alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : এগার

শিকিবু

আবুল কাসেম

: বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই ২০২১
image

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিশ

তামেতাকার মৃত্যু সংবাদে খুব খুশি হয়েছেন সম্রাজ্ঞী শোশি। তার মনে হলো এবার ইঝোমিকে পেতে আর বাধা রইল না।

সম্রাজ্ঞী শোশি তার বাবা মিচিনাগাকে বললেন, প্রাক্তন সম্রাট রেইঝেইকে বলে এখনই ইঝোমিকে নিয়ে আসতে হবে।

বাবা ঝানু কূটকৌশলী। মেয়েকে বললেন, এখন সম্রাটের মন খারাপ। ইঝোমিরও। দেখবে ইঝোমি নিজে থেকেই চলে আসবে। সে প্রাসাদে তার ভালো লাগতেই পারে না।

তার মনে হলো কন্যার বয়স কম হলেও এ যাত্রা তাকে বুঝাতে সক্ষম হলেন পিতা। শিশু কন্যা যেন পুতুলের বায়না ধরছেন, আর অক্ষম পিতা তাকে বুঝ দিচ্ছেন।

এদিকে সম্রাজ্ঞী তেইশেই একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তামেতাকার প্রাসাদ ছেড়ে ইঝোমি নিশ্চয়ই শোশির দরবারে উপস্থিত হবেন। এ দুর্ভাবনায় কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত তা নিয়ে সেই শোনাগন ছাড়া অন্যসব লেডিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। সেই শোনাগনকে বললেন না, তাকে চাপে রাখার জন্য। তিনি শুনেছেন সেই শোনাগন ইদানীং কোনো এক যুবকের সঙ্গে নাকি পত্র কবিতার যোগাযোগ তৈরি করেছেন। নানা অশান্তিতে আছেন তিনি নানা দিক থেকে।

অন্যান্য লেডিরা পূর্বসূত্র ধরে ইঝোমি সম্পর্কে সম্রাটের কানভারি করতে সম্রাজ্ঞী তেইশিকে পরামর্শ দিলেন। তার কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হলো।

প্রথমা ও বড় সম্রাজ্ঞীর প্রতি সম্রাটের দুর্বলতা আছে, না হয় বৈরি পরিবেশে কবেই তিনি ছিটকে যেতেন। তা সম্রাজ্ঞী তেইশি নিজেও জানেন। তাই তার অনেক অন্যায় আবদারও সম্রাট ইচিজো রক্ষা করেন। তেইশি সে সুযোগটা গ্রহণ করেন। সম্রাজ্ঞী সম্রাটের খাস কক্ষে গেলেন। সম্রাট তাকে স্বাগত জানালেন। সম্রাজ্ঞী বললেন যে, সম্রাট রেইঝেইয়ের পুত্র তামেতাকার অকাল মৃত্যুতে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে এ শোক বোধ হয় কাটাতে পারবেন না।

সম্রাট বললেন, খুবই কষ্ট পেয়েছেন। আমি গিয়ে শোক জানিয়ে এসেছি।

ঐ মেয়েটা মনে হয় এর জন্য দায়ী।

সম্রাট রেইঝেই তো তাকে পছন্দ করেন। প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল। তিনি যেতে দেননি।

নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। তবে তিনি ঠিক করেননি। অপয়া এই দুশ্চরিত্রা মেয়েকে প্রাসাদে রেখে অকল্যাণই বয়ে আনছেন।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেই সোনাগান।

মেয়েটা লেখে ভালো।

ভালো লেখে না, ছাই। আমি চাই না অভিশাপ নিয়ে সে কখনো এ প্রাসাদে আসুক।

আমি বুঝতে পেরেছি।

আমি বুঝতে পারি না বিবাহবহির্ভূতভাবে প্রিন্সের সঙ্গে থাকা একটা মেয়ের প্রতি সম্রাট রেইঝেই কেন এত সহানুভূতি দেখাবেন।

তার কাজের সমালোচনা কি আমরা করতে পারি?

তা পারি না। আমিও শ্রদ্ধা করি তাকে। কিন্তু অশ্রদ্ধা হতে পারে এমন কাজ তিনি কেন করবেন? তিনি ছেলের মরদেহ সামান্য দাহ করে পূর্ণভাবে সমাধিস্থ করেছেন। না মেনেছেন বৌদ্ধ রীতি, না মেনেছেন শিন্টু সংস্কার।

এটা তুমি ঠিক বলোনি। তিনি উভয় রীতিই মেনেছেন এবং আমাদের সকল সংস্কার মেনে কাজ করেছেন। এ বিষয়টা থাক। তুমি অন্য কিছু বল।

সম্রাজ্ঞী তেইশি বুঝতে পারলেন এতটা বলা বোধহয় ঠিক হয়নি। তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বললেন, মহামারী কবে শেষ হয় কে জানে, সকলেরই সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। জীবন কেমন যেন ঝিমিয়ে যাচ্ছে।

তোমার লেডি সেই শোনাগনের কী অবস্থা? তোমার দরবারে নাকি চায়নিজ ক্ল্যাসিকের চর্চা হয়?

চর্চা হয় না মহামান্য সম্রাট, তা নিয়ে আলোচনা নয়, চীনা সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হয়।

মহামারীর সময়ে চীনা সাহিত্য কেন?

নিজেদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। আপনাকে নিশ্চয়ই তা সম্রাজ্ঞী শোশি বলেছে।

সে কারো কথা বলে বেড়ায় না।

বলে বেড়াবার মতো বাবা থাকলে তার বলার দরকার কি?

মিচিনাগা এতটা নিচে নামবেন না। যাই হোক, এখন তুমি এসো সম্রাজ্ঞী।

সম্রাজ্ঞী তেইশি মন খারাপ করেই চলে গেলেন।

সেই শোনাগনকে গিয়ে বললেন, আমরা চীনা ভাষার চর্চা করি এ কথা দরবারের বাইরে গেল কেমন করে?

সেই শোনাগন অবাক হলেন। বললেন, তাতো গোপনীয়ভাবে হচ্ছে, তা বাইরে গেল কী করে?

এ প্রশ্ন তো আমার। তা সম্রাটের কানে গেছে।

সর্বনাশ। এটাতো খুব খারাপ সংবাদ। কিছু দিন আমরা চর্চা বন্ধ রাখি।

তাই করো। চারদিকে সমস্যা। ইজোমির সংবাদ কিছু রাখো?

তার এখন দুঃসময়।

তা আমি জানি এবং তা নিয়ে আনন্দিত হবার কিছু নেই। সুসময় আসতে দেরি হবে না, তার সম্ভাবনাই প্রবল।

ক্ষমা করবেন সম্রাজ্ঞী, এ নিয়ে কি আপনার কানে কিছু এসেছে?

