alt

উপ-সম্পাদকীয়

মমতা এবং আরএসএসের সম্পর্ক প্রসঙ্গে

গৌতম রায়

: শুক্রবার, ২০ মে ২০২২

পশ্চিমবঙ্গ সফররত আরএসএসপ্রধানকে এখানকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফল, মিষ্টি পাঠানোর জন্যে তার প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। কোন অতিথি বাড়িতে এসে তাকে আপ্যায়িত করা বাংলা তথা বাঙালির রীতি। কিন্তু যে অতিথি বাড়ির ক্ষতি করবার জন্যে এসেছে, তাকে আপ্যায়িত করবার মতো ভীরু, মেরুদন্ডহীন কি বাঙালি কোনদিন ছিল? অনাকাক্সিক্ষত অতিথি আইয়ুব খানের মুখের ওপর তাকে, ‘জানোয়ারদের সর্দার’ বলার মতো স্পর্ধা দেখানো সুফিয়া কামাল তো একজন অতি সাধারণ দেখতে আপামর বাঙালি নারীর মতোই একজন ছিলেন। তার তো ফিল্ড মার্শালের মুখের ওপর সত্য উচ্চারণে এতটুকু অস্পষ্টতা ছিল না। একবার ও তিনি ভাবেননি, আইয়ুব খানের মুখের ওপর এ কথা বলার দায়ে এখনই তাকে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলতে পারে পাকিস্থানের সেনাবাহিনী। সত্য কে দিনের আলোর মতো পরিষ্কারভাবে দেখাতে পেরেছিলেন সুফিয়া কামাল নিজের সত্যের প্রতি অবিচল অবস্থান থেকে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখে বিজেপির বিরোধিতা করে, নানা ধরনের মোটা দাগের অভিনয়ের চেষ্টা করে ও বিজেপির মস্তিষ্ক আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবত কে ‘ভেট’ পাঠিয়েছেন, থুড়ি, বলা দরকার পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন নিজের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্যে।

পশ্চিমবঙ্গ সফররত আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকে মমতার ফল, মিষ্টি পাঠানোর খবরকে ঘিরে হইচই হচ্ছে বেশ। সিপিআই (এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম যেভাবে প্রকাশ্যে বলেছেন, রাজ্যে আরএসএসের মডেলকেই বাস্তবায়িত করছে শাসক তৃণমূল, এভাবে এতটা স্পষ্ট ভাষায় আরএসএসের নীরব কর্মী হিসেবে তৃণমূলের ভূমিকাটি বামপন্থি দলের পদাধিকারীরা আগে কখনো বলেননি। সেলিম ভারতের লোকসভার সদস্য থাকাকালীন বিষয়টি সংসদের ভেতরে ও বাইরে বারবার স্পষ্ট করলেও দলের রাজ্য শাখার পদাধিকারী হিসেবে তিনি যেভাবে পূর্বসূরিদের অস্পষ্ট উচ্চারণ থেকে সরে এসে একদম লক্ষ্যস্থির রেখে আক্রমণ শাণিয়েছেন, তা আরএসএস-মমতার অদৃশ্য গাঁটছড়াকে দৃশ্য করে রাজনৈতিক লড়াইকে একটা শক্ত বনিয়াদের ওপর দাঁড় করাবে।

আরএসএসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া মমতা ক্ষমতায় আসেননি। দীর্ঘ ১১ বছর সেই ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা মমতার পক্ষে সম্ভব হতো না হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী সংগঠন আরএসএসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া। মজার বিষয় হলো, সঙ্ঘ এবং মমতা দুই তরফেই নিজেদের গোপন অথচ মজবুত বোঝাপড়ার বিষয়টাকে কখনো প্রকাশ্যে আসতে দেয় না। আরএসএসের কর্মসূচিকে সফল করতে নয়ের দশকে কংগ্রেস ভেঙে আলাদা দল করবার সময় থেকেই মমতার যে সক্রিয়তা তা যাতে সাধারণ মানুষের চোখে ধরা না পড়ে তার জন্যে বিভিন্ন সময়ে মমতা যে কৌশল নিয়েছেন, সেই কৌশলের ছক যে আরএসএসের তৈরি করা নয়- পরিপ্রেক্ষিত তা বিশ্বাস করতে দেয় না।

আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির সঙ্গে নয়ের দশকে যে গাঁটছড়া প্রথম তৈরি হয়েছিল, তা কখনোই সঙ্ঘের সম্মতি ছাড়া হয়নি। তাই এনডিএতে একই সঙ্গে অবস্থান করে বিজেপি যখন একের পর এক মারমুখী হিন্দু সাম্প্রদায়িক অবস্থান নিয়েছে তখন কিন্তু মমতা বিজেপির সাম্প্রদায়িক অবস্থান ঘিরে একটা কথাও বলেনি। বরংচ বিজেপির সাম্প্রদায়িক কাজকর্ম থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্য খাতে ঘুরিয়ে দিতে মমতা সেই সময়ের উপপ্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানীর সঙ্গে এক নকল যুদ্ধের অভিনয় করে গিয়েছিলেন। বাজপেয়ী ভালো আর আদবানী খারাপ, এটাই ছিল সেই সময়ে মমতার সফল রাজনৈতিক অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের অন্যতম মূলধন।

জ্যোতি বসু এইএনডিএ জোটকে চিরদিন, ‘নীতিবিহীন সুবিধাবাদী’ জোট হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। সেই নীতিবিহীন সুবিধাবাদী জোটে চরম হিন্দু সাম্প্রদায়িক আর একই সঙ্গে চরম মুসলমান বিদ্বেষী বিজেপির সঙ্গে অবস্থান করেও মমতা নিজের যে তথাকথিত মুসলমানপ্রেমী ইমেজটি সেই সময় থেকে তৈরি করেছিলেন, সেই ইমেজ বিলাডিংয়ের ক্ষেত্রে আরএসএসের একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। এই প্রসঙ্গে খুব জোরের সঙ্গেই এই সন্দেহ প্রকাশ করতে হয় যে মমতা গুজরাট গণহত্যার সময়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা সত্ত্বেও তাকে মুসলিম মসিহা হিসেবে তুলে ধরতে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের যে ভূমিকা ছিল, তার পেছনে কি আরএসএসের কোনো অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলন ছিল?

ইন্দিরা গান্ধীর শেষবারের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে আরএসএস যেভাবে কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল, সেই রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের সফল ফলশ্রুতি হলেন মমতা। ভুলে গেলে চলবে না এই মমতাকে রাজনৈতিক পাদপ্রদীপের সামনে তুলে ধরতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকাটি। আল সেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রাষ্ট্রপতি পদে অবসর নেওয়ার পর আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুরের রেশমবাগের কেশব ভবনে গিয়ে সঙ্ঘ স্তুতি দেখবার পর ইন্দিরার মর্মান্তিক হত্যার পর প্রণব কর্তৃক মমতার পৃষ্টপোষকতার বিষয়টি ঘিরে একটা সন্দেহের বাতাবরণ কিন্তু থেকেই যায়। আর সেই সন্দেহটা অনেকটাই তীব্র হয়ে ওঠে সেই সময়ের বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা এবিএ গণিখান চৌধুরীর মমতার সঙ্গে রাজনৈতিক দূরতাবের দিকটিকে মাথায় রাখলে। গণিখান চৌধুরী কি চরম মুসলমানবিরোধী আরএসএসের সঙ্গে মমতার গোপন সম্পর্কের বিষয়ে অবহিত হয়েই নিজের দলের ভেতরে শুধু মমতাবিরোধী নন, মমতা বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন?

