alt

সাময়িকী

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

জয়নাল আবেদীন শিবু

: বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২

শিল্পী : সালভাদর দালি

কবিতা শিল্প মাধ্যমের সূক্ষ্মতম ও সুন্দরতম শাখা। সাহিত্যরে এই শাখাটি প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে একটা কাঠামোর ভেতর দিয়ে। কবিতা নয় কেবল, শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমই আদি কাঠামো থেকে উত্তর কাঠোমোতে প্রবেশ করা একেবারে বিচ্ছিন্ন বা মূলচ্যুত কোনো ঘটনা নয়। সময় পরিসরে শিল্পের পরিবর্তন লক্ষ্যযোগ্য। যদি বলা যায় কবিতা একটা স্রোতস্বিনী, তাহলে এর অনন্ত প্রবাহে বাঁক নেয়া স্বাভাবিক। গতি পরিবর্তনে নতুন মোড় নিয়ে নবায়িত ধারা এগিয়ে চলে সামনের দিকে এবং যেতে যেতে আবারো বাঁক নিয়ে এগিয়ে চলে। কিন্তু নদীর স্রোত একেবারে বিচ্ছিন্ন না হয়ে একটা সাযুজ্য রেখে চলে সর্বদা। একটা যোগসূত্র থাকেই। আমরা এখানে বলতে চাইবো, বাংলা কবিতার যাত্রাও একটা কাঠামোর ভেতর দিয়ে চলছে। পরম্পরাগত একটা সমন্বয় রয়েছে। কবিতায় পূর্বাপর যোগসূত্রকে ‘ঐতিহ্য-চেতনা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। রবীন্দ্র-নজরুল কাব্য ভাষা থেকে ত্রিশের কবিরা বাংলা কবিতায় নতুন একটা আবহ নিয়ে হাজির হলেন ঠিকই তবে কবিতার বিষয়ে তেমন রকমফের হয়নি। কেবল আঙ্গিক, প্রকরণ অন্যভাবে আর্বিভূত হয়েছে। বাংলা কবিতায় এ রকম বাঁক নিয়েছে আরো। মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে মধ্যযুগের আবরণ খুলে আধুনিক উজ্জ্বল প্রকরণে সেজেছে বাংলা কবিতা। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ঘটনাস্রোতের কারণে কবিতায় সূচিত হয় রূপান্তর। পঞ্চাশ ষাটের দশকের কবিতায় রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রভাব পড়েছিলো, সন্দেহ নেই। সে সময়ের কবিতায়- ‘যুদ্ধ নয়, আমরা চাই শান্তি’, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’, ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরনো শকুন’- এরকম উচ্চকিত রাজনৈতিক অনেক সে্লাগান উচ্চারিত হয়েছে। সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কবিরা বলিষ্ঠভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন কবিতার মাধ্যমে। এমন অনেক পংক্তি কাব্যের শিল্পগুণের চেয়ে বক্তব্যপ্রধান হিসেবে উচ্চকিত হয়েছে। স্বীকার করতেই হবে, কবিদের কথা রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আঘাত করেছে তুমুলভাবে। অবশ্য রাজনৈতিক উচ্চারণের বাইরেও কব্যিক আমেজে নির্মিত হয়েছে এ সময়ে আবুল হাসান, সিকদার আমিনুল হক প্রমুখের কবিতা। এভাবে আশির দশকেও রাজনৈতিক ঘনঘটার বাইরে নির্মেদ কাব্যিক ঘনঘটাই বেশি পরিলক্ষিত হয় হাতেগোনা দুচারজন কবির কবিতায়। কবিতার বিষয় ও প্রকরণে সময় ভেদে এভাবে পরিবর্তন এসেছে।

বলা হয়ে থাকে- ‘কবিতার ইতিহাস টেকনিক পরিবর্তনের ইতিহাস’। ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডবের পর এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রতিভাসিত হয় বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের কবিতায়। ত্রিশের মতো বিষয়গত রূপান্তরের সাথে সাথে নব্বইয়ের কবিতায় প্রাকরণিক বা আঙ্গিকগত পরিবর্তন আমাদের কাছে মোটাদাগে আভাসিত। এ সময়ের কবিতা আলোচনার ক্ষুদ্র প্রয়াসেই এ লেখনি। শুরুতেই স্বীকার করে নেয়া ভালো- এটি নব্বইয়ের দশকের কবিতার পূর্ণ কোনো আলোকপাত নয়। আংশিকমাত্র।

নব্বইয়ের দশকের কবিতা শুরু হয়েছিলো লিটলম্যাগকেন্দ্রিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় নিজস্ব প্লাটফর্মে কাব্যচর্চা শুরু করেন কবিকুল। গোষ্ঠীবদ্ধ এমন কাব্যচর্চা ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়াসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত লিটলম্যাগকেই কাব্যচর্চার মূল জমিন হিসেবে বেছে নিয়ে কবিরা কবিতার বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। সারা দেশেই একটা কাব্য আন্দোলন গড়ে ওঠে এ সময়। বিশ্বায়নের প্রসার,

