alt

সাময়িকী

মধুর তোমার শেষ যে না পাই

দিঠি হাসনাত

: শনিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২১

মেয়ে দিঠি ও নাতনির সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্তে আবুল হাসনাত

কিছুতেই এখনও ভাবতে পারছি না বাবা তুমি কোথাও নেই। প্রতিটা মুহূর্তে আমি তোমার সাথে কথা বলছি বাবা। এই কদিনে কত কথা জমা হয়েছে বাবা। কত গল্প জমা হয়েছে । এই কদিনে আমি অনেক কঠিন সময় পার করছি কি ন্তু তোমাকে প্রশ্ন করে ই মনে মনে সমাধান খুঁজে পেয়েছি। মনে হচ্ছে তুমি আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের সাথে জড়িয়ে আছ। আমাদে র সমস্ত কষ্টে আনন্দে প্রতিটা নান্দনিক মুহূর্তের সাথে জড়িয়ে আছ। দুতিন দিন আগে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “তোমায় নতুন করে পাব বলে” শুনছিলাম মনে হলো তুমি বললে এবার আনন্দধারা বহিবার ভুবনেটা ছেড়ে দাও তো মা। তারপরে মনে হলো সুবিনয় রায়ের “এই করেছ ভালো নিঠুর হে...”টা ছাড়তো... অনেকক্ষণ তোমার সাথে গান শুনছিলাম বাবা। শুনতে শুনতে গাইতে থাকলাম তোমার মতো এমন টানে কেউ তো টানে না। প্রতিদিন রেওয়াজের সময় মনে হয় তুমি শুনতে পারছ, আমি আরও সচেতন হয়ে গান করছি বাবা যেন একবার হলেও তোমার কাছ থেকে বিরল “বাহ”টা শুনতে পারি। তোমার অসীম ভালবাসার মাত্রা উপলব্ধি তোমার পাশে থাকার সময় ততটা বুঝতে পারি নি এখন যতটা বুঝতে পারছি।

প্রতিটা সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পৃক্ততা অনেক দৃঢ় থাকে। কিন্তু আমার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। একটা

গল্প বলি আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছি, ক্লাসও শুরু করেছি হঠাৎ একদিন

বন্ধুদের সাথে বাসে করে ঢাকায় চলে আসি। আর আমি হঠাৎ দুপুরে বাবার অফিসে গিয়ে হাজির হই। অপ্রত্যাশিতভাবে

বাবা আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন। তখনই আমি ঠিক করলাম ইংরেজি সাহিত্য আমার পছন্দের বিষয় হওয়া সত্ত্বেও

কিছুতেই হোস্টেলে থাকা চলবে না; বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে হবে।

আমার বাবা আবুল হাসনাত ভীষণ সংবেদনশীল মানুষ। খুবই নরম মনের মানুষ। এখনকার সময়ে এতটা সংবেদনশীল হওয়া এবং মানবিক হওয়া অনেকটাই বিরল ব্যাপার। যার কারণে চলার পথে তাকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। অনেকেই তার ভদ্রতা-বিনয়ের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু নিজের মনন, মানবিকতাকে, সংবেদনশীলতাকে নষ্ট হতে দেননি। অনেক বৈরী পরিবেশে, বৈরী মানুষদের মাঝে থেকেও কেমন করে নিজের এই গুণাবলিকে অক্ষুণœ রেখেছেন তা আমি ভাবলে অবাক হয়ে যাই। অনেকেই বাবাকে অনেক স্বল্পভাষী কঠিন মানুষ ভাবেন। কিন্তু আমার কাছে, আমার মায়ের কাছে বা আমার মেয়ে শ্রেয়সীর কাছে বাবা অনেক কাছের অনেক সহজ মানুষ। ছায়ার মতো আমাদের পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছে। যে ছায়াটা নেই, আমরা এখনো ভাবতেই পারছি না। হয়তো এখন আছে, থাকবে নানাভাবে আমাদের জীবনে। আমার জীবনে নান্দনিকতার পাঠ বাবার কাছ থেকে যে কত শিশু বয়স থেকে শুরু হয়েছে তা এখন বুঝতে পারি। চিত্রকলা সংগ্রহ বাবার খুব প্রিয় একটা বিষয়, যা আমি বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি। আমি তখন খুব ছোট, বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কামরুল হাসান কাকার বাসায়। আমার এখনো মনে আছে তার ইজেলে তখন তিন রমণী সিরিজের কোনো ছবি আঁকছিলেন। বাসায় এসে আমি বাবার কাছে ছবি আঁকার জন্য ইজেল চেয়েছিলাম। আর কামরুল হাসান কাকা, কাইয়ুম কাকার ছবি বাঁধানো নিয়ে যে আমাদের কত গল্প আছে। প্রতি মাসে আমি বাবার সঙ্গে সেই ছবি বাঁধাইয়ের দোকানে যেতাম। কোন ছবির সঙ্গে কোন ফ্রেম ভালো হবে, কোন মাউন্ট ভালো হবে তা বুঝতে শিখেছি অবচেতনভাবেই।

