alt

সাময়িকী

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

জামিরুল শরীফ

: রোববার, ১৪ নভেম্বর ২০২১

জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু

কবিরা আত্মোপলব্ধির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে জন্মায়। যে-কবি প্রতিনিয়ত অন্তঃপ্রেরণার মুখাপেক্ষী থেকে স্ব-প্রণীত সাহিত্যের স্বয়ংসিদ্ধি লাভে সক্ষম- তিনিই কাব্যের যথার্থ রূপকার এবং নিমজ্জিত অভিজ্ঞতার অতলস্পর্শী প্রতীক। স্বাতন্ত্র্যহেতু জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- এই দুই সমসময়নিবাসী, নিরাত্মীয় হলেও উপলব্ধিঘনিষ্ঠ কবি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ধ্বনিত। কাব্যরচনা প্রেরণার মুখাপেক্ষী হলেও সে-প্রেরণা জন্মায় প্রত্যয়ে। মানুষ প্রকৃতি আর প্রত্যয়ের সমবলে জীবনের দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্বে যেমন নামে; কবিরা সার্বভৌম প্রত্যয়ের মানসলোকে জন্মালেও সমস্ত বস্তুজগতে বিরাট দৃকশক্তি ও কালজ্ঞানের মূল্যে দুর্লভ গুণের অধিকারী ও বিশ্ববীক্ষার প্রাণ; এবং এই কালজ্ঞান ও ঐতিহাসিক দৃষ্টির বিচারে আমাদের আনতেই হয়।

সভ্যতার পর্বাপর্বে আধুনিকতাকে স্বীকার করা মানে বিজ্ঞানকে অঙ্গীকার করে নেয়া। জীবনানন্দ দাশ স্পষ্টত নগর ও সভ্যতার প্রতি বিতৃষ্ণ! তাঁর বিবেচনায় নগর বিরোধিতার আভাসে ট্রামলাইনকে তিনি আদিম সাপিনী রূপে দেখেন, ট্রাম জান্তব হাঙর, নগরীর রাত আফ্রিকার জঙ্গলের মতো, প্রকারান্তরে নগরীকে তিনি অতি জান্তব জটিল বলে গণ্য করেন। তাঁর বুনোহাঁস শহরের সমভূমি ছাড়িয়ে দক্ষিণ সমুদ্রের উদ্দেশে উড়ন্ত। মধ্যবয়সে মতিভ্রান্তরা অনেক সময় দিগি¦দিক হারালেও ওই বয়সে জীবনানন্দ কলকাতায় এসে “মহাপৃথিবী”র প্রতিভাসে কলকাতাকে তাঁর কবিতার স্থান করেছিলেন অনেকটা তিক্ততায়। সভ্যতার নিরবধিকালের প্রয়োজনে, আবেদনে আমাদের যত ঋণ ও সহানুভূতি থাক সকল যুগের ভাবুকেরা কাব্যের তরফে যে স্বাধীনতা চান- তা ঐতিহ্যের পরিপন্থী নয়। বরং যুগের অভিনিবেশে দেখি স্পেনের ভূস্বর্গ থেকে নিউইয়র্কে এসে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা নগরীর জটিল জ্যামিতিক প্রকরণ মেনে নিতে পারেননি, “নিউইয়র্কে মৃত্যু” গ্রন্থে নগর বিরূপতার তিক্ত ছায়াপাত লক্ষ্য করি- তেমনি প্রায় সমতুল্য প্রতিক্রিয়া জীবনানন্দের কলকাতায় এসে। এদিকে বুদ্ধদেব বসুর চোখে শহর সুন্দর, স্বপ্নতুল্য, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি দর্শনে তাঁর মনোদৃষ্টি শিক্ষিত নাগরিকের; তাঁর স্বপ্ন-ছায়াপাতে ‘কলকাতা ঝরে একফোঁটা মধু/অসীমের শতদলে।’ মূলত জীবনানন্দের ‘মহাপৃথিবী’র প্রতিনিধিত্বে ও তারই অনুসরণে বুদ্ধদেবের শ্রমে ও সৌজন্যে কলকাতা হয়ে উঠলো বাংলা কবিতার রাজধানী।

স্বাতন্ত্র্যহেতু জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- এই দুই সমসময়নিবাসী, নিরাত্মীয় হলেও উপলব্ধিঘনিষ্ঠ কবি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ধ্বনিত। কাব্যরচনা প্রেরণার মুখাপেক্ষী হলেও সে-প্রেরণা জন্মায় প্রত্যয়ে

যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্ষিপ্রতার প্রভাব ও প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনের উৎকর্ষ নিশ্চিতরূপে অনিবার্য। যুক্তির সমর্থন থাকলেও আপত্তির আশংকা সুধীন্দ্রনাথের মন স্বস্তি পায়নি- ‘যানবাহনের ক্ষিপ্রতায় আর যন্ত্রপাতির আশীর্বাদে পৃথিবীর প্রাথমিক বৈচিত্র্য ক্রমেই মিলিয়ে আসছে বটে, কিন্তু মানুষের শরীরে যত দিন আত্মীয়-বন্ধুর স্বাক্ষর থাকবে, তার ব্যবসা যত দিন সামবায়িক সংকল্পের মুখ চাইবে, তত দিন সে যে কী উপায়ে গোষ্ঠীর গণ্ডি খণ্ডাবে, তা অন্তত আমার কাছে দুর্বোধ্য।’ [প্রগতি ও পরিবর্তন/অংশবিশেষ, সু. দ.]

নগর সভ্যতার আবরণের অন্তরালে মানবিক পৃথিবী কতখানি দুর্দশাগ্রস্ত, তার আকাশজুড়ে সংবর্তের ঘোর ঘটা প্রেমেন্দ্র মিত্র-র মনেও অতিজীবিতের আর্তনাদ, নাগরিক আলোকের অভ্যন্তরে অন্ধকার, অনিশ্চয়, হতাশা আর অভীপ্সার দ্বন্দ্ব-

“আমার সঙ্গে চলো মহানগরে, যে মহানগর ছড়িয়ে আছে আকাশের তলায় পৃথিবীর ক্ষতের মতন, আবার যে মহানগর উঠেছে মিনারে আর চূড়ায় আর অভ্রভেদী প্রাসাদ-শিখরে তারাদের দিকে, প্রার্থনার মত মানবাত্মার।

আমার সঙ্গে এসো মহানগরের পথে, যে পথ জটিল, দুর্বল মানুষের জীবনধারার মতো, যে পথ অন্ধকার মানুষের মনের অরণ্যের মতো, আর যে পথ প্রশস্ত, আলোকোজ্জ্বল, মানুষের বুদ্ধি, মানুষের অদম্য উৎসাহের মতো।

এ মহানগরের সঙ্গীত রচনা করা উচিত, ভয়াবহ, বিস্ময়কর সঙ্গীত।

তার পটভূমিতে যন্ত্রের নির্ঘোষ, ঊর্ধ্বেমুখ কলের শঙ্খনাদ, সমস্ত পথের সমস্ত চাকার ঘর্ঘর, শিকলের ঝনৎকার- ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সঙ্ঘর্ষের আর্তনাদ। শব্দের এই পটভূমির ওপর দিয়ে চলেছে বিসর্পিল সুরের পথ; প্রিয়ার মতো যে নদী শুয়ে আছে মহানগরের কোলে তার জলের ঢেউয়ের সুর, আর নগরের ছায়াবীথির ওপর দিয়ে যে হাওয়া বয় তার, নির্জন ঘরে প্রেমিকেরা অর্ধস্ফুট যে কথা বলে তারও। সে সঙ্গীতের মাঝে থাকবে উত্তেজিত জনতার সম্মিলিত পদধ্বনি; শব্দের বন্যার মতো, আর থাকবে ক্লান্ত পথিকের পথের ওপর দিয়ে পা টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজ, মধ্যরাতে যে পথিক চলেছে অনির্দিষ্ট আশ্রয়ের খোঁজে।

কঠিন ধাতু ও ইটের ফ্রেমে লক্ষ জীবনের সূত্র নিয়ে মহানগর বুনছে যে বিশাল সূচীচিত্র। যেখানে খেই যাচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে, উঠছে জড়িয়ে নতুন সুতোর সঙ্গে অকস্মাৎ- সহসা যাচ্ছে ছিঁড়ে- সেই বিশাল দুর্বোধ চিত্রের অনুবাদ থাকবে সে সঙ্গীতে।”

[মহানগর/প্রেমেন্দ্র মিত্র]

প্রায় সমান্তরালে বুদ্ধদেব বসু এক অর্থে নাগরিক কবি। নগরকেন্দ্রের সম্বন্ধসূত্রে বিস্তারিত প্রসারিত হয় তার সাংস্কৃতিক সব ডালপালা। সন্দেহ নেই, সংস্কৃতির শেকড়গুলো গ্রামেই প্রোথিত। এবং তার শাখা-প্রশাখার বিকাশ ও বিস্তার শাহরিক আকাশে। রবীন্দ্রনাথের পরে তিরিশের কবিবৃন্দ বিষয়ের প্রাধান্যে কবিতায় আধুনিক প্রাণবীজের যে নতুন প্রাণপ্রতিষ্ঠা আনলেন, পরবর্তীতে একই ধারায় প্রত্যেক কবিরাই একই বাদ্যযন্ত্রে ভিন্ন সুর শুনিয়েছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব প্রমুখ স্মরণীয়। আমার বিবেচনায় এদের মধ্যে কোনও ঐক্য না থাক, একান্ত দৃষ্টির ইঙ্গিত আছে। মুখ্যত তিরিশের আধুনিক কবিদের ভাষা, রচনারীতি ও দৃকশক্তির স্বাক্ষরে রচিত অক্ষরবৃত্তের অকাট্য নিয়ম মেনেও তাঁরা ব্যতিক্রম-

সুধীন্দ্রনাথ: সে যে অনামিকা

অনিত্যা মৃন্ময়ী অল্পা, তবু তার রূপমরীচিকা

নিশ্চয় অমিত শূন্য মরুভূমির মাঝে

অন্তিম সম্বলসম দিশাহারা নয়নে বিরাজে।

[অনাম কবিতা, তন্বী]

প্রেমেন্দ্র মিত্র: কথা খুঁজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহেনাকো সীমা;

-আনন্দের ঝটিকায় কাঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মতো;

বিরাটের তীরে-তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে-

নমো নমো নমো।

[নমো নমো, প্রথমা]

বিষ্ণু দে: অগুণ্ঠিত নারী-

শরতের সূর্য সে যে- সে তো নয় কোজাগরী শশী,

কুণ্ঠাহীন দৃষ্টি তার আমাকে সে দিলে দৃষ্টি ভ’রে,

আমি তাই একা তটে বসি,

আর ভাবি রৌদ্রময়

ভাষা তার কিবা বলে- ডায়ানা? উর্বশী?

