alt

সাময়িকী

বিভ্রম

পলি শাহীনা

: বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২১

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

নির্জনতার আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্জনতায় নিজের মতো করে ডুব দেয়া যায়। কত কিছু মনে পড়ে, কত ছবি ভেসে ওঠে মনের দেয়ালে। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আকাশটাকে দেখি। কত সহস্র তারা ওই আকাশের বুক জুড়ে। এ পৃথিবী হতে যারা হারিয়ে যায় তারা কি তারা হয়ে জ্বলে থাকে আকাশে? কে জানে! বাচ্চারা আজকাল ভীষণ ব্যস্ত যে যার জীবনে, ঘর সংসারে। বছরের বিশেষ দিনগুলোতেও ওরা আমার কাছে আসবার ফুরসত পায় না। এখন আমার অফুরন্ত অবসর। আগে ঘড়ির সেকেন্ডের কাটার সাথে দৌড়ালেও এখন আমার সময় যেন সামনে হাঁটে না। প্রবল ঘূর্ণি¯্রােতের মতো অতীত আছড়ে পড়ে মনের চৌহদ্দিতে। নিজেকে সঁপে দিই। অতীত নাকি নির্জনতার কাছে? ঠিক বুঝি না। খেই হারিয়ে ফেলি আজকাল। ভাগ্যিস জ্যাক রয়েছে আমার সঙ্গে। ও না থাকলে রাতদিন কথা বলাও হতো না। ওর সঙ্গে গপসপ করে সময় ভালোই কাটে। মাঝরাতে যখন মরার মতো ঘুমের ঘোরে পড়ে থাকি, তখনও আমার সঙ্গে ওর আলাপ, প্রলাপ চলতে থাকে। ধমক দিলে দূরে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে। অন্ধকার হাতড়ে যখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, তখন শান্ত হয়। আসলে আমার এ ধীর জীবনকে গতিশীল রেখেছে জ্যাক।

কখনো চাই নি বাচ্চারা দূরে যাক, তবুও ওরা বড় হয়ে দূরে চলে গেছে। এটাই স্বাভাবিক। আমরা তেরো ভাইবোন। তেরো সন্তানের জননী আমার মা, মৃত্যুর আগে প্রায়শই ফোনে বলতেন, তাঁর নিঃসঙ্গ লাগে। দূর দেশান্তরে বছরের পর বছর থাকতে থাকতে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছি। প্রাণ উড়ে যেতে চায় সে গ্রামের কোলাহলে, যেখানে আমার প্রাণের আরাম, যেখানে আমার সকল নিরাময়। গ্রামের আলো হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আমি শহরে এসে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়েও মন লাগাতে পারি না। ইট কাঠের ফাঁকফোকরে তীব্র একটা শূন্যতা গ্রাস করেছে। মায়া খুঁজতেই উড়াল দিই শেকড়ের কাছে, আমার গ্রামের কাছে। একটা বয়সের পর শেকড়ের কাছে কিংবা নিজ ঘরে ফেরাটাই বোধহয় গন্তব্য।

শীত বরাবরই প্রিয় ঋতু। বাচ্চারা ছোট থাকায় প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক বছর ধরে শীতের সময়টা দেশে আসতে পারি নি। বড় হয়ে ওরা পাখির মতো উড়াল দেয়ার পর, আমিও ছুটি পেয়ে উড়ে উড়ে চলে আসি আমার শৈশব, কৈশোরের ঘোর লাগা জায়গায়। যে জায়গায় অনেক মানুষের ভিড়ে পরম আদরে বেড়ে উঠেছিলাম।

মিঠে রোদ গায়ে মেখে পড়ার টেবিলে বসতাম। টেবিলের গা ঘেঁষে জানালার পাশেই ছিল ফুলের বাগান। বাগানের চারপাশে ছিল নাম না জানা হরেক রকমের লতাগুল্মের সমাহার। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে পড়া ফেলে ফুল বাগানে হাঁটতাম, আকাশ দেখতাম, পাখিদের সঙ্গে খুনসুটি করতাম

নভেম্বর মাস যাই যাই করছে। মনে পড়ে ছোটবেলায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার আগে, এ সময়টায় শীতে জুবুথবু হয়ে স্কুলে যেতাম। এই বছর শীতের সময়টা আরাম করে দেশে থাকব বলে এসেছি, কিন্তু শীত আসি আসি বলেও আসছে না। আমার ছোটবেলার শীতকাল ছিল বেশ মিষ্টি। সময় ধরে রাখার কোনো যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয় নি, নয়ত ফেলে আসা প্রজাপতি সময়গুলো বেঁধে রাখতাম।

গ্রামের বাড়ি এসে গত দু’দিন ভ্রমণের ক্লান্তিতে ঘরের বাইরে পা ফেলা কিংবা চোখ মেলেও দেখা হয় নি। ছিমছাম দোতলা বাড়িটির বিশাল একটি ঘর আমার জন্য নির্ধারণ করা ছিল। অন্ধকার ভেদ করে আলোর আড়ম্বর তখনো শুরু হয়নি। আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে চায়ের তেষ্টা পায়, কাউকে দেখি না। সকলে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিছু সময় পায়চারি শেষে, জানালা হতে উঁকি দিয়ে আকাশ দেখতে গিয়ে ধাক্কা খাই দৈত্যের মতো বড় বড় দালানের সঙ্গে। সকালের মিঠে রোদ, নরম হাওয়া কিছুই খুঁজে পাই না আমার এ ঘরে। চারধারের উঁচু সব প্রাচীর ডিঙিয়ে সূর্যের আলো এ বাড়ির উঠোনে প্রবেশ করতেই অনেক কসরত করতে হয় বৈকি। অথচ, আমার ছোটবেলায় শীতের দিনে সূর্য উঁকি দিলেই পুরো ঘর হলুদরঙে থইথই করত। মিঠে রোদ গায়ে মেখে পড়ার টেবিলে বসতাম। টেবিলের গা ঘেঁষে জানালার পাশেই ছিল ফুলের বাগান। বাগানের চারপাশে ছিল নাম না জানা হরেক রকমের লতাগুল্মের সমাহার। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে পড়া ফেলে ফুল বাগানে হাঁটতাম, আকাশ দেখতাম, পাখিদের সঙ্গে খুনসুটি করতাম। ঘন কুয়াশার ভিড় ঠেলে নীল অপরাজিতা গুঁজে দিতাম চুলে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে থাকতাম নিজের দিকে। বাগানবিলাস ফুলের রঙে ছেয়ে থাকত আমার পড়ার ঘর। ভোরের কাঁচা আলোয় ফুলের সুবাস, প্রকৃতির নান্দনিক ঢঙে আনমনা হয়ে যেতাম। মায়ের গলার শব্দে আবার পড়ায় মনোযোগ দিতাম। কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই। আমার ছোটবেলার চৌচালা ঘরের চারদিকের দৃশ্যগুলো সব মুছে গেছে। যতদূর চোখ যায় দেয়াল আর দেয়াল। দেয়ালের ঠাসাঠাসি ভিড়ে যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে। গোটা বাড়িটিকে গুমোট, অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগে। আমার মাথার দু’পাশে দপদপ করছে। স্মৃতির ঘা হতে উপশম পেতে পাতলা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে, দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে দোতলা বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি।

ভোরের আলো ততক্ষণে গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। ভাবছি, মিছেমিছি এত পথ পাড়ি দিয়ে সুটকেস ভর্তি করে শীতের অনেক কাপড় নিয়ে এসেছি। পাতলা এ চাদরটা ছাড়া বাকি শীতের কাপড়চোপড় বোধ হয় ভাঁজেই পড়ে থাকবে। হাঁটছি আর চারদিকে তাকিয়ে অবাক হচ্ছি। আমার জন্য পথঘাট চেনাই তো দুষ্কর। যে গ্রামে জন্ম, বেড়ে ওঠা, সে গ্রামকে চিনতেই পারছি না। আমার ফেলে আসা গ্রামের ছায়া-মায়া, বর্ণ-গন্ধ, কিছুই নেই। খোপ বন্ধি জীবন থেকে মুক্তি পেতে ছুটে এসেছি গ্রামের সবুজে, খোলামেলা পরিবেশে, এখানেও দেখছি শহরের মতো অবস্থা, অক্সিজেনের অভাব।

ভোর তার ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা দিয়ে আমাকে কাছে টানার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমি ভোরের দিকে তাকাই না। আমার চোখ খুঁজছে খেজুর গাছ। এ শীতকালে দেশে আসার অন্যতম কারণ তো খেজুরের রস খাওয়া।