আমার বাবা আবুল হাসনাত ভীষণ সংবেদনশীল মানুষ। খুবই নরম মনের মানুষ। এখনকার সময়ে এতটা সংবেদনশীল হওয়া এবং মানবিক হওয়া অনেকটাই বিরল ব্যাপার। যার কারণে চলার পথে তাকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে

সেসব ছবি যখন টাঙানো হবে নতুন বাসায় সেই ছবিগুলো কী যত্ন করে বাবা টানিয়েছে। বাবার ভেতর নান্দনিক ভাবনাটা খুব সহজাত। তা সে পত্রিকার মেকআপই হোক, আর ছবি বাঁধাই হোক না কেন- এ ভাবনাটা বাবার সহজাত। তবে নিজেকে কীভাবে তৈরি করতে হয় তা বাবার কাছে শিক্ষণীয়। কীভাবে ভাষা সুন্দর সাবলীল করতে হবে বা কীভাবে সুন্দর বাচনে কথা বলতে হবে, কীভাবে নির্লোভভাবে নীতি নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচা যায় তা বাবা আমাকে শিখিয়েছেন।

বাবাই বই সংগ্রহ, চিত্রকলা আর রেকর্ড সংগ্রহের প্রতি আগ্রহ আমাকে সংগীত, চিত্রকলা, বই আর চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। আর যখন আমি উচ্চাঙ্গ সংগীত নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি তখন আমাকে কুদরতী রঙ্গী বিরঙ্গী, রাগ-অনুরাগ, ‘আমার কথা’ বইগুলো পড়তে বলল। আমাদের বইয়ের সংগ্রহ থেকে বইগুলো খুঁজে দিল। আর বই পড়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিত বাবা। ছোটবেলায় আমার বন্ধুরা গল্পের বই পড়ার জন্য বকা খেত, আমি গল্পের বই পড়ার জন্য আরো উপহার পেতাম। গান শেখার ব্যাপারেও একই কথা। ছোটবেলায় মা-বাবা রেওয়াজ করানোর জন্য কত উপহার দেয়ার কথা বলত। আরো পরে যখন অনেক গানের ভেতর ঢুকতে চাচ্ছি, রেওয়াজ করতাম, বাবা গান শুনে বলত করে যাও। শুধু বলত চুপচাপ রেওয়াজ করে যাও। আমি যখন খুব ছোট, বাবার লেখা বইগুলো পড়ছি, ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘রানুর দুঃখ ও ভালবাসা’, ‘সমুদ্র ও টুকুর গল্প’; আমি অবাক হয়েছি যে বাবা কীভাবে একজন শিশুর মনোজগত বুঝতে পারছে। একই ব্যাপারে দেখেছি আমার মেয়ে শ্রেয়সীকে বড় করার ক্ষেত্রে আমার পারিবারিক জটিলতায় অনেক কিছু হয়তো আমার চোখ এড়িয়ে গেছে, কিন্তু বাবা শুধু আমাকে বলত যাই করো শ্রেয়সীর দিকটা সবকিছু ভেবে করবে। ওকে বেশি বকাঝকা করবে না। সব সময় ওকে বন্ধুর মতো বুঝিয়ে বলবে। তোমাকে অনেক শক্তভাবে সংবেদনশীলভাবে শ্রেয়সীকে বড় করতে হবে। গত তিন বছর যখন নিউইয়র্কে আমাদের কাছে বেড়াতে এসেছিল এত ভালো সময় কেটেছে আমাদের। এতকিছু করার ইচ্ছা ছিল, আর কত জায়গায় বেড়ানোর পরিকল্পনা ছিল আমাদের। সেই ইচ্ছাটা অসম্পূর্ণই থেকে গেল। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যখন আশঙ্কা করছি এক ভয়াবহ সময় আসছে। বাবাকে, মাকে শুধু বলেছি খুব সাবধানে থাকতে হবে, আমাদের সবার সাবধানে বেঁচে থাকতে হবে। আমার যখন এপ্রিল মাসে করোনা হলো বাবা-মাকে জানতে দিইনি। বাবা প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করেছে তোমার কী হয়েছে, গলাটা বসা কেন? আমি বলেছি ঘুমিয়েছি তো তাই। কিন্তু বাবা-মার আশঙ্কা কমেনি। বাবা শুধু ফোনে বলেছে, ভালো লাগে না, কাছের মানুষেরা চলে যাচ্ছে, কী হবে। আমি কত বোঝালাম কিছু হবে না শুধু সাবধানে থাকতে হবে। এই সংকটময় সময় পার হলে আমরা একসাথে হব, আবার কলকাতায় যাব। কত বেড়াব নিউইয়র্কে আবার আমরা একসাথে। তা আর হলো না। এমনভাবে আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করবে, ঠিক আছো মা? আমার কষ্টে আর কেউ অস্থির হবে না। কেউ আর এমনভাবে আগলে রাখবে না।