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আরএসএস মমতাকে বাম আমলে যেমন চেয়েছিল আজ ও যে তেমনটাই চায়, তার প্রধান কারণ হলো; সঙ্ঘের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বিভাজনের রাজনীতি, মুসলমান বিদ্বেষ... এইসব কিছুকে সমাজজীবনের গভীরে ঢুকিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তারা মমতাকে নিজেদের লোকেদের থেকেও অনেক বেশি বিশ্বস্ত মনে করে। প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়ে ওয়াকফের টাকায় ইমাম-মোয়াজ্জিনদের ভাতা দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই যে সাফল্যের সঙ্গে ছড়াতে পেরেছিলেন, কেন্দ্রের প্রশাসনে থেকে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ গোটা পূর্বাঞ্চলে তার ধারে পাশে ঘেঁষতে পারেনি আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হিসেবে কলকাতা শহরে মুসলমানদের বেহাত হওয়া বহু সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেছিলেন। স্বাধীন ভারতে সেই জমি জায়গা মুসলমান সমাজের উন্নতির স্বার্থে ব্যবহারে প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে মহঃ সেলিম একুশ শতকের প্রথম দশকে। সেলিমের উদ্যোগে ফজলুল হক নির্ধারিত জমিতে মুসলমান সমাজকে আধুনিক, বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার জন্যে পার্ক সার্কাসে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়েছিল। বামফ্রন্টের আমলেই উচ্চস্তরের আমলারা উদ্যোগী ছিল আজকের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে নিজেদের জন্যে আবাসন তৈরি করতে। কায়েমিস্বার্থের সেই বাস্তুঘুঘুর বাসা ভেঙে সেলিম সেদিন ওই জমিতে মুসলমানদের জন্য আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্রের উদ্যোগ নেন। সেই শিক্ষাকেন্দ্রের জমি মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নেয়ার যে চক্রান্ত চলছে, সেই চক্রান্তের ভেতরেও আরএসএসের গোপন, অদৃশ্য হাত কার্যকরী কি না, মোহন ভাগবতের পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে মমতা ফল, মিষ্টি পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে খুব তীব্রভাবে ইতোমধ্যেই ফুটে উঠতে শুরু করে দিয়েছে।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ছবি

‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক দূষণে আরএসএসের ভূমিকা

একতা, ন্যায় ও শক্তির প্রেরণা

ছবি

পদ্মা সেতু : স্বপ্ন এখন বাস্তব

পদ্মা সেতু : বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের প্রতীক

মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ছবি

রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার আকুতি

চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি

কুসিক নির্বাচনে ইসি কি পাস করেছে

বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

ছবি

জয় হোক মানবতার

বন্যা : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ভূমি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের এনজিও ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা কী

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম মোস্তাফা জব্বার

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

ছবি

শরণার্থীদের নিরাপত্তার অধিকার

পদ্মা সেতু : বিএনপির দায় ও সরকারের দায়িত্ব

প্রস্তাবিত বাজেট ব্যাংক খাতে কী প্রভাব রাখবে

ছবি

পদ্মা সেতু : দেশের ‘আইকনিক স্থাপনা’

ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার ও সম্ভাবনা

নবীকে নিয়ে বিজেপি নেতার কটূক্তি

অগ্নিকান্ডে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও করণীয়

ছিন্নমূল মানুষ ও বাংলার কথা

খুনিদের বাঁচাতে আইন হয় কিন্তু আইনজীবীদের সুরক্ষায় আইন নেই

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

দায়িত্ব থেকে সরে গেলেই সুশীল হয়ে যান

ছবি

চলমান পাঠদান পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কতটা সন্তুষ্ট

ছবি

ই-কমার্স খাত উপেক্ষিতই রয়ে গেল

শিক্ষকের সঙ্গে অভিভাবকও নতুন প্রক্রিয়ার অংশীদার

তোমার কথাই ঠিক

আদালত প্রাঙ্গণ টাউট-দালালমুক্ত হোক

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

কমন-সেন্সের বাইরে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

মমতা এবং আরএসএসের সম্পর্ক প্রসঙ্গে

গৌতম রায়

শুক্রবার, ২০ মে ২০২২

পশ্চিমবঙ্গ সফররত আরএসএসপ্রধানকে এখানকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফল, মিষ্টি পাঠানোর জন্যে তার প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। কোন অতিথি বাড়িতে এসে তাকে আপ্যায়িত করা বাংলা তথা বাঙালির রীতি। কিন্তু যে অতিথি বাড়ির ক্ষতি করবার জন্যে এসেছে, তাকে আপ্যায়িত করবার মতো ভীরু, মেরুদন্ডহীন কি বাঙালি কোনদিন ছিল? অনাকাক্সিক্ষত অতিথি আইয়ুব খানের মুখের ওপর তাকে, ‘জানোয়ারদের সর্দার’ বলার মতো স্পর্ধা দেখানো সুফিয়া কামাল তো একজন অতি সাধারণ দেখতে আপামর বাঙালি নারীর মতোই একজন ছিলেন। তার তো ফিল্ড মার্শালের মুখের ওপর সত্য উচ্চারণে এতটুকু অস্পষ্টতা ছিল না। একবার ও তিনি ভাবেননি, আইয়ুব খানের মুখের ওপর এ কথা বলার দায়ে এখনই তাকে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলতে পারে পাকিস্থানের সেনাবাহিনী। সত্য কে দিনের আলোর মতো পরিষ্কারভাবে দেখাতে পেরেছিলেন সুফিয়া কামাল নিজের সত্যের প্রতি অবিচল অবস্থান থেকে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখে বিজেপির বিরোধিতা করে, নানা ধরনের মোটা দাগের অভিনয়ের চেষ্টা করে ও বিজেপির মস্তিষ্ক আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবত কে ‘ভেট’ পাঠিয়েছেন, থুড়ি, বলা দরকার পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন নিজের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্যে।

