alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : চব্বিশ

শিকিবু

আবুল কাসেম

: রোববার, ২১ নভেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

একচল্লিশ.

সেই শোনাগন চারদিকে মুরাসাকির সুনাম ছড়িয়ে পড়ার কথা শুনে বেশ মন খারাপ করে আছেন। তার নিজের লেখায়ও মন বসছে না। সন্তানসম্ভবা সম্রাজ্ঞী তেইশিরও কোনো সংবাদ নেননি আজ।

তেইশি হেইয়ান প্রাসাদে থাকা নিরাপদ মনে করছেন না। আগুনভীতি সম্রাট প্রাসাদের এক নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। আগুন লেগে কাঁঠের দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ কয়েকবারই পুড়ে গেছে। এ ছাড়া যোগ হয়েছে সম্রাজ্ঞী শোশির পিতা মিচিনাগা-ভীতি। সম্রাজ্ঞী বাকি দিনগুলো চুগুশিকি অংশে অধিকতর নিরাপদে থাকার লক্ষ্যে সেখানে গমনের সিদ্ধান্ত নেন। চুগুশিকি মূলত সম্রাজ্ঞীর সেবাকেন্দ্র। চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া হয়েছে। সেই শোনাগনের সঙ্গে প্রাথমিক কথা হয়েছে, সম্রাজ্ঞী আবারও তাঁর সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে চান।

তিনি ডেকে পাঠালেন শোনগনকে। শোনগন তাঁর মন খারাপের প্রকৃত কারণ বলতে চান না। তাই তার লেখা পুরোনো প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন, মহামান্যা, আমি আজও ভুলতে পারি না সে সব দুঃসময়ের স্মৃতি যখন আপনার বাবা মারা গেলেন। মিচিনাগা তার কন্যাকে সম্রাজ্ঞী করে আপনার হৃদয়কে ভাগ করে দিলেন। কোথাও কোনো ইতিহাসে কি দুই সম্রাজ্ঞীর কথা জানা যায়? যায় না। এখানে তাই ঘটলো। আপনার ভাইসহ শুভার্র্শীদের তাড়িয়ে দেয়া হলো। কী মর্মান্তিক। এসব তো আমি লিখেছি।

দুঃসময়ের কথা লিখে রেখে ভালোই করেছে।

লেডি-চিকিৎসক বললেন, দুঃসময়ের কথা নয় মহামান্যা আপনাকে শুনতে হবে এখন সব আনন্দের কথা। রোমন্থন করতে হবে সুন্দর সুন্দর দিনের স্মৃতি। তাহলে সন্তান সুন্দর মন মানসিকতা নিয়ে জন্মাবে।

শোনাগন বললেন তা ঠিক। তা হলে আমরা সেবা কেন্দ্রেই যাচ্ছি।

সম্রাজ্ঞী তেইশি বললেন, জরুরিভাবে যাওয়া উচিত। বৈরী পরিবেশে মানসিক দুশ্চিন্তা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাও তো সন্তানের জন্য ভালো নয়।

ঠিক বলছেন মহামান্যা। বললেন লেডি চিকিৎসক। এসব স্থানচ্যুতি এবং পরিবর্তন শোনাগনের ভালো লাগে না। মানসিক স্থিরতা নষ্ট হয়। লেখার ক্ষতি হয়। তবু তাকে তা মেনে নিতে হয়। সম্রাজ্ঞী প্রাসাদ পরিবর্তন করলে লেডিদেরও দপ্তর সরাতে হয়।

নিজ দপ্তরে ফিরে শোনাগন মুরাসাকির লেখার শেষ অংশটি নিয়ে বসলেন চুপি চুপি। অন্য লেডিরা যাতে না জানতে পারেন, তাই এবং সাবধানতা।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

এক ধরনের উন্নাসিকতা নিয়ে স্ক্রলটা খুলেছিলেন। পড়তে পড়তে নিজেও অভিভূত হলেন। মুরাসাকি তাঁর চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট। তিনি প্রকাশ্যে তাঁর লেখার প্রশংসা করতে পারতেন। তাহলেই তা শোভন হতো। অনুপ্রেরণা দিয়ে নিজের বড়ত্ব বজায় রাখতে পারতেন। তিনি কিনা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেন। এসব ভেবে নিজেই কেমন যেন অনুতপ্ত বোধ করলেন। কিন্তু এ পর্যন্তই। মেয়েলি ঈর্ষা আবার তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। স্ক্রলটা ছুড়ে ফেলে দিলেন। না, যে অবস্থা চলছে, তা-ই চলতে থাকবে, পরাজিত হওয়া চলবে না। কোনো প্রশংসা নয়। একে নিজের দরবারের লেডিরা তো বটেই, অন্যেরাও দুর্বলতা এবং আপোসকামিতা মনে করবে।

প্রাসাদ পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে, গোছগাছ করতে দাসীদের নির্দেশ দিলেন। এক দাসী গোছাতে গোছাতে বলল, লেডি তাকাকুর দপ্তরে লেডি সেনশি ফুল নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তো সম্রাজ্ঞী ছাড়া অন্য কারো দপ্তরে যান না।

তোকে এ কথা কে বলল?

অমা একথা তো সবাই জানে।

যত আকথা। যা কাজ করা।

দাসীকে একথা বললেও ভেতরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে তাঁর, তা হলে এত দূর। রাতে খুব একটা ঘুম হল না। ঈর্ষা এমন এক জিনিস যা খুব জ্বালায়। জ্বালাতেই থাকে। এখানে আলাদা কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হয় না।

ইঝোমি সে দিন মুরাসাকির কাছ থেকে ইমনের দপ্তরে যান এবং সেখানেই রাত্রিযাপন করেন। সারারাত গল্প করেন। ইমনের মতো ধৈর্যশীল ভালো শ্রোতা বুঝি আর জগতে নেই।

আজ ইমনের সেসব কথা মনে করে হাসি পাচ্ছে। ইঝোমি বলছিলেন অতসুমিচির গল্প, যাকে বাগে আনা সতিই কঠিন। কতটা প্রাণপণ চেষ্টা এবং কসরত করতে হচ্ছে তাঁকে।

ইঝোমি তাকে বলেছিলেন, কেন যেন ব্যাটেবলে হচ্ছে না।

কি রকম?

