alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : তেইশ

শিকিবু

আবুল কাসেম

: বুধবার, ১৭ নভেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চল্লিশ.

মুরাসাকি লিখেই চলেছেন। গেঞ্জির জীবনে এই প্রথম বিপর্যস্ত হবার মতো দু’টি ঘটনা ঘটলো। গেঞ্জি আসলে একজনকেই ভালোবেসেছে। সে হচ্ছে মুরাসাকি। এই মুরাসাকির হঠাৎই মৃত্যু হলো সন্ন্যাসিনী অবস্থায়। তাতে গেঞ্জির অন্তর বিদীর্ণ হয়। এ মৃত্যু তাকে গভীরভাবে ভাবায়। তা হলে এই কী জীবনের শেষ পরিণতি। তার পাপের কারণেই কি মুরাসাকির অকাল মৃত্যু হলো। গেঞ্জি বিশ্বাস করতো মুরাসাকি সন্নাসিনী হলেও ফিরে আসবে। এটা তার অভিমান। অনেক সন্ন্যাসিনী প্যাগোডা-শ্রাইন থেকে ফিরে আসে। স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনে আত্ম নিয়োগ করে। অভিমানী মুরাসাকি একেবারে অভিমান করে চলে গেল! গেঞ্জির যেন বুক ফেটে যাচ্ছে।

এ সময় পুত্রের সাম্রাজ্যে সর্বোচ্চপদ এবং নতুন স্ত্রী-প্রিন্সেসকে নিয়ে তার পরম সুখে থাকার কথা। কিন্তু রাজ্যের দুঃখ এবং সারা জীবনের পাপের শাস্তি যেন তার ওপর ভর করেছে। গেঞ্জি কঠিন দোজগে আছে। সে দোজগ শুধু হৃদয়কে আগুনে পোড়ায়।

ইত্যবসরে তার স্ত্রী থার্ড প্রিন্সেসের সঙ্গে গেঞ্জির ভাইপোর প্রেম এবং দৈহিক সম্পর্ক তৈরি হয় সকলের অগোচরে। তাতে জন্ম হয় প্রিন্স কাওরোর।

এ সংবাদে সবাই খুশি। সবাই জানে বুড়ো বয়সেও গেঞ্জির একটি পুত্র হয়েছে। এ নিয়ে আনন্দ-উৎসব। সম্রাট সুজেকো এ উৎসবের আয়োজক। তার আনন্দই বেশি।

কিন্তু গেঞ্জি জানে যে, সে প্রিন্সেসের সঙ্গে মিলিত হয়নি, সে সামর্থ্য তার নেই। তা হলে? মৃত্যুর আগে কি তাকে তার কর্মফল দেখে যেত হল? তার মনে হল তার যৌবনের পাপ, ভোগ, তাকে আজ দুর্ভোগের মধ্যে একই আলামত দেখিয়ে দিল! তার প্রায়শ্চিত্তের যে আর সময় নেই। উপায় নেই। পাশ্চাত্যে তা নিয়তি নির্ধারিত। একে কেউ এড়িয়ে যেত পারে না। গ্রিক আর শেক্সপিয়রের ট্যাজেডিগুলো এ মিথের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রাচ্যে কর্মফলবাদ যেন বৌদ্ধ ধর্মের সে কথাই বলছে, জীবন দুঃখের সমষ্টি, এ দুঃখ তারই সৃষ্টি।

গেঞ্জির মানসিক চাপে স্বাস্থ্যের অবণতি ঘটে। গেঞ্জি এক সময় এই দুঃখ কষ্ট নিয়ে মারা যায় (সংক্ষেপিত)।

স্ক্রলগুলোর প্রতিলিপি প্রণীত হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। তাতে হৈচৈ পড়ে গেল। মুরাসাকির গল্প অনৈতিক সম্ভোগের মনস্তাত্ত্বিক অনিবার্য পরিণতি দেখে গভীর চিন্তার দার্শনিক, লেখক, কবি, ঋষি, ধর্মীয় গুরু, সম্রাটের দরবার, সবাই নতুন এক বিশ্বাসে যেন অবগাহন করে বিশাল সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। এটা তাদের কাছে ছিল অভাবিত।

