alt

উপ-সম্পাদকীয়

ব্যাংক খাতের রোগ সারাতে রোডম্যাপ

রেজাউল করিম খোকন

: বৃহস্পতিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

দেশের ব্যাংক খাতের পুরোনো ‘রোগগুলো’ সারিয়ে তুুলতে এবার রোডম্যাপ বা পথনকশা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পথনকশায় বহু বছর ধরে ব্যাংক খাতে যেসব সংস্কারের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল, তা অনেকটাই স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারের এ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো হবে। কোনো রাজনৈতিক চাপ আমাদের ওপর নেই। দুর্বল ব্যাংকগুলোর উন্নতি না হলে সেগুলো অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জ) করে দেয়া হবে।

পথনকশা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণখেলাপিদের সঙ্গে আর আপস করা হবে না। ব্যাংক খাত আইন অনুযায়ী চলবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে আর কোনো সুবিধা দেয়া যাবে না। ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ গণনায় নীতি ছাড় কমিয়ে আনতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ৯০ দিনের মধ্যে ঋণের কিস্তি অপরিশোধিত থাকলে তা খেলাপির খাতায় ওঠার সেই আগের নীতিতে ফিরে যাওয়ার আভাস দেয়া হয়েছে। এ নীতি বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে। নীতি ছাড়ের পরও বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। পুনঃতফসিল আর অবলোপনসহ হিসাব করলে ব্যাংক খাতের প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার ঋণ ‘দুর্দশাগ্রস্ত’। যারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব নিয়ে কথা বলেছেন, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পথনকশাকে স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি সন্দেহও প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ব্যাংকের রোগ সারাতে ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা কতটা পারবে, তা আগামী দিনগুলোতে দেখা যাবে।

পথনকশায় খেলাপি ঋণ কমাতে বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর একটি হলো খেলাপি ঋণ অবলোপন, অর্থাৎ ব্যাংকের স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেয়া সংক্রান্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো ঋণ একাধারে দুই বছর মন্দ বা ক্ষতিজনক (খেলাপি) থাকলে সেসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখে তা অবলোপন করতে হবে।

উল্লেখ্য, ব্যাংক তার মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণের সমপরিমাণ অর্থ রেখে দেয়, যা নিরাপত্তা সঞ্চিতি নামে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলছে, কোনো ঋণ টানা তিন বছর খেলাপি থাকলে তা অবলোপন করতে হয়। অবলোপন নীতি বাস্তবায়নের ফলে কত টাকা খেলাপি কমবে, তা-ও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অবলোপন করা ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ইউনিট’ নামে একটি আলাদা ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে পথনকশায়। এই ঋণ আদায়ের লক্ষ্য অর্জন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পারদর্শিতা মূল্যায়নে যুক্ত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো ঋণ একাধারে দুই বছর মন্দ বা ক্ষতিজনক (খেলাপি) থাকলে সেসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখে তা অবলোপন করতে হবে। অবলোপন মানে খেলাপি ঋণ আদায় নয়। ব্যবসায়ীরা টাকা না দিলে খেলাপি ঋণের পেছনে ব্যয় করতে হবে ব্যাংকের মুনাফা থেকে, যা আসলে শেয়ারধারীদের প্রাপ্য।

