alt

উপ-সম্পাদকীয়

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

এমএ কবীর

: শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের মাফুসি কারাগারেই বন্দি আছেন তিন হাজার বাংলাদেশি। বিভিন্ন অপরাধে তারা গ্রেপ্তার হয়ে ভোগ করছেন সাজা। আনুমানিক হিসাবে বিশ্বের ৪২ দেশে কমপক্ষে ২০ হাজার বাংলাদেশি বন্দি আছেন। এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ সরকারের পরিসংখ্যানে শুধু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়াদের তথ্যই আছে। প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা বা যাদের কাছে ডকুমেন্টস নেই তাদের সংখ্যা সেভাবে উঠে আসে না। এর মধ্যেই প্রতিদিন প্রচলিত ও অপ্রচলিত পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। ভাগ্য বদলের আশায় তারা বৈধ পথের পাশাপাশি যাচ্ছেন অবৈধ পথেও। অনেকেই গিয়ে আটক হচ্ছেন সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। আবার অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষে অবস্থান করে অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন।

কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে থাকাদের মধ্যে রয়েছেন অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থানকারী ছাড়াও চুরি, মাদক পাচারসহ রোমহর্ষক খুনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতরাও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীদের নিয়ে গবেষণা করা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যানের তথ্যানুসারে, বিশ্বের ৪২টি দেশে কমপক্ষে ১০ হাজার বাংলাদেশি বন্দি হয়ে আছেন। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনও হচ্ছে।

নাম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়ার মাধ্যমে ২৩ দেশে বন্দি থাকা বাংলাদেশিদের ধাপে ধাপে আইনি সেবা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে বাকি দেশগুলোতে থাকা আটকদের বিষয়ে কোন পক্ষ থেকেই তেমন কোন উদ্যোগ নেই।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্যানুসারে শুধু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কারাগারেই আছে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি। অন্যদিকে, দুর্গম পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে বন্দি হওয়া অনেকের তথ্যই পাওয়া যায় না। সেখানকার অনেক দেশেই নিয়মতান্ত্রিক কারাগারের কাঠামোই নেই। সেখানে হয়তো কোন ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয় গ্রেপ্তার হওয়া ভাগ্যান্বেষীদের।

পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও দূতাবাসগুলোর তালিকা অনুসারে, বাংলাদেশিরা বন্দি আছেন মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, লেবানন, জাপান, মালদ্বীপ, ওমান, মিসর, ইরান, বুলগেরিয়া, চীন, ফ্রান্স, তুরস্ক, আজারবাইজান, কোরিয়া, ব্রুনাই, জাপান, জিম্বাবুয়ে, তাঞ্জানিয়া, আলজেরিয়া, জর্ডান, মরিশাস, বাহরাইন, সাইপ্রাস, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া, কম্বোডিয়া, বেলজিয়াম, জর্জিয়া, সুইডেন, সার্বিয়া, নেপাল, পোল্যান্ড, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। এর মধ্যে আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান, মিসর, কাতার, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে খুন ধর্ষণের মতো অপরাধে ইতোমধ্যেই মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়ে কার্যকরের অপেক্ষায় আছেন ৩৪ জন। মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হওয়ার মতো অপরাধে বিচার চলছে ১৪৮ জনের।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি কর্মরত। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস। প্রবাসীদের সবাই যে বৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে সেসব দেশে গেছেন তা বলার কোন অবকাশ নেই। এদের অনেকে অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে যে বিড়ম্বনায় পড়েছেন তা কল্পনা করাও কঠিন। বিশেষ করে সমুদ্রপথে ইউরোপ যেতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যা খুব একটা কম নয়। বিদেশে তাদের আটক করে মুক্তিপণ আদায়ও ঘটেছে অসংখ্য।

