alt

সাময়িকী

২০২১ সালের নোবেল বিজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহর গল্প

আগন্তুকের গল্প

অনুবাদ : ফজল হাসান

: শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

আমি উড়োজাহাজে চড়ে এসেছি। কথাটা হয়তো এভাবে বলা শ্রুতিমধুর নয়- তাহলে অন্য কোন উপায়ে? কিছু মানুষ হেঁটেছে। অনেকে ডুবে গেছে। ওরা সবাই ছিল বেপরোয়া। আমি মরিয়া ছিলাম না, কিন্তু আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। কেননা আমি কিছু মানুষকে রাগান্বিত করেছিলাম। আমার অপরাধ ছিল আমি আমার বোরবারের স্কুলের মেয়েদেরকে বলেছিলাম ওরা যেন খতনা করতে রাজি না হয়। আমার বোরবারের স্কুলে শুধু লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমি ভালো কথা বলার সুযোগ পেলে বলে ফেলি। আমি ওদেরকে বলেছিলাম যে, খতনা হলো যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ এবং বর্বর ও পশ্চাৎপদ প্রচলন। পুরুষরা মহিলাদের কাজটি করতে বাধ্য করে, যাতে তারা জানতে পারে যে মহিলারা মূল্যহীন। আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের কষ্ট দেওয়া এবং তাদের অথর্ব করা এবং এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা। যেদিন মেয়েদের রাজি হওয়ার কথা ছিল, সেদিন ছয়জন মেয়ে প্রত্যাখান করেছে। সেখানে আমি ছিলাম না, কিন্তু ঘটনা বুঝতে পেরেছি সেদিন রাতে যখন আমার বাড়ির সম্মুখে উত্তেজিত মানুষের কোলাহলে মুখরিত ছিল। তারা আমাকে ঘর থেকে বেরোতে বলেছিল এবং তাদের মেয়েদের বুদ্ধি দেওয়ার জন্য দৈহিক শাস্তি দিতে চেয়েছিল। জায়গাটি ছিল মুসলমান দেশের মুসলমান অধ্যুষিত গ্রাম এবং আমি সেই গ্রামের বাসিন্দা ছিলাম। আমি একজন খ্রিস্টান, এখন যে কিনা তাদের মেয়েদের বুদ্ধি দেওয়ার জন্য দোষী। আমার আতঙ্কের পরিমাণ আপনারা অনুমান করতে পারছেন।

বাইরে যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এসেছিল এবং উত্তেজিত জনগণ চলে গিয়েছিল, হয়তো তারা লোক সংখ্যা বাড়ানো কিংবা তাদের সাহায্য করার জন্য অন্যদের ডেকে আনতে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে আমি অন্ধকারের মধ্যে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম এবং নিরাপত্তার জন্য পাশের এক গ্রামে চলে যাই। পরদিন আমি শুনেছি যে, উত্তেজিত লোকজন সে রাতেই আমার ঘরে অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরও তারা আমাকে খুঁজছিল এবং আমাকে নিয়ে খারাপ কথা বলছিল। সুতরাং শহরের যেই বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতাম, আমি দ্রুত সেই অফিসে পালিয়ে যাই। অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন একজন ইংরেজ এবং তার নাম ছিল বার্নার্ড। তিনি আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তিনি আমার জন্য একটা পথ খুঁজে বের করবেন এবং এ বিষয় নিয়ে আমি যেন কোনো দুশ্চিন্তা না করি। তিনি আরও বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম আসলে আমি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাবো। কয়েকদিন পরে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, যারা আমার ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে, তারা আমার খোঁজে অফিসে গিয়েছিল এবং বলেছে আমার সঙ্গে তাদের কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে। তিনি আমাকে পুলিশের কাছে যেতে বলেছিলেন, যা শোনার পরে আমার হাসি পেয়েছিল। আমি হাসতে চাইনি, কিন্তু অবলীলায় চলে এসেছিল। আমি বার্নার্ডকে বলেছি যে, প্রথমেই পুলিশ আমাকে মারধর করবে এবং তারপর বাকি কাজ সমাপ্ত করার জন্য তারা তাদের সুহৃদদের হাতে তুলে দেবে। সুতরাং তখন আমার সামনে লুকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। কেননা সেই লোকজন ছিল ভীষণ ভয়ঙ্কর, বিপজ্জনক। আমার খোঁজে তারা বেশ কয়েকবার অফিসে গিয়েছিল। অবশেষে একদিন বার্নার্ড আমাকে ব্রিটেনে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশটি খ্রিস্টানদের এবং তুমি একজন খ্রিস্টান কর্মচারী। তুমি খ্রিস্টানদের জন্য কাজ করতে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছো। তিনি জানতেন আমাকে আশ্রয় দেওয়া হবে, তিনি তাই বলেছিলেন। বার্নার্ড নিজেই তার দেশে ফিরে যাচ্ছেন এবং তিনি আমাকে তার লন্ডনের টেলিফোন নম্বর দিয়েছিলেন, যদি কখনও তাকে আমার প্রয়োজন হয়।

