alt

উপ-সম্পাদকীয়

প্রস্তাবিত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন

জেরিন জান্নাত ঈশিতা

: শনিবার, ১৪ মে ২০২২

ভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা পৃথিবীর সবচাইতে আদিম সম্পর্ক। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভূমির সঙ্গে মানুষের এ সম্পর্কের এইরূপও বদলে গিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রকম সমস্যা। আবার বের হয়েছে সেসব সমস্যার সমাধানও। কিন্তু সমস্যা যেভাবে তৈরি হয় প্রতিনিয়ত, সেভাবে তার সমাধানটা আসে না। এ কারণে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও অপরাধ আমাদের সমাজে সবসময়ই একটা বড়ো এবং প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে দেওয়ানি আইন থাকলেও পৃথকভাবে কোন ফৌজদারি আইন এতদিন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে নতুন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশের সরকার, যেখানে জমিজমা, ফ্ল্যাট ইত্যাদি সংক্রান্ত ২৪ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করে তার জন্য নানা মেয়াদের শাস্তির বিধান থাকছে। এসব অপরাধে শাস্তি ও জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনে। এখন পর্যন্ত এসব অপরাধের অনেকগুলো দেওয়ানি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেগুলোর বিচার হতেও অনেক দিন সময় লাগে। কিন্তু নতুন আইনটি পাশ হলে এগুলো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে শনাক্ত করে দ্রুতবিচার করা যাবে।

‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২১’ শীর্ষক এ আইনের খসড়ায় অন্যের জমির মালিক হতে জাল দলিল তৈরির পাশাপাশি মালিকানার চেয়ে অতিরিক্ত জমির দলিল করা, অতিরিক্ত জমি লিখে নেওয়া, আগে বিক্রি বা হস্তান্তরের পরও গোপনে বিক্রি করা, বায়না করা জমি পুনরায় বিক্রি করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া কিংবা ভুল বুঝিয়ে দানপত্র তৈরির মতো অপরাধগুলো হচ্ছে বলে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়াসহ-উত্তরাধিকারীকে ঠকিয়ে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি নিজের নামে দলিল করে নেওয়ার মতো অপরাধের কথাও ওই খসড়ায় তুলে ধরা হয়েছে।

১৯ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে প্রস্তাবিত আইনটির প্রাথমিক খসড়া (বিল) সবার মতামতের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ আল নাহিয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, মতামত নেয়ার পর খসড়া বিলটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। সেখানে অনুমোদন মিললে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এই আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে গত ২০ জানুয়ারি ডিসি সম্মেলনে বাংলাদেশের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, ‘অবৈধ ভূমি দখলকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় এনে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২১’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। ভূমি দস্যুতা রোধেও এ আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ভূমিলোভী কোনো ব্যক্তির জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে এবং অন্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে দলিল করে বা কোন দলিল ছাড়াই অবৈধভাবে ভূমির দখল গ্রহণ বা দখল গ্রহণের চেষ্টা বা এর ক্ষতি রোধে ভূমিকা রাখবে এ আইন। তিনি আরও জানান, এই আইন কার্যকর হলে ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ কমে যাবে। ফলে জমিজমা-সংক্রান্ত মামলাও অনেক কমে যাবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের মতো, আর এসব মামলার বড়ো অংশটি অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ মামলা জমিজমা সংক্রান্ত নানা ধরনের বিরোধের সূত্রে দায়ের করা।

কী আছে খসড়া আইনটিতে

নতুন আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে- ভূমির জবর দখল, ক্ষতি, জাল কাগজপত্র তৈরি করে জালিয়াতি বা প্রতারণা বন্ধ করাই এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করে জনগণের ভোগান্তি দূর করা এবং ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধ ও দ্রুত প্রতিকার দেওয়ার জন্য আইনটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্য আইনে যা কিছু বলা হোক না কেন, এই আইনটি সেখানে প্রাধান্য পাবে। এসব অপরাধ ফৌজদারি কার্যবিধির মতো সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে। প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা মোবাইল কোর্ট আইনের মাধ্যমে এই আইনের প্রয়োগ করা যাবে।

প্রস্তাবিত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২১ আইনে যেসব অপরাধ চিহ্নিত করে সেগুলোর জন্য যে সাজা প্রস্তাব করা হয়েছে-

