alt

উপ-সম্পাদকীয়

আসুন মানবতাবাদের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বিশ্ব গড়ি

মুক্তা শেরপা

: রোববার, ২৫ এপ্রিল ২০২১
image

বিশ্ব ব্রহ্মা- চারটি প্রধান ধর্মে (হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান) বিভক্ত। সব ধর্মের অনুসারীগণই নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে একজনকে সৃষ্টিকর্তা বলে মানেন এবং জানেন। ধর্ম আসলে কি? ধর্ম হলো একটি অবলম্বন অথবা সুকাঠামো যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ তার জীবনকে সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত রাখতে পারেন। আর ধর্মীয় কৃষ্টি কালচার হলো মানুষের জীবনকে সুপথে নিয়ন্ত্রিত রাখার কিছু পন্থা। আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্য ধর্মীয় কৃষ্টি কালচার পালন করে থাকি।

তবে বিভক্ত এই চার ধর্মের মানুষের মাঝেই আবহমান কাল ধরে চলে আসছে ধর্মীয় ভেদাভেদ। প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত। এভাবে একসময় মানুষ অন্য ধর্মের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মানুষ কখনো হিংস্র হয়ে জন্মগ্রহণ করে না; ক্রমাগত হিংস্র হয়ে ওঠে। এর জন্য দায়ী তার সমাজ ব্যবস্থা, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অন্ধকারাচ্ছন্নতা। এরমধ্যে অন্যতম একটি হলো ধর্মান্ধতা। ধর্মান্ধতা থেকে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িকতা আর সাম্প্রদায়িকতা থেকে জন্ম নেয় উগ্রবাদ। আর উগ্রবাদ সবসময়ই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অন্তরায়।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিগ্রহের একটি অন্যতম প্রধান কারণ এই ধর্মীয় ভেদাভেদ। যেভাবে ধর্মীয় দাঙ্গামা শুরু হয়েছে, আশঙ্কা করা হচ্ছে হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে শুধু উগ্রবাদী আর ধর্মান্ধদের কারণে যার ভয়াবহতা হবে হয়তো পূর্বেকার চাইতে কয়েকগুণ বেশি। মানবতা থেকে প্রাধান্য পাবে নিজ নিজ ধর্মীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার। তবে এত্থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আছে?

সাম্প্রদায়িকতার কারণেই সেই ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে নৃশংস বোমা হামলা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ২০১৬ এর ১ জুলাই বাংলাদেশের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। মায়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বে আলোড়িত। একমাত্র এই সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ২০১৯-এর ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ড ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে মুসল্লিদের ওপর হামলা হয়।

সেই শোকের রেষ কাটতে না কাটতেই আবার শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোসহ দেশটির অন্তত ছয়টি স্থানে তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও সাম্প্রদায়িকতার রোষানলে সমগ্র বিশ্বের সংখ্যালঘুরাই নিজ নিজ দেশে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সিরিয়া, ফিলিস্তান, ইসরাইল এবং ভারতের কিছু কিছু জায়গায় মুসলিম নির্যাতিত হচ্ছে।

সমগ্র পৃথিবীতে শুধু চারটি প্রধান ধর্মই নয়; এর রয়েছে আবার শাখা-প্রশাখা। যেমন মুসলিম এর মধ্যে কেউ শিয়া, আবার কেউ সুন্নি। সুন্নিদের মধ্যে আবার কেউ শরিয়তি, কেউ মারফতি। এদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

আবার হিন্দুদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য জাত। সেখানে রয়েছে আবার উঁচু-নীচু জাত ভেদাভেদ। নীচু জাতেরা উঁচু জাত কর্তৃক সমাজে চরমভাবে নিগৃহীত হয়। এই ২০১৯ এর ১৯ জানুয়ারি ভারতের উড়িষ্যায় নীচু জাতের হওয়াতে মায়ের মৃতদেহ সৎকারে কারও সাহায্য পায়নি সরোজ নামে ১৭ বছরের এক কিশোর। অনন্যোপায় হয়ে মায়ের মৃতদেহকে সাইকেলে বেঁধে ৪-৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্মশানে দাহ করার সুযোগও হয়নি। নির্মম ও নিষ্ঠুর জাতিভেদের শিকার হয়ে দূরের জংগলে মাকে সমাহিত করতে হয়েছে।

