alt

উপ-সম্পাদকীয়

গ্রাম-গ্রামান্তরে

প্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড শিক্ষা বোর্ড যশোর

রুকুনউদ্দৌলাহ

: বুধবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২১
image

দেশের অনেক কিছুতে যশোর প্রথম হওয়ার গৌরবের অধিকারী। যুক্ত বাংলার প্রথম জেলা যশোর। এই জেলা প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। প্রথম ডিজিটালাইজড জেলা এই যশোর। প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোরে অবস্থিত শিক্ষা বোর্ডটিও সর্বপ্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড হয়েছে। এ কার্যক্রমের শুরু ২০১৫ সালে, যা আজ ঈর্ষণীয় সাফল্যের পথে চলমান। আর এর সুফল পাচ্ছে ৩ হাজার ৩৫৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৪ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীসহ ৫২ হাজার শিক্ষক। বছরে কয়েক কোটি টাকার সাশ্রয়ও হচ্ছে।

বোর্ড চেয়ারম্যান ড. প্রফেসর মোল্লা আমীর হোসেন বলেন, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণে বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে ঘরে ঘরে সেবা পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করে। দেশব্যাপী শুরু হয় অনলাইন সেবা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোরে অনলাইন সেবার যাত্রা শুরু করে। এ বোর্ড ২০১১ সালে ডিজিটাল পরিষেবা শুরু করে ঠিকই। তবে ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত নিবন্ধন ও ফরম ফিলআপের আংশিক কাজ করতে সক্ষম হয়। প্রকৃত অনলাইন সেবা বা কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৫ সালের এপ্রিলে। অনলাইনের মাধ্যমে বিদ্যালয় অনুমোদন কার্যক্রম দিয়েই যশোর শিক্ষা বোর্ডের ডিজিটালাইজড কাজ শুরু হয়। অনলাইন কার্যক্রম বাধ্যবাধকতায় আনা হয়।

চেয়ারম্যান ড. মোল্লা আমীর হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ বোর্ডে বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করি। দায়িত্ব নিয়েই বিদ্যালয় অনুমোদন শাখায় অনলাইন বিদ্যালয় অনুমোদন শাখায় ই-ফাইলিং সফটওয়ার চালু করে সব আবেদন অনলাইনে দাখিল, নিষ্পত্তি ও প্রেরণ বাধ্যতামূলক করি। সেই থেকে আর কখনও তা ম্যানুয়ালে যায়নি। পরে সচিব পদে যোগদান করে সব শাখা অনলাইনের আওতায় আনি। ওই সময় থেকে কোন প্রতিষ্ঠান প্রধানকে আর বোর্ড অফিসে আসতে হয় না। এতে তারা হয়রানি থেকেও রেহাই পেয়েছেন।

নাম, বয়স তথা সনদের অন্যান্য যে কোন ভুল সংশোধন, ই-টিসি ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। কাউকে বোর্ডে আসতে হচ্ছে না। পরীক্ষার ফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষার্থীর মোবাইলে পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বিনা খরচে ফল প্রকাশের ১০ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষার্থীরা ফল পেয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন প্রশ্ন ব্যাংক এই বোর্ডের অন্যতম সাফল্য। এজন্য একটি সফটওয়ার তৈরির জন্য বুয়েট কোটি টাকা দাবি করেছিল। বর্তমান চেয়ারম্যান সচিব থাকাকালে বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তরুণ শিক্ষকদের সহযোগিতায় সেই সফটওয়ার তৈরি করা হয়েছে। আর এতে খরচ পড়েছে মাত্র ২৫ লাখ টাকা। এখন এই সফটওয়ারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা বোর্ডের একক ও মানসম্পন্ন প্রশ্নে গ্রহণ করা হয়।

বোর্ডের ডকুমেন্টস শাখায় চলে সীমাহীন দুর্নীতি। আর চলে সেবা গ্রহণকারীদের হয়রানি। ডকুমেন্ট শাখার জন্য সফটওয়ার তৈরি হওয়ায় সে সব দুর্নীতি ও হয়রানি করার সুযোগ আর নেই। স্কান মেশিন দিয়ে কেন্দ্রে ওএমআর স্কান করে অন লাইনে বোর্ডের ওয়েবসাইটে দাখিল করার একটি সফটওয়ার উদ্ভাবন করেছেন চেয়ারম্যান ড. মোল্লা আমীর হোসেন। এখন থেকে কেন্দ্র বা প্রধান পরীক্ষকদের নিকট থেকে আর ওএমআর বোর্ডে আনতে হবে না। এতে বিনা খরচে ওএমআরের রঙিন ছবি মুহূর্তের মধ্যে বোর্ডের ওয়েবসাইটে জমা হবে এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাটা হয়ে রেজাল্ট তৈরি হয়ে যাবে। এতে বোর্ডর কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