তুমি তৈরি থাকো শোনাগন। আমার দরবারের আলো ছাড়িয়ে কোনো দরবার যেন বেশি আলো না ছড়ায়।

আমি আগেও বলেছি, এ নিয়ে ভাববেন না, আপনার বড়ত্ব বহাল থাকবে। আপনার রুচিবোধ এবং সাহিত্যপ্রীতি সবার ওপরে স্থান পাবে।

তোমার লেখা পত্র কবিতাগুলো আমাকে দেখাওনি।

আমার পত্র কবিতা লেখার কেউ নেই মহামান্যা। আপনার জন্যই আমার সব লেখা : গদ্যনিবন্ধ, পর্যবেক্ষণ এবং ওয়াকা কবিতা।

তা ঠিক আছে। কিন্তু আমি এমন কোনো কথা শুনতে চাই না, যা তোমার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে।

আপনার মর্যাদা সম্পর্কে আমি সচেতন। আর ইঝোমি শিকিবুর খোঁজখবর নিচ্ছি আমি।

বেশ তাই করো।

প্রাক্তন সম্রাট রেইঝেই পুত্র প্রিন্স তামেতাকার সমাধি সৌধ নির্মাণ করে দিয়েছেন সুন্দর এক স্থাপত্য নকশা অনুসরণ করে। সে সৌধে ফুল দিতে গেছেন ইঝোমি। শোকের কালো পোশাকটা তখনও পরে আছেন। সঙ্গে আছে মেয়েটি। ফিরে এসে লিখলেন:

‘পৃথিবী ছাড়ার সময়

একজন কোথায়

তার বাড়ি নির্মাণ করবে?

ওহারা পর্বতে?

একটি মনোরম জায়গাই বাস করার।’

জায়গাটি ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না তার। তবুও তাকে ফিরে আসতে হল। প্রাসাদে এসে ইমনের কিছু উপহার এবং একটি কবিতা পেলেন। উপহার নয়, কবিতাটিই তাকে বেশি আকর্ষণ করল। কবিতাটি এরকম :

‘যে যায়, এবং

তোমরা যারা থাকো, কী

অনুভব কর তুমি? অবাক হই আমি

বিচ্ছেদের শেষে

আরো একবার বিষাদ...’

কবিতাটি পাঠ করে মৃদু হাসলেন। বৈধব্য শোকের পোশাকর সঙ্গে তা সহসাই মিলিয়ে গেল। অস্ফুটে বললেন, হ্যাঁ, বিচ্ছেদের শেষে আরো একবার বিষাদ।

মুরাসাকির দিনগুলো আগের চেয়ে খারাপ যাচ্ছে। তার বিষাদগ্রস্ত মনে ইঝোমির শোক যুক্ত হয়েছে। ওয়াকায় লিখলেন :

‘আমি বয়োপ্রাপ্ত তুমি ঝরে গেলে

তীব্র শোক বলে

এই বিশ্বে তোমার কিছুই জানা নেই

আমার নির্জনশূন্য বাগানেই

ভেসে যাওয়া উহ প্রথম বরফ ফলক!’

এক সময় অনুভব করেন ইঝোমির মতো বুঝি তার জীবনও শেষ হয়ে গেছে। কিছুদিন শোকটা ভুলেছিলেন, আবার যেন ইঝোমির কালো কিমোনোর মতোই তাকে অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে ফেললো। কান্নার মতো বুঝি শোকটাও সংক্রামক। বিষণœতা আবার সঙ্গী হলো। তা কাটিয়ে ওঠা এবার সত্যিই খুব কঠিন।

ইমন এলেন একদিন তার কাছে। ইমন খুবই সামাজিক মানুষ। সবার খোঁজখবর নিতে পছন্দ করেন। মুরাসাকি এবং ইঝোমির স্বামী মারা যাবারপর তাদের প্রতি তার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। মুরাসাকিকে ভেঙ্গে পড়তে দেখে একটু চিন্তিতই হলেন। কিন্তু বুঝতে দিলেন না। আজ হাতে করে কাগেরো নিক্কি (উত্তপ্ত ডায়েরি) নিয়ে এসেছেন। এটি এখন কাজে লাগলো। বললেন, কত কষ্টে একজন নারী জীবনধারণ করেন এই ডায়েরি তার প্রমাণ। অথচ ভালো পুরুষগুলো চলে যান।

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন মুরাসাকি। অন্য সময় হলে উচ্ছ্বাসপ্রবণ হয়ে পড়তেন। এখন হলেন না। শোকের কালো পোশাক ইঝোমির গায়ে, আর মুরাসাকির অন্তরে।

ইমন সদ্য লেখা একটি কবিতা এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়। ডায়েরিতে লেখা কবিতাটি এরকম :

‘ফেরা নয়, এবং

শিনোদায় মাত্র কিছুক্ষণ

তোমার তাকিয়ে থাকা দেখে ছিল বন

তুমি হয়ত প্রত্যাবর্তন করবে পুনরায়

মৃদুমন্দ বায়ু নিচে পাতাদের দোলায়।’

সুন্দর হয়েছে। মন্তব্য করলেন মুরাসাকি এবং ইমনের দিকে তাকালেন। ইমন বললেন, ইঝোমিকে লেখা কবিতা পত্রটা।

তাই? পড়ে তার ভালো লাগবে।

লাগবে না। প্রিন্স অতসুমিচি তার কাছে আসা-যাওয়া শুরু করেছে। সেও যাচ্ছে।

মুরাসাকি যেন শোক ঝেড়ে ফেলে অবাক হয়ে বললেন, কী! আবারো?

একুশ.