জাল দলিল তৈরি : কোন ব্যক্তি যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন বা সরকারি খাসভূমি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের জমির দলিল জাল করেন, তাহলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

মালিকানার অতিরিক্ত জমির দলিল সম্পাদন : কোনো ব্যক্তি যদি যতটুকু জমির মালিকানা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি জমির দলিল করেন, তাহলে তার দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

একই জমি একাধিকবার বিক্রয় : কোন ব্যক্তি যদি তার বিক্রীত জমি পুনরায় বিক্রি করার উদ্দেশ্যে দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করেন, তাহলে তার দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বায়নাকৃত জমির পুনরায় চুক্তি করা : কোনো ব্যক্তি বিক্রয় চুক্তি বা বায়না চুক্তি করার পর অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আবার চুক্তি করলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

ভুল বুঝিয়ে দানপত্র : যদি কোন ব্যক্তি ভুল বুঝিয়ে বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অথবা প্রতারণা করে অন্য আরেক জনের কাছ থেকে জমির দানদলিল করেন, তাহলে সেটা একটা অপরাধ হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সহ-উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করে নিজের নামে দলিল : উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, অন্যকে বঞ্চিত করে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমির দলিল করা হলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সহ-উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করে নিজের প্রাপ্যতার চেয়ে অধিক জমি বিক্রি : উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, অন্যকে বঞ্চিত করে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি বিক্রির জন্য দলিল সম্পাদন করলে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অবৈধ দখল : বৈধ কাগজপত্র না থাকার পরেও কেউ যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন, সরকারি খাসভূমি বা কোন সংস্থার জমি জোর করে দখল করে রাখেন, সেজন্য এক বছর থেকে তিন বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সহ-উত্তরাধিকারীর জমি দখল করে রাখা : কোনো ব্যক্তি যদি তার শরিক বা সহ-উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য জমি জোর করে দখল করে রাখেন, সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অবৈধভাবে মাটিকাটা, বালি উত্তোলন : বেআইনিভাবে সরকারি বা বেসরকারি ভূমি, নদীর পাড়, তলদেশ ইত্যাদি থেকে মাটি বা বালু উত্তোলন করলে (কোনো ক্ষতি হোক বা না হোক) অপরাধ হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করার শাস্তি : যদি কোন ব্যক্তি বেআইনিভাবে মাটি ভরাট করে বা অন্য কোনভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি করে, সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

বিনা অনুমতিতে জমির ওপরের স্তর কেটে নেয়া : জমির মালিকের অনুমতি ছাড়া ওপরের স্তর থেকে মাটি উত্তোলন করা বা করানো হলে সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অধিগ্রহণের পূর্বে অতিরিক্ত মূল্যে জমির দলিল : কোন এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে, এমন খবর জানতে পেরে কেউ যদি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত মূল্যে ভূমি নিবন্ধন করেন, তাহলে সেটি একটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

জনসাধারণের ব্যবহার্য বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জমি দখল : খেলার মাঠ, জলাশয়, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, দরগা, শিক্ষা বা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি দাতব্য বা জন প্রতিষ্ঠানের জমি দখল, সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করা বা করতে সহায়তা করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

বিনা অনুমতিতে পাহাড় বা টিলার পাদদেশে বসতি : যদি কোনো ব্যক্তি মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও পাহাড় বা টিলার পাদদেশে বা পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে, তাহলে তাকে যে কোনো সময় উচ্ছেদ করা যাবে এবং অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের জন্য তিন মাসের কারাদন্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড দেয়া যাবে।

রিয়েল এস্টেট কর্তৃক জমি বা ফ্ল্যাট হস্তান্তর সংক্রান্ত অপরাধ : একই জমি একাধিক ব্যক্তির বরাবর দলিল করে দেয়া, চুক্তি মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ে জমির দখল দিতে না পারা, ফ্ল্যাট বিক্রয়ের পর ঘোষিত সময়ের মধ্যে হস্তান্তর করতে না পারা, ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হলেও দলিল দিতে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি কর্মকান্ড অপরাধ বলে গণ্য হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