অন লাইনে উপস্থিতির হিসাব সংরক্ষণের একটি সফটওয়ার তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে হাজির হয় না। তারা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ইভটিজিং, জঙ্গি, মাদকাসক্তদের আড্ডায় মেতে থাকে। তারা সারা বছর ক্লাস না করায় পরীক্ষায় পাস করতে পারে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে ক্লাসে ওঠার সুযোগ নেয়। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা দেয়। টেস্টে ফেল করলেও তাদের নাম বোর্ডে পাঠাতে বাধ্য করে। এই সফটওয়ারের মাধ্যমে এসব অনিয়ম ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির অবসান হবে।

যশোর শিক্ষা বোর্ডেও এ পর্যন্ত যে সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে তা হলো,

১. অনলাইন ক্লাস। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সহায়তায় ঘরে বসে পাঠ গ্রহণ পদ্ধতি হচ্ছে অনলাইন ক্লাসরুম।

২. নাম ও বয়স সংশোধন অটো চিঠি ও সনদের স্ক্যান কপি প্রেরণ। বোর্ডে সেবাগ্রহিতাদের সর্বাধিক আগমণ ঘটে এই সেবাটি পেতে। তাই বোর্ড অত্যন্ত সুন্দরভাবে শিক্ষার্থীরা যাতে ঘরে বসেই নাম ও বয়স সংশোধনের আবেদন করতে পারে এবং সংশোধন সনদ ডাউনলোড করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

৩. বোর্ডের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ডিজিটালাইজড। এই সেবাটি চালু হওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকরা সহজেই ঘরে বসে বিল পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন।

৪. ই-অফিস ম্যানেজমেন্ট বা ই-ফাইলিং একটি সর্বাধুনিক অফিস ব্যবস্থাপনা, যার সাহায্যে জনগণের দোরগোড়ায় খুব কম খরচে কম সময়ে আবেদন গ্রহণ করে সেটি নিষ্পন্ন করে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ৫. ইনস্টিটিউট প্যানেল। ৬. অনলাইন টিচার ইনফরমেশন। ৭. সেন্টার সেবা ও সোনালি সেবা ভেরিফাই। ৮. নিবন্ধনপত্র ও পরীক্ষার প্রবেশপত্র।

৯. এটেনডেন্স শিট। বায়োমেট্রিক মেশিনে নিয়মানুযায়ী আঙুলের ছাপ প্রদানের মাধ্যমে অনলাইনে হাজিরা নিশ্চিত করবে। ফলে শ্রেণীকক্ষে হাজিরা খাতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের হাজিরা কল করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অবসান ঘটবে এবং প্রক্সি দেয়ার প্রবণতা থাকবে না। টেস্ট পরীক্ষার পর ফরম ফিলআপ প্রক্রিয়ায় এর ব্যবহার শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষমুখী করবে।

১০. পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ এবং পরীক্ষকদের বিল। প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষা বোর্ডে এসে শিক্ষকদের তথ্য/আবেদন জমা দিতেন। বোর্ডে ডাটা এন্ট্রি করে শিক্ষকদের তথ্য হার্ডকপিতে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়া করে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানো হতো। উত্তরপত্র বিতরণ ম্যানুয়ালি করা হতো।

১১. স্টুডেন্ট ম্যানেজমেন্ট। অনলাইনে শিক্ষার্থীদের তথ্য আপলোড, নিবন্ধন, পরীক্ষার্থী নির্বাচন (ফরম ফিলআপ), শিক্ষার্থী বদলি/ছাড়পত্র ও ভর্তি বাতিল। ১২. ইনস্টিটিউট ওয়েবসাইট। ১৩. ফলাফল আর্কাইভ। ১৪. মোবাইলে পরীক্ষার ফল প্রেরণ।