[সাগরউত্থিতা, উর্বশী ও আর্টেমিস]

জীবনানন্দ: রৌদ্র ঝিলমিল

ঊষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল,

অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারেবারে

নিঃসহায় নগরীর কারাগার প্রাচীরের পারে!

[নীলিমা, ঝরা পালক]

বুদ্ধদেব: যেথা যত বিপুল বেদনা,

যেথা যত আনন্দের মহান মহিমা-

আমার হৃদয়ে তার নব-নব হয়েছে প্রকাশ।

বকুল বীথির ছায়ে গোধূলির অস্পষ্ট মায়ায়

অমাবস্যা-পূর্ণিমার পরিণয়ে আমি পুরোহিত।

শাপভ্রষ্ট দেবশিশু আমি!

[শাপভ্রষ্ট, বন্দীর বন্দনা]

এরা প্রত্যেকেই রবীন্দ্রস্মরণিতে দাঁড়িয়ে মনোযোগ রেখেছেন সামনের দিকে, সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্র্রোতধারা সে পথ ধরেই বয়ে এসেছে। সমস্ত চেষ্টা নিয়োজিত হয়েছিল নতুন হবার জন্য; এবং আজও নতুনত্বের প্রতি দুর্মর মোহ অব্যাহত। তাই সাহিত্য ও চলিষ্ণুতা সমার্থক। কালের চলিষ্ণু-গতিকে অস্বীকার করে কবি মর্যাদায় স্থবির হয়ে থাকা পোষ্যপুত্রের মতো নিন্দনীয়। সঞ্চিত আবেগে খামকা খেয়াল ধরা পড়ে। রবীন্দ্র-যুগের উত্তরপর্বের কবিদের মধ্যে আধুনিক ও ব্যতিক্রম হবার যে শ্রম ও স্বপ্ন, তা সুস্পষ্ট, অত্যন্ত সরব, অত্যন্ত সচেতন স্বাক্ষর জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- যা অপ্রতিরোধ্য ও অপরিবর্তনীয় তার বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া শক্তির অপচয়- এমন বিধিলিপির প্রতি সমর্পিত না হয়ে বরং দু’জনেই আপ্রাণ চেষ্টায় রক্তাক্ত। জীবনানন্দ দাশ অনায়াসেই স্বয়ংসিদ্ধ, রবীন্দ্রস্পর্শমুক্ত। এবং তর্কাতীতভাবেই সহজ স্বাধীনতায় তিনি একেবারেই নতুন চিত্তবৃত্তির সাক্ষ্য হয়ে উঠলেন। জীবনানন্দের প্রশংসায় এবং সহজে বুঝেছিলেন এই কবি প্রশংসনীয় নন শুধু, কাব্যাদর্শে একান্তভাবে অননুকরণীয়, একটা অভাবনীয় অভিনবত্বেই ফুটে বেরুচ্ছে।

আজও জীবনানন্দ দাশের জয় জয়কার বাংলাদেশে, তাঁর অন্তর্দর্শনের অনুভূতিজাত বাঙালি মানস ছাড়িয়ে নিঃসন্দেহে বিশ্বসাহিত্যেরও অংশভাগ। এর পেছনে পাঠক সমাজে তাঁকে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন বুদ্ধদেব বসু। তার আগে জীবনানন্দ প্রায় অনাবিষ্কৃত ছিলেন। বুদ্ধদেবের অভিনিবেশ, প্রেরণা ও পরিশ্রমে বোদলেয়ারের পরে জীবনানন্দের ক্রমবিকাশ ও বিস্মরণ বাঙালি পাঠক সমাজে অচিন্ত্যনীয়। বুদ্ধদেব বসু অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন, কারণ তাঁর মতো প্রেমীর উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এমনকি কাব্যপাঠে আমাদের ভোঁতা বুদ্ধিতে শান লাগিয়েছেন তিনিই এবং কাব্যপাঠে আমাদের ইন্দ্রিয়াতীত সত্তা যে আনন্দ পায়, আমাদের বোধকে সংবেদনীয় সার্থকতা সম্বন্ধে ঔৎসুক্য করে তোলে তা বুদ্ধদেবের অনুবাদ-সমালোচনার অনুগ্রহে তিনি দৃষ্টি-শ্রুতির অনিবার্য প্রিয়পাত্র। গত শতাব্দির অন্যতম প্রধান দুই কবি জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা অত্যুত্তম, বিশেষত অনুবাদ কাজে ও প্রবন্ধ রচনায় দু’জন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। জীবনানন্দ তাঁর কবিস্বভাবের ভাবচ্ছবির নিঃশব্দ নির্জনতার সামঞ্জস্যে অনুবাদে অন্যদের করে তোলেন নিজের মতো, বুদ্ধদেব করে তোলেন অন্যদের মতো। এই দুই অনুবাদক-কবির ভাষা-চারিত্রের ছাপ স্বতন্ত্রতা সম্বন্ধে কথা কওয়ার অবসর নাই। বর্ষগণনাতে উপস্থিত কালের নতুন প্রভাব ও সৃষ্টির পরাক্রান্তে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব সাহিত্যিক গৃহস্থালির মায়াজালে সময়কে বাঁধতে পেরেছিলেন বলেই পৃথকান্তরে দু’জনেই ততদিনে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। সময়ের সম্বন্ধ স্থাপনে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই সৎসাহিত্যের মহত্তম ফসল ফলিয়েছেন। সাহিত্যে যেহেতু নিন্দারোপের লোকের অভাব হয় না, এক শ্রেণির লোকেরা বরাবরই নিন্দুক এবং এরা বড়জোর সাহিত্যের অলস ও মুমূর্ষু পাঠক, সৎ-সমালোচক নয়। কুরুক্ষেত্রের আসনেই এদের আরামবোধ, অথবা নির্বোধের কৃপাকটাক্ষেই এদের বিচরণ। সব ছাপিয়ে কবিত্বের পদমর্যাদায় এই দুই কবির প্রতি আমাদের বিনয়, ঋণ, সহানুভূতি ও পুনরুত্থান অনিবার্য লাগে। সহজাত প্রতিভার প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে, চৈতন্যের ব্যাপ্তিতে শিক্ষিত বাঙালির বদ্ধমূল পরিচয়ের আয়ত্তে আমরা তাঁদের পাই। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে সাহিত্যশিল্পে মন্ময়তা ও তন্ময়তার এমন যুগল আবির্ভাব খুব সুলভ নয়।

কঠিন ধাতু ও ইটের ফ্রেমে লক্ষ জীবনের সূত্র নিয়ে মহানগর বুনছে যে বিশাল সূচীচিত্র। যেখানে খেই যাচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে, উঠছে জড়িয়ে নতুন সুতোর সঙ্গে অকস্মাৎ- সহসা যাচ্ছে ছিঁড়ে- সেই বিশাল দুর্বোধ চিত্রের অনুবাদ থাকবে সে সঙ্গীতে।”

[মহানগর/প্রেমেন্দ্র মিত্র]

প্রায় সমান্তরালে বুদ্ধদেব বসু এক অর্থে নাগরিক কবি। নগরকেন্দ্রের সম্বন্ধসূত্রে বিস্তারিত প্রসারিত হয় তার সাংস্কৃতিক সব ডালপালা। সন্দেহ নেই, সংস্কৃতির শেকড়গুলো গ্রামেই প্রোথিত। এবং তার শাখা-প্রশাখার বিকাশ ও বিস্তার শাহরিক আকাশে। রবীন্দ্রনাথের পরে তিরিশের কবিবৃন্দ বিষয়ের প্রাধান্যে কবিতায় আধুনিক প্রাণবীজের যে নতুন প্রাণপ্রতিষ্ঠা আনলেন, পরবর্তীতে একই ধারায় প্রত্যেক কবিরাই একই বাদ্যযন্ত্রে ভিন্ন সুর শুনিয়েছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব প্রমুখ স্মরণীয়। আমার বিবেচনায় এদের মধ্যে কোনও ঐক্য না থাক, একান্ত দৃষ্টির ইঙ্গিত আছে। মুখ্যত তিরিশের আধুনিক কবিদের ভাষা, রচনারীতি ও দৃকশক্তির স্বাক্ষরে রচিত অক্ষরবৃত্তের অকাট্য নিয়ম মেনেও তাঁরা ব্যতিক্রম-

সুধীন্দ্রনাথ: সে যে অনামিকা

অনিত্যা মৃন্ময়ী অল্পা, তবু তার রূপমরীচিকা

নিশ্চয় অমিত শূন্য মরুভূমির মাঝে

অন্তিম সম্বলসম দিশাহারা নয়নে বিরাজে।

[অনাম কবিতা, তন্বী]

প্রেমেন্দ্র মিত্র: কথা খুঁজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহেনাকো সীমা;

-আনন্দের ঝটিকায় কাঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মতো;

বিরাটের তীরে-তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে-

নমো নমো নমো।

[নমো নমো, প্রথমা]

বিষ্ণু দে: অগুণ্ঠিত নারী-

শরতের সূর্য সে যে- সে তো নয় কোজাগরী শশী,

কুণ্ঠাহীন দৃষ্টি তার আমাকে সে দিলে দৃষ্টি ভ’রে,

আমি তাই একা তটে বসি,

আর ভাবি রৌদ্রময়

ভাষা তার কিবা বলে- ডায়ানা? উর্বশী?

[সাগরউত্থিতা, উর্বশী ও আর্টেমিস]

জীবনানন্দ: রৌদ্র ঝিলমিল

ঊষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল,

অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারেবারে

নিঃসহায় নগরীর কারাগার প্রাচীরের পারে!

[নীলিমা, ঝরা পালক]

বুদ্ধদেব: যেথা যত বিপুল বেদনা,

যেথা যত আনন্দের মহান মহিমা-

আমার হৃদয়ে তার নব-নব হয়েছে প্রকাশ।

বকুল বীথির ছায়ে গোধূলির অস্পষ্ট মায়ায়

অমাবস্যা-পূর্ণিমার পরিণয়ে আমি পুরোহিত।

শাপভ্রষ্ট দেবশিশু আমি!

