alt

উপ-সম্পাদকীয়

পেশার অর্জন

এম এ কবীর

: বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২

গ্লোবাল মিডিয়া ওয়াচডগ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) এবার ভারতীয় মিডিয়ার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। তেমনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) উন্মোচন করে দিয়েছে ভারত কিভাবে সত্য আড়াল করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারীতে মৃত্যুর যে অফিসিয়াল সংখ্যা বের হয়েছে তার চেয়ে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা ২.৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু ভারতে যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি মারা গেছে মহামারীতে। সেই হিসাবে করোনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ভারতে। বিশ্বব্যাপী করোনায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা দেড় কোটি (১.৫ মিলিয়ন) আর সরকারি রেকর্ডে দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬২ লাখ। ভারতে সরকারি হিসাবে মৃত্যু পাঁচ লাখ দেখানো হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এ মৃত্যু সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার যে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে তাতে ভারতের অবস্থান গত বছরের (২০২১ সাল) চেয়ে আট ধাপ নেমে গেছে বলে উল্লেখ করেছে।

‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে’ বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এখন ১৫০ নম্বরে। গত বছর তা ছিল ১৪২তম। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স আরো বলেছে, মিডিয়ার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের রেকর্ড কখনোই খুব আহামরি ছিল না। কিন্তু ইদানীং পরিস্থিতির অবনতি এতটাই ঘটেছে যে, ভারতের মূলধারার মিডিয়াগুলো সরকারের বশংবদে পরিণত হচ্ছে। প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কোর ও প্রেস অ্যাসোসিয়েশন আরএসএফদের রিপোর্ট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিবিসিকে বলেছে, ভারতে একদিকে যেমন সাংবাদিকদের কাজের নিরাপত্তা কমছে, তেমনি মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠানগুলো একবাক্যে বলছে, তুচ্ছ ও ঘোলাটে কারণে বিভিন্ন ড্রাকোনিয়ান আইন প্রয়োগ করে সাংবাদিকদের শুধু ভয়ই দেখানো হচ্ছে না, তাদের জীবনও অনেক সময় হুমকির মুখে পড়ছে। গত এক বছরে সাংবাদিকদের এ ধরনের যে চরম হেনস্তার মধ্যে পড়তে হয়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে টাইম ম্যাগাজিন ও নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট রানা আইয়ুবের ওপর নির্যাতন ও হেনস্তা।

উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে এক মুসলিম বৃদ্ধের হেনস্তার ভাইরাল হওয়া ভিডিও টুইটারে শেয়ার করার অভিযোগে কলামিস্ট রানা আইয়ুবের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশ মামলা দিয়েছে। বিবিসিকে আইয়ুব বলেন, সরকারের সমালোচকদের ওপর নির্যাতন তো করা হচ্ছেই, আমার বেলায় যে দিন পুলিশ মামলা করে, ঠিক সে দিনই কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তত তিনটি এজেন্সি আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের সমন পাঠিয়ে জানতে চায় কে আমাদের টাকা-পয়সা দিচ্ছে, আমি কেন বিদেশি পত্রিকার জন্য লিখি, নরেন্দ্র মোদিকে কলঙ্কিত করার এজেন্ডায় আমি যুক্ত কিনা ইত্যাদি। গত এক বছরের মধ্যেই লখিমপুর খেরিতে সাংবাদিক রমন কাশ্যপকে নেতার গাড়ি পিষে দিয়েছে, বিহারে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ছোট শহরের এক সাংবাদিক অবিনাশ ঝাকে। তেমনি লিকার মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে প্রাণ হারিয়েছেন সুলভ শ্রীবাস্তব, খবর কভার করতে গিয়ে ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের পাতা মাইনে নিহত হয়েছে রোহিত বিসওয়ালা। ভারতশাসিত কাশ্মীরেও ২০১৮ সাল থেকে জেলে আছেন সাংবাদিক আসিফ সুলতান। উত্তর প্রদেশের হাতরাসে গণধর্ষণের ঘটনা কভার করতে গিয়ে ২০২০ সাল থেকে আটক আছেন কেরালার সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান।