ছুটে এলেন ইমন। বললেন, দারুণ সাড়া জাগিয়েছে। আমার খুব ভালো লেগেছে। কাক্সিক্ষত পরিণাম। এত বিস্তারিত, তারপরও ক্লান্তিবোধ করিনি। শেষ না করে উঠে আসতে পারিনি। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভোগ-লালসা, ক্ষমতার পরিণাম, বিশেষ করে রোমাঞ্চ এবং সম্ভোগের মনস্তাত্তিক ব্যাখ্যা ও দুর্ভোগের নৈতিক পরাভবকে যেভাবে চিত্রিত (ফিকশনেট) করে তুলেছ, তা এখনকার ধ্যানধারণায় শুধু বিরলই নয়, অভিনবও।

বহুদিন পর ইঝোমিও যেন অবরুদ্ধ প্রাচীর চুড়মার করে বের হয়ে চলে এলেন সম্রাটের প্রাসাদে, মুরাসাকির দপ্তরে। বললেন, আমার জীবনের পরিণাম তুমি বলে দিয়েছ। তোমার ভোগময় জীবনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আমি আমার অতৃপ্ত ভোগ লিপ্সার দর্শনকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু বোধহয় বের হয়ে আসতে পারব না। একটা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হবো। আর কিছু না।

ইমন হেসে দিয়ে বললেন, তুমি শান্ত হও, কবি ইঝোমি। জগতে সবাই এক রকম হবে এমন কথা নেই। তুমি তোমাকে নিয়ে ঠিক আছো। এখন যেভাবে আছো, যা করে যাচ্ছো, তার পরিণাম কী দাঁড়াবে, তার চেয়ে বড় কথা তোমার সংবেদনশীল ও আনন্দ-বিরহের জগৎ, যা আমাদেরকে আন্দোলিত করে, যেমন এখানে তুমি এবং আমি ছুটে এসেছি নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে। তাকাকু আমাদেরকে প্রবলভাবে নাড়া দিতে পেরেছে।

ও যে ভেতর ভেতর এত বড় লেখক, আমি তা বুঝতেই পারিনি। একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছে। এখন গেঞ্জির মধ্যে আমি আমাকে দেখি। ভোগাসক্ত মানুষের এই পরিণতি?

শুধু তুমি কেন, গেঞ্জির আয়নায় পুরো হেইয়ানকিয়ো নিজেদের দেখছে। এতে আরো কী আছে কে জানে। আমাদের দৃষ্টিরসীমা আছে। তার ওপারে কী আছে যার দৃষ্টি আরো প্রসারিত তারাই বলতে পারবে। তাকাকু তো আমাদের বলবে না।

ইঝোমি বললেন, কেন বলবে সে? যা বলার তা তো লেখায়ই বলে দিয়েছে।

ঠিক বলেছ।

এতক্ষণ মুরাসাকি চুপ করেছিলেন। এখন বললেন, লেখা শেষ হয়নি আরো অনেকদূর যেত হবে।

ইমন বললেন, ঠিক আছে যাও। আমাদের কথাগুলোকেও সঙ্গে করে নিও।

ইঝোমি বললেন, আমি কি দেখেছি জানো? তোমার মধ্যে একটা অতৃপ্তি। এটাই প্রেম এবং সৃষ্টির প্রেরণা। চালিয়ে যাও বন্ধু। আমারও যা কিছু ছিল তা পূর্ণ করুক তোমায় পরিপূর্ণ রেখায়, সম্পূর্ণ দেখায়।

ইঝোমির মুখে ছন্দবদ্ধ পদ্য শুনে মুরাসাকি আবার হাসলেন। বললেন, বলে যাও, সুন্দর লাগছে। সেদিন যখন তোমাকে বিওয়া হ্রদের ধারে দেখেছিলাম, আজ তার চেয়ে অনেক প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে। তোমার এত এত প্রাণই আমাদের সজীব করে তোমার ওপর আস্থা বাড়িয়ে তোলে।