রাস্তায় নেমে হালকা কুয়াশা সঙ্গে ঠা-া বাতাসের শিরশিরানি অনুভূত হওয়ায় বেশ লাগছে। যাক, দেরি করে হলেও শেষ পর্যন্ত শীত আসছে। খবরে জেনেছি আজ দিনের শেষাংশ হতে বেশ জাঁকিয়ে ঠা-া পড়বে। এমন কনকনে ঠা-ার দিনে খেজুরের রসের পায়েস আমার খুব প্রিয়। শৈশবে ঘুম ভেঙে মিষ্টি রোদে মাটির উনুনের পাশে দাদার সঙ্গে কাঠের পিঁড়িতে বসে ধোঁয়া উড়া সুস্বাদু খেজুর রসের পায়েস খেতাম, আর আগুনের উষ্ণতা নিতাম। আগুনের চুলার পাশে বসেও কাঁপতাম বলে দাদা বলতেন, আগামীকাল হতে কিছু কাঁচা খেজুরের রস খাবি। খেজুরের রসে অনেক পুষ্টিগুণ আছে। মাকে দাদা বলতেন, খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে ওরে গুড় খেতে দিও। গুড় খেলে ওর শরীরে রক্ত বাড়বে। দেখো না, আগুনের তাপে বসেও কেমন ঠা-ায় ঠকঠক কাঁপছে। ওর শরীরে রক্ত নাই, শক্তি নাই। উত্তরে আম্মা বলতেন, আপনার নাতনী পারলে তো রসের হাঁড়িটাও খেয়ে ফেলে। আম্মা, দাদা এ নিয়ে খুব হাসতে থাকে। আমি তখন খুব পায়েস খাওয়ায় ব্যস্ত থাকলেও দাদার কথাগুলো ছোট্ট মাথায় গেঁথে যায়। মনে মনে বলি, তাই তো স্কুলে অঙ্ক দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হলেও দৌড় প্রতিযোগিতায় সকলের শেষে আমার অবস্থান। রোগা বলে বন্ধুরা ক্ষেপায়, হাসাহাসি করে। ব্যাটমিন্টন খেলতে যেয়ে একটু পরেই হাঁপিয়ে উঠি বলে কেউ দলে নিতে চায় না। দাদা তো ঠিক কথাই বলেছেন। সেদিন থেকে খেজুরের রস, রসের পায়েস, গুড় আমার আরো অধিক প্রিয় হয়ে ওঠে। সে থেকেই শীতকাল এলেই আমি খেজুরের রসে উষ্ণতা, কিংবা শক্তি খুঁজতাম অবচেতন মনেই।

শীত এলেই আমার ভারি আনন্দ হতো। আমাদের গ্রামে সারি সারি খেজুর গাছ ছিল বলে দূরদূরান্ত হতে মানুষ আসতো রস সংগ্রহ করতে। একটা উৎসব ভাব বিরাজ করতো। ঘন কুয়াশা ঢাকা ভোরবেলায় কয়েক হাত দূরত্বে যখন মানুষ দেখা যেত না, ঠিক তখন মকবুল মামার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম টাটকা খেজুরের রস খাওয়ার জন্য। মামা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। শীতকালে বাড়তি আয়ের জন্য খেজুর গাছ কাটতেন। উনি বলতেন, কোনো কাজে লজ্জা পেতে নেই। যে কোনো কাজ জেনে রাখা ভাল। সবাই খেজুর গাছ কেটে রস উত্তোলন করতে পারে না, আমি পারি বলে এ সময় বাড়তি আয় করতে পারছি। উনি আমাকে মা বলে ডাকতেন। আমার বয়সী আরো অনেকে এসে জড়ো হতেন মামার পেছনে। উনি সকলকে গাছ হতে রস পেড়ে টিনের মগে খেতে দিতেন। আমরা সকলে তাঁকে সম্মান করতাম। করবে না কেন? মামা অনেককেই বিনামূল্যে অংক, ইংরেজি পড়াতেন। অনেকের বাবা-মা’র প্রয়োজনীয় কাজগপত্র দেখে দিতেন, চিঠি লিখে দিতেন। মনে পড়ে, উত্তর পাড়ার জসিম ভাই ডি.ভি লটারির চিঠি হাতে পেয়ে দৌড়ে এসেছিলেন তাঁর কাছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত্ন সহকারে তিনি সকল কাগজপত্র পূরণ করে দিয়েছেন। গ্রামের মানুষের বিপদে-আপদে মামা এক নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। আমাদের কাছে উনি ছিলেন আনন্দ। শীতের সকালে খেজুর গাছ হতে রস সংগ্রহ করে উনি যখন হাঁড়িতে ঢালতেন, তখন তাঁর চোখেমুখে যে আনন্দ খেলে যেত, তাতে আমরা ডুবে যেতাম।

আমাদের গ্রামে নামমাত্র পল্লীবিদ্যুৎ ছিল। রাত দিনের বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকতো। লোডশেডিংয়ের রাতগুলো ছিল বাঁধভাঙা আনন্দের। হারিকেনের আলোয় মায়ের ভয়ে পড়তে বসতাম ঠিকই, মা চোখের আড়াল হলেই বুদ্ধি খাটিয়ে হারিকেনের শিখা বাড়িয়ে দিতাম। চিমনি কালো হয়ে গেলে বলতাম, হারিকেনের তেল শেষ। আজ আর পড়ব না। বই, খাতা ফেলে মকবুল মামার সঙ্গে নিকোনো উঠোনে বসে আকাশে তারা দেখতাম, ঝিঝিঁদের গান শুনতাম। মামার কাছ হতে সপ্তর্ষি, কালপুরুষসহ বিভিন্ন তারাদের সম্পর্কে জেনেছি। তাঁর সান্নিধ্যে সদা আরাম লাগত প্রাণে। ঘন অন্ধকারে আবৃত বাঁশ ঝাড়ের দিকে তাকিয়ে মামা বলতেন, অন্ধকারের নিজস্ব একটা ভাষা আছে, রূপ আছে। মামার অত কঠিন ভাষা বুঝতে না পেরে মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকতাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে উনি বলতেন, অন্ধকারের ভাষা, রূপ বোঝার জন্য অন্তর্দৃষ্টি শক্তিশালী হতে হয় রে মা। এ রূপ বুঝতে হলে চোখ বুঁজে নিবিড় কান পাততে হয়। তাঁর কথা শুনে চোখ বুঁজতেই রাতজাগা পাখির ডানা ঝাপ্টানোর শব্দ এসে কানে লাগে। আমি অবাক হই। মামা বলেন, রাতের ভাষা, রঙ, রূপ আস্বাদন করতে হলে অস্থির হলে কিন্তু চলবে না। প্রকৃতির শব্দ শোনার জন্য মনকে সদা স্থির রাখতে হবে। মামার কাছ হতে কত কী যে শিখেছি, আর মনের দেয়ালে ছবি এঁকেছি, হিসেব নেই।

দেশান্তরি হওয়ার পর মকবুল মামার সঙ্গে আর দেখা হয় নি, শীতকালে তাঁর সঙ্গে তাজা খেজুরের রস খাওয়া হয় নি। জীবন থেকে কত কী এভাবেই হারিয়ে যায়। প্রথম প্রথম শীত এলে বড় মন খারাপ হতো, পরে ক্রমশ ভুলে যেতে থাকি। সম্ভবত, মানুষ একমাত্র প্রাণি যে কোনো পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বয়স বেড়েছে, চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। কোনো মানুষ স্বর্গে যাবে নিশ্চিত হলেও মরতে চায় না, আমিও চাই না, কিন্তু আজকাল শরীরে শক্তি পাই না। দাদার কথাগুলো আজো কানে বাজে। শরীর, মনে শক্তি পেতে ছোটবেলার মতো প্রচুর তাজা খেজুরের রস খেতে গ্রামে ফিরে আসি। আর যে কটা দিন বেঁচে থাকি যেন অন্যের ঘাড়ে বোঝা না হই। হাঁটাচলার মাঝেই যেন অনন্ত ঘুমে তলিয়ে যাই।