পশ্চিমবঙ্গ সফররত আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকে মমতার ফল, মিষ্টি পাঠানোর খবরকে ঘিরে হইচই হচ্ছে বেশ। সিপিআই (এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম যেভাবে প্রকাশ্যে বলেছেন, রাজ্যে আরএসএসের মডেলকেই বাস্তবায়িত করছে শাসক তৃণমূল, এভাবে এতটা স্পষ্ট ভাষায় আরএসএসের নীরব কর্মী হিসেবে তৃণমূলের ভূমিকাটি বামপন্থি দলের পদাধিকারীরা আগে কখনো বলেননি। সেলিম ভারতের লোকসভার সদস্য থাকাকালীন বিষয়টি সংসদের ভেতরে ও বাইরে বারবার স্পষ্ট করলেও দলের রাজ্য শাখার পদাধিকারী হিসেবে তিনি যেভাবে পূর্বসূরিদের অস্পষ্ট উচ্চারণ থেকে সরে এসে একদম লক্ষ্যস্থির রেখে আক্রমণ শাণিয়েছেন, তা আরএসএস-মমতার অদৃশ্য গাঁটছড়াকে দৃশ্য করে রাজনৈতিক লড়াইকে একটা শক্ত বনিয়াদের ওপর দাঁড় করাবে।

আরএসএসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া মমতা ক্ষমতায় আসেননি। দীর্ঘ ১১ বছর সেই ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা মমতার পক্ষে সম্ভব হতো না হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী সংগঠন আরএসএসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া। মজার বিষয় হলো, সঙ্ঘ এবং মমতা দুই তরফেই নিজেদের গোপন অথচ মজবুত বোঝাপড়ার বিষয়টাকে কখনো প্রকাশ্যে আসতে দেয় না। আরএসএসের কর্মসূচিকে সফল করতে নয়ের দশকে কংগ্রেস ভেঙে আলাদা দল করবার সময় থেকেই মমতার যে সক্রিয়তা তা যাতে সাধারণ মানুষের চোখে ধরা না পড়ে তার জন্যে বিভিন্ন সময়ে মমতা যে কৌশল নিয়েছেন, সেই কৌশলের ছক যে আরএসএসের তৈরি করা নয়- পরিপ্রেক্ষিত তা বিশ্বাস করতে দেয় না।

আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির সঙ্গে নয়ের দশকে যে গাঁটছড়া প্রথম তৈরি হয়েছিল, তা কখনোই সঙ্ঘের সম্মতি ছাড়া হয়নি। তাই এনডিএতে একই সঙ্গে অবস্থান করে বিজেপি যখন একের পর এক মারমুখী হিন্দু সাম্প্রদায়িক অবস্থান নিয়েছে তখন কিন্তু মমতা বিজেপির সাম্প্রদায়িক অবস্থান ঘিরে একটা কথাও বলেনি। বরংচ বিজেপির সাম্প্রদায়িক কাজকর্ম থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্য খাতে ঘুরিয়ে দিতে মমতা সেই সময়ের উপপ্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানীর সঙ্গে এক নকল যুদ্ধের অভিনয় করে গিয়েছিলেন। বাজপেয়ী ভালো আর আদবানী খারাপ, এটাই ছিল সেই সময়ে মমতার সফল রাজনৈতিক অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের অন্যতম মূলধন।