এ সময় অপ্রত্যাশিতভাবে একমুঠো তাজা ফুল নিয়ে বিদগ্ধ লেডি খ্যাত সেনশি উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। ইঝোমির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি মাসামুনের মেয়ে না? হতাশ করো না মেয়ে। আমি তোমার মুগ্ধ পাঠক। মুরাসাকির হাতে ফুলগুলো দিলেন।

তিনি মেঝেতে বসার পর সবাই বসলেন। আবার বললেন, তোমরা আছো ভালো হয়েছে। সেদিন তাকে (তাকাকু) অনেক কটু কথা বলেছি। সে কষ্ট নিয়ে ফিরে এসেছে। তাকে আমি ভুল বুঝেছিলাম। আমার শুধু ভুল না, সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করছি। একজন মেধাবী এবং দূরদর্শী লেখককে বুঝতে হলে শতাব্দীর পর শতাব্দীও অপেক্ষা করতে হয়। আমার মাত্র কয়েকস্ক্রল দূরে ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। কী লজ্জা বলতো। এত বড় ব্যাপার সামনে রেখে এগোচ্ছিল সে, বুঝবার কি কোনো উপায় আছে? আমাদের মতো কম মগজের মাথায় নেই, তোমরা কবিরা বলতে পারো। সৃষ্টিকর্তা তোমাদের সে ধীশক্তি দিয়েছেন। দূরদর্শী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তোমাদের দেখে খুবই ঈর্ষা হয়।

তার কথা শুনে কবিরা সবাই হাসলেন। সেনশি আবার বললেন, মনোগাতারি কি এখানেই শেষ?

মুরাসাকি বললেন, না, শেষ না।

পরে কী থাকছে?

এখনো চিন্তা করিনি।

ইচিজো একটা কবিতা সংকলন করাতে যাচ্ছে। জানো বোধ হয়। সে দিন সভাকবি কিন্তুকে বলেছিল।

ইমন বললেন, তা হলে তো ভালো হয়। মহামান্য অবশ্য বেশ আগে একবার বলেছিলেন।

আমি তা হলে আসি, তোমরা ভালো থেকো।

বোন চলে গেলে ভাই এলেন। মিচিনাগা অপেক্ষা করছিলেন, বোন কখন উঠে যাবেন। আসলে মুরাসাকি তখন লেডি সেনশির সঙ্গে সহজ হতে পারছিলেন না। এখনো সে অবস্থাটা রয়ে গেছে। একটা সেকি সেকি বা বিচলিতভাব।

মিচিনাগা বললেন, প্রশংসার কাজটা লেডি সেনশি করে গেছেন। বিদগ্ধ রমণী, আমারটা আর এতটা আকর্ষণীয় হবে না। তাই প্রশংসায় গেলাম না। অভিভূত হয়েছি এক কথায়।

এরা সবাই জানেন, মিচিনাগা কবিতাও লেখেন। ইমন বললেন, মাননীয় যে উন্নত ভাষা এবং ভাবের কবিতা লেখেন তার পক্ষেই এ ধরনের বড় কাজের প্রশংসা মানায়, মুল্যায়নটা সঠিক হয়।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

ইমন হচ্ছে হলুদ বুঝলে, সবাই তাকে পছন্দ করে। কারণ সে সবার মন জয় করতে পারে। আর ইঝোমি হচ্ছে ইউকারোমি (প্লবমান নারী)। এই উপাধি শুনে ইঝোমিই বেশি হাসলেন। মিচিনাগা আবার বললেন, তাকে আমি নিত্য নতুন প্রেমে সাঁতার কাটতে দেখি। অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। কিন্তু সে লেখে ভালো। উপস্থিত ক্ষেত্রে বৃষ্টির কবিতা লিখে যেভাবে শুনিয়ে দিল সম্রাটকে, কারো পক্ষেই তা সম্ভব নয়।

ইমন বললেন, তাকাকু সম্পর্কে কিছু বলেননি।

বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। গদ্যকাররা কি গদাইলঙ্কর?

তার কথা শুনে সবাই হাসলেন উচ্চস্বরে। পরে মিচিনাগা আবার বললেন, আমি তাকে খুব ভয় পাই। বলে এবার নিজেই হাসলেন।

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

ছবি

পদাবলি : হেমন্ত প্রান্তরে

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : তেইশ

শিকিবু

আবুল কাসেম

বুধবার, ১৭ নভেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চল্লিশ.