আমার আর মায়ের পুরো পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেছে। দেশ থেকে দূরে থাকতে আমার অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছে। এখন অনেক বেশি বুঝতে পারছি আত্মিক টান কতটা বাবার সঙ্গে। বিশাল কাজের জগতের মধ্যে অনেক পরিপূর্ণ জীবন বাবার। আমাদের ভালো রাখার জন্য কষ্ট করে গেছেন। পারিবারিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। অনেক লেখক-পাঠক তৈরি করাই ছিল তার ব্রত। সেই গুরুদায়িত্ব করতে গিয়ে নিজের লেখালেখির সময় পাননি অনেক বছর। যখন লেখালেখির কাজ গুছিয়ে এনেছেন তখনই যাওয়ার সময় হয়ে এল। আর ষাট দশক থেকে ছায়ানটের সঙ্গে, সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেণ। নালন্দা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির লিয়অজো অফিসের পুরো দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় মুক্তিযুদ্ধে সার্বক্ষণিক যুক্ত থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৬৫ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য থেকেছেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি এভাবে নীরবে-নিভৃতে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে গেছেন। ১৯৬৬ সাল থেকে বাবা ছায়ানটের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকেছেন। ষাট দশক থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছায়ানট, সংস্কৃতি সংসদ, আফ্রো এশীয় লেখক ইউনিয়নসহ নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। আইটিআই (ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট)-সহ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছেন বহু বছর। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিষয়ে তার আজন্ম আগ্রহকে শুধু তাত্ত্বিক চর্চায় সীমাবদ্ধ রাখেনননি। তার সমগ্র জীবন চর্চায় তার প্রতিফলন রেখেছেন। যার ছাপ আমি দেখেছি সংবাদের সাহিত্য পাতায় প্রতিটা সংখ্যার পরিকল্পনা থেকে কালি ও কলেমের প্রতিটা সংখ্যার পরিকল্পনা পর্যন্ত। তার প্রতিফলন দেখা যায় জীবনযাপনে, দর্শনে। ১৯৬৬ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যর্নত বাংলাদেশের সংস্কৃতি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে থেকেছেন। ছায়ানট, রনীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার শিল্পরুচির প্রতিফলন দেখেছি প্রতিটা কাজে। যা আমার চলার পথের পাথেয়। আজ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জ্ঞানী-গুণীজন ও সাহিত্যপ্রেমী পাঠক যারা তাকে স্মারণ করে আমাদের সমেবদনা