১৫. প্রশ্নপত্র ফাঁস সর্বোতভাবে বন্ধ করার জন্য অনলাইন প্রশ্নব্যাংক কার্যক্রম চালু। এ পদ্ধতিতে অনলাইনে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরিশোধনের অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করে প্রশ্নপত্র স্বয়ংক্রিয় মেশিনে মুদ্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ, নির্ভুল ও মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, গাইড বই ও কোচিং নির্ভরতা বন্ধ করতে ও কমাতে যশোর শিক্ষা বোর্ডের উদ্ভাবন অনলাইন প্রশ্নব্যাংক। রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই যশোর শিক্ষা বোর্ড আইসিটি ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বোর্ডের সব প্রশাসনিক কার্যক্রমের সেবা অনলাইনে প্রদান শুরু করে। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ, নির্ভুল ও মানসম্মত সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে পরীক্ষা গ্রহণ করা যায় সে লক্ষ্যে খসড়া আইডিয়া উপস্থাপন করে। পরীক্ষামূলকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যশোর শিক্ষা বোর্ডকে একটি সফটওয়ার তৈরি ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা (প্রাক-নির্বচনী, নির্বাচনী, অর্ধ-বার্ষিক, বাষিক) গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে।

এর আলোকে প্রশ্নব্যাংক সফটওয়ার তৈরি করে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মতামত গ্রহণ করে ২০১৬ সালে সফটওয়ারটি চূড়ান্ত করা হয়। প্রশ্নব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১৬ মাধ্যমিক ১৬১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারটি বিষয়ে প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা সফলভাবে গ্রহণ করা হয়।

এরপর ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এ বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীর সব বিষয়ে, নবম ও দশম শ্রেণীর ১৭টি বিষয়ে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।

বর্তমানে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত ২৭১৫টি (সব) নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর ৫টি বিষয়, অষ্টম শ্রেণীর সব বিষয়ের অর্ধ-বার্ষিক ও নবম শ্রেণীর ১৯টি বিষয়ের অর্ধ-বাষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রাক-নির্বাচনী ও পরীক্ষা প্রশ্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।

১৬. সমন্বিত ভর্তি কার্যক্রমের অবশিষ্ট যারা কোথাও ভর্তি পারে না ম্যানুয়াল ভর্তির জন্য অপেক্ষায় থাকে তাদের একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির কার্যক্রম অনলাইনে করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১৭. কলেজ-স্কুলের কমিটি অনুমোদন ও তার চিঠি অটো জেনারেট। ১৮. স্বীকৃতি নবায়ন ও তার চিঠি অটো জেনারেট। ১৯. দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই-টিসি। ২০. অনলাইন রেজিস্ট্রেশন কার্ড সংশোধন (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী)। ২১. অনলাইন ভর্তি বাতিল (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী)। ২২. অনলাইন বিল পেমেন্ট ফর সেটার অ্যান্ড মডারেটর।

বস্তবায়নাধীন প্রকল্প রয়েছে তিনটি। সেগুলো হলো, ওএমআর শিটসমূহ কেন্দ্র সচিব ও প্রধান পরীক্ষকদের নিকট থেকে স্ক্যান করে অনলাইনে তার ইমেজ সংগ্রহ করা ও তা দিয়ে রেজাল্ট তৈরি করা। ডকুমেন্ট অনলাইন আর্কাইভ করে সেবা সহজ করা। অনলাইন স্টুডেন্ট প্রোফাইল তৈরি করে শিক্ষার্থীর সব অর্জনসহ পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত আপলোড করা।

[লেখক : সাংবাদিক]

ছবি

নারী জাগরণের পথিকৃৎ

পাহাড় কি শান্তিতে আছে?