একদিন প্রিন্স লিখলেন, ‘দুঃখ নিয়ে শরতের আকাশের দিকে চেয়ে আছি/ মেঘগুলো লণ্ডভণ্ড/বাতাস প্রচণ্ড।’

তুমি কি লিখলে?

শরতের ভদ্রবাতাস আমাকে দুঃখিত করে তুলেছে/হায় ঝড়ের দিন/তা বলার ভাষা আমার জানা নাই’।

প্রিন্স ভেবেছিলেন আমি তার প্রকৃত মনোভাব বুঝতে পারব।

তা হলে হলোটা কি?

আবার সেই অদৃশ্য অবস্থা। তার কোনো খবর নেই।

ভারী মজার তো ব্যাপারটা।

কিন্তু আমি তাকে বাগে আনবই। কেউ আমাকে ভোগাতে পারেনি, আমিই নিয়ন্ত্রণ করেছি এবং করব।

তারপর কি হলো?

তিনি সংবাদ না দিয়ে এক রাতে এলেন। দরজায় টোকা দিলেন।

জানি না কে এসেছে। কাজের মেয়েটা ঘুমোচ্ছে অঘোরে। কাজের পুরুষলোকটিকে ডেকে পাঠালাম। সে এসে বলল, দরজায় তো কেউ নেই। আমি বললাম, তুমি যেত দেরি করেছ। সারা রাত অস্থির হয়ে রইলাম। ঘুম হলো না। ওহ্, অশান্তির লোকজন। সকাল সকাল উঠলাম। আকাশটা হালকা মেঘে ঢাকা। অন্ধকার চারদিক। যখন সকাল হল লক্ষ্যহীনভাবে ভাবছি অস্থিরতাটা কমে এসেছে। তখন একটা পত্র পেলাম। একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন তিনি : শরতের রাতে/ফ্যাকাসে সকালের চাঁদ অস্তগামী/বন্ধ দরজা থেকে আমি ফিরে চলে এলাম।

আপনি হাসছেন? তিনি আমাকে কী ভাববেন বলুন, নিশ্চয়ই একটা হতাশ করা মহিলা।

তুমি কি লিখলে?

বিশাল একটি চিঠি। তাতে ছিল টোকা, পদ্য কবিতা এবং গদ্যে প্রভাতের দৃশ্য বর্ণনা- যার সঙ্গে আমার জীবনের দুঃখ হতাশার মিল আছে।

টোকায় কি ছিল?

বাতাসের শব্দ : প্রচণ্ড বাতাস, ডালের শেষ পাতাটিও যেন উড়িয়ে নেবে, তেমনি প্রতিজ্ঞা তার। তাতে মেঘের সৃষ্টি এবং ভয় প্রদর্শ, বৃষ্টির ফোটা কিছু কিছু। আমি আশাহীনভাবে নির্জন।

কবিতাটি?

একটি :

শরৎ শেষ হবার আগেই/আমার হাতা অশ্রুতে পচে যাবে/ধীরগতির বৃষ্টিও তারছে বেশি কিছু করতে পারবে না।

গদ্যে কি লিখলে?

আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি কেউ তা নিয়ে কিছু বলছে না। গাছের পাতা এবং বৃক্ষরাজি দিন দিন পরিবর্তিত হয়। এই-ই তার স্নেহ? প্রত্যাশায় আমি দীর্ঘ শীতে বৃষ্টিপাতের উদ্বেগ অনুভব করি। পাতাগুলোকে বাতাস সকরুণভাবে জ্বালাতন করছে। পাতাগুলোর ওপর থাকা ফোটা ফোঁটা বৃষ্টি যে কোনো মুহূর্তে বিলীন হতে পারে, আমার জীবনের মতো। পত্রগুলো আমার নিজের দুঃখের কথা আমাকে আজো স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি ভেতরে যেত পারি না, বারান্দায় শুয়ে থাকি। আমার শেষ বুঝি বেশি দূরে নেই। আমার রাগ হচ্ছে, অন্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুমোচ্ছে, আমার প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই। আমি বন্যহংসের মূর্ছা যাওয়ার মতো আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি। তা কাউকে স্পর্শ করবে না জানি। আমার শব্দটি সহ্য হচ্ছে না। কত রাত হায়/নিদ্রাহীন/কেবল বুনো রাজহংসের ডাক। শেষাংশটা কবিতা।

এ পর্যন্তই?

না, আরো আছে। এভাবে আমাকে সময় পার করতে দেবেন না। আমি দরজা খুলবই এবং পশ্চিম আকাশের দিগন্ত রেখায় ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ দেখবই। এটা দূরবর্তী প্রশান্তির স্বচ্ছতা এনে দেবে। পৃথিবীর ওপরটা ধোঁয়াটে। সকালের ঘণ্টাধ্বনি এবং কাকের ডাক একসঙ্গে আসছে। এরকম মুহূর্ত অতীতে ছিল না ভবিষ্যতেও আসবে না। আমার মনে হচ্ছে আমার হাতার রঙ নতুন কিছু। কিছু ভাবনার সঙ্গে আরেকটি/হয়ত তাকিয়ে দেখছেন সকালের ফ্যাকাসে চাঁদ/মাসের দীর্ঘতম রাত/কোনো দৃশ্যই (এর চেয়ে) বেশি বেদনায়দায়ক নয়।

দরজায় আবার ধাক্কা। কে আবার আমার মতো রাত পার করে এসেছে। দ্রুত লিখলাম : আমার মতো সমমনা কেউ একজন আছে/তন্ময় হয়ে দেখে সকালের চাঁদ/কিন্তু তাঁকে খুঁজে বের করার পথ নেই।

ভাবলাম শেষের কবিতাটি পাঠিয়ে দেব। কিন্তু যখন শুনলাম তিনিই এসেছেন সবগুলোই দিয়ে দিলাম।

প্রতিক্রিয়া কি হলো?