মুরাসাকি আবার বইপুস্তক, বিশেষ করে ‘বাঁশ কর্তনকারীর উপাখ্যান’, ‘ইছের উপাখ্যান’ এবং প্রপিতামহের লেখা ‘ইয়ামাতো উপাখ্যান’ পাঠ করলেন। উপাখ্যান বা মনোগাতারি সাহিত্যের মাধ্যমে তার এ ধারার সাহিত্য সম্পর্কে, বিশেষ করে গল্প বা কাহিনী রচনার ধারণাটা পাকাপোক্ত হয়েছে।

ইশিয়ামা ডেরার পাশেই বিওয়া হ্রদ। জ্যোৎস্না রাতে হ্রদের সৌন্দর্য পাগল করে দেয়ার মতো। এ সময় হাজার কবিতারা ভিড় করে চিন্তায়। না মুসাকির ওপর কোনো কবিতার ভাব ভর করেনি, গদ্যের এক বিশাল জাহাজ যেন ভিড়েছে।

সময়টা আগস্ট মাস। জ্যোৎস্না রাতের অপূর্ব সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে মুরাসাকি কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে শুরু করে দিলেন। নাম দিলেন ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’। হয়ত কিছুদিন যাবতই গল্পটা মাথায় তৈরি করছিলেন। জ্যোৎস্না রাতের বিওয়া সৌন্দর্য বিগলিত জ্যোৎস্নার মতোই ঝকঝকে গদ্যের বহতা এনে দিয়েছে।

লিখলেন- সম্রাট কিরিতসুবোর দ্বিতীয় সন্তান গেঞ্জি। মাত্র তিন বছর বয়সে তার মাতৃবিয়োগ ঘটে। গেঞ্জি সম্রাটের এক উপপতœীর সন্তান। তা হলেও সম্রাট তাকে খুব পছন্দ করেন। সন্তানের মায়ের কথাও ভুলতে পারেন না। ছেলেটির জন্য কষ্ট হয় তার।

এ সময় একদিন সম্রাট একজন রমণীর খোঁজ পেলেন, যে কিনা দেখতে হুবহু গেঞ্জির মায়ের মতো। নাম ফুজিতসুবো। প্রাক্তন এক সম্রাটের মেয়ে। সম্রাট তাকে বিয়ে করলেন। গেঞ্জি তাকে মা বলে গ্রহণ করে, মেনে চলে এবং তার স্নেহে লালিত-পালিত হয় (সংক্ষেপিত)।

শুরুটা নিজেকে চমকে দেয়। চমকে দেয় তার বন্ধু-বান্ধবদেরও। বেশি অবাক হন আকাঝোমি ইমন। তিনি কতগুলো কপি করান এবং হেইয়ান সম্রাটের দরবারে বিলি করেন। সবাই উৎসাহ নিয়ে পাঠ করছে লেখাটা। পরের অংশ তাদের আরো বেশি চমকিত করে। কারণ এখানে ছিল অভাবিত কিছু, যা তারা কল্পনাও করেননি।

এই অংশের শুরু করলেন এভাবে- গেঞ্জি যৌবনে উপনীত হয়েছে। অত্যন্ত সুদর্শন। হিকারো বা সাইনিং গেঞ্জি। সম্রাটের দরবারে তার একটা চাকরি হয়েছে। তবে তা নিম্নপর্যায়ের রাজকর্মচারী হিসেবে। তাতে তেমন গৌরব নেই। নেই তেমন মর্যাদাও। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার গেঞ্জি। তার মধ্যেও তার বিয়ে হয় নো অয়ি নামে এক সুন্দরীর যুবতীর সঙ্গে। কিছুদিন পরই গেঞ্জি উপলব্ধি করে সে নো অয়িকে নয়, সৎমা ফুজিতসুবোকে ভালোবাসে। সে তার প্রেমে পড়ে যায় এবং এদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় (সংক্ষেপিত)।

এ অধ্যায় পড়ে পাঠকদের বিস্ময়ের অবধি রইল না। কাহিনীর নতুন মোড় তাদের পরবর্তী লেখাগুলোর জন্য দারুণ উদ্গ্রীব করে তুলল।

ইমনকে সম্রাজ্ঞী শোশি ডেকে পাঠালেন। বললেন, কে এই লেখিকা চারদিকে কেবল তার সুখ্যাতিই শুনছি।

ইমন মুরাসাকির পরিচয় তুলে ধরলেন।

শোশি বললেন, তাকে আমি চাই। তুমি তাকে সম্রাটের প্রাসাদে আনার ব্যবস্থা করো।

আমার কথায় সে কি আসবে?

ঠিক আছে আমিই সে ব্যবস্থা করছি।

শোশি তার বাবার কাছে আবার সে আবদার করলেন। সম্রাজ্ঞী শোশির বাবা মিচিনাগা মুরাসাকিদের ভালোভাবেই চেনেন। বললেন, তুমি ভেবো না, সে তোমার দরবারে আসবে, আমি ব্যবস্থা করছি।

এক বিকেলে নিজেই উপস্থিত হলেন ইশিয়ামা ডেরায়। ঐশ্বর্য এবং আভিজাত্য দেখে নিজেই চমকে উঠলেন। বললেন, তাকাকু তোমাদের পারিবারিক বনেদিয়ানার কথা আমি জানি। আমি কেন, সবাই জানে। নোবুতাকা উৎসব-অনুষ্ঠান বিভাগে আমার প্রিয় পাত্র ছিল। আমি একটা ইচ্ছা নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। তুমি একজন অত্যন্তগুণী লেখিকা। তোমার সুনাম শুনে আমার গর্ব হচ্ছে। তুমি নিভৃতে এই ডেরায় পড়ে থাকবে তা হয় না। তুমি শোশির দরবারে লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে চলে এসো। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, সেখানে তোমার মর্যাদার কোনো অভাব হবে না।

আপনি জানেন নিশ্চয়ই, আমি মানসিকভাবে ভালো নেই। সম্রাজ্ঞীর দরবারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আমাকে দিয়ে কি তা হবে, হবে না। আমি শুনেছি ইঝোমি ও ইমনেরা আছেন, তারাই যথেষ্ট নয় কি?

তাদের বাইরেও আছে। কিন্তু তোমার মতো গুণী কেউ নেই। তোমাকে সেখানে কিছুই করতে হবে না। তোমার উপস্থিতি তার দরবারের গৌরব বাড়াবে- এই যা। তুমি আর আপত্তি করবে না তাকাকু।

আমাকে একটু ভাবতে দিন মহামান্য।

ঠিক আছে তুমি ভাবতে থাকো। ভেবে আমাকে জানাবে। আমার মেয়ে তোমার পথপানে চেয়ে আছে।

তিনি কি চান?

