alt

সংস্কৃতি

বিদায় বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’

ইসমাইল মাহমুদ

: শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১
image

‘তুমি আসবে বলে, কাছে ডাকবে বলে, ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে, তাই চম্পা বকুল, করে গন্ধে আকুল এই জোসনা রাতে, তারে মনে পড়ে’-ভালোবাসার এমন আকুতিমাখা গান বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে অভিনেত্রী কবরীর মুখে শুনে অনেকেই ভক্ত হয়ে যান।

কবরী অভিনীত প্রথম ছবি ‘সুতরাং’-এর জনপ্রিয় একটি গান এটি। কবরীর নজরকাড়া অভিনয়ের কারণে ছবিটি দর্শকের হৃদয় তোলপাড় সৃষ্টি করে। এ ছবিটিই চট্টগ্রামের কিশোরী মিনা পাল রাতারাতি বাংলা চলচ্চিত্রের সুঅভিনেত্রী কবরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। এক সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রীর মর্যাদা লাভ করেন তিনি।

এই কিংবদন্তি নায়িকা আর আমাদের মাঝে নেই। ১৬ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে দেশের আকাশ থেকে খসে পড়ছে একের পর এক তারকা। করোনার মৃত্যুর এ মিছিলে যোগ দিলেন বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নায়িকা কবরী।

সারাহ বেগম কবরী ওরফে কবরী সরোয়ার ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম মিনা পাল। তাঁর পিতা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল ও মাতা লাবণ্য প্রভা পাল।

কবরীর জন্ম বোয়ালখালি হলেও তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর সে সময়ে ১৯৬৩ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভূত হন। কবরী বড় হয়েছেন সাংস্কৃতিক পরিবারে। তাঁর মা লাবণ্য প্রভা পাল পুঁথি পড়তেন। কবরীর ভাই-বোনেরা নাচতেন-গাইতেন। সবচেয়ে ছোট ভাই ছিলেন তবলা বাদক। কবরী নাচ করতেন। তবে অভিনয় করার সুযোগ পাননি।

অভিনয় সম্পর্কে কোন জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ১৯৬৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুভাষ দত্তের বিপরীতে ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। সুতরাং ছবিটি মুক্তি পাবার পর এ ছবি এবং ছবির নায়িকা হিসেবে কবরী চলচ্চিত্রামোদী মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হন। জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে এ দেশের চলচ্চিত্র দুনিয়ায় কবরীর দুর্বারগতিতে পথচলা শুরু হয়।

একদিকে অভিনয়শৈলী অন্যদিকে মনকাড়া হাসি দিয়ে তিনি সহজেই দর্শকদের দৃষ্টি কেড়ে নেন। চলচ্চিত্র দর্শকরা তাঁকে ‘মিষ্টি মেয়ে’ উপাধি দেন। এরপর ১৯৬৫ ‘জলছবি’ ও ‘বাহানা’; ১৯৬৮ সালে ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরী’ ও ‘যে আগুনে পুড়ি’; ১৯৭০ সালে ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘দর্প চূর্ণ’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ও ‘বিনিময়’ করে ব্যাপক প্রশংসিত হন কবরী।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমাদের দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় কবরী তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে চলে যান গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে। সেখান থেকে শ্মরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন ভারতের কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন কবরী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি কীভাবে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে ছেড়ে এক কাপড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তার বর্ণনা করেন এবং তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের দেশকে সাহায্যের আবেদন করেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর কবরী পুনরায় ফিরে আসেন প্রিয় জন্মভূমিতে। আবারও চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। স্বাধীনতা লাভের পর তাঁর প্রথম ছবি ‘লালন ফকির’ মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। ওই বছরই মুক্তি পায় অপর দুই ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘রঙ্গবাজ’; ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ‘মাসুদ রানা’; ১৯৭৫ সালে ‘সুজন সখী’ ও ‘সাধারণ মেয়ে’; ১৯৭৬ সালে ‘গুন্ডা’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘আগন্তুক’, ‘আঁকাবাঁকা’, ‘কত যে মিনতি’, ‘অধিকার’ ও ‘স্মৃতিটুকু থাক’; ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ ও ‘বধু বিদায়’; ১৯৭৯ সালে ‘আরাধনা’, ‘বেইমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, কাচ কাঁটা হীরা’, ‘উপহার’, ‘আমাদের সন্তান’, ‘মতিমহল’, ‘পারুলের সংসার’, ‘অরুন বরুন কিরণমালা’, ‘হীরামন’, ‘দেবদাস’ ও ‘আমার জন্মভূমি’; ১৯৮৭ সালে ‘দুই জীবন’ ছবিতে মূল নায়িতা চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সফলতা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।