তিনি এগুলো নিয়ে গিয়ে একসঙ্গে পাঁচ পাঁচটি কবিতা লিখে পাঠালেন।

তা হলে তো মিটেই গেল।

না, মিটলো না। সেসব আরেক দিন বলবো।

বিয়াল্লিশ.

মুরাসাকির মন খারাপ। তিনি যেন আর লিখতে পারছেন না। তিনি চিন্তিতও যে, আসলে কি তার লেখার শক্তি শেষ হয়ে গেছে? চারদিক থেকে প্রশংসা পেয়ে পেয়ে অবশ্য তার মনে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়েছিল। তা-ই কি লেখার ক্ষমতাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে? উপন্যাসের আঙ্গিক এবং পর্ব বা অধ্যায় ভাগ নিয়ে পর্যালোচনা করলেন। এক থেকে তেত্রিশ অধ্যায় পর্যন্ত প্রেম ও রোমান্স, চৌত্রিশ থেকে একচল্লিশে সাফল্য এবং ব্যর্থতা, বিয়াল্লিশ থেকে চুয়াল্লিশ পর্যন্ত ক্রান্তিকাল। মুরাসাকি এ জায়গায় আছেন। অধ্যায় বিয়াল্লিশ লিখবেন তিনি। রাত হচ্ছে। কলম চলছে না।

তার খুব কান্না পেলো। প্রশংসা আর স্বীকৃতিই কি তাকে শেষ করে দিল। একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা থেমে যাওয়ার চেয়ে তার জন্য বড় শাস্তি আর কিছু নেই। মুরাসাকি যেন সে শাস্তি পেয়ে কাঁদছেন। তার কন্যা দাইনি নো সানমি মায়ের পাশে এসে বসল। বলল, মা কী হয়েছে, কাঁদছো কেন? তার বয়স মাত্র নয় হবে হবে করছে। জগতের অনেক বিষয়ই বুঝতে বাকি।

মুরাসাকি বললেন, তেমন কিছু নয় মা, মনটা হঠাৎই খারাপ হলো।

তোমাকে দীর্ঘদিন কাঁদতে দেখিনি মা।

কাল আমরা একবার তোমার বাবার সমাধিতে যাবো।

বেশ তো। আমারও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, তোমার নানা ব্যস্ততা দেখে বলিনি।

হ্যাঁ মা, খুব ব্যস্ত ছিলাম। মনে হয় ব্যস্ততার সময় পার হয়ে এসেছি। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার বললেন, মনো নো এওয়্যার। দুঃখ ভোগেই জীবন সুন্দর।

এ কথার মর্মার্থ সানমি জানে না। জিজ্ঞেস করে এর অর্থ কি মা?

আমিও সঠিক জানি না, শুধু উপলব্ধি করি। গেঞ্জি মনোগাতারিতে বোধহয় কথাটা সহস্রবার ব্যবহার করেছি। মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গেই দুঃখ কষ্ট যেন চিরস্থায়ী হয়ে আছে। সেই তুলনায় সুখটা বড় ক্ষণস্থায়ী এবং তার মধ্যে ডুব দিতে, অস্তিত্বে টান পড়ে। জীবন দুঃখ কষ্টে ভরে ওঠে। যাক এসব বুঝবার বয়স তোমার এখনো হয়নি। এখন শুনে যাও।

সানমি চলে যাওয়ার পরও প্রচুর কাঁদলেন মুরাসাকি। কঠিন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এমন কেউ নেই যে তাকে সহায়তা করেন।

মুরাসাকি ভাবলেন কিছুদিন লেখাটা বন্ধ থাক। সময়টা কাটানোই সমস্যা হবে। প্রাসাদ জীবনটা তার পছন্দ হচ্ছে না। তাই লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাইছেন। বিরতির সময়টায় কবিতা পড়ে পড়ে সময় কাটাবেন। দরবারের ফাঁকে ফাঁকে মেয়েকে সময় দেবেন।

শেষরাতের দিকে তার ঘুম এল। ঘুমিয়ে তিনি একটা স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নটা স্বস্তির নয়। দেখলেন সম্রাজ্ঞী শোশি সন্তানসম্ভবা। সন্তান প্রসবের সময় তিনি মারা গেছেন। সেই শোকে সব লেডিরা কাঁদছেন। তিনিও তাদের সঙ্গে আছেন। তার আছে একটি বাড়তি যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি। সানমি ধাক্কা দিয়ে তার ঘুম ভাঙালো।

তিনি ঘেমে গেছেন। সানমি বলল, কী হয়েছে মা।

একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছিলাম। এখন ঘুমো।

মুরাসাকির আর ঘুম হলো না। আবারও মনে হলো মেনো নো এওয়্যার।

সৌভাগ্যবশত সেদিনই বাবা তামেতোকি ইচিঝেন থেকে আসেন। তিনি মুরাসাকির লেখার সুনাম দূর থেকেও শুনতে পেয়েছিলেন। মেয়ের জন্য গর্ব হচ্ছিল। তারও গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে। তার দাদার কালের গৌরব বুঝি আবার ফিরে এল। তখনো মুরাসাকির শেষের দিকে লেখাগুলো তার পাঠ করা হয়নি। এখন পড়ার সুযোগ হবে।