ইউনেস্কো বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসের এবারের আলোচ্য বিষয় ঠিক করেছে ‘জার্নালিজম আন্ডার ডিজিটাল সিজ’ অর্থাৎ ‘ডিজিটাল অবরোধে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’। স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো মুক্ত সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল হিসেবে ডিজিটাল জগতকে ব্যবহার করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সাংবাদিক ও নাগরিক গোষ্ঠীর ওপর বেআইনি নজরদারি থেকে নিবৃত্ত থাকা।

সম্পাদক পরিষদ ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে দেয়া বিবৃতিতে এ বিষয়টিই উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে যেটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। গণমাধ্যমকর্মী আইন নামে আরেকটি কালো আইন করতে যাচ্ছে সরকার। সাংবাদিক সুরক্ষার নামে প্রস্তাবিত এ আইনটিতে সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ই মুছে ফেলা হয়েছে। নতুন এ আইনটি হলে বাংলাদেশ কার্যত একটি নজরদারিমূলক রাষ্ট্রেই পরিণত হবে। ভিন্নমত, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অবশেষটুকুও আর থাকবে না। ডিজিটাল নিবর্তন কোন পর্যায়ে গেছে তা কয়েক দিন আগে প্রকাশিত গভর্ন্যান্স স্টাডিজের গবেষণাতেই উঠে এসেছে। তারা গত অক্টোবর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৬৬৮টি মামলার সন্ধান পেয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি চারজনের একজন হলেন সাংবাদিক। গ্রেপ্তারকৃত ৪৯৯ জনের মধ্যে ৪২ জনই সাংবাদিক।

বাংলাদেশে এখন যে সাংবাদিকতা চলছে, তা নামেই সাংবাদিকতা। শুধু চাকরিটা করে যাওয়া ও মাস শেষে বেতন পাওয়া নিশ্চিত করা এতটুকুই। বেতনও ঠিকভাবে পাওয়া যায় না কর্তাব্যক্তিদের মর্জি অনুযায়ী কাজ করেও। জীবিকার জন্য ঝুঁকি নেয়ার বিষয়টি একেবারেই গৌণ। একজন সাংবাদিক চাইলেই তার ইচ্ছানুযায়ী কোনো রিপোর্ট করতে পারেন না। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা হলো- ‘তিনি বলেন, তিনি আরো বলেন’।

অর্থাৎ বক্তৃতাবাদীর মধ্যে তাদের সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ। বর্তমানটা আমাদের কাছে যতটা জ্বলজ্বলে, অতীতটা ততটাই ধূসর। সাংবাদিকের জীবন হাঁসের জীবন নয়। হাঁস কাদা-প্যাকের মধ্যে থেকেও গা-ঝাড়া দিয়ে সাফসুতরো হয়ে চলতে পারে। সাংবাদিকদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তারা মানুষ। অন্য সব পেশাজীবী মানুষের যেমন মানবিক ত্রুটি-দুর্বলতা আছে, কোনো কোনো সাংবাদিকেরও তেমন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সমাজের অন্য শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যেমন দুর্নীতি-অসততা আছে, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যেও আছে। তবে এর মধ্যে মাত্রাভেদ আছে। স্বল্প বেতন ও অনিয়মিত বেতনের কারণে সাংবাদিকদের কেউ কেউ ‘হাতপাতা’ স্বভাব রপ্ত করতে বাধ্য হন।

আমাদের দেশে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের একধরনের ‘ধান্দা’র জীবন বেছে নিতে বাধ্য করে। ঢাকার সাংবাদিকদের থেকে মফস্বলের সাংবাদিকদের জীবন আরও দুর্বিষহ। বেশির ভাগ মফস্বল সাংবাদিক একটি নিয়োগপত্র এবং পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছু পান না। কোনো কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল কিছু মাসোহারা দিলেও তা অতি সামান্য এবং অনিয়মিত। তাহলে মফস্বল সাংবাদিকের জীবন চলে কীভাবে? নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যায়, কিন্তু নিজের খাওয়াটা তো থাকতে হবে!