আমি ভাড়ার জন্য টাকা কেমন করে যোগাড় করবো? বন্ধুরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন আমার পরিবারকে দেখাশোনা করার প্রতিজ্ঞা করেছিল। তারা সবাই দেখতে পেয়েছিল যে, আমার জীবন বিপদের সম্মুখিন এবং এ নিয়ে তারা আলাপ-আলোচনা করেছে যতক্ষণ না পর্যন্ত লন্ডনে যাওয়ার জন্য এয়ার মরক্কোর ভাড়ার টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। বন্ধু-বান্ধবরা মিলে সব ব্যবস্থা করেছিল। সুতরাং আমি উড়োজাহাজে চড়ে এসেছি, যা ইতোমধ্যে আপনাদের বলেছি। আমি ডান-বাম কোনো কিছু না চিনে লন্ডনে পৌঁছেছি এবং বিশাল খোলা জায়গা আর রাস্তায় ব্যস্ত মানুষের ঢল দেখে রীতিমতো ভ্যাকাচ্যাকা খেয়েছি। কিন্তু মানসিকভাবে শক্ত থাকার জন্য আমি নিজের সঙ্গে কথা বলেছি যে, আমি সাহসী একটা কিছু করছি। আমি আসার আগে আমার জন্য স্যুট বানিয়েছিলাম এবং তা পরিধান করেছি। এখনও আমার কাছে সেই স্যুট আছে এবং আমি বিশেষ অনুষ্ঠানে পড়ি। তাই আমি নিজেকে বলেছিলাম যে, আমাকে ভালো দেখাচ্ছে। আমাকে পূরণ করার জন্য কয়েকটা ফর্ম দিয়েছিল এবং আমি আমার জীবন বাঁচাতে যা প্রয়োজন, তাই লিখেছি। আমাকে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আমি জানি না কীভাবে? আমি দ্বিধান্বিত ছিলাম এবং ডান-বাম কিছু জানতাম না। কিন্তু আমি কোনো রকমে বললাম কী দরকার ছিল, কারণ আমি জানতাম ওরা আমাকে ফিরিয়ে দেবে না। প্রতিকূল কাজ করার জন্য আমাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। তারপরও আমি জানতাম যে, লন্ডন আমাকে বঞ্চিত করবে না।

বার্নার্ড আমাকে যে টেলিফোন নম্বর দিয়েছিল, আমি সে নম্বরে ফোন করেছি এবং তিনি আমার ফোন পেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছেন আমি তার ওখানে যেতে পারবো না এবং তার সঙ্গে থাকাও সম্ভব নয়। তার স্ত্রী মানা করেছেন। তিনি বলেছেন আমি থিতু হওয়ার পরে কোনো একসময় আমরা হয়তো অন্য কোনো জায়গায় দেখা করে কফি খেতে পারি। পরবর্তীতে কী করবো, তা না জেনে আমি বিমানবন্দরে বসে ছিলাম। তারপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমার দিকে এগিয়ে এসেছিল এবং আমাকে উপরের তলায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সে বলেছিল যে, উপরের তলার জায়গা গরম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি ঠিক আছে কি না, যদি আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম যে, আমার থাকার কোনো জায়গা নেই এবং আমার কাছে অল্প পরিমাণে অর্থকড়ি আছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তিনি আমাকে একজন সম্মানিত ভদ্রলোক ভেবেছেন এবং আমি যদি তাকে তাই বলতাম, তাহলে তিনি হয়তো মনে করতেন যে, আমি শুধু একজন আফ্রিকান হিং¯্র যুবক। সুতরাং তার কাছে কোনো সাহায্য না চেয়ে আমি উপরের তলায় চলে যাই।

আমি বাড়ি থেকে একজন বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। সে কোলচেস্টারে বাস করতো। তাকে বলেছিলাম, আমি লন্ডনে আছি।

