alt

উপ-সম্পাদকীয়

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে বিতর্ক

জেরিন জান্নাত ঈশিতা

: শনিবার, ২১ মে ২০২২

বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের কোন ঊর্ধ্বসীমা না থাকলেও বাংলাদেশে বয়স ৩০ বছর পেরিয়ে গেলে আর সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার কোন সুযোগ থাকে না। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ সাধারণ বয়সসীমা ৩০ বছর। মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, উপজাতি কোটা থেকে যারা সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেন তাদের জন্য বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৩২ বছর। সেবিকার চাকরির ক্ষেত্রে তা ৩৬ এবং বিভাগীয় প্রার্থীর কোটায় ৩৫ বছর। আর চাকরিতে অবসরের সাধারণ বয়সসীমা ৫৯ বছর। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে তা ৬০ বছর। বিচারকদের ক্ষেত্রে ৬২ বছরের নির্দেশ আছে আদালতের। এ নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের অনেক সময় হাপিত্যেশ করতে দেখা যায়। চাকরি প্রার্থীদের একটি জনপ্রিয় দাবি হচ্ছে, সরকারি চাকরির জন্য সবার বয়সের ঊর্ধ্বসীমা সর্বোচ্চ ৩৫ করা হোক। এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ নামে একটি অধিকারবিষয়ক সংগঠন ২০১২ সাল থেকে এই দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। করোনার সময় এ দাবি আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সমাধানের কথা বলা হলেও তা এখনো ঝুলে আছে।

বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকারি চাকরির বয়স নির্ধারণের বিষয়টি শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ ভারত তথা উপনিবেশিক আমল থেকে। বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে তখন চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৩ বছর। এরপর যখন পাকিস্তান শাসনামল আসে, তখন এই বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৫ বছর করা হয়। কারণ তখন ধরে নেয়া হয়েছিল যে, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য যেসব যোগ্যতার দরকার হয় তার সবকিছু অর্জন করে ২৩ বছরের মধ্যে প্রস্তুত হওয়াটা কঠিন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর এই বয়স আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২৭ বছর করা হয়। মি. মজুমদার বলেন, ওই সময়ের বাংলাদেশের অবস্থাটা ভিন্ন ছিল। যুদ্ধের কারণে ধরেই নেয়া হয়েছিল যে, শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে এক বছর হারিয়ে গেছে। আর এ কারণেই শিক্ষা জীবন শেষ করে চাকরিতে প্রবেশের সময় বেশি লাগবে বলে বয়স বাড়ানো হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা লেখাপড়ায় একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম, এক বছর তো বন্ধই ছিল সবধরনের ক্লাস-পরীক্ষা।’

তিনি বলেন, ‘তবে বয়স বাড়ানো সেই সময়ে বলা হয়েছিল এবং ধরেই নেয়া হয়েছিল যে, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে শুরু করলে বয়স আবার ২৫ বছরে নামিয়ে নেয়া হবে।’ তবে পরে আর সেটি করা হয়নি। উল্টো এই বয়সের সময়সীমায় আরও পরিবর্তন আসে ১৯৯১ সালে এইচ এম এরশাদের শাসনামলে। সেসময় নানা পক্ষের চাপের মুখে এই বয়স ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়, যেটি এখনো কার্যকর রয়েছে বলে জানান সাবেক এই আমলা।

যখন ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়, তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৭ বছর। এই ৩০ বছরে গড় আয়ু ১৬ বছর বৃদ্ধি পেয়ে ৭৩ বছর হলেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি পায়নি। ২০১১ সালে এসে অবসরের বয়সসীমা বেড়ে হয় ৫৯ আর মহান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয় ৬০। অবসরের বয়স যেহেতু ২ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে সেক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ২ বছর বৃদ্ধি করলে সেটাও আর সাংঘর্ষিক হয় না।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পূর্ব থেকেই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন করে আসছেন চাকরিপ্রার্থীরা। করোনার কারণে দীর্ঘ ১৮ মাস চাকরির পরীক্ষা বন্ধ থাকায় এই দাবি আরও জোরালো হয়। সংক্রমণ কমার পর প্রার্থীরা বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে সরকার করোনাকালীন ক্ষতি বিবেচনায় চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে ২১ মাস ছাড় দেয়। তবে এটিকে চাকরি প্রত্যাশীদের সঙ্গে প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনরতরা। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ফের আন্দোলনে নামেন চাকরিপ্রার্থীরা। সবশেষ চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির দাবিতে নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করেন তারা। পরে পুলিশের লাঠি চার্জে তাদের সেই কর্মসূচি পন্ড হয়ে যায়। নতুন করে আন্দোলনের আভাস মিললেও বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যায় নি। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম গণমাধ্যমকে বলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে না। করোনার ক্ষতি বিবেচনায় প্রার্থীদের বয়সে ছাড় দেয়া হয়েছিল। নতুন করে এ বিষয়ে কোন চিন্তাভাবনা সরকারের আছে বলে আমার জানা নেই। অথচ দুই বছর আগে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ থেকে ৩৫ এবং অবসরের বয়স ৬০ থেকে ৬২ করার। কিন্তু সেটা নিয়ে এখন আর কোন কথা হচ্ছে না। করোনার সময় দুই দফায় কিছুটা বয়সের ছাড় দেয়া হলেও তা সাময়িক। এর আগে ২০১২ সালে জাতীয় সংসদের তখনকার স্পিকার (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) আবদুল হামিদ নিজেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার কথা বলেছিলেন। আন্দোলনরতরা বলেছেন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। তবে সরকার সেটি বাস্তবায়ন করছে না।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির পক্ষে মতামত

সেশনজট, করোনার ক্ষতি ও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক বলে মনে করেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান। তার মতে, সেশনজটসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। সে ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এ বিষয়ে সরকারকে চিন্তা করতে হবে, কত বছর বয়স বাড়ানো যায়। তিনি মনে করেন, সবার জন্য ৩০ বছর থেকে ৩২ করাটা প্রাসঙ্গিক। আবার অবসরের বয়স যেহেতু ৫৯ সেহেতু চাকরিতে প্রবেশের পরে ২৫ বছর সার্ভিস পিরিয়ড নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি করলে দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর। তিনি বলেন, যুব সম্প্রদায়ের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ও সময় প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বা ৩৫ বছরে উন্নীত করা দরকার। আর একই সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ চাকরিজীবীদের সেবা একটি ফলপ্রসূ বয়স পর্যন্ত পেতে এবং নবীন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে চাকরি থেকে অবসরের বয়স এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করাই বর্তমানে সময়োপযোগী।

তাছাড়া চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর যুক্তিসঙ্গত অনেক কারণ রয়েছে। অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর কারণে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমাও বাড়ানো উচিত। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা না বাড়ালে বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। ফলে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে হতাশ হয়ে পড়বেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে নানা ধরনের অরাজকতার সৃষ্টি হতে পারে। বিপথগামী হতে পারেন অনেকে।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির বিপক্ষে সরকারের ব্যাখ্যা

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির কোন পরিকল্পনা নেই জানিয়ে তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হলে নিয়োগ পরীক্ষা বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও ৩০-এর কম বয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হবে বলে ব্যাখ্যায় জানান তিনি। ৫ এপ্রিল ২০২২ তারিখে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সরকারি দলের হাবিবে মিল্লাতের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নত্তোর টেবিলে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সেশনজট থাকলেও বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সেশনজট নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ১৬ বছরে এসএসসি, ১৮ বছরে এইচএসসি এবং ২৩ বা ২৪ বছরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে থাকে।

সাধারণ প্রার্থীদের জন্য চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর বিধায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরও তারা চাকরিতে আবেদনের জন্য কমপক্ষে ৬ থেকে ৭ বছর সময় পেয়ে থাকে। এ ছাড়া ৩০ বছর বয়সসীমার মধ্যে একজন প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করলে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ১ থেকে ২ বছর সময় লাগলেও তা গণনা করা হয় না।

প্রতিমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি চাকরি হতে অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ হতে ৫৯ বছরে উন্নীত হওয়ায় বর্তমানে কূন্য পদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে চাকরিতে প্রবেশের বয়সমীসা বৃদ্ধি করা হলে বিভিন্ন পদের বিপরীতে চাকরি প্রার্থীদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে বর্তমানে ৩০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সীরা চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ পেলেও অনূর্ধ্ব ৩০ বছরের প্রার্থীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হতে পারে।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

[লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ]

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ছবি

‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক দূষণে আরএসএসের ভূমিকা

একতা, ন্যায় ও শক্তির প্রেরণা

ছবি

পদ্মা সেতু : স্বপ্ন এখন বাস্তব

পদ্মা সেতু : বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের প্রতীক

মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ছবি

রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার আকুতি

চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি

কুসিক নির্বাচনে ইসি কি পাস করেছে

বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

ছবি

জয় হোক মানবতার

বন্যা : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ভূমি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের এনজিও ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা কী

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম মোস্তাফা জব্বার

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

ছবি

শরণার্থীদের নিরাপত্তার অধিকার

পদ্মা সেতু : বিএনপির দায় ও সরকারের দায়িত্ব

প্রস্তাবিত বাজেট ব্যাংক খাতে কী প্রভাব রাখবে

ছবি

পদ্মা সেতু : দেশের ‘আইকনিক স্থাপনা’

ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার ও সম্ভাবনা

নবীকে নিয়ে বিজেপি নেতার কটূক্তি

অগ্নিকান্ডে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও করণীয়

ছিন্নমূল মানুষ ও বাংলার কথা

খুনিদের বাঁচাতে আইন হয় কিন্তু আইনজীবীদের সুরক্ষায় আইন নেই

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

দায়িত্ব থেকে সরে গেলেই সুশীল হয়ে যান

ছবি

চলমান পাঠদান পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কতটা সন্তুষ্ট

ছবি

ই-কমার্স খাত উপেক্ষিতই রয়ে গেল

শিক্ষকের সঙ্গে অভিভাবকও নতুন প্রক্রিয়ার অংশীদার

তোমার কথাই ঠিক

আদালত প্রাঙ্গণ টাউট-দালালমুক্ত হোক

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

কমন-সেন্সের বাইরে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে বিতর্ক

জেরিন জান্নাত ঈশিতা

শনিবার, ২১ মে ২০২২

বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের কোন ঊর্ধ্বসীমা না থাকলেও বাংলাদেশে বয়স ৩০ বছর পেরিয়ে গেলে আর সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার কোন সুযোগ থাকে না। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ সাধারণ বয়সসীমা ৩০ বছর। মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, উপজাতি কোটা থেকে যারা সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেন তাদের জন্য বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৩২ বছর। সেবিকার চাকরির ক্ষেত্রে তা ৩৬ এবং বিভাগীয় প্রার্থীর কোটায় ৩৫ বছর। আর চাকরিতে অবসরের সাধারণ বয়সসীমা ৫৯ বছর। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে তা ৬০ বছর। বিচারকদের ক্ষেত্রে ৬২ বছরের নির্দেশ আছে আদালতের। এ নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের অনেক সময় হাপিত্যেশ করতে দেখা যায়। চাকরি প্রার্থীদের একটি জনপ্রিয় দাবি হচ্ছে, সরকারি চাকরির জন্য সবার বয়সের ঊর্ধ্বসীমা সর্বোচ্চ ৩৫ করা হোক। এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ নামে একটি অধিকারবিষয়ক সংগঠন ২০১২ সাল থেকে এই দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। করোনার সময় এ দাবি আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সমাধানের কথা বলা হলেও তা এখনো ঝুলে আছে।

বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকারি চাকরির বয়স নির্ধারণের বিষয়টি শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ ভারত তথা উপনিবেশিক আমল থেকে। বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে তখন চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৩ বছর। এরপর যখন পাকিস্তান শাসনামল আসে, তখন এই বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৫ বছর করা হয়। কারণ তখন ধরে নেয়া হয়েছিল যে, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য যেসব যোগ্যতার দরকার হয় তার সবকিছু অর্জন করে ২৩ বছরের মধ্যে প্রস্তুত হওয়াটা কঠিন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর এই বয়স আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২৭ বছর করা হয়। মি. মজুমদার বলেন, ওই সময়ের বাংলাদেশের অবস্থাটা ভিন্ন ছিল। যুদ্ধের কারণে ধরেই নেয়া হয়েছিল যে, শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে এক বছর হারিয়ে গেছে। আর এ কারণেই শিক্ষা জীবন শেষ করে চাকরিতে প্রবেশের সময় বেশি লাগবে বলে বয়স বাড়ানো হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা লেখাপড়ায় একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম, এক বছর তো বন্ধই ছিল সবধরনের ক্লাস-পরীক্ষা।’

তিনি বলেন, ‘তবে বয়স বাড়ানো সেই সময়ে বলা হয়েছিল এবং ধরেই নেয়া হয়েছিল যে, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে শুরু করলে বয়স আবার ২৫ বছরে নামিয়ে নেয়া হবে।’ তবে পরে আর সেটি করা হয়নি। উল্টো এই বয়সের সময়সীমায় আরও পরিবর্তন আসে ১৯৯১ সালে এইচ এম এরশাদের শাসনামলে। সেসময় নানা পক্ষের চাপের মুখে এই বয়স ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়, যেটি এখনো কার্যকর রয়েছে বলে জানান সাবেক এই আমলা।

যখন ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়, তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৭ বছর। এই ৩০ বছরে গড় আয়ু ১৬ বছর বৃদ্ধি পেয়ে ৭৩ বছর হলেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি পায়নি। ২০১১ সালে এসে অবসরের বয়সসীমা বেড়ে হয় ৫৯ আর মহান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয় ৬০। অবসরের বয়স যেহেতু ২ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে সেক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ২ বছর বৃদ্ধি করলে সেটাও আর সাংঘর্ষিক হয় না।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পূর্ব থেকেই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন করে আসছেন চাকরিপ্রার্থীরা। করোনার কারণে দীর্ঘ ১৮ মাস চাকরির পরীক্ষা বন্ধ থাকায় এই দাবি আরও জোরালো হয়। সংক্রমণ কমার পর প্রার্থীরা বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে সরকার করোনাকালীন ক্ষতি বিবেচনায় চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে ২১ মাস ছাড় দেয়। তবে এটিকে চাকরি প্রত্যাশীদের সঙ্গে প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনরতরা। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ফের আন্দোলনে নামেন চাকরিপ্রার্থীরা। সবশেষ চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির দাবিতে নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করেন তারা। পরে পুলিশের লাঠি চার্জে তাদের সেই কর্মসূচি পন্ড হয়ে যায়। নতুন করে আন্দোলনের আভাস মিললেও বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যায় নি। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম গণমাধ্যমকে বলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে না। করোনার ক্ষতি বিবেচনায় প্রার্থীদের বয়সে ছাড় দেয়া হয়েছিল। নতুন করে এ বিষয়ে কোন চিন্তাভাবনা সরকারের আছে বলে আমার জানা নেই। অথচ দুই বছর আগে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ থেকে ৩৫ এবং অবসরের বয়স ৬০ থেকে ৬২ করার। কিন্তু সেটা নিয়ে এখন আর কোন কথা হচ্ছে না। করোনার সময় দুই দফায় কিছুটা বয়সের ছাড় দেয়া হলেও তা সাময়িক। এর আগে ২০১২ সালে জাতীয় সংসদের তখনকার স্পিকার (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) আবদুল হামিদ নিজেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার কথা বলেছিলেন। আন্দোলনরতরা বলেছেন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। তবে সরকার সেটি বাস্তবায়ন করছে না।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির পক্ষে মতামত

সেশনজট, করোনার ক্ষতি ও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক বলে মনে করেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান। তার মতে, সেশনজটসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। সে ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এ বিষয়ে সরকারকে চিন্তা করতে হবে, কত বছর বয়স বাড়ানো যায়। তিনি মনে করেন, সবার জন্য ৩০ বছর থেকে ৩২ করাটা প্রাসঙ্গিক। আবার অবসরের বয়স যেহেতু ৫৯ সেহেতু চাকরিতে প্রবেশের পরে ২৫ বছর সার্ভিস পিরিয়ড নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি করলে দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর। তিনি বলেন, যুব সম্প্রদায়ের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ও সময় প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বা ৩৫ বছরে উন্নীত করা দরকার। আর একই সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ চাকরিজীবীদের সেবা একটি ফলপ্রসূ বয়স পর্যন্ত পেতে এবং নবীন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে চাকরি থেকে অবসরের বয়স এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করাই বর্তