alt

সাময়িকী

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

জাকির তালুকদার

: রোববার, ১৪ নভেম্বর ২০২১

আনোয়ারা সৈয়দ হক

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং সৈয়দ শাসুল হক দম্পতির বাসস্থান ছিল ঢাকার ২১ নম্বর, গ্রীন রোড। পাকিস্তান এয়ারফোর্সের ভাড়া করা ফ্ল্যাট। আনোয়ারা সৈয়দ হক তখন ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর মেডিক্যাল কোরের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ডা. আনোয়ারা বেগম। সৈয়দ শামসুল হক তখনো, জীবনের বাকি দিনগুলোর মতোই, সার্বক্ষণিক লেখকই। বিয়ের পরে তাদের এক মেয়ে এবং এক ছেলের জন্ম হয়েছে। ভালো বেতন পেতেন ডাক্তার আনোয়ারা। যেমনটি সবদেশে সবসময় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সেনাবাহিনী পেয়ে থাকে। সংসারে চমৎকার স্বচ্ছলতা ছিল। ছিল সেইসময় ঢাকায় কেবলমাত্র অভিজাত পরিবারেই দেখতে পাওয়া যায় এমন সব উপকরণ। ছিল ফ্রিজ, সাদাকালো টেলিভিশন, মিউজিক সেন্টার, আধুনিক বেতারযন্ত্র। ঘরজুড়ে ছিল বই, পত্রিকা, গানের রেকর্ড। অঢেল খাদ্যের সরবরাহ। নিজের গাড়ি তখনোই নিজে ড্রাইভ করতেন ফ্লাইট লেফটেনান্ট ডা. আনোয়ারা। সত্যিকারের সুখের সময়। কিন্তু ২৫ মার্চের পরে কোটি কোটি বাঙালির মতো তাদের অবস্থাও আর আগের মতো রইল না।

ক্র্যাকডাউনের পরে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য হাজার হাজার তরুণ-তরুণী দেশত্যাগ করেছিলেন। বাঙালি পুলিশ, ইপিআরদের মতো সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্য বাংলাদেশ থেকে কিংবা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ডা. আনোয়ারা বেগম পালাতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। নিজের ডিউটি করেছেন নয়টি মাস। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। উল্লেখ্য, তিনি প্রধানত দেখতেন নারী, গর্ভবতী এবং শিশু রোগীদের। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ডা. আনোয়ারা বেগম স্বাধীনভাবেই বসবাস করেছেন ঢাকায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমস্ত বাঙালির মতোই তিনিও অবরুদ্ধই ছিলেন সেই বিভীষিকাময় নয়টি মাস। সেই অবরুদ্ধ জীবনের কিছু গদ্যচিত্র নিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘অবরুদ্ধ’।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে ‘অবরুদ্ধ’ গ্রন্থে। কোনোটি তীব্র বেদনার কোনোটি আনন্দের। কোনোটি বীরত্বের কোনোটি লাঞ্ছনার। কোনো ঘটনাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এই বইতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এক সাহিত্যিক-দম্পতির সত্যভাষণের নির্ভীকতা

এই বইটি বিশেষভাবে ভিন্ন এই একই বিষয়ে লেখা অন্য অসংখ্য স্মৃতিচারণ থেকে। একাত্তরের নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবনের স্মৃতিকথা যারা লিখেছেন, তারা লেখার কোনো-না-কোনো অংশে মুক্তিযুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের কথা একটু হলেও যোগ করে রেখেছেন। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, এমন কোনো ইঙ্গিত আনোয়ারা সৈয়দ হক তার বইয়ের কোথাও দেবার চেষ্টা করেননি। এমনকী একথাও বেশ কয়েকবারই স্বীকার করেছেন যে দেশের অবস্থা নিয়ে গভীর বেদনাবোধ থাকলেও তা প্রকাশ করার সুযোগ তিনি পাননি। তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে স্বামী-সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে, বাড়িভর্তি আশ্রিতদের রক্ষা করা এবং তাদের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করা নিয়ে, এবং একই সাথে একজন যুবতী ডাক্তার হিসাবে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করা নিয়ে। বইটি একারণেই আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।