খুবই ভালো খবর, সে বলেছিল।

তোমাকে দেখতে আসছি, আমি বলেছিলাম।

অপূর্ব, সে বলেছিল।

আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই, আমি আমার বন্ধুকে বলেছিলাম। সে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে আমার কাছে টাকা পাঠিয়েছিল। আমি সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধু এবং তার পরিবারের সঙ্গে কোলচেস্টারে ছিলাম। বন্ধু আমার ধোপদুরস্ত স্যুট দেখে মশকরা করেছিল এবং অনেকদিন পর পুনরায় দেখা হওয়ার জন্য আমরা হাসি-তামাশায় মশগুল ছিলাম। কিন্তু আমার জন্য যেসব খাবার তার স্ত্রী রান্না করেছিল, আমি তা আনন্দের সঙ্গে খাওয়ার পরও বন্ধু আমাকে বলেছে যে, আমি তাদের সঙ্গে থাকতে পারবো না। ইতোমধ্যে আমি তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমার বন্ধু, তার স্ত্রী এবং বাচ্চা বয়সী তিন সন্তান নিয়ে দুই কক্ষের একটা ছোট ফ্ল্যাটে বাস করে। তাদের বাড়িতে সব কিছু দেখার পর আমার মনে হয়েছে যে, তাদের জীবন সংগ্রামের।

আমার বন্ধু বলেছে, এখন আমি যেহেতু এসে পড়েছি, তাই হোম অফিসে গিয়ে আমার আশ্রয় চাওয়া উচিত। সে আমাকে যাতায়াত খরচ দিয়েছিল এবং পরদিন আমি ক্রয়ডন গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, লুনার হাউজ। না, আমি ভয় পাইনি, হয়তো সামান্য দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কেননা আমি হারিয়ে যেতে চাইনি এবং নিজেকে বোকা বানাতেও চাইনি। লুনার হাউজে একজন মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং আমার সম্পর্কে সমস্ত তথ্য লিখে রেখেছেন। তাকে বলেছি যে, আমার দেশে আমি নারী যৌনাঙ্গ অঙ্গচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার প্রচারক ছিলাম এবং তার জন্য আমার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল।

হ্যাঁ, মহিলা বললেন, আমি আপনার জন্য প্রাথমিকভাবে জরুরি আবাসনের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আপনি ওখানে বসুন এবং অপেক্ষা করুন।

দিনের শেষে সেখানে আমরা ছয়জন অপেক্ষা করছিলাম এবং আমাদের সবাইকে একটা ভ্যান গাড়িতে তুলে ব্যারি হাউজে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমরা সর্বমোট বারোজন ছিলাম এবং আমরা চাইলে বাইরে যেতে পারতাম। আমি বেশিরভাগ সময় রাস্তার একদিক থেকে অন্যদিকে পায়ে হেঁটে যেতাম এবং ফিরে আসতাম। কেউ যদি আমার দিকে তাকাতো, তাহলে আমি চোখেমুখে হাসি ফুটিয়ে তাদের দেশে আমাকে স্বাগতম জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতাম। সেখানে আমি পাঁচ দিন ছিলাম। আমরা একজন আরেকজনকে বিপদ এবং মরণের হাত থেকে পালানোর গল্প বলেছি। তারপর আমাদের মধ্যে তিনজনকে নিউক্যাসেলের একটা বাড়িতে পাঠিয়েছিল। সেখানে আমরা এক মাস ছিলাম। পরবর্তীতে আমাকে গ্লাসগোর একটা ফ্ল্যাটে থাকতে দেওয়া হয়েছিল এবং সঙ্গে তিন সপ্তাহের খরচপাতিও দিয়েছিল। সেই পুরোটা সময় আমি সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করেছি, যেন আমি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার কথা বিশদভাবে বলতে পারি। আমার সাক্ষাৎকারের জন্য আমি উদ্গ্রীব ছিলাম। আমি জানতাম, এদেশে আসার কারণ শুনলে কর্মকর্তা বুঝবেন এবং সমবেদনা জানাবেন।

গ্লাসগোর এক দোকানে একজন নাইজেরিয়ানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল এবং সে আমাকে গির্জায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। গির্জায় উপস্থিত সবাই আফ্রিকান, এমনকি যাজকও। আচার-অনুষ্ঠানের পরে আমাদের আফ্রিকার খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল, যা সমাবেশের লোকজন তৈরি করেছিল। আমি সেখানে একটা সম্প্রদায়ের সন্ধান পেয়েছি এবং আসার পর থেকে আমি যা অনুভব করেছি, তার চেয়ে বেশি আপন করে নেওয়ার অনুভূতি উপলব্ধি করেছি। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছিল এবং সমুদ্রে ও স্টার্লিং-এ যাওয়ার এক দিনের ভ্রমণও ছিল। সেসব অনুষ্ঠান আমার প্রতীক্ষার কষ্ট কমিয়েছিল এবং সামান্য উদ্বিগ্নতা লাঘব করেছিল।