পরাশক্তির উত্থান, স্বৈরাচারী শাসন-শোষণ, সমকালীন অস্থিরতা নব্বইয়ের কবিতায় বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে। এ সময়ের কবিতায় বহুস্বরের (পলিফনি) ভাব বিদ্যমান। নানা ভঙ্গিতে নির্মিত হয় কবিতা। কাব্যশরীরে প্রবলভাবে প্রবেশ করে লোকজ-অন্ত্যজ-নাগরিক ও প্রাযুক্তিক শব্দ সমাহার। কবিতায় লক্ষ্য করা যায় ভাষার বক্রতা, ভাবের ভিন্নতা। এ সময়ের কবিরা টেকনিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় কাব্যনদের দীর্ঘ প্রবাহে কুঠারাঘাত করে নতুন গতিপথ নির্মাণে সচেষ্ট হন। মুক্তছন্দ, মুক্তগদ্যের চর্চায় ‘ছক বাঁধা কাঠামো’ থেকে কবিতাকে মুক্ত করে নেন নব্বইয়ের কবিরা।

আর এতে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, হৃদয়ক্ষরিত প্রতিভাস উঠে এসেছে, সেই ক্ষরণ, সেই দগ্ধতা শশ্মানের চেয়েও কম জ্বালাময়ী নয়। আসলে জ্বলতে না জানলে কি আলো বিকিরিত হয়? আসলে জীর্ণতাকে পোড়াতে হলে নিজেকেই যে পুড়তে হয় এ চিরসত্য কবি উপলব্ধি করেন-

‘পুড়বো না, এ কথা বলতে পারে না শ্মশানের কাঠ,

অন্যকে পোড়াতে হলে আগে নিজেকে পুড়তে হয়।’

[মিহির মুসাকী]

কবিতার স্বপক্ষে শান্তি কুমার ঘোষ বলেন,- ‘কবিতা হচ্ছে সেই আর্ট যা দুঃসাধ্য আত্মনিয়োগ ও অনুশীলন দাবী করে। তার জন্য কবিকে অন্তত নিজের ভাষা সম্বন্ধে অন্যের চাইতে সচেতন... সংবেদনশীল এবং ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের অর্থ সম্বন্ধে অবহিত হতে হবে।’ নব্বইয়ের কবিরা অনেক বেশি আত্মসচেতন, শব্দ সচেতন। স্বাদেশিক ঐতিহ্য চেতনায় দৈশিক ও বৈশি^ক কাব্যভাষাও নির্মাণ করে চলেছেন কেউ কেউ। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে তাদের কবিতায় সর্বজনীন হয়ে ধরা দিয়েছে সময়ের অভিঘাত-

‘আমাদের একদিকে ক্ষুধা অন্যদিকে অগাধ মমতা

মধ্যপ্রাচ্যের রাখাল কিংবা নির্মাণ-শ্রমিকের মতো

সম্মুখে সদা দোদুল্যমানতা’

কিংবা,

‘তবু প্রতিরাতে কলঙ্কের পাশে গিয়ে শুই

ভারতবর্ষ বিভাজিত করে পদ্মা, যমুনা তিস্তার বুকে

পড়ে থাকি পরস্পর সম্পর্কের মায়া’

[ওবায়েদ আকাশ]।

সম্পর্কের মায়া, মাটি ও মানুষের মায়া কবিকে উজ্জীবিত করে, উত্থিত করে। বিশ^ায়নের অভিঘাতে কবির ভাবনায় রক্তবীজ ফুটে। পুঁজির প্রবল প্রতাপে অবদমিত মানবত্মার কান্না, নিপীড়ন যন্ত্রণার প্রবহমান স্রোত কাব্যিক ব্যঞ্জনায় বিভাসিত হয়ে ওঠে। কবির নিবিড় চিন্তায় রেখাপাত করে বিষণœতা-

‘প্রগতির নেভানো চুল্লি থেকে আকাশের মেটিওর শাওয়ার পর্যন্ত ঝরে গেছে অনেক অনেক আলফ্রেড সরেন- বস্তুত কালো ঘোড়ার চিঁহি ডাকে সরে যাচ্ছে পরিণত মেঘ- কতশত বিপ্লবের চুঁয়ানির তলে কতশত তত্ত্বের ফুলঝুরি মেখে এই আমরাই দ্যাখো আজ ফুল বাগানের আড়ালে সারমেয়-সঙ্গম দেখে বিমোহিত হই...’

[কামরুল ইসলাম]

নব্বইয়ের কবি জফির সেতু ও শোয়াইব জিবরান। লোকায়ত বাংলাকে পাওয়া যায় তাঁদের কাব্যের পরতে পরতে। ইতিহাস, মিথ-পুরাণ, ধ্রুপদী চরিত্র, আদিম অনুসঙ্গের নানা বাক প্রতিমায় ঋদ্ধ হয়ে ওঠে তাঁদের কবিতা। ভারতীয় পুরাণ থেকে গ্রিক পুরাণেরও সমান উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় সেসব কবিতায়-