তার দরবার তোমাদের মত গুণী মানুষদের পদার্পণে সরগরম হয়ে উঠবে- এই যা।

আচ্ছা, আমি জানাব আপনাকে।

বাবার আসার কথা আছে। তিনি এলে মুরাসাকি তার সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন। তার আগে তিনি ইমনের সঙ্গে কথা বলতে চান।

এদিকে ইঝোমি একটা চরম সংকটে পড়ে দারুণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন। ব্যাপারটা এমন যে কারো সঙ্গেই কথা বলতে পারছেন না। ইমনের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতো, তিনি আগে থেকেই কবিতার মাধ্যমে একটা বার্তা দিয়ে রেখেছেন।

প্রিন্স অতসুমিচি আজও বিকেলে এসেছিলেন। তার ওপর অসম্ভব চাপ। তামেতাকার মৃত্যুতে মানসিকভাবে সত্যিই ভেঙ্গে পড়েছেন। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তবে মনের ভেতর কেমন যেন তাগিদ বোধ করছেন, মনটা অতসুমিচির পক্ষ নিয়ে তাকে ভোগাচ্ছে।

সন্ধ্যায় তার বারান্দায় ফুটফুটে চাঁদের আলো। গত মাসেও এ আলোয় এক সঙ্গে ছিলেন প্রিন্স তামেতাকার সঙ্গে। তা ভেবে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয়ে গেল। চাঁদের আলোয় যাবেন না পণ করেছেন। কিন্তু পণটা রক্ষা করা গেল না। তিনি নেই তাতে কী চাঁদের তো আলো আছে। এই আলো বন্ধন তৈরি করে দিত। এ রকম মনে হতেই বারান্দায় ছুটে গেলেন। যে মন এখন তার বিপক্ষে কাজ করে তার কথায় বারান্দায় এসে মনে হল আমি কী হেরে যাচ্ছি। সেখানে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয়ই দু’চোখ ভাসিয়ে কাঁদলেন। পরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে একটি কবিতার জন্ম হল :

‘সে অভ্যস্ত

চেহারা এখন আর নেই

আমার বাড়িতে

সকালের চাঁদ

আমি রোজ দেখি প্রতি রাতে।’

বারান্দা থেকে ফিরে এসে ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করলেন তা এবং ক্ষমা চাইলেন তামেতাকার আত্মার কাছে।

রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্ন দেখলেন। তামেতাকা গভীর রাতে স্বপ্ন সঞ্চরণে যাচ্ছেন। অতসুমিচিকে বললেন, ছোট ভাই আমার, আমার অবর্তমানে তুমি ইঝোমির দায়িত্ব নেবে। সে কবি বটে কিন্তু খুব অসহায়। তা বলেই হারিয়ে গেলেন তামেতাকা। গভীর রাতে অতসুমিচি এসে ইঝোমির দরজায় টোকা দিয়েছেন। তখনই ইঝোমির ঘুম ভাঙ্গলো। অতসুমিচি তাকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন, বললেন- ঘুম আসছিল না, তাই এলাম। এ পবিত্র জ্যোৎস্নায়ও তুমি আমাকে গ্রহণ করবে না?

ইঝোমি বুঝতে পারছেন না, তিনি কী স্বপ্ন দেখছেন, মনে হচ্ছে বাস্তবেই প্রিন্সের পাশে আছেন। দু’হাত ওপরে তুলে তাকে বিরত করার চেষ্টা করলেন। পরে বললেন, এত রাতে এখানে?

বলেছি তো জ্যোৎস্ন জোয়ারে টিকতে পারলাম না, সঙ্গী খোঁজা মাছেদের মতো ছুটে এলাম। রক্ষা করো আমায়। দয়া করো।

ইঝোমির কানে শেষ কথাগুলো যায়নি। তিনি ভাবছিলেন স্বপ্নের কথা। তামেতাকা অতসুমিচিকে তার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত।

অতসুমিচি তাকে চিন্তিত দেখে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে এলেন। ইঝোমি তার বাহুর মধ্যে। তার ঠোঁট ইঝোমির ঠোঁটের ওপর। ইঝোমি তাকে বাধা দেয়ার কোনো চেষ্টাই করলেন না। রক্ষককে ভক্ষক হতে দিলেন। ঘটনাটা এত তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে গেল যে, উভয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

অতসুমিচির জ্যোৎস্না-ভালোবাসা, ইঝোমি-প্রেম আজ এটুকুই। ফিরে গেলেন তিনি। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ইঝোমি। তার কাছে আজ আর জ্যোৎস্না সুন্দর নয়, জ্যোৎস্না রাত পবিত্র নয়। সবকিছু ম্লান এবং ওই চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা কলঙ্কের মতো মনে হয়। গ্লানিময় লাগছে তামেতাকার ভালোবাসাও।

তার মনের যে অংশটা অতসুমিচির পক্ষ নিয়েছিল তা এখন আর কোনো যুক্তি দাঁড় করিয়ে কাজটিকে সমর্থন করছে না। তাই গ্লানিবোধটা একতরফা হচ্ছে।

যে জ্যোৎস্না সন্ধ্যারাতে তামেতাকাকে নিয়ে কবিতার জন্ম দিয়েছিল, তা এখন যেন চন্দ্রগ্রাসে জীবনের অর্থহীনতাকে ক্রমে ক্রমে গ্রহণীয় করছে। তিনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে যেন দেখতে পাচ্ছেন চন্দ্রগাস চলছে। তাই জ্যোৎস্নাও ক্রমে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে টেনে টেনে নিয়ে এলেন কক্ষের মধ্যে। এখানটায় ঘন অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

মেয়ের মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভাঙ্গলো তার। তা হলে তিনি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন। খাটে বসে ঘামছেন তিনি। ব্যাপারটার এটা সমঝোতাপূর্ণ অবস্থায় যেতে হবে। আর কত সহ্য করা যাবে। কী করবেন তিনি?

চাঁদটা পশ্চিমের আকাশে হেলে পড়েছে বাইরে এসে দেখলেন তিনি। বাতাস বইছে। ফুলের সুবাস আসছে। সম্রাট রেইঝেই সৌখিন মানুষ। তার বাগান নানা ফুলে সুশোভিত। প্রকৃতি আগের জায়গায়ই আছে। মন থেকে বাজে স্বপ্নটা মুছে ফেলতে চাইলেন তিনি। মনে পড়ল সন্ধ্যা রাতের কবিতাটির কথা। আবৃওি করলেন তার অংশ বিশেষ :

সকালের চাঁদ/আমি রোজ দেখি প্রতি রাতে। ক্রমশ...