গ্লাসগোতে এক মাস থাকার পরে সাক্ষাৎকারের জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল। তিনজন কর্মকর্তা আলাদাভাবে আমাকে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারা সবাই ছিল শান্ত এবং অবিচলিত, কিন্তু তাদের প্রশ্নের ধরন দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, ঘটনার আড়ালে কোথাও কোনো ঘাপলা লুকিয়ে আছে। কর্মকর্তারা আমাকে বিশ্বাস করেনি এবং সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছিল, আমি ততই ভাবতে শুরুকরেছি, এমনকি সম্ভাবনা, যা আমি বিগত তিন মাস অপেক্ষার সময় ভাবিনি। তারা আমাকে সেখানে চায়নি। কেননা তারা আমাকে পছন্দ করেনি। সাক্ষাৎকারের ফলাফল ছিল যে, আমার থাকার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

আমার মনে হয়েছিল যে, আমি যেন কিছু ভেঙে ফেলেছি এবং অগ্রাহ্য করেছি, হয়তো অন্য ভাঙা জিনিসের সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। আমি কর্মকর্তাদের একগুঁয়েমি এবং অবিচলিত শত্রুতা বরদাশত্ করতে পারিনি। পুরো সময়ের জানা কথা যে, শেষ পর্যন্ত এমন একটা কিছু হতে পারে। কিন্তু আমি তা আশা করিনি। সত্যি আমি ভেবেছিলাম আলাদা কিছু শুনবো। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের শুরুথেকে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দু’বছরের বেশি সময় আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে আমার দরখাস্ত বারবার প্রত্যাখান করা হয়েছিল। এছাড়া আমাকে শুনানিতেও উপস্থিত থাকতে দেয়নি। তবে পরে আমাকে জানানো হতো যে, আমার দরখাস্ত প্রত্যাখান করা হয়েছে। আমি জানি না, রিফিউজি কাউন্সিলের আইনজীবী, যিনি আমার জন্য লড়াই করেছেন, ছাড়া আমার কী হতে পারতো। তাকে ছাড়া হয়তো আমাকে পুঁটলী বানিয়ে উড়োজাহাজে তুলে দিত এবং আমি আমার ঘাতকদের কাছে ফিরে যেতাম।

অবশেষে ২০০৯ সালে আমার দরখাস্ত মঞ্জুর হয়। কিন্তু আশ্রয়ের অনুমতি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, আমার আগন্তুকের গল্প শেষ হয়ে গেছে। আমাকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমার ভাতা, যা একটা ইলেকট্রনিক কার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট দোকান থেকে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করার সুযোগ ছিল। শেষ পর্যন্ত হাত খরচের জন্য আমি একটা মোটর যন্ত্রাংশের দোকানে সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টার কাজ নিয়েছিলাম। কাজটা ছিল অবৈধ। আমি জানি না কীভাবে পুলিশ আমার হদিস পেয়েছিল। তারা আমার ফ্ল্যাটে ভোর চারটায় অভিযান চালিয়েছিল এবং যা কিছু তছনছ করার ছিল, তারা তাই ওলটপালট করেছে এবং চটজলদি আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে গিয়েছিল, যেন আমি কোনো বিপজ্জনক অপরাধী। আমাকে গ্রেফতার করার সময় আমি আমার সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজ এবং ব্যবহৃত জিনিসপত্র হারিয়েছি। কেননা আমাকে ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আমাকে দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়েছিল। তাদের কাছে আমি যেন কোনো বিষাক্ত সাপ, কিংবা কয়েক মাস ধরে সংক্রামিত কোনো জন্তু-জানোয়ার। যখন আমার মামলা আদালতে উত্থাপন করা হয়, তখন আদালত আমাকে বারো মাসের জন্য কারাদ- দিয়েছে। একটা খ-কালীন মামুলি কাজ করার জন্য বারো মাসের কারাবাস! এখন আমি জানতে পেরেছি যে, আমি পৌঁছেছি।

আমি আগে যে অবহেলিত অবস্থায় ছিলাম, সে পরিবেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ২০১১ সালে আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। আমার কাজ করার অনুমতি ছিল না। আমি এখানে আট বছর যাবত আছি। আমাকে যেখানে থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে থাকা ছাড়া আমার অন্য কোন উপায় ছিল না। এছাড়া আমাকে আমার আবেদন বিবেচনা করে অনুমতির জন্য পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আপনারা কী জানেন অবহেলিত অবস্থার অর্থ কী? এর অর্থ নরকের প্রান্ত।