বাবাকে পেয়ে মুরাসাকির যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। বাবা বললেন, সব লেখকেরই এরকম হয়। মনে হয় তিনি শূন্য হয়ে গেছেন। আর একরত্তি দেবারও সামর্থ্য নেই তার। মরা কটালের মতো অবস্থা। আবার যেমন সমুদ্রে জোয়ার আসে ভরা কটালের মতো, তখন দুকূলকে পর্যন্ত প্লাবিত করে দেয়। প্রাকৃতিকভাবেই এসব হয়। শুধু তৈরি থাকতে হয় এই যা।

মুরাসাকি বললেন, কিছুতেই মন বসছে না। কী লিখব জানি না।

গভর্নর হলেও বাবা একজন কবি এবং স্বনামধন্য সাহিত্য সমালোচক, আকাদেমির সদস্য, বললেন, লেখা নিয়ে এখন ভাববারই দরকার নেই। দরবারে সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে প্রাত্যহিক কাজে মনোযোগ দাও। দেখবে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। লেখা, লেখার ভাবনা আপনিতেই এসে ধরা দেবে।

আমি বাবা পরিশ্রম করে লিখি।

সমস্যা নেই, তখন লেখকের সঙ্গে একজন শ্রমিকও এসে যোগ দেবে।

প্রথম যখন লিখতে শুরু করি পূর্ণিমার চাঁদ এসে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

চাঁদ তো এখনো আছে। অমাবস্যা কেটে গেলেই আবার উদয় হবে। কোনো না কোনোভাবে লেখাই তোমাকে খুঁজে দেবে।

বাবার কথায় মুরাসাকি হাসলেন।

কী বিশ্বাস হচ্ছে না?

বাবার ওপর মুরাসাকির আস্থা আছে। বললেন, হচ্ছে। বাবা বললেন, গল্প আর কবিতা পাঠে মনোনিবেশ কর।

মুরাসাকির মন হালকা হলো। তবে লেখার প্রতি কোনো উৎসাহ তৈরি হলো না। বাবা এলেন বলে স্বপ্নটা নিয়ে ভাবতে পারলেন না। এখন মনে হলো। সাথে সাথে মনে মনে প্রশ্ন জাগল, এরকম স্বপ্ন দেখবেন কেন? সম্রাজ্ঞী তেইশির কথা মনে হলো, মনে হলো লেডি চিকিৎসকের কথাও। সম্রাজ্ঞী তেইশির মঙ্গলটাই চাইলেন তিনি।

সম্রাজ্ঞী তেইশি সেবাকেন্দ্রে লেডি এবং চিকিৎসকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ভালোই আছেন। এখানে এসে তার আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। সম্রাট ইচিজো খোঁজখবর রাখছেন। তিনি আসলেই তেইশিকে বেশি ভালোবাসেন, সবটা দেখাতে পারেন না মিচিনাগার ভয়ে। মিচিনাগা তার জন্য ত্রাস। মামা হলেও আন্তরিকভাবে পছন্দ করেন না। তেইশিকে মিচিনাগা কন্যার শত্রু জ্ঞান করেন।

তিনিও নানা সুত্রের মাধ্যমে তেইশির খোঁজখবর রাখছেন। ভালো সংবাদ শুনে চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছেন। আবার গেলেন প্রাক্তন সম্রাট রেইঝেই এর প্রাসাদে।

রেইঝেই জানতেন মিচিনাগা আবার আসবেন। তাই মানসিক প্রস্তুতি তার ছিল এবং কী বলবেন তা আগেই ভেবে রেখেছেন। বললেন, আমি তোমার প্রস্তাব নিয়ে ভেবেছি। মনে হলো তোমার প্রস্তাব ঠিক আছে। সানজুই হবে পরবর্তী সম্রাট। সবই নিয়তি নির্ধারিত। বললেন না যে, তা আরো বিশ বছর আগে ঠিক হয়ে আছে। মিচিনাগা সাফল্যের হাসি হাসলেন।

রেইঝেই বললেন, আমি সম্মত হয়েছি সিংহাসনের প্রতি প্রিন্স সানজুর অধিকার আছে বলে। তবে শর্ত আছে।

কি শর্ত? কিছুটা চিন্তিত হলেন মিচিনাগা।

সানজুর পর ইচিঝোর সন্তান আবার সম্রাট হবে।

এরকম শর্ত কেন সান?

কারো অধিকারের প্রতি আমি অবিচার করতে পারি না। নিয়মমতো ইচিজোর জ্যেষ্ঠপুত্র হবে সিংহাসনের পরিবর্তী উত্তরাধিকারী।

তা হলে তো সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

সমস্যা মনে করলে সমস্যা। অবস্থার পরিবর্তনও তো হতে পারে।

কীরকম?

তা বাদ দাও, তোমার কী বলার আছে বল।

প্রধানমন্ত্রীর পদে আমিই থাকবো।

তা তো বুঝতেই পারছি। তাহলে সানজুকে ডাকাই?

ডাকাবো?

ডাকান।

প্রিন্স সানজু এলেন। সাবেক সম্রাট রেইঝেই সবই তাকে খুলে বললেন।

প্রিন্স সানজুর তা ছিল কল্পনারও বাইরে। বললেন, সম্রাটের পুত্র রয়েছে অতসুইয়াসু।

রেইঝেই বললেন, তোমার পর সে সম্রাট হবে। তোমার পুত্র হবে তার পর।

এসব কথা কি লিখিত থাকবে?

তার প্রয়োজন কী? বললেন মিচিনাগা।

কথাটা শক্ত হয় অঙ্গীকারনামা থাকলে।

রেইঝেই বললেন, মুখের কথারও দাম আছে। এটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।

মিচিনাগা বললেন, আরো কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে কথা বলতে হবে।

তা ঠিক আছে। কি কি বিষয়ে কথা বলতে চাও ভেবে নাও। সানজুও ভাবনা-চিন্তা করুক। তারপর আমরা একদিন বসবো।

এটাই ভালো হবে। মিচিনাগার কথায় তেমন জোর নেই। মনে হচ্ছে তিনি চিন্তিত। ক্রমশ...