এমন বসন্ত দিনে আমি গ্রীস-রোম-ব্যাবিলন হয়ে

হরপ্পার যুগল মূর্তির কোল ঘেঁষে প্রেরণাস্বরূপ

দাঁড়িয়েছি নটরাজ। পষ্ট দেখি আমার ছায়ার রং

লেগে আছে তাদের শরীরে- সে শব্দ শুনতে পাই

সিন্ধুর গোপন গান জীবনে খুব কম লোকে শোনে।

আমাকে প্রতিভূপাখি ভেবে যারা বসিয়ে রাখে পাতায়

তাদের নাড়িতে টাইগ্রিস লোহিত উত্তেজনায় কাঁপে।

[জফির সেতু]

ভাব ভাষা ও ভাবনার নতুনত্ব নব্বইয়ের দশকের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত শব্দকে নতুন অভিধায় অভিহিত করার নিরীক্ষাও দেখা যায় কবিতায়। কখনোবা উপমা, উৎপ্রেক্ষা ভিন্নার্থে ব্যবহৃত হয়ে নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করে। যেমন: ‘ইস্পাতের গোলাপ’ [দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু], কিংবা, ‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ [মোস্তাক আহমাদ দীন]। অনেকের কবিতায় অভিনব উপমা, আকর্ষণীয় ভঙ্গিমাও লক্ষ্যনীয়। ব্যবহারিক কথাবার্তার নান্দনিক উপস্থাপন পাঠকমনে রস সঞ্চার করে। আনন্দ সাগরে অবগাহন করায়-

‘সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বিবাহ পর্যন্ত এলো

আমি আর সিলভিয়া মিলে

মাছ-আড়তের পাশে বাড়িভাড়া নিয়ে আছি

শস্তায় মাছ কিনি; সহজ আমিষ খাই

আশপাশে অনেক বরফকল। আমরা প্রস্তুত আছি

আমাদের সম্পর্কের

কখনো পচন এলে; শস্তা বরফ কিনে পচন ঠেকাব’

[মাসুদার রহমান]

কবি সরকার আমিনের কবিতায় প্রেম, দর্শন ও ব্যক্তি আমিনের মাঝে বিশ্বরূপ খুুঁজে পাওয়ার প্রয়াস লক্ষ্যণীয়-

‘আমি মারা গেলে দয়া করে কেউ শোক করবেন না। চোখের পানি ফেলবেন না। প্রেমিকার হাত শক্ত করে ধরে রেখে আলতো করে চুমু খাবেন অদূরবর্তী ঠোঁটে আর বলবেন স আ ছিলো আসলে প্রেমের মাস্তান। তাঁর সৌজন্যে এই চুম্বন উৎসর্গ করা হলো।

প্রেমিকার অনুপস্থিতিতে নিঃসঙ্গ কোনো যৌনকর্মীর হাতে গুঁজে দিয়ে কিছু পুষ্প ও টাকা; বলবেন, ভালবেসে দিলাম,

আজ রাতে ঘরে যাও বনলতা, বিশ্রাম করো।’

[সরকার আমিন]

কবি ক্রিস্টোফার কডওয়েল বলেন- ‘কবিতা এমন-ই একটি দর্শন, যেখানে ব্যক্তি জীবন ও বর্হিজীবন শব্দ প্রতীকে রূপান্তরিত হয়।’ শব্দে শব্দে আসলে কবিতা ও জীবন একাকার হয়ে ওঠে। কবিতার পংক্তিগুলো মুখরোচক হলেই ব্যাস, নিঙড়ে নিঙড়ে রসাস্বাদন করা যায়। বিষয়ের চেয়ে ভাষাই মুখ্য হয়ে ওঠে তখন। নব্বইয়ের দশকের কবি মুজিব ইরম এমন এক কাব্যধারা সৃষ্টি করে চলছেন যে, তাঁর পংক্তিগুলো পাঠককে টেনে টেনে নিয়ে যায় সামনের দিকে। লোকজ শব্দের প্রাচুর্য, মধ্যযুগের গীতিময়তা তাঁর কবিতায় ভিন্ন মাত্রা পায়। তাঁর কবিতায় উপজীব্য লোকভাষা, লোকশব্দ, লোককথাগুলো আর সেকেলে থাকে না, কাব্যগাঁথুনিতে হয়ে ওঠে আধুনিক ও সর্বজনীন-

‘যে পুকুরে কলমি লতা ভাসে, যে পুকুরে কাঁঠাল ছায়া হাসে, যে পুকুরে পানা ফুলের ঢেউ, যে পুকুরে জোছনা ভাসায় কেউ, যে পুকুরে নাই হয়ে যায় চিতল মাছের ঘাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।

জাম্বুরা ফুল কেমন করে ফোটে, ভাটি ফুল কেমন করে চিত্তমায়া লুটে, কেমন করে শুকনা খালে ফুলের দেখা পাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।

ইরি ক্ষেতে পাকনা ধানের হাসি, মাছ চলাচল করে, নিঝুম সন্ধ্যায় বৃষ্টি জলে ভাসি, জল ফিসফিস করে, রোদ থৈ থৈ রোদ থৈ থৈ ডাক শুনতে পাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।

ও আমার বিল ভাসানো নয়া পানির রূপ, কোড়া ডাকে কোড়া ডাকে দুপুর বেলা চুপ, ও আমার রাস্তা ডুবা হঠাৎ ঢলের স্রোত, কোথায় গেলো কোথায় গেলো, তার দেখা ফের চাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।’