[শাপভ্রষ্ট, বন্দীর বন্দনা]

এরা প্রত্যেকেই রবীন্দ্রস্মরণিতে দাঁড়িয়ে মনোযোগ রেখেছেন সামনের দিকে, সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্র্রোতধারা সে পথ ধরেই বয়ে এসেছে। সমস্ত চেষ্টা নিয়োজিত হয়েছিল নতুন হবার জন্য; এবং আজও নতুনত্বের প্রতি দুর্মর মোহ অব্যাহত। তাই সাহিত্য ও চলিষ্ণুতা সমার্থক। কালের চলিষ্ণু-গতিকে অস্বীকার করে কবি মর্যাদায় স্থবির হয়ে থাকা পোষ্যপুত্রের মতো নিন্দনীয়। সঞ্চিত আবেগে খামকা খেয়াল ধরা পড়ে। রবীন্দ্র-যুগের উত্তরপর্বের কবিদের মধ্যে আধুনিক ও ব্যতিক্রম হবার যে শ্রম ও স্বপ্ন, তা সুস্পষ্ট, অত্যন্ত সরব, অত্যন্ত সচেতন স্বাক্ষর জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- যা অপ্রতিরোধ্য ও অপরিবর্তনীয় তার বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া শক্তির অপচয়- এমন বিধিলিপির প্রতি সমর্পিত না হয়ে বরং দু’জনেই আপ্রাণ চেষ্টায় রক্তাক্ত। জীবনানন্দ দাশ অনায়াসেই স্বয়ংসিদ্ধ, রবীন্দ্রস্পর্শমুক্ত। এবং তর্কাতীতভাবেই সহজ স্বাধীনতায় তিনি একেবারেই নতুন চিত্তবৃত্তির সাক্ষ্য হয়ে উঠলেন। জীবনানন্দের প্রশংসায় এবং সহজে বুঝেছিলেন এই কবি প্রশংসনীয় নন শুধু, কাব্যাদর্শে একান্তভাবে অননুকরণীয়, একটা অভাবনীয় অভিনবত্বেই ফুটে বেরুচ্ছে।

আজও জীবনানন্দ দাশের জয় জয়কার বাংলাদেশে, তাঁর অন্তর্দর্শনের অনুভূতিজাত বাঙালি মানস ছাড়িয়ে নিঃসন্দেহে বিশ্বসাহিত্যেরও অংশভাগ। এর পেছনে পাঠক সমাজে তাঁকে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন বুদ্ধদেব বসু। তার আগে জীবনানন্দ প্রায় অনাবিষ্কৃত ছিলেন। বুদ্ধদেবের অভিনিবেশ, প্রেরণা ও পরিশ্রমে বোদলেয়ারের পরে জীবনানন্দের ক্রমবিকাশ ও বিস্মরণ বাঙালি পাঠক সমাজে অচিন্ত্যনীয়। বুদ্ধদেব বসু অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন, কারণ তাঁর মতো প্রেমীর উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এমনকি কাব্যপাঠে আমাদের ভোঁতা বুদ্ধিতে শান লাগিয়েছেন তিনিই এবং কাব্যপাঠে আমাদের ইন্দ্রিয়াতীত সত্তা যে আনন্দ পায়, আমাদের বোধকে সংবেদনীয় সার্থকতা সম্বন্ধে ঔৎসুক্য করে তোলে তা বুদ্ধদেবের অনুবাদ-সমালোচনার অনুগ্রহে তিনি দৃষ্টি-শ্রুতির অনিবার্য প্রিয়পাত্র। গত শতাব্দির অন্যতম প্রধান দুই কবি জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা অত্যুত্তম, বিশেষত অনুবাদ কাজে ও প্রবন্ধ রচনায় দু’জন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। জীবনানন্দ তাঁর কবিস্বভাবের ভাবচ্ছবির নিঃশব্দ নির্জনতার সামঞ্জস্যে অনুবাদে অন্যদের করে তোলেন নিজের মতো, বুদ্ধদেব করে তোলেন অন্যদের মতো। এই দুই অনুবাদক-কবির ভাষা-চারিত্রের ছাপ স্বতন্ত্রতা সম্বন্ধে কথা কওয়ার অবসর নাই। বর্ষগণনাতে উপস্থিত কালের নতুন প্রভাব ও সৃষ্টির পরাক্রান্তে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব সাহিত্যিক গৃহস্থালির মায়াজালে সময়কে বাঁধতে পেরেছিলেন বলেই পৃথকান্তরে দু’জনেই ততদিনে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। সময়ের সম্বন্ধ স্থাপনে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই সৎসাহিত্যের মহত্তম ফসল ফলিয়েছেন। সাহিত্যে যেহেতু নিন্দারোপের লোকের অভাব হয় না, এক শ্রেণির লোকেরা বরাবরই নিন্দুক এবং এরা বড়জোর সাহিত্যের অলস ও মুমূর্ষু পাঠক, সৎ-সমালোচক নয়। কুরুক্ষেত্রের আসনেই এদের আরামবোধ, অথবা নির্বোধের কৃপাকটাক্ষেই এদের বিচরণ। সব ছাপিয়ে কবিত্বের পদমর্যাদায় এই দুই কবির প্রতি আমাদের বিনয়, ঋণ, সহানুভূতি ও পুনরুত্থান অনিবার্য লাগে। সহজাত প্রতিভার প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে, চৈতন্যের ব্যাপ্তিতে শিক্ষিত বাঙালির বদ্ধমূল পরিচয়ের আয়ত্তে আমরা তাঁদের পাই। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে সাহিত্যশিল্পে মন্ময়তা ও তন্ময়তার এমন যুগল আবির্ভাব খুব সুলভ নয়।

জীবনানন্দ-প্রতিভা রুচিপ্রধান, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও ঐতিহ্যপ্রবণ। নিসর্গনিষ্ঠার চেতনা এতটাই নির্মল যে তাঁর রচনা যেমন রহস্যকেন্দ্রিক, তেমনি রসাত্মক ও আনন্দঘন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে আমার আস্থা-অনাস্থা ব্যক্তিগত হলেও, কবিস্বাতন্ত্র্যের স্বাবলম্বনেই আমার আস্থা অত্যধিক, এবং রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রতিষ্ঠাভূমির উপর দাঁড়ালে আমাদের অনেকেরই যেখানে পা পিছলায়, তার মানে অনেক পূর্বসূরির প্রভাব আমাদের উপর কম-বেশি পড়েই পড়ে, তখন অনুকরণের প্রভাব ও প্রাদুর্ভাব দুই স্বাভাবিক, কেননা শিল্প জিনিসটা চিরকাল গতানুগতিক প্রয়োজনের পরিপন্থী আমার তা মনে হয় না। নানা বিদ্যায় ও জ্ঞানার্জনে আমরা যতই আধুনিকের প্রাগ্রসরতা দাবি করি না কেন, আসলে আমাদের মন প্রাচীনপন্থী। অর্থাৎ আধুনিককালের ভাবুকেরা ষখন পাশ্চাত্য আবহাওয়াতেই মানুষ এবং স্বচ্ছন্দ, তখন পূর্বসূরিদের অসামান্যতারও তারা ভক্ত, তা না হলে গুরুভক্তি টিকতো না। পাশ্চাত্য রোমান্টিক কবিদের বংশভুক্ত হয়েও রবীন্দ্রনাথ নিজের বৈশিষ্ট্য একটুও খোয়াননি, অনুরূপ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ছেড়ে কবিস্বাতন্ত্র্যের অধিকার জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেবরও প্রাপ্য।

জীবনানন্দের কবিমন বিষণ্ন পর্যবেক্ষণে প্রকৃতি-প্রবৃত্তিতাড়িত। তাঁর নির্জনতম সত্তা নগর ও আধুনিক সভ্যতার চাকায় বিষময়, অমানবিক ঠেকে। প্রযুক্তিসভ্যতার অসাধারণ উন্নতিসাধন স্বীকার করেও শুধু বেঁচে থাকায় তৃপ্ত হলে চলবে না, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে- তাকে বনজ বৃক্ষের মতো বাড়তে এবং ডালপালা বিস্তার করতে দিতে হবে; বাধা আসবে, কিন্তু ব্যক্তিমানুষের অপমৃত্যু ঘটাতে পারবে না, বরং ব্যক্তি বিকাশে সহায়তা করবে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায়, সভ্যতার যান্ত্রিক চাকায় পিষ্ট চিৎকারময় কোলাহল কবির ভাবনায় ব্যঘাত ঘটায়। জীবনের চলমান স্তরে কী জীবনে, কী সাহিত্যে অত্যধিক কালনিষ্ঠা স্থান-কালের দাসত্ব বলে তিনি মনে করেন, এবং কবিতাকে চিরন্তনের কোঠায় ওঠাতে প্রেম ও প্রকৃতি তাঁর কাছে মন্ময় ও অনন্ত ঠেকে।

এ-যুগে কোথাও কোনো আলো- কোনো কান্তিময় আলো

চোখের সুমুখে নেই যাত্রিকের; নেই তো নিঃসৃত অন্ধকার

রাত্রির মায়ের মতো : মানুষের বিহ্বল দেহের

সব দোষ প্রক্ষালিত ক’রে দেয়- মানুষের বিহ্বল আত্মাকে

লোকসমাগমহীন একান্তের অন্ধকারে অন্তঃশীল ক’রে

তাকে আর শুধায় না- অতীতের শুধানো প্রশ্নের

উত্তর চায় না আর- শুধু শব্দহীন মৃত্যুহীন

অন্ধকারে ঘিরে রাখে, সব অপরাধ ক্লান্তি ভয় ভুল পাপ

বীতকাম হয় যাতে- এ জীবন ধীরে ধীরে বীতশোক হয়,

স্নিগ্ধতা হৃদয়ে জাগে; যেন দিকচিহ্নময় সমুদ্রের পারে

কয়েকটি দেবদারু গাছের ভিতরে অবলীন

বাতাসের প্রিয়কণ্ঠ কাছে আসে- মানুষের রক্তাক্ত

সে-হাওয়া অনবচ্ছিন্ন সুগমের- মানুষের জীবন নির্মল।

আজ এই পৃথিবীতে এমন মহানুভব ব্যাপ্ত অন্ধকার

নেই আর? সুবাতাস গভীরতা পবিত্রতা নেই?