জানাচ্ছেন ও তার কাজকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন তাদের সকলের প্রতি আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি যখন শোকে স্তব্ধ তখন অনেকে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেছেন, অনেকে শোক জানিয়েছেন। সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। প-িত তন্ময়বোস, তন্ময়দাদা আমায় ফোন করে বলেছেন, ‘তিনি এখন আরো জ্যোতির্ময়, আরো শক্তিশালী এবং তিনি তোর কাছেই আছেন।’ বাবা গত বছর আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় বলে গেছেন, আমি মার্চ-এপ্রিলেই তোমার আর শ্রেয়সীর কাছে আসব। তন্ময়দার কথা আমাকে শক্তি দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি বাবা আমার প্রতিটা চিন্তায়, প্রতিটা নিঃশ্বাসে মিশে আছে। এখন আরো বেশি করে হয়তো আমাদের কাছে এসে গেছে। তাই সারা দিন গেয়ে চলেছি- চিরসভা হে, ছেড়ো না ছেড়ো না মোরে।

দিঠি হাসনাত : সংবাদের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক ও কালি ও কলম সম্পাদক কবি ও লেখক আবুল হাসনাতের মেয়ে ও শিক্ষক।

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

tab

সাময়িকী

মধুর তোমার শেষ যে না পাই

দিঠি হাসনাত

মেয়ে দিঠি ও নাতনির সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্তে আবুল হাসনাত

শনিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২১

কিছুতেই এখনও ভাবতে পারছি না বাবা তুমি কোথাও নেই। প্রতিটা মুহূর্তে আমি তোমার সাথে কথা বলছি বাবা। এই কদিনে কত কথা জমা হয়েছে বাবা। কত গল্প জমা হয়েছে । এই কদিনে আমি অনেক কঠিন সময় পার করছি কি ন্তু তোমাকে প্রশ্ন করে ই মনে মনে সমাধান খুঁজে পেয়েছি। মনে হচ্ছে তুমি আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের সাথে জড়িয়ে আছ। আমাদে র সমস্ত কষ্টে আনন্দে প্রতিটা নান্দনিক মুহূর্তের সাথে জড়িয়ে আছ। দুতিন দিন আগে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “তোমায় নতুন করে পাব বলে” শুনছিলাম মনে হলো তুমি বললে এবার আনন্দধারা বহিবার ভুবনেটা ছেড়ে দাও তো মা। তারপরে মনে হলো সুবিনয় রায়ের “এই করেছ ভালো নিঠুর হে...”টা ছাড়তো... অনেকক্ষণ তোমার সাথে গান শুনছিলাম বাবা। শুনতে শুনতে গাইতে থাকলাম তোমার মতো এমন টানে কেউ তো টানে না। প্রতিদিন রেওয়াজের সময় মনে হয় তুমি শুনতে পারছ, আমি আরও সচেতন হয়ে গান করছি বাবা যেন একবার হলেও তোমার কাছ থেকে বিরল “বাহ”টা শুনতে পারি। তোমার অসীম ভালবাসার মাত্রা উপলব্ধি তোমার পাশে থাকার সময় ততটা বুঝতে পারি নি এখন যতটা বুঝতে পারছি।