[মুজিব ইরম]

নব্বইয়ের আরেক কবি ব্রাত্য রাইসু লোকভাষাকে কবিতায় নির্মিতি দানের মাধ্যমে একটা স্বাতন্ত্র্যিক কাব্যধারা সৃষ্টি করে নিয়েছেন। জনমানুষের ভাষা অনুবাদহীনভাবে কবিতার শরীরে প্রবেশ করলে কবিতার আবেদন কখনো ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং অনেকগুণ বেড়ে যায়। লোকভাষা, লোকসংস্কৃতি কখনো আঞ্চলিক স্বাক্ষর হয়ে ওঠে কবিতার ভেতরে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অস্তিত্ব সংকট, ব্যক্তিত্বের সংঘাতের বিরুদ্ধে ব্রাত্য রাইসুর শ্লেষ ও বিদ্রুপের উচ্চারণ বিশেষভাবে আলোচিত।

কবি ইকবাল হোসেন বুলবুলের কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ মরমীচেতনা। তিনি ভাবের নির্জাসকে আরোহণ করেন মানুষের বিশ^াস ও যাপনের গভীরতর ভাবানুবাদ থেকে। এর রাইরেও মানবীয় রোমান্সের নব বিনির্মাণেও সাবলীল প্রত্যয়ী। সেখানেও স্বাতন্ত্র্য, সেখানেও সহজাত পাঠাভ্যাসকে নাড়া দিতে সক্ষম এই কবি।

‘পূর্ণ চাঁদ লটকে থাকে তার নাভিমূলে। ঝাঁপ দিয়ে নিজেরে লুকাই।

লোকে বলে আত্মহত্যা; আর আমি বলি আত্মহারা।

তাই নিয়ে শহরের অলিগলি, চলে কানাকানি...’

[ইকবাল হোসেন বুলবুল]

প্রতিষ্ঠিত সত্যের (হয়তো সত্য নাও হতে পারে) বিপরীতে আর একটি সত্য (প্রকৃত সত্য) প্রতিষ্ঠায় শক্তিমত্তা দেখাতে চেষ্টা করেছেন নব্বইয়ের দশকের কেউ কেউ। বহুকাল থেকে চলে আসা গতানুগতিক ধারণাকেও শুধরে দিয়েছেন গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। এর প্রমাণ দেখে নেয়া যেতে পারে-

‘মেরু অঞ্চলে পাখি উষ্ণতার খোঁজে

এদেশে শীতে এসে পড়ে

যতোই অতিথি বলি, তারা কিন্তু বেড়াতে আসে না

আসে অভিশাপে, চিরতুষারের।’

[চঞ্চল আশরাফ]

কী বুঝা গেল? শীতকালে বাংলার হাওর-বাওর, বিলে-ঝিলে আসা পাখিরা আমাদের আদর পেয়ে আনন্দ ভ্রমণে আসে? আমরা আহ্লাদ করে তাদের ‘অতিথি’ বানিয়েছি। নয় কি? আমরা সেই পাখিদের শরণার্থী জীবনের কথা ভেবে অতিথি বলি কি? এই গতানুগতিক বিশ^াসকে ভেঙে প্রকৃত কথাটি জানিয়ে দেন একজন পর্যবেক্ষক, নিরীক্ষাপ্রবণ কবি!

নব্বইয়ের দশকের কবিতার স্বাতন্ত্র্যিক এ ধারা এগিয়ে গেছে- কবি সরকার আমিন, ওবায়েদ আকাশ, মাসরুর আরেফিন, মিহির মুসাকী, বায়তুল্লাহ কাদেরী, মুজিব ইরম, শাহনাজ মুন্নী, কবির হুমায়ূন, ইকবাল হোসেন বুলবুল, মজনু শাহ, ব্রাত্য রাইসু, শামীম রেজা, কামরুল ইসলাম, পরিতোষ হালদার, তুষার গায়েন, ভাগ্যধন বড়ুয়া, মাসুদার রহমান, তাপস গায়েন, কামরুজ্জামান কামু, শান্তা মারিয়া, শাহেদ কায়েস, জুনান নাশিত, মিলটন রহমান, মাহফুজ আল-হোসেন, রোকসানা আফরীন, মোস্তাক আহমাদ দীন, হেনরী স্বপন, জাফর আহমদ রাশেদ, চঞ্চল আশরাফ, রাগীব হাসান, জফির সেতু, মামুন মুস্তাফা, বদরে মুনীর, আহমেদ নকীব, গাজী লতিফ, শিবলী মোকতাদির, খলিল মজিদ, অনিকেত শামীম, হাদিউল ইসলাম, কাজল কানন, আলফ্রেড খোকন, নেহাল আহমেদ, শোয়াইব জিবরান, টোকন ঠাকুর, মাহবুব লীলেন, খোকন মাহমুদ, কুমার চক্রবর্তী, শেলী নাজ প্রমুখের হাত ধরে। এছাড়া এর বাইরেও নব্বইয়ের আরো কিছু শব্দযোদ্ধা রয়েছেন যারা তাদের লেখনি দিয়ে বাংলাদেশের কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