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : চব্বিশ

শিকিবু

আবুল কাসেম

রোববার, ২১ নভেম্বর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

একচল্লিশ.

সেই শোনাগন চারদিকে মুরাসাকির সুনাম ছড়িয়ে পড়ার কথা শুনে বেশ মন খারাপ করে আছেন। তার নিজের লেখায়ও মন বসছে না। সন্তানসম্ভবা সম্রাজ্ঞী তেইশিরও কোনো সংবাদ নেননি আজ।

তেইশি হেইয়ান প্রাসাদে থাকা নিরাপদ মনে করছেন না। আগুনভীতি সম্রাট প্রাসাদের এক নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। আগুন লেগে কাঁঠের দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ কয়েকবারই পুড়ে গেছে। এ ছাড়া যোগ হয়েছে সম্রাজ্ঞী শোশির পিতা মিচিনাগা-ভীতি। সম্রাজ্ঞী বাকি দিনগুলো চুগুশিকি অংশে অধিকতর নিরাপদে থাকার লক্ষ্যে সেখানে গমনের সিদ্ধান্ত নেন। চুগুশিকি মূলত সম্রাজ্ঞীর সেবাকেন্দ্র। চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া হয়েছে। সেই শোনাগনের সঙ্গে প্রাথমিক কথা হয়েছে, সম্রাজ্ঞী আবারও তাঁর সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে চান।

তিনি ডেকে পাঠালেন শোনগনকে। শোনগন তাঁর মন খারাপের প্রকৃত কারণ বলতে চান না। তাই তার লেখা পুরোনো প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন, মহামান্যা, আমি আজও ভুলতে পারি না সে সব দুঃসময়ের স্মৃতি যখন আপনার বাবা মারা গেলেন। মিচিনাগা তার কন্যাকে সম্রাজ্ঞী করে আপনার হৃদয়কে ভাগ করে দিলেন। কোথাও কোনো ইতিহাসে কি দুই সম্রাজ্ঞীর কথা জানা যায়? যায় না। এখানে তাই ঘটলো। আপনার ভাইসহ শুভার্র্শীদের তাড়িয়ে দেয়া হলো। কী মর্মান্তিক। এসব তো আমি লিখেছি।

দুঃসময়ের কথা লিখে রেখে ভালোই করেছে।

লেডি-চিকিৎসক বললেন, দুঃসময়ের কথা নয় মহামান্যা আপনাকে শুনতে হবে এখন সব আনন্দের কথা। রোমন্থন করতে হবে সুন্দর সুন্দর দিনের স্মৃতি। তাহলে সন্তান সুন্দর মন মানসিকতা নিয়ে জন্মাবে।

শোনাগন বললেন তা ঠিক। তা হলে আমরা সেবা কেন্দ্রেই যাচ্ছি।

সম্রাজ্ঞী তেইশি বললেন, জরুরিভাবে যাওয়া উচিত। বৈরী পরিবেশে মানসিক দুশ্চিন্তা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাও তো সন্তানের জন্য ভালো নয়।

ঠিক বলছেন মহামান্যা। বললেন লেডি চিকিৎসক। এসব স্থানচ্যুতি এবং পরিবর্তন শোনাগনের ভালো লাগে না। মানসিক স্থিরতা নষ্ট হয়। লেখার ক্ষতি হয়। তবু তাকে তা মেনে নিতে হয়। সম্রাজ্ঞী প্রাসাদ পরিবর্তন করলে লেডিদেরও দপ্তর সরাতে হয়।

নিজ দপ্তরে ফিরে শোনাগন মুরাসাকির লেখার শেষ অংশটি নিয়ে বসলেন চুপি চুপি। অন্য লেডিরা যাতে না জানতে পারেন, তাই এবং সাবধানতা।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

এক ধরনের উন্নাসিকতা নিয়ে স্ক্রলটা খুলেছিলেন। পড়তে পড়তে নিজেও অভিভূত হলেন। মুরাসাকি তাঁর চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট। তিনি প্রকাশ্যে তাঁর লেখার প্রশংসা করতে পারতেন। তাহলেই তা শোভন হতো। অনুপ্রেরণা দিয়ে নিজের বড়ত্ব বজায় রাখতে পারতেন। তিনি কিনা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেন। এসব ভেবে নিজেই কেমন যেন অনুতপ্ত বোধ করলেন। কিন্তু এ পর্যন্তই। মেয়েলি ঈর্ষা আবার তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। স্ক্রলটা ছুড়ে ফেলে দিলেন। না, যে অবস্থা চলছে, তা-ই চলতে থাকবে, পরাজিত হওয়া চলবে না। কোনো প্রশংসা নয়। একে নিজের দরবারের লেডিরা তো বটেই, অন্যেরাও দুর্বলতা এবং আপোসকামিতা মনে করবে।

প্রাসাদ পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে, গোছগাছ করতে দাসীদের নির্দেশ দিলেন। এক দাসী গোছাতে গোছাতে বলল, লেডি তাকাকুর দপ্তরে লেডি সেনশি ফুল নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তো সম্রাজ্ঞী ছাড়া অন্য কারো দপ্তরে যান না।

তোকে এ কথা কে বলল?

অমা একথা তো সবাই জানে।

যত আকথা। যা কাজ করা।

দাসীকে একথা বললেও ভেতরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে তাঁর, তা হলে এত দূর। রাতে খুব একটা ঘুম হল না। ঈর্ষা এমন এক জিনিস যা খুব জ্বালায়। জ্বালাতেই থাকে। এখানে আলাদা কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হয় না।

ইঝোমি সে দিন মুরাসাকির কাছ থেকে ইমনের দপ্তরে যান এবং সেখানেই রাত্রিযাপন করেন। সারারাত গল্প করেন। ইমনের মতো ধৈর্যশীল ভালো শ্রোতা বুঝি আর জগতে নেই।

আজ ইমনের সেসব কথা মনে করে হাসি পাচ্ছে। ইঝোমি বলছিলেন অতসুমিচির গল্প, যাকে বাগে আনা সতিই কঠিন। কতটা প্রাণপণ চেষ্টা এবং কসরত করতে হচ্ছে তাঁকে।

ইঝোমি তাকে বলেছিলেন, কেন যেন ব্যাটেবলে হচ্ছে না।

কি রকম?