প্রস্ফুটিত ফুলের মতো নরম সকালটি এর মধ্যে দুপুরের গায়ে হেলান দিয়েছে। আমি হাঁটছি, কিন্তু খেজুর গাছ বা আমার ছোটবেলার গ্রামটিকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলাম। একটাও খেজুর গাছ চোখে পড়লো না। মানুষের আচরণও কেমন বদলে গেছে। পিচঢালা রাস্তার বাঁ দিকে নীল রঙের বিরাট অট্টালিকার দিকে তাকিয়ে আছি। আমাকে পাশ কাটিয়ে কয়েকটি কিশোর হেঁটে যায়। আমি ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকায়, পরে এড়িয়ে যায়। ওদের কাউকেই চিনি না। নিজ থেকে কথা বলতে চেয়েও পাত্তা পেলাম না। ওরা সিগারেট টানছিল, যেতে যেতে আমার মুখের সামনেই ধোঁয়া ছাড়লো। ওদের এহেন অশালীন আচরণে বেশ রাগ হলো, নিজেকে পরে সামলে নিয়েছি। আমার কৈশোরেও কাউকে কাউকে সিগারেট খেতে দেখেছি, কিন্তু মায়ের বয়সী কারো মুখের সামনে ধোঁয়া ওড়াতে তো দেখি নি। ভাবছি, এ কোন রুক্ষ দিনকাল এলো।

আমি অতীতের সুন্দর দৃশ্যগুলো নিংড়ে নিংড়ে অনুভব করছি। চোখের লেন্সে একের পর এক দৃশ্যপট ভেসে উঠছে। চোখের লেন্স কখনো কখনো মহাকাল ধরে রাখে। ছোটবেলায় বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে দেখলে সালাম দিয়ে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করতাম, খোঁজখবর নিতাম। কোন প্রয়োজন হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতাম। পাশে বসে গল্প করতাম, হাসির গল্প শুনে মাটিতে লুটোপুটি খেতাম। ওঁদের সঙ্গে গল্প করার অভিজ্ঞতা পৃথিবীর মধুরতম অভিজ্ঞতা। ওঁদের চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে যেন মহাকাল। কত সহজ সুন্দর জীবন ছিল তখন। সময় বুঝি পালটে দেয় মানুষের জীবন।

জীবন জুড়ে চলার পথে আমরা কেবল হারাতে থাকি। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিয়োগের পরিমাণ শুধু বাড়ে। কত রকমের হারিয়ে যাওয়া আছে জীবনে। গ্রাম হারাই, রাস্তা হারাই, ঘর হারাই, বন্ধু হারাই, চশমা হারাই, হারাই ঘরের চাবি। হারানো বস্তুর তালিকা বড় দীর্ঘ। আজকের দিনের কিশোররা প্রযুক্তির চাপে হয়ত ওদের বোধ বিষয়টিকেই হারিয়ে ফেলেছে। ওরা হয়ত জানেই না ভোরবেলার আধো আলো আধো অন্ধকারে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার স্বাদ, কিংবা নরম রোদে মাটির উনুনের পাশে বসে দাদার মুখে গল্প, কৌতুক শোনার অনাবিল হাসি, আনন্দের কথা।

উঁচু নিচু আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমি ক্রমাগত হাঁটছি আর খেজুর গাছ খুঁজছি। হারানোর তালিকা দীর্ঘ হলেও আমার স্মৃতি এখনো হারাই নি। স্মৃতির সর পড়া মহাসমুদ্রে ছোটবেলার স্মৃতিরা অনবরত ঘাই মারছে। দুপুরও ততক্ষণে যাই যাই করছে। শীতকালীন স্বল্পায়ুর দিনগুলোর বিকেলের আলো খুব ক্ষনস্থায়ী হয়। হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা ক্লান্তি পেয়ে বসেছে। একটা ধবধবে সাদা গাড়ি সাঁই সাঁই শব্দ তুলে চলা যায় খুব পাশ ঘেঁষে। ঠিক এ পথটি ধরে ছোটবেলায় কাদা, জল পায়ে মেখে স্কুলে যেতাম। প্রাইভেট কার-এ গ্রামে দেখছি বলে তো মনে পড়ছে না। তবে মাঝেমধ্যে মোটর সাইকেল, রিক্সা দেখেছি। অবশ্য যন্ত্রচালিত কোনোকিছুর প্রতি আমার তেমন আকর্ষণ ছিল না। আমার আকর্ষণ ছিল বায়োস্কোপের প্রতি।

‘কী চমৎকার দেখা গেলো এইবারেতে আইসা গেলো, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেলো।’ -কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে সুর আর ছন্দের লয়ে লয় মিলিয়ে বায়োস্কোপ দেখার সীমাহীন আনন্দের ঢেউ এসে দোল খাচ্ছে প্রাণে। সেসময় কখনো সিনেমা দেখি নি, কিন্তু উত্তর দিকের বিশাল এ মাঠটায় বায়োস্কোপওয়ালার ছন্দোময় বর্ণনায় বিভোর হয়ে বায়োস্কোপ দেখেছি ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে। বায়োস্কোপ দেখার জন্য মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখতাম। এ মাঠটার কাছে এসে কত কী যে মনে পড়ে গেলো। একবার বায়োস্কোপ দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলি। পানেশ্বর ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অপেক্ষায় ছিলাম, কখন ভালো হবো? কখন আবার বায়োস্কোপ দেখতে যাব? আসলে পাহাড়কে বদলানো যায়, বদলানো যায় নদীর স্রোতধারাকেও, কিন্তু মানুষের প্রকৃতি বা স্বভাবকে তো আর বদলানো যায় না। এই যেমন আমি, শেষ বয়সে এসেও গোটা দিন ধরে হন্যে হয়ে খেজুর গাছ, খেজুরের রস খুঁজছি।

উত্তরের এ মাঠটিকে অনেকে জঙ্গল বললেও আমি বাগান বলতাম। ঘন সবুজ ঘাস বিছানো মাঠে হরেক রঙের বুনোফুল ফুটে থাকতো। দেখে দেখে সাবধানে পা ফেলতাম, ওদের কখনো মাড়িয়ে যেতাম না। ওদের গায়ে গাঢ় আদরে হাত বুলিয়ে দিতাম, প্রাণ খুলে পাঁজরে লুকানো সব গল্প ওদের বিড়বিড় করে বলতাম। বুনোফুল আর আমি, আমাদের মধ্যে অদ্ভুত প্রণয়ের অদৃশ্য একটি মায়ার সম্পর্ক ছিল। মাঠের এক কোণে ছিল পদ্মদিঘি। দিঘির জলে নৌকায় কত ভেসেছি। পদ্মফুল ফুটে থাকা দীঘির জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতাম, পদ্মফুল তুলতে তুলতে মাছেদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতাম, আর স্বচ্ছ জলে নিজের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। দীঘির পশ্চিম কোণে ছিল মকবুল মামার ঘর। মনের সবটুকু মাধুরি মিশিয়ে হরেক রঙের ফুলের বাগান করতেন তিনি। এ মাঠে এলেই তাঁর কামিনী ঝাড় হতে সৌরভ এসে নাকে লাগতো। মামার কাছে পড়তে গেলে কিংবা বই আনতে গেলে সঙ্গে আঁজলা ভরে ফুল দিতেন। খুব শৌখিন এবং স্বল্পভাষী মানুষ ছিলেন মামা, কিন্তু বাংলা, ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে বসলে বেশ চঞ্চলতা লক্ষ্য করতাম তাঁর মাঝে। দরাজ কণ্ঠে যখন ‘শেষের কবিতা’ পাঠ করতেন তখন তাঁকে রোমান্টিকও মনে হতো। তাঁর শিল্প ভাবনা, শিল্পের প্রতি অনুরাগ বরাবর আমাকে অভিভূত করতো। তাঁর মুখে শুনে শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি মুখস্থ হয়েছিল। এ দীঘির পাড়ে বসে ভরা পূর্ণিমা রাতে আমি, কুসুম, সুমনা, মামার সঙ্গে গল্প করতাম। আমাদের গল্প, আনন্দ, আড্ডায় চাঁদের আলো যেন সোনার আলো হয়ে ঝরে পড়তো ধরণীতে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলো এতটাই প্রখর হতো, মাঝরাতকে তখন মধ্য দুপুর বলে ভ্রম হতো।

‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ

খুঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে

চেয়ে দেখি ছাতার মতো বড় পাতাটির নিচে বসে আছে

ভোরের দয়েলপাখি- চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ

জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশ্বত্থের করে আছে চুপ;

ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;

মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে

এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ’