সিলেটের হবিগঞ্জের ভারত সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারীদের বাড়ির সামনে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এমন একটা সাইনবোর্ডের ছবি দিয়েছে ডেইলি স্টার, যাতে লেখা, ‘মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি’। চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে জারি বিজিবির কার্যক্রম ও এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার প্রয়াস খুবই ভালো। আইন প্রয়োগের সঙ্গে মানুষকে শোধরানোর কাজটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু মুশকিল হলো, আইনের কাজ আইনকে ‘বাইপাস’ করে করতে যাওয়া। ধর্ম বলে যার পাপ শাস্তি তারই। আইনও তাই বলে, বাবার পাপের শাস্তির ছেলে পাবে না, ছেলের পাপের শাস্তি বাবা। এই যে মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি বলে যেসব বাড়িকে চিহ্নিত করা হলো, সেসব বাড়িতে কি মাদক ব্যবসায়ী একাই বাস করেন? না সেখানে তাদের শিশু সন্তান, স্ত্রী বা বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন? যদি থাকেন তবে তাদের অসম্মান করার অধিকার কে কাকে দিল? কোন আইনে দেয়া হলো।

বাবাকে বাগে আনতে ছেলেকে খুন। ভাইকে বাগে আনতে বোনকে লাঞ্ছিত করা। মেয়েকে ভোগ করতে বাপকে হেনস্তা। কাগজে চোখ বুলালেই কদিন পরপর চোখে পড়ে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর। ছেলেকে হত্যা করে বাপের আত্মহত্যা। মেয়েকে মেরে মার গলায় দড়ি। দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর মরদেহ পাওয়া গেছে ছাত্রী নিবাসে। এর আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রের ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায়। একজন তরুণ মা-বাবাকে চিরকুট লিখলেন, ‘আমি ব্যর্থ, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো’। কতটা হতাশ হলে একজন তরুণ-যুবা এমনটা চিরকুটে লিখে নিজেকে ‘কুইট’ করতে পারে।

বাকস্বাধীনতা বা মুক্ত মত প্রকাশের বিষয়টি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ। একদলের মতে, ‘বাক স্বাধীনতা মানেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়,’ আরেক দল মনে করেন, ‘বাক স্বাধীনতা মানে দেশের অস্তিত্বে আঘাত নয়,’। আসল কথা হচ্ছে, সংখ্যাগুরু মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী নিজের মতের বিরুদ্ধে কোন কথা যেমন শুনতে চায় না, তেমনি অন্যের মতকে আক্রমণ করার জন্য বাক স্বাধীনতার আশ্রয়ও চায়।

মানুষ যেটা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই দেখতে চাওয়ার প্রবণতা থেকে ফেক নিউজ বা ভুল তথ্যকে বিশ্বাস করে। এমনকি মিথ্যা জেনেও। এই বিশ্বাসটা যে আনমনে চলে আসে তা নয়, বরং ‘বিশ্বাস করে’ বলেই সে বিশ্বাস করে। যার কারণে ফ্রয়েড আনকনসাস শব্দটিকে অনেক আগেই অস্বীকার করেছেন।

