alt

সাময়িকী

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

মাসুদ রহমান

: বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর ২০২১

ধর্মের সাথে সমাজ-সংস্কৃতি-সংস্কারের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল মধ্যযুগ অবধি। একালে যে একেবারে সংলগ্নতা হারিয়েছে এমন নয়। মধ্যযুগে সর্ববিষয়ে ধর্মের সম্মতি লাগতো, পার্থক্য এমনকী বিরোধ যদি বা কিছু থাকতো সেগুলো নানা ধর্মমতের আচরণ-প্রণালিগত। আধুনিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনায়, আইন-আদালতে, নানা ক্রিয়াকর্মে ধর্মকে সরিয়ে বা একটু পাশে রেখে দেওয়ার প্রবণতা-প্রথা কমবেশি আছে। তবে মধ্যযুগ পর্যন্ত সকল দেশে শিল্পসাহিত্যও ধর্ম-প্রভাবিতই ছিল। বাংলা সাহিত্যের এতাবৎ প্রাপ্ত প্রাচীনতম সাহিত্যনিদর্শন চর্যাপদও মূলত ধর্মসংগীত- বৌদ্ধসহজিয়াদের সাধনসংকেত। সেই বৌদ্ধদের একরকম বিতাড়নের ইঙ্গিত আছে চর্যাপদে। তবে তারও আগে থেকে থাকা হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতি আর পরবর্তীকালে প্রবেশিত ইসলাম সমাজ-রাষ্ট্রে প্রবল ও অটল হয়। বাংলা-ভারতে হিন্দুমতের সহজিয়া রূপ বৈষ্ণব আর ইসলামের সুফিসাধনার বঙ্গায়ন। তিন প্রবল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে উদ্ভূত এইসব সহজিয়া মতপথ একসময় একান্ত বাঙালি সাধন মত ও পন্থার সৃষ্টি করেছে; মরমি ও মানবজাগতিক সেই মত বাউলদর্শন।

উনিশ শতকের আধুনিকতা-অভিঘাতের কালে বস্তুবাদীদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য বলে সম্মানিত অক্ষয়কুমার দত্ত। এই ইহজাগতিকতাবাদী লিখেছিলেন দুখণ্ডের বৃহদাকায় গ্রন্থ ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়। এটি আর দশজন অতিআধুনিক বাঙালির জীবনসায়াহ্নে অতিধার্মিকতার সাক্ষ্য নয়। গ্রন্থটি নির্মোহ গবেষণারই ফসল। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য পেশ ও বেফাঁস বক্তব্য পাওয়া যায় বইটিতে। এই যেমন বাউলমাত্রই বিপাকীয় বস্তু পান-ভক্ষণ করে। “শুনিতে পাই” সহযোগে জানিয়েছেন যে, বাউলেরা “নর-মাংস-ভোজন ও শবের বস্ত্র সংগ্রহ করিয়া পরিধান করে”। ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী রেনেসাঁর অন্যতম ব্যক্তির এই বক্তব্য উদ্ধারের পাশাপাশি সেই রেনেসাঁর প্রধান পুরুষ রামমোহনের “বাউলের মরমিচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই ভাব নিয়ে কিছু ব্রহ্মসংগীত রচনা”রও তথ্য দিয়েছেন। বেদান্তের আধুনিক ভাষ্যকার রামমোহন সংগীত রচনার সময় বাউলমত দ্বারা কতোখানি প্রভাবিত হয়েছিলেন সে আলোচনা এখানে করার সুযোগ নেই, তবে একথা তো সত্য, রেনেসাঁর শ্রেষ্ঠ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ বাউলের প্রতি প্রীতিময় ও বাউলদর্শনপ্রিয় ছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাউল বাঙালিরই সম্পদ, তবে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সাথে তার সম্পর্ক বহুভঙ্গিম। অধ্যাপক চৌধুরীর সুবাদে আমরা বাউলের প্রতি সমাজের প্রভাবশালীদের আর ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধতার ইতিহাস জেনেছি আবার একই সাথে বর্তমানে দেখছি সাধারণের মধ্যে বাউল গানের জনপ্রিয়তা, শিক্ষিতজনদের বাউল অনুসন্ধিৎসা। এই শেষোক্ত বিষয়টি, এমনকী বাউল গান যে বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এই প্রাপ্তির পিছনেও আমাদের আলোচ্য গ্রন্থের রচয়িতা আবুল আহসান চৌধুরীর উল্লেখনীয় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের এ দাবির পক্ষে দু-তিনটি তথ্য দিতে চাই। রবীন্দ্রনাথের কারণে শিক্ষিত সমাজ বাউলদের প্রতি কিছুটা সসম্মানে তাকাতে শুরু করেছিল, কিন্তু সেটি তেমন ধারায় পরিণত হয়নি। আরও পরে যাদের কারণে লোকায়তনের বাইরে লালন ও বাউলেরা বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করলো- গানের ক্ষেত্রে এক-দুজন কিংবদন্তি শিল্পী আছেন সত্য, আর গবেষণা-লেখালেখির ক্ষেত্রে যাঁদের অবদান সর্বাগ্রে, তাঁদের একজন আবুল আহসান চৌধুরী। তাঁর গবেষণা আমাদের সাহিত্য ছাড়াও শিল্পজগতের অন্যান্য ক্ষেত্রের মানুষদের আকর্ষণ, আগ্রহ ও আস্থার উৎস। যেমন অন্নদাশঙ্কর রায় চাকুরিসূত্রে একসময় কুষ্টিয়ায় ছিলেন, বাউলদের তখন থেকেই পছন্দ করতেন বটে, কিন্তু বাউল নিয়ে লেখালেখি ও পরবর্তীকালে ওপার বাংলায় বাউল সাধকদের ও সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতায় যে যুক্ত হয়েছেন, তার জন্যে একাধিক লেখায় আবুল আহসান চৌধুরীর অবদানের কথা উদাত্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। আমাদের আলোচ্য বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে “লালনমনস্ক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়”কে। সব্যসাচী সাহিত্যিক সুনীলের লালনমনস্কতা শিল্পে অভিব্যক্ত হয়েছে আবুল আহসানের কারণে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস মনের মানুষ রচনার জন্যে মুক্তকণ্ঠে ডক্টর চৌধুরীর অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। উপন্যাসটির ‘লেখকের বক্তব্য’ অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করলে বোঝা যায়, সুনীলের এ-সংক্রান্ত অভিজ্ঞান প্রধানত আবুল আহসানের গবেষণা-মূল্যায়নের প্রতিধ্বনি। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসেরই চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে বরেণ্য নির্মাতা গৌতম ঘোষের পরিচালনায়। সেটির চিত্রনাট্যও আবুল আহসান চৌধুরী গ্রন্থনা ও ভূমিকাযোগে প্রকাশিত হয়েছে। এমনই অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব হলেও বাহুল্য বিবেচনায় তা থেকে সরে আসা গেল।