চুক্তির পর ভূমি মালিককে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেয়া : ভূমির মালিকের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি চুক্তি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমির মালিকের অংশ তাকে বুঝিয়ে না দিলে বা দখল না দিলে দুই বছরের কারাদন্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি বা সংস্থার জমির বেআইনি দখল : সরকারি খাসজমি বা অন্য কোন সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমি বেআইনিভাবে দখল করা হলে বা ওই ভূমিতে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে সেটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হতে পারে।

নদী, হাওর, বিল বা জলাভূমির ক্ষতি : মাটি, বালি বা আবর্জনা দ্বারা, অন্য কোনো পদার্থ বা উপায়ে বা অবকাঠামো নির্মাণ করে নদী, হাওর, বিল বা জলাভূমির আংশিক ক্ষতি করা হলে এক বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে। আর সম্পূর্ণ ক্ষতি করা হলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অবৈধ দখল গ্রহণ ও দখল বজায় রাখতে পেশিশক্তি প্রদর্শন : অবৈধভাবে ভূমির দখল করা হলে এবং উক্ত বেআইনি দখল বজায় রাখার জন্য অস্ত্র প্রদর্শন, প্রাণনাশের হুমকি ইত্যাদি দেওয়া হলে সেটি জামিন অযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে তিন বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হতে পারে।

পুনরায় অপরাধ করা : এ আইনের অধীন কোন অপরাধে একবার সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর পুনরায় সেই অপরাধ করলে আগে যে ধারায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, তার দ্বিগুণ শাস্তি হবে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বেশি জমি লিখিয়ে নেয়া : এক্ষেত্রে যদি জমির পরিমাণ এক একরের বেশি হয় এবং ল্যান্ড ডেভেলপার বা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার জড়িত থাকে, তাহলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রতিবেশী ভূমি মালিকের ক্ষতিসাধন : কেউ যদি সহ-মালিক বা পাশাপাশি থাকা জমির ক্ষতি করেন, বা কোনো পরিবর্তন আনেন, তাহলে এক বছর থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হতে পারে।

অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা : এই আইনের বর্ণনা করা যে কোন অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করলে সেই ব্যক্তিরও অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তির মতো শাস্তি হবে।

প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি নিয়ে জনসাধারণের মতামত

সাতকাহন বাই আজিম এবং ল অ্যান্ড লাইফ টিভির দুজন ইউটিউবারের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, সাতকাহন বাই আজিম আইনটির প্রস্তাবিত বিষয় সম্পর্কে সন্তুষ্ট হলেও আইনটির বাস্তবায়নে ক্ষমতাপ্রাপ্তদের নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তার মতে, খসড়া আইনটিতে যে কর্তৃপক্ষকে আইন বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা একটি কার্যনির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতা, যার কারণে ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ ক্ষমতাসীন লোকের জমি দখল আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ল অ্যান্ড লাইফ টিভির মতে, আইনটি যদি প্রণয়ন করা হয় এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে জমিসংক্রান্ত অনেক সমস্যা একেবারে নির্মূল না হলেও অনেকটা সমাধান হয়ে যাবে, অনেক মামলা-মোকাদ্দমা কমে আসবে এবং ভুক্তভোগী মানুষের জন্য আইনটি মাসিহা এবং মাইলফলক হিসেবে আসবে বলে মনে করছেন তিনি।

[লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ]

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

প্রসঙ্গ : উন্নয়ন

শিক্ষা খাত ও বাজেট

ছবি

বহুমাত্রিক কলমযোদ্ধা

পশ্চিমবঙ্গের দলবদলের রাজনীতি প্রসঙ্গে

ছবি

শিরিন : নিপীড়িত ফিলিস্তিনের স্বর

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যর্থ বিশ্ব

সয়াবিন তেলের ইতিবৃত্ত

শ্রীলঙ্কার মতোই কি পরিণতি হতে চলেছে বাংলাদেশের

সুশীল সমাজের বিকাশ কেন জরুরি

নতুন ভাইরাস মাঙ্কিপক্স

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে কীভাবে

ছবি

বন্যায় হাওরের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে করণীয়

সমাজের নির্লিপ্ততা এবং ন্যায়ের দাবি

পদ্মা সেতুর টোল

আলু উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহার

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল : ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম

সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় বিবেচ্য বিষয়

ই-কমার্সের জবাবদিহিতা

ইভিএমে আস্থার সংকট

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : কাড়ছে প্রাণ, বাড়ছে পঙ্গুত্ব

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে বিতর্ক

ছবি

পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেন নেই?