সাংবাদিকদের বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা নিশ্চিত না করে তাদের কাছে সৎ সাংবাদিকতা আশা করাও দুরাশা। কারণ এখন ‘সেই সত্য রচিবে যা তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’ গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতাও রাজনীতির ‘মন্দ’ হাওয়া থেকে মুক্ত নয়। মুক্ত থাকার বাস্তব কারণও নেই। বিরোধিতার চেয়ে প্রশংসা অনেক সময় বেশি ক্ষতির কারণ হয়। যে রাজা শুধু প্রশংসা শুনতে চায়, সে তো হীরক রাজা। হীরক রাজা প্রজাদের মগজ ধোলাই করে নিজেকে ‘ভগবান’ বানানোর চেষ্টা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘খান খান’ হয়ে যায়। ত্রুটিবিচ্যুতি ধরিয়ে দিলে তাকে শত্রু না ভেবে বন্ধু ভাবা উচিত। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো/ যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো/ সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে/ নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে।

সাংবাদিকতা পেশাটি অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে আলাদা। এর বিশেষত্বও অনেক। অন্য পেশায় কেবল ওই পেশাসম্পর্কিত জ্ঞানেই চলে। কিন্তু সাংবাদিকতায় জুতা সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা নিতে হয়। মর্যাদা দিতে গিয়ে কেউ কেউ সাংবাদিকদের বিচারক এবং ধর্মযাজকদের তুলনায় নিয়ে যেতে চান। কর্মবিচারে এ তুলনা যথার্থ নয়। বিচারককে অন্যের তদন্ত, অন্যের সাক্ষ্য ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে বিচারকাজ করতে হয়। তাতে অন্যদের কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি বিচারে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি থাকে। ধর্মযাজককে নির্ভর করতে হয় তার ধর্মবিশ্বাসের ওপর, যা তিনি নিজে প্রণয়ন করেননি। কিন্তু সাংবাদিককে নির্ভর করতে হয় নিজের উদঘাটিত তথ্য-প্রমাণাদি এবং নিজের ন্যায়-অন্যায়বোধের ওপর। অর্থাৎ বিবেকবান থাকার শক্তি, সুযোগ এবং সামর্থ্য সবচেয়ে বেশি থাকতে হয় সাংবাদিকদের। দায়ের সঙ্গে দায়িত্বও অনেক। সঙ্গে ভাবমর্যাদাও।

বছর কয়েক ধরে সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষিতদের অভিষেক ঘটছে। এটি সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক। উড়াধুড়া নয়, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন রয়েল সাবজেক্ট পড়ে আসা এই গণমাধ্যমকর্মীরা অনেকটা কাদামাটির মতো। সুন্দর, পেশাদার হাতে পড়লে তাদের দিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা আসতে পারে। আর বেহাতে পড়লে সামনে মুক্তগণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার মানমর্যাদার সূচক আরও তলানিতে যাওয়ার উপাদান তৈরি হবে। জাতির বিবেক, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ধরনের সম্বোধন অন্য কোনো পেশার ভাগ্যে জোটেনি। এটি এ পেশার অর্জন।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ছবি

‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক দূষণে আরএসএসের ভূমিকা

একতা, ন্যায় ও শক্তির প্রেরণা

ছবি

পদ্মা সেতু : স্বপ্ন এখন বাস্তব

পদ্মা সেতু : বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের প্রতীক

মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ছবি

রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার আকুতি

চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি

কুসিক নির্বাচনে ইসি কি পাস করেছে

বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

ছবি

জয় হোক মানবতার

বন্যা : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ভূমি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের এনজিও ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা কী

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম মোস্তাফা জব্বার

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

ছবি

শরণার্থীদের নিরাপত্তার অধিকার

পদ্মা সেতু : বিএনপির দায় ও সরকারের দায়িত্ব

প্রস্তাবিত বাজেট ব্যাংক খাতে কী প্রভাব রাখবে

ছবি

পদ্মা সেতু : দেশের ‘আইকনিক স্থাপনা’

ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার ও সম্ভাবনা

নবীকে নিয়ে বিজেপি নেতার কটূক্তি

অগ্নিকান্ডে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও করণীয়

ছিন্নমূল মানুষ ও বাংলার কথা

খুনিদের বাঁচাতে আইন হয় কিন্তু আইনজীবীদের সুরক্ষায় আইন নেই

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

দায়িত্ব থেকে সরে গেলেই সুশীল হয়ে যান

ছবি

চলমান পাঠদান পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কতটা সন্তুষ্ট

ছবি

ই-কমার্স খাত উপেক্ষিতই রয়ে গেল

শিক্ষকের সঙ্গে অভিভাবকও নতুন প্রক্রিয়ার অংশীদার

তোমার কথাই ঠিক

আদালত প্রাঙ্গণ টাউট-দালালমুক্ত হোক

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

কমন-সেন্সের বাইরে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

পেশার অর্জন

এম এ কবীর

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২

গ্লোবাল মিডিয়া ওয়াচডগ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) এবার ভারতীয় মিডিয়ার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। তেমনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) উন্মোচন করে দিয়েছে ভারত কিভাবে সত্য আড়াল করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারীতে মৃত্যুর যে অফিসিয়াল সংখ্যা বের হয়েছে তার চেয়ে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা ২.৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু ভারতে যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি মারা গেছে মহামারীতে। সেই হিসাবে করোনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ভারতে। বিশ্বব্যাপী করোনায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা দেড় কোটি (১.৫ মিলিয়ন) আর সরকারি রেকর্ডে দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬২ লাখ। ভারতে সরকারি হিসাবে মৃত্যু পাঁচ লাখ দেখানো হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এ মৃত্যু সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার যে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে তাতে ভারতের অবস্থান গত বছরের (২০২১ সাল) চেয়ে আট ধাপ নেমে গেছে বলে উল্লেখ করেছে।

‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে’ বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এখন ১৫০ নম্বরে। গত বছর তা ছিল ১৪২তম। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স আরো বলেছে, মিডিয়ার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের রেকর্ড কখনোই খুব আহামরি ছিল না। কিন্তু ইদানীং পরিস্থিতির অবনতি এতটাই ঘটেছে যে, ভারতের মূলধারার মিডিয়াগুলো সরকারের বশংবদে পরিণত হচ্ছে। প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কোর ও প্রেস অ্যাসোসিয়েশন আরএসএফদের রিপোর্ট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিবিসিকে বলেছে, ভারতে একদিকে যেমন সাংবাদিকদের কাজের নিরাপত্তা কমছে, তেমনি মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠানগুলো একবাক্যে বলছে, তুচ্ছ ও ঘোলাটে কারণে বিভিন্ন ড্রাকোনিয়ান আইন প্রয়োগ করে সাংবাদিকদের শুধু ভয়ই দেখানো হচ্ছে না, তাদের জীবনও অনেক সময় হুমকির মুখে পড়ছে। গত এক বছরে সাংবাদিকদের এ ধরনের যে চরম হেনস্তার মধ্যে পড়তে হয়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে টাইম ম্যাগাজিন ও নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট রানা আইয়ুবের ওপর নির্যাতন ও হেনস্তা।

উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে এক মুসলিম বৃদ্ধের হেনস্তার ভাইরাল হওয়া ভিডিও টুইটারে শেয়ার করার অভিযোগে কলামিস্ট রানা আইয়ুবের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশ মামলা দিয়েছে। বিবিসিকে আইয়ুব বলেন, সরকারের সমালোচকদের ওপর নির্যাতন তো করা হচ্ছেই, আমার বেলায় যে দিন পুলিশ মামলা করে, ঠিক সে দিনই কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তত তিনটি এজেন্সি আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের সমন পাঠিয়ে জানতে চায় কে আমাদের টাকা-পয়সা দিচ্ছে, আমি কেন বিদেশি পত্রিকার জন্য লিখি, নরেন্দ্র মোদিকে কলঙ্কিত করার এজেন্ডায় আমি যুক্ত কিনা ইত্যাদি। গত এক বছরের মধ্যেই লখিমপুর খেরিতে সাংবাদিক রমন কাশ্যপকে নেতার গাড়ি পিষে দিয়েছে, বিহারে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ছোট শহরের এক সাংবাদিক অবিনাশ ঝাকে। তেমনি লিকার মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে প্রাণ হারিয়েছেন সুলভ শ্রীবাস্তব, খবর কভার করতে গিয়ে ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের পাতা মাইনে নিহত হয়েছে রোহিত বিসওয়ালা। ভারতশাসিত কাশ্মীরেও ২০১৮ সাল থেকে জেলে আছেন সাংবাদিক আসিফ সুলতান। উত্তর প্রদেশের হাতরাসে গণধর্ষণের ঘটনা কভার করতে গিয়ে ২০২০ সাল থেকে আটক আছেন কেরালার সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান।

ইউনেস্কো বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসের এবারের আলোচ্য বিষয় ঠিক করেছে ‘জার্নালিজম আন্ডার ডিজিটাল সিজ’ অর্থাৎ ‘ডিজিটাল অবরোধে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’। স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো মুক্ত সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল হিসেবে ডিজিটাল জগতকে ব্যবহার করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সাংবাদিক ও নাগরিক গোষ্ঠীর ওপর বেআইনি নজরদারি থেকে নিবৃত্ত থাকা।

সম্পাদক পরিষদ ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে দেয়া বিবৃতিতে এ বিষয়টিই উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে যেটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। গণমাধ্যমকর্মী আইন নামে আরেকটি কালো আইন করতে যাচ্ছে সরকার। সাংবাদিক সুরক্ষার নামে প্রস্তাবিত এ আইনটিতে সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ই মুছে ফেলা হয়েছে। নতুন এ আইনটি হলে বাংলাদেশ কার্যত একটি নজরদারিমূলক রাষ্ট্রেই পরিণত হবে। ভিন্নমত, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অবশেষটুকুও আর থাকবে না। ডিজিটাল নিবর্তন কোন পর্যায়ে গেছে তা কয়েক দিন আগে প্রকাশিত গভর্ন্যান্স স্টাডিজের গবেষণাতেই উঠে এসেছে। তারা গত অক্টোবর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৬৬৮টি মামলার সন্ধান পেয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি চারজনের একজন হলেন সাংবাদিক। গ্রেপ্তারকৃত ৪৯৯ জনের মধ্যে ৪২ জনই সাংবাদিক।

বাংলাদেশে এখন যে সাংবাদিকতা চলছে, তা নামেই সাংবাদিকতা। শুধু চাকরিটা করে যাওয়া ও মাস শেষে বেতন পাওয়া নিশ্চিত করা এতটুকুই। বেতনও ঠিকভাবে পাওয়া যায় না কর্তাব্যক্তিদের মর্জি অনুযায়ী কাজ করেও। জীবিকার জন্য ঝুঁকি নেয়ার বিষয়টি একেবারেই গৌণ। একজন সাংবাদিক চাইলেই তার ইচ্ছানুযায়ী কোনো রিপোর্ট করতে পারেন না। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা হলো- ‘তিনি বলেন, তিনি আরো বলেন’।

অর্থাৎ বক্তৃতাবাদীর মধ্যে তাদের সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ। বর্তমানটা আমাদের কাছে যতটা জ্বলজ্বলে, অতীতটা ততটাই ধূসর। সাংবাদিকের জীবন হাঁসের জীবন নয়। হাঁস কাদা-প্যাকের মধ্যে থেকেও গা-ঝাড়া দিয়ে সাফসুতরো হয়ে চলতে পারে। সাংবাদিকদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তারা মানুষ। অন্য সব পেশাজীবী মানুষের যেমন মানবিক ত্রুটি-দুর্বলতা আছে, কোনো কোনো সাংবাদিকেরও তেমন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সমাজের অন্য শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যেমন দুর্নীতি-অসততা আছে, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যেও আছে। তবে এর মধ্যে মাত্রাভেদ আছে। স্বল্প বেতন ও অনিয়মিত বেতনের কারণে সাংবাদিকদের কেউ কেউ ‘হাতপাতা’ স্বভাব রপ্ত করতে বাধ্য হন।