আসামের ডিটেনশন সেন্টারের নাম কেন বদলাচ্ছে

বাঙালির অদম্য দেশপ্রেম

বিলুপ্তির পথে বিরল প্রজাতির হনুমান

বনগুলো কি হারিয়ে যাবে

ডিজিটাল সাম্য সমাজের বীজ বঙ্গবন্ধু বপন করেছেন

ছবি

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সংস্কৃতি

চাকরি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, বিড়ম্বনা এবং অচলায়তন

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সাফল্য কি মিলল

ভয়কে জয় করা পরীক্ষা

শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

কলকাতার পুরভোট ও সমকালীন রাজনীতি

ছবি

জেলখানার চিঠি - পিতা-পুত্রের কথোপকথন

ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

ছবি

নদী রক্ষার আন্দোলন

ছবি

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীরা কেন ‘হাফ পাস’ পাবে না

ছবি

রাজস্ব ও দেশের উন্নয়ন

অনলাইন জন্মনিবন্ধনে সমস্যা

ছবি

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন

শান্তিচুক্তি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার

পাঠ্যপুস্তক এবং আমাদের গোঁড়ামি

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

শিক্ষা বিস্তারে সরকারিকরণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

ছবি

বারবার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে

ছবি

প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন বিতর্ক

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

গ্রাম-গ্রামান্তরে

প্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড শিক্ষা বোর্ড যশোর

রুকুনউদ্দৌলাহ

image

বুধবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২১

দেশের অনেক কিছুতে যশোর প্রথম হওয়ার গৌরবের অধিকারী। যুক্ত বাংলার প্রথম জেলা যশোর। এই জেলা প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। প্রথম ডিজিটালাইজড জেলা এই যশোর। প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোরে অবস্থিত শিক্ষা বোর্ডটিও সর্বপ্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড হয়েছে। এ কার্যক্রমের শুরু ২০১৫ সালে, যা আজ ঈর্ষণীয় সাফল্যের পথে চলমান। আর এর সুফল পাচ্ছে ৩ হাজার ৩৫৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৪ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীসহ ৫২ হাজার শিক্ষক। বছরে কয়েক কোটি টাকার সাশ্রয়ও হচ্ছে।

বোর্ড চেয়ারম্যান ড. প্রফেসর মোল্লা আমীর হোসেন বলেন, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণে বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে ঘরে ঘরে সেবা পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করে। দেশব্যাপী শুরু হয় অনলাইন সেবা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোরে অনলাইন সেবার যাত্রা শুরু করে। এ বোর্ড ২০১১ সালে ডিজিটাল পরিষেবা শুরু করে ঠিকই। তবে ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত নিবন্ধন ও ফরম ফিলআপের আংশিক কাজ করতে সক্ষম হয়। প্রকৃত অনলাইন সেবা বা কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৫ সালের এপ্রিলে। অনলাইনের মাধ্যমে বিদ্যালয় অনুমোদন কার্যক্রম দিয়েই যশোর শিক্ষা বোর্ডের ডিজিটালাইজড কাজ শুরু হয়। অনলাইন কার্যক্রম বাধ্যবাধকতায় আনা হয়।

চেয়ারম্যান ড. মোল্লা আমীর হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ বোর্ডে বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করি। দায়িত্ব নিয়েই বিদ্যালয় অনুমোদন শাখায় অনলাইন বিদ্যালয় অনুমোদন শাখায় ই-ফাইলিং সফটওয়ার চালু করে সব আবেদন অনলাইনে দাখিল, নিষ্পত্তি ও প্রেরণ বাধ্যতামূলক করি। সেই থেকে আর কখনও তা ম্যানুয়ালে যায়নি। পরে সচিব পদে যোগদান করে সব শাখা অনলাইনের আওতায় আনি। ওই সময় থেকে কোন প্রতিষ্ঠান প্রধানকে আর বোর্ড অফিসে আসতে হয় না। এতে তারা হয়রানি থেকেও রেহাই পেয়েছেন।

নাম, বয়স তথা সনদের অন্যান্য যে কোন ভুল সংশোধন, ই-টিসি ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। কাউকে বোর্ডে আসতে হচ্ছে না। পরীক্ষার ফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষার্থীর মোবাইলে পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বিনা খরচে ফল প্রকাশের ১০ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষার্থীরা ফল পেয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন প্রশ্ন ব্যাংক এই বোর্ডের অন্যতম সাফল্য। এজন্য একটি সফটওয়ার তৈরির জন্য বুয়েট কোটি টাকা দাবি করেছিল। বর্তমান চেয়ারম্যান সচিব থাকাকালে বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তরুণ শিক্ষকদের সহযোগিতায় সেই সফটওয়ার তৈরি করা হয়েছে। আর এতে খরচ পড়েছে মাত্র ২৫ লাখ টাকা। এখন এই সফটওয়ারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা বোর্ডের একক ও মানসম্পন্ন প্রশ্নে গ্রহণ করা হয়।