দুর্নীতি ও দোষারোপের রাজনীতি

মমতা এবং আরএসএসের সম্পর্ক প্রসঙ্গে

ভূমি অপরাধ আইন এবং আদিবাসী

ঝুঁকিতে অর্থনীতি : করণীয় কী

চুকনগর : বিশ্বের স্বাধীনতা ইতিহাসে অন্যতম গণহত্যা

পিকের মেধা-প্রতিভা

পেশার অর্জন

প্রসঙ্গ : ধর্মীয় অনুভূতি

নির্বাচনই কি একমাত্র লক্ষ্য?

ছবি

হরপ্রাসাদের ‘তৈল’ এবং উন্নয়নের পথরেখা

নদী রক্ষায় চাই কার্যকর ব্যবস্থা

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশমাধ্যম

সংবাদ ও বাংলাদেশ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

প্রস্তাবিত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন

জেরিন জান্নাত ঈশিতা

শনিবার, ১৪ মে ২০২২

ভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা পৃথিবীর সবচাইতে আদিম সম্পর্ক। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভূমির সঙ্গে মানুষের এ সম্পর্কের এইরূপও বদলে গিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রকম সমস্যা। আবার বের হয়েছে সেসব সমস্যার সমাধানও। কিন্তু সমস্যা যেভাবে তৈরি হয় প্রতিনিয়ত, সেভাবে তার সমাধানটা আসে না। এ কারণে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও অপরাধ আমাদের সমাজে সবসময়ই একটা বড়ো এবং প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে দেওয়ানি আইন থাকলেও পৃথকভাবে কোন ফৌজদারি আইন এতদিন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে নতুন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশের সরকার, যেখানে জমিজমা, ফ্ল্যাট ইত্যাদি সংক্রান্ত ২৪ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করে তার জন্য নানা মেয়াদের শাস্তির বিধান থাকছে। এসব অপরাধে শাস্তি ও জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনে। এখন পর্যন্ত এসব অপরাধের অনেকগুলো দেওয়ানি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেগুলোর বিচার হতেও অনেক দিন সময় লাগে। কিন্তু নতুন আইনটি পাশ হলে এগুলো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে শনাক্ত করে দ্রুতবিচার করা যাবে।

‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২১’ শীর্ষক এ আইনের খসড়ায় অন্যের জমির মালিক হতে জাল দলিল তৈরির পাশাপাশি মালিকানার চেয়ে অতিরিক্ত জমির দলিল করা, অতিরিক্ত জমি লিখে নেওয়া, আগে বিক্রি বা হস্তান্তরের পরও গোপনে বিক্রি করা, বায়না করা জমি পুনরায় বিক্রি করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া কিংবা ভুল বুঝিয়ে দানপত্র তৈরির মতো অপরাধগুলো হচ্ছে বলে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়াসহ-উত্তরাধিকারীকে ঠকিয়ে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি নিজের নামে দলিল করে নেওয়ার মতো অপরাধের কথাও ওই খসড়ায় তুলে ধরা হয়েছে।

১৯ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে প্রস্তাবিত আইনটির প্রাথমিক খসড়া (বিল) সবার মতামতের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ আল নাহিয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, মতামত নেয়ার পর খসড়া বিলটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। সেখানে অনুমোদন মিললে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এই আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে গত ২০ জানুয়ারি ডিসি সম্মেলনে বাংলাদেশের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, ‘অবৈধ ভূমি দখলকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় এনে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২১’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। ভূমি দস্যুতা রোধেও এ আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ভূমিলোভী কোনো ব্যক্তির জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে এবং অন্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে দলিল করে বা কোন দলিল ছাড়াই অবৈধভাবে ভূমির দখল গ্রহণ বা দখল গ্রহণের চেষ্টা বা এর ক্ষতি রোধে ভূমিকা রাখবে এ আইন। তিনি আরও জানান, এই আইন কার্যকর হলে ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ কমে যাবে। ফলে জমিজমা-সংক্রান্ত মামলাও অনেক কমে যাবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের মতো, আর এসব মামলার বড়ো অংশটি অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ মামলা জমিজমা সংক্রান্ত নানা ধরনের বিরোধের সূত্রে দায়ের করা।