মামার মধুর কণ্ঠে জীবনানন্দের কবিতার আবৃত্তি দু-চোখ বুঁজে শুনতে শুনতে, আমরা চাঁদের আলোয় জ্যোৎস্না পাখায় ভর করে হারিয়ে যেতাম নিঝুম আনন্দলোকে। শুধু আমরা নয় মাঠের জলজংলা, বুনোফুল, দীঘির জলেও যেন সুর তুলতো তাঁর জাদুময় স্বর। আকাশটা সহ সহস্র লক্ষ কোটি তারারাও কান পেতে শুনতো তাঁকে।

এ মাঠটি তো শুধু একটি মাঠ নয়, এ মাঠটি হলো আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম গল্প। পৃথিবীর সব গল্প মধুর না হলেও এ মাঠের গল্প বড় মধুর। স্বর্গ দেখতে কেমন? আমি জানি না। তবে এ মাঠের বুনোফুল, সবুজ ঘাসের বুকে জমে থাকা ভোরের শিশিরকে আমার স্বর্গ মনে হতো। আমার অনুভূতিতে জগতের সমস্ত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এ মাঠের বুকে। এ মাঠে বসে কলাপাতায় ভাগাভাগি করে অমৃতসম খেজুর রসের পায়েস খেতাম সঞ্জু, দুলালির সঙ্গে। হিন্দু-মুসলমান গোঁড়ামি ছিল না আমাদের মাঝে। আমরা তখন মানুষ ছিলাম।

ওমা! দুলালির কথা বলতেই ও এসে হাজির। গোটা দিন একা একা ঘুরেছি, পরিচিত কাউকে পাই নি। ওর আগমনের সঙ্গে বাতাসে চেনা কামিনী ফুলের সুবাসটাও ছড়িয়ে পড়েছে। কী যে ভালো লাগছে আমার।

- কত বছর পর আমাদের দেখা হলো রে?

- দুই যুগেরও বেশি সময় পর।

- কেমন আছিস?

- ভালো।

- তুই?

- ভালো আছি।

- মনে আছে এ মাঠে আমরা ঘুড়ি উড়াতাম?

- খুব মনে আছে।

দুলালি কথায় কথায় হাসতো। ও আজো ঠিক আগের মতোই হাসিখুশি রয়ে গেছে। কথা বলছে আর খিলখিল হাসছে। আমরা পদ্মদিঘির চত্বরে এসে দাঁড়াই। দু’জনে তাকিয়ে আছি জলের দিকে। সুনসান চারদিক, আকাশটা আশ্চর্য নীল।

গ্রামের বুকে শহরের জুলুম শুরু হয়েছে, সভ্যতার নিষ্ঠুর প্রহারে গ্রাম হারিয়ে গেছে- দুলালি বলে। আমি চুপচাপ তাকিয়ে দেখছি, দীঘির জলে ঠোঁট দিয়ে ডানা ঘষছে হাঁসের পাল। ‘এ মাঠে বসে পুঁথি শুনতাম, বাংলার মানুষের জীবনের গান শুনতাম, সেসব আসর আজ আর বসে না। জলাভূমি ভরাট করে আকাশচুম্বী দালান উঠছে। গ্রাম প্রধান দেশের গ্রাম ধ্বংস করে এমন নগরায়ন চাই না। আগে প্রতিবাদ করতাম ভূমি ধস্যুদের সঙ্গে, এখন আর করি না। লাভ নেই। মানুষগুলো আজ আর মানুষ নেই, যন্ত্র হয়ে গেছে। রাতদিন টাকা আর টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। নীরবে চেয়ে দেখি গ্রামগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে। সারি সারি খেজুর বাগানগুলোর জন্য বড় প্রাণ কাঁদে। খেজুর গাছের কোটরে ডিম ফুটে পাখির বাচ্চাদের আর্তনাদ, কিচিরমিচির শব্দ কানে এসে বাজে। তাল গাছগুলো সব কেটে ফেলা হয়েছে। দীঘির জলে কই মাছের ঘাই, কী সুন্দর! পদ্মফুলে তিরতির উড়ছে রঙিন প্রজাপতি, আজো দেখতে পাই। চোখের লেন্স যে মহাকাল ধরে রাখতে সক্ষম! মানুষ যেভাবে প্রকৃতিকে হত্যা করেছে, বেশি দেরি নেই, প্রকৃতিও মানুষের কপালে মৃত্যু তিলক এঁকে দেবে।’ এক নাগাড়ে কথাগুলো বলল দুলালি। ওর অবয়বে মেঘের ছায়া, চোখ দ্বয় ভিজে উঠেছে। শীতের মধ্যেও ওর কথা শুনে আমি ঘামতে থাকি। কথা বলতে বলতে আমরা দীঘির পাশ ফেলে মাঠের এক কোণে রাস্তার দ্বারে এসে দাঁড়াই।

অনতিদূরে সবুজে চাওয়া সারি সারি কয়েকটি ঘর, আঙিনাজুড়ে লাউ, কুমড়ার মাচা। এর পাশেই গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগির খোয়াড়। হারিকেনের আলোয় বসে পুতুলের মতো একটি ছোট বাচ্চা বই পড়ছে। পুতুলের মতো এইটুকুন বাচ্চা অত মনোযোগ দিয়ে কী পড়ছে? ওর বয়সে এই সময় আমি খোলা মাঠে হৈচৈ করতাম, দৌড়াতাম সহপাঠীদের সঙ্গে, কাগজের ঠোঙ্গায় বাদাম, বিস্কুট ভাগাভাগি করে খেতাম। বিস্কুটের কথা মনে পড়তেই ঘিয়ে ভাজা নারিকেলের টোস্ট, কৌটা ভর্তি পাইন এপেল বিস্কুটের কথা মনে পড়ে যায়। আহারে! ছোটবেলায় টাকার অভাবে পেটভরে খেতে পারতাম না। পেটের ক্ষুধাটা যেন আরো বেড়ে গেলো।

চল চা-বিস্কুট খাই, বললাম দুলালিকে। বাড়ি ফিরতে হবে, তাড়া আছে বলে ও সামনের দিকে দ্রুত পদে এগোতে থাকে। ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে মন ভারি করে তাকিয়ে থাকি। একসময় আমার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে।

ঠিক তখনই আচমকা বাজখাঁই শব্দ তুলে অপ্রতিরোধ্য বেগে একটি বাস সামনে এগিয়ে যায়। বড়সড় একটা ধাক্কা খাই। আমি রাস্তা থেকে সিটকে পড়ি দূরে। চারপাশ বিবর্ণ হয়ে আসে। পুরো দিনের ক্লান্তিতে, অনাহারে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অবসাদে চোখজোড়া বুঁজে আসে।

কেমন করে এতটা সময় কেটে গেলো টের পাই নি। বোধ ফিরতেই দেখলাম একদল লোক আমায় ঘিরে আছে। ওঁদের মুখেই শুনলাম প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছি। কে আপনি? বাড়ি কোথায়? কোথা হতে এসেছেন? ভিড় ঠেলে কালো ফ্রেমের চশমা পরা রাশভারি একজন এগিয়ে এসে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। আরেকজন বললেন, আপনার গায়ের জ্বর হু হু করে বাড়ছে। জ্বরের কথা বলতেই মনে পড়লো, গলায় ঠা-া লাগলেই তো আমার জ্বর আসে।

অনেকগুলো অচেনা মুখের উদ্বিগ্ন দৃষ্টি ঝুঁকে আছে আমার দিকে। তাঁদের মনে আমাকে ঘিরে নানান কৌতূহল। আমি স্থির চোখে সকলের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছি, আর দুলালিকে খুঁজছি। দুলালি কোথায় গেলো? আর কিছুই যে মনে করতে পারছি না।

খেই হারানো বিবশ আমি উঠে দাঁড়াই। বুকের ভেতর বাতাসের অভাব বোধ করছি। ভেট বোর্ডিং সেন্টারে রেখে আসা জ্যাকের জন্য মন কেঁদে ওঠে। মন কেমন করা দমচাপা কষ্ট নিয়ে তাকিয়ে দেখি আমি একটা অত্যাধুনিক শপিং মলের সামনে। এ গ্রামের পথঘাট হাতের রেখার মতো মুখস্থ ছিল, কিন্তু কোথা হতে কীভাবে কোথায় এসেছি? বুঝতে পারছি না। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সাদা কাফনের মতো স্তব্ধ কুয়াশার শরীর ঘেঁষে ঘুমঘুম চোখে আমি হাঁটছি, আর ঘরে ফেরার রাস্তা খুঁজছি।