প্রতিটা সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পৃক্ততা অনেক দৃঢ় থাকে। কিন্তু আমার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। একটা

গল্প বলি আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছি, ক্লাসও শুরু করেছি হঠাৎ একদিন

বন্ধুদের সাথে বাসে করে ঢাকায় চলে আসি। আর আমি হঠাৎ দুপুরে বাবার অফিসে গিয়ে হাজির হই। অপ্রত্যাশিতভাবে

বাবা আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন। তখনই আমি ঠিক করলাম ইংরেজি সাহিত্য আমার পছন্দের বিষয় হওয়া সত্ত্বেও

কিছুতেই হোস্টেলে থাকা চলবে না; বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে হবে।

আমার বাবা আবুল হাসনাত ভীষণ সংবেদনশীল মানুষ। খুবই নরম মনের মানুষ। এখনকার সময়ে এতটা সংবেদনশীল হওয়া এবং মানবিক হওয়া অনেকটাই বিরল ব্যাপার। যার কারণে চলার পথে তাকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। অনেকেই তার ভদ্রতা-বিনয়ের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু নিজের মনন, মানবিকতাকে, সংবেদনশীলতাকে নষ্ট হতে দেননি। অনেক বৈরী পরিবেশে, বৈরী মানুষদের মাঝে থেকেও কেমন করে নিজের এই গুণাবলিকে অক্ষুণœ রেখেছেন তা আমি ভাবলে অবাক হয়ে যাই। অনেকেই বাবাকে অনেক স্বল্পভাষী কঠিন মানুষ ভাবেন। কিন্তু আমার কাছে, আমার মায়ের কাছে বা আমার মেয়ে শ্রেয়সীর কাছে বাবা অনেক কাছের অনেক সহজ মানুষ। ছায়ার মতো আমাদের পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছে। যে ছায়াটা নেই, আমরা এখনো ভাবতেই পারছি না। হয়তো এখন আছে, থাকবে নানাভাবে আমাদের জীবনে। আমার জীবনে নান্দনিকতার পাঠ বাবার কাছ থেকে যে কত শিশু বয়স থেকে শুরু হয়েছে তা এখন বুঝতে পারি। চিত্রকলা সংগ্রহ বাবার খুব প্রিয় একটা বিষয়, যা আমি বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি। আমি তখন খুব ছোট, বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কামরুল হাসান কাকার বাসায়। আমার এখনো মনে আছে তার ইজেলে তখন তিন রমণী সিরিজের কোনো ছবি আঁকছিলেন। বাসায় এসে আমি বাবার কাছে ছবি আঁকার জন্য ইজেল চেয়েছিলাম। আর কামরুল হাসান কাকা, কাইয়ুম কাকার ছবি বাঁধানো নিয়ে যে আমাদের কত গল্প আছে। প্রতি মাসে আমি বাবার সঙ্গে সেই ছবি বাঁধাইয়ের দোকানে যেতাম। কোন ছবির সঙ্গে কোন ফ্রেম ভালো হবে, কোন মাউন্ট ভালো হবে তা বুঝতে শিখেছি অবচেতনভাবেই।

আমার বাবা আবুল হাসনাত ভীষণ সংবেদনশীল মানুষ। খুবই নরম মনের মানুষ। এখনকার সময়ে এতটা সংবেদনশীল হওয়া এবং মানবিক হওয়া অনেকটাই বিরল ব্যাপার। যার কারণে চলার পথে তাকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে

সেসব ছবি যখন টাঙানো হবে নতুন বাসায় সেই ছবিগুলো কী যত্ন করে বাবা টানিয়েছে। বাবার ভেতর নান্দনিক ভাবনাটা খুব সহজাত। তা সে পত্রিকার মেকআপই হোক, আর ছবি বাঁধাই হোক না কেন- এ ভাবনাটা বাবার সহজাত। তবে নিজেকে কীভাবে তৈরি করতে হয় তা বাবার কাছে শিক্ষণীয়। কীভাবে ভাষা সুন্দর সাবলীল করতে হবে বা কীভাবে সুন্দর বাচনে কথা বলতে হবে, কীভাবে নির্লোভভাবে নীতি নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচা যায় তা বাবা আমাকে শিখিয়েছেন।