এমন ঘটনা নিরবে নিভৃতে হাজারো ঘটছে। মানবতা যেন মাথা ঠুকরে কাঁদছে। বুঝি না যেই ধর্ম জাত ভেদাভেদে মানুষের মানবতাকে ভুলিয়ে দেয় সেই ধর্ম কি করে ‘ধর্ম’ হয়? “এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান গোত্র নাহি রবে” -লালন ফকির। এমন পাশবিকতা দেখার পরে সত্যিই মনে হয় আমি লালন সাঁইজির মতো জাতি ধর্ম গোত্রহীন একজন মানুষে পরিণত হই যেখানে থাকবে শুধুই মানবতা।

আসলেই তো তা-ই, যা কিছু সত্য ও সুন্দর তা-ই ধর্ম। ধর্ম হলো মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা; মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ। মানবতার ঊর্ধ্বে কোনোই ধর্ম হতে পারে না। “আগুন, পানি, বাতাস, মাটি এবং শূন্য সংবলিত প্রকৃতির সমস্ত ফিজিক্স কেমিস্ট্রির নিয়ম ও আচরণই হচ্ছে ধর্ম” -স্যার পান্না চৌধুরী। তেমনি মানুষেরও সত্তাগত একটি ধর্ম আছে -‘মনুষ্যত্ব’। বাকিসব (সম্প্রদায়ভুক্ত সব ধর্ম) মনুষ্য সৃষ্টই কেবল।

কারো থাকতেই পারে একটি সুন্দর অনুসরণীয় পথ, মত এবং বিশ্বাস যাকে তিনি ধর্ম বলেই জানেন মানেন। তবে সেই বিশ্বাস জোরপূর্বক অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টাকেই বলে ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদীতা। মানুষের প্রকৃত ধর্ম তো শুধু অন্তরেই থাকে। ধর্মীয় রিচুয়্যাল অ্যাক্টিভিটিস; যা অন্যকে দেখানো যায় অর্থাৎ ধর্মীয় লেবাস অথবা বহিরাঙ্গে সাধুসাজ কখনো ধর্ম হতে পারে না।

ভেদাভেদ যেখানে আছে, বিরোধ বা লড়াই সেখানে অনিবার্য। ধর্মীয় ভেদাভেদ যদি মানুষকে সাম্প্রদায়িকতায় কেন্দ্রীভূত করে তবে আমি কোন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না; আমি সার্বজনীন হতে চাই। চিৎকার করে বলতে চাই” আমি না হিন্দু, না মুসলিম, না বৌদ্ধ, না খ্রিস্টান; আমি শুধু একজন মানুষ শুধুই মানুষ। আমার স্রষ্টাকে আমি মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, অন্ধকার গুহা, ধু ধু মরুভূমি, পানি, বায়ু, অগ্নি, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই উপলব্ধি করি।

পৃথিবীর সব মনুষ্যজাতি, পশুপাখি থেকে শুরু করে যদি সবকিছুই একই স্রষ্টার সৃষ্টি হয় তবে কেবল আমরা মনুষ্যজাতিই কেন ধর্মকে আলাদা আলাদা ভাগে বিভক্ত করেছি? পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর তো আলাদা আলাদা কোন ধর্ম নেই। ওদের ধর্ম বলতে শুধু ওদের স্বকীয় সত্তাকেই বোঝায়। তবে কি ওদের মৃত্যুর পরে স্বর্গপ্রাপ্তি অথবা জান্নাতপ্রাপ্তি হবে না? নাকি আমরা মনুষ্যজাতিই শুধু স্বর্গ/বেহেস্ত নিয়ে কাড়াকাড়ি করছি?

সম্প্রদায় প্রীতি, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা, নিন্দা সমালোচনা এটা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলে মনে হয়। এ থেকে ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষের কঠিন। তবে মহৎ গুণের মানুষও পৃথিবীতে আছে। যারা নিজ নিজ ধর্মে অধিভুক্ত থেকেও মানবতার ঊর্ধ্বে তাদের অন্তর থেকে প্রণিপাত জানাই।

সমগ্র বিশ্ব যখন সাম্প্রদায়িকতায় জর্জরিত তখন অসাম্প্রদায়িকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কানাডায় টরন্টোস্থ ট্রিনিটি সেন্ট পলস ইউনাইটেড চার্চে নামাজের জন্য আহ্বান জানিয়ে খুলে দেয়া হয়েছে গির্জার দরজা। কিছুদিন পূর্বে ভারতের কেরেলা রাজ্যে ঈদগাঁহ বন্যার পানিতে ডুবে গেলে মন্দিরের দরজা খুলে দেয়া হয় নামাজিদের নামাজের জন্য।