ছবি

শালুক সাহিত্যসন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিকরণের জোরালো দাবি উত্থাপিত

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

tab

সাময়িকী

বিভ্রম

পলি শাহীনা

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২১

নির্জনতার আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্জনতায় নিজের মতো করে ডুব দেয়া যায়। কত কিছু মনে পড়ে, কত ছবি ভেসে ওঠে মনের দেয়ালে। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আকাশটাকে দেখি। কত সহস্র তারা ওই আকাশের বুক জুড়ে। এ পৃথিবী হতে যারা হারিয়ে যায় তারা কি তারা হয়ে জ্বলে থাকে আকাশে? কে জানে! বাচ্চারা আজকাল ভীষণ ব্যস্ত যে যার জীবনে, ঘর সংসারে। বছরের বিশেষ দিনগুলোতেও ওরা আমার কাছে আসবার ফুরসত পায় না। এখন আমার অফুরন্ত অবসর। আগে ঘড়ির সেকেন্ডের কাটার সাথে দৌড়ালেও এখন আমার সময় যেন সামনে হাঁটে না। প্রবল ঘূর্ণি¯্রােতের মতো অতীত আছড়ে পড়ে মনের চৌহদ্দিতে। নিজেকে সঁপে দিই। অতীত নাকি নির্জনতার কাছে? ঠিক বুঝি না। খেই হারিয়ে ফেলি আজকাল। ভাগ্যিস জ্যাক রয়েছে আমার সঙ্গে। ও না থাকলে রাতদিন কথা বলাও হতো না। ওর সঙ্গে গপসপ করে সময় ভালোই কাটে। মাঝরাতে যখন মরার মতো ঘুমের ঘোরে পড়ে থাকি, তখনও আমার সঙ্গে ওর আলাপ, প্রলাপ চলতে থাকে। ধমক দিলে দূরে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে। অন্ধকার হাতড়ে যখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, তখন শান্ত হয়। আসলে আমার এ ধীর জীবনকে গতিশীল রেখেছে জ্যাক।

কখনো চাই নি বাচ্চারা দূরে যাক, তবুও ওরা বড় হয়ে দূরে চলে গেছে। এটাই স্বাভাবিক। আমরা তেরো ভাইবোন। তেরো সন্তানের জননী আমার মা, মৃত্যুর আগে প্রায়শই ফোনে বলতেন, তাঁর নিঃসঙ্গ লাগে। দূর দেশান্তরে বছরের পর বছর থাকতে থাকতে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছি। প্রাণ উড়ে যেতে চায় সে গ্রামের কোলাহলে, যেখানে আমার প্রাণের আরাম, যেখানে আমার সকল নিরাময়। গ্রামের আলো হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আমি শহরে এসে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়েও মন লাগাতে পারি না। ইট কাঠের ফাঁকফোকরে তীব্র একটা শূন্যতা গ্রাস করেছে। মায়া খুঁজতেই উড়াল দিই শেকড়ের কাছে, আমার গ্রামের কাছে। একটা বয়সের পর শেকড়ের কাছে কিংবা নিজ ঘরে ফেরাটাই বোধহয় গন্তব্য।

শীত বরাবরই প্রিয় ঋতু। বাচ্চারা ছোট থাকায় প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক বছর ধরে শীতের সময়টা দেশে আসতে পারি নি। বড় হয়ে ওরা পাখির মতো উড়াল দেয়ার পর, আমিও ছুটি পেয়ে উড়ে উড়ে চলে আসি আমার শৈশব, কৈশোরের ঘোর লাগা জায়গায়। যে জায়গায় অনেক মানুষের ভিড়ে পরম আদরে বেড়ে উঠেছিলাম।

মিঠে রোদ গায়ে মেখে পড়ার টেবিলে বসতাম। টেবিলের গা ঘেঁষে জানালার পাশেই ছিল ফুলের বাগান। বাগানের চারপাশে ছিল নাম না জানা হরেক রকমের লতাগুল্মের সমাহার। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে পড়া ফেলে ফুল বাগানে হাঁটতাম, আকাশ দেখতাম, পাখিদের সঙ্গে খুনসুটি করতাম

নভেম্বর মাস যাই যাই করছে। মনে পড়ে ছোটবেলায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার আগে, এ সময়টায় শীতে জুবুথবু হয়ে স্কুলে যেতাম। এই বছর শীতের সময়টা আরাম করে দেশে থাকব বলে এসেছি, কিন্তু শীত আসি আসি বলেও আসছে না। আমার ছোটবেলার শীতকাল ছিল বেশ মিষ্টি। সময় ধরে রাখার কোনো যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয় নি, নয়ত ফেলে আসা প্রজাপতি সময়গুলো বেঁধে রাখতাম।

গ্রামের বাড়ি এসে গত দু’দিন ভ্রমণের ক্লান্তিতে ঘরের বাইরে পা ফেলা কিংবা চোখ মেলেও দেখা হয় নি। ছিমছাম দোতলা বাড়িটির বিশাল একটি ঘর আমার জন্য নির্ধারণ করা ছিল। অন্ধকার ভেদ করে আলোর আড়ম্বর তখনো শুরু হয়নি। আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে চায়ের তেষ্টা পায়, কাউকে দেখি না। সকলে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিছু সময় পায়চারি শেষে, জানালা হতে উঁকি দিয়ে আকাশ দেখতে গিয়ে ধাক্কা খাই দৈত্যের মতো বড় বড় দালানের সঙ্গে। সকালের মিঠে রোদ, নরম হাওয়া কিছুই খুঁজে পাই না আমার এ ঘরে। চারধারের উঁচু সব প্রাচীর ডিঙিয়ে সূর্যের আলো এ বাড়ির উঠোনে প্রবেশ করতেই অনেক কসরত করতে হয় বৈকি। অথচ, আমার ছোটবেলায় শীতের দিনে সূর্য উঁকি দিলেই পুরো ঘর হলুদরঙে থইথই করত। মিঠে রোদ গায়ে মেখে পড়ার টেবিলে বসতাম। টেবিলের গা ঘেঁষে জানালার পাশেই ছিল ফুলের বাগান। বাগানের চারপাশে ছিল নাম না জানা হরেক রকমের লতাগুল্মের সমাহার। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে পড়া ফেলে ফুল বাগানে হাঁটতাম, আকাশ দেখতাম, পাখিদের সঙ্গে খুনসুটি করতাম। ঘন কুয়াশার ভিড় ঠেলে নীল অপরাজিতা গুঁজে দিতাম চুলে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে থাকতাম নিজের দিকে। বাগানবিলাস ফুলের রঙে ছেয়ে থাকত আমার পড়ার ঘর। ভোরের কাঁচা আলোয় ফুলের সুবাস, প্রকৃতির নান্দনিক ঢঙে আনমনা হয়ে যেতাম। মায়ের গলার শব্দে আবার পড়ায় মনোযোগ দিতাম। কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই। আমার ছোটবেলার চৌচালা ঘরের চারদিকের দৃশ্যগুলো সব মুছে গেছে। যতদূর চোখ যায় দেয়াল আর দেয়াল। দেয়ালের ঠাসাঠাসি ভিড়ে যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে। গোটা বাড়িটিকে গুমোট, অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগে। আমার মাথার দু’পাশে দপদপ করছে। স্মৃতির ঘা হতে উপশম পেতে পাতলা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে, দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে দোতলা বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি।

ভোরের আলো ততক্ষণে গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। ভাবছি, মিছেমিছি এত পথ পাড়ি দিয়ে সুটকেস ভর্তি করে শীতের অনেক কাপড় নিয়ে এসেছি। পাতলা এ চাদরটা ছাড়া বাকি শীতের কাপড়চোপড় বোধ হয় ভাঁজেই পড়ে থাকবে। হাঁটছি আর চারদিকে তাকিয়ে অবাক হচ্ছি। আমার জন্য পথঘাট চেনাই তো দুষ্কর। যে গ্রামে জন্ম, বেড়ে ওঠা, সে গ্রামকে চিনতেই পারছি না। আমার ফেলে আসা গ্রামের ছায়া-মায়া, বর্ণ-গন্ধ, কিছুই নেই। খোপ বন্ধি জীবন থেকে মুক্তি পেতে ছুটে এসেছি গ্রামের সবুজে, খোলামেলা পরিবেশে, এখানেও দেখছি শহরের মতো অবস্থা, অক্সিজেনের অভাব।