গল্পসূত্র: নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক আব্দুলরাজাক গুরনাহর ‘দ্য অ্যারাইভার’স্ টেইল’ গল্পের অনুবাদ ‘আগন্তুকের গল্প’। ইংরেজিতে গল্পটি ‘রিফিউজি টেইলস’ ছোটগল্প সংকলনে ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

tab

সাময়িকী

২০২১ সালের নোবেল বিজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহর গল্প

আগন্তুকের গল্প

অনুবাদ : ফজল হাসান

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

আমি উড়োজাহাজে চড়ে এসেছি। কথাটা হয়তো এভাবে বলা শ্রুতিমধুর নয়- তাহলে অন্য কোন উপায়ে? কিছু মানুষ হেঁটেছে। অনেকে ডুবে গেছে। ওরা সবাই ছিল বেপরোয়া। আমি মরিয়া ছিলাম না, কিন্তু আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। কেননা আমি কিছু মানুষকে রাগান্বিত করেছিলাম। আমার অপরাধ ছিল আমি আমার বোরবারের স্কুলের মেয়েদেরকে বলেছিলাম ওরা যেন খতনা করতে রাজি না হয়। আমার বোরবারের স্কুলে শুধু লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমি ভালো কথা বলার সুযোগ পেলে বলে ফেলি। আমি ওদেরকে বলেছিলাম যে, খতনা হলো যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ এবং বর্বর ও পশ্চাৎপদ প্রচলন। পুরুষরা মহিলাদের কাজটি করতে বাধ্য করে, যাতে তারা জানতে পারে যে মহিলারা মূল্যহীন। আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের কষ্ট দেওয়া এবং তাদের অথর্ব করা এবং এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা। যেদিন মেয়েদের রাজি হওয়ার কথা ছিল, সেদিন ছয়জন মেয়ে প্রত্যাখান করেছে। সেখানে আমি ছিলাম না, কিন্তু ঘটনা বুঝতে পেরেছি সেদিন রাতে যখন আমার বাড়ির সম্মুখে উত্তেজিত মানুষের কোলাহলে মুখরিত ছিল। তারা আমাকে ঘর থেকে বেরোতে বলেছিল এবং তাদের মেয়েদের বুদ্ধি দেওয়ার জন্য দৈহিক শাস্তি দিতে চেয়েছিল। জায়গাটি ছিল মুসলমান দেশের মুসলমান অধ্যুষিত গ্রাম এবং আমি সেই গ্রামের বাসিন্দা ছিলাম। আমি একজন খ্রিস্টান, এখন যে কিনা তাদের মেয়েদের বুদ্ধি দেওয়ার জন্য দোষী। আমার আতঙ্কের পরিমাণ আপনারা অনুমান করতে পারছেন।

বাইরে যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এসেছিল এবং উত্তেজিত জনগণ চলে গিয়েছিল, হয়তো তারা লোক সংখ্যা বাড়ানো কিংবা তাদের সাহায্য করার জন্য অন্যদের ডেকে আনতে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে আমি অন্ধকারের মধ্যে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম এবং নিরাপত্তার জন্য পাশের এক গ্রামে চলে যাই। পরদিন আমি শুনেছি যে, উত্তেজিত লোকজন সে রাতেই আমার ঘরে অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরও তারা আমাকে খুঁজছিল এবং আমাকে নিয়ে খারাপ কথা বলছিল। সুতরাং শহরের যেই বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতাম, আমি দ্রুত সেই অফিসে পালিয়ে যাই। অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন একজন ইংরেজ এবং তার নাম ছিল বার্নার্ড। তিনি আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তিনি আমার জন্য একটা পথ খুঁজে বের করবেন এবং এ বিষয় নিয়ে আমি যেন কোনো দুশ্চিন্তা না করি। তিনি আরও বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম আসলে আমি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাবো। কয়েকদিন পরে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, যারা আমার ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে, তারা আমার খোঁজে অফিসে গিয়েছিল এবং বলেছে আমার সঙ্গে তাদের কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে। তিনি আমাকে পুলিশের কাছে যেতে বলেছিলেন, যা শোনার পরে আমার হাসি পেয়েছিল। আমি হাসতে চাইনি, কিন্তু অবলীলায় চলে এসেছিল। আমি বার্নার্ডকে বলেছি যে, প্রথমেই পুলিশ আমাকে মারধর করবে এবং তারপর বাকি কাজ সমাপ্ত করার জন্য তারা তাদের সুহৃদদের হাতে তুলে দেবে। সুতরাং তখন আমার সামনে লুকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। কেননা সেই লোকজন ছিল ভীষণ ভয়ঙ্কর, বিপজ্জনক। আমার খোঁজে তারা বেশ কয়েকবার অফিসে গিয়েছিল। অবশেষে একদিন বার্নার্ড আমাকে ব্রিটেনে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশটি খ্রিস্টানদের এবং তুমি একজন খ্রিস্টান কর্মচারী। তুমি খ্রিস্টানদের জন্য কাজ করতে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছো। তিনি জানতেন আমাকে আশ্রয় দেওয়া হবে, তিনি তাই বলেছিলেন। বার্নার্ড নিজেই তার দেশে ফিরে যাচ্ছেন এবং তিনি আমাকে তার লন্ডনের টেলিফোন নম্বর দিয়েছিলেন, যদি কখনও তাকে আমার প্রয়োজন হয়।