একাত্তরের আগে তো আছে ঊনসত্তর। তখন তার ভূমিকা কী? আনোয়ারা সৈয়দ হক মনের গ্লানি স্বীকার করে নিয়েও প্রকৃতির মতো সত্যভাষণ করে গেছেন- ‘ওই উত্তাল গণজাগরণের দিনগুলোতেই কিনা গায়ে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের উর্দি চাপিয়ে পাক আর্মির চাকরি করে গেছি, খেয়েপরে থাকার তাগিদে তাদের দাসত্ব (একরকমের) করে চলেছি। সেই দিনগুলোতে আমার স্বামী সৈয়দ শামসুল হক লিখে চলেছেন ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’। দিন নেই, রাত নেই, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, পরিবারে সঙ্গে কথাবার্তা নেই, লিখে চলেছেন তিনি। লাইনের পর লাইন। লাইনের পর লাইন। ভোরে ঘুম থেকে জেগে ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে এয়ারফোর্স স্কোয়াড্রনে রওনা হবার আগে দেখি তিনি আমার আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠে সেই বিশাল ডাইনিং টেবিলের কোণে বসে সাজিয়ে তুলছেন পংক্তির পর পংক্তি। আবার দুপুর দুটোর পরে বাড়ি ফিরে দেখি উনি তখনো আপন মনে লিখেই চলেছেন। ঘরদোর সেই ভোরে যেভাবে ফেলে গিয়েছিলাম, সেভাবেই পড়ে আছে।’ [পৃষ্ঠা ৩৭]।

এই রকম অনায়াস স্বীকারোক্তির জন্য মানুষ যদি তাকে ধিক্কার দেয় দিক, আনোয়ারা সৈয়দ হক নিজের সম্পর্কে, কিংবা সব্যসাচী সৈয়দ হক সম্পর্কে মিথ্যা বলতে রাজি নন।

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে গিয়েছিলেন অবশ্য দুজনেই। সে অভিজ্ঞতা অনন্য। লেখকের ভাষায়- ‘রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। বিকেলের দিকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে শুরু করলেন। এখন আমাদের দেশে কত বড় বড় জনসভা হয়, এখন আমাদের দেশের লোকসংখ্যাও দ্বিগুণ। কিন্তু সেদিনের মতো কোনো জমায়েত এখন পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে দেখা যায়নি। তার কারণ সেদিনের সমাবেশ ছিল বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের সমাবেশ আর সেই ভাগ্য নির্ধারণের কর্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু।... পড়ন্ত রোদে বঙ্গবন্ধু সেদিন ভিড় ঠেলে মঞ্চে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। তাঁকে দেখামাত্র জনতা জয়ধ্বনি করে উঠল। আমাদের চোখের সামনে রচিত হয়ে চললো সোনালি এক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু চতুর্দিকে দ্রুত একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জলদ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, ভায়েরা আমার-

বঙ্গবন্ধুর সেই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে যেন রোদ্দুরের ফুলবৃষ্টি শুরু হল। বাতাস প্রবাহিত হতে লাগল জোরে। বাংলার মাটি দুলে উঠল আনন্দে। জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর মুখনিসৃত ভাষণ শুনতে লাগল। কী পরিষ্কার তাঁর কণ্ঠ! কত স্বতঃস্ফূর্ত তাঁর বাক্যের দ্যোতনা। পৃথিবীর ইতিহাসে রাজনৈতিক কাব্য বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণ হচ্ছে তা-ই।’ [ পৃষ্ঠা ১৮]

তারপরে ঘরে ফিরে এসে সৈয়দ হক মন দিয়েছেন লেখায়, আনোয়ারা সৈয়দ হক তার চাকুরি এবং পারিবারিক জীবনে।