পৃথিবীর সৃষ্টি আর আকারের সঠিক ধারণা ছিল মানব ইতিহাসে এক বড় ধাক্কা। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ দশকেই ঈজিয়ান অঞ্চলের জ্যোতির্বিদ অ্যারিস্টারকাস সূর্যকে বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু বলে গণ্য করেন। সে সময় গ্রিক দার্শনিক টলেমি বা তার অনুসারীরা এ মতবাদ গ্রহণ করেননি। কারণ এটি ছিল তাদের জন্য ভিন্নমত। ফলে এ মতবাদের বিরোধিতা করেছেন জোরালোভাবে। তারা বলতেন, বিশ্বের সব বস্তু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান। পরবর্তীতে টলেমিকে অনুসরণ করেছেন প্লেটো এবং এরিস্টটল। তারাও অ্যারিস্টারকাসের এই মতকে বন্দি করে রাখেন এবং প্রচলিতধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মত দেন যে, ‘পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র।’ এরপর আর কেউ সাহস করেনি এই মতবাদকে ভাঙার। কারণ তৎকালীন গ্রিস, তথা পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতো তাদের এই দার্শনিককূলের মতামতের ওপর। কেটে যায় দুই হাজার বছর। এরপর যখন ১৫ শতকে কোপার্নিকাস এসে সুসঙ্গতভাবে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণরত গ্রহসমূহের ধারণা নিয়ে ভাবেন। তিনি সাহস পাচ্ছিলেন না প্রচলিত বিশ্বাসকে ভাঙতে। কারণ তার ওই মত অনেকের ধর্মীয় অনুভূতিতে যেমন আঘাত হানতে পারে, তেমনি সৃষ্টির ধারণাকেও বদলে দিতে পারে। তার এই মতবাদ লিপিবদ্ধ হওয়ার পরেও দীর্ঘ একযুগের বেশি সময় অপ্রকাশিত রাখতে হয়। কোপার্নিকাস তার নতুন মতবাদের বিষয়বস্তু নিয়ে একটি পা-ুলিপি প্রস্তুত করেন। ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে সেটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি তার বন্ধুদের মাঝে প্রচার করেন। এরপর ২২ বছর পর মতবাদটি প্রকাশের অনুমতি পান তিনি। তার ছাত্র রেটিকাসের প্রচেষ্টায় এই মতকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। পা-ুলিপিটি মুদ্রণের জন্য জার্মানির নুরেমবার্গে নিয়ে যান রেটিকাস। কিন্তু সেখানে মার্টিন লুথার, ফিলিপ মেলান্সথন ও অন্য সংস্কারকদের বাধার কারণে আর প্রকাশ করা যায়নি। রেটিকাস নুরেমবার্গ থেকে লাইপজিগে চলে যান এবং প্রকাশনার দায়িত্ব দেন আন্দ্রিয়াস ও সিয়ান্ডারের হাতে। মতবাদটি প্রকাশের আগেই সমালোচনার ভয় পাচ্ছিলেন সিয়ান্ডার, কোপার্নিকাসের সঙ্গে তারও জীবন হারানোর ভয়ে। তাই গ্রন্থের সঙ্গে একটা মুখবন্ধজুড়ে দিয়ে তিনি লেখেন, ‘এ বইয়ের বিষয়বস্তু পুরোপুরি সত্য নয়। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।’ এই কথাটি বলে তিনি নিজেকে নিরাপদ রাখলেন এবং বইটি থেকে অ্যারিস্টার্কাসের নাম মুছে ফেলেন। যিনি প্রথম বলেছিলেন, ‘সূর্য স্থির পৃথিবী গতিশীল।’ শুধু মত প্রকাশ করতে না পারার কারণে পৃথিবী, তথা সৃষ্টির ধারণা থেকে দুই হাজার বছর পিছিয়ে গিয়েছিল বিশ^। দুই হাজার বছর কেন লাগলো সেই সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে? কারণ ক্ষমতাশালীরা এবং মতের সংখ্যাগুরুরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে সেখানে ভিন্নমত কোন স্থানই পায়নি।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

প্রিয়জন হারানোর বেদনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হয়েছেটা কী

ক্ষমতার অপব্যবহার দুর্নীতির অন্যতম কারণ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন চাই

বাংলাদেশ-রাশিয়া বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

মুজিববর্ষে আদিবাসীদের প্রতি ভালোবাসা

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে হবে মূল লক্ষ্য

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা : এখনও অনেক কাজ বাকি

ছবি

নাসিক নির্বাচন কি বার্তা দিচ্ছে?

ছবি

ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো

ছবি

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমাদের জীবন, আমাদের সন্তান

সমাজে বিভক্তির ফাটল

ভারতে মুসলমানের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক অবহেলা

প্রসঙ্গ তালাকের নোটিশ

কীভাবে অজান্তেই ধনী হয়ে উঠছি

নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত কল্যাণ হবে না

ননএমপিও : অবসান হোক এ অসহ রাত্রির

ছবি

কখন ও কেমন হবে করোনার শেষটা

ছবি

‘বিদ্রোহী’ ও সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ

আস্থাহীনতা কেন চিন্তাহীনতার জন্ম দেয়?