এক সময় বাংলাদেশের চলচিত্র শিল্পে রাজ্জাক-কবরী জুটি সুপার-ডুপার হিট জুটি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রথম ছবিতে অভিনয়ের কয়েক বছর পরই কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। ১৯৭৮ সালে তাঁকে ছেড়ে তিনি বিয়ে করেন নারায়নগঞ্জের শফিউদ্দিন সারোয়ার ওরফে বাবু সারোয়ারকে। দীর্ঘ সাংসারিক জীবনে পাঁচ পুত্র সন্তানের জননী কবরীকে রাজনৈতিক কারনে ছাড়তে হয় দ্বিতীয় স্বামীকেও।

সারাহ বেগম কবরী ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ সন্মাননা পান। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি কর্তৃক ১৯৭৩ সালে ‘লালন ফকির’, ১৯৭৫ সালে ‘সুজন সখী’, ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’, ১৯৮৮ সালে ‘দুই জীবন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া একই সংগঠন কর্তৃক ২০০৮ সালে অনারারি অ্যাওয়ার্ড এবং ২০০৯ সালে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ সন্মাননা লাভ করেন।

কবরী পরিচালিত ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার ডাবিং ও সম্পাদনার কাজ চলছে। সরকারি অনুদানের এই ছবিটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিশাত সালওয়া ও রিয়াদ রায়হান। ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করবেন কবরীও। এই ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন সাবিনা ইয়াসমীন। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছিলেন কবরী।

চলচ্চিত্র অভিনয়, প্রযোজনা, পরিচালনার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন সারাহ বেগম কবরী। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নারায়নগঞ্জ-৪ আসন থেকে ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৭৫ ভোট পেয়ে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র কবরীর মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে তাঁর অবদান এ দেশের মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। কবরীর দেহের মৃত্যু হলেও তিনি যুগ যুগ ধরে থাকবেন এ দেশের মানুষের অন্তরে।

ছবি

ওকোডের নতুন হেড অফ অপারেশন এন্ড ইনোভেশন হলেন নাহারিন চৌধুরী

ছবি

আজিমপুর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী

ছবি

বাংলাদেশ এর অন্যতম নারী দেয়াল - চিত্রশিল্পী পপি টিকলি

ছবি

নব বিনির্মাণের স্রষ্টা কবি শঙ্খ ঘোষ

ছবি

বাঙালির ঐতিহাসিক উৎসবের নবায়ন

ছবি

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা’

শুধু নেই সে

তোমাদের যাহাদের সাথে

ছবি

প্রাণে প্রাণ মেলানোর উৎসব

ছবি

শিয়রে করোনাক্রান্তি, বরণে ১৪২৮

ছবি

শূন্যতায় ঢিল

ছবি

আহা বৈশাখ এলো বৈশাখ

ছবি

বাংলা নববর্ষ : চিরনতুনের ডাক

বৈশাখের পঙ্ক্তিমালা

ছবি

বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান আর নেই

ছবি

ঢাবিতে বর্ষবরণের প্রতীকী শোভাযাত্রা

ছবি

আজ চৈত্র সংক্রান্তি, কাল পহেলা বৈশাখ

ছবি

জীবনানন্দ দাশের সরল পাঠ-উন্মোচন

ছবি

এবারও রমনার বটমূলে হচ্ছে না ছায়ানটের বর্ষবরণ

ছবি

করোনামুক্তি কামনায় পানিতে ফুল ভাসিয়ে ‘বৈসাবি’ উ‍ৎসব শুরু

ছবি

একুশে বই মেলায় ড. হারুন-অর-রশিদের ৫টি নতুন বই

ছবি

বইমেলা নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বাংলা একাডেমি

ছবি

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাংবাদিক শাহীন রেজা নূরকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা

করোনায় কমতি ছিল না ভালোবাসার

ছবি

লেখকের খোঁজে ’রাইটার্স গ্যারাজ’

ছবি

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ

ছবি

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকল্পে খেয়ালীর সাংস্কৃতিক জাগরণ ।

ছবি

এ বছর একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ গুণীজন

ছবি

বছর ঘুরে আবার ও মঞ্চে ‘কঞ্জুস’

ছবি

এবারের বইমেলা ১৮ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত

ছবি

পূর্ণিমা তিথির মাসিক সাধুসঙ্গের ২২তম আসর

ছবি

অমর একুশে বইমেলা ১৮ মার্চ শুরু

ছবি

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা

ছবি

‘হাছনজানের রাজা’ নিয়ে মঞ্চে প্রাঙ্গণেমোর

ছবি

সংঙ্গীত শিল্পী শেখ জসিম

ছবি

ইকবালের তিন ছবির শুভ মহরত অনুষ্ঠিত

tab

সংস্কৃতি

বিদায় বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’

ইসমাইল মাহমুদ

image

শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১

‘তুমি আসবে বলে, কাছে ডাকবে বলে, ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে, তাই চম্পা বকুল, করে গন্ধে আকুল এই জোসনা রাতে, তারে মনে পড়ে’-ভালোবাসার এমন আকুতিমাখা গান বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে অভিনেত্রী কবরীর মুখে শুনে অনেকেই ভক্ত হয়ে যান।

কবরী অভিনীত প্রথম ছবি ‘সুতরাং’-এর জনপ্রিয় একটি গান এটি। কবরীর নজরকাড়া অভিনয়ের কারণে ছবিটি দর্শকের হৃদয় তোলপাড় সৃষ্টি করে। এ ছবিটিই চট্টগ্রামের কিশোরী মিনা পাল রাতারাতি বাংলা চলচ্চিত্রের সুঅভিনেত্রী কবরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। এক সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রীর মর্যাদা লাভ করেন তিনি।

এই কিংবদন্তি নায়িকা আর আমাদের মাঝে নেই। ১৬ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে দেশের আকাশ থেকে খসে পড়ছে একের পর এক তারকা। করোনার মৃত্যুর এ মিছিলে যোগ দিলেন বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নায়িকা কবরী।

সারাহ বেগম কবরী ওরফে কবরী সরোয়ার ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম মিনা পাল। তাঁর পিতা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল ও মাতা লাবণ্য প্রভা পাল।

কবরীর জন্ম বোয়ালখালি হলেও তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর সে সময়ে ১৯৬৩ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভূত হন। কবরী বড় হয়েছেন সাংস্কৃতিক পরিবারে। তাঁর মা লাবণ্য প্রভা পাল পুঁথি পড়তেন। কবরীর ভাই-বোনেরা নাচতেন-গাইতেন। সবচেয়ে ছোট ভাই ছিলেন তবলা বাদক। কবরী নাচ করতেন। তবে অভিনয় করার সুযোগ পাননি।

অভিনয় সম্পর্কে কোন জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ১৯৬৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুভাষ দত্তের বিপরীতে ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। সুতরাং ছবিটি মুক্তি পাবার পর এ ছবি এবং ছবির নায়িকা হিসেবে কবরী চলচ্চিত্রামোদী মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হন। জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে এ দেশের চলচ্চিত্র দুনিয়ায় কবরীর দুর্বারগতিতে পথচলা শুরু হয়।