কার্যত খেলাপি ঋণ আদায় না করে অবলোপন করা হলে লোকসান হবে শেয়ারধারীদের। এদিকে বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয় পথনকশায়। আরও বলা হয়, মন্দ ঋণ ও অবলোপন করা সেই কোম্পানির কাছে বিক্রি করে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক স্থিতিপত্র পরিষ্কার করতে পারবে। বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া টাকা ব্যাংক আয় হিসেবে দেখাতে পারবে। ঋণ পরিশোধের জন্য দেয়া বাড়তি মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি মনে করে, এতে ব্যাংকের তারল্যসংকট কমবে। পাশাপাশি ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে পথনকশায়। এতে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিতে ছয় পরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকের শেয়ারধারী পরিচালকদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা সংশোধন করা এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, তাদের সম্মানী নির্ধারণ ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগে বাছাই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পারফরম্যান্স বা পারদর্শিতার সূচকের ভিত্তিতে এমডিদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পথনকশায় ব্যাংক একীভূত করার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, একীভূত হওয়ার তিন বছর পর্যন্ত কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। ব্যাংকে পেশাদারদের নিয়োগে একাধিক পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের আর্থিক সূচক পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। কোন ব্যাংক কী পর্যায়ে আছে, তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে। কোন ব্যাংক দুর্বল, কোন ব্যাংক সবল, তা নির্ধারণ কিভাবে হবে, সেটা বড় প্রশ্ন। ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের আর্থিক সূচক পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। কোন ব্যাংক কী পর্যায়ে আছে, তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে। প্রশ্ন হলো, নানা অনিয়ম করা ও তা গোপন করতে ‘সিদ্ধহস্ত’ কিছু ব্যাংক নিজেদের দুর্বল দেখাবে কিনা। বেশির ভাগ ব্যাংক নিজেদের আর্থিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে যে তথ্য দিচ্ছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এজন্য সন্দেহের তালিকায় থাকা দুর্বল ব্যাংকগুলোতে স্বাধীনভাবে বিশেষ নিরীক্ষা চালাতে হবে। তার আগে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সংস্কার কাজটি কঠিনভাবে করতে হবে। নরম সুরে কাজ হবে না। তবে সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। এসব বহুদিন ধরে বলে আসছেন সবাই; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আবার বিভিন্ন সময়ে নানা ঘোষণা দেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে পথনকশা ঘোষণা করেছে, এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাতে হয়। তবে প্রশ্ন হলো, সংস্কারকে কতটা গুরুত্বসহকারে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার সরকারের উচ্চপর্যায় এ সংস্কার কতটা চায়, এটাও একটা বড় প্রশ্ন।

সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া আর্থিক খাত সংস্কার করা সম্ভব না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এখন সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগোতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে পুরো খাতের পরিস্থিতির উন্নতি করার। এজন্য ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, আগে তা বের করতে হবে। সব ব্যাংকই নিজের দুর্বলতা ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। ফলে যে আর্থিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তার পুরোটা বিশ্বাসযোগ্য না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে স্বাধীনভাবে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারে, আবার বাইরের কাউকে দিয়েও এটা করাতে পারে। নিরপেক্ষ নিরীক্ষায় সত্য চিত্র পাওয়া গেলেই কেবল সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে। সঠিক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। তাহলেই সংস্কার পরিপূর্ণ রূপ পাবে।

ব্যাংক তদারকিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও দক্ষতা দেখাতে হবে। আইনকানুন পরিপালনে কাউকে ছাড় দিয়ে টিকিয়ে রাখার প্রথা তুলে নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবেচনায় সব ব্যাংকের পরিচালকদের এক কাতারে রাখতে হবে। যখন যা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন, তা নিতে হবে। তাহলে এর সুফল পাবে দেশের অর্থনীতি।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

উদার-উদ্দাম বৈশাখ চাই

ঈদ নিয়ে আসুক শান্তি ও সমৃদ্ধি, বিস্তৃত হোক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ

প্রসঙ্গ: বিদেশি ঋণ

ছাত্ররাজনীতি কি খারাপ?

জাকাত : বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস : শুরুর কথা

ছবি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত

প্রবাসীর ঈদ-ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

ধানের ফলন বাড়াতে ক্লাইমেট স্মার্ট গুটি ইউরিয়া প্রযুক্তি

কমিশন কিংবা ভিজিটে জমি রেজিস্ট্রির আইনি বিধান ও প্রাসঙ্গিকতা

ছবি

ঈদের অর্থনীতি

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে ‘পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম’

শিক্ষকের বঞ্চনা, শিক্ষকের বেদনা

নিরাপদ সড়ক কেন চাই

রম্যগদ্য : ‘প্রহরীর সাতশ কোটি টাকা...’