তবুও মানুষ অন্ধ দুর্দশার থেকে স্নিগ্ধ আঁধারের দিকে

অন্ধকার হ’তে তার নবীন নগরী গ্রাম উৎসবের পানে

যে অনবনমনে চলেছে আজো- তার হৃদয়ের

ভুলের পাপের উৎস অতিক্রম ক’রে চেতনার

বলয়ের নিজ গুণ র’য়ে গেছে ব’লে মনে হয়।

এসো জ্ঞান, দীনতা, নির্মেঘ দৃষ্টি, শান্তি, আলো, প্রেম।*

[কবিতা: ১৯৪৬-৪৭/অংশত]

অপরদিকে কবিস্বাতন্ত্র্যের একটা সুনির্দিষ্ট ধারা স্পট সত্ত্বেও জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব চেতনার উৎকর্ষের সরণী বেয়ে উভয়ে চিরন্তনার অনন্ত অমৃতের পূর্ণতার স্বরূপ-সন্ধানে নামেন।

বিধাতা, জানো না তুমি কী অপার পিপাসা আমার

অমৃতের তরে।...

না-হয় রেখেছো বেঁধে, তবু জেনো শৃঙ্খলিত ক্ষুদ্র হস্ত মোর

উধাও আগ্রহ-ভরে ঊর্ধ্বনভে উঠিবারে চায়

অসীমার নীলিমারে জড়াইতে ব্যগ্র আলিঙ্গনে।

[বন্দীর বন্দনা/অংশত]

জীবনানন্দ দাশের কবি পরিচয় কী? তাঁর মতো অতি বড় খেয়ালীর-ভাবের ছায়াময় রাজ্যে বহুল-আলোচিত, আলোড়িত-আন্দোলিত, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান কোথায়? কোন মহিমায় তিনি আজও সময় বা কালের গ্রন্থি ছিঁড়ে স্বাবলম্বীরূপে বর্তমান? তাঁর সম্বন্ধে এইটুকুই আমার কওয়া যে, জীবনানন্দের দার্শনিক মনোভাব আর তাঁর কবিতার তত্ত্ব বিচার এক জিনিস। যদিও দর্শন-শব্দকে বিস্তারিত অর্থে ধরলে, শুধু কবিতা নয়, মানুষের সকল প্রক্রিয়াতেই তার প্রসার দেখা যাবে। দর্শন বলতে মানবচৈতন্যের সেই দিব্যদৃষ্টিকে বুঝি না, যার দ্যোতনায় বস্তুবিশ্বের সম্বন্ধে আমাদের বুদ্ধিগত মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তিকে একটা ন্যায়সঙ্গতিতে মুক্তি দেয়। এই অর্থে দর্শন আর যুক্তি পরস্পর সম্পর্কগাঁথা, এবং আমিও সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে একমত যে, ‘দর্শনের সঙ্গে কাব্যের সম্পর্ক শিথিল’। দর্শনের প্রাণ দ্রষ্টার মানসে এবং কাব্যের প্রাণশক্তি অভিজ্ঞতা-উৎপাদনে; এই দু’য়ের ধর্ম অনন্যবিরোধী। অর্থাৎ দর্শনের বয়ানে অভিজ্ঞতার স্বরূপ সন্ধান যুক্তির সংস্পর্শ মানলেও কবির কাব্যের বয়নে অভিজ্ঞতার স্বরূপে বিশ্বের অখ-তাই তার বিশেষ গুণ। সে-গুণের সংবেদনার স্রোতে বিস্ময়বোধই একমাত্র মনোভাব, এবং বিশ্বসাহিত্যও প্রকরণবিশেষে তার অন্যতম অবদান। জীবনানন্দের কবি পরিচয়ে তাঁর কাব্যগুণ ভাষাগত নৈপুণ্যে সৌন্দর্যতৃষ্ণা, অতৃপ্ত বাসনা, আকণ্ঠ প্রেমতৃষ্ণা, প্রকৃতি-সংস্কৃতির উত্থানে তিনি ক্লান্তিহীন, আত্মস্থ বিশ্বমানব। তাঁর কাব্য-ভুবনের পরিবেশের মধ্যে সত্য ও শ্রেয়োবোধের শিকড় নিজ গুণে প্রোথিত এবং মর্যাদাবান। জীবনানন্দের কবিতার ভাষার বড় গুণ হচ্ছে স্বচ্ছতা ও প্রাঞ্জলতা। প্রচলিত ভাষার তুচ্ছতা তাঁকে স্পর্শ করে না; অথচ স্বচ্ছতম ভাষা জীবনানন্দনীয় কবিভাষা প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহৃত শব্দ-সম্ভার নিয়েই গড়ে উঠেছে, এ-ভাষা নিতান্ত সাধারণীকৃত বলে হেয় নয়, বরং রূপকার্থ-ব্যঞ্জক শব্দ, সম্প্রসারিত শব্দসম্ভার স্বাভাবিক কাঠামোর বাইরে কাব্যের অভিভাব পাঠকের অন্তরাত্মায় পৌঁছে এমন এক অর্থবোধের চিত্রকল্পাদির প্রাণস্পন্দে আমাদের নিয়ে যায়- যেখানে কাব্যলোকের কোনো অঙ্গীকার নেই, অথচ অমৃতলোকের সন্ধান আছে। উল্লেখ করতে পারি ‘বৈতরণী’ কবিতার প্রথম স্তবক:

কী যেন কখন আমি কবর থেকে উঠে আসিলাম

আমারে দিয়েছে ছুটি বৈতরণী নদী

শকুনের মতো কালো ডানা মেলে পৃথিবীর দিকে উড়িলাম

সাত-দিন সাত-রাত উড়ে গেলে সেই আলো পাওয়া যায় যদি

পৃথিবীর আলো প্রেম?

আমারে দিয়েছে ছুটি বৈতরণী নদী।

জীবনানন্দের শব্দসম্ভার নিরঙ্কুশ, যা ভাষাকে ছাড়িয়ে প্রহেলিকা সৃষ্টি করে না, পর্যবসিত করে না কৃত্রিম বাগাড়ম্বরে। আবার মরীচিকার মায়াজালেও জড়িত করে না। ভাষা তখনই প্রহেলিকায় পরিণত হয় যখন ব্যবহৃত শব্দসম্ভার রূপকধর্মী, অন্ধের চোখ না ফুটিয়ে লাঠির ওপর ভর করে; আর কৃত্রিম বাগাড়ম্বরে পর্যবসিত হয় যখন স্ব-ভাষায় রচিত হলেও অনেক শব্দই বাইরে থেকে আমদানি করে, নয়তো ধার করে নতুন সামগ্রী-স্বরূপ চমক সৃষ্টির প্রয়াস দেখি কি কবিতায়, কি গদ্য রচনায়- আমার কাছে এইসব আধুনিকদের কৌতুককর এবং বিদ্রুপযোগ্য লাগে। অপ্রচলিত শব্দ, রূপক, আলংকারিক শব্দ এবং অন্যান্য প্রজাতির শব্দ, শব্দ- সেসব ভাষাকে হীনতা ও তুচ্ছতার উর্ধ্বে তুলে ধরে প্রতিদিনের শব্দসম্ভার ভাষাকে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা- অর্থাৎ কাব্যের সাহিত্যের ভাষার স্বচ্ছতার বিধান মানে। ভাষাকে আভিজাত্য-দানের সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় শব্দের সপ্রতিভ রূপ, সংক্ষেপিত এবং পরিবর্তিত রূপের ব্যবহার- যা প্রচলিত বাকভঙ্গি থেকে কিছুটা দূরে অপরিচয়ের ব্যবধান সৃষ্টি করে ভাষাকে প্রাত্যহিকতার তুচ্ছতার উর্ধ্বে তুলে ধরবে, আর সাধারণ বাগভঙ্গির বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হলে ভাষার স্পষ্টতা গুণ বাড়ে। আজকাল কাব্যের আধুনিক কা-ে অনভ্যস্ত, অপ্রাঞ্জল পরিভাষা, অনর্থ অর্থবোধের বিঘ্নতা- সর্বোপরি এসব দুর্বোধ্যতা একটি মারাত্মক রোগ এবং আমি এদের সাহিত্যের অমার্জনীয় আবর্জনা বলি। কবি হবার দিবাস্বপ্ন যারা দেখেন, খামকা খেয়ালের বশবর্তী হয়েই তারা লেখেন। অনশনে গেলেও তাদের দিবাস্বপ্ন ভাঙে না। নিঃসংশয় বস্তুবিশ্বের সংঘাত পেরিয়ে সত্যের সাক্ষাতে না পৌঁছলে আর যাইহোক কাব্য রচনা সম্ভব নয়, বড়জোর, ঐকান্তিক উপলব্ধির ধ্বংসাবশেষ তাদের আশ্রয়স্থল এবং ভুয়োদর্শীর স্বপ্নাবিষ্টই শেষ সম্বল। আমার এই মত যথার্থ কবিদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন মন্তব্য বা আচরণ মনে করলে তা-হবে মারাত্মক ভুল, বরং এ-ই মর্মে আমার কাছে কবিরা সর্ববিধ উপলব্ধির রহস্যময় প্রতীক।

জীবনানন্দের আকস্মিক দুর্ঘটনার দেহাবসানে মনুষ্যজীবনের ভঙ্গুর প্রাণসামগ্রীর আবরণ ঘুচে, ফুটে বেরুলো কবিতায় সৃজন প্রতিভার এমনই এক বিশিষ্ট ও মহৎ গুণ- যা আধুনিক কাব্যের প্রতিনিধিত্বে তাঁর পদমর্যাদায় ঘুণ তো ধরেইনি, বরং তা উত্তরোত্তর আধুনিক কবিতায় যথাসর্বস্বরূপে তাঁকে আমি সবিস্ময়ে ঈর্ষান্বিত চোখেই দেখি। তাছাড়া ভবিষ্যৎ প্রকৃতি-নিসর্গবিলাসীরা তাঁর কবিতার স্বভাবোক্তিতে শুনবেন বাংলা ও বাঙালির মর্মবাণী। জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু বাংলা ভাষার এই দুই কবির ভাষা ও ধ্বনিবৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিলে আমাদের কান ও ইন্দ্রিয়বিশেষ হয়ে ওঠে সজাগ। তাঁদের ভাষা যেমন ঝর্নার মতো ক্ষিপ্র পায়ে ছোটে- সেই সঙ্গে আমরা নূপুরের ধ্বনিও শুনতে পাই, যার প্রবর্তনায় আছে ‘Architecnic Quality’– অর্থাৎ ভাষার ইমারতে স্থপতির পটুত্ব। স্বপ্নাবিষ্টতা নয়, নিঃসংশয় সত্যের সাক্ষাতে আমাদের মানতে হয় জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- দুই-ই সাহিত্যজগতে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

ছবি

শালুক সাহিত্যসন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিকরণের জোরালো দাবি উত্থাপিত