একদিকে অভিনয়শৈলী অন্যদিকে মনকাড়া হাসি দিয়ে তিনি সহজেই দর্শকদের দৃষ্টি কেড়ে নেন। চলচ্চিত্র দর্শকরা তাঁকে ‘মিষ্টি মেয়ে’ উপাধি দেন। এরপর ১৯৬৫ ‘জলছবি’ ও ‘বাহানা’; ১৯৬৮ সালে ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরী’ ও ‘যে আগুনে পুড়ি’; ১৯৭০ সালে ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘দর্প চূর্ণ’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ও ‘বিনিময়’ করে ব্যাপক প্রশংসিত হন কবরী।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমাদের দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় কবরী তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে চলে যান গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে। সেখান থেকে শ্মরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন ভারতের কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন কবরী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি কীভাবে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে ছেড়ে এক কাপড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তার বর্ণনা করেন এবং তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের দেশকে সাহায্যের আবেদন করেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর কবরী পুনরায় ফিরে আসেন প্রিয় জন্মভূমিতে। আবারও চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। স্বাধীনতা লাভের পর তাঁর প্রথম ছবি ‘লালন ফকির’ মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। ওই বছরই মুক্তি পায় অপর দুই ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘রঙ্গবাজ’; ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ‘মাসুদ রানা’; ১৯৭৫ সালে ‘সুজন সখী’ ও ‘সাধারণ মেয়ে’; ১৯৭৬ সালে ‘গুন্ডা’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘আগন্তুক’, ‘আঁকাবাঁকা’, ‘কত যে মিনতি’, ‘অধিকার’ ও ‘স্মৃতিটুকু থাক’; ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ ও ‘বধু বিদায়’; ১৯৭৯ সালে ‘আরাধনা’, ‘বেইমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, কাচ কাঁটা হীরা’, ‘উপহার’, ‘আমাদের সন্তান’, ‘মতিমহল’, ‘পারুলের সংসার’, ‘অরুন বরুন কিরণমালা’, ‘হীরামন’, ‘দেবদাস’ ও ‘আমার জন্মভূমি’; ১৯৮৭ সালে ‘দুই জীবন’ ছবিতে মূল নায়িতা চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সফলতা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।

এক সময় বাংলাদেশের চলচিত্র শিল্পে রাজ্জাক-কবরী জুটি সুপার-ডুপার হিট জুটি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রথম ছবিতে অভিনয়ের কয়েক বছর পরই কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। ১৯৭৮ সালে তাঁকে ছেড়ে তিনি বিয়ে করেন নারায়নগঞ্জের শফিউদ্দিন সারোয়ার ওরফে বাবু সারোয়ারকে। দীর্ঘ সাংসারিক জীবনে পাঁচ পুত্র সন্তানের জননী কবরীকে রাজনৈতিক কারনে ছাড়তে হয় দ্বিতীয় স্বামীকেও।

সারাহ বেগম কবরী ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ সন্মাননা পান। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি কর্তৃক ১৯৭৩ সালে ‘লালন ফকির’, ১৯৭৫ সালে ‘সুজন সখী’, ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’, ১৯৮৮ সালে ‘দুই জীবন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া একই সংগঠন কর্তৃক ২০০৮ সালে অনারারি অ্যাওয়ার্ড এবং ২০০৯ সালে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ সন্মাননা লাভ করেন।

কবরী পরিচালিত ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার ডাবিং ও সম্পাদনার কাজ চলছে। সরকারি অনুদানের এই ছবিটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিশাত সালওয়া ও রিয়াদ রায়হান। ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করবেন কবরীও। এই ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন সাবিনা ইয়াসমীন। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছিলেন কবরী।

চলচ্চিত্র অভিনয়, প্রযোজনা, পরিচালনার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন সারাহ বেগম কবরী। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নারায়নগঞ্জ-৪ আসন থেকে ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৭৫ ভোট পেয়ে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র কবরীর মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে তাঁর অবদান এ দেশের মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। কবরীর দেহের মৃত্যু হলেও তিনি যুগ যুগ ধরে থাকবেন এ দেশের মানুষের অন্তরে।

back to top