কী আছে খসড়া আইনটিতে

নতুন আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে- ভূমির জবর দখল, ক্ষতি, জাল কাগজপত্র তৈরি করে জালিয়াতি বা প্রতারণা বন্ধ করাই এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করে জনগণের ভোগান্তি দূর করা এবং ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধ ও দ্রুত প্রতিকার দেওয়ার জন্য আইনটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্য আইনে যা কিছু বলা হোক না কেন, এই আইনটি সেখানে প্রাধান্য পাবে। এসব অপরাধ ফৌজদারি কার্যবিধির মতো সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে। প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা মোবাইল কোর্ট আইনের মাধ্যমে এই আইনের প্রয়োগ করা যাবে।

প্রস্তাবিত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২১ আইনে যেসব অপরাধ চিহ্নিত করে সেগুলোর জন্য যে সাজা প্রস্তাব করা হয়েছে-

জাল দলিল তৈরি : কোন ব্যক্তি যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন বা সরকারি খাসভূমি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের জমির দলিল জাল করেন, তাহলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

মালিকানার অতিরিক্ত জমির দলিল সম্পাদন : কোনো ব্যক্তি যদি যতটুকু জমির মালিকানা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি জমির দলিল করেন, তাহলে তার দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

একই জমি একাধিকবার বিক্রয় : কোন ব্যক্তি যদি তার বিক্রীত জমি পুনরায় বিক্রি করার উদ্দেশ্যে দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করেন, তাহলে তার দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বায়নাকৃত জমির পুনরায় চুক্তি করা : কোনো ব্যক্তি বিক্রয় চুক্তি বা বায়না চুক্তি করার পর অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আবার চুক্তি করলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

ভুল বুঝিয়ে দানপত্র : যদি কোন ব্যক্তি ভুল বুঝিয়ে বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অথবা প্রতারণা করে অন্য আরেক জনের কাছ থেকে জমির দানদলিল করেন, তাহলে সেটা একটা অপরাধ হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সহ-উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করে নিজের নামে দলিল : উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, অন্যকে বঞ্চিত করে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমির দলিল করা হলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সহ-উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করে নিজের প্রাপ্যতার চেয়ে অধিক জমি বিক্রি : উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, অন্যকে বঞ্চিত করে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি বিক্রির জন্য দলিল সম্পাদন করলে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অবৈধ দখল : বৈধ কাগজপত্র না থাকার পরেও কেউ যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন, সরকারি খাসভূমি বা কোন সংস্থার জমি জোর করে দখল করে রাখেন, সেজন্য এক বছর থেকে তিন বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সহ-উত্তরাধিকারীর জমি দখল করে রাখা : কোনো ব্যক্তি যদি তার শরিক বা সহ-উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য জমি জোর করে দখল করে রাখেন, সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অবৈধভাবে মাটিকাটা, বালি উত্তোলন : বেআইনিভাবে সরকারি বা বেসরকারি ভূমি, নদীর পাড়, তলদেশ ইত্যাদি থেকে মাটি বা বালু উত্তোলন করলে (কোনো ক্ষতি হোক বা না হোক) অপরাধ হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করার শাস্তি : যদি কোন ব্যক্তি বেআইনিভাবে মাটি ভরাট করে বা অন্য কোনভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি করে, সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

বিনা অনুমতিতে জমির ওপরের স্তর কেটে নেয়া : জমির মালিকের অনুমতি ছাড়া ওপরের স্তর থেকে মাটি উত্তোলন করা বা করানো হলে সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অধিগ্রহণের পূর্বে অতিরিক্ত মূল্যে জমির দলিল : কোন এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে, এমন খবর জানতে পেরে কেউ যদি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত মূল্যে ভূমি নিবন্ধন করেন, তাহলে সেটি একটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

জনসাধারণের ব্যবহার্য বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জমি দখল : খেলার মাঠ, জলাশয়, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, দরগা, শিক্ষা বা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি দাতব্য বা জন প্রতিষ্ঠানের জমি দখল, সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করা বা করতে সহায়তা করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