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

দিনান্তবেলায়

ছবি

বাংলা সঙ্গীতের আধুনিকায়নে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

ছবি

নূরুল হকের অপ্রকাশিত কবিতা

ছবি

মালা থেকে খসে পড়া একটি ফুল একজন নূরুল হক

ছবি

অন্তরালের কবি নূরুল হক

ছবি

কবি নূরুল হক তাঁর স্মৃতি ও কবিতা

ছবি

শেষ চুমুকের আগে : জীবনের বাইপাসে ব্যক্তিগত ভ্রমণ

ছবি

শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে

ছবি

স্বপ্নের হাতি

ছবি

বর্ষামঙ্গল ও শৈলজারঞ্জন মজুমদার

ছবি

ডিগ্রি ডাক্তার ও কর্পোরেশনের দাঁত

ছবি

বর্ষা ও বিবিধ কাব্য

ছবি

গণমানুষের অর্থনীতি ও বঙ্গবন্ধু

ছবি

শূন্যস্থান

ছবি

দিনান্তবেলায়

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

অদ্বৈত মল্লবর্মণ

ছবি

অ্যান্ড্রু মোশনের প্রোজ পোয়েট্রি

ছবি

সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অর্জন

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

মুগ্ধপাঠ: একটি প্রবন্ধ সংকলন

সাবলীল বর্ণনায় অন্তর্গত দুঃখগাথা

ছবি

দিনান্তবেলায়

ছবি

বিন্দু ও বৃত্তে

ছবি

ফুলের আর্তনাদ

ছবি

মোম জোছনার সিলসিলা

ছবি

মান্টোর সঙ্গে একদিন

ছবি

জীবনবৃত্ত নয়, জাতীয় জীবনের প্রামাণ্য বৃত্তান্ত

ছবি

অরবিন্দ পোদ্দার স্মরণে

ছবি

শিকিবু

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কার্লোস হুগো গ্যারিডো চালেন-এর কবিতা

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : এগার

শিকিবু

আবুল কাসেম

image

বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিশ

তামেতাকার মৃত্যু সংবাদে খুব খুশি হয়েছেন সম্রাজ্ঞী শোশি। তার মনে হলো এবার ইঝোমিকে পেতে আর বাধা রইল না।

সম্রাজ্ঞী শোশি তার বাবা মিচিনাগাকে বললেন, প্রাক্তন সম্রাট রেইঝেইকে বলে এখনই ইঝোমিকে নিয়ে আসতে হবে।

বাবা ঝানু কূটকৌশলী। মেয়েকে বললেন, এখন সম্রাটের মন খারাপ। ইঝোমিরও। দেখবে ইঝোমি নিজে থেকেই চলে আসবে। সে প্রাসাদে তার ভালো লাগতেই পারে না।

তার মনে হলো কন্যার বয়স কম হলেও এ যাত্রা তাকে বুঝাতে সক্ষম হলেন পিতা। শিশু কন্যা যেন পুতুলের বায়না ধরছেন, আর অক্ষম পিতা তাকে বুঝ দিচ্ছেন।

এদিকে সম্রাজ্ঞী তেইশেই একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তামেতাকার প্রাসাদ ছেড়ে ইঝোমি নিশ্চয়ই শোশির দরবারে উপস্থিত হবেন। এ দুর্ভাবনায় কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত তা নিয়ে সেই শোনাগন ছাড়া অন্যসব লেডিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। সেই শোনাগনকে বললেন না, তাকে চাপে রাখার জন্য। তিনি শুনেছেন সেই শোনাগন ইদানীং কোনো এক যুবকের সঙ্গে নাকি পত্র কবিতার যোগাযোগ তৈরি করেছেন। নানা অশান্তিতে আছেন তিনি নানা দিক থেকে।

অন্যান্য লেডিরা পূর্বসূত্র ধরে ইঝোমি সম্পর্কে সম্রাটের কানভারি করতে সম্রাজ্ঞী তেইশিকে পরামর্শ দিলেন। তার কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হলো।

প্রথমা ও বড় সম্রাজ্ঞীর প্রতি সম্রাটের দুর্বলতা আছে, না হয় বৈরি পরিবেশে কবেই তিনি ছিটকে যেতেন। তা সম্রাজ্ঞী তেইশি নিজেও জানেন। তাই তার অনেক অন্যায় আবদারও সম্রাট ইচিজো রক্ষা করেন। তেইশি সে সুযোগটা গ্রহণ করেন। সম্রাজ্ঞী সম্রাটের খাস কক্ষে গেলেন। সম্রাট তাকে স্বাগত জানালেন। সম্রাজ্ঞী বললেন যে, সম্রাট রেইঝেইয়ের পুত্র তামেতাকার অকাল মৃত্যুতে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে এ শোক বোধ হয় কাটাতে পারবেন না।

সম্রাট বললেন, খুবই কষ্ট পেয়েছেন। আমি গিয়ে শোক জানিয়ে এসেছি।

ঐ মেয়েটা মনে হয় এর জন্য দায়ী।

সম্রাট রেইঝেই তো তাকে পছন্দ করেন। প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল। তিনি যেতে দেননি।

নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। তবে তিনি ঠিক করেননি। অপয়া এই দুশ্চরিত্রা মেয়েকে প্রাসাদে রেখে অকল্যাণই বয়ে আনছেন।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেই সোনাগান।

মেয়েটা লেখে ভালো।

ভালো লেখে না, ছাই। আমি চাই না অভিশাপ নিয়ে সে কখনো এ প্রাসাদে আসুক।

আমি বুঝতে পেরেছি।

আমি বুঝতে পারি না বিবাহবহির্ভূতভাবে প্রিন্সের সঙ্গে থাকা একটা মেয়ের প্রতি সম্রাট রেইঝেই কেন এত সহানুভূতি দেখাবেন।

তার কাজের সমালোচনা কি আমরা করতে পারি?

তা পারি না। আমিও শ্রদ্ধা করি তাকে। কিন্তু অশ্রদ্ধা হতে পারে এমন কাজ তিনি কেন করবেন? তিনি ছেলের মরদেহ সামান্য দাহ করে পূর্ণভাবে সমাধিস্থ করেছেন। না মেনেছেন বৌদ্ধ রীতি, না মেনেছেন শিন্টু সংস্কার।

এটা তুমি ঠিক বলোনি। তিনি উভয় রীতিই মেনেছেন এবং আমাদের সকল সংস্কার মেনে কাজ করেছেন। এ বিষয়টা থাক। তুমি অন্য কিছু বল।

সম্রাজ্ঞী তেইশি বুঝতে পারলেন এতটা বলা বোধহয় ঠিক হয়নি। তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বললেন, মহামারী কবে শেষ হয় কে জানে, সকলেরই সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। জীবন কেমন যেন ঝিমিয়ে যাচ্ছে।

তোমার লেডি সেই শোনাগনের কী অবস্থা? তোমার দরবারে নাকি চায়নিজ ক্ল্যাসিকের চর্চা হয়?

চর্চা হয় না মহামান্য সম্রাট, তা নিয়ে আলোচনা নয়, চীনা সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হয়।

মহামারীর সময়ে চীনা সাহিত্য কেন?

নিজেদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। আপনাকে নিশ্চয়ই তা সম্রাজ্ঞী শোশি বলেছে।

সে কারো কথা বলে বেড়ায় না।

বলে বেড়াবার মতো বাবা থাকলে তার বলার দরকার কি?