tab

সাময়িকী

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

জয়নাল আবেদীন শিবু

শিল্পী : সালভাদর দালি

বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২

কবিতা শিল্প মাধ্যমের সূক্ষ্মতম ও সুন্দরতম শাখা। সাহিত্যরে এই শাখাটি প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে একটা কাঠামোর ভেতর দিয়ে। কবিতা নয় কেবল, শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমই আদি কাঠামো থেকে উত্তর কাঠোমোতে প্রবেশ করা একেবারে বিচ্ছিন্ন বা মূলচ্যুত কোনো ঘটনা নয়। সময় পরিসরে শিল্পের পরিবর্তন লক্ষ্যযোগ্য। যদি বলা যায় কবিতা একটা স্রোতস্বিনী, তাহলে এর অনন্ত প্রবাহে বাঁক নেয়া স্বাভাবিক। গতি পরিবর্তনে নতুন মোড় নিয়ে নবায়িত ধারা এগিয়ে চলে সামনের দিকে এবং যেতে যেতে আবারো বাঁক নিয়ে এগিয়ে চলে। কিন্তু নদীর স্রোত একেবারে বিচ্ছিন্ন না হয়ে একটা সাযুজ্য রেখে চলে সর্বদা। একটা যোগসূত্র থাকেই। আমরা এখানে বলতে চাইবো, বাংলা কবিতার যাত্রাও একটা কাঠামোর ভেতর দিয়ে চলছে। পরম্পরাগত একটা সমন্বয় রয়েছে। কবিতায় পূর্বাপর যোগসূত্রকে ‘ঐতিহ্য-চেতনা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। রবীন্দ্র-নজরুল কাব্য ভাষা থেকে ত্রিশের কবিরা বাংলা কবিতায় নতুন একটা আবহ নিয়ে হাজির হলেন ঠিকই তবে কবিতার বিষয়ে তেমন রকমফের হয়নি। কেবল আঙ্গিক, প্রকরণ অন্যভাবে আর্বিভূত হয়েছে। বাংলা কবিতায় এ রকম বাঁক নিয়েছে আরো। মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে মধ্যযুগের আবরণ খুলে আধুনিক উজ্জ্বল প্রকরণে সেজেছে বাংলা কবিতা। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ঘটনাস্রোতের কারণে কবিতায় সূচিত হয় রূপান্তর। পঞ্চাশ ষাটের দশকের কবিতায় রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রভাব পড়েছিলো, সন্দেহ নেই। সে সময়ের কবিতায়- ‘যুদ্ধ নয়, আমরা চাই শান্তি’, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’, ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরনো শকুন’- এরকম উচ্চকিত রাজনৈতিক অনেক সে্লাগান উচ্চারিত হয়েছে। সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কবিরা বলিষ্ঠভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন কবিতার মাধ্যমে। এমন অনেক পংক্তি কাব্যের শিল্পগুণের চেয়ে বক্তব্যপ্রধান হিসেবে উচ্চকিত হয়েছে। স্বীকার করতেই হবে, কবিদের কথা রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আঘাত করেছে তুমুলভাবে। অবশ্য রাজনৈতিক উচ্চারণের বাইরেও কব্যিক আমেজে নির্মিত হয়েছে এ সময়ে আবুল হাসান, সিকদার আমিনুল হক প্রমুখের কবিতা। এভাবে আশির দশকেও রাজনৈতিক ঘনঘটার বাইরে নির্মেদ কাব্যিক ঘনঘটাই বেশি পরিলক্ষিত হয় হাতেগোনা দুচারজন কবির কবিতায়। কবিতার বিষয় ও প্রকরণে সময় ভেদে এভাবে পরিবর্তন এসেছে।

বলা হয়ে থাকে- ‘কবিতার ইতিহাস টেকনিক পরিবর্তনের ইতিহাস’। ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডবের পর এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রতিভাসিত হয় বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের কবিতায়। ত্রিশের মতো বিষয়গত রূপান্তরের সাথে সাথে নব্বইয়ের কবিতায় প্রাকরণিক বা আঙ্গিকগত পরিবর্তন আমাদের কাছে মোটাদাগে আভাসিত। এ সময়ের কবিতা আলোচনার ক্ষুদ্র প্রয়াসেই এ লেখনি। শুরুতেই স্বীকার করে নেয়া ভালো- এটি নব্বইয়ের দশকের কবিতার পূর্ণ কোনো আলোকপাত নয়। আংশিকমাত্র।

নব্বইয়ের দশকের কবিতা শুরু হয়েছিলো লিটলম্যাগকেন্দ্রিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় নিজস্ব প্লাটফর্মে কাব্যচর্চা শুরু করেন কবিকুল। গোষ্ঠীবদ্ধ এমন কাব্যচর্চা ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়াসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত লিটলম্যাগকেই কাব্যচর্চার মূল জমিন হিসেবে বেছে নিয়ে কবিরা কবিতার বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। সারা দেশেই একটা কাব্য আন্দোলন গড়ে ওঠে এ সময়। বিশ্বায়নের প্রসার,