বাউল বাঙালিরই সম্পদ, তবে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সাথে তার সম্পর্ক বহুভঙ্গিম। অধ্যাপক চৌধুরীর সুবাদে আমরা বাউলের প্রতি সমাজের প্রভাবশালীদের আর ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধতার ইতিহাস জেনেছি আবার একই সাথে বর্তমানে দেখছি সাধারণের মধ্যে বাউল গানের জনপ্রিয়তা, শিক্ষিতজনদের বাউল অনুসন্ধিৎসা

আপাতত এই আনন্দ সংবাদ নিয়ে কথা বলতে চাই যে, বিগত অর্ধশতক ধরে লালন ও বাউল নিয়ে গবেষণায় নিরত আবুল আহসান চৌধুরীর আরেকটি বই আমরা পেয়েছি লালনের ঈশ্বর ও অন্যান্য নামাঙ্কনে। গ্রন্থস্থ প্রবন্ধসমূহের শিরোনাম: ‘বাঙালির সমাজমন ও বাউল’, ‘পূর্ববঙ্গের বাউল : অন্তরঙ্গ চালচিত্র’, ‘নারী ও লালন’, ‘বাউল নিগ্রহের পরম্পরা ও লালন’ এবং ‘লালনের ঈশ্বর’। বস্তুত প্রথম প্রবন্ধই আমাদের এতক্ষণের প্রস্তাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘পূর্বখণ্ডের বাউল : অন্তরঙ্গ চালচিত্র’ কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার ‘বাউল আমার একতারাতে’ শীর্ষক প্রধান আয়োজনের অংশ হিসেবে বের হয়েছিল। পত্রিকাটির ১৮ জানুয়ারি ১৯৯২ তারিখের সংখ্যায় পত্রস্থকালে নাম ছিল ‘চালচিত্র : বাংলাদেশের বাউলদের’। আমাদের বিবেচনায়, সে নামকরণই অধিক যুক্তিযুক্ত ছিল। কারণ এ-আলোচনা বাংলাদেশের বাউল-কেন্দ্রিকই বটে। শুধু শব্দবৈচিত্র্যের প্রয়োজনেই নয়, আলোচক হয়তো সচেতনভাবেই ‘পূর্ববাংলা’ শব্দটি পরিহার করে ‘পূর্বখ-’ ব্যবহার করেছেন; বাংলার পূর্বভাগে বাঙালির আপন জীবনদর্শনের অনুসারীদের কথাই বলা হয়েছে এখানে। বনেদি পত্রিকা দেশ-এর বাউলবিষয়ক পরিবেশনার প্রথম প্রবন্ধই ছিল এটি। একটি সাক্ষাৎকার ও আরো দুটি আলোচনার সাথে এই লেখা নিয়ে পত্রিকাটির ওই সংখ্যার সূচিপত্র পূর্ণতা পেয়েছিল। মনোমুগ্ধকর ভাষায় বাউলের অজানিত চমকপ্রদ বিষয়াবলি, বাউল-বিদ্বেষের ইতিবৃত্ত, বর্তমানের বাউলদের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রবন্ধে। এই গুহ্যসাধনপন্থীদের ধর্মাচারের এরূপ আন্তরঙ্গিক বিবরণ সত্যিই বিরল। গোপনীয় সব তথ্যসম্ভারে সমৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের প্রান্তস্থিত আত্মভোলা ভাবসাধকদের প্রতি লেখকের দরদ লেখাটিকে মহত্ত্ব দান করেছে। তবে নামকরণ নিয়ে আমাদের উপর্যুক্ত মন্তব্যের সমান্তরালে আরও মনে করতে পারি, লেখক প্রবন্ধমধ্যে বলেছেন: “...বাংলাদেশের বাউলের সঙ্গে যেমন রাঢ়-বাংলার বাউলের প্রভেদ-পার্থক্য আছে, তেমনি এই ভূখ-ের বাউল-ফকিরদের মধ্যেও অঞ্চল ও ঘরানাভেদে অমিল-স্বাতন্ত্র্য আছে (পৃ. ৩৩)।” শেষোক্ত খ-ে যশোর-কুষ্টিয়া-পাবনা-ফরিদপুর, ঢাকা-মানিকগঞ্জ-নরসিংদী এবং সিলেট-ময়মনসিংহ-কুমিল্লার বাউল-ঘরানার মধ্যে আছে স্পষ্ট পার্থক্য আর সংগীতে ‘ভিন্নতার ইঙ্গিত’ রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আলোচনায় সে বিষয়ে স্পষ্ট কিংবা ইঙ্গিতময়ভাবে কিছূ বলা হয়নি। অথচ প্রবন্ধের নামে যখন ‘পূর্বখ-’ কথাটি যুক্ত হলো, তখন বিপরীত খণ্ডের অস্তিত্ব ঘোষিত হলো, সেক্ষেত্রে সামান্য হলে পূর্বখণ্ডের বিশিষ্টতার কথা আলাদাভাবে কিছু আসলে ভালো হতো। তবে বাংলাদেশের বাউলদের চালচিত্র হিসেবে আলোচনাটি সম্পূর্ণ।