মিচিনাগা এতটা নিচে নামবেন না। যাই হোক, এখন তুমি এসো সম্রাজ্ঞী।

সম্রাজ্ঞী তেইশি মন খারাপ করেই চলে গেলেন।

সেই শোনাগনকে গিয়ে বললেন, আমরা চীনা ভাষার চর্চা করি এ কথা দরবারের বাইরে গেল কেমন করে?

সেই শোনাগন অবাক হলেন। বললেন, তাতো গোপনীয়ভাবে হচ্ছে, তা বাইরে গেল কী করে?

এ প্রশ্ন তো আমার। তা সম্রাটের কানে গেছে।

সর্বনাশ। এটাতো খুব খারাপ সংবাদ। কিছু দিন আমরা চর্চা বন্ধ রাখি।

তাই করো। চারদিকে সমস্যা। ইজোমির সংবাদ কিছু রাখো?

তার এখন দুঃসময়।

তা আমি জানি এবং তা নিয়ে আনন্দিত হবার কিছু নেই। সুসময় আসতে দেরি হবে না, তার সম্ভাবনাই প্রবল।

ক্ষমা করবেন সম্রাজ্ঞী, এ নিয়ে কি আপনার কানে কিছু এসেছে?

তুমি তৈরি থাকো শোনাগন। আমার দরবারের আলো ছাড়িয়ে কোনো দরবার যেন বেশি আলো না ছড়ায়।

আমি আগেও বলেছি, এ নিয়ে ভাববেন না, আপনার বড়ত্ব বহাল থাকবে। আপনার রুচিবোধ এবং সাহিত্যপ্রীতি সবার ওপরে স্থান পাবে।

তোমার লেখা পত্র কবিতাগুলো আমাকে দেখাওনি।

আমার পত্র কবিতা লেখার কেউ নেই মহামান্যা। আপনার জন্যই আমার সব লেখা : গদ্যনিবন্ধ, পর্যবেক্ষণ এবং ওয়াকা কবিতা।

তা ঠিক আছে। কিন্তু আমি এমন কোনো কথা শুনতে চাই না, যা তোমার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে।

আপনার মর্যাদা সম্পর্কে আমি সচেতন। আর ইঝোমি শিকিবুর খোঁজখবর নিচ্ছি আমি।

বেশ তাই করো।

প্রাক্তন সম্রাট রেইঝেই পুত্র প্রিন্স তামেতাকার সমাধি সৌধ নির্মাণ করে দিয়েছেন সুন্দর এক স্থাপত্য নকশা অনুসরণ করে। সে সৌধে ফুল দিতে গেছেন ইঝোমি। শোকের কালো পোশাকটা তখনও পরে আছেন। সঙ্গে আছে মেয়েটি। ফিরে এসে লিখলেন:

‘পৃথিবী ছাড়ার সময়

একজন কোথায়

তার বাড়ি নির্মাণ করবে?

ওহারা পর্বতে?

একটি মনোরম জায়গাই বাস করার।’

জায়গাটি ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না তার। তবুও তাকে ফিরে আসতে হল। প্রাসাদে এসে ইমনের কিছু উপহার এবং একটি কবিতা পেলেন। উপহার নয়, কবিতাটিই তাকে বেশি আকর্ষণ করল। কবিতাটি এরকম :

‘যে যায়, এবং

তোমরা যারা থাকো, কী

অনুভব কর তুমি? অবাক হই আমি

বিচ্ছেদের শেষে

আরো একবার বিষাদ...’

কবিতাটি পাঠ করে মৃদু হাসলেন। বৈধব্য শোকের পোশাকর সঙ্গে তা সহসাই মিলিয়ে গেল। অস্ফুটে বললেন, হ্যাঁ, বিচ্ছেদের শেষে আরো একবার বিষাদ।

মুরাসাকির দিনগুলো আগের চেয়ে খারাপ যাচ্ছে। তার বিষাদগ্রস্ত মনে ইঝোমির শোক যুক্ত হয়েছে। ওয়াকায় লিখলেন :

‘আমি বয়োপ্রাপ্ত তুমি ঝরে গেলে

তীব্র শোক বলে

এই বিশ্বে তোমার কিছুই জানা নেই

আমার নির্জনশূন্য বাগানেই

ভেসে যাওয়া উহ প্রথম বরফ ফলক!’

এক সময় অনুভব করেন ইঝোমির মতো বুঝি তার জীবনও শেষ হয়ে গেছে। কিছুদিন শোকটা ভুলেছিলেন, আবার যেন ইঝোমির কালো কিমোনোর মতোই তাকে অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে ফেললো। কান্নার মতো বুঝি শোকটাও সংক্রামক। বিষণœতা আবার সঙ্গী হলো। তা কাটিয়ে ওঠা এবার সত্যিই খুব কঠিন।

ইমন এলেন একদিন তার কাছে। ইমন খুবই সামাজিক মানুষ। সবার খোঁজখবর নিতে পছন্দ করেন। মুরাসাকি এবং ইঝোমির স্বামী মারা যাবারপর তাদের প্রতি তার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। মুরাসাকিকে ভেঙ্গে পড়তে দেখে একটু চিন্তিতই হলেন। কিন্তু বুঝতে দিলেন না। আজ হাতে করে কাগেরো নিক্কি (উত্তপ্ত ডায়েরি) নিয়ে এসেছেন। এটি এখন কাজে লাগলো। বললেন, কত কষ্টে একজন নারী জীবনধারণ করেন এই ডায়েরি তার প্রমাণ। অথচ ভালো পুরুষগুলো চলে যান।

ডায়েরিটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন মুরাসাকি। অন্য সময় হলে উচ্ছ্বাসপ্রবণ হয়ে পড়তেন। এখন হলেন না। শোকের কালো পোশাক ইঝোমির গায়ে, আর মুরাসাকির অন্তরে।

ইমন সদ্য লেখা একটি কবিতা এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়। ডায়েরিতে লেখা কবিতাটি এরকম :

‘ফেরা নয়, এবং

শিনোদায় মাত্র কিছুক্ষণ

তোমার তাকিয়ে থাকা দেখে ছিল বন

তুমি হয়ত প্রত্যাবর্তন করবে পুনরায়

মৃদুমন্দ বায়ু নিচে পাতাদের দোলায়।’

সুন্দর হয়েছে। মন্তব্য করলেন মুরাসাকি এবং ইমনের দিকে তাকালেন। ইমন বললেন, ইঝোমিকে লেখা কবিতা পত্রটা।

তাই? পড়ে তার ভালো লাগবে।

লাগবে না। প্রিন্স অতসুমিচি তার কাছে আসা-যাওয়া শুরু করেছে। সেও যাচ্ছে।

মুরাসাকি যেন শোক ঝেড়ে ফেলে অবাক হয়ে বললেন, কী! আবারো?

একুশ.