পরাশক্তির উত্থান, স্বৈরাচারী শাসন-শোষণ, সমকালীন অস্থিরতা নব্বইয়ের কবিতায় বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে। এ সময়ের কবিতায় বহুস্বরের (পলিফনি) ভাব বিদ্যমান। নানা ভঙ্গিতে নির্মিত হয় কবিতা। কাব্যশরীরে প্রবলভাবে প্রবেশ করে লোকজ-অন্ত্যজ-নাগরিক ও প্রাযুক্তিক শব্দ সমাহার। কবিতায় লক্ষ্য করা যায় ভাষার বক্রতা, ভাবের ভিন্নতা। এ সময়ের কবিরা টেকনিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় কাব্যনদের দীর্ঘ প্রবাহে কুঠারাঘাত করে নতুন গতিপথ নির্মাণে সচেষ্ট হন। মুক্তছন্দ, মুক্তগদ্যের চর্চায় ‘ছক বাঁধা কাঠামো’ থেকে কবিতাকে মুক্ত করে নেন নব্বইয়ের কবিরা।

আর এতে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, হৃদয়ক্ষরিত প্রতিভাস উঠে এসেছে, সেই ক্ষরণ, সেই দগ্ধতা শশ্মানের চেয়েও কম জ্বালাময়ী নয়। আসলে জ্বলতে না জানলে কি আলো বিকিরিত হয়? আসলে জীর্ণতাকে পোড়াতে হলে নিজেকেই যে পুড়তে হয় এ চিরসত্য কবি উপলব্ধি করেন-

‘পুড়বো না, এ কথা বলতে পারে না শ্মশানের কাঠ,

অন্যকে পোড়াতে হলে আগে নিজেকে পুড়তে হয়।’

[মিহির মুসাকী]

কবিতার স্বপক্ষে শান্তি কুমার ঘোষ বলেন,- ‘কবিতা হচ্ছে সেই আর্ট যা দুঃসাধ্য আত্মনিয়োগ ও অনুশীলন দাবী করে। তার জন্য কবিকে অন্তত নিজের ভাষা সম্বন্ধে অন্যের চাইতে সচেতন... সংবেদনশীল এবং ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের অর্থ সম্বন্ধে অবহিত হতে হবে।’ নব্বইয়ের কবিরা অনেক বেশি আত্মসচেতন, শব্দ সচেতন। স্বাদেশিক ঐতিহ্য চেতনায় দৈশিক ও বৈশি^ক কাব্যভাষাও নির্মাণ করে চলেছেন কেউ কেউ। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে তাদের কবিতায় সর্বজনীন হয়ে ধরা দিয়েছে সময়ের অভিঘাত-

‘আমাদের একদিকে ক্ষুধা অন্যদিকে অগাধ মমতা

মধ্যপ্রাচ্যের রাখাল কিংবা নির্মাণ-শ্রমিকের মতো

সম্মুখে সদা দোদুল্যমানতা’

কিংবা,

‘তবু প্রতিরাতে কলঙ্কের পাশে গিয়ে শুই

ভারতবর্ষ বিভাজিত করে পদ্মা, যমুনা তিস্তার বুকে

পড়ে থাকি পরস্পর সম্পর্কের মায়া’

[ওবায়েদ আকাশ]।

সম্পর্কের মায়া, মাটি ও মানুষের মায়া কবিকে উজ্জীবিত করে, উত্থিত করে। বিশ^ায়নের অভিঘাতে কবির ভাবনায় রক্তবীজ ফুটে। পুঁজির প্রবল প্রতাপে অবদমিত মানবত্মার কান্না, নিপীড়ন যন্ত্রণার প্রবহমান স্রোত কাব্যিক ব্যঞ্জনায় বিভাসিত হয়ে ওঠে। কবির নিবিড় চিন্তায় রেখাপাত করে বিষণœতা-

‘প্রগতির নেভানো চুল্লি থেকে আকাশের মেটিওর শাওয়ার পর্যন্ত ঝরে গেছে অনেক অনেক আলফ্রেড সরেন- বস্তুত কালো ঘোড়ার চিঁহি ডাকে সরে যাচ্ছে পরিণত মেঘ- কতশত বিপ্লবের চুঁয়ানির তলে কতশত তত্ত্বের ফুলঝুরি মেখে এই আমরাই দ্যাখো আজ ফুল বাগানের আড়ালে সারমেয়-সঙ্গম দেখে বিমোহিত হই...’

[কামরুল ইসলাম]

নব্বইয়ের কবি জফির সেতু ও শোয়াইব জিবরান। লোকায়ত বাংলাকে পাওয়া যায় তাঁদের কাব্যের পরতে পরতে। ইতিহাস, মিথ-পুরাণ, ধ্রুপদী চরিত্র, আদিম অনুসঙ্গের নানা বাক প্রতিমায় ঋদ্ধ হয়ে ওঠে তাঁদের কবিতা। ভারতীয় পুরাণ থেকে গ্রিক পুরাণেরও সমান উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় সেসব কবিতায়-