কৃষির রূপান্তর : প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিও আছে

ভূমি মন্ত্রণালয়ের আধুনিকায়ন ও প্রত্যাশা

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

“অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু”

নতুন কপিরাইট আইনের খসড়া

ছবি

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নারীর অংশগ্রহণ

গণমাধ্যমের শিরদাঁড়া

এনসিটিবিতে হচ্ছেটা কী?

করোনায় সৃষ্ট মনোজগতের বিচ্ছিন্নতা

কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য

ছবি

মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি

আগামীতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি বেঁচে থাকবে?

ছবি

উড়বে ঘুড়ি, পুড়বে আতশবাজি

স্বজন হত্যার বিচারের অপেক্ষায় এক মানুষ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

এমএ কবীর

শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের মাফুসি কারাগারেই বন্দি আছেন তিন হাজার বাংলাদেশি। বিভিন্ন অপরাধে তারা গ্রেপ্তার হয়ে ভোগ করছেন সাজা। আনুমানিক হিসাবে বিশ্বের ৪২ দেশে কমপক্ষে ২০ হাজার বাংলাদেশি বন্দি আছেন। এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ সরকারের পরিসংখ্যানে শুধু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়াদের তথ্যই আছে। প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা বা যাদের কাছে ডকুমেন্টস নেই তাদের সংখ্যা সেভাবে উঠে আসে না। এর মধ্যেই প্রতিদিন প্রচলিত ও অপ্রচলিত পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। ভাগ্য বদলের আশায় তারা বৈধ পথের পাশাপাশি যাচ্ছেন অবৈধ পথেও। অনেকেই গিয়ে আটক হচ্ছেন সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। আবার অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষে অবস্থান করে অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন।

কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে থাকাদের মধ্যে রয়েছেন অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থানকারী ছাড়াও চুরি, মাদক পাচারসহ রোমহর্ষক খুনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতরাও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীদের নিয়ে গবেষণা করা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যানের তথ্যানুসারে, বিশ্বের ৪২টি দেশে কমপক্ষে ১০ হাজার বাংলাদেশি বন্দি হয়ে আছেন। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনও হচ্ছে।

নাম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়ার মাধ্যমে ২৩ দেশে বন্দি থাকা বাংলাদেশিদের ধাপে ধাপে আইনি সেবা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে বাকি দেশগুলোতে থাকা আটকদের বিষয়ে কোন পক্ষ থেকেই তেমন কোন উদ্যোগ নেই।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্যানুসারে শুধু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কারাগারেই আছে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি। অন্যদিকে, দুর্গম পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে বন্দি হওয়া অনেকের তথ্যই পাওয়া যায় না। সেখানকার অনেক দেশেই নিয়মতান্ত্রিক কারাগারের কাঠামোই নেই। সেখানে হয়তো কোন ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয় গ্রেপ্তার হওয়া ভাগ্যান্বেষীদের।

পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও দূতাবাসগুলোর তালিকা অনুসারে, বাংলাদেশিরা বন্দি আছেন মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, লেবানন, জাপান, মালদ্বীপ, ওমান, মিসর, ইরান, বুলগেরিয়া, চীন, ফ্রান্স, তুরস্ক, আজারবাইজান, কোরিয়া, ব্রুনাই, জাপান, জিম্বাবুয়ে, তাঞ্জানিয়া, আলজেরিয়া, জর্ডান, মরিশাস, বাহরাইন, সাইপ্রাস, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া, কম্বোডিয়া, বেলজিয়াম, জর্জিয়া, সুইডেন, সার্বিয়া, নেপাল, পোল্যান্ড, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। এর মধ্যে আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান, মিসর, কাতার, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে খুন ধর্ষণের মতো অপরাধে ইতোমধ্যেই মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়ে কার্যকরের অপেক্ষায় আছেন ৩৪ জন। মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হওয়ার মতো অপরাধে বিচার চলছে ১৪৮ জনের।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি কর্মরত। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস। প্রবাসীদের সবাই যে বৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে সেসব দেশে গেছেন তা বলার কোন অবকাশ নেই। এদের অনেকে অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে যে বিড়ম্বনায় পড়েছেন তা কল্পনা করাও কঠিন। বিশেষ করে সমুদ্রপথে ইউরোপ যেতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যা খুব একটা কম নয়। বিদেশে তাদের আটক করে মুক্তিপণ আদায়ও ঘটেছে অসংখ্য।