মুরাসাকি আবার বইপুস্তক, বিশেষ করে ‘বাঁশ কর্তনকারীর উপাখ্যান’, ‘ইছের উপাখ্যান’ এবং প্রপিতামহের লেখা ‘ইয়ামাতো উপাখ্যান’ পাঠ করলেন। উপাখ্যান বা মনোগাতারি সাহিত্যের মাধ্যমে তার এ ধারার সাহিত্য সম্পর্কে, বিশেষ করে গল্প বা কাহিনী রচনার ধারণাটা পাকাপোক্ত হয়েছে।

ইশিয়ামা ডেরার পাশেই বিওয়া হ্রদ। জ্যোৎস্না রাতে হ্রদের সৌন্দর্য পাগল করে দেয়ার মতো। এ সময় হাজার কবিতারা ভিড় করে চিন্তায়। না মুসাকির ওপর কোনো কবিতার ভাব ভর করেনি, গদ্যের এক বিশাল জাহাজ যেন ভিড়েছে।

সময়টা আগস্ট মাস। জ্যোৎস্না রাতের অপূর্ব সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে মুরাসাকি কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে শুরু করে দিলেন। নাম দিলেন ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’। হয়ত কিছুদিন যাবতই গল্পটা মাথায় তৈরি করছিলেন। জ্যোৎস্না রাতের বিওয়া সৌন্দর্য বিগলিত জ্যোৎস্নার মতোই ঝকঝকে গদ্যের বহতা এনে দিয়েছে।

লিখলেন- সম্রাট কিরিতসুবোর দ্বিতীয় সন্তান গেঞ্জি। মাত্র তিন বছর বয়সে তার মাতৃবিয়োগ ঘটে। গেঞ্জি সম্রাটের এক উপপতœীর সন্তান। তা হলেও সম্রাট তাকে খুব পছন্দ করেন। সন্তানের মায়ের কথাও ভুলতে পারেন না। ছেলেটির জন্য কষ্ট হয় তার।

এ সময় একদিন সম্রাট একজন রমণীর খোঁজ পেলেন, যে কিনা দেখতে হুবহু গেঞ্জির মায়ের মতো। নাম ফুজিতসুবো। প্রাক্তন এক সম্রাটের মেয়ে। সম্রাট তাকে বিয়ে করলেন। গেঞ্জি তাকে মা বলে গ্রহণ করে, মেনে চলে এবং তার স্নেহে লালিত-পালিত হয় (সংক্ষেপিত)।

শুরুটা নিজেকে চমকে দেয়। চমকে দেয় তার বন্ধু-বান্ধবদেরও। বেশি অবাক হন আকাঝোমি ইমন। তিনি কতগুলো কপি করান এবং হেইয়ান সম্রাটের দরবারে বিলি করেন। সবাই উৎসাহ নিয়ে পাঠ করছে লেখাটা। পরের অংশ তাদের আরো বেশি চমকিত করে। কারণ এখানে ছিল অভাবিত কিছু, যা তারা কল্পনাও করেননি।

এই অংশের শুরু করলেন এভাবে- গেঞ্জি যৌবনে উপনীত হয়েছে। অত্যন্ত সুদর্শন। হিকারো বা সাইনিং গেঞ্জি। সম্রাটের দরবারে তার একটা চাকরি হয়েছে। তবে তা নিম্নপর্যায়ের রাজকর্মচারী হিসেবে। তাতে তেমন গৌরব নেই। নেই তেমন মর্যাদাও। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার গেঞ্জি। তার মধ্যেও তার বিয়ে হয় নো অয়ি নামে এক সুন্দরীর যুবতীর সঙ্গে। কিছুদিন পরই গেঞ্জি উপলব্ধি করে সে নো অয়িকে নয়, সৎমা ফুজিতসুবোকে ভালোবাসে। সে তার প্রেমে পড়ে যায় এবং এদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় (সংক্ষেপিত)।

এ অধ্যায় পড়ে পাঠকদের বিস্ময়ের অবধি রইল না। কাহিনীর নতুন মোড় তাদের পরবর্তী লেখাগুলোর জন্য দারুণ উদ্গ্রীব করে তুলল।

ইমনকে সম্রাজ্ঞী শোশি ডেকে পাঠালেন। বললেন, কে এই লেখিকা চারদিকে কেবল তার সুখ্যাতিই শুনছি।

ইমন মুরাসাকির পরিচয় তুলে ধরলেন।

শোশি বললেন, তাকে আমি চাই। তুমি তাকে সম্রাটের প্রাসাদে আনার ব্যবস্থা করো।

আমার কথায় সে কি আসবে?

ঠিক আছে আমিই সে ব্যবস্থা করছি।

শোশি তার বাবার কাছে আবার সে আবদার করলেন। সম্রাজ্ঞী শোশির বাবা মিচিনাগা মুরাসাকিদের ভালোভাবেই চেনেন। বললেন, তুমি ভেবো না, সে তোমার দরবারে আসবে, আমি ব্যবস্থা করছি।

এক বিকেলে নিজেই উপস্থিত হলেন ইশিয়ামা ডেরায়। ঐশ্বর্য এবং আভিজাত্য দেখে নিজেই চমকে উঠলেন। বললেন, তাকাকু তোমাদের পারিবারিক বনেদিয়ানার কথা আমি জানি। আমি কেন, সবাই জানে। নোবুতাকা উৎসব-অনুষ্ঠান বিভাগে আমার প্রিয় পাত্র ছিল। আমি একটা ইচ্ছা নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। তুমি একজন অত্যন্তগুণী লেখিকা। তোমার সুনাম শুনে আমার গর্ব হচ্ছে। তুমি নিভৃতে এই ডেরায় পড়ে থাকবে তা হয় না। তুমি শোশির দরবারে লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে চলে এসো। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, সেখানে তোমার মর্যাদার কোনো অভাব হবে না।

আপনি জানেন নিশ্চয়ই, আমি মানসিকভাবে ভালো নেই। সম্রাজ্ঞীর দরবারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আমাকে দিয়ে কি তা হবে, হবে না। আমি শুনেছি ইঝোমি ও ইমনেরা আছেন, তারাই যথেষ্ট নয় কি?

তাদের বাইরেও আছে। কিন্তু তোমার মতো গুণী কেউ নেই। তোমাকে সেখানে কিছুই করতে হবে না। তোমার উপস্থিতি তার দরবারের গৌরব বাড়াবে- এই যা। তুমি আর আপত্তি করবে না তাকাকু।

আমাকে একটু ভাবতে দিন মহামান্য।

ঠিক আছে তুমি ভাবতে থাকো। ভেবে আমাকে জানাবে। আমার মেয়ে তোমার পথপানে চেয়ে আছে।

তিনি কি চান?