একদিন প্রিন্স লিখলেন, ‘দুঃখ নিয়ে শরতের আকাশের দিকে চেয়ে আছি/ মেঘগুলো লণ্ডভণ্ড/বাতাস প্রচণ্ড।’

তুমি কি লিখলে?

শরতের ভদ্রবাতাস আমাকে দুঃখিত করে তুলেছে/হায় ঝড়ের দিন/তা বলার ভাষা আমার জানা নাই’।

প্রিন্স ভেবেছিলেন আমি তার প্রকৃত মনোভাব বুঝতে পারব।

তা হলে হলোটা কি?

আবার সেই অদৃশ্য অবস্থা। তার কোনো খবর নেই।

ভারী মজার তো ব্যাপারটা।

কিন্তু আমি তাকে বাগে আনবই। কেউ আমাকে ভোগাতে পারেনি, আমিই নিয়ন্ত্রণ করেছি এবং করব।

তারপর কি হলো?

তিনি সংবাদ না দিয়ে এক রাতে এলেন। দরজায় টোকা দিলেন।

জানি না কে এসেছে। কাজের মেয়েটা ঘুমোচ্ছে অঘোরে। কাজের পুরুষলোকটিকে ডেকে পাঠালাম। সে এসে বলল, দরজায় তো কেউ নেই। আমি বললাম, তুমি যেত দেরি করেছ। সারা রাত অস্থির হয়ে রইলাম। ঘুম হলো না। ওহ্, অশান্তির লোকজন। সকাল সকাল উঠলাম। আকাশটা হালকা মেঘে ঢাকা। অন্ধকার চারদিক। যখন সকাল হল লক্ষ্যহীনভাবে ভাবছি অস্থিরতাটা কমে এসেছে। তখন একটা পত্র পেলাম। একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন তিনি : শরতের রাতে/ফ্যাকাসে সকালের চাঁদ অস্তগামী/বন্ধ দরজা থেকে আমি ফিরে চলে এলাম।

আপনি হাসছেন? তিনি আমাকে কী ভাববেন বলুন, নিশ্চয়ই একটা হতাশ করা মহিলা।

তুমি কি লিখলে?

বিশাল একটি চিঠি। তাতে ছিল টোকা, পদ্য কবিতা এবং গদ্যে প্রভাতের দৃশ্য বর্ণনা- যার সঙ্গে আমার জীবনের দুঃখ হতাশার মিল আছে।

টোকায় কি ছিল?

বাতাসের শব্দ : প্রচণ্ড বাতাস, ডালের শেষ পাতাটিও যেন উড়িয়ে নেবে, তেমনি প্রতিজ্ঞা তার। তাতে মেঘের সৃষ্টি এবং ভয় প্রদর্শ, বৃষ্টির ফোটা কিছু কিছু। আমি আশাহীনভাবে নির্জন।

কবিতাটি?

একটি :

শরৎ শেষ হবার আগেই/আমার হাতা অশ্রুতে পচে যাবে/ধীরগতির বৃষ্টিও তারছে বেশি কিছু করতে পারবে না।

গদ্যে কি লিখলে?

আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি কেউ তা নিয়ে কিছু বলছে না। গাছের পাতা এবং বৃক্ষরাজি দিন দিন পরিবর্তিত হয়। এই-ই তার স্নেহ? প্রত্যাশায় আমি দীর্ঘ শীতে বৃষ্টিপাতের উদ্বেগ অনুভব করি। পাতাগুলোকে বাতাস সকরুণভাবে জ্বালাতন করছে। পাতাগুলোর ওপর থাকা ফোটা ফোঁটা বৃষ্টি যে কোনো মুহূর্তে বিলীন হতে পারে, আমার জীবনের মতো। পত্রগুলো আমার নিজের দুঃখের কথা আমাকে আজো স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি ভেতরে যেত পারি না, বারান্দায় শুয়ে থাকি। আমার শেষ বুঝি বেশি দূরে নেই। আমার রাগ হচ্ছে, অন্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুমোচ্ছে, আমার প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই। আমি বন্যহংসের মূর্ছা যাওয়ার মতো আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি। তা কাউকে স্পর্শ করবে না জানি। আমার শব্দটি সহ্য হচ্ছে না। কত রাত হায়/নিদ্রাহীন/কেবল বুনো রাজহংসের ডাক। শেষাংশটা কবিতা।

এ পর্যন্তই?

না, আরো আছে। এভাবে আমাকে সময় পার করতে দেবেন না। আমি দরজা খুলবই এবং পশ্চিম আকাশের দিগন্ত রেখায় ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ দেখবই। এটা দূরবর্তী প্রশান্তির স্বচ্ছতা এনে দেবে। পৃথিবীর ওপরটা ধোঁয়াটে। সকালের ঘণ্টাধ্বনি এবং কাকের ডাক একসঙ্গে আসছে। এরকম মুহূর্ত অতীতে ছিল না ভবিষ্যতেও আসবে না। আমার মনে হচ্ছে আমার হাতার রঙ নতুন কিছু। কিছু ভাবনার সঙ্গে আরেকটি/হয়ত তাকিয়ে দেখছেন সকালের ফ্যাকাসে চাঁদ/মাসের দীর্ঘতম রাত/কোনো দৃশ্যই (এর চেয়ে) বেশি বেদনায়দায়ক নয়।

দরজায় আবার ধাক্কা। কে আবার আমার মতো রাত পার করে এসেছে। দ্রুত লিখলাম : আমার মতো সমমনা কেউ একজন আছে/তন্ময় হয়ে দেখে সকালের চাঁদ/কিন্তু তাঁকে খুঁজে বের করার পথ নেই।

ভাবলাম শেষের কবিতাটি পাঠিয়ে দেব। কিন্তু যখন শুনলাম তিনিই এসেছেন সবগুলোই দিয়ে দিলাম।

প্রতিক্রিয়া কি হলো?