তেমনি মুসলিমদের মধ্যেও মহৎ হৃদয়ের কিছু মানুষ না থাকলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে যেত। “মুসলিম মানেই উগ্রবাদী”, এই দৃষ্টিভঙ্গিও ভয়ঙ্কর রকমের বর্ণবাদিতা। বেপরোয়া ধর্মান্ধদেরই জঙ্গি বলা হয়; তা যে ধর্মেরই হোক না কেন। কারো হিংস্রতা প্রকাশ্যে; কারওবা থাকে অন্তরে। সুযোগ পেলেই এর বহিঃন্ত্রাশ ঘটতে থাকে। ইসলাম মানুষকে উদারতা শেখায়। ইসলামের উদারতা যে ধারণ করতে না পারে, সে প্রকৃত মুসলমান নয়। এদেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবার সম্প্রীতিতে গাথা।”

সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই। আমাদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার পথে প্রধান বাধা ধর্মীয় ভেদাভেদ যা জন্মের পর থেকেই প্রত্যেকের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত করার উপায় হিসেবে মানুষকে বেশি বেশি সংস্কৃতি চর্চায় উদ্ভুদ্ধ করা এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্ত চিন্তাচেতনার কিছু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার সংযোজন করা অতীব প্রয়োজন। মানুষ চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত হোক এই হোক প্রত্যয়।

[লেখক : নরওয়েভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র অ্যাডভাইজারি]

ই-কৃষি : কৃষকের মুখে হাসি

বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে চাই সচেতনতা

ছবি

বলাৎকার ও ধর্ষণ একই অপরাধের ভিন্ন সাজা কেন?

মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার ও নারী ইউএনও

পরিবেশ ছাড়পত্র কেন প্রয়োজন

হারিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর খাল

তিস্তার ডান তীরের মঙ্গা মোকাবিলায় করণীয়

ছবি

হিন্দু নারীর সমানাধিকারের দাবি

ছবি

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

ভূমিকম্প : প্রস্তুতি থাকলে মোকাবিলা করতে সুবিধা

মাগুরছড়ায় পরিবেশ-প্রতিবেশ হত্যার বিচার কি হবে না

ছবি

টিকা কখন

ছবি

সূর্যডিম

বাজেটে উপেক্ষিত আদিবাসীরা

ছবি

কোভিড-১৯ : ভ্যাকসিন তৈরি ও কর্মকৌশল

বাজেট ২০২১-২২

শিক্ষকদের বোবাকান্না

ছবি

তাদের আমি খুঁজে বেড়াই

ছবি

বাজেট কি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে

প্রান্তিক শিশুর মনোসামাজিক অবস্থা

শিক্ষা বাজেট : সংকট ও সম্ভাবনা

চোখ রাঙাচ্ছে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট

উদ্যোক্তা উন্নয়নে চাই সামগ্রিক পরিকল্পনা

মাশরুম প্রকল্প কার জন্য?

হাফিজ হয়তো আগেই চলে গেছে

বনাখলা ও আগার খাসিপুঞ্জির ন্যায়বিচার

খাদেম ভিসা ও কিছু কথা

ব্যাংক ঋণ চাই

বাজেট কি গণমুখী

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব

ছবি

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

পান গাছ না থাকলে খাসিয়ারা বাঁচবে কী করে

ছবি

ছয় দফা : জাতির মুক্তিসনদ

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

মধ্যবিত্তবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়ন কৌশল

tab

উপ-সম্পাদকীয়

আসুন মানবতাবাদের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বিশ্ব গড়ি

মুক্তা শেরপা

image

রোববার, ২৫ এপ্রিল ২০২১

বিশ্ব ব্রহ্মা- চারটি প্রধান ধর্মে (হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান) বিভক্ত। সব ধর্মের অনুসারীগণই নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে একজনকে সৃষ্টিকর্তা বলে মানেন এবং জানেন। ধর্ম আসলে কি? ধর্ম হলো একটি অবলম্বন অথবা সুকাঠামো যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ তার জীবনকে সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত রাখতে পারেন। আর ধর্মীয় কৃষ্টি কালচার হলো মানুষের জীবনকে সুপথে নিয়ন্ত্রিত রাখার কিছু পন্থা। আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্য ধর্মীয় কৃষ্টি কালচার পালন করে থাকি।

