনি যেন সব সময় নিজেকে নিয়ে বিব্রত কিংবা নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে বিড়ম্বিত। অথচ তাঁর এমন সাহস ছিল না যে, সেই দুর্ভাগ্যের বিবরণ অন্য কাউকে শুনিয়ে নিজের বোঝা লাঘব করেন।...” ( সূত্র : দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৮১, পৃ. ৯৭-১১২)। অদ্বৈত মল্লবর্মণ মৃত্যুর পরেও দীর্ঘকাল স্মৃতির অন্তরালে অবেহেলা অনাদরে পত্র-পত্রিকার পাতার মধ্যে আটকা পড়ে ছিলেন। সেই দিক বিবেচনা করলে অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই রচনাবলী ব্যাপক গুরুত্ব বহন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

back to top