এমন বসন্ত দিনে আমি গ্রীস-রোম-ব্যাবিলন হয়ে

হরপ্পার যুগল মূর্তির কোল ঘেঁষে প্রেরণাস্বরূপ

দাঁড়িয়েছি নটরাজ। পষ্ট দেখি আমার ছায়ার রং

লেগে আছে তাদের শরীরে- সে শব্দ শুনতে পাই

সিন্ধুর গোপন গান জীবনে খুব কম লোকে শোনে।

আমাকে প্রতিভূপাখি ভেবে যারা বসিয়ে রাখে পাতায়

তাদের নাড়িতে টাইগ্রিস লোহিত উত্তেজনায় কাঁপে।

[জফির সেতু]

ভাব ভাষা ও ভাবনার নতুনত্ব নব্বইয়ের দশকের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত শব্দকে নতুন অভিধায় অভিহিত করার নিরীক্ষাও দেখা যায় কবিতায়। কখনোবা উপমা, উৎপ্রেক্ষা ভিন্নার্থে ব্যবহৃত হয়ে নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করে। যেমন: ‘ইস্পাতের গোলাপ’ [দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু], কিংবা, ‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ [মোস্তাক আহমাদ দীন]। অনেকের কবিতায় অভিনব উপমা, আকর্ষণীয় ভঙ্গিমাও লক্ষ্যনীয়। ব্যবহারিক কথাবার্তার নান্দনিক উপস্থাপন পাঠকমনে রস সঞ্চার করে। আনন্দ সাগরে অবগাহন করায়-

‘সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বিবাহ পর্যন্ত এলো

আমি আর সিলভিয়া মিলে

মাছ-আড়তের পাশে বাড়িভাড়া নিয়ে আছি

শস্তায় মাছ কিনি; সহজ আমিষ খাই

আশপাশে অনেক বরফকল। আমরা প্রস্তুত আছি

আমাদের সম্পর্কের

কখনো পচন এলে; শস্তা বরফ কিনে পচন ঠেকাব’

[মাসুদার রহমান]

কবি সরকার আমিনের কবিতায় প্রেম, দর্শন ও ব্যক্তি আমিনের মাঝে বিশ্বরূপ খুুঁজে পাওয়ার প্রয়াস লক্ষ্যণীয়-

‘আমি মারা গেলে দয়া করে কেউ শোক করবেন না। চোখের পানি ফেলবেন না। প্রেমিকার হাত শক্ত করে ধরে রেখে আলতো করে চুমু খাবেন অদূরবর্তী ঠোঁটে আর বলবেন স আ ছিলো আসলে প্রেমের মাস্তান। তাঁর সৌজন্যে এই চুম্বন উৎসর্গ করা হলো।

প্রেমিকার অনুপস্থিতিতে নিঃসঙ্গ কোনো যৌনকর্মীর হাতে গুঁজে দিয়ে কিছু পুষ্প ও টাকা; বলবেন, ভালবেসে দিলাম,

আজ রাতে ঘরে যাও বনলতা, বিশ্রাম করো।’

[সরকার আমিন]

কবি ক্রিস্টোফার কডওয়েল বলেন- ‘কবিতা এমন-ই একটি দর্শন, যেখানে ব্যক্তি জীবন ও বর্হিজীবন শব্দ প্রতীকে রূপান্তরিত হয়।’ শব্দে শব্দে আসলে কবিতা ও জীবন একাকার হয়ে ওঠে। কবিতার পংক্তিগুলো মুখরোচক হলেই ব্যাস, নিঙড়ে নিঙড়ে রসাস্বাদন করা যায়। বিষয়ের চেয়ে ভাষাই মুখ্য হয়ে ওঠে তখন। নব্বইয়ের দশকের কবি মুজিব ইরম এমন এক কাব্যধারা সৃষ্টি করে চলছেন যে, তাঁর পংক্তিগুলো পাঠককে টেনে টেনে নিয়ে যায় সামনের দিকে। লোকজ শব্দের প্রাচুর্য, মধ্যযুগের গীতিময়তা তাঁর কবিতায় ভিন্ন মাত্রা পায়। তাঁর কবিতায় উপজীব্য লোকভাষা, লোকশব্দ, লোককথাগুলো আর সেকেলে থাকে না, কাব্যগাঁথুনিতে হয়ে ওঠে আধুনিক ও সর্বজনীন-

‘যে পুকুরে কলমি লতা ভাসে, যে পুকুরে কাঁঠাল ছায়া হাসে, যে পুকুরে পানা ফুলের ঢেউ, যে পুকুরে জোছনা ভাসায় কেউ, যে পুকুরে নাই হয়ে যায় চিতল মাছের ঘাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।

জাম্বুরা ফুল কেমন করে ফোটে, ভাটি ফুল কেমন করে চিত্তমায়া লুটে, কেমন করে শুকনা খালে ফুলের দেখা পাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।

ইরি ক্ষেতে পাকনা ধানের হাসি, মাছ চলাচল করে, নিঝুম সন্ধ্যায় বৃষ্টি জলে ভাসি, জল ফিসফিস করে, রোদ থৈ থৈ রোদ থৈ থৈ ডাক শুনতে পাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।

ও আমার বিল ভাসানো নয়া পানির রূপ, কোড়া ডাকে কোড়া ডাকে দুপুর বেলা চুপ, ও আমার রাস্তা ডুবা হঠাৎ ঢলের স্রোত, কোথায় গেলো কোথায় গেলো, তার দেখা ফের চাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই, আমি তারে লিখতে পারি নাই।’