তবে বিভক্ত এই চার ধর্মের মানুষের মাঝেই আবহমান কাল ধরে চলে আসছে ধর্মীয় ভেদাভেদ। প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত। এভাবে একসময় মানুষ অন্য ধর্মের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মানুষ কখনো হিংস্র হয়ে জন্মগ্রহণ করে না; ক্রমাগত হিংস্র হয়ে ওঠে। এর জন্য দায়ী তার সমাজ ব্যবস্থা, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অন্ধকারাচ্ছন্নতা। এরমধ্যে অন্যতম একটি হলো ধর্মান্ধতা। ধর্মান্ধতা থেকে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িকতা আর সাম্প্রদায়িকতা থেকে জন্ম নেয় উগ্রবাদ। আর উগ্রবাদ সবসময়ই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অন্তরায়।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিগ্রহের একটি অন্যতম প্রধান কারণ এই ধর্মীয় ভেদাভেদ। যেভাবে ধর্মীয় দাঙ্গামা শুরু হয়েছে, আশঙ্কা করা হচ্ছে হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে শুধু উগ্রবাদী আর ধর্মান্ধদের কারণে যার ভয়াবহতা হবে হয়তো পূর্বেকার চাইতে কয়েকগুণ বেশি। মানবতা থেকে প্রাধান্য পাবে নিজ নিজ ধর্মীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার। তবে এত্থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আছে?

সাম্প্রদায়িকতার কারণেই সেই ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে নৃশংস বোমা হামলা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ২০১৬ এর ১ জুলাই বাংলাদেশের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। মায়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বে আলোড়িত। একমাত্র এই সাম্প্রদায়িকতার কারণেই ২০১৯-এর ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ড ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে মুসল্লিদের ওপর হামলা হয়।

সেই শোকের রেষ কাটতে না কাটতেই আবার শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোসহ দেশটির অন্তত ছয়টি স্থানে তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও সাম্প্রদায়িকতার রোষানলে সমগ্র বিশ্বের সংখ্যালঘুরাই নিজ নিজ দেশে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সিরিয়া, ফিলিস্তান, ইসরাইল এবং ভারতের কিছু কিছু জায়গায় মুসলিম নির্যাতিত হচ্ছে।

সমগ্র পৃথিবীতে শুধু চারটি প্রধান ধর্মই নয়; এর রয়েছে আবার শাখা-প্রশাখা। যেমন মুসলিম এর মধ্যে কেউ শিয়া, আবার কেউ সুন্নি। সুন্নিদের মধ্যে আবার কেউ শরিয়তি, কেউ মারফতি। এদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

আবার হিন্দুদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য জাত। সেখানে রয়েছে আবার উঁচু-নীচু জাত ভেদাভেদ। নীচু জাতেরা উঁচু জাত কর্তৃক সমাজে চরমভাবে নিগৃহীত হয়। এই ২০১৯ এর ১৯ জানুয়ারি ভারতের উড়িষ্যায় নীচু জাতের হওয়াতে মায়ের মৃতদেহ সৎকারে কারও সাহায্য পায়নি সরোজ নামে ১৭ বছরের এক কিশোর। অনন্যোপায় হয়ে মায়ের মৃতদেহকে সাইকেলে বেঁধে ৪-৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্মশানে দাহ করার সুযোগও হয়নি। নির্মম ও নিষ্ঠুর জাতিভেদের শিকার হয়ে দূরের জংগলে মাকে সমাহিত করতে হয়েছে।

এমন ঘটনা নিরবে নিভৃতে হাজারো ঘটছে। মানবতা যেন মাথা ঠুকরে কাঁদছে। বুঝি না যেই ধর্ম জাত ভেদাভেদে মানুষের মানবতাকে ভুলিয়ে দেয় সেই ধর্ম কি করে ‘ধর্ম’ হয়? “এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান গোত্র নাহি রবে” -লালন ফকির। এমন পাশবিকতা দেখার পরে সত্যিই মনে হয় আমি লালন সাঁইজির মতো জাতি ধর্ম গোত্রহীন একজন মানুষে পরিণত হই যেখানে থাকবে শুধুই মানবতা।

আসলেই তো তা-ই, যা কিছু সত্য ও সুন্দর তা-ই ধর্ম। ধর্ম হলো মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা; মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ। মানবতার ঊর্ধ্বে কোনোই ধর্ম হতে পারে না। “আগুন, পানি, বাতাস, মাটি এবং শূন্য সংবলিত প্রকৃতির সমস্ত ফিজিক্স কেমিস্ট্রির নিয়ম ও আচরণই হচ্ছে ধর্ম” -স্যার পান্না চৌধুরী। তেমনি মানুষেরও সত্তাগত একটি ধর্ম আছে -‘মনুষ্যত্ব’। বাকিসব (সম্প্রদায়ভুক্ত সব ধর্ম) মনুষ্য সৃষ্টই কেবল।