২৫ মার্চের পরে আনোয়ারার প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় সৈয়দ শামসুল হকের নিরাপত্তা। বাড়ি থেকে স্বামীকে বেরুতে দিতেন না। আবার তাকে অন্য কোনো বন্ধুর আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকার জন্যেও পাঠিয়েছিলেন। কারণ খবর এসেছে যে জ্যোতির্ময় ঘুহ ঠাকরতা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, এবং আরো অনেককে তাদের বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করেছে পাকবাহিনী। আনোয়ারা সৈয়দ হকের মনে প্রচ- ভীতি, যদি পাকবাহিনী তাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে হত্যা করে যায় সৈয়দ হককে? তখন তার- ‘মনে পড়ল, রিকশায় আমি কখনোই সৈয়দ হককে ডানদিকে বসতে দিইনে, সবসময় জোর করে বাঁ দিকে বসাই- পাছে এ্যাক্সিডেন্ট হলে তাঁর চোট লাগে। এই নিয়ে আগে কত ঝগড়া হয়েছে। গাড়ির ভেতরেও তাঁকে সবসময় বসতে হয় বাঁ দিকে। জানি এগুলোর কোনো অর্থ নেই, তবু আমার কাছে অর্থ আছে। যে-মানুষটির গায়ে আমি শারীরিক আঘাত লাগতে দিতে চাই না, তাঁর গায়ে হাত দেবে পশ্চিমা এক সৈন্য? অসম্ভব।’ [ পৃষ্ঠা ৪৬]।

কিন্তু বন্ধু আশ্রয় দেয়নি সৈয়দ হককে। তাকে ফিরে এসে কয়েক মাস থাকতে হয়েছে ঘরবন্দি অবস্থাতেই।

অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখে সৈয়দ শামসুল হক লন্ডনে পাড়ি জমাতে সক্ষম হন। সেখানে গিয়ে তিনি অনেকরকম কাজের পাশাপাশি বিবিসি-র অনিয়মিত কথক হিসাবে কাজ করেছেন। আর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা এটাই যে, ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর বিবিসিতে প্রথম পাঠ করেন সৈয়দ শামসুল হকই।

স্বামীকে লন্ডন পাঠিয়ে কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত আনোয়ারা সন্তানদের নিয়ে অবরুদ্ধ ঢাকায় রয়ে গেলেন।

‘অবরুদ্ধ’ গ্রন্থে লেখক শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করেছেন তার এসএমও স্কোয়াড্রন লিডার হার্বার্ট শরাফ-এর নাম। এই মানুষটি ধর্মে ছিলেন খ্রিস্টান। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে উচ্চপদে কর্মরত থাকার সুবাদে তিনি আনোয়ারা সৈয়দ হককে অনেক বিপদ থেকে আগলে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষ করে লেখকের ভাই যখন যশোরের নাভারন ব্রিজ বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার অভিযোগ ধৃত হয়েছিলেন, তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে সপল উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। আবার ভাইকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যে পাকিস্তানি সামরিক অফিসার লেখককে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে রাতে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, সেই আমন্ত্রণের ফাঁদ থেকেও লেখককে রক্ষা করেছিলেন এই হার্বার্ট শরাফই। সৈয়দ শামসুল হককে লন্ডন পাঠাতে সেই সময় রিটার্ন টিকেটের জন্য দরকার ছিল ১৬ হাজার টাকা। সেই টাকার একটা বড় অংশ জোগাড় করতে ভূমিকা রেখেছিলেন হার্বার্ট শরাফ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পরে লেখক তার এই সিনিয়র অফিসারকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। স্কোয়াড্রন লিডার তখন যুদ্ধবন্দি। সেদিন লেখকের সাথে তার কথোকথন এই রকম-

‘আমি হার্বার্ট শরাফের দিকে তাকিয়ে বললাম, একটা কথা আমি আপনাকে এখন জানাতে চাই, স্যার।