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

tab

সাময়িকী

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

জামিরুল শরীফ

জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু

রোববার, ১৪ নভেম্বর ২০২১

কবিরা আত্মোপলব্ধির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে জন্মায়। যে-কবি প্রতিনিয়ত অন্তঃপ্রেরণার মুখাপেক্ষী থেকে স্ব-প্রণীত সাহিত্যের স্বয়ংসিদ্ধি লাভে সক্ষম- তিনিই কাব্যের যথার্থ রূপকার এবং নিমজ্জিত অভিজ্ঞতার অতলস্পর্শী প্রতীক। স্বাতন্ত্র্যহেতু জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- এই দুই সমসময়নিবাসী, নিরাত্মীয় হলেও উপলব্ধিঘনিষ্ঠ কবি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ধ্বনিত। কাব্যরচনা প্রেরণার মুখাপেক্ষী হলেও সে-প্রেরণা জন্মায় প্রত্যয়ে। মানুষ প্রকৃতি আর প্রত্যয়ের সমবলে জীবনের দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্বে যেমন নামে; কবিরা সার্বভৌম প্রত্যয়ের মানসলোকে জন্মালেও সমস্ত বস্তুজগতে বিরাট দৃকশক্তি ও কালজ্ঞানের মূল্যে দুর্লভ গুণের অধিকারী ও বিশ্ববীক্ষার প্রাণ; এবং এই কালজ্ঞান ও ঐতিহাসিক দৃষ্টির বিচারে আমাদের আনতেই হয়।

সভ্যতার পর্বাপর্বে আধুনিকতাকে স্বীকার করা মানে বিজ্ঞানকে অঙ্গীকার করে নেয়া। জীবনানন্দ দাশ স্পষ্টত নগর ও সভ্যতার প্রতি বিতৃষ্ণ! তাঁর বিবেচনায় নগর বিরোধিতার আভাসে ট্রামলাইনকে তিনি আদিম সাপিনী রূপে দেখেন, ট্রাম জান্তব হাঙর, নগরীর রাত আফ্রিকার জঙ্গলের মতো, প্রকারান্তরে নগরীকে তিনি অতি জান্তব জটিল বলে গণ্য করেন। তাঁর বুনোহাঁস শহরের সমভূমি ছাড়িয়ে দক্ষিণ সমুদ্রের উদ্দেশে উড়ন্ত। মধ্যবয়সে মতিভ্রান্তরা অনেক সময় দিগি¦দিক হারালেও ওই বয়সে জীবনানন্দ কলকাতায় এসে “মহাপৃথিবী”র প্রতিভাসে কলকাতাকে তাঁর কবিতার স্থান করেছিলেন অনেকটা তিক্ততায়। সভ্যতার নিরবধিকালের প্রয়োজনে, আবেদনে আমাদের যত ঋণ ও সহানুভূতি থাক সকল যুগের ভাবুকেরা কাব্যের তরফে যে স্বাধীনতা চান- তা ঐতিহ্যের পরিপন্থী নয়। বরং যুগের অভিনিবেশে দেখি স্পেনের ভূস্বর্গ থেকে নিউইয়র্কে এসে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা নগরীর জটিল জ্যামিতিক প্রকরণ মেনে নিতে পারেননি, “নিউইয়র্কে মৃত্যু” গ্রন্থে নগর বিরূপতার তিক্ত ছায়াপাত লক্ষ্য করি- তেমনি প্রায় সমতুল্য প্রতিক্রিয়া জীবনানন্দের কলকাতায় এসে। এদিকে বুদ্ধদেব বসুর চোখে শহর সুন্দর, স্বপ্নতুল্য, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি দর্শনে তাঁর মনোদৃষ্টি শিক্ষিত নাগরিকের; তাঁর স্বপ্ন-ছায়াপাতে ‘কলকাতা ঝরে একফোঁটা মধু/অসীমের শতদলে।’ মূলত জীবনানন্দের ‘মহাপৃথিবী’র প্রতিনিধিত্বে ও তারই অনুসরণে বুদ্ধদেবের শ্রমে ও সৌজন্যে কলকাতা হয়ে উঠলো বাংলা কবিতার রাজধানী।

স্বাতন্ত্র্যহেতু জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- এই দুই সমসময়নিবাসী, নিরাত্মীয় হলেও উপলব্ধিঘনিষ্ঠ কবি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ধ্বনিত। কাব্যরচনা প্রেরণার মুখাপেক্ষী হলেও সে-প্রেরণা জন্মায় প্রত্যয়ে

যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্ষিপ্রতার প্রভাব ও প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনের উৎকর্ষ নিশ্চিতরূপে অনিবার্য। যুক্তির সমর্থন থাকলেও আপত্তির আশংকা সুধীন্দ্রনাথের মন স্বস্তি পায়নি- ‘যানবাহনের ক্ষিপ্রতায় আর যন্ত্রপাতির আশীর্বাদে পৃথিবীর প্রাথমিক বৈচিত্র্য ক্রমেই মিলিয়ে আসছে বটে, কিন্তু মানুষের শরীরে যত দিন আত্মীয়-বন্ধুর স্বাক্ষর থাকবে, তার ব্যবসা যত দিন সামবায়িক সংকল্পের মুখ চাইবে, তত দিন সে যে কী উপায়ে গোষ্ঠীর গণ্ডি খণ্ডাবে, তা অন্তত আমার কাছে দুর্বোধ্য।’ [প্রগতি ও পরিবর্তন/অংশবিশেষ, সু. দ.]

নগর সভ্যতার আবরণের অন্তরালে মানবিক পৃথিবী কতখানি দুর্দশাগ্রস্ত, তার আকাশজুড়ে সংবর্তের ঘোর ঘটা প্রেমেন্দ্র মিত্র-র মনেও অতিজীবিতের আর্তনাদ, নাগরিক আলোকের অভ্যন্তরে অন্ধকার, অনিশ্চয়, হতাশা আর অভীপ্সার দ্বন্দ্ব-

“আমার সঙ্গে চলো মহানগরে, যে মহানগর ছড়িয়ে আছে আকাশের তলায় পৃথিবীর ক্ষতের মতন, আবার যে মহানগর উঠেছে মিনারে আর চূড়ায় আর অভ্রভেদী প্রাসাদ-শিখরে তারাদের দিকে, প্রার্থনার মত মানবাত্মার।

আমার সঙ্গে এসো মহানগরের পথে, যে পথ জটিল, দুর্বল মানুষের জীবনধারার মতো, যে পথ অন্ধকার মানুষের মনের অরণ্যের মতো, আর যে পথ প্রশস্ত, আলোকোজ্জ্বল, মানুষের বুদ্ধি, মানুষের অদম্য উৎসাহের মতো।

এ মহানগরের সঙ্গীত রচনা করা উচিত, ভয়াবহ, বিস্ময়কর সঙ্গীত।

তার পটভূমিতে যন্ত্রের নির্ঘোষ, ঊর্ধ্বেমুখ কলের শঙ্খনাদ, সমস্ত পথের সমস্ত চাকার ঘর্ঘর, শিকলের ঝনৎকার- ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সঙ্ঘর্ষের আর্তনাদ। শব্দের এই পটভূমির ওপর দিয়ে চলেছে বিসর্পিল সুরের পথ; প্রিয়ার মতো যে নদী শুয়ে আছে মহানগরের কোলে তার জলের ঢেউয়ের সুর, আর নগরের ছায়াবীথির ওপর দিয়ে যে হাওয়া বয় তার, নির্জন ঘরে প্রেমিকেরা অর্ধস্ফুট যে কথা বলে তারও। সে সঙ্গীতের মাঝে থাকবে উত্তেজিত জনতার সম্মিলিত পদধ্বনি; শব্দের বন্যার মতো, আর থাকবে ক্লান্ত পথিকের পথের ওপর দিয়ে পা টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজ, মধ্যরাতে যে পথিক চলেছে অনির্দিষ্ট আশ্রয়ের খোঁজে।

কঠিন ধাতু ও ইটের ফ্রেমে লক্ষ জীবনের সূত্র নিয়ে মহানগর বুনছে যে বিশাল সূচীচিত্র। যেখানে খেই যাচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে, উঠছে জড়িয়ে নতুন সুতোর সঙ্গে অকস্মাৎ- সহসা যাচ্ছে ছিঁড়ে- সেই বিশাল দুর্বোধ চিত্রের অনুবাদ থাকবে সে সঙ্গীতে।”

[মহানগর/প্রেমেন্দ্র মিত্র]

প্রায় সমান্তরালে বুদ্ধদেব বসু এক অর্থে নাগরিক কবি। নগরকেন্দ্রের সম্বন্ধসূত্রে বিস্তারিত প্রসারিত হয় তার সাংস্কৃতিক সব ডালপালা। সন্দেহ নেই, সংস্কৃতির শেকড়গুলো গ্রামেই প্রোথিত। এবং তার শাখা-প্রশাখার বিকাশ ও বিস্তার শাহরিক আকাশে। রবীন্দ্রনাথের পরে তিরিশের কবিবৃন্দ বিষয়ের প্রাধান্যে কবিতায় আধুনিক প্রাণবীজের যে নতুন প্রাণপ্রতিষ্ঠা আনলেন, পরবর্তীতে একই ধারায় প্রত্যেক কবিরাই একই বাদ্যযন্ত্রে ভিন্ন সুর শুনিয়েছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব প্রমুখ স্মরণীয়। আমার বিবেচনায় এদের মধ্যে কোনও ঐক্য না থাক, একান্ত দৃষ্টির ইঙ্গিত আছে। মুখ্যত তিরিশের আধুনিক কবিদের ভাষা, রচনারীতি ও দৃকশক্তির স্বাক্ষরে রচিত অক্ষরবৃত্তের অকাট্য নিয়ম মেনেও তাঁরা ব্যতিক্রম-

সুধীন্দ্রনাথ: সে যে অনামিকা

অনিত্যা মৃন্ময়ী অল্পা, তবু তার রূপমরীচিকা

নিশ্চয় অমিত শূন্য মরুভূমির মাঝে

অন্তিম সম্বলসম দিশাহারা নয়নে বিরাজে।

[অনাম কবিতা, তন্বী]

প্রেমেন্দ্র মিত্র: কথা খুঁজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহেনাকো সীমা;

-আনন্দের ঝটিকায় কাঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মতো;

বিরাটের তীরে-তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে-

নমো নমো নমো।

[নমো নমো, প্রথমা]

বিষ্ণু দে: অগুণ্ঠিত নারী-

শরতের সূর্য সে যে- সে তো নয় কোজাগরী শশী,

কুণ্ঠাহীন দৃষ্টি তার আমাকে সে দিলে দৃষ্টি ভ’রে,

আমি তাই একা তটে বসি,

আর ভাবি রৌদ্রময়

ভাষা তার কিবা বলে- ডায়ানা? উর্বশী?