মুরাসাকি লিখেই চলেছেন। গেঞ্জির জীবনে এই প্রথম বিপর্যস্ত হবার মতো দু’টি ঘটনা ঘটলো। গেঞ্জি আসলে একজনকেই ভালোবেসেছে। সে হচ্ছে মুরাসাকি। এই মুরাসাকির হঠাৎই মৃত্যু হলো সন্ন্যাসিনী অবস্থায়। তাতে গেঞ্জির অন্তর বিদীর্ণ হয়। এ মৃত্যু তাকে গভীরভাবে ভাবায়। তা হলে এই কী জীবনের শেষ পরিণতি। তার পাপের কারণেই কি মুরাসাকির অকাল মৃত্যু হলো। গেঞ্জি বিশ্বাস করতো মুরাসাকি সন্নাসিনী হলেও ফিরে আসবে। এটা তার অভিমান। অনেক সন্ন্যাসিনী প্যাগোডা-শ্রাইন থেকে ফিরে আসে। স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনে আত্ম নিয়োগ করে। অভিমানী মুরাসাকি একেবারে অভিমান করে চলে গেল! গেঞ্জির যেন বুক ফেটে যাচ্ছে।

এ সময় পুত্রের সাম্রাজ্যে সর্বোচ্চপদ এবং নতুন স্ত্রী-প্রিন্সেসকে নিয়ে তার পরম সুখে থাকার কথা। কিন্তু রাজ্যের দুঃখ এবং সারা জীবনের পাপের শাস্তি যেন তার ওপর ভর করেছে। গেঞ্জি কঠিন দোজগে আছে। সে দোজগ শুধু হৃদয়কে আগুনে পোড়ায়।

ইত্যবসরে তার স্ত্রী থার্ড প্রিন্সেসের সঙ্গে গেঞ্জির ভাইপোর প্রেম এবং দৈহিক সম্পর্ক তৈরি হয় সকলের অগোচরে। তাতে জন্ম হয় প্রিন্স কাওরোর।

এ সংবাদে সবাই খুশি। সবাই জানে বুড়ো বয়সেও গেঞ্জির একটি পুত্র হয়েছে। এ নিয়ে আনন্দ-উৎসব। সম্রাট সুজেকো এ উৎসবের আয়োজক। তার আনন্দই বেশি।

কিন্তু গেঞ্জি জানে যে, সে প্রিন্সেসের সঙ্গে মিলিত হয়নি, সে সামর্থ্য তার নেই। তা হলে? মৃত্যুর আগে কি তাকে তার কর্মফল দেখে যেত হল? তার মনে হল তার যৌবনের পাপ, ভোগ, তাকে আজ দুর্ভোগের মধ্যে একই আলামত দেখিয়ে দিল! তার প্রায়শ্চিত্তের যে আর সময় নেই। উপায় নেই। পাশ্চাত্যে তা নিয়তি নির্ধারিত। একে কেউ এড়িয়ে যেত পারে না। গ্রিক আর শেক্সপিয়রের ট্যাজেডিগুলো এ মিথের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রাচ্যে কর্মফলবাদ যেন বৌদ্ধ ধর্মের সে কথাই বলছে, জীবন দুঃখের সমষ্টি, এ দুঃখ তারই সৃষ্টি।

গেঞ্জির মানসিক চাপে স্বাস্থ্যের অবণতি ঘটে। গেঞ্জি এক সময় এই দুঃখ কষ্ট নিয়ে মারা যায় (সংক্ষেপিত)।

স্ক্রলগুলোর প্রতিলিপি প্রণীত হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। তাতে হৈচৈ পড়ে গেল। মুরাসাকির গল্প অনৈতিক সম্ভোগের মনস্তাত্ত্বিক অনিবার্য পরিণতি দেখে গভীর চিন্তার দার্শনিক, লেখক, কবি, ঋষি, ধর্মীয় গুরু, সম্রাটের দরবার, সবাই নতুন এক বিশ্বাসে যেন অবগাহন করে বিশাল সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। এটা তাদের কাছে ছিল অভাবিত।