আমি ভাড়ার জন্য টাকা কেমন করে যোগাড় করবো? বন্ধুরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন আমার পরিবারকে দেখাশোনা করার প্রতিজ্ঞা করেছিল। তারা সবাই দেখতে পেয়েছিল যে, আমার জীবন বিপদের সম্মুখিন এবং এ নিয়ে তারা আলাপ-আলোচনা করেছে যতক্ষণ না পর্যন্ত লন্ডনে যাওয়ার জন্য এয়ার মরক্কোর ভাড়ার টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। বন্ধু-বান্ধবরা মিলে সব ব্যবস্থা করেছিল। সুতরাং আমি উড়োজাহাজে চড়ে এসেছি, যা ইতোমধ্যে আপনাদের বলেছি। আমি ডান-বাম কোনো কিছু না চিনে লন্ডনে পৌঁছেছি এবং বিশাল খোলা জায়গা আর রাস্তায় ব্যস্ত মানুষের ঢল দেখে রীতিমতো ভ্যাকাচ্যাকা খেয়েছি। কিন্তু মানসিকভাবে শক্ত থাকার জন্য আমি নিজের সঙ্গে কথা বলেছি যে, আমি সাহসী একটা কিছু করছি। আমি আসার আগে আমার জন্য স্যুট বানিয়েছিলাম এবং তা পরিধান করেছি। এখনও আমার কাছে সেই স্যুট আছে এবং আমি বিশেষ অনুষ্ঠানে পড়ি। তাই আমি নিজেকে বলেছিলাম যে, আমাকে ভালো দেখাচ্ছে। আমাকে পূরণ করার জন্য কয়েকটা ফর্ম দিয়েছিল এবং আমি আমার জীবন বাঁচাতে যা প্রয়োজন, তাই লিখেছি। আমাকে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আমি জানি না কীভাবে? আমি দ্বিধান্বিত ছিলাম এবং ডান-বাম কিছু জানতাম না। কিন্তু আমি কোনো রকমে বললাম কী দরকার ছিল, কারণ আমি জানতাম ওরা আমাকে ফিরিয়ে দেবে না। প্রতিকূল কাজ করার জন্য আমাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। তারপরও আমি জানতাম যে, লন্ডন আমাকে বঞ্চিত করবে না।

বার্নার্ড আমাকে যে টেলিফোন নম্বর দিয়েছিল, আমি সে নম্বরে ফোন করেছি এবং তিনি আমার ফোন পেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছেন আমি তার ওখানে যেতে পারবো না এবং তার সঙ্গে থাকাও সম্ভব নয়। তার স্ত্রী মানা করেছেন। তিনি বলেছেন আমি থিতু হওয়ার পরে কোনো একসময় আমরা হয়তো অন্য কোনো জায়গায় দেখা করে কফি খেতে পারি। পরবর্তীতে কী করবো, তা না জেনে আমি বিমানবন্দরে বসে ছিলাম। তারপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমার দিকে এগিয়ে এসেছিল এবং আমাকে উপরের তলায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সে বলেছিল যে, উপরের তলার জায়গা গরম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি ঠিক আছে কি না, যদি আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম যে, আমার থাকার কোনো জায়গা নেই এবং আমার কাছে অল্প পরিমাণে অর্থকড়ি আছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তিনি আমাকে একজন সম্মানিত ভদ্রলোক ভেবেছেন এবং আমি যদি তাকে তাই বলতাম, তাহলে তিনি হয়তো মনে করতেন যে, আমি শুধু একজন আফ্রিকান হিং¯্র যুবক। সুতরাং তার কাছে কোনো সাহায্য না চেয়ে আমি উপরের তলায় চলে যাই।

আমি বাড়ি থেকে একজন বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। সে কোলচেস্টারে বাস করতো। তাকে বলেছিলাম, আমি লন্ডনে আছি।