[সাগরউত্থিতা, উর্বশী ও আর্টেমিস]

জীবনানন্দ: রৌদ্র ঝিলমিল

ঊষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল,

অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারেবারে

নিঃসহায় নগরীর কারাগার প্রাচীরের পারে!

[নীলিমা, ঝরা পালক]

বুদ্ধদেব: যেথা যত বিপুল বেদনা,

যেথা যত আনন্দের মহান মহিমা-

আমার হৃদয়ে তার নব-নব হয়েছে প্রকাশ।

বকুল বীথির ছায়ে গোধূলির অস্পষ্ট মায়ায়

অমাবস্যা-পূর্ণিমার পরিণয়ে আমি পুরোহিত।

শাপভ্রষ্ট দেবশিশু আমি!

[শাপভ্রষ্ট, বন্দীর বন্দনা]

এরা প্রত্যেকেই রবীন্দ্রস্মরণিতে দাঁড়িয়ে মনোযোগ রেখেছেন সামনের দিকে, সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্র্রোতধারা সে পথ ধরেই বয়ে এসেছে। সমস্ত চেষ্টা নিয়োজিত হয়েছিল নতুন হবার জন্য; এবং আজও নতুনত্বের প্রতি দুর্মর মোহ অব্যাহত। তাই সাহিত্য ও চলিষ্ণুতা সমার্থক। কালের চলিষ্ণু-গতিকে অস্বীকার করে কবি মর্যাদায় স্থবির হয়ে থাকা পোষ্যপুত্রের মতো নিন্দনীয়। সঞ্চিত আবেগে খামকা খেয়াল ধরা পড়ে। রবীন্দ্র-যুগের উত্তরপর্বের কবিদের মধ্যে আধুনিক ও ব্যতিক্রম হবার যে শ্রম ও স্বপ্ন, তা সুস্পষ্ট, অত্যন্ত সরব, অত্যন্ত সচেতন স্বাক্ষর জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- যা অপ্রতিরোধ্য ও অপরিবর্তনীয় তার বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া শক্তির অপচয়- এমন বিধিলিপির প্রতি সমর্পিত না হয়ে বরং দু’জনেই আপ্রাণ চেষ্টায় রক্তাক্ত। জীবনানন্দ দাশ অনায়াসেই স্বয়ংসিদ্ধ, রবীন্দ্রস্পর্শমুক্ত। এবং তর্কাতীতভাবেই সহজ স্বাধীনতায় তিনি একেবারেই নতুন চিত্তবৃত্তির সাক্ষ্য হয়ে উঠলেন। জীবনানন্দের প্রশংসায় এবং সহজে বুঝেছিলেন এই কবি প্রশংসনীয় নন শুধু, কাব্যাদর্শে একান্তভাবে অননুকরণীয়, একটা অভাবনীয় অভিনবত্বেই ফুটে বেরুচ্ছে।

আজও জীবনানন্দ দাশের জয় জয়কার বাংলাদেশে, তাঁর অন্তর্দর্শনের অনুভূতিজাত বাঙালি মানস ছাড়িয়ে নিঃসন্দেহে বিশ্বসাহিত্যেরও অংশভাগ। এর পেছনে পাঠক সমাজে তাঁকে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন বুদ্ধদেব বসু। তার আগে জীবনানন্দ প্রায় অনাবিষ্কৃত ছিলেন। বুদ্ধদেবের অভিনিবেশ, প্রেরণা ও পরিশ্রমে বোদলেয়ারের পরে জীবনানন্দের ক্রমবিকাশ ও বিস্মরণ বাঙালি পাঠক সমাজে অচিন্ত্যনীয়। বুদ্ধদেব বসু অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন, কারণ তাঁর মতো প্রেমীর উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এমনকি কাব্যপাঠে আমাদের ভোঁতা বুদ্ধিতে শান লাগিয়েছেন তিনিই এবং কাব্যপাঠে আমাদের ইন্দ্রিয়াতীত সত্তা যে আনন্দ পায়, আমাদের বোধকে সংবেদনীয় সার্থকতা সম্বন্ধে ঔৎসুক্য করে তোলে তা বুদ্ধদেবের অনুবাদ-সমালোচনার অনুগ্রহে তিনি দৃষ্টি-শ্রুতির অনিবার্য প্রিয়পাত্র। গত শতাব্দির অন্যতম প্রধান দুই কবি জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা অত্যুত্তম, বিশেষত অনুবাদ কাজে ও প্রবন্ধ রচনায় দু’জন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। জীবনানন্দ তাঁর কবিস্বভাবের ভাবচ্ছবির নিঃশব্দ নির্জনতার সামঞ্জস্যে অনুবাদে অন্যদের করে তোলেন নিজের মতো, বুদ্ধদেব করে তোলেন অন্যদের মতো। এই দুই অনুবাদক-কবির ভাষা-চারিত্রের ছাপ স্বতন্ত্রতা সম্বন্ধে কথা কওয়ার অবসর নাই। বর্ষগণনাতে উপস্থিত কালের নতুন প্রভাব ও সৃষ্টির পরাক্রান্তে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব সাহিত্যিক গৃহস্থালির মায়াজালে সময়কে বাঁধতে পেরেছিলেন বলেই পৃথকান্তরে দু’জনেই ততদিনে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। সময়ের সম্বন্ধ স্থাপনে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই সৎসাহিত্যের মহত্তম ফসল ফলিয়েছেন। সাহিত্যে যেহেতু নিন্দারোপের লোকের অভাব হয় না, এক শ্রেণির লোকেরা বরাবরই নিন্দুক এবং এরা বড়জোর সাহিত্যের অলস ও মুমূর্ষু পাঠক, সৎ-সমালোচক নয়। কুরুক্ষেত্রের আসনেই এদের আরামবোধ, অথবা নির্বোধের কৃপাকটাক্ষেই এদের বিচরণ। সব ছাপিয়ে কবিত্বের পদমর্যাদায় এই দুই কবির প্রতি আমাদের বিনয়, ঋণ, সহানুভূতি ও পুনরুত্থান অনিবার্য লাগে। সহজাত প্রতিভার প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে, চৈতন্যের ব্যাপ্তিতে শিক্ষিত বাঙালির বদ্ধমূল পরিচয়ের আয়ত্তে আমরা তাঁদের পাই। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে সাহিত্যশিল্পে মন্ময়তা ও তন্ময়তার এমন যুগল আবির্ভাব খুব সুলভ নয়।

কঠিন ধাতু ও ইটের ফ্রেমে লক্ষ জীবনের সূত্র নিয়ে মহানগর বুনছে যে বিশাল সূচীচিত্র। যেখানে খেই যাচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে, উঠছে জড়িয়ে নতুন সুতোর সঙ্গে অকস্মাৎ- সহসা যাচ্ছে ছিঁড়ে- সেই বিশাল দুর্বোধ চিত্রের অনুবাদ থাকবে সে সঙ্গীতে।”

[মহানগর/প্রেমেন্দ্র মিত্র]

প্রায় সমান্তরালে বুদ্ধদেব বসু এক অর্থে নাগরিক কবি। নগরকেন্দ্রের সম্বন্ধসূত্রে বিস্তারিত প্রসারিত হয় তার সাংস্কৃতিক সব ডালপালা। সন্দেহ নেই, সংস্কৃতির শেকড়গুলো গ্রামেই প্রোথিত। এবং তার শাখা-প্রশাখার বিকাশ ও বিস্তার শাহরিক আকাশে। রবীন্দ্রনাথের পরে তিরিশের কবিবৃন্দ বিষয়ের প্রাধান্যে কবিতায় আধুনিক প্রাণবীজের যে নতুন প্রাণপ্রতিষ্ঠা আনলেন, পরবর্তীতে একই ধারায় প্রত্যেক কবিরাই একই বাদ্যযন্ত্রে ভিন্ন সুর শুনিয়েছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব প্রমুখ স্মরণীয়। আমার বিবেচনায় এদের মধ্যে কোনও ঐক্য না থাক, একান্ত দৃষ্টির ইঙ্গিত আছে। মুখ্যত তিরিশের আধুনিক কবিদের ভাষা, রচনারীতি ও দৃকশক্তির স্বাক্ষরে রচিত অক্ষরবৃত্তের অকাট্য নিয়ম মেনেও তাঁরা ব্যতিক্রম-

সুধীন্দ্রনাথ: সে যে অনামিকা

অনিত্যা মৃন্ময়ী অল্পা, তবু তার রূপমরীচিকা

নিশ্চয় অমিত শূন্য মরুভূমির মাঝে

অন্তিম সম্বলসম দিশাহারা নয়নে বিরাজে।

[অনাম কবিতা, তন্বী]

প্রেমেন্দ্র মিত্র: কথা খুঁজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহেনাকো সীমা;

-আনন্দের ঝটিকায় কাঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মতো;

বিরাটের তীরে-তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে-

নমো নমো নমো।

[নমো নমো, প্রথমা]

বিষ্ণু দে: অগুণ্ঠিত নারী-

শরতের সূর্য সে যে- সে তো নয় কোজাগরী শশী,

কুণ্ঠাহীন দৃষ্টি তার আমাকে সে দিলে দৃষ্টি ভ’রে,

আমি তাই একা তটে বসি,

আর ভাবি রৌদ্রময়

ভাষা তার কিবা বলে- ডায়ানা? উর্বশী?

[সাগরউত্থিতা, উর্বশী ও আর্টেমিস]

জীবনানন্দ: রৌদ্র ঝিলমিল

ঊষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল,

অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারেবারে

নিঃসহায় নগরীর কারাগার প্রাচীরের পারে!

[নীলিমা, ঝরা পালক]

বুদ্ধদেব: যেথা যত বিপুল বেদনা,

যেথা যত আনন্দের মহান মহিমা-

আমার হৃদয়ে তার নব-নব হয়েছে প্রকাশ।

বকুল বীথির ছায়ে গোধূলির অস্পষ্ট মায়ায়

অমাবস্যা-পূর্ণিমার পরিণয়ে আমি পুরোহিত।

শাপভ্রষ্ট দেবশিশু আমি!