[মুজিব ইরম]

নব্বইয়ের আরেক কবি ব্রাত্য রাইসু লোকভাষাকে কবিতায় নির্মিতি দানের মাধ্যমে একটা স্বাতন্ত্র্যিক কাব্যধারা সৃষ্টি করে নিয়েছেন। জনমানুষের ভাষা অনুবাদহীনভাবে কবিতার শরীরে প্রবেশ করলে কবিতার আবেদন কখনো ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং অনেকগুণ বেড়ে যায়। লোকভাষা, লোকসংস্কৃতি কখনো আঞ্চলিক স্বাক্ষর হয়ে ওঠে কবিতার ভেতরে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অস্তিত্ব সংকট, ব্যক্তিত্বের সংঘাতের বিরুদ্ধে ব্রাত্য রাইসুর শ্লেষ ও বিদ্রুপের উচ্চারণ বিশেষভাবে আলোচিত।

কবি ইকবাল হোসেন বুলবুলের কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ মরমীচেতনা। তিনি ভাবের নির্জাসকে আরোহণ করেন মানুষের বিশ^াস ও যাপনের গভীরতর ভাবানুবাদ থেকে। এর রাইরেও মানবীয় রোমান্সের নব বিনির্মাণেও সাবলীল প্রত্যয়ী। সেখানেও স্বাতন্ত্র্য, সেখানেও সহজাত পাঠাভ্যাসকে নাড়া দিতে সক্ষম এই কবি।

‘পূর্ণ চাঁদ লটকে থাকে তার নাভিমূলে। ঝাঁপ দিয়ে নিজেরে লুকাই।

লোকে বলে আত্মহত্যা; আর আমি বলি আত্মহারা।

তাই নিয়ে শহরের অলিগলি, চলে কানাকানি...’

[ইকবাল হোসেন বুলবুল]

প্রতিষ্ঠিত সত্যের (হয়তো সত্য নাও হতে পারে) বিপরীতে আর একটি সত্য (প্রকৃত সত্য) প্রতিষ্ঠায় শক্তিমত্তা দেখাতে চেষ্টা করেছেন নব্বইয়ের দশকের কেউ কেউ। বহুকাল থেকে চলে আসা গতানুগতিক ধারণাকেও শুধরে দিয়েছেন গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। এর প্রমাণ দেখে নেয়া যেতে পারে-

‘মেরু অঞ্চলে পাখি উষ্ণতার খোঁজে

এদেশে শীতে এসে পড়ে

যতোই অতিথি বলি, তারা কিন্তু বেড়াতে আসে না

আসে অভিশাপে, চিরতুষারের।’

[চঞ্চল আশরাফ]

কী বুঝা গেল? শীতকালে বাংলার হাওর-বাওর, বিলে-ঝিলে আসা পাখিরা আমাদের আদর পেয়ে আনন্দ ভ্রমণে আসে? আমরা আহ্লাদ করে তাদের ‘অতিথি’ বানিয়েছি। নয় কি? আমরা সেই পাখিদের শরণার্থী জীবনের কথা ভেবে অতিথি বলি কি? এই গতানুগতিক বিশ^াসকে ভেঙে প্রকৃত কথাটি জানিয়ে দেন একজন পর্যবেক্ষক, নিরীক্ষাপ্রবণ কবি!

নব্বইয়ের দশকের কবিতার স্বাতন্ত্র্যিক এ ধারা এগিয়ে গেছে- কবি সরকার আমিন, ওবায়েদ আকাশ, মাসরুর আরেফিন, মিহির মুসাকী, বায়তুল্লাহ কাদেরী, মুজিব ইরম, শাহনাজ মুন্নী, কবির হুমায়ূন, ইকবাল হোসেন বুলবুল, মজনু শাহ, ব্রাত্য রাইসু, শামীম রেজা, কামরুল ইসলাম, পরিতোষ হালদার, তুষার গায়েন, ভাগ্যধন বড়ুয়া, মাসুদার রহমান, তাপস গায়েন, কামরুজ্জামান কামু, শান্তা মারিয়া, শাহেদ কায়েস, জুনান নাশিত, মিলটন রহমান, মাহফুজ আল-হোসেন, রোকসানা আফরীন, মোস্তাক আহমাদ দীন, হেনরী স্বপন, জাফর আহমদ রাশেদ, চঞ্চল আশরাফ, রাগীব হাসান, জফির সেতু, মামুন মুস্তাফা, বদরে মুনীর, আহমেদ নকীব, গাজী লতিফ, শিবলী মোকতাদির, খলিল মজিদ, অনিকেত শামীম, হাদিউল ইসলাম, কাজল কানন, আলফ্রেড খোকন, নেহাল আহমেদ, শোয়াইব জিবরান, টোকন ঠাকুর, মাহবুব লীলেন, খোকন মাহমুদ, কুমার চক্রবর্তী, শেলী নাজ প্রমুখের হাত ধরে। এছাড়া এর বাইরেও নব্বইয়ের আরো কিছু শব্দযোদ্ধা রয়েছেন যারা তাদের লেখনি দিয়ে বাংলাদেশের কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

back to top