খুবই ভালো খবর, সে বলেছিল।

তোমাকে দেখতে আসছি, আমি বলেছিলাম।

অপূর্ব, সে বলেছিল।

আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই, আমি আমার বন্ধুকে বলেছিলাম। সে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে আমার কাছে টাকা পাঠিয়েছিল। আমি সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধু এবং তার পরিবারের সঙ্গে কোলচেস্টারে ছিলাম। বন্ধু আমার ধোপদুরস্ত স্যুট দেখে মশকরা করেছিল এবং অনেকদিন পর পুনরায় দেখা হওয়ার জন্য আমরা হাসি-তামাশায় মশগুল ছিলাম। কিন্তু আমার জন্য যেসব খাবার তার স্ত্রী রান্না করেছিল, আমি তা আনন্দের সঙ্গে খাওয়ার পরও বন্ধু আমাকে বলেছে যে, আমি তাদের সঙ্গে থাকতে পারবো না। ইতোমধ্যে আমি তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমার বন্ধু, তার স্ত্রী এবং বাচ্চা বয়সী তিন সন্তান নিয়ে দুই কক্ষের একটা ছোট ফ্ল্যাটে বাস করে। তাদের বাড়িতে সব কিছু দেখার পর আমার মনে হয়েছে যে, তাদের জীবন সংগ্রামের।

আমার বন্ধু বলেছে, এখন আমি যেহেতু এসে পড়েছি, তাই হোম অফিসে গিয়ে আমার আশ্রয় চাওয়া উচিত। সে আমাকে যাতায়াত খরচ দিয়েছিল এবং পরদিন আমি ক্রয়ডন গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, লুনার হাউজ। না, আমি ভয় পাইনি, হয়তো সামান্য দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কেননা আমি হারিয়ে যেতে চাইনি এবং নিজেকে বোকা বানাতেও চাইনি। লুনার হাউজে একজন মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং আমার সম্পর্কে সমস্ত তথ্য লিখে রেখেছেন। তাকে বলেছি যে, আমার দেশে আমি নারী যৌনাঙ্গ অঙ্গচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার প্রচারক ছিলাম এবং তার জন্য আমার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল।

হ্যাঁ, মহিলা বললেন, আমি আপনার জন্য প্রাথমিকভাবে জরুরি আবাসনের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আপনি ওখানে বসুন এবং অপেক্ষা করুন।

দিনের শেষে সেখানে আমরা ছয়জন অপেক্ষা করছিলাম এবং আমাদের সবাইকে একটা ভ্যান গাড়িতে তুলে ব্যারি হাউজে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমরা সর্বমোট বারোজন ছিলাম এবং আমরা চাইলে বাইরে যেতে পারতাম। আমি বেশিরভাগ সময় রাস্তার একদিক থেকে অন্যদিকে পায়ে হেঁটে যেতাম এবং ফিরে আসতাম। কেউ যদি আমার দিকে তাকাতো, তাহলে আমি চোখেমুখে হাসি ফুটিয়ে তাদের দেশে আমাকে স্বাগতম জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতাম। সেখানে আমি পাঁচ দিন ছিলাম। আমরা একজন আরেকজনকে বিপদ এবং মরণের হাত থেকে পালানোর গল্প বলেছি। তারপর আমাদের মধ্যে তিনজনকে নিউক্যাসেলের একটা বাড়িতে পাঠিয়েছিল। সেখানে আমরা এক মাস ছিলাম। পরবর্তীতে আমাকে গ্লাসগোর একটা ফ্ল্যাটে থাকতে দেওয়া হয়েছিল এবং সঙ্গে তিন সপ্তাহের খরচপাতিও দিয়েছিল। সেই পুরোটা সময় আমি সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করেছি, যেন আমি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার কথা বিশদভাবে বলতে পারি। আমার সাক্ষাৎকারের জন্য আমি উদ্গ্রীব ছিলাম। আমি জানতাম, এদেশে আসার কারণ শুনলে কর্মকর্তা বুঝবেন এবং সমবেদনা জানাবেন।

গ্লাসগোর এক দোকানে একজন নাইজেরিয়ানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল এবং সে আমাকে গির্জায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। গির্জায় উপস্থিত সবাই আফ্রিকান, এমনকি যাজকও। আচার-অনুষ্ঠানের পরে আমাদের আফ্রিকার খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল, যা সমাবেশের লোকজন তৈরি করেছিল। আমি সেখানে একটা সম্প্রদায়ের সন্ধান পেয়েছি এবং আসার পর থেকে আমি যা অনুভব করেছি, তার চেয়ে বেশি আপন করে নেওয়ার অনুভূতি উপলব্ধি করেছি। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছিল এবং সমুদ্রে ও স্টার্লিং-এ যাওয়ার এক দিনের ভ্রমণও ছিল। সেসব অনুষ্ঠান আমার প্রতীক্ষার কষ্ট কমিয়েছিল এবং সামান্য উদ্বিগ্নতা লাঘব করেছিল।