আমাদের দেশে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের একধরনের ‘ধান্দা’র জীবন বেছে নিতে বাধ্য করে। ঢাকার সাংবাদিকদের থেকে মফস্বলের সাংবাদিকদের জীবন আরও দুর্বিষহ। বেশির ভাগ মফস্বল সাংবাদিক একটি নিয়োগপত্র এবং পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছু পান না। কোনো কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল কিছু মাসোহারা দিলেও তা অতি সামান্য এবং অনিয়মিত। তাহলে মফস্বল সাংবাদিকের জীবন চলে কীভাবে? নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যায়, কিন্তু নিজের খাওয়াটা তো থাকতে হবে!

সাংবাদিকদের বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা নিশ্চিত না করে তাদের কাছে সৎ সাংবাদিকতা আশা করাও দুরাশা। কারণ এখন ‘সেই সত্য রচিবে যা তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’ গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতাও রাজনীতির ‘মন্দ’ হাওয়া থেকে মুক্ত নয়। মুক্ত থাকার বাস্তব কারণও নেই। বিরোধিতার চেয়ে প্রশংসা অনেক সময় বেশি ক্ষতির কারণ হয়। যে রাজা শুধু প্রশংসা শুনতে চায়, সে তো হীরক রাজা। হীরক রাজা প্রজাদের মগজ ধোলাই করে নিজেকে ‘ভগবান’ বানানোর চেষ্টা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘খান খান’ হয়ে যায়। ত্রুটিবিচ্যুতি ধরিয়ে দিলে তাকে শত্রু না ভেবে বন্ধু ভাবা উচিত। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো/ যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো/ সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে/ নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে।

সাংবাদিকতা পেশাটি অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে আলাদা। এর বিশেষত্বও অনেক। অন্য পেশায় কেবল ওই পেশাসম্পর্কিত জ্ঞানেই চলে। কিন্তু সাংবাদিকতায় জুতা সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা নিতে হয়। মর্যাদা দিতে গিয়ে কেউ কেউ সাংবাদিকদের বিচারক এবং ধর্মযাজকদের তুলনায় নিয়ে যেতে চান। কর্মবিচারে এ তুলনা যথার্থ নয়। বিচারককে অন্যের তদন্ত, অন্যের সাক্ষ্য ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে বিচারকাজ করতে হয়। তাতে অন্যদের কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি বিচারে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি থাকে। ধর্মযাজককে নির্ভর করতে হয় তার ধর্মবিশ্বাসের ওপর, যা তিনি নিজে প্রণয়ন করেননি। কিন্তু সাংবাদিককে নির্ভর করতে হয় নিজের উদঘাটিত তথ্য-প্রমাণাদি এবং নিজের ন্যায়-অন্যায়বোধের ওপর। অর্থাৎ বিবেকবান থাকার শক্তি, সুযোগ এবং সামর্থ্য সবচেয়ে বেশি থাকতে হয় সাংবাদিকদের। দায়ের সঙ্গে দায়িত্বও অনেক। সঙ্গে ভাবমর্যাদাও।

বছর কয়েক ধরে সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষিতদের অভিষেক ঘটছে। এটি সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক। উড়াধুড়া নয়, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন রয়েল সাবজেক্ট পড়ে আসা এই গণমাধ্যমকর্মীরা অনেকটা কাদামাটির মতো। সুন্দর, পেশাদার হাতে পড়লে তাদের দিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা আসতে পারে। আর বেহাতে পড়লে সামনে মুক্তগণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার মানমর্যাদার সূচক আরও তলানিতে যাওয়ার উপাদান তৈরি হবে। জাতির বিবেক, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ধরনের সম্বোধন অন্য কোনো পেশার ভাগ্যে জোটেনি। এটি এ পেশার অর্জন।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

back to top