[শাপভ্রষ্ট, বন্দীর বন্দনা]

এরা প্রত্যেকেই রবীন্দ্রস্মরণিতে দাঁড়িয়ে মনোযোগ রেখেছেন সামনের দিকে, সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্র্রোতধারা সে পথ ধরেই বয়ে এসেছে। সমস্ত চেষ্টা নিয়োজিত হয়েছিল নতুন হবার জন্য; এবং আজও নতুনত্বের প্রতি দুর্মর মোহ অব্যাহত। তাই সাহিত্য ও চলিষ্ণুতা সমার্থক। কালের চলিষ্ণু-গতিকে অস্বীকার করে কবি মর্যাদায় স্থবির হয়ে থাকা পোষ্যপুত্রের মতো নিন্দনীয়। সঞ্চিত আবেগে খামকা খেয়াল ধরা পড়ে। রবীন্দ্র-যুগের উত্তরপর্বের কবিদের মধ্যে আধুনিক ও ব্যতিক্রম হবার যে শ্রম ও স্বপ্ন, তা সুস্পষ্ট, অত্যন্ত সরব, অত্যন্ত সচেতন স্বাক্ষর জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- যা অপ্রতিরোধ্য ও অপরিবর্তনীয় তার বিরুদ্ধে লড়তে যাওয়া শক্তির অপচয়- এমন বিধিলিপির প্রতি সমর্পিত না হয়ে বরং দু’জনেই আপ্রাণ চেষ্টায় রক্তাক্ত। জীবনানন্দ দাশ অনায়াসেই স্বয়ংসিদ্ধ, রবীন্দ্রস্পর্শমুক্ত। এবং তর্কাতীতভাবেই সহজ স্বাধীনতায় তিনি একেবারেই নতুন চিত্তবৃত্তির সাক্ষ্য হয়ে উঠলেন। জীবনানন্দের প্রশংসায় এবং সহজে বুঝেছিলেন এই কবি প্রশংসনীয় নন শুধু, কাব্যাদর্শে একান্তভাবে অননুকরণীয়, একটা অভাবনীয় অভিনবত্বেই ফুটে বেরুচ্ছে।

আজও জীবনানন্দ দাশের জয় জয়কার বাংলাদেশে, তাঁর অন্তর্দর্শনের অনুভূতিজাত বাঙালি মানস ছাড়িয়ে নিঃসন্দেহে বিশ্বসাহিত্যেরও অংশভাগ। এর পেছনে পাঠক সমাজে তাঁকে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন বুদ্ধদেব বসু। তার আগে জীবনানন্দ প্রায় অনাবিষ্কৃত ছিলেন। বুদ্ধদেবের অভিনিবেশ, প্রেরণা ও পরিশ্রমে বোদলেয়ারের পরে জীবনানন্দের ক্রমবিকাশ ও বিস্মরণ বাঙালি পাঠক সমাজে অচিন্ত্যনীয়। বুদ্ধদেব বসু অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন, কারণ তাঁর মতো প্রেমীর উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এমনকি কাব্যপাঠে আমাদের ভোঁতা বুদ্ধিতে শান লাগিয়েছেন তিনিই এবং কাব্যপাঠে আমাদের ইন্দ্রিয়াতীত সত্তা যে আনন্দ পায়, আমাদের বোধকে সংবেদনীয় সার্থকতা সম্বন্ধে ঔৎসুক্য করে তোলে তা বুদ্ধদেবের অনুবাদ-সমালোচনার অনুগ্রহে তিনি দৃষ্টি-শ্রুতির অনিবার্য প্রিয়পাত্র। গত শতাব্দির অন্যতম প্রধান দুই কবি জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা অত্যুত্তম, বিশেষত অনুবাদ কাজে ও প্রবন্ধ রচনায় দু’জন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। জীবনানন্দ তাঁর কবিস্বভাবের ভাবচ্ছবির নিঃশব্দ নির্জনতার সামঞ্জস্যে অনুবাদে অন্যদের করে তোলেন নিজের মতো, বুদ্ধদেব করে তোলেন অন্যদের মতো। এই দুই অনুবাদক-কবির ভাষা-চারিত্রের ছাপ স্বতন্ত্রতা সম্বন্ধে কথা কওয়ার অবসর নাই। বর্ষগণনাতে উপস্থিত কালের নতুন প্রভাব ও সৃষ্টির পরাক্রান্তে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব সাহিত্যিক গৃহস্থালির মায়াজালে সময়কে বাঁধতে পেরেছিলেন বলেই পৃথকান্তরে দু’জনেই ততদিনে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। সময়ের সম্বন্ধ স্থাপনে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই সৎসাহিত্যের মহত্তম ফসল ফলিয়েছেন। সাহিত্যে যেহেতু নিন্দারোপের লোকের অভাব হয় না, এক শ্রেণির লোকেরা বরাবরই নিন্দুক এবং এরা বড়জোর সাহিত্যের অলস ও মুমূর্ষু পাঠক, সৎ-সমালোচক নয়। কুরুক্ষেত্রের আসনেই এদের আরামবোধ, অথবা নির্বোধের কৃপাকটাক্ষেই এদের বিচরণ। সব ছাপিয়ে কবিত্বের পদমর্যাদায় এই দুই কবির প্রতি আমাদের বিনয়, ঋণ, সহানুভূতি ও পুনরুত্থান অনিবার্য লাগে। সহজাত প্রতিভার প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে, চৈতন্যের ব্যাপ্তিতে শিক্ষিত বাঙালির বদ্ধমূল পরিচয়ের আয়ত্তে আমরা তাঁদের পাই। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে সাহিত্যশিল্পে মন্ময়তা ও তন্ময়তার এমন যুগল আবির্ভাব খুব সুলভ নয়।

জীবনানন্দ-প্রতিভা রুচিপ্রধান, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও ঐতিহ্যপ্রবণ। নিসর্গনিষ্ঠার চেতনা এতটাই নির্মল যে তাঁর রচনা যেমন রহস্যকেন্দ্রিক, তেমনি রসাত্মক ও আনন্দঘন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে আমার আস্থা-অনাস্থা ব্যক্তিগত হলেও, কবিস্বাতন্ত্র্যের স্বাবলম্বনেই আমার আস্থা অত্যধিক, এবং রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রতিষ্ঠাভূমির উপর দাঁড়ালে আমাদের অনেকেরই যেখানে পা পিছলায়, তার মানে অনেক পূর্বসূরির প্রভাব আমাদের উপর কম-বেশি পড়েই পড়ে, তখন অনুকরণের প্রভাব ও প্রাদুর্ভাব দুই স্বাভাবিক, কেননা শিল্প জিনিসটা চিরকাল গতানুগতিক প্রয়োজনের পরিপন্থী আমার তা মনে হয় না। নানা বিদ্যায় ও জ্ঞানার্জনে আমরা যতই আধুনিকের প্রাগ্রসরতা দাবি করি না কেন, আসলে আমাদের মন প্রাচীনপন্থী। অর্থাৎ আধুনিককালের ভাবুকেরা ষখন পাশ্চাত্য আবহাওয়াতেই মানুষ এবং স্বচ্ছন্দ, তখন পূর্বসূরিদের অসামান্যতারও তারা ভক্ত, তা না হলে গুরুভক্তি টিকতো না। পাশ্চাত্য রোমান্টিক কবিদের বংশভুক্ত হয়েও রবীন্দ্রনাথ নিজের বৈশিষ্ট্য একটুও খোয়াননি, অনুরূপ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ছেড়ে কবিস্বাতন্ত্র্যের অধিকার জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেবরও প্রাপ্য।

জীবনানন্দের কবিমন বিষণ্ন পর্যবেক্ষণে প্রকৃতি-প্রবৃত্তিতাড়িত। তাঁর নির্জনতম সত্তা নগর ও আধুনিক সভ্যতার চাকায় বিষময়, অমানবিক ঠেকে। প্রযুক্তিসভ্যতার অসাধারণ উন্নতিসাধন স্বীকার করেও শুধু বেঁচে থাকায় তৃপ্ত হলে চলবে না, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে- তাকে বনজ বৃক্ষের মতো বাড়তে এবং ডালপালা বিস্তার করতে দিতে হবে; বাধা আসবে, কিন্তু ব্যক্তিমানুষের অপমৃত্যু ঘটাতে পারবে না, বরং ব্যক্তি বিকাশে সহায়তা করবে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায়, সভ্যতার যান্ত্রিক চাকায় পিষ্ট চিৎকারময় কোলাহল কবির ভাবনায় ব্যঘাত ঘটায়। জীবনের চলমান স্তরে কী জীবনে, কী সাহিত্যে অত্যধিক কালনিষ্ঠা স্থান-কালের দাসত্ব বলে তিনি মনে করেন, এবং কবিতাকে চিরন্তনের কোঠায় ওঠাতে প্রেম ও প্রকৃতি তাঁর কাছে মন্ময় ও অনন্ত ঠেকে।

এ-যুগে কোথাও কোনো আলো- কোনো কান্তিময় আলো

চোখের সুমুখে নেই যাত্রিকের; নেই তো নিঃসৃত অন্ধকার

রাত্রির মায়ের মতো : মানুষের বিহ্বল দেহের

সব দোষ প্রক্ষালিত ক’রে দেয়- মানুষের বিহ্বল আত্মাকে

লোকসমাগমহীন একান্তের অন্ধকারে অন্তঃশীল ক’রে

তাকে আর শুধায় না- অতীতের শুধানো প্রশ্নের

উত্তর চায় না আর- শুধু শব্দহীন মৃত্যুহীন

অন্ধকারে ঘিরে রাখে, সব অপরাধ ক্লান্তি ভয় ভুল পাপ

বীতকাম হয় যাতে- এ জীবন ধীরে ধীরে বীতশোক হয়,

স্নিগ্ধতা হৃদয়ে জাগে; যেন দিকচিহ্নময় সমুদ্রের পারে

কয়েকটি দেবদারু গাছের ভিতরে অবলীন

বাতাসের প্রিয়কণ্ঠ কাছে আসে- মানুষের রক্তাক্ত

সে-হাওয়া অনবচ্ছিন্ন সুগমের- মানুষের জীবন নির্মল।

আজ এই পৃথিবীতে এমন মহানুভব ব্যাপ্ত অন্ধকার

নেই আর? সুবাতাস গভীরতা পবিত্রতা নেই?