কারো থাকতেই পারে একটি সুন্দর অনুসরণীয় পথ, মত এবং বিশ্বাস যাকে তিনি ধর্ম বলেই জানেন মানেন। তবে সেই বিশ্বাস জোরপূর্বক অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টাকেই বলে ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদীতা। মানুষের প্রকৃত ধর্ম তো শুধু অন্তরেই থাকে। ধর্মীয় রিচুয়্যাল অ্যাক্টিভিটিস; যা অন্যকে দেখানো যায় অর্থাৎ ধর্মীয় লেবাস অথবা বহিরাঙ্গে সাধুসাজ কখনো ধর্ম হতে পারে না।

ভেদাভেদ যেখানে আছে, বিরোধ বা লড়াই সেখানে অনিবার্য। ধর্মীয় ভেদাভেদ যদি মানুষকে সাম্প্রদায়িকতায় কেন্দ্রীভূত করে তবে আমি কোন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না; আমি সার্বজনীন হতে চাই। চিৎকার করে বলতে চাই” আমি না হিন্দু, না মুসলিম, না বৌদ্ধ, না খ্রিস্টান; আমি শুধু একজন মানুষ শুধুই মানুষ। আমার স্রষ্টাকে আমি মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, অন্ধকার গুহা, ধু ধু মরুভূমি, পানি, বায়ু, অগ্নি, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই উপলব্ধি করি।

পৃথিবীর সব মনুষ্যজাতি, পশুপাখি থেকে শুরু করে যদি সবকিছুই একই স্রষ্টার সৃষ্টি হয় তবে কেবল আমরা মনুষ্যজাতিই কেন ধর্মকে আলাদা আলাদা ভাগে বিভক্ত করেছি? পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর তো আলাদা আলাদা কোন ধর্ম নেই। ওদের ধর্ম বলতে শুধু ওদের স্বকীয় সত্তাকেই বোঝায়। তবে কি ওদের মৃত্যুর পরে স্বর্গপ্রাপ্তি অথবা জান্নাতপ্রাপ্তি হবে না? নাকি আমরা মনুষ্যজাতিই শুধু স্বর্গ/বেহেস্ত নিয়ে কাড়াকাড়ি করছি?

সম্প্রদায় প্রীতি, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা, নিন্দা সমালোচনা এটা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলে মনে হয়। এ থেকে ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষের কঠিন। তবে মহৎ গুণের মানুষও পৃথিবীতে আছে। যারা নিজ নিজ ধর্মে অধিভুক্ত থেকেও মানবতার ঊর্ধ্বে তাদের অন্তর থেকে প্রণিপাত জানাই।

সমগ্র বিশ্ব যখন সাম্প্রদায়িকতায় জর্জরিত তখন অসাম্প্রদায়িকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কানাডায় টরন্টোস্থ ট্রিনিটি সেন্ট পলস ইউনাইটেড চার্চে নামাজের জন্য আহ্বান জানিয়ে খুলে দেয়া হয়েছে গির্জার দরজা। কিছুদিন পূর্বে ভারতের কেরেলা রাজ্যে ঈদগাঁহ বন্যার পানিতে ডুবে গেলে মন্দিরের দরজা খুলে দেয়া হয় নামাজিদের নামাজের জন্য।

তেমনি মুসলিমদের মধ্যেও মহৎ হৃদয়ের কিছু মানুষ না থাকলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে যেত। “মুসলিম মানেই উগ্রবাদী”, এই দৃষ্টিভঙ্গিও ভয়ঙ্কর রকমের বর্ণবাদিতা। বেপরোয়া ধর্মান্ধদেরই জঙ্গি বলা হয়; তা যে ধর্মেরই হোক না কেন। কারো হিংস্রতা প্রকাশ্যে; কারওবা থাকে অন্তরে। সুযোগ পেলেই এর বহিঃন্ত্রাশ ঘটতে থাকে। ইসলাম মানুষকে উদারতা শেখায়। ইসলামের উদারতা যে ধারণ করতে না পারে, সে প্রকৃত মুসলমান নয়। এদেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবার সম্প্রীতিতে গাথা।”

সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই। আমাদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার পথে প্রধান বাধা ধর্মীয় ভেদাভেদ যা জন্মের পর থেকেই প্রত্যেকের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত করার উপায় হিসেবে মানুষকে বেশি বেশি সংস্কৃতি চর্চায় উদ্ভুদ্ধ করা এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্ত চিন্তাচেতনার কিছু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার সংযোজন করা অতীব প্রয়োজন। মানুষ চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত হোক এই হোক প্রত্যয়।

[লেখক : নরওয়েভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র অ্যাডভাইজারি]

back to top