গ্লাসগোতে এক মাস থাকার পরে সাক্ষাৎকারের জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল। তিনজন কর্মকর্তা আলাদাভাবে আমাকে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারা সবাই ছিল শান্ত এবং অবিচলিত, কিন্তু তাদের প্রশ্নের ধরন দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, ঘটনার আড়ালে কোথাও কোনো ঘাপলা লুকিয়ে আছে। কর্মকর্তারা আমাকে বিশ্বাস করেনি এবং সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছিল, আমি ততই ভাবতে শুরুকরেছি, এমনকি সম্ভাবনা, যা আমি বিগত তিন মাস অপেক্ষার সময় ভাবিনি। তারা আমাকে সেখানে চায়নি। কেননা তারা আমাকে পছন্দ করেনি। সাক্ষাৎকারের ফলাফল ছিল যে, আমার থাকার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

আমার মনে হয়েছিল যে, আমি যেন কিছু ভেঙে ফেলেছি এবং অগ্রাহ্য করেছি, হয়তো অন্য ভাঙা জিনিসের সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। আমি কর্মকর্তাদের একগুঁয়েমি এবং অবিচলিত শত্রুতা বরদাশত্ করতে পারিনি। পুরো সময়ের জানা কথা যে, শেষ পর্যন্ত এমন একটা কিছু হতে পারে। কিন্তু আমি তা আশা করিনি। সত্যি আমি ভেবেছিলাম আলাদা কিছু শুনবো। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের শুরুথেকে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দু’বছরের বেশি সময় আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে আমার দরখাস্ত বারবার প্রত্যাখান করা হয়েছিল। এছাড়া আমাকে শুনানিতেও উপস্থিত থাকতে দেয়নি। তবে পরে আমাকে জানানো হতো যে, আমার দরখাস্ত প্রত্যাখান করা হয়েছে। আমি জানি না, রিফিউজি কাউন্সিলের আইনজীবী, যিনি আমার জন্য লড়াই করেছেন, ছাড়া আমার কী হতে পারতো। তাকে ছাড়া হয়তো আমাকে পুঁটলী বানিয়ে উড়োজাহাজে তুলে দিত এবং আমি আমার ঘাতকদের কাছে ফিরে যেতাম।

অবশেষে ২০০৯ সালে আমার দরখাস্ত মঞ্জুর হয়। কিন্তু আশ্রয়ের অনুমতি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, আমার আগন্তুকের গল্প শেষ হয়ে গেছে। আমাকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমার ভাতা, যা একটা ইলেকট্রনিক কার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট দোকান থেকে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করার সুযোগ ছিল। শেষ পর্যন্ত হাত খরচের জন্য আমি একটা মোটর যন্ত্রাংশের দোকানে সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টার কাজ নিয়েছিলাম। কাজটা ছিল অবৈধ। আমি জানি না কীভাবে পুলিশ আমার হদিস পেয়েছিল। তারা আমার ফ্ল্যাটে ভোর চারটায় অভিযান চালিয়েছিল এবং যা কিছু তছনছ করার ছিল, তারা তাই ওলটপালট করেছে এবং চটজলদি আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে গিয়েছিল, যেন আমি কোনো বিপজ্জনক অপরাধী। আমাকে গ্রেফতার করার সময় আমি আমার সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজ এবং ব্যবহৃত জিনিসপত্র হারিয়েছি। কেননা আমাকে ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আমাকে দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়েছিল। তাদের কাছে আমি যেন কোনো বিষাক্ত সাপ, কিংবা কয়েক মাস ধরে সংক্রামিত কোনো জন্তু-জানোয়ার। যখন আমার মামলা আদালতে উত্থাপন করা হয়, তখন আদালত আমাকে বারো মাসের জন্য কারাদ- দিয়েছে। একটা খ-কালীন মামুলি কাজ করার জন্য বারো মাসের কারাবাস! এখন আমি জানতে পেরেছি যে, আমি পৌঁছেছি।

আমি আগে যে অবহেলিত অবস্থায় ছিলাম, সে পরিবেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ২০১১ সালে আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। আমার কাজ করার অনুমতি ছিল না। আমি এখানে আট বছর যাবত আছি। আমাকে যেখানে থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে থাকা ছাড়া আমার অন্য কোন উপায় ছিল না। এছাড়া আমাকে আমার আবেদন বিবেচনা করে অনুমতির জন্য পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আপনারা কী জানেন অবহেলিত অবস্থার অর্থ কী? এর অর্থ নরকের প্রান্ত।

গল্পসূত্র: নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক আব্দুলরাজাক গুরনাহর ‘দ্য অ্যারাইভার’স্ টেইল’ গল্পের অনুবাদ ‘আগন্তুকের গল্প’। ইংরেজিতে গল্পটি ‘রিফিউজি টেইলস’ ছোটগল্প সংকলনে ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

back to top