ভোর তার ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা দিয়ে আমাকে কাছে টানার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমি ভোরের দিকে তাকাই না। আমার চোখ খুঁজছে খেজুর গাছ। এ শীতকালে দেশে আসার অন্যতম কারণ তো খেজুরের রস খাওয়া।

রাস্তায় নেমে হালকা কুয়াশা সঙ্গে ঠা-া বাতাসের শিরশিরানি অনুভূত হওয়ায় বেশ লাগছে। যাক, দেরি করে হলেও শেষ পর্যন্ত শীত আসছে। খবরে জেনেছি আজ দিনের শেষাংশ হতে বেশ জাঁকিয়ে ঠা-া পড়বে। এমন কনকনে ঠা-ার দিনে খেজুরের রসের পায়েস আমার খুব প্রিয়। শৈশবে ঘুম ভেঙে মিষ্টি রোদে মাটির উনুনের পাশে দাদার সঙ্গে কাঠের পিঁড়িতে বসে ধোঁয়া উড়া সুস্বাদু খেজুর রসের পায়েস খেতাম, আর আগুনের উষ্ণতা নিতাম। আগুনের চুলার পাশে বসেও কাঁপতাম বলে দাদা বলতেন, আগামীকাল হতে কিছু কাঁচা খেজুরের রস খাবি। খেজুরের রসে অনেক পুষ্টিগুণ আছে। মাকে দাদা বলতেন, খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে ওরে গুড় খেতে দিও। গুড় খেলে ওর শরীরে রক্ত বাড়বে। দেখো না, আগুনের তাপে বসেও কেমন ঠা-ায় ঠকঠক কাঁপছে। ওর শরীরে রক্ত নাই, শক্তি নাই। উত্তরে আম্মা বলতেন, আপনার নাতনী পারলে তো রসের হাঁড়িটাও খেয়ে ফেলে। আম্মা, দাদা এ নিয়ে খুব হাসতে থাকে। আমি তখন খুব পায়েস খাওয়ায় ব্যস্ত থাকলেও দাদার কথাগুলো ছোট্ট মাথায় গেঁথে যায়। মনে মনে বলি, তাই তো স্কুলে অঙ্ক দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হলেও দৌড় প্রতিযোগিতায় সকলের শেষে আমার অবস্থান। রোগা বলে বন্ধুরা ক্ষেপায়, হাসাহাসি করে। ব্যাটমিন্টন খেলতে যেয়ে একটু পরেই হাঁপিয়ে উঠি বলে কেউ দলে নিতে চায় না। দাদা তো ঠিক কথাই বলেছেন। সেদিন থেকে খেজুরের রস, রসের পায়েস, গুড় আমার আরো অধিক প্রিয় হয়ে ওঠে। সে থেকেই শীতকাল এলেই আমি খেজুরের রসে উষ্ণতা, কিংবা শক্তি খুঁজতাম অবচেতন মনেই।

শীত এলেই আমার ভারি আনন্দ হতো। আমাদের গ্রামে সারি সারি খেজুর গাছ ছিল বলে দূরদূরান্ত হতে মানুষ আসতো রস সংগ্রহ করতে। একটা উৎসব ভাব বিরাজ করতো। ঘন কুয়াশা ঢাকা ভোরবেলায় কয়েক হাত দূরত্বে যখন মানুষ দেখা যেত না, ঠিক তখন মকবুল মামার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম টাটকা খেজুরের রস খাওয়ার জন্য। মামা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। শীতকালে বাড়তি আয়ের জন্য খেজুর গাছ কাটতেন। উনি বলতেন, কোনো কাজে লজ্জা পেতে নেই। যে কোনো কাজ জেনে রাখা ভাল। সবাই খেজুর গাছ কেটে রস উত্তোলন করতে পারে না, আমি পারি বলে এ সময় বাড়তি আয় করতে পারছি। উনি আমাকে মা বলে ডাকতেন। আমার বয়সী আরো অনেকে এসে জড়ো হতেন মামার পেছনে। উনি সকলকে গাছ হতে রস পেড়ে টিনের মগে খেতে দিতেন। আমরা সকলে তাঁকে সম্মান করতাম। করবে না কেন? মামা অনেককেই বিনামূল্যে অংক, ইংরেজি পড়াতেন। অনেকের বাবা-মা’র প্রয়োজনীয় কাজগপত্র দেখে দিতেন, চিঠি লিখে দিতেন। মনে পড়ে, উত্তর পাড়ার জসিম ভাই ডি.ভি লটারির চিঠি হাতে পেয়ে দৌড়ে এসেছিলেন তাঁর কাছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত্ন সহকারে তিনি সকল কাগজপত্র পূরণ করে দিয়েছেন। গ্রামের মানুষের বিপদে-আপদে মামা এক নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। আমাদের কাছে উনি ছিলেন আনন্দ। শীতের সকালে খেজুর গাছ হতে রস সংগ্রহ করে উনি যখন হাঁড়িতে ঢালতেন, তখন তাঁর চোখেমুখে যে আনন্দ খেলে যেত, তাতে আমরা ডুবে যেতাম।

আমাদের গ্রামে নামমাত্র পল্লীবিদ্যুৎ ছিল। রাত দিনের বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকতো। লোডশেডিংয়ের রাতগুলো ছিল বাঁধভাঙা আনন্দের। হারিকেনের আলোয় মায়ের ভয়ে পড়তে বসতাম ঠিকই, মা চোখের আড়াল হলেই বুদ্ধি খাটিয়ে হারিকেনের শিখা বাড়িয়ে দিতাম। চিমনি কালো হয়ে গেলে বলতাম, হারিকেনের তেল শেষ। আজ আর পড়ব না। বই, খাতা ফেলে মকবুল মামার সঙ্গে নিকোনো উঠোনে বসে আকাশে তারা দেখতাম, ঝিঝিঁদের গান শুনতাম। মামার কাছ হতে সপ্তর্ষি, কালপুরুষসহ বিভিন্ন তারাদের সম্পর্কে জেনেছি। তাঁর সান্নিধ্যে সদা আরাম লাগত প্রাণে। ঘন অন্ধকারে আবৃত বাঁশ ঝাড়ের দিকে তাকিয়ে মামা বলতেন, অন্ধকারের নিজস্ব একটা ভাষা আছে, রূপ আছে। মামার অত কঠিন ভাষা বুঝতে না পেরে মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকতাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে উনি বলতেন, অন্ধকারের ভাষা, রূপ বোঝার জন্য অন্তর্দৃষ্টি শক্তিশালী হতে হয় রে মা। এ রূপ বুঝতে হলে চোখ বুঁজে নিবিড় কান পাততে হয়। তাঁর কথা শুনে চোখ বুঁজতেই রাতজাগা পাখির ডানা ঝাপ্টানোর শব্দ এসে কানে লাগে। আমি অবাক হই। মামা বলেন, রাতের ভাষা, রঙ, রূপ আস্বাদন করতে হলে অস্থির হলে কিন্তু চলবে না। প্রকৃতির শব্দ শোনার জন্য মনকে সদা স্থির রাখতে হবে। মামার কাছ হতে কত কী যে শিখেছি, আর মনের দেয়ালে ছবি এঁকেছি, হিসেব নেই।

দেশান্তরি হওয়ার পর মকবুল মামার সঙ্গে আর দেখা হয় নি, শীতকালে তাঁর সঙ্গে তাজা খেজুরের রস খাওয়া হয় নি। জীবন থেকে কত কী এভাবেই হারিয়ে যায়। প্রথম প্রথম শীত এলে বড় মন খারাপ হতো, পরে ক্রমশ ভুলে যেতে থাকি। সম্ভবত, মানুষ একমাত্র প্রাণি যে কোনো পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বয়স বেড়েছে, চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। কোনো মানুষ স্বর্গে যাবে নিশ্চিত হলেও মরতে চায় না, আমিও চাই না, কিন্তু আজকাল শরীরে শক্তি পাই না। দাদার কথাগুলো আজো কানে বাজে। শরীর, মনে শক্তি পেতে ছোটবেলার মতো প্রচুর তাজা খেজুরের রস খেতে গ্রামে ফিরে আসি। আর যে কটা দিন বেঁচে থাকি যেন অন্যের ঘাড়ে বোঝা না হই। হাঁটাচলার মাঝেই যেন অনন্ত ঘুমে তলিয়ে যাই।