জ্যোতি বসু এইএনডিএ জোটকে চিরদিন, ‘নীতিবিহীন সুবিধাবাদী’ জোট হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। সেই নীতিবিহীন সুবিধাবাদী জোটে চরম হিন্দু সাম্প্রদায়িক আর একই সঙ্গে চরম মুসলমান বিদ্বেষী বিজেপির সঙ্গে অবস্থান করেও মমতা নিজের যে তথাকথিত মুসলমানপ্রেমী ইমেজটি সেই সময় থেকে তৈরি করেছিলেন, সেই ইমেজ বিলাডিংয়ের ক্ষেত্রে আরএসএসের একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। এই প্রসঙ্গে খুব জোরের সঙ্গেই এই সন্দেহ প্রকাশ করতে হয় যে মমতা গুজরাট গণহত্যার সময়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা সত্ত্বেও তাকে মুসলিম মসিহা হিসেবে তুলে ধরতে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের যে ভূমিকা ছিল, তার পেছনে কি আরএসএসের কোনো অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলন ছিল?

ইন্দিরা গান্ধীর শেষবারের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে আরএসএস যেভাবে কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল, সেই রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের সফল ফলশ্রুতি হলেন মমতা। ভুলে গেলে চলবে না এই মমতাকে রাজনৈতিক পাদপ্রদীপের সামনে তুলে ধরতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকাটি। আল সেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রাষ্ট্রপতি পদে অবসর নেওয়ার পর আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুরের রেশমবাগের কেশব ভবনে গিয়ে সঙ্ঘ স্তুতি দেখবার পর ইন্দিরার মর্মান্তিক হত্যার পর প্রণব কর্তৃক মমতার পৃষ্টপোষকতার বিষয়টি ঘিরে একটা সন্দেহের বাতাবরণ কিন্তু থেকেই যায়। আর সেই সন্দেহটা অনেকটাই তীব্র হয়ে ওঠে সেই সময়ের বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা এবিএ গণিখান চৌধুরীর মমতার সঙ্গে রাজনৈতিক দূরতাবের দিকটিকে মাথায় রাখলে। গণিখান চৌধুরী কি চরম মুসলমানবিরোধী আরএসএসের সঙ্গে মমতার গোপন সম্পর্কের বিষয়ে অবহিত হয়েই নিজের দলের ভেতরে শুধু মমতাবিরোধী নন, মমতা বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন?

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আরএসএস মমতাকে বাম আমলে যেমন চেয়েছিল আজ ও যে তেমনটাই চায়, তার প্রধান কারণ হলো; সঙ্ঘের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বিভাজনের রাজনীতি, মুসলমান বিদ্বেষ... এইসব কিছুকে সমাজজীবনের গভীরে ঢুকিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তারা মমতাকে নিজেদের লোকেদের থেকেও অনেক বেশি বিশ্বস্ত মনে করে। প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়ে ওয়াকফের টাকায় ইমাম-মোয়াজ্জিনদের ভাতা দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই যে সাফল্যের সঙ্গে ছড়াতে পেরেছিলেন, কেন্দ্রের প্রশাসনে থেকে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ গোটা পূর্বাঞ্চলে তার ধারে পাশে ঘেঁষতে পারেনি আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হিসেবে কলকাতা শহরে মুসলমানদের বেহাত হওয়া বহু সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেছিলেন। স্বাধীন ভারতে সেই জমি জায়গা মুসলমান সমাজের উন্নতির স্বার্থে ব্যবহারে প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে মহঃ সেলিম একুশ শতকের প্রথম দশকে। সেলিমের উদ্যোগে ফজলুল হক নির্ধারিত জমিতে মুসলমান সমাজকে আধুনিক, বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার জন্যে পার্ক সার্কাসে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়েছিল। বামফ্রন্টের আমলেই উচ্চস্তরের আমলারা উদ্যোগী ছিল আজকের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে নিজেদের জন্যে আবাসন তৈরি করতে। কায়েমিস্বার্থের সেই বাস্তুঘুঘুর বাসা ভেঙে সেলিম সেদিন ওই জমিতে মুসলমানদের জন্য আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্রের উদ্যোগ নেন। সেই শিক্ষাকেন্দ্রের জমি মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নেয়ার যে চক্রান্ত চলছে, সেই চক্রান্তের ভেতরেও আরএসএসের গোপন, অদৃশ্য হাত কার্যকরী কি না, মোহন ভাগবতের পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে মমতা ফল, মিষ্টি পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে খুব তীব্রভাবে ইতোমধ্যেই ফুটে উঠতে শুরু করে দিয়েছে।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

back to top