বাউলেরা ‘নারীভজনাকারী’, নারীযোগে কুরুচিময় যৌনতায় লিপ্ত- এরকম নেতিবাচক প্রচারণা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া আছে আমাদের দেশে- এ বিষয়ে ‘বাউলনিগ্রহের পরম্পরা ও লালন’ শীর্ষক গ্রন্থস্থ চতুর্থ প্রবন্ধে আনুপূর্বিক বিবরণ দিয়েছেন আবুল আহসান। আমরা এখানে তৃতীয় প্রবন্ধ ‘নারী ও লালন’ নিয়ে কথা সেরে নিতে চাই। যেসব আধুনিক-নাগরিকদের বাউল আখড়ার প্রতি আকর্ষণ দেখা যায় তাঁদের কারো কারো সেই আনাগোনার পিছনে যে সাধনসঙ্গিনী ও উপচার অনুষঙ্গও বিশেষ ক্রিয়াশীল থাকে, এ অভিযোগ অস্বীকার করা যায় না। এজন্য বাউলসম্রাট লালনের নারীভাবনা জেনে নেওয়া জরুরি ছিল। তাছাড়া যেকোনো সমাজ ও জীবনদর্শন সম্যকভাবে বুঝতে হলেও নারীকে বিষয় করে বিচার-বিশ্লেষণ রীতির কার্যকারিতা আছে। ‘নারী ও লালন’ সেই বিচারে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। বাউলের সাথে নারী নিয়ে অপপ্রচারের বিপরীতে শুরুতেই বলা যায়, বাউল মতের ভিত্তি ও প্রবর্তনের পর্যায়ে ইসলাম ও হিন্দু দুই ধর্মেরই নমস্য নারীর ভূমিকার কথা শোনা যায়। “চৈতন্য-পার্ষদ নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্রের গুরু হিসেবে প্রচারিত ‘মাধববিবি’কেও কেউ কেউ এই মতের প্রবর্তনার সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন (পৃ. ৪৭)।” আর ইসলাম ধর্মসূত্রে লেখক জানিয়েছেন: “এই মরমি সাধনার আদিরূপের অনেক গুপ্ত রহস্য নবি-দুহিতা হজরত ফাতেমা (রা.) অবগত ছিলেন বলেও বাউল-ফকিরদের বিশ্বাস (পূর্বোক্ত)।” লালনের গানে ফাতেমা (রা.)-এর প্রসঙ্গও উদ্ধৃতিসহ দেখিয়ে গিয়েছেন গ্রন্থকার। আর বৈষ্ণব পদাবলির ধাঁচে লালনের তো প্রচুর গান রয়েছে। তবে লালন সংগীতে নারী শুধু এই তাত্ত্বিক বা ধর্মীয় প্রসঙ্গক্রমেই আসেনি। লালন মানবতাবাদী ভাবনা, প্রাগসর চেতনায় নারীকে তুলে এনেছেন তাঁর গানে। নারীর মাধুর্যময়ী রূপ দেখানোর পাশাপাশি, তার অবহেলিত, প্রবঞ্চিত জীবনের আর্তধ্বনি শুনিয়ে দিয়েছেন লালন। লোকধর্মের একজন সাধক লালন আজ কীর্তিত এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও। লালনের নারীভাবনা ও তার প্রকাশ সম্পর্কে আবুল আহসান চৌধুরীর যথার্থই মূল্যায়ন:

“...সমাজে-সংসারে অবজ্ঞাত-উপেক্ষিত নারীর বেদনা-দুর্বলতা-অবমাননা-অসহায়ত্ব-অভিমান-বিরহের পাশাপাশি তার স্বাতন্ত্র্য-গৌরব-শক্তি-দৃঢ়তা-প্রতিবাদ-শ্রেষ্ঠত্ব-মর্যাদার রূপটিও তুলে ধরেছেন- নারীকে উপস্থাপিত করেছেন স্বতন্ত্র মহিমায়- আবিষ্কার করেছেন ভিন্ন গৌরবে কালিক প্রেরণা ও নিবিড় গৌরবের আলোকে।” (পৃ. ৫৯)

‘বাউলনিগ্রহের পরম্পরা ও লালন’ প্রবন্ধটিতে প্রাপ্ত বিপুল তথ্য পাঠ করে আমরা ব্যথিত ও বিস্মিত হই। বাউলেরা আর্থিক-সামাজিক সর্বত দুর্বল ও নিম্নস্তরের। এদের প্রতি এমনই ধারাবাহিকভাবে নিগ্রহ চলে আসছে! তাদের মত ও পন্থায় ভালোমন্দ যা-ই থাকুক, তারা তো প্রচারধর্মী নয়, বলবিস্তারেও প্রয়াসী নয়। নিজেদের আঙিনায় নিভৃতে সাধন-ভজন করেন। তবু তাঁদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার পাশাপাশি একেবারে শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও চলে আসছে। আবুল আহসান চৌধুরী বাউলবিদ্বেষের অনেক দুর্লভ তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছেন প্রবন্ধে। এসবের কিছু পৃথক গ্রন্থাকারেও বের করেছেন। কিন্তু বাউলের পক্ষে দরদি লোকের অবস্থান নেওয়ার উদাহরণ খুব কমই দেখাতে পেরেছেন। একমাত্র কাজী আবদুল ওদুদের যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিবাদী বক্তব্য পাচ্ছি। আর ক্ষিতিমোহন সেনের সহমর্মিমূলক ভাবনার খবর আছে। বস্তুত, এই অত্যল্প প্রতিবাদী ভূমিকা-বিবরণের জন্যে অধ্যাপক চৌধুরী দায়ী নন। গবেষক তো বাস্তবতার বাইরে কল্পনাসৃজন করতে পারেন না। সত্য স্বীকারে অকুণ্ঠিত গ্রন্থকার এ-ও বলেছেন: “বাউল-ফকির ও সমধর্মী মরমি সম্প্রদায়ের ভেতরে কিছু অনাচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সবসময়ই প্রচলিত ছিল (পৃ. ৭৫)।” তবে আমাদের বিস্ময় ওখানে যে, এই যে দীর্ঘদিন ধরে তাদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন চললো প্রবল শক্তির, তবু টিকেও থাকলো পরম্পরাগতভাবেই। আর শঙ্কা-সন্দেহ ওখানেই, যেখানে আবুল আহসান চৌধুরী জানিয়েছেন, “...এখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুধীজনের আগ্রহ-সমাদরের কারণে বাউলেরা আবার নতুন করে জেগে উঠেছে- বিশেষ করে সংগীত-সম্প্রদায় হিসেবে বাউলের সংখ্যা বেড়ে চলেছে (পৃ. ৭৩)।” এই আগ্রহ-সমাদরের আঘাত-আয়াসে বাউলেরা টিকে থাকতে পারবে তো? “আপন ভজনকথা/ না কহিবে যথাতথা/ আপনাতে আপনি হইবে সাবধান” -এইরূপ যে সাধনপন্থীদের পালনীয় কর্ম, জিন্দাদেহে মরার বেশধারী সেই বাউল আজ মাইক্রোফোনের দিকে গলা এগিয়ে দেয়, চায় মিডিয়ার ক্যামেরাগুলোর সমস্ত আলোকসম্পাত হোক তার মুখ ’পরে, আমন্ত্রণ আসুক কসমোপলিটান শহরের সুসজ্জিত মঞ্চে ওঠার। আবুল আহসান যে বললেন, ‘সংগীত-সম্প্রদায় হিসেবে বাউলের সংখ্যা বেড়ে চলেছে’; একটি সাধকশ্রেণি সংগীত-সম্প্রদায়ে রূপান্তর বস্তুত বৃদ্ধি বা শ্রীবৃদ্ধি নয়, সীমিত হয়ে পড়া।

তো যে সম্পদটি নিঃশেষ হবে না, সেটি লালনের গান, যেখানে লালনের অভিজ্ঞান পেয়েছে শৈল্পিক বাণীস্ফুর্তি। বাউল একটি লৌকিক ধর্মমত, আর ধর্মের কেন্দ্রীয় বিষয় ঈশ্বর। সর্বশেষ প্রবন্ধ ‘লালনের ঈশ্বর’-এ সেই গুরুত্ববহ, কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় আলোচিত হয়েছে। আবুল আহসান চৌধুরী ঈশ্বর প্রশ্নে মানুষকে তিন ভাগে দেখিয়েছেন: আস্তিক, সংশয়বাদী ও নাস্তিক। তিনি যথার্থই বলেছেন: “প্রচলিত ঈশ্বরের অস্তিত্ব যুক্তি-প্রমাণে নয়, তা নিঃশর্ত বিশ্বাসের মুখাপেক্ষী (পৃ. ৭৯)।” কিন্তু “...দার্শনিকের মতে, ঈশ্বর মানুষেরই সৃষ্টি-মানুষেরই প্রয়োজনে (পূর্বোক্ত)”, এই কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। কোনো বিষয়ে একমত হওয়া গেলে তা আর দর্শনশাস্ত্রীয় বিষয়ও থাকে না। ঈশ্বর বিষয়েও দার্শনিকরা একমত নন, বস্তুত মতামতটি যুক্তিবাদী নিরীশ্বরবাদী দার্শনিকদের। তবে একথাটিও সত্য, ধার্মিক নির্বিশেষে “ঈশ্বরের ধারণা ও প্রকৃতি এক নয় (পূর্বোক্ত)।” এইজন্যে লালনের ঈশ্বর কেমন তা আলোচ্য।

লালন একাধারে ধার্মিক ও দার্শনিক। ধর্মসাধনায় তিনি গুরুবাদী। ধর্মবিশ্বাসে তিনি উদার, সর্বধর্মের প্রতি অনেকটা বিশ্বাসীর মতোই শ্রদ্ধাশীল; এক্ষেত্রে কখনো সমন্বয়ীও মনে হয়। লেখক লালনকে ‘সেক্যুলার-ধর্মনিরপেক্ষ’ও (পৃ. ৯৭) বলেছেন। এই সমন্বয়সাধনে তো ধর্মসমূহের মধ্যকার অমৌলিক বিষয়াবলি খারিজ করতেই হয়। এ-কারণে জপ-তপ-স্তব, তাবিজ-তাগা-মালা, ‘মাটির ঢিবি কাঠের ছবি’, ‘জিন-ফেরেস্তার খেলা’ প্রভৃতি আচার-উপচার, দেব-উপদেবকে অগ্রাহ্য করেছেন করেছেন। আর জাতপাতের বিরুদ্ধে তো যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। মহম্মদ-ফাতেমা, রাম-কৃষ্ণ-রাধা তাঁর কাছে শ্রদ্ধেয়। কিন্তু কৃষ্ণের কপটতা বা বঞ্চনা তাঁর অনুমোদন পায় না। তেমনই রসুল (স.)-কে মান্য করার পরও মেরাজের ঘটনা তাঁকে ‘ধন্ধে’-সন্দেহে ফেলে দেয়। এইসব বিষয় নিয়ে লালনের বিশ্বাস ও বিতর্কমূলক বাণীচয় আলোচক আমাদের সামনে পেশ করেছেন। তাহলে ঈশ্বর বিষয়ে উপসংহার কী? লালন প্রথমত-শেষত গুরুবাদী। গুরুই ঈশ্বর, গুরুই ঈশ্বরপ্রদর্শক। মক্কা-মদিনা, দিল্লি-লাহোর ঘুরে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না। হৃদকমলে এই ‘মনের মানুষে’র বাস, গুরু তার সাথে দেখা করিয়ে দেবেন এই আশ্বাসেই আস্থাশীল লালন। গুরু মানবরূপী, বা মানবই গুরু-মুরশিদ তথা ঈশ্বর। এভাবে দুটি বিভাগে আবুল আহসান চৌধুরী লালনের ঈশ্বরকে দেখিয়েছেন। দার্শনিক লালন ঈশ্বর প্রশ্নে সংশয়ী, জিজ্ঞাসু এমনকী কখনও যেন অনাগ্রহী। আর সাধক লালন- আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়: “গুরুর জ্ঞানচক্ষুর আলোকেই লালন দেখেছিলেন জগৎ ও জীবনের রহস্যের স্বরূপ- যে ঈশ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর মরমি মনোলোকে, তা ‘গুরুরূপের ঝলকে’ মিশে গিয়েছিল ‘মনের মানুষে’র সঙ্গে (পৃ. ১০০)।”

এভাবে পাঁচটি প্রবন্ধে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে বাংলার বাউল ও বাউলসম্রাটের প্রতিচ্ছবি। এ-বই শৈল্পিক উপস্থাপনের কারণে পাঠে উপভোগ্য, তত্ত্ব-তথ্যের সমাহারে সমৃদ্ধ এবং আলোচনফল সুগভীর ভাবনার উদ্দীপক। আমাদের প্রবন্ধপুস্তকে এরকম ‘তিন পাগলের মেলা’ প্রার্থিত হলেও বিরল।

লালনের ঈশ্বর ও অন্যান্য। আবুল আহসান চৌধুরী। জার্নিম্যান বুক্স, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯। প্রচ্ছদ ও গ্রন্থ-নকশা: তারিক সুজাত। পৃষ্ঠা: ১০০। মূল্য: ৩৫০ টাকা।

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

ছবি

পদাবলি : হেমন্ত প্রান্তরে

সাময়িকী কবিতা

ছবি

বৃত্তের ভিতরে

ছবি

আব্দুল্লাহ জামিলের ‘স্বনির্বাচন’

ছবি

বিমল গুহর একগুচ্ছ কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

মাসুদ রহমান

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর ২০২১

ধর্মের সাথে সমাজ-সংস্কৃতি-সংস্কারের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল মধ্যযুগ অবধি। একালে যে একেবারে সংলগ্নতা হারিয়েছে এমন নয়। মধ্যযুগে সর্ববিষয়ে ধর্মের সম্মতি লাগতো, পার্থক্য এমনকী বিরোধ যদি বা কিছু থাকতো সেগুলো নানা ধর্মমতের আচরণ-প্রণালিগত। আধুনিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনায়, আইন-আদালতে, নানা ক্রিয়াকর্মে ধর্মকে সরিয়ে বা একটু পাশে রেখে দেওয়ার প্রবণতা-প্রথা কমবেশি আছে। তবে মধ্যযুগ পর্যন্ত সকল দেশে শিল্পসাহিত্যও ধর্ম-প্রভাবিতই ছিল। বাংলা সাহিত্যের এতাবৎ প্রাপ্ত প্রাচীনতম সাহিত্যনিদর্শন চর্যাপদও মূলত ধর্মসংগীত- বৌদ্ধসহজিয়াদের সাধনসংকেত। সেই বৌদ্ধদের একরকম বিতাড়নের ইঙ্গিত আছে চর্যাপদে। তবে তারও আগে থেকে থাকা হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতি আর পরবর্তীকালে প্রবেশিত ইসলাম সমাজ-রাষ্ট্রে প্রবল ও অটল হয়। বাংলা-ভারতে হিন্দুমতের সহজিয়া রূপ বৈষ্ণব আর ইসলামের সুফিসাধনার বঙ্গায়ন। তিন প্রবল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে উদ্ভূত এইসব সহজিয়া মতপথ একসময় একান্ত বাঙালি সাধন মত ও পন্থার সৃষ্টি করেছে; মরমি ও মানবজাগতিক সেই মত বাউলদর্শন।

উনিশ শতকের আধুনিকতা-অভিঘাতের কালে বস্তুবাদীদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য বলে সম্মানিত অক্ষয়কুমার দত্ত। এই ইহজাগতিকতাবাদী লিখেছিলেন দুখণ্ডের বৃহদাকায় গ্রন্থ ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়। এটি আর দশজন অতিআধুনিক বাঙালির জীবনসায়াহ্নে অতিধার্মিকতার সাক্ষ্য নয়। গ্রন্থটি নির্মোহ গবেষণারই ফসল। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য পেশ ও বেফাঁস বক্তব্য পাওয়া যায় বইটিতে। এই যেমন বাউলমাত্রই বিপাকীয় বস্তু পান-ভক্ষণ করে। “শুনিতে পাই” সহযোগে জানিয়েছেন যে, বাউলেরা “নর-মাংস-ভোজন ও শবের বস্ত্র সংগ্রহ করিয়া পরিধান করে”। ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী রেনেসাঁর অন্যতম ব্যক্তির এই বক্তব্য উদ্ধারের পাশাপাশি সেই রেনেসাঁর প্রধান পুরুষ রামমোহনের “বাউলের মরমিচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই ভাব নিয়ে কিছু ব্রহ্মসংগীত রচনা”রও তথ্য দিয়েছেন। বেদান্তের আধুনিক ভাষ্যকার রামমোহন সংগীত রচনার সময় বাউলমত দ্বারা কতোখানি প্রভাবিত হয়েছিলেন সে আলোচনা এখানে করার সুযোগ নেই, তবে একথা তো সত্য, রেনেসাঁর শ্রেষ্ঠ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ বাউলের প্রতি প্রীতিময় ও বাউলদর্শনপ্রিয় ছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাউল বাঙালিরই সম্পদ, তবে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সাথে তার সম্পর্ক বহুভঙ্গিম। অধ্যাপক চৌধুরীর সুবাদে আমরা বাউলের প্রতি সমাজের প্রভাবশালীদের আর ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধতার ইতিহাস জেনেছি আবার একই সাথে বর্তমানে দেখছি সাধারণের মধ্যে বাউল গানের জনপ্রিয়তা, শিক্ষিতজনদের বাউল অনুসন্ধিৎসা। এই শেষোক্ত বিষয়টি, এমনকী বাউল গান যে বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এই প্রাপ্তির পিছনেও আমাদের আলোচ্য গ্রন্থের রচয়িতা আবুল আহসান চৌধুরীর উল্লেখনীয় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের এ দাবির পক্ষে দু-তিনটি তথ্য দিতে চাই। রবীন্দ্রনাথের কারণে শিক্ষিত সমাজ বাউলদের প্রতি কিছুটা সসম্মানে তাকাতে শুরু করেছিল, কিন্তু সেটি তেমন ধারায় পরিণত হয়নি। আরও পরে যাদের কারণে লোকায়তনের বাইরে লালন ও বাউলেরা বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করলো- গানের ক্ষেত্রে এক-দুজন কিংবদন্তি শিল্পী আছেন সত্য, আর গবেষণা-লেখালেখির ক্ষেত্রে যাঁদের অবদান সর্বাগ্রে, তাঁদের একজন আবুল আহসান চৌধুরী। তাঁর গবেষণা আমাদের সাহিত্য ছাড়াও শিল্পজগতের অন্যান্য ক্ষেত্রের মানুষদের আকর্ষণ, আগ্রহ ও আস্থার উৎস। যেমন অন্নদাশঙ্কর রায় চাকুরিসূত্রে একসময় কুষ্টিয়ায় ছিলেন, বাউলদের তখন থেকেই পছন্দ করতেন বটে, কিন্তু বাউল নিয়ে লেখালেখি ও পরবর্তীকালে ওপার বাংলায় বাউল সাধকদের ও সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতায় যে যুক্ত হয়েছেন, তার জন্যে একাধিক লেখায় আবুল আহসান চৌধুরীর অবদানের কথা উদাত্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। আমাদের আলোচ্য বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে “লালনমনস্ক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়”কে। সব্যসাচী সাহিত্যিক সুনীলের লালনমনস্কতা শিল্পে অভিব্যক্ত হয়েছে আবুল আহসানের কারণে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস মনের মানুষ রচনার জন্যে মুক্তকণ্ঠে ডক্টর চৌধুরীর অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। উপন্যাসটির ‘লেখকের বক্তব্য’ অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করলে বোঝা যায়, সুনীলের এ-সংক্রান্ত অভিজ্ঞান প্রধানত আবুল আহসানের গবেষণা-মূল্যায়নের প্রতিধ্বনি। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসেরই চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে বরেণ্য নির্মাতা গৌতম ঘোষের পরিচালনায়। সেটির চিত্রনাট্যও আবুল আহসান চৌধুরী গ্রন্থনা ও ভূমিকাযোগে প্রকাশিত হয়েছে। এমনই অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব হলেও বাহুল্য বিবেচনায় তা থেকে সরে আসা গেল।

বাউল বাঙালিরই সম্পদ, তবে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সাথে তার সম্পর্ক বহুভঙ্গিম। অধ্যাপক চৌধুরীর সুবাদে আমরা বাউলের প্রতি সমাজের প্রভাবশালীদের আর ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধতার ইতিহাস জেনেছি আবার একই সাথে বর্তমানে দেখছি সাধারণের মধ্যে বাউল গানের জনপ্রিয়তা, শিক্ষিতজনদের বাউল অনুসন্ধিৎসা

আপাতত এই আনন্দ সংবাদ নিয়ে কথা বলতে চাই যে, বিগত অর্ধশতক ধরে লালন ও বাউল নিয়ে গবেষণায় নিরত আবুল আহসান চৌধুরীর আরেকটি বই আমরা পেয়েছি লালনের ঈশ্বর ও অন্যান্য নামাঙ্কনে। গ্রন্থস্থ প্রবন্ধসমূহের শিরোনাম: ‘বাঙালির সমাজমন ও বাউল’, ‘পূর্ববঙ্গের বাউল : অন্তরঙ্গ চালচিত্র’, ‘নারী ও লালন’, ‘বাউল নিগ্রহের পরম্পরা ও লালন’ এবং ‘লালনের ঈশ্বর’। বস্তুত প্রথম প্রবন্ধই আমাদের এতক্ষণের প্রস্তাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘পূর্বখণ্ডের বাউল : অন্তরঙ্গ চালচিত্র’ কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার ‘বাউল আমার একতারাতে’ শীর্ষক প্রধান আয়োজনের অংশ হিসেবে বের হয়েছিল। পত্রিকাটির ১৮ জানুয়ারি ১৯৯২ তারিখের সংখ্যায় পত্রস্থকালে নাম ছিল ‘চালচিত্র : বাংলাদেশের বাউলদের’। আমাদের বিবেচনায়, সে নামকরণই অধিক যুক্তিযুক্ত ছিল। কারণ এ-আলোচনা বাংলাদেশের বাউল-কেন্দ্রিকই বটে। শুধু শব্দবৈচিত্র্যের প্রয়োজনেই নয়, আলোচক হয়তো সচেতনভাবেই ‘পূর্ববাংলা’ শব্দটি পরিহার করে ‘পূর্বখ-’ ব্যবহার করেছেন; বাংলার পূর্বভাগে বাঙালির আপন জীবনদর্শনের অনুসারীদের কথাই বলা হয়েছে এখানে। বনেদি পত্রিকা দেশ-এর বাউলবিষয়ক পরিবেশনার প্রথম প্রবন্ধই ছিল এটি। একটি সাক্ষাৎকার ও আরো দুটি আলোচনার সাথে এই লেখা নিয়ে পত্রিকাটির ওই সংখ্যার সূচিপত্র পূর্ণতা পেয়েছিল। মনোমুগ্ধকর ভাষায় বাউলের অজানিত চমকপ্রদ বিষয়াবলি, বাউল-বিদ্বেষের ইতিবৃত্ত, বর্তমানের বাউলদের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রবন্ধে। এই গুহ্যসাধনপন্থীদের ধর্মাচারের এরূপ আন্তরঙ্গিক বিবরণ সত্যিই বিরল। গোপনীয় সব তথ্যসম্ভারে সমৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের প্রান্তস্থিত আত্মভোলা ভাবসাধকদের প্রতি লেখকের দরদ লেখাটিকে মহত্ত্ব দান করেছে। তবে নামকরণ নিয়ে আমাদের উপর্যুক্ত মন্তব্যের সমান্তরালে আরও মনে করতে পারি, লেখক প্রবন্ধমধ্যে বলেছেন: “...বাংলাদেশের বাউলের সঙ্গে যেমন রাঢ়-বাংলার বাউলের প্রভেদ-পার্থক্য আছে, তেমনি এই ভূখ-ের বাউল-ফকিরদের মধ্যেও অঞ্চল ও ঘরানাভেদে অমিল-স্বাতন্ত্র্য আছে (পৃ. ৩৩)।” শেষোক্ত খ-ে যশোর-কুষ্টিয়া-পাবনা-ফরিদপুর, ঢাকা-মানিকগঞ্জ-নরসিংদী এবং সিলেট-ময়মনসিংহ-কুমিল্লার বাউল-ঘরানার মধ্যে আছে স্পষ্ট পার্থক্য আর সংগীতে ‘ভিন্নতার ইঙ্গিত’ রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আলোচনায় সে বিষয়ে স্পষ্ট কিংবা ইঙ্গিতময়ভাবে কিছূ বলা হয়নি। অথচ প্রবন্ধের নামে যখন ‘পূর্বখ-’ কথাটি যুক্ত হলো, তখন বিপরীত খণ্ডের অস্তিত্ব ঘোষিত হলো, সেক্ষেত্রে সামান্য হলে পূর্বখণ্ডের বিশিষ্টতার কথা আলাদাভাবে কিছু আসলে ভালো হতো। তবে বাংলাদেশের বাউলদের চালচিত্র হিসেবে আলোচনাটি সম্পূর্ণ।

বাউলেরা ‘নারীভজনাকারী’, নারীযোগে কুরুচিময় যৌনতায় লিপ্ত- এরকম নেতিবাচক প্রচারণা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া আছে আমাদের দেশে- এ বিষয়ে ‘বাউলনিগ্রহের পরম্পরা ও লালন’ শীর্ষক গ্রন্থস্থ চতুর্থ প্রবন্ধে আনুপূর্বিক বিবরণ দিয়েছেন আবুল আহসান। আমরা এখানে তৃতীয় প্রবন্ধ ‘নারী ও লালন’ নিয়ে কথা সেরে নিতে চাই। যেসব আধুনিক-নাগরিকদের বাউল আখড়ার প্রতি আকর্ষণ দেখা যায় তাঁদের কারো কারো সেই আনাগোনার পিছনে যে সাধনসঙ্গিনী ও উপচার অনুষঙ্গও বিশেষ ক্রিয়াশীল থাকে, এ অভিযোগ অস্বীকার করা যায় না। এজন্য বাউলসম্রাট লালনের নারীভাবনা জেনে নেওয়া জরুরি ছিল। তাছাড়া যেকোনো সমাজ ও জীবনদর্শন সম্যকভাবে বুঝতে হলেও নারীকে বিষয় করে বিচার-বিশ্লেষণ রীতির কার্যকারিতা আছে। ‘নারী ও লালন’ সেই বিচারে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। বাউলের সাথে নারী নিয়ে অপপ্রচারের বিপরীতে শুরুতেই বলা যায়, বাউল মতের ভিত্তি ও প্রবর্তনের পর্যায়ে ইসলাম ও হিন্দু দুই ধর্মেরই নমস্য নারীর ভূমিকার কথা শোনা যায়। “চৈতন্য-পার্ষদ নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্রের গুরু হিসেবে প্রচারিত ‘মাধববিবি’কেও কেউ কেউ এই মতের প্রবর্তনার সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন (পৃ. ৪৭)।” আর ইসলাম ধর্মসূত্রে লেখক জানিয়েছেন: “এই মরমি সাধনার আদিরূপের অনেক গুপ্ত রহস্য নবি-দুহিতা হজরত ফাতেমা (রা.) অবগত ছিলেন বলেও বাউল-ফকিরদের বিশ্বাস (পূর্বোক্ত)।” লালনের গানে ফাতেমা (রা.)-এর প্রসঙ্গও উদ্ধৃতিসহ দেখিয়ে গিয়েছেন গ্রন্থকার। আর বৈষ্ণব পদাবলির ধাঁচে লালনের তো প্রচুর গান রয়েছে। তবে লালন সংগীতে নারী শুধু এই তাত্ত্বিক বা ধর্মীয় প্রসঙ্গক্রমেই আসেনি। লালন মানবতাবাদী ভাবনা, প্রাগসর চেতনায় নারীকে তুলে এনেছেন তাঁর গানে। নারীর মাধুর্যময়ী রূপ দেখানোর পাশাপাশি, তার অবহেলিত, প্রবঞ্চিত জীবনের আর্তধ্বনি শুনিয়ে দিয়েছেন লালন। লোকধর্মের একজন সাধক লালন আজ কীর্তিত এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও। লালনের নারীভাবনা ও তার প্রকাশ সম্পর্কে আবুল আহসান চৌধুরীর যথার্থই মূল্যায়ন:

“...সমাজে-সংসারে অবজ্ঞাত-উপেক্ষিত নারীর বেদনা-দুর্বলতা-অবমাননা-অসহায়ত্ব-অভিমান-বিরহের পাশাপাশি তার স্বাতন্ত্র্য-গৌরব-শক্তি-দৃঢ়তা-প্রতিবাদ-শ্রেষ্ঠত্ব-মর্যাদার রূপটিও তুলে ধরেছেন- নারীকে উপস্থাপিত করেছেন স্বতন্ত্র মহিমায়- আবিষ্কার করেছেন ভিন্ন গৌরবে কালিক প্রেরণা ও নিবিড় গৌরবের আলোকে।” (পৃ. ৫৯)

‘বাউলনিগ্রহের পরম্পরা ও লালন’ প্রবন্ধটিতে প্রাপ্ত বিপুল তথ্য পাঠ করে আমরা ব্যথিত ও বিস্মিত হই। বাউলেরা আর্থিক-সামাজিক সর্বত দুর্বল ও নিম্নস্তরের। এদের প্রতি এমনই ধারাবাহিকভাবে নিগ্রহ চলে আসছে! তাদের মত ও পন্থায় ভালোমন্দ যা-ই থাকুক, তারা তো প্রচারধর্মী নয়, বলবিস্তারেও প্রয়াসী নয়। নিজেদের আঙিনায় নিভৃতে সাধন-ভজন করেন। তবু তাঁদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার পাশাপাশি একেবারে শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও চলে আসছে। আবুল আহসান চৌধুরী বাউলবিদ্বেষের অনেক দুর্লভ তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছেন প্রবন্ধে। এসবের কিছু পৃথক গ্রন্থাকারেও বের করেছেন। কিন্তু বাউলের পক্ষে দরদি লোকের অবস্থান নেওয়ার উদাহরণ খুব কমই দেখাতে পেরেছেন। একমাত্র কাজী আবদুল ওদুদের যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিবাদী বক্তব্য পাচ্ছি। আর ক্ষিতিমোহন সেনের সহমর্মিমূলক ভাবনার খবর আছে। বস্তুত, এই অত্যল্প প্রতিবাদী ভূমিকা-বিবরণের জন্যে অধ্যাপক চৌধুরী দায়ী নন। গবেষক তো বাস্তবতার বাইরে কল্পনাসৃজন করতে পারেন না। সত্য স্বীকারে অকুণ্ঠিত গ্রন্থকার এ-ও বলেছেন: “বাউল-ফকির ও সমধর্মী মরমি সম্প্রদায়ের ভেতরে কিছু অনাচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সবসময়ই প্রচলিত ছিল (পৃ. ৭৫)।” তবে আমাদের বিস্ময় ওখানে যে, এই যে দীর্ঘদিন ধরে তাদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন চললো প্রবল শক্তির, তবু টিকেও থাকলো পরম্পরাগতভাবেই। আর শঙ্কা-সন্দেহ ওখানেই, যেখানে আবুল আহসান চৌধুরী জানিয়েছেন, “...এখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুধীজনের আগ্রহ-সমাদরের কারণে বাউলেরা আবার নতুন করে জেগে উঠেছে- বিশেষ করে সংগীত-সম্প্রদায় হিসেবে বাউলের সংখ্যা বেড়ে চলেছে (পৃ. ৭৩)।” এই আগ্রহ-সমাদরের আঘাত-আয়াসে বাউলেরা টিকে থাকতে পারবে তো? “আপন ভজনকথা/ না কহিবে যথাতথা/ আপনাতে আপনি হইবে সাবধান” -এইরূপ যে সাধনপন্থীদের পালনীয় কর্ম, জিন্দাদেহে মরার বেশধারী সেই বাউল আজ মাইক্রোফোনের দিকে গলা এগিয়ে দেয়, চায় মিডিয়ার ক্যামেরাগুলোর সমস্ত আলোকসম্পাত হোক তার মুখ ’পরে, আমন্ত্রণ আসুক কসমোপলিটান শহরের সুসজ্জিত মঞ্চে ওঠার। আবুল আহসান যে বললেন, ‘সংগীত-সম্প্রদায় হিসেবে বাউলের সংখ্যা বেড়ে চলেছে’; একটি সাধকশ্রেণি সংগীত-সম্প্রদায়ে রূপান্তর বস্তুত বৃদ্ধি বা শ্রীবৃদ্ধি নয়, সীমিত হয়ে পড়া।