তবুও মানুষ অন্ধ দুর্দশার থেকে স্নিগ্ধ আঁধারের দিকে

অন্ধকার হ’তে তার নবীন নগরী গ্রাম উৎসবের পানে

যে অনবনমনে চলেছে আজো- তার হৃদয়ের

ভুলের পাপের উৎস অতিক্রম ক’রে চেতনার

বলয়ের নিজ গুণ র’য়ে গেছে ব’লে মনে হয়।

এসো জ্ঞান, দীনতা, নির্মেঘ দৃষ্টি, শান্তি, আলো, প্রেম।*

[কবিতা: ১৯৪৬-৪৭/অংশত]

অপরদিকে কবিস্বাতন্ত্র্যের একটা সুনির্দিষ্ট ধারা স্পট সত্ত্বেও জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব চেতনার উৎকর্ষের সরণী বেয়ে উভয়ে চিরন্তনার অনন্ত অমৃতের পূর্ণতার স্বরূপ-সন্ধানে নামেন।

বিধাতা, জানো না তুমি কী অপার পিপাসা আমার

অমৃতের তরে।...

না-হয় রেখেছো বেঁধে, তবু জেনো শৃঙ্খলিত ক্ষুদ্র হস্ত মোর

উধাও আগ্রহ-ভরে ঊর্ধ্বনভে উঠিবারে চায়

অসীমার নীলিমারে জড়াইতে ব্যগ্র আলিঙ্গনে।

[বন্দীর বন্দনা/অংশত]

জীবনানন্দ দাশের কবি পরিচয় কী? তাঁর মতো অতি বড় খেয়ালীর-ভাবের ছায়াময় রাজ্যে বহুল-আলোচিত, আলোড়িত-আন্দোলিত, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান কোথায়? কোন মহিমায় তিনি আজও সময় বা কালের গ্রন্থি ছিঁড়ে স্বাবলম্বীরূপে বর্তমান? তাঁর সম্বন্ধে এইটুকুই আমার কওয়া যে, জীবনানন্দের দার্শনিক মনোভাব আর তাঁর কবিতার তত্ত্ব বিচার এক জিনিস। যদিও দর্শন-শব্দকে বিস্তারিত অর্থে ধরলে, শুধু কবিতা নয়, মানুষের সকল প্রক্রিয়াতেই তার প্রসার দেখা যাবে। দর্শন বলতে মানবচৈতন্যের সেই দিব্যদৃষ্টিকে বুঝি না, যার দ্যোতনায় বস্তুবিশ্বের সম্বন্ধে আমাদের বুদ্ধিগত মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তিকে একটা ন্যায়সঙ্গতিতে মুক্তি দেয়। এই অর্থে দর্শন আর যুক্তি পরস্পর সম্পর্কগাঁথা, এবং আমিও সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে একমত যে, ‘দর্শনের সঙ্গে কাব্যের সম্পর্ক শিথিল’। দর্শনের প্রাণ দ্রষ্টার মানসে এবং কাব্যের প্রাণশক্তি অভিজ্ঞতা-উৎপাদনে; এই দু’য়ের ধর্ম অনন্যবিরোধী। অর্থাৎ দর্শনের বয়ানে অভিজ্ঞতার স্বরূপ সন্ধান যুক্তির সংস্পর্শ মানলেও কবির কাব্যের বয়নে অভিজ্ঞতার স্বরূপে বিশ্বের অখ-তাই তার বিশেষ গুণ। সে-গুণের সংবেদনার স্রোতে বিস্ময়বোধই একমাত্র মনোভাব, এবং বিশ্বসাহিত্যও প্রকরণবিশেষে তার অন্যতম অবদান। জীবনানন্দের কবি পরিচয়ে তাঁর কাব্যগুণ ভাষাগত নৈপুণ্যে সৌন্দর্যতৃষ্ণা, অতৃপ্ত বাসনা, আকণ্ঠ প্রেমতৃষ্ণা, প্রকৃতি-সংস্কৃতির উত্থানে তিনি ক্লান্তিহীন, আত্মস্থ বিশ্বমানব। তাঁর কাব্য-ভুবনের পরিবেশের মধ্যে সত্য ও শ্রেয়োবোধের শিকড় নিজ গুণে প্রোথিত এবং মর্যাদাবান। জীবনানন্দের কবিতার ভাষার বড় গুণ হচ্ছে স্বচ্ছতা ও প্রাঞ্জলতা। প্রচলিত ভাষার তুচ্ছতা তাঁকে স্পর্শ করে না; অথচ স্বচ্ছতম ভাষা জীবনানন্দনীয় কবিভাষা প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহৃত শব্দ-সম্ভার নিয়েই গড়ে উঠেছে, এ-ভাষা নিতান্ত সাধারণীকৃত বলে হেয় নয়, বরং রূপকার্থ-ব্যঞ্জক শব্দ, সম্প্রসারিত শব্দসম্ভার স্বাভাবিক কাঠামোর বাইরে কাব্যের অভিভাব পাঠকের অন্তরাত্মায় পৌঁছে এমন এক অর্থবোধের চিত্রকল্পাদির প্রাণস্পন্দে আমাদের নিয়ে যায়- যেখানে কাব্যলোকের কোনো অঙ্গীকার নেই, অথচ অমৃতলোকের সন্ধান আছে। উল্লেখ করতে পারি ‘বৈতরণী’ কবিতার প্রথম স্তবক:

কী যেন কখন আমি কবর থেকে উঠে আসিলাম

আমারে দিয়েছে ছুটি বৈতরণী নদী

শকুনের মতো কালো ডানা মেলে পৃথিবীর দিকে উড়িলাম

সাত-দিন সাত-রাত উড়ে গেলে সেই আলো পাওয়া যায় যদি

পৃথিবীর আলো প্রেম?

আমারে দিয়েছে ছুটি বৈতরণী নদী।

জীবনানন্দের শব্দসম্ভার নিরঙ্কুশ, যা ভাষাকে ছাড়িয়ে প্রহেলিকা সৃষ্টি করে না, পর্যবসিত করে না কৃত্রিম বাগাড়ম্বরে। আবার মরীচিকার মায়াজালেও জড়িত করে না। ভাষা তখনই প্রহেলিকায় পরিণত হয় যখন ব্যবহৃত শব্দসম্ভার রূপকধর্মী, অন্ধের চোখ না ফুটিয়ে লাঠির ওপর ভর করে; আর কৃত্রিম বাগাড়ম্বরে পর্যবসিত হয় যখন স্ব-ভাষায় রচিত হলেও অনেক শব্দই বাইরে থেকে আমদানি করে, নয়তো ধার করে নতুন সামগ্রী-স্বরূপ চমক সৃষ্টির প্রয়াস দেখি কি কবিতায়, কি গদ্য রচনায়- আমার কাছে এইসব আধুনিকদের কৌতুককর এবং বিদ্রুপযোগ্য লাগে। অপ্রচলিত শব্দ, রূপক, আলংকারিক শব্দ এবং অন্যান্য প্রজাতির শব্দ, শব্দ- সেসব ভাষাকে হীনতা ও তুচ্ছতার উর্ধ্বে তুলে ধরে প্রতিদিনের শব্দসম্ভার ভাষাকে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা- অর্থাৎ কাব্যের সাহিত্যের ভাষার স্বচ্ছতার বিধান মানে। ভাষাকে আভিজাত্য-দানের সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় শব্দের সপ্রতিভ রূপ, সংক্ষেপিত এবং পরিবর্তিত রূপের ব্যবহার- যা প্রচলিত বাকভঙ্গি থেকে কিছুটা দূরে অপরিচয়ের ব্যবধান সৃষ্টি করে ভাষাকে প্রাত্যহিকতার তুচ্ছতার উর্ধ্বে তুলে ধরবে, আর সাধারণ বাগভঙ্গির বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হলে ভাষার স্পষ্টতা গুণ বাড়ে। আজকাল কাব্যের আধুনিক কা-ে অনভ্যস্ত, অপ্রাঞ্জল পরিভাষা, অনর্থ অর্থবোধের বিঘ্নতা- সর্বোপরি এসব দুর্বোধ্যতা একটি মারাত্মক রোগ এবং আমি এদের সাহিত্যের অমার্জনীয় আবর্জনা বলি। কবি হবার দিবাস্বপ্ন যারা দেখেন, খামকা খেয়ালের বশবর্তী হয়েই তারা লেখেন। অনশনে গেলেও তাদের দিবাস্বপ্ন ভাঙে না। নিঃসংশয় বস্তুবিশ্বের সংঘাত পেরিয়ে সত্যের সাক্ষাতে না পৌঁছলে আর যাইহোক কাব্য রচনা সম্ভব নয়, বড়জোর, ঐকান্তিক উপলব্ধির ধ্বংসাবশেষ তাদের আশ্রয়স্থল এবং ভুয়োদর্শীর স্বপ্নাবিষ্টই শেষ সম্বল। আমার এই মত যথার্থ কবিদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন মন্তব্য বা আচরণ মনে করলে তা-হবে মারাত্মক ভুল, বরং এ-ই মর্মে আমার কাছে কবিরা সর্ববিধ উপলব্ধির রহস্যময় প্রতীক।

জীবনানন্দের আকস্মিক দুর্ঘটনার দেহাবসানে মনুষ্যজীবনের ভঙ্গুর প্রাণসামগ্রীর আবরণ ঘুচে, ফুটে বেরুলো কবিতায় সৃজন প্রতিভার এমনই এক বিশিষ্ট ও মহৎ গুণ- যা আধুনিক কাব্যের প্রতিনিধিত্বে তাঁর পদমর্যাদায় ঘুণ তো ধরেইনি, বরং তা উত্তরোত্তর আধুনিক কবিতায় যথাসর্বস্বরূপে তাঁকে আমি সবিস্ময়ে ঈর্ষান্বিত চোখেই দেখি। তাছাড়া ভবিষ্যৎ প্রকৃতি-নিসর্গবিলাসীরা তাঁর কবিতার স্বভাবোক্তিতে শুনবেন বাংলা ও বাঙালির মর্মবাণী। জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু বাংলা ভাষার এই দুই কবির ভাষা ও ধ্বনিবৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিলে আমাদের কান ও ইন্দ্রিয়বিশেষ হয়ে ওঠে সজাগ। তাঁদের ভাষা যেমন ঝর্নার মতো ক্ষিপ্র পায়ে ছোটে- সেই সঙ্গে আমরা নূপুরের ধ্বনিও শুনতে পাই, যার প্রবর্তনায় আছে ‘Architecnic Quality’– অর্থাৎ ভাষার ইমারতে স্থপতির পটুত্ব। স্বপ্নাবিষ্টতা নয়, নিঃসংশয় সত্যের সাক্ষাতে আমাদের মানতে হয় জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু- দুই-ই সাহিত্যজগতে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

back to top