সিলেটের হবিগঞ্জের ভারত সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারীদের বাড়ির সামনে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এমন একটা সাইনবোর্ডের ছবি দিয়েছে ডেইলি স্টার, যাতে লেখা, ‘মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি’। চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে জারি বিজিবির কার্যক্রম ও এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার প্রয়াস খুবই ভালো। আইন প্রয়োগের সঙ্গে মানুষকে শোধরানোর কাজটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু মুশকিল হলো, আইনের কাজ আইনকে ‘বাইপাস’ করে করতে যাওয়া। ধর্ম বলে যার পাপ শাস্তি তারই। আইনও তাই বলে, বাবার পাপের শাস্তির ছেলে পাবে না, ছেলের পাপের শাস্তি বাবা। এই যে মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি বলে যেসব বাড়িকে চিহ্নিত করা হলো, সেসব বাড়িতে কি মাদক ব্যবসায়ী একাই বাস করেন? না সেখানে তাদের শিশু সন্তান, স্ত্রী বা বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন? যদি থাকেন তবে তাদের অসম্মান করার অধিকার কে কাকে দিল? কোন আইনে দেয়া হলো।

বাবাকে বাগে আনতে ছেলেকে খুন। ভাইকে বাগে আনতে বোনকে লাঞ্ছিত করা। মেয়েকে ভোগ করতে বাপকে হেনস্তা। কাগজে চোখ বুলালেই কদিন পরপর চোখে পড়ে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর। ছেলেকে হত্যা করে বাপের আত্মহত্যা। মেয়েকে মেরে মার গলায় দড়ি। দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর মরদেহ পাওয়া গেছে ছাত্রী নিবাসে। এর আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রের ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায়। একজন তরুণ মা-বাবাকে চিরকুট লিখলেন, ‘আমি ব্যর্থ, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো’। কতটা হতাশ হলে একজন তরুণ-যুবা এমনটা চিরকুটে লিখে নিজেকে ‘কুইট’ করতে পারে।

বাকস্বাধীনতা বা মুক্ত মত প্রকাশের বিষয়টি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ। একদলের মতে, ‘বাক স্বাধীনতা মানেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়,’ আরেক দল মনে করেন, ‘বাক স্বাধীনতা মানে দেশের অস্তিত্বে আঘাত নয়,’। আসল কথা হচ্ছে, সংখ্যাগুরু মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী নিজের মতের বিরুদ্ধে কোন কথা যেমন শুনতে চায় না, তেমনি অন্যের মতকে আক্রমণ করার জন্য বাক স্বাধীনতার আশ্রয়ও চায়।

মানুষ যেটা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই দেখতে চাওয়ার প্রবণতা থেকে ফেক নিউজ বা ভুল তথ্যকে বিশ্বাস করে। এমনকি মিথ্যা জেনেও। এই বিশ্বাসটা যে আনমনে চলে আসে তা নয়, বরং ‘বিশ্বাস করে’ বলেই সে বিশ্বাস করে। যার কারণে ফ্রয়েড আনকনসাস শব্দটিকে অনেক আগেই অস্বীকার করেছেন।