বিনা অনুমতিতে পাহাড় বা টিলার পাদদেশে বসতি : যদি কোনো ব্যক্তি মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও পাহাড় বা টিলার পাদদেশে বা পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে, তাহলে তাকে যে কোনো সময় উচ্ছেদ করা যাবে এবং অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের জন্য তিন মাসের কারাদন্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড দেয়া যাবে।

রিয়েল এস্টেট কর্তৃক জমি বা ফ্ল্যাট হস্তান্তর সংক্রান্ত অপরাধ : একই জমি একাধিক ব্যক্তির বরাবর দলিল করে দেয়া, চুক্তি মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ে জমির দখল দিতে না পারা, ফ্ল্যাট বিক্রয়ের পর ঘোষিত সময়ের মধ্যে হস্তান্তর করতে না পারা, ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হলেও দলিল দিতে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি কর্মকান্ড অপরাধ বলে গণ্য হবে। সে জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

চুক্তির পর ভূমি মালিককে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেয়া : ভূমির মালিকের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি চুক্তি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমির মালিকের অংশ তাকে বুঝিয়ে না দিলে বা দখল না দিলে দুই বছরের কারাদন্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি বা সংস্থার জমির বেআইনি দখল : সরকারি খাসজমি বা অন্য কোন সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমি বেআইনিভাবে দখল করা হলে বা ওই ভূমিতে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে সেটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হতে পারে।

নদী, হাওর, বিল বা জলাভূমির ক্ষতি : মাটি, বালি বা আবর্জনা দ্বারা, অন্য কোনো পদার্থ বা উপায়ে বা অবকাঠামো নির্মাণ করে নদী, হাওর, বিল বা জলাভূমির আংশিক ক্ষতি করা হলে এক বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে। আর সম্পূর্ণ ক্ষতি করা হলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

অবৈধ দখল গ্রহণ ও দখল বজায় রাখতে পেশিশক্তি প্রদর্শন : অবৈধভাবে ভূমির দখল করা হলে এবং উক্ত বেআইনি দখল বজায় রাখার জন্য অস্ত্র প্রদর্শন, প্রাণনাশের হুমকি ইত্যাদি দেওয়া হলে সেটি জামিন অযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেজন্য ছয় মাস থেকে তিন বছরের কারাদন্ড, বা ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হতে পারে।

পুনরায় অপরাধ করা : এ আইনের অধীন কোন অপরাধে একবার সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর পুনরায় সেই অপরাধ করলে আগে যে ধারায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, তার দ্বিগুণ শাস্তি হবে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বেশি জমি লিখিয়ে নেয়া : এক্ষেত্রে যদি জমির পরিমাণ এক একরের বেশি হয় এবং ল্যান্ড ডেভেলপার বা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার জড়িত থাকে, তাহলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড, বা ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে এবং এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রতিবেশী ভূমি মালিকের ক্ষতিসাধন : কেউ যদি সহ-মালিক বা পাশাপাশি থাকা জমির ক্ষতি করেন, বা কোনো পরিবর্তন আনেন, তাহলে এক বছর থেকে দুই বছরের কারাদন্ড, বা ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হতে পারে।

অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা : এই আইনের বর্ণনা করা যে কোন অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করলে সেই ব্যক্তিরও অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তির মতো শাস্তি হবে।

প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি নিয়ে জনসাধারণের মতামত

সাতকাহন বাই আজিম এবং ল অ্যান্ড লাইফ টিভির দুজন ইউটিউবারের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, সাতকাহন বাই আজিম আইনটির প্রস্তাবিত বিষয় সম্পর্কে সন্তুষ্ট হলেও আইনটির বাস্তবায়নে ক্ষমতাপ্রাপ্তদের নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তার মতে, খসড়া আইনটিতে যে কর্তৃপক্ষকে আইন বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা একটি কার্যনির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতা, যার কারণে ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ ক্ষমতাসীন লোকের জমি দখল আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ল অ্যান্ড লাইফ টিভির মতে, আইনটি যদি প্রণয়ন করা হয় এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে জমিসংক্রান্ত অনেক সমস্যা একেবারে নির্মূল না হলেও অনেকটা সমাধান হয়ে যাবে, অনেক মামলা-মোকাদ্দমা কমে আসবে এবং ভুক্তভোগী মানুষের জন্য আইনটি মাসিহা এবং মাইলফলক হিসেবে আসবে বলে মনে করছেন তিনি।

[লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ]

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

back to top