তিনি এগুলো নিয়ে গিয়ে একসঙ্গে পাঁচ পাঁচটি কবিতা লিখে পাঠালেন।

তা হলে তো মিটেই গেল।

না, মিটলো না। সেসব আরেক দিন বলবো।

বিয়াল্লিশ.

মুরাসাকির মন খারাপ। তিনি যেন আর লিখতে পারছেন না। তিনি চিন্তিতও যে, আসলে কি তার লেখার শক্তি শেষ হয়ে গেছে? চারদিক থেকে প্রশংসা পেয়ে পেয়ে অবশ্য তার মনে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়েছিল। তা-ই কি লেখার ক্ষমতাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে? উপন্যাসের আঙ্গিক এবং পর্ব বা অধ্যায় ভাগ নিয়ে পর্যালোচনা করলেন। এক থেকে তেত্রিশ অধ্যায় পর্যন্ত প্রেম ও রোমান্স, চৌত্রিশ থেকে একচল্লিশে সাফল্য এবং ব্যর্থতা, বিয়াল্লিশ থেকে চুয়াল্লিশ পর্যন্ত ক্রান্তিকাল। মুরাসাকি এ জায়গায় আছেন। অধ্যায় বিয়াল্লিশ লিখবেন তিনি। রাত হচ্ছে। কলম চলছে না।

তার খুব কান্না পেলো। প্রশংসা আর স্বীকৃতিই কি তাকে শেষ করে দিল। একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা থেমে যাওয়ার চেয়ে তার জন্য বড় শাস্তি আর কিছু নেই। মুরাসাকি যেন সে শাস্তি পেয়ে কাঁদছেন। তার কন্যা দাইনি নো সানমি মায়ের পাশে এসে বসল। বলল, মা কী হয়েছে, কাঁদছো কেন? তার বয়স মাত্র নয় হবে হবে করছে। জগতের অনেক বিষয়ই বুঝতে বাকি।

মুরাসাকি বললেন, তেমন কিছু নয় মা, মনটা হঠাৎই খারাপ হলো।

তোমাকে দীর্ঘদিন কাঁদতে দেখিনি মা।

কাল আমরা একবার তোমার বাবার সমাধিতে যাবো।

বেশ তো। আমারও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, তোমার নানা ব্যস্ততা দেখে বলিনি।

হ্যাঁ মা, খুব ব্যস্ত ছিলাম। মনে হয় ব্যস্ততার সময় পার হয়ে এসেছি। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার বললেন, মনো নো এওয়্যার। দুঃখ ভোগেই জীবন সুন্দর।

এ কথার মর্মার্থ সানমি জানে না। জিজ্ঞেস করে এর অর্থ কি মা?

আমিও সঠিক জানি না, শুধু উপলব্ধি করি। গেঞ্জি মনোগাতারিতে বোধহয় কথাটা সহস্রবার ব্যবহার করেছি। মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গেই দুঃখ কষ্ট যেন চিরস্থায়ী হয়ে আছে। সেই তুলনায় সুখটা বড় ক্ষণস্থায়ী এবং তার মধ্যে ডুব দিতে, অস্তিত্বে টান পড়ে। জীবন দুঃখ কষ্টে ভরে ওঠে। যাক এসব বুঝবার বয়স তোমার এখনো হয়নি। এখন শুনে যাও।

সানমি চলে যাওয়ার পরও প্রচুর কাঁদলেন মুরাসাকি। কঠিন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এমন কেউ নেই যে তাকে সহায়তা করেন।

মুরাসাকি ভাবলেন কিছুদিন লেখাটা বন্ধ থাক। সময়টা কাটানোই সমস্যা হবে। প্রাসাদ জীবনটা তার পছন্দ হচ্ছে না। তাই লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাইছেন। বিরতির সময়টায় কবিতা পড়ে পড়ে সময় কাটাবেন। দরবারের ফাঁকে ফাঁকে মেয়েকে সময় দেবেন।

শেষরাতের দিকে তার ঘুম এল। ঘুমিয়ে তিনি একটা স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নটা স্বস্তির নয়। দেখলেন সম্রাজ্ঞী শোশি সন্তানসম্ভবা। সন্তান প্রসবের সময় তিনি মারা গেছেন। সেই শোকে সব লেডিরা কাঁদছেন। তিনিও তাদের সঙ্গে আছেন। তার আছে একটি বাড়তি যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি। সানমি ধাক্কা দিয়ে তার ঘুম ভাঙালো।

তিনি ঘেমে গেছেন। সানমি বলল, কী হয়েছে মা।

একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছিলাম। এখন ঘুমো।

মুরাসাকির আর ঘুম হলো না। আবারও মনে হলো মেনো নো এওয়্যার।

সৌভাগ্যবশত সেদিনই বাবা তামেতোকি ইচিঝেন থেকে আসেন। তিনি মুরাসাকির লেখার সুনাম দূর থেকেও শুনতে পেয়েছিলেন। মেয়ের জন্য গর্ব হচ্ছিল। তারও গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে। তার দাদার কালের গৌরব বুঝি আবার ফিরে এল। তখনো মুরাসাকির শেষের দিকে লেখাগুলো তার পাঠ করা হয়নি। এখন পড়ার সুযোগ হবে।