তো যে সম্পদটি নিঃশেষ হবে না, সেটি লালনের গান, যেখানে লালনের অভিজ্ঞান পেয়েছে শৈল্পিক বাণীস্ফুর্তি। বাউল একটি লৌকিক ধর্মমত, আর ধর্মের কেন্দ্রীয় বিষয় ঈশ্বর। সর্বশেষ প্রবন্ধ ‘লালনের ঈশ্বর’-এ সেই গুরুত্ববহ, কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় আলোচিত হয়েছে। আবুল আহসান চৌধুরী ঈশ্বর প্রশ্নে মানুষকে তিন ভাগে দেখিয়েছেন: আস্তিক, সংশয়বাদী ও নাস্তিক। তিনি যথার্থই বলেছেন: “প্রচলিত ঈশ্বরের অস্তিত্ব যুক্তি-প্রমাণে নয়, তা নিঃশর্ত বিশ্বাসের মুখাপেক্ষী (পৃ. ৭৯)।” কিন্তু “...দার্শনিকের মতে, ঈশ্বর মানুষেরই সৃষ্টি-মানুষেরই প্রয়োজনে (পূর্বোক্ত)”, এই কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। কোনো বিষয়ে একমত হওয়া গেলে তা আর দর্শনশাস্ত্রীয় বিষয়ও থাকে না। ঈশ্বর বিষয়েও দার্শনিকরা একমত নন, বস্তুত মতামতটি যুক্তিবাদী নিরীশ্বরবাদী দার্শনিকদের। তবে একথাটিও সত্য, ধার্মিক নির্বিশেষে “ঈশ্বরের ধারণা ও প্রকৃতি এক নয় (পূর্বোক্ত)।” এইজন্যে লালনের ঈশ্বর কেমন তা আলোচ্য।

লালন একাধারে ধার্মিক ও দার্শনিক। ধর্মসাধনায় তিনি গুরুবাদী। ধর্মবিশ্বাসে তিনি উদার, সর্বধর্মের প্রতি অনেকটা বিশ্বাসীর মতোই শ্রদ্ধাশীল; এক্ষেত্রে কখনো সমন্বয়ীও মনে হয়। লেখক লালনকে ‘সেক্যুলার-ধর্মনিরপেক্ষ’ও (পৃ. ৯৭) বলেছেন। এই সমন্বয়সাধনে তো ধর্মসমূহের মধ্যকার অমৌলিক বিষয়াবলি খারিজ করতেই হয়। এ-কারণে জপ-তপ-স্তব, তাবিজ-তাগা-মালা, ‘মাটির ঢিবি কাঠের ছবি’, ‘জিন-ফেরেস্তার খেলা’ প্রভৃতি আচার-উপচার, দেব-উপদেবকে অগ্রাহ্য করেছেন করেছেন। আর জাতপাতের বিরুদ্ধে তো যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। মহম্মদ-ফাতেমা, রাম-কৃষ্ণ-রাধা তাঁর কাছে শ্রদ্ধেয়। কিন্তু কৃষ্ণের কপটতা বা বঞ্চনা তাঁর অনুমোদন পায় না। তেমনই রসুল (স.)-কে মান্য করার পরও মেরাজের ঘটনা তাঁকে ‘ধন্ধে’-সন্দেহে ফেলে দেয়। এইসব বিষয় নিয়ে লালনের বিশ্বাস ও বিতর্কমূলক বাণীচয় আলোচক আমাদের সামনে পেশ করেছেন। তাহলে ঈশ্বর বিষয়ে উপসংহার কী? লালন প্রথমত-শেষত গুরুবাদী। গুরুই ঈশ্বর, গুরুই ঈশ্বরপ্রদর্শক। মক্কা-মদিনা, দিল্লি-লাহোর ঘুরে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না। হৃদকমলে এই ‘মনের মানুষে’র বাস, গুরু তার সাথে দেখা করিয়ে দেবেন এই আশ্বাসেই আস্থাশীল লালন। গুরু মানবরূপী, বা মানবই গুরু-মুরশিদ তথা ঈশ্বর। এভাবে দুটি বিভাগে আবুল আহসান চৌধুরী লালনের ঈশ্বরকে দেখিয়েছেন। দার্শনিক লালন ঈশ্বর প্রশ্নে সংশয়ী, জিজ্ঞাসু এমনকী কখনও যেন অনাগ্রহী। আর সাধক লালন- আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়: “গুরুর জ্ঞানচক্ষুর আলোকেই লালন দেখেছিলেন জগৎ ও জীবনের রহস্যের স্বরূপ- যে ঈশ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর মরমি মনোলোকে, তা ‘গুরুরূপের ঝলকে’ মিশে গিয়েছিল ‘মনের মানুষে’র সঙ্গে (পৃ. ১০০)।”

এভাবে পাঁচটি প্রবন্ধে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে বাংলার বাউল ও বাউলসম্রাটের প্রতিচ্ছবি। এ-বই শৈল্পিক উপস্থাপনের কারণে পাঠে উপভোগ্য, তত্ত্ব-তথ্যের সমাহারে সমৃদ্ধ এবং আলোচনফল সুগভীর ভাবনার উদ্দীপক। আমাদের প্রবন্ধপুস্তকে এরকম ‘তিন পাগলের মেলা’ প্রার্থিত হলেও বিরল।

লালনের ঈশ্বর ও অন্যান্য। আবুল আহসান চৌধুরী। জার্নিম্যান বুক্স, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯। প্রচ্ছদ ও গ্রন্থ-নকশা: তারিক সুজাত। পৃষ্ঠা: ১০০। মূল্য: ৩৫০ টাকা।

back to top