প্রস্ফুটিত ফুলের মতো নরম সকালটি এর মধ্যে দুপুরের গায়ে হেলান দিয়েছে। আমি হাঁটছি, কিন্তু খেজুর গাছ বা আমার ছোটবেলার গ্রামটিকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলাম। একটাও খেজুর গাছ চোখে পড়লো না। মানুষের আচরণও কেমন বদলে গেছে। পিচঢালা রাস্তার বাঁ দিকে নীল রঙের বিরাট অট্টালিকার দিকে তাকিয়ে আছি। আমাকে পাশ কাটিয়ে কয়েকটি কিশোর হেঁটে যায়। আমি ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকায়, পরে এড়িয়ে যায়। ওদের কাউকেই চিনি না। নিজ থেকে কথা বলতে চেয়েও পাত্তা পেলাম না। ওরা সিগারেট টানছিল, যেতে যেতে আমার মুখের সামনেই ধোঁয়া ছাড়লো। ওদের এহেন অশালীন আচরণে বেশ রাগ হলো, নিজেকে পরে সামলে নিয়েছি। আমার কৈশোরেও কাউকে কাউকে সিগারেট খেতে দেখেছি, কিন্তু মায়ের বয়সী কারো মুখের সামনে ধোঁয়া ওড়াতে তো দেখি নি। ভাবছি, এ কোন রুক্ষ দিনকাল এলো।

আমি অতীতের সুন্দর দৃশ্যগুলো নিংড়ে নিংড়ে অনুভব করছি। চোখের লেন্সে একের পর এক দৃশ্যপট ভেসে উঠছে। চোখের লেন্স কখনো কখনো মহাকাল ধরে রাখে। ছোটবেলায় বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে দেখলে সালাম দিয়ে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করতাম, খোঁজখবর নিতাম। কোন প্রয়োজন হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতাম। পাশে বসে গল্প করতাম, হাসির গল্প শুনে মাটিতে লুটোপুটি খেতাম। ওঁদের সঙ্গে গল্প করার অভিজ্ঞতা পৃথিবীর মধুরতম অভিজ্ঞতা। ওঁদের চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে যেন মহাকাল। কত সহজ সুন্দর জীবন ছিল তখন। সময় বুঝি পালটে দেয় মানুষের জীবন।

জীবন জুড়ে চলার পথে আমরা কেবল হারাতে থাকি। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিয়োগের পরিমাণ শুধু বাড়ে। কত রকমের হারিয়ে যাওয়া আছে জীবনে। গ্রাম হারাই, রাস্তা হারাই, ঘর হারাই, বন্ধু হারাই, চশমা হারাই, হারাই ঘরের চাবি। হারানো বস্তুর তালিকা বড় দীর্ঘ। আজকের দিনের কিশোররা প্রযুক্তির চাপে হয়ত ওদের বোধ বিষয়টিকেই হারিয়ে ফেলেছে। ওরা হয়ত জানেই না ভোরবেলার আধো আলো আধো অন্ধকারে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার স্বাদ, কিংবা নরম রোদে মাটির উনুনের পাশে বসে দাদার মুখে গল্প, কৌতুক শোনার অনাবিল হাসি, আনন্দের কথা।

উঁচু নিচু আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমি ক্রমাগত হাঁটছি আর খেজুর গাছ খুঁজছি। হারানোর তালিকা দীর্ঘ হলেও আমার স্মৃতি এখনো হারাই নি। স্মৃতির সর পড়া মহাসমুদ্রে ছোটবেলার স্মৃতিরা অনবরত ঘাই মারছে। দুপুরও ততক্ষণে যাই যাই করছে। শীতকালীন স্বল্পায়ুর দিনগুলোর বিকেলের আলো খুব ক্ষনস্থায়ী হয়। হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা ক্লান্তি পেয়ে বসেছে। একটা ধবধবে সাদা গাড়ি সাঁই সাঁই শব্দ তুলে চলা যায় খুব পাশ ঘেঁষে। ঠিক এ পথটি ধরে ছোটবেলায় কাদা, জল পায়ে মেখে স্কুলে যেতাম। প্রাইভেট কার-এ গ্রামে দেখছি বলে তো মনে পড়ছে না। তবে মাঝেমধ্যে মোটর সাইকেল, রিক্সা দেখেছি। অবশ্য যন্ত্রচালিত কোনোকিছুর প্রতি আমার তেমন আকর্ষণ ছিল না। আমার আকর্ষণ ছিল বায়োস্কোপের প্রতি।

‘কী চমৎকার দেখা গেলো এইবারেতে আইসা গেলো, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেলো।’ -কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে সুর আর ছন্দের লয়ে লয় মিলিয়ে বায়োস্কোপ দেখার সীমাহীন আনন্দের ঢেউ এসে দোল খাচ্ছে প্রাণে। সেসময় কখনো সিনেমা দেখি নি, কিন্তু উত্তর দিকের বিশাল এ মাঠটায় বায়োস্কোপওয়ালার ছন্দোময় বর্ণনায় বিভোর হয়ে বায়োস্কোপ দেখেছি ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে। বায়োস্কোপ দেখার জন্য মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখতাম। এ মাঠটার কাছে এসে কত কী যে মনে পড়ে গেলো। একবার বায়োস্কোপ দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলি। পানেশ্বর ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অপেক্ষায় ছিলাম, কখন ভালো হবো? কখন আবার বায়োস্কোপ দেখতে যাব? আসলে পাহাড়কে বদলানো যায়, বদলানো যায় নদীর স্রোতধারাকেও, কিন্তু মানুষের প্রকৃতি বা স্বভাবকে তো আর বদলানো যায় না। এই যেমন আমি, শেষ বয়সে এসেও গোটা দিন ধরে হন্যে হয়ে খেজুর গাছ, খেজুরের রস খুঁজছি।

উত্তরের এ মাঠটিকে অনেকে জঙ্গল বললেও আমি বাগান বলতাম। ঘন সবুজ ঘাস বিছানো মাঠে হরেক রঙের বুনোফুল ফুটে থাকতো। দেখে দেখে সাবধানে পা ফেলতাম, ওদের কখনো মাড়িয়ে যেতাম না। ওদের গায়ে গাঢ় আদরে হাত বুলিয়ে দিতাম, প্রাণ খুলে পাঁজরে লুকানো সব গল্প ওদের বিড়বিড় করে বলতাম। বুনোফুল আর আমি, আমাদের মধ্যে অদ্ভুত প্রণয়ের অদৃশ্য একটি মায়ার সম্পর্ক ছিল। মাঠের এক কোণে ছিল পদ্মদিঘি। দিঘির জলে নৌকায় কত ভেসেছি। পদ্মফুল ফুটে থাকা দীঘির জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতাম, পদ্মফুল তুলতে তুলতে মাছেদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতাম, আর স্বচ্ছ জলে নিজের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। দীঘির পশ্চিম কোণে ছিল মকবুল মামার ঘর। মনের সবটুকু মাধুরি মিশিয়ে হরেক রঙের ফুলের বাগান করতেন তিনি। এ মাঠে এলেই তাঁর কামিনী ঝাড় হতে সৌরভ এসে নাকে লাগতো। মামার কাছে পড়তে গেলে কিংবা বই আনতে গেলে সঙ্গে আঁজলা ভরে ফুল দিতেন। খুব শৌখিন এবং স্বল্পভাষী মানুষ ছিলেন মামা, কিন্তু বাংলা, ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে বসলে বেশ চঞ্চলতা লক্ষ্য করতাম তাঁর মাঝে। দরাজ কণ্ঠে যখন ‘শেষের কবিতা’ পাঠ করতেন তখন তাঁকে রোমান্টিকও মনে হতো। তাঁর শিল্প ভাবনা, শিল্পের প্রতি অনুরাগ বরাবর আমাকে অভিভূত করতো। তাঁর মুখে শুনে শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি মুখস্থ হয়েছিল। এ দীঘির পাড়ে বসে ভরা পূর্ণিমা রাতে আমি, কুসুম, সুমনা, মামার সঙ্গে গল্প করতাম। আমাদের গল্প, আনন্দ, আড্ডায় চাঁদের আলো যেন সোনার আলো হয়ে ঝরে পড়তো ধরণীতে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলো এতটাই প্রখর হতো, মাঝরাতকে তখন মধ্য দুপুর বলে ভ্রম হতো।

‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ

খুঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে

চেয়ে দেখি ছাতার মতো বড় পাতাটির নিচে বসে আছে

ভোরের দয়েলপাখি- চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ

জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশ্বত্থের করে আছে চুপ;

ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;

মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে

এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ’