ছুটে এলেন ইমন। বললেন, দারুণ সাড়া জাগিয়েছে। আমার খুব ভালো লেগেছে। কাক্সিক্ষত পরিণাম। এত বিস্তারিত, তারপরও ক্লান্তিবোধ করিনি। শেষ না করে উঠে আসতে পারিনি। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভোগ-লালসা, ক্ষমতার পরিণাম, বিশেষ করে রোমাঞ্চ এবং সম্ভোগের মনস্তাত্তিক ব্যাখ্যা ও দুর্ভোগের নৈতিক পরাভবকে যেভাবে চিত্রিত (ফিকশনেট) করে তুলেছ, তা এখনকার ধ্যানধারণায় শুধু বিরলই নয়, অভিনবও।

বহুদিন পর ইঝোমিও যেন অবরুদ্ধ প্রাচীর চুড়মার করে বের হয়ে চলে এলেন সম্রাটের প্রাসাদে, মুরাসাকির দপ্তরে। বললেন, আমার জীবনের পরিণাম তুমি বলে দিয়েছ। তোমার ভোগময় জীবনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আমি আমার অতৃপ্ত ভোগ লিপ্সার দর্শনকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু বোধহয় বের হয়ে আসতে পারব না। একটা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হবো। আর কিছু না।

ইমন হেসে দিয়ে বললেন, তুমি শান্ত হও, কবি ইঝোমি। জগতে সবাই এক রকম হবে এমন কথা নেই। তুমি তোমাকে নিয়ে ঠিক আছো। এখন যেভাবে আছো, যা করে যাচ্ছো, তার পরিণাম কী দাঁড়াবে, তার চেয়ে বড় কথা তোমার সংবেদনশীল ও আনন্দ-বিরহের জগৎ, যা আমাদেরকে আন্দোলিত করে, যেমন এখানে তুমি এবং আমি ছুটে এসেছি নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে। তাকাকু আমাদেরকে প্রবলভাবে নাড়া দিতে পেরেছে।

ও যে ভেতর ভেতর এত বড় লেখক, আমি তা বুঝতেই পারিনি। একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছে। এখন গেঞ্জির মধ্যে আমি আমাকে দেখি। ভোগাসক্ত মানুষের এই পরিণতি?

শুধু তুমি কেন, গেঞ্জির আয়নায় পুরো হেইয়ানকিয়ো নিজেদের দেখছে। এতে আরো কী আছে কে জানে। আমাদের দৃষ্টিরসীমা আছে। তার ওপারে কী আছে যার দৃষ্টি আরো প্রসারিত তারাই বলতে পারবে। তাকাকু তো আমাদের বলবে না।

ইঝোমি বললেন, কেন বলবে সে? যা বলার তা তো লেখায়ই বলে দিয়েছে।

ঠিক বলেছ।

এতক্ষণ মুরাসাকি চুপ করেছিলেন। এখন বললেন, লেখা শেষ হয়নি আরো অনেকদূর যেত হবে।

ইমন বললেন, ঠিক আছে যাও। আমাদের কথাগুলোকেও সঙ্গে করে নিও।

ইঝোমি বললেন, আমি কি দেখেছি জানো? তোমার মধ্যে একটা অতৃপ্তি। এটাই প্রেম এবং সৃষ্টির প্রেরণা। চালিয়ে যাও বন্ধু। আমারও যা কিছু ছিল তা পূর্ণ করুক তোমায় পরিপূর্ণ রেখায়, সম্পূর্ণ দেখায়।

ইঝোমির মুখে ছন্দবদ্ধ পদ্য শুনে মুরাসাকি আবার হাসলেন। বললেন, বলে যাও, সুন্দর লাগছে। সেদিন যখন তোমাকে বিওয়া হ্রদের ধারে দেখেছিলাম, আজ তার চেয়ে অনেক প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে। তোমার এত এত প্রাণই আমাদের সজীব করে তোমার ওপর আস্থা বাড়িয়ে তোলে।