পৃথিবীর সৃষ্টি আর আকারের সঠিক ধারণা ছিল মানব ইতিহাসে এক বড় ধাক্কা। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ দশকেই ঈজিয়ান অঞ্চলের জ্যোতির্বিদ অ্যারিস্টারকাস সূর্যকে বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু বলে গণ্য করেন। সে সময় গ্রিক দার্শনিক টলেমি বা তার অনুসারীরা এ মতবাদ গ্রহণ করেননি। কারণ এটি ছিল তাদের জন্য ভিন্নমত। ফলে এ মতবাদের বিরোধিতা করেছেন জোরালোভাবে। তারা বলতেন, বিশ্বের সব বস্তু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান। পরবর্তীতে টলেমিকে অনুসরণ করেছেন প্লেটো এবং এরিস্টটল। তারাও অ্যারিস্টারকাসের এই মতকে বন্দি করে রাখেন এবং প্রচলিতধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মত দেন যে, ‘পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র।’ এরপর আর কেউ সাহস করেনি এই মতবাদকে ভাঙার। কারণ তৎকালীন গ্রিস, তথা পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতো তাদের এই দার্শনিককূলের মতামতের ওপর। কেটে যায় দুই হাজার বছর। এরপর যখন ১৫ শতকে কোপার্নিকাস এসে সুসঙ্গতভাবে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণরত গ্রহসমূহের ধারণা নিয়ে ভাবেন। তিনি সাহস পাচ্ছিলেন না প্রচলিত বিশ্বাসকে ভাঙতে। কারণ তার ওই মত অনেকের ধর্মীয় অনুভূতিতে যেমন আঘাত হানতে পারে, তেমনি সৃষ্টির ধারণাকেও বদলে দিতে পারে। তার এই মতবাদ লিপিবদ্ধ হওয়ার পরেও দীর্ঘ একযুগের বেশি সময় অপ্রকাশিত রাখতে হয়। কোপার্নিকাস তার নতুন মতবাদের বিষয়বস্তু নিয়ে একটি পা-ুলিপি প্রস্তুত করেন। ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে সেটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি তার বন্ধুদের মাঝে প্রচার করেন। এরপর ২২ বছর পর মতবাদটি প্রকাশের অনুমতি পান তিনি। তার ছাত্র রেটিকাসের প্রচেষ্টায় এই মতকে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। পা-ুলিপিটি মুদ্রণের জন্য জার্মানির নুরেমবার্গে নিয়ে যান রেটিকাস। কিন্তু সেখানে মার্টিন লুথার, ফিলিপ মেলান্সথন ও অন্য সংস্কারকদের বাধার কারণে আর প্রকাশ করা যায়নি। রেটিকাস নুরেমবার্গ থেকে লাইপজিগে চলে যান এবং প্রকাশনার দায়িত্ব দেন আন্দ্রিয়াস ও সিয়ান্ডারের হাতে। মতবাদটি প্রকাশের আগেই সমালোচনার ভয় পাচ্ছিলেন সিয়ান্ডার, কোপার্নিকাসের সঙ্গে তারও জীবন হারানোর ভয়ে। তাই গ্রন্থের সঙ্গে একটা মুখবন্ধজুড়ে দিয়ে তিনি লেখেন, ‘এ বইয়ের বিষয়বস্তু পুরোপুরি সত্য নয়। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।’ এই কথাটি বলে তিনি নিজেকে নিরাপদ রাখলেন এবং বইটি থেকে অ্যারিস্টার্কাসের নাম মুছে ফেলেন। যিনি প্রথম বলেছিলেন, ‘সূর্য স্থির পৃথিবী গতিশীল।’ শুধু মত প্রকাশ করতে না পারার কারণে পৃথিবী, তথা সৃষ্টির ধারণা থেকে দুই হাজার বছর পিছিয়ে গিয়েছিল বিশ^। দুই হাজার বছর কেন লাগলো সেই সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে? কারণ ক্ষমতাশালীরা এবং মতের সংখ্যাগুরুরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে সেখানে ভিন্নমত কোন স্থানই পায়নি।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

back to top