মামার মধুর কণ্ঠে জীবনানন্দের কবিতার আবৃত্তি দু-চোখ বুঁজে শুনতে শুনতে, আমরা চাঁদের আলোয় জ্যোৎস্না পাখায় ভর করে হারিয়ে যেতাম নিঝুম আনন্দলোকে। শুধু আমরা নয় মাঠের জলজংলা, বুনোফুল, দীঘির জলেও যেন সুর তুলতো তাঁর জাদুময় স্বর। আকাশটা সহ সহস্র লক্ষ কোটি তারারাও কান পেতে শুনতো তাঁকে।

এ মাঠটি তো শুধু একটি মাঠ নয়, এ মাঠটি হলো আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম গল্প। পৃথিবীর সব গল্প মধুর না হলেও এ মাঠের গল্প বড় মধুর। স্বর্গ দেখতে কেমন? আমি জানি না। তবে এ মাঠের বুনোফুল, সবুজ ঘাসের বুকে জমে থাকা ভোরের শিশিরকে আমার স্বর্গ মনে হতো। আমার অনুভূতিতে জগতের সমস্ত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এ মাঠের বুকে। এ মাঠে বসে কলাপাতায় ভাগাভাগি করে অমৃতসম খেজুর রসের পায়েস খেতাম সঞ্জু, দুলালির সঙ্গে। হিন্দু-মুসলমান গোঁড়ামি ছিল না আমাদের মাঝে। আমরা তখন মানুষ ছিলাম।

ওমা! দুলালির কথা বলতেই ও এসে হাজির। গোটা দিন একা একা ঘুরেছি, পরিচিত কাউকে পাই নি। ওর আগমনের সঙ্গে বাতাসে চেনা কামিনী ফুলের সুবাসটাও ছড়িয়ে পড়েছে। কী যে ভালো লাগছে আমার।

- কত বছর পর আমাদের দেখা হলো রে?

- দুই যুগেরও বেশি সময় পর।

- কেমন আছিস?

- ভালো।

- তুই?

- ভালো আছি।

- মনে আছে এ মাঠে আমরা ঘুড়ি উড়াতাম?

- খুব মনে আছে।

দুলালি কথায় কথায় হাসতো। ও আজো ঠিক আগের মতোই হাসিখুশি রয়ে গেছে। কথা বলছে আর খিলখিল হাসছে। আমরা পদ্মদিঘির চত্বরে এসে দাঁড়াই। দু’জনে তাকিয়ে আছি জলের দিকে। সুনসান চারদিক, আকাশটা আশ্চর্য নীল।

গ্রামের বুকে শহরের জুলুম শুরু হয়েছে, সভ্যতার নিষ্ঠুর প্রহারে গ্রাম হারিয়ে গেছে- দুলালি বলে। আমি চুপচাপ তাকিয়ে দেখছি, দীঘির জলে ঠোঁট দিয়ে ডানা ঘষছে হাঁসের পাল। ‘এ মাঠে বসে পুঁথি শুনতাম, বাংলার মানুষের জীবনের গান শুনতাম, সেসব আসর আজ আর বসে না। জলাভূমি ভরাট করে আকাশচুম্বী দালান উঠছে। গ্রাম প্রধান দেশের গ্রাম ধ্বংস করে এমন নগরায়ন চাই না। আগে প্রতিবাদ করতাম ভূমি ধস্যুদের সঙ্গে, এখন আর করি না। লাভ নেই। মানুষগুলো আজ আর মানুষ নেই, যন্ত্র হয়ে গেছে। রাতদিন টাকা আর টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। নীরবে চেয়ে দেখি গ্রামগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে। সারি সারি খেজুর বাগানগুলোর জন্য বড় প্রাণ কাঁদে। খেজুর গাছের কোটরে ডিম ফুটে পাখির বাচ্চাদের আর্তনাদ, কিচিরমিচির শব্দ কানে এসে বাজে। তাল গাছগুলো সব কেটে ফেলা হয়েছে। দীঘির জলে কই মাছের ঘাই, কী সুন্দর! পদ্মফুলে তিরতির উড়ছে রঙিন প্রজাপতি, আজো দেখতে পাই। চোখের লেন্স যে মহাকাল ধরে রাখতে সক্ষম! মানুষ যেভাবে প্রকৃতিকে হত্যা করেছে, বেশি দেরি নেই, প্রকৃতিও মানুষের কপালে মৃত্যু তিলক এঁকে দেবে।’ এক নাগাড়ে কথাগুলো বলল দুলালি। ওর অবয়বে মেঘের ছায়া, চোখ দ্বয় ভিজে উঠেছে। শীতের মধ্যেও ওর কথা শুনে আমি ঘামতে থাকি। কথা বলতে বলতে আমরা দীঘির পাশ ফেলে মাঠের এক কোণে রাস্তার দ্বারে এসে দাঁড়াই।

অনতিদূরে সবুজে চাওয়া সারি সারি কয়েকটি ঘর, আঙিনাজুড়ে লাউ, কুমড়ার মাচা। এর পাশেই গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগির খোয়াড়। হারিকেনের আলোয় বসে পুতুলের মতো একটি ছোট বাচ্চা বই পড়ছে। পুতুলের মতো এইটুকুন বাচ্চা অত মনোযোগ দিয়ে কী পড়ছে? ওর বয়সে এই সময় আমি খোলা মাঠে হৈচৈ করতাম, দৌড়াতাম সহপাঠীদের সঙ্গে, কাগজের ঠোঙ্গায় বাদাম, বিস্কুট ভাগাভাগি করে খেতাম। বিস্কুটের কথা মনে পড়তেই ঘিয়ে ভাজা নারিকেলের টোস্ট, কৌটা ভর্তি পাইন এপেল বিস্কুটের কথা মনে পড়ে যায়। আহারে! ছোটবেলায় টাকার অভাবে পেটভরে খেতে পারতাম না। পেটের ক্ষুধাটা যেন আরো বেড়ে গেলো।

চল চা-বিস্কুট খাই, বললাম দুলালিকে। বাড়ি ফিরতে হবে, তাড়া আছে বলে ও সামনের দিকে দ্রুত পদে এগোতে থাকে। ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে মন ভারি করে তাকিয়ে থাকি। একসময় আমার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে।

ঠিক তখনই আচমকা বাজখাঁই শব্দ তুলে অপ্রতিরোধ্য বেগে একটি বাস সামনে এগিয়ে যায়। বড়সড় একটা ধাক্কা খাই। আমি রাস্তা থেকে সিটকে পড়ি দূরে। চারপাশ বিবর্ণ হয়ে আসে। পুরো দিনের ক্লান্তিতে, অনাহারে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অবসাদে চোখজোড়া বুঁজে আসে।

কেমন করে এতটা সময় কেটে গেলো টের পাই নি। বোধ ফিরতেই দেখলাম একদল লোক আমায় ঘিরে আছে। ওঁদের মুখেই শুনলাম প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছি। কে আপনি? বাড়ি কোথায়? কোথা হতে এসেছেন? ভিড় ঠেলে কালো ফ্রেমের চশমা পরা রাশভারি একজন এগিয়ে এসে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। আরেকজন বললেন, আপনার গায়ের জ্বর হু হু করে বাড়ছে। জ্বরের কথা বলতেই মনে পড়লো, গলায় ঠা-া লাগলেই তো আমার জ্বর আসে।

অনেকগুলো অচেনা মুখের উদ্বিগ্ন দৃষ্টি ঝুঁকে আছে আমার দিকে। তাঁদের মনে আমাকে ঘিরে নানান কৌতূহল। আমি স্থির চোখে সকলের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছি, আর দুলালিকে খুঁজছি। দুলালি কোথায় গেলো? আর কিছুই যে মনে করতে পারছি না।

খেই হারানো বিবশ আমি উঠে দাঁড়াই। বুকের ভেতর বাতাসের অভাব বোধ করছি। ভেট বোর্ডিং সেন্টারে রেখে আসা জ্যাকের জন্য মন কেঁদে ওঠে। মন কেমন করা দমচাপা কষ্ট নিয়ে তাকিয়ে দেখি আমি একটা অত্যাধুনিক শপিং মলের সামনে। এ গ্রামের পথঘাট হাতের রেখার মতো মুখস্থ ছিল, কিন্তু কোথা হতে কীভাবে কোথায় এসেছি? বুঝতে পারছি না। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সাদা কাফনের মতো স্তব্ধ কুয়াশার শরীর ঘেঁষে ঘুমঘুম চোখে আমি হাঁটছি, আর ঘরে ফেরার রাস্তা খুঁজছি।

back to top