বাবাই বই সংগ্রহ, চিত্রকলা আর রেকর্ড সংগ্রহের প্রতি আগ্রহ আমাকে সংগীত, চিত্রকলা, বই আর চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। আর যখন আমি উচ্চাঙ্গ সংগীত নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি তখন আমাকে কুদরতী রঙ্গী বিরঙ্গী, রাগ-অনুরাগ, ‘আমার কথা’ বইগুলো পড়তে বলল। আমাদের বইয়ের সংগ্রহ থেকে বইগুলো খুঁজে দিল। আর বই পড়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিত বাবা। ছোটবেলায় আমার বন্ধুরা গল্পের বই পড়ার জন্য বকা খেত, আমি গল্পের বই পড়ার জন্য আরো উপহার পেতাম। গান শেখার ব্যাপারেও একই কথা। ছোটবেলায় মা-বাবা রেওয়াজ করানোর জন্য কত উপহার দেয়ার কথা বলত। আরো পরে যখন অনেক গানের ভেতর ঢুকতে চাচ্ছি, রেওয়াজ করতাম, বাবা গান শুনে বলত করে যাও। শুধু বলত চুপচাপ রেওয়াজ করে যাও। আমি যখন খুব ছোট, বাবার লেখা বইগুলো পড়ছি, ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘রানুর দুঃখ ও ভালবাসা’, ‘সমুদ্র ও টুকুর গল্প’; আমি অবাক হয়েছি যে বাবা কীভাবে একজন শিশুর মনোজগত বুঝতে পারছে। একই ব্যাপারে দেখেছি আমার মেয়ে শ্রেয়সীকে বড় করার ক্ষেত্রে আমার পারিবারিক জটিলতায় অনেক কিছু হয়তো আমার চোখ এড়িয়ে গেছে, কিন্তু বাবা শুধু আমাকে বলত যাই করো শ্রেয়সীর দিকটা সবকিছু ভেবে করবে। ওকে বেশি বকাঝকা করবে না। সব সময় ওকে বন্ধুর মতো বুঝিয়ে বলবে। তোমাকে অনেক শক্তভাবে সংবেদনশীলভাবে শ্রেয়সীকে বড় করতে হবে। গত তিন বছর যখন নিউইয়র্কে আমাদের কাছে বেড়াতে এসেছিল এত ভালো সময় কেটেছে আমাদের। এতকিছু করার ইচ্ছা ছিল, আর কত জায়গায় বেড়ানোর পরিকল্পনা ছিল আমাদের। সেই ইচ্ছাটা অসম্পূর্ণই থেকে গেল। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যখন আশঙ্কা করছি এক ভয়াবহ সময় আসছে। বাবাকে, মাকে শুধু বলেছি খুব সাবধানে থাকতে হবে, আমাদের সবার সাবধানে বেঁচে থাকতে হবে। আমার যখন এপ্রিল মাসে করোনা হলো বাবা-মাকে জানতে দিইনি। বাবা প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করেছে তোমার কী হয়েছে, গলাটা বসা কেন? আমি বলেছি ঘুমিয়েছি তো তাই। কিন্তু বাবা-মার আশঙ্কা কমেনি। বাবা শুধু ফোনে বলেছে, ভালো লাগে না, কাছের মানুষেরা চলে যাচ্ছে, কী হবে। আমি কত বোঝালাম কিছু হবে না শুধু সাবধানে থাকতে হবে। এই সংকটময় সময় পার হলে আমরা একসাথে হব, আবার কলকাতায় যাব। কত বেড়াব নিউইয়র্কে আবার আমরা একসাথে। তা আর হলো না। এমনভাবে আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করবে, ঠিক আছো মা? আমার কষ্টে আর কেউ অস্থির হবে না। কেউ আর এমনভাবে আগলে রাখবে না।