বাবাকে পেয়ে মুরাসাকির যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। বাবা বললেন, সব লেখকেরই এরকম হয়। মনে হয় তিনি শূন্য হয়ে গেছেন। আর একরত্তি দেবারও সামর্থ্য নেই তার। মরা কটালের মতো অবস্থা। আবার যেমন সমুদ্রে জোয়ার আসে ভরা কটালের মতো, তখন দুকূলকে পর্যন্ত প্লাবিত করে দেয়। প্রাকৃতিকভাবেই এসব হয়। শুধু তৈরি থাকতে হয় এই যা।

মুরাসাকি বললেন, কিছুতেই মন বসছে না। কী লিখব জানি না।

গভর্নর হলেও বাবা একজন কবি এবং স্বনামধন্য সাহিত্য সমালোচক, আকাদেমির সদস্য, বললেন, লেখা নিয়ে এখন ভাববারই দরকার নেই। দরবারে সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে প্রাত্যহিক কাজে মনোযোগ দাও। দেখবে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। লেখা, লেখার ভাবনা আপনিতেই এসে ধরা দেবে।

আমি বাবা পরিশ্রম করে লিখি।

সমস্যা নেই, তখন লেখকের সঙ্গে একজন শ্রমিকও এসে যোগ দেবে।

প্রথম যখন লিখতে শুরু করি পূর্ণিমার চাঁদ এসে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

চাঁদ তো এখনো আছে। অমাবস্যা কেটে গেলেই আবার উদয় হবে। কোনো না কোনোভাবে লেখাই তোমাকে খুঁজে দেবে।

বাবার কথায় মুরাসাকি হাসলেন।

কী বিশ্বাস হচ্ছে না?

বাবার ওপর মুরাসাকির আস্থা আছে। বললেন, হচ্ছে। বাবা বললেন, গল্প আর কবিতা পাঠে মনোনিবেশ কর।

মুরাসাকির মন হালকা হলো। তবে লেখার প্রতি কোনো উৎসাহ তৈরি হলো না। বাবা এলেন বলে স্বপ্নটা নিয়ে ভাবতে পারলেন না। এখন মনে হলো। সাথে সাথে মনে মনে প্রশ্ন জাগল, এরকম স্বপ্ন দেখবেন কেন? সম্রাজ্ঞী তেইশির কথা মনে হলো, মনে হলো লেডি চিকিৎসকের কথাও। সম্রাজ্ঞী তেইশির মঙ্গলটাই চাইলেন তিনি।

সম্রাজ্ঞী তেইশি সেবাকেন্দ্রে লেডি এবং চিকিৎসকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ভালোই আছেন। এখানে এসে তার আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। সম্রাট ইচিজো খোঁজখবর রাখছেন। তিনি আসলেই তেইশিকে বেশি ভালোবাসেন, সবটা দেখাতে পারেন না মিচিনাগার ভয়ে। মিচিনাগা তার জন্য ত্রাস। মামা হলেও আন্তরিকভাবে পছন্দ করেন না। তেইশিকে মিচিনাগা কন্যার শত্রু জ্ঞান করেন।

তিনিও নানা সুত্রের মাধ্যমে তেইশির খোঁজখবর রাখছেন। ভালো সংবাদ শুনে চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছেন। আবার গেলেন প্রাক্তন সম্রাট রেইঝেই এর প্রাসাদে।

রেইঝেই জানতেন মিচিনাগা আবার আসবেন। তাই মানসিক প্রস্তুতি তার ছিল এবং কী বলবেন তা আগেই ভেবে রেখেছেন। বললেন, আমি তোমার প্রস্তাব নিয়ে ভেবেছি। মনে হলো তোমার প্রস্তাব ঠিক আছে। সানজুই হবে পরবর্তী সম্রাট। সবই নিয়তি নির্ধারিত। বললেন না যে, তা আরো বিশ বছর আগে ঠিক হয়ে আছে। মিচিনাগা সাফল্যের হাসি হাসলেন।

রেইঝেই বললেন, আমি সম্মত হয়েছি সিংহাসনের প্রতি প্রিন্স সানজুর অধিকার আছে বলে। তবে শর্ত আছে।

কি শর্ত? কিছুটা চিন্তিত হলেন মিচিনাগা।

সানজুর পর ইচিঝোর সন্তান আবার সম্রাট হবে।

এরকম শর্ত কেন সান?

কারো অধিকারের প্রতি আমি অবিচার করতে পারি না। নিয়মমতো ইচিজোর জ্যেষ্ঠপুত্র হবে সিংহাসনের পরিবর্তী উত্তরাধিকারী।

তা হলে তো সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

সমস্যা মনে করলে সমস্যা। অবস্থার পরিবর্তনও তো হতে পারে।

কীরকম?

তা বাদ দাও, তোমার কী বলার আছে বল।

প্রধানমন্ত্রীর পদে আমিই থাকবো।

তা তো বুঝতেই পারছি। তাহলে সানজুকে ডাকাই?

ডাকাবো?

ডাকান।

প্রিন্স সানজু এলেন। সাবেক সম্রাট রেইঝেই সবই তাকে খুলে বললেন।

প্রিন্স সানজুর তা ছিল কল্পনারও বাইরে। বললেন, সম্রাটের পুত্র রয়েছে অতসুইয়াসু।

রেইঝেই বললেন, তোমার পর সে সম্রাট হবে। তোমার পুত্র হবে তার পর।

এসব কথা কি লিখিত থাকবে?

তার প্রয়োজন কী? বললেন মিচিনাগা।

কথাটা শক্ত হয় অঙ্গীকারনামা থাকলে।

রেইঝেই বললেন, মুখের কথারও দাম আছে। এটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।

মিচিনাগা বললেন, আরো কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে কথা বলতে হবে।

তা ঠিক আছে। কি কি বিষয়ে কথা বলতে চাও ভেবে নাও। সানজুও ভাবনা-চিন্তা করুক। তারপর আমরা একদিন বসবো।

এটাই ভালো হবে। মিচিনাগার কথায় তেমন জোর নেই। মনে হচ্ছে তিনি চিন্তিত। ক্রমশ...

back to top