ছবি

অবন্তিকাদের আত্মহনন

শিক্ষাবিষয়ক ভাবনা

অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান নয়

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে

আত্মহত্যা রোধে নৈতিক শিক্ষা

আউশ ধান : পরিবেশ ও কৃষকবান্ধব ফসল

ছবি

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আতুড়ঘর

চেক ডিজঅনার মামলার অধিক্ষেত্র ও প্রাসঙ্গিকতা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের কৃষি

ছবি

‘হৃৎ কলমের’ পাখি এবং আমাদের জেগে ওঠা

ছবি

ভূগর্ভস্থ পানি সুরক্ষায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

প্রসঙ্গ : নিত্যপণ্যের দাম

ছবি

টঙ্ক আন্দোলনের কুমুদিনী হাজং

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে চাই বিকেন্দ্রীকরণ

দূষণমুক্ত পানির বিকল্প নাই

রম্যগদ্য : ‘দুনিয়ার বাঙালি এক হও”

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের লড়াই

স্মৃতির জানালা খুলে স্বাধীনতাকে উপভোগ করছি

শিশুর সার্বিক বিকাশে বাবা-মায়ের ভূমিকা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ব্যাংক খাতের রোগ সারাতে রোডম্যাপ

রেজাউল করিম খোকন

বৃহস্পতিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

দেশের ব্যাংক খাতের পুরোনো ‘রোগগুলো’ সারিয়ে তুুলতে এবার রোডম্যাপ বা পথনকশা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পথনকশায় বহু বছর ধরে ব্যাংক খাতে যেসব সংস্কারের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল, তা অনেকটাই স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারের এ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো হবে। কোনো রাজনৈতিক চাপ আমাদের ওপর নেই। দুর্বল ব্যাংকগুলোর উন্নতি না হলে সেগুলো অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জ) করে দেয়া হবে।

পথনকশা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণখেলাপিদের সঙ্গে আর আপস করা হবে না। ব্যাংক খাত আইন অনুযায়ী চলবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে আর কোনো সুবিধা দেয়া যাবে না। ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ গণনায় নীতি ছাড় কমিয়ে আনতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ৯০ দিনের মধ্যে ঋণের কিস্তি অপরিশোধিত থাকলে তা খেলাপির খাতায় ওঠার সেই আগের নীতিতে ফিরে যাওয়ার আভাস দেয়া হয়েছে। এ নীতি বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে। নীতি ছাড়ের পরও বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। পুনঃতফসিল আর অবলোপনসহ হিসাব করলে ব্যাংক খাতের প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার ঋণ ‘দুর্দশাগ্রস্ত’। যারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব নিয়ে কথা বলেছেন, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পথনকশাকে স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি সন্দেহও প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ব্যাংকের রোগ সারাতে ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা কতটা পারবে, তা আগামী দিনগুলোতে দেখা যাবে।

পথনকশায় খেলাপি ঋণ কমাতে বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর একটি হলো খেলাপি ঋণ অবলোপন, অর্থাৎ ব্যাংকের স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেয়া সংক্রান্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো ঋণ একাধারে দুই বছর মন্দ বা ক্ষতিজনক (খেলাপি) থাকলে সেসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখে তা অবলোপন করতে হবে।

উল্লেখ্য, ব্যাংক তার মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণের সমপরিমাণ অর্থ রেখে দেয়, যা নিরাপত্তা সঞ্চিতি নামে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলছে, কোনো ঋণ টানা তিন বছর খেলাপি থাকলে তা অবলোপন করতে হয়। অবলোপন নীতি বাস্তবায়নের ফলে কত টাকা খেলাপি কমবে, তা-ও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অবলোপন করা ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ইউনিট’ নামে একটি আলাদা ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে পথনকশায়। এই ঋণ আদায়ের লক্ষ্য অর্জন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পারদর্শিতা মূল্যায়নে যুক্ত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো ঋণ একাধারে দুই বছর মন্দ বা ক্ষতিজনক (খেলাপি) থাকলে সেসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখে তা অবলোপন করতে হবে। অবলোপন মানে খেলাপি ঋণ আদায় নয়। ব্যবসায়ীরা টাকা না দিলে খেলাপি ঋণের পেছনে ব্যয় করতে হবে ব্যাংকের মুনাফা থেকে, যা আসলে শেয়ারধারীদের প্রাপ্য।