এ সময় অপ্রত্যাশিতভাবে একমুঠো তাজা ফুল নিয়ে বিদগ্ধ লেডি খ্যাত সেনশি উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। ইঝোমির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি মাসামুনের মেয়ে না? হতাশ করো না মেয়ে। আমি তোমার মুগ্ধ পাঠক। মুরাসাকির হাতে ফুলগুলো দিলেন।

তিনি মেঝেতে বসার পর সবাই বসলেন। আবার বললেন, তোমরা আছো ভালো হয়েছে। সেদিন তাকে (তাকাকু) অনেক কটু কথা বলেছি। সে কষ্ট নিয়ে ফিরে এসেছে। তাকে আমি ভুল বুঝেছিলাম। আমার শুধু ভুল না, সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করছি। একজন মেধাবী এবং দূরদর্শী লেখককে বুঝতে হলে শতাব্দীর পর শতাব্দীও অপেক্ষা করতে হয়। আমার মাত্র কয়েকস্ক্রল দূরে ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। কী লজ্জা বলতো। এত বড় ব্যাপার সামনে রেখে এগোচ্ছিল সে, বুঝবার কি কোনো উপায় আছে? আমাদের মতো কম মগজের মাথায় নেই, তোমরা কবিরা বলতে পারো। সৃষ্টিকর্তা তোমাদের সে ধীশক্তি দিয়েছেন। দূরদর্শী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তোমাদের দেখে খুবই ঈর্ষা হয়।

তার কথা শুনে কবিরা সবাই হাসলেন। সেনশি আবার বললেন, মনোগাতারি কি এখানেই শেষ?

মুরাসাকি বললেন, না, শেষ না।

পরে কী থাকছে?

এখনো চিন্তা করিনি।

ইচিজো একটা কবিতা সংকলন করাতে যাচ্ছে। জানো বোধ হয়। সে দিন সভাকবি কিন্তুকে বলেছিল।

ইমন বললেন, তা হলে তো ভালো হয়। মহামান্য অবশ্য বেশ আগে একবার বলেছিলেন।

আমি তা হলে আসি, তোমরা ভালো থেকো।

বোন চলে গেলে ভাই এলেন। মিচিনাগা অপেক্ষা করছিলেন, বোন কখন উঠে যাবেন। আসলে মুরাসাকি তখন লেডি সেনশির সঙ্গে সহজ হতে পারছিলেন না। এখনো সে অবস্থাটা রয়ে গেছে। একটা সেকি সেকি বা বিচলিতভাব।

মিচিনাগা বললেন, প্রশংসার কাজটা লেডি সেনশি করে গেছেন। বিদগ্ধ রমণী, আমারটা আর এতটা আকর্ষণীয় হবে না। তাই প্রশংসায় গেলাম না। অভিভূত হয়েছি এক কথায়।

এরা সবাই জানেন, মিচিনাগা কবিতাও লেখেন। ইমন বললেন, মাননীয় যে উন্নত ভাষা এবং ভাবের কবিতা লেখেন তার পক্ষেই এ ধরনের বড় কাজের প্রশংসা মানায়, মুল্যায়নটা সঠিক হয়।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

ইমন হচ্ছে হলুদ বুঝলে, সবাই তাকে পছন্দ করে। কারণ সে সবার মন জয় করতে পারে। আর ইঝোমি হচ্ছে ইউকারোমি (প্লবমান নারী)। এই উপাধি শুনে ইঝোমিই বেশি হাসলেন। মিচিনাগা আবার বললেন, তাকে আমি নিত্য নতুন প্রেমে সাঁতার কাটতে দেখি। অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। কিন্তু সে লেখে ভালো। উপস্থিত ক্ষেত্রে বৃষ্টির কবিতা লিখে যেভাবে শুনিয়ে দিল সম্রাটকে, কারো পক্ষেই তা সম্ভব নয়।

ইমন বললেন, তাকাকু সম্পর্কে কিছু বলেননি।

বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। গদ্যকাররা কি গদাইলঙ্কর?

তার কথা শুনে সবাই হাসলেন উচ্চস্বরে। পরে মিচিনাগা আবার বললেন, আমি তাকে খুব ভয় পাই। বলে এবার নিজেই হাসলেন।

back to top