হার্বার্ট শরাফ একটু হেসে বললেন, আপনি কি কথা বলবেন আমি জানি।

আমি বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, আপনি বরাবর মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ছিলেন। যেদিন আপনার স্বামীর সাথে আমার পরিচয় হয় সেদিনই আমি বুঝেছি।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে ‘অবরুদ্ধ’ গ্রন্থে। কোনোটি তীব্র বেদনার কোনোটি আনন্দের। কোনোটি বীরত্বের কোনোটি লাঞ্ছনার। কোনো ঘটনাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এই বইতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এক সাহিত্যিক-দম্পতির সত্যভাষণের নির্ভীকতা।

অন্য অনেক বিষয়ের মতো মুক্তিযুদ্ধও এখন অনেকের কাছে পণ্য। মুক্তিযুদ্ধের বেসাতি করেছেন অনেক মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে নানা ঘটনার সাথে নিজেদের মিথ্যা সম্পৃক্তির দাবির মাধ্যমে আখের গুছিয়ে নিচ্ছে অনেকেই। কেউ কেউ কাল্পনিক বীরত্বের গল্প ফেঁদে নাম লিখিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধে নিজের বীরত্বের কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে বই লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু আনোয়ারা সৈয়দ হক তাঁর এই গ্রন্থে নিজের বীরত্ব নয়, আত্মত্যাগ নয়, বরং লিখেছেন নিজের অসহায়ত্ব, ভীতি এবং মুক্তিযুদ্ধে তেমন কোনো অবদান রাখতে না পারার আক্ষেপের কথা। তিনি বলতে পেরেছেন- ‘এই যুদ্ধে আমার তেমন কোনো অবদান নাই, তবে আছে অনেক অবমাননা।’

সত্যিকারের লেখকেরই কেবলমাত্র এইরকম নির্মোহ সৎসাহস থাকতে পারে।

ছবি

শালুক সাহিত্যসন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিকরণের জোরালো দাবি উত্থাপিত

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

tab

সাময়িকী

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

জাকির তালুকদার

আনোয়ারা সৈয়দ হক

রোববার, ১৪ নভেম্বর ২০২১

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং সৈয়দ শাসুল হক দম্পতির বাসস্থান ছিল ঢাকার ২১ নম্বর, গ্রীন রোড। পাকিস্তান এয়ারফোর্সের ভাড়া করা ফ্ল্যাট। আনোয়ারা সৈয়দ হক তখন ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর মেডিক্যাল কোরের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ডা. আনোয়ারা বেগম। সৈয়দ শামসুল হক তখনো, জীবনের বাকি দিনগুলোর মতোই, সার্বক্ষণিক লেখকই। বিয়ের পরে তাদের এক মেয়ে এবং এক ছেলের জন্ম হয়েছে। ভালো বেতন পেতেন ডাক্তার আনোয়ারা। যেমনটি সবদেশে সবসময় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সেনাবাহিনী পেয়ে থাকে। সংসারে চমৎকার স্বচ্ছলতা ছিল। ছিল সেইসময় ঢাকায় কেবলমাত্র অভিজাত পরিবারেই দেখতে পাওয়া যায় এমন সব উপকরণ। ছিল ফ্রিজ, সাদাকালো টেলিভিশন, মিউজিক সেন্টার, আধুনিক বেতারযন্ত্র। ঘরজুড়ে ছিল বই, পত্রিকা, গানের রেকর্ড। অঢেল খাদ্যের সরবরাহ। নিজের গাড়ি তখনোই নিজে ড্রাইভ করতেন ফ্লাইট লেফটেনান্ট ডা. আনোয়ারা। সত্যিকারের সুখের সময়। কিন্তু ২৫ মার্চের পরে কোটি কোটি বাঙালির মতো তাদের অবস্থাও আর আগের মতো রইল না।