তার দরবার তোমাদের মত গুণী মানুষদের পদার্পণে সরগরম হয়ে উঠবে- এই যা।

আচ্ছা, আমি জানাব আপনাকে।

বাবার আসার কথা আছে। তিনি এলে মুরাসাকি তার সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন। তার আগে তিনি ইমনের সঙ্গে কথা বলতে চান।

এদিকে ইঝোমি একটা চরম সংকটে পড়ে দারুণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন। ব্যাপারটা এমন যে কারো সঙ্গেই কথা বলতে পারছেন না। ইমনের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতো, তিনি আগে থেকেই কবিতার মাধ্যমে একটা বার্তা দিয়ে রেখেছেন।

প্রিন্স অতসুমিচি আজও বিকেলে এসেছিলেন। তার ওপর অসম্ভব চাপ। তামেতাকার মৃত্যুতে মানসিকভাবে সত্যিই ভেঙ্গে পড়েছেন। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তবে মনের ভেতর কেমন যেন তাগিদ বোধ করছেন, মনটা অতসুমিচির পক্ষ নিয়ে তাকে ভোগাচ্ছে।

সন্ধ্যায় তার বারান্দায় ফুটফুটে চাঁদের আলো। গত মাসেও এ আলোয় এক সঙ্গে ছিলেন প্রিন্স তামেতাকার সঙ্গে। তা ভেবে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয়ে গেল। চাঁদের আলোয় যাবেন না পণ করেছেন। কিন্তু পণটা রক্ষা করা গেল না। তিনি নেই তাতে কী চাঁদের তো আলো আছে। এই আলো বন্ধন তৈরি করে দিত। এ রকম মনে হতেই বারান্দায় ছুটে গেলেন। যে মন এখন তার বিপক্ষে কাজ করে তার কথায় বারান্দায় এসে মনে হল আমি কী হেরে যাচ্ছি। সেখানে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয়ই দু’চোখ ভাসিয়ে কাঁদলেন। পরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে একটি কবিতার জন্ম হল :

‘সে অভ্যস্ত

চেহারা এখন আর নেই

আমার বাড়িতে

সকালের চাঁদ

আমি রোজ দেখি প্রতি রাতে।’

বারান্দা থেকে ফিরে এসে ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করলেন তা এবং ক্ষমা চাইলেন তামেতাকার আত্মার কাছে।

রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্ন দেখলেন। তামেতাকা গভীর রাতে স্বপ্ন সঞ্চরণে যাচ্ছেন। অতসুমিচিকে বললেন, ছোট ভাই আমার, আমার অবর্তমানে তুমি ইঝোমির দায়িত্ব নেবে। সে কবি বটে কিন্তু খুব অসহায়। তা বলেই হারিয়ে গেলেন তামেতাকা। গভীর রাতে অতসুমিচি এসে ইঝোমির দরজায় টোকা দিয়েছেন। তখনই ইঝোমির ঘুম ভাঙ্গলো। অতসুমিচি তাকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন, বললেন- ঘুম আসছিল না, তাই এলাম। এ পবিত্র জ্যোৎস্নায়ও তুমি আমাকে গ্রহণ করবে না?

ইঝোমি বুঝতে পারছেন না, তিনি কী স্বপ্ন দেখছেন, মনে হচ্ছে বাস্তবেই প্রিন্সের পাশে আছেন। দু’হাত ওপরে তুলে তাকে বিরত করার চেষ্টা করলেন। পরে বললেন, এত রাতে এখানে?

বলেছি তো জ্যোৎস্ন জোয়ারে টিকতে পারলাম না, সঙ্গী খোঁজা মাছেদের মতো ছুটে এলাম। রক্ষা করো আমায়। দয়া করো।

ইঝোমির কানে শেষ কথাগুলো যায়নি। তিনি ভাবছিলেন স্বপ্নের কথা। তামেতাকা অতসুমিচিকে তার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত।

অতসুমিচি তাকে চিন্তিত দেখে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে এলেন। ইঝোমি তার বাহুর মধ্যে। তার ঠোঁট ইঝোমির ঠোঁটের ওপর। ইঝোমি তাকে বাধা দেয়ার কোনো চেষ্টাই করলেন না। রক্ষককে ভক্ষক হতে দিলেন। ঘটনাটা এত তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে গেল যে, উভয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

অতসুমিচির জ্যোৎস্না-ভালোবাসা, ইঝোমি-প্রেম আজ এটুকুই। ফিরে গেলেন তিনি। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ইঝোমি। তার কাছে আজ আর জ্যোৎস্না সুন্দর নয়, জ্যোৎস্না রাত পবিত্র নয়। সবকিছু ম্লান এবং ওই চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা কলঙ্কের মতো মনে হয়। গ্লানিময় লাগছে তামেতাকার ভালোবাসাও।

তার মনের যে অংশটা অতসুমিচির পক্ষ নিয়েছিল তা এখন আর কোনো যুক্তি দাঁড় করিয়ে কাজটিকে সমর্থন করছে না। তাই গ্লানিবোধটা একতরফা হচ্ছে।

যে জ্যোৎস্না সন্ধ্যারাতে তামেতাকাকে নিয়ে কবিতার জন্ম দিয়েছিল, তা এখন যেন চন্দ্রগ্রাসে জীবনের অর্থহীনতাকে ক্রমে ক্রমে গ্রহণীয় করছে। তিনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে যেন দেখতে পাচ্ছেন চন্দ্রগাস চলছে। তাই জ্যোৎস্নাও ক্রমে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে টেনে টেনে নিয়ে এলেন কক্ষের মধ্যে। এখানটায় ঘন অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

মেয়ের মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভাঙ্গলো তার। তা হলে তিনি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন। খাটে বসে ঘামছেন তিনি। ব্যাপারটার এটা সমঝোতাপূর্ণ অবস্থায় যেতে হবে। আর কত সহ্য করা যাবে। কী করবেন তিনি?

চাঁদটা পশ্চিমের আকাশে হেলে পড়েছে বাইরে এসে দেখলেন তিনি। বাতাস বইছে। ফুলের সুবাস আসছে। সম্রাট রেইঝেই সৌখিন মানুষ। তার বাগান নানা ফুলে সুশোভিত। প্রকৃতি আগের জায়গায়ই আছে। মন থেকে বাজে স্বপ্নটা মুছে ফেলতে চাইলেন তিনি। মনে পড়ল সন্ধ্যা রাতের কবিতাটির কথা। আবৃওি করলেন তার অংশ বিশেষ :

সকালের চাঁদ/আমি রোজ দেখি প্রতি রাতে। ক্রমশ...

back to top