আমার আর মায়ের পুরো পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেছে। দেশ থেকে দূরে থাকতে আমার অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছে। এখন অনেক বেশি বুঝতে পারছি আত্মিক টান কতটা বাবার সঙ্গে। বিশাল কাজের জগতের মধ্যে অনেক পরিপূর্ণ জীবন বাবার। আমাদের ভালো রাখার জন্য কষ্ট করে গেছেন। পারিবারিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। অনেক লেখক-পাঠক তৈরি করাই ছিল তার ব্রত। সেই গুরুদায়িত্ব করতে গিয়ে নিজের লেখালেখির সময় পাননি অনেক বছর। যখন লেখালেখির কাজ গুছিয়ে এনেছেন তখনই যাওয়ার সময় হয়ে এল। আর ষাট দশক থেকে ছায়ানটের সঙ্গে, সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেণ। নালন্দা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির লিয়অজো অফিসের পুরো দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় মুক্তিযুদ্ধে সার্বক্ষণিক যুক্ত থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৬৫ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য থেকেছেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি এভাবে নীরবে-নিভৃতে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে গেছেন। ১৯৬৬ সাল থেকে বাবা ছায়ানটের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকেছেন। ষাট দশক থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছায়ানট, সংস্কৃতি সংসদ, আফ্রো এশীয় লেখক ইউনিয়নসহ নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। আইটিআই (ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট)-সহ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছেন বহু বছর। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিষয়ে তার আজন্ম আগ্রহকে শুধু তাত্ত্বিক চর্চায় সীমাবদ্ধ রাখেনননি। তার সমগ্র জীবন চর্চায় তার প্রতিফলন রেখেছেন। যার ছাপ আমি দেখেছি সংবাদের সাহিত্য পাতায় প্রতিটা সংখ্যার পরিকল্পনা থেকে কালি ও কলেমের প্রতিটা সংখ্যার পরিকল্পনা পর্যন্ত। তার প্রতিফলন দেখা যায় জীবনযাপনে, দর্শনে। ১৯৬৬ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যর্নত বাংলাদেশের সংস্কৃতি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে থেকেছেন। ছায়ানট, রনীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার শিল্পরুচির প্রতিফলন দেখেছি প্রতিটা কাজে। যা আমার চলার পথের পাথেয়। আজ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জ্ঞানী-গুণীজন ও সাহিত্যপ্রেমী পাঠক যারা তাকে স্মারণ করে আমাদের সমেবদনা জানাচ্ছেন ও তার কাজকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন তাদের সকলের প্রতি আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি যখন শোকে স্তব্ধ তখন অনেকে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেছেন, অনেকে শোক জানিয়েছেন। সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। প-িত তন্ময়বোস, তন্ময়দাদা আমায় ফোন করে বলেছেন, ‘তিনি এখন আরো জ্যোতির্ময়, আরো শক্তিশালী এবং তিনি তোর কাছেই আছেন।’ বাবা গত বছর আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় বলে গেছেন, আমি মার্চ-এপ্রিলেই তোমার আর শ্রেয়সীর কাছে আসব। তন্ময়দার কথা আমাকে শক্তি দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি বাবা আমার প্রতিটা চিন্তায়, প্রতিটা নিঃশ্বাসে মিশে আছে। এখন আরো বেশি করে হয়তো আমাদের কাছে এসে গেছে। তাই সারা দিন গেয়ে চলেছি- চিরসভা হে, ছেড়ো না ছেড়ো না মোরে।

দিঠি হাসনাত : সংবাদের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক ও কালি ও কলম সম্পাদক কবি ও লেখক আবুল হাসনাতের মেয়ে ও শিক্ষক।

back to top