কার্যত খেলাপি ঋণ আদায় না করে অবলোপন করা হলে লোকসান হবে শেয়ারধারীদের। এদিকে বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয় পথনকশায়। আরও বলা হয়, মন্দ ঋণ ও অবলোপন করা সেই কোম্পানির কাছে বিক্রি করে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক স্থিতিপত্র পরিষ্কার করতে পারবে। বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া টাকা ব্যাংক আয় হিসেবে দেখাতে পারবে। ঋণ পরিশোধের জন্য দেয়া বাড়তি মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি মনে করে, এতে ব্যাংকের তারল্যসংকট কমবে। পাশাপাশি ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে পথনকশায়। এতে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিতে ছয় পরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকের শেয়ারধারী পরিচালকদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা সংশোধন করা এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, তাদের সম্মানী নির্ধারণ ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগে বাছাই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পারফরম্যান্স বা পারদর্শিতার সূচকের ভিত্তিতে এমডিদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পথনকশায় ব্যাংক একীভূত করার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, একীভূত হওয়ার তিন বছর পর্যন্ত কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। ব্যাংকে পেশাদারদের নিয়োগে একাধিক পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের আর্থিক সূচক পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। কোন ব্যাংক কী পর্যায়ে আছে, তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে। কোন ব্যাংক দুর্বল, কোন ব্যাংক সবল, তা নির্ধারণ কিভাবে হবে, সেটা বড় প্রশ্ন। ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের আর্থিক সূচক পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। কোন ব্যাংক কী পর্যায়ে আছে, তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে। প্রশ্ন হলো, নানা অনিয়ম করা ও তা গোপন করতে ‘সিদ্ধহস্ত’ কিছু ব্যাংক নিজেদের দুর্বল দেখাবে কিনা। বেশির ভাগ ব্যাংক নিজেদের আর্থিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে যে তথ্য দিচ্ছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এজন্য সন্দেহের তালিকায় থাকা দুর্বল ব্যাংকগুলোতে স্বাধীনভাবে বিশেষ নিরীক্ষা চালাতে হবে। তার আগে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সংস্কার কাজটি কঠিনভাবে করতে হবে। নরম সুরে কাজ হবে না। তবে সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। এসব বহুদিন ধরে বলে আসছেন সবাই; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আবার বিভিন্ন সময়ে নানা ঘোষণা দেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে পথনকশা ঘোষণা করেছে, এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাতে হয়। তবে প্রশ্ন হলো, সংস্কারকে কতটা গুরুত্বসহকারে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার সরকারের উচ্চপর্যায় এ সংস্কার কতটা চায়, এটাও একটা বড় প্রশ্ন।

সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া আর্থিক খাত সংস্কার করা সম্ভব না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এখন সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগোতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে পুরো খাতের পরিস্থিতির উন্নতি করার। এজন্য ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, আগে তা বের করতে হবে। সব ব্যাংকই নিজের দুর্বলতা ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। ফলে যে আর্থিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তার পুরোটা বিশ্বাসযোগ্য না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে স্বাধীনভাবে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারে, আবার বাইরের কাউকে দিয়েও এটা করাতে পারে। নিরপেক্ষ নিরীক্ষায় সত্য চিত্র পাওয়া গেলেই কেবল সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে। সঠিক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। তাহলেই সংস্কার পরিপূর্ণ রূপ পাবে।

ব্যাংক তদারকিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও দক্ষতা দেখাতে হবে। আইনকানুন পরিপালনে কাউকে ছাড় দিয়ে টিকিয়ে রাখার প্রথা তুলে নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবেচনায় সব ব্যাংকের পরিচালকদের এক কাতারে রাখতে হবে। যখন যা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন, তা নিতে হবে। তাহলে এর সুফল পাবে দেশের অর্থনীতি।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

back to top