ক্র্যাকডাউনের পরে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য হাজার হাজার তরুণ-তরুণী দেশত্যাগ করেছিলেন। বাঙালি পুলিশ, ইপিআরদের মতো সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্য বাংলাদেশ থেকে কিংবা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ডা. আনোয়ারা বেগম পালাতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। নিজের ডিউটি করেছেন নয়টি মাস। ঢাকা এয়ারবেসের মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসা করেছেন সৈনিকদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের। উল্লেখ্য, তিনি প্রধানত দেখতেন নারী, গর্ভবতী এবং শিশু রোগীদের। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ডা. আনোয়ারা বেগম স্বাধীনভাবেই বসবাস করেছেন ঢাকায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমস্ত বাঙালির মতোই তিনিও অবরুদ্ধই ছিলেন সেই বিভীষিকাময় নয়টি মাস। সেই অবরুদ্ধ জীবনের কিছু গদ্যচিত্র নিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘অবরুদ্ধ’।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে ‘অবরুদ্ধ’ গ্রন্থে। কোনোটি তীব্র বেদনার কোনোটি আনন্দের। কোনোটি বীরত্বের কোনোটি লাঞ্ছনার। কোনো ঘটনাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এই বইতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এক সাহিত্যিক-দম্পতির সত্যভাষণের নির্ভীকতা

এই বইটি বিশেষভাবে ভিন্ন এই একই বিষয়ে লেখা অন্য অসংখ্য স্মৃতিচারণ থেকে। একাত্তরের নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবনের স্মৃতিকথা যারা লিখেছেন, তারা লেখার কোনো-না-কোনো অংশে মুক্তিযুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের কথা একটু হলেও যোগ করে রেখেছেন। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, এমন কোনো ইঙ্গিত আনোয়ারা সৈয়দ হক তার বইয়ের কোথাও দেবার চেষ্টা করেননি। এমনকী একথাও বেশ কয়েকবারই স্বীকার করেছেন যে দেশের অবস্থা নিয়ে গভীর বেদনাবোধ থাকলেও তা প্রকাশ করার সুযোগ তিনি পাননি। তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে স্বামী-সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে, বাড়িভর্তি আশ্রিতদের রক্ষা করা এবং তাদের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করা নিয়ে, এবং একই সাথে একজন যুবতী ডাক্তার হিসাবে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করা নিয়ে। বইটি একারণেই আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।

একাত্তরের আগে তো আছে ঊনসত্তর। তখন তার ভূমিকা কী? আনোয়ারা সৈয়দ হক মনের গ্লানি স্বীকার করে নিয়েও প্রকৃতির মতো সত্যভাষণ করে গেছেন- ‘ওই উত্তাল গণজাগরণের দিনগুলোতেই কিনা গায়ে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের উর্দি চাপিয়ে পাক আর্মির চাকরি করে গেছি, খেয়েপরে থাকার তাগিদে তাদের দাসত্ব (একরকমের) করে চলেছি। সেই দিনগুলোতে আমার স্বামী সৈয়দ শামসুল হক লিখে চলেছেন ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’। দিন নেই, রাত নেই, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, পরিবারে সঙ্গে কথাবার্তা নেই, লিখে চলেছেন তিনি। লাইনের পর লাইন। লাইনের পর লাইন। ভোরে ঘুম থেকে জেগে ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে এয়ারফোর্স স্কোয়াড্রনে রওনা হবার আগে দেখি তিনি আমার আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠে সেই বিশাল ডাইনিং টেবিলের কোণে বসে সাজিয়ে তুলছেন পংক্তির পর পংক্তি। আবার দুপুর দুটোর পরে বাড়ি ফিরে দেখি উনি তখনো আপন মনে লিখেই চলেছেন। ঘরদোর সেই ভোরে যেভাবে ফেলে গিয়েছিলাম, সেভাবেই পড়ে আছে।’ [পৃষ্ঠা ৩৭]।

এই রকম অনায়াস স্বীকারোক্তির জন্য মানুষ যদি তাকে ধিক্কার দেয় দিক, আনোয়ারা সৈয়দ হক নিজের সম্পর্কে, কিংবা সব্যসাচী সৈয়দ হক সম্পর্কে মিথ্যা বলতে রাজি নন।

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে গিয়েছিলেন অবশ্য দুজনেই। সে অভিজ্ঞতা অনন্য। লেখকের ভাষায়- ‘রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। বিকেলের দিকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে শুরু করলেন। এখন আমাদের দেশে কত বড় বড় জনসভা হয়, এখন আমাদের দেশের লোকসংখ্যাও দ্বিগুণ। কিন্তু সেদিনের মতো কোনো জমায়েত এখন পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে দেখা যায়নি। তার কারণ সেদিনের সমাবেশ ছিল বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের সমাবেশ আর সেই ভাগ্য নির্ধারণের কর্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু।... পড়ন্ত রোদে বঙ্গবন্ধু সেদিন ভিড় ঠেলে মঞ্চে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। তাঁকে দেখামাত্র জনতা জয়ধ্বনি করে উঠল। আমাদের চোখের সামনে রচিত হয়ে চললো সোনালি এক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু চতুর্দিকে দ্রুত একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জলদ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, ভায়েরা আমার-

বঙ্গবন্ধুর সেই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে যেন রোদ্দুরের ফুলবৃষ্টি শুরু হল। বাতাস প্রবাহিত হতে লাগল জোরে। বাংলার মাটি দুলে উঠল আনন্দে। জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর মুখনিসৃত ভাষণ শুনতে লাগল। কী পরিষ্কার তাঁর কণ্ঠ! কত স্বতঃস্ফূর্ত তাঁর বাক্যের দ্যোতনা। পৃথিবীর ইতিহাসে রাজনৈতিক কাব্য বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণ হচ্ছে তা-ই।’ [ পৃষ্ঠা ১৮]

তারপরে ঘরে ফিরে এসে সৈয়দ হক মন দিয়েছেন লেখায়, আনোয়ারা সৈয়দ হক তার চাকুরি এবং পারিবারিক জীবনে।

২৫ মার্চের পরে আনোয়ারার প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় সৈয়দ শামসুল হকের নিরাপত্তা। বাড়ি থেকে স্বামীকে বেরুতে দিতেন না। আবার তাকে অন্য কোনো বন্ধুর আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকার জন্যেও পাঠিয়েছিলেন। কারণ খবর এসেছে যে জ্যোতির্ময় ঘুহ ঠাকরতা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, এবং আরো অনেককে তাদের বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করেছে পাকবাহিনী। আনোয়ারা সৈয়দ হকের মনে প্রচ- ভীতি, যদি পাকবাহিনী তাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে হত্যা করে যায় সৈয়দ হককে? তখন তার- ‘মনে পড়ল, রিকশায় আমি কখনোই সৈয়দ হককে ডানদিকে বসতে দিইনে, সবসময় জোর করে বাঁ দিকে বসাই- পাছে এ্যাক্সিডেন্ট হলে তাঁর চোট লাগে। এই নিয়ে আগে কত ঝগড়া হয়েছে। গাড়ির ভেতরেও তাঁকে সবসময় বসতে হয় বাঁ দিকে। জানি এগুলোর কোনো অর্থ নেই, তবু আমার কাছে অর্থ আছে। যে-মানুষটির গায়ে আমি শারীরিক আঘাত লাগতে দিতে চাই না, তাঁর গায়ে হাত দেবে পশ্চিমা এক সৈন্য? অসম্ভব।’ [ পৃষ্ঠা ৪৬]।

কিন্তু বন্ধু আশ্রয় দেয়নি সৈয়দ হককে। তাকে ফিরে এসে কয়েক মাস থাকতে হয়েছে ঘরবন্দি অবস্থাতেই।

অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখে সৈয়দ শামসুল হক লন্ডনে পাড়ি জমাতে সক্ষম হন। সেখানে গিয়ে তিনি অনেকরকম কাজের পাশাপাশি বিবিসি-র অনিয়মিত কথক হিসাবে কাজ করেছেন। আর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা এটাই যে, ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর বিবিসিতে প্রথম পাঠ করেন সৈয়দ শামসুল হকই।

স্বামীকে লন্ডন পাঠিয়ে কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত আনোয়ারা সন্তানদের নিয়ে অবরুদ্ধ ঢাকায় রয়ে গেলেন।

‘অবরুদ্ধ’ গ্রন্থে লেখক শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করেছেন তার এসএমও স্কোয়াড্রন লিডার হার্বার্ট শরাফ-এর নাম। এই মানুষটি ধর্মে ছিলেন খ্রিস্টান। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে উচ্চপদে কর্মরত থাকার সুবাদে তিনি আনোয়ারা সৈয়দ হককে অনেক বিপদ থেকে আগলে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষ করে লেখকের ভাই যখন যশোরের নাভারন ব্রিজ বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার অভিযোগ ধৃত হয়েছিলেন, তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে সপল উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। আবার ভাইকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যে পাকিস্তানি সামরিক অফিসার লেখককে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে রাতে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, সেই আমন্ত্রণের ফাঁদ থেকেও লেখককে রক্ষা করেছিলেন এই হার্বার্ট শরাফই। সৈয়দ শামসুল হককে লন্ডন পাঠাতে সেই সময় রিটার্ন টিকেটের জন্য দরকার ছিল ১৬ হাজার টাকা। সেই টাকার একটা বড় অংশ জোগাড় করতে ভূমিকা রেখেছিলেন হার্বার্ট শরাফ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পরে লেখক তার এই সিনিয়র অফিসারকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। স্কোয়াড্রন লিডার তখন যুদ্ধবন্দি। সেদিন লেখকের সাথে তার কথোকথন এই রকম-

‘আমি হার্বার্ট শরাফের দিকে তাকিয়ে বললাম, একটা কথা আমি আপনাকে এখন জানাতে চাই, স্যার।

হার্বার্ট শরাফ একটু হেসে বললেন, আপনি কি কথা বলবেন আমি জানি।

আমি বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, আপনি বরাবর মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ছিলেন। যেদিন আপনার স্বামীর সাথে আমার পরিচয় হয় সেদিনই আমি বুঝেছি।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে ‘অবরুদ্ধ’ গ্রন্থে। কোনোটি তীব্র বেদনার কোনোটি আনন্দের। কোনোটি বীরত্বের কোনোটি লাঞ্ছনার। কোনো ঘটনাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এই বইতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এক সাহিত্যিক-দম্পতির সত্যভাষণের নির্ভীকতা।

অন্য অনেক বিষয়ের মতো মুক্তিযুদ্ধও এখন অনেকের কাছে পণ্য। মুক্তিযুদ্ধের বেসাতি করেছেন অনেক মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে নানা ঘটনার সাথে নিজেদের মিথ্যা সম্পৃক্তির দাবির মাধ্যমে আখের গুছিয়ে নিচ্ছে অনেকেই। কেউ কেউ কাল্পনিক বীরত্বের গল্প ফেঁদে নাম লিখিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধে নিজের বীরত্বের কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে বই লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু আনোয়ারা সৈয়দ হক তাঁর এই গ্রন্থে নিজের বীরত্ব নয়, আত্মত্যাগ নয়, বরং লিখেছেন নিজের অসহায়ত্ব, ভীতি এবং মুক্তিযুদ্ধে তেমন কোনো অবদান রাখতে না পারার আক্ষেপের কথা। তিনি বলতে পেরেছেন- ‘এই যুদ্ধে আমার তেমন কোনো অবদান নাই, তবে আছে অনেক অবমাননা।’

সত্যিকারের লেখকেরই কেবলমাত্র এইরকম নির্মোহ সৎসাহস থাকতে পারে।

back to top