বোর্ডের ডকুমেন্টস শাখায় চলে সীমাহীন দুর্নীতি। আর চলে সেবা গ্রহণকারীদের হয়রানি। ডকুমেন্ট শাখার জন্য সফটওয়ার তৈরি হওয়ায় সে সব দুর্নীতি ও হয়রানি করার সুযোগ আর নেই। স্কান মেশিন দিয়ে কেন্দ্রে ওএমআর স্কান করে অন লাইনে বোর্ডের ওয়েবসাইটে দাখিল করার একটি সফটওয়ার উদ্ভাবন করেছেন চেয়ারম্যান ড. মোল্লা আমীর হোসেন। এখন থেকে কেন্দ্র বা প্রধান পরীক্ষকদের নিকট থেকে আর ওএমআর বোর্ডে আনতে হবে না। এতে বিনা খরচে ওএমআরের রঙিন ছবি মুহূর্তের মধ্যে বোর্ডের ওয়েবসাইটে জমা হবে এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাটা হয়ে রেজাল্ট তৈরি হয়ে যাবে। এতে বোর্ডর কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

অন লাইনে উপস্থিতির হিসাব সংরক্ষণের একটি সফটওয়ার তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে হাজির হয় না। তারা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ইভটিজিং, জঙ্গি, মাদকাসক্তদের আড্ডায় মেতে থাকে। তারা সারা বছর ক্লাস না করায় পরীক্ষায় পাস করতে পারে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে ক্লাসে ওঠার সুযোগ নেয়। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা দেয়। টেস্টে ফেল করলেও তাদের নাম বোর্ডে পাঠাতে বাধ্য করে। এই সফটওয়ারের মাধ্যমে এসব অনিয়ম ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির অবসান হবে।

যশোর শিক্ষা বোর্ডেও এ পর্যন্ত যে সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে তা হলো,

১. অনলাইন ক্লাস। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সহায়তায় ঘরে বসে পাঠ গ্রহণ পদ্ধতি হচ্ছে অনলাইন ক্লাসরুম।

২. নাম ও বয়স সংশোধন অটো চিঠি ও সনদের স্ক্যান কপি প্রেরণ। বোর্ডে সেবাগ্রহিতাদের সর্বাধিক আগমণ ঘটে এই সেবাটি পেতে। তাই বোর্ড অত্যন্ত সুন্দরভাবে শিক্ষার্থীরা যাতে ঘরে বসেই নাম ও বয়স সংশোধনের আবেদন করতে পারে এবং সংশোধন সনদ ডাউনলোড করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

৩. বোর্ডের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ডিজিটালাইজড। এই সেবাটি চালু হওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকরা সহজেই ঘরে বসে বিল পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন।

৪. ই-অফিস ম্যানেজমেন্ট বা ই-ফাইলিং একটি সর্বাধুনিক অফিস ব্যবস্থাপনা, যার সাহায্যে জনগণের দোরগোড়ায় খুব কম খরচে কম সময়ে আবেদন গ্রহণ করে সেটি নিষ্পন্ন করে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ৫. ইনস্টিটিউট প্যানেল। ৬. অনলাইন টিচার ইনফরমেশন। ৭. সেন্টার সেবা ও সোনালি সেবা ভেরিফাই। ৮. নিবন্ধনপত্র ও পরীক্ষার প্রবেশপত্র।

৯. এটেনডেন্স শিট। বায়োমেট্রিক মেশিনে নিয়মানুযায়ী আঙুলের ছাপ প্রদানের মাধ্যমে অনলাইনে হাজিরা নিশ্চিত করবে। ফলে শ্রেণীকক্ষে হাজিরা খাতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের হাজিরা কল করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অবসান ঘটবে এবং প্রক্সি দেয়ার প্রবণতা থাকবে না। টেস্ট পরীক্ষার পর ফরম ফিলআপ প্রক্রিয়ায় এর ব্যবহার শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষমুখী করবে।

১০. পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ এবং পরীক্ষকদের বিল। প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষা বোর্ডে এসে শিক্ষকদের তথ্য/আবেদন জমা দিতেন। বোর্ডে ডাটা এন্ট্রি করে শিক্ষকদের তথ্য হার্ডকপিতে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়া করে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানো হতো। উত্তরপত্র বিতরণ ম্যানুয়ালি করা হতো।

১১. স্টুডেন্ট ম্যানেজমেন্ট। অনলাইনে শিক্ষার্থীদের তথ্য আপলোড, নিবন্ধন, পরীক্ষার্থী নির্বাচন (ফরম ফিলআপ), শিক্ষার্থী বদলি/ছাড়পত্র ও ভর্তি বাতিল। ১২. ইনস্টিটিউট ওয়েবসাইট। ১৩. ফলাফল আর্কাইভ। ১৪. মোবাইলে পরীক্ষার ফল প্রেরণ।

১৫. প্রশ্নপত্র ফাঁস সর্বোতভাবে বন্ধ করার জন্য অনলাইন প্রশ্নব্যাংক কার্যক্রম চালু। এ পদ্ধতিতে অনলাইনে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরিশোধনের অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করে প্রশ্নপত্র স্বয়ংক্রিয় মেশিনে মুদ্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ, নির্ভুল ও মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, গাইড বই ও কোচিং নির্ভরতা বন্ধ করতে ও কমাতে যশোর শিক্ষা বোর্ডের উদ্ভাবন অনলাইন প্রশ্নব্যাংক। রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই যশোর শিক্ষা বোর্ড আইসিটি ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বোর্ডের সব প্রশাসনিক কার্যক্রমের সেবা অনলাইনে প্রদান শুরু করে। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ, নির্ভুল ও মানসম্মত সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে পরীক্ষা গ্রহণ করা যায় সে লক্ষ্যে খসড়া আইডিয়া উপস্থাপন করে। পরীক্ষামূলকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যশোর শিক্ষা বোর্ডকে একটি সফটওয়ার তৈরি ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা (প্রাক-নির্বচনী, নির্বাচনী, অর্ধ-বার্ষিক, বাষিক) গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে।

এর আলোকে প্রশ্নব্যাংক সফটওয়ার তৈরি করে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মতামত গ্রহণ করে ২০১৬ সালে সফটওয়ারটি চূড়ান্ত করা হয়। প্রশ্নব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১৬ মাধ্যমিক ১৬১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারটি বিষয়ে প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা সফলভাবে গ্রহণ করা হয়।

এরপর ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এ বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীর সব বিষয়ে, নবম ও দশম শ্রেণীর ১৭টি বিষয়ে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।

বর্তমানে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত ২৭১৫টি (সব) নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর ৫টি বিষয়, অষ্টম শ্রেণীর সব বিষয়ের অর্ধ-বার্ষিক ও নবম শ্রেণীর ১৯টি বিষয়ের অর্ধ-বাষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রাক-নির্বাচনী ও পরীক্ষা প্রশ্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।

১৬. সমন্বিত ভর্তি কার্যক্রমের অবশিষ্ট যারা কোথাও ভর্তি পারে না ম্যানুয়াল ভর্তির জন্য অপেক্ষায় থাকে তাদের একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির কার্যক্রম অনলাইনে করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১৭. কলেজ-স্কুলের কমিটি অনুমোদন ও তার চিঠি অটো জেনারেট। ১৮. স্বীকৃতি নবায়ন ও তার চিঠি অটো জেনারেট। ১৯. দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই-টিসি। ২০. অনলাইন রেজিস্ট্রেশন কার্ড সংশোধন (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী)। ২১. অনলাইন ভর্তি বাতিল (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী)। ২২. অনলাইন বিল পেমেন্ট ফর সেটার অ্যান্ড মডারেটর।

বস্তবায়নাধীন প্রকল্প রয়েছে তিনটি। সেগুলো হলো, ওএমআর শিটসমূহ কেন্দ্র সচিব ও প্রধান পরীক্ষকদের নিকট থেকে স্ক্যান করে অনলাইনে তার ইমেজ সংগ্রহ করা ও তা দিয়ে রেজাল্ট তৈরি করা। ডকুমেন্ট অনলাইন আর্কাইভ করে সেবা সহজ করা। অনলাইন স্টুডেন্ট প্রোফাইল তৈরি করে শিক্ষার্থীর সব অর্জনসহ পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত আপলোড করা।

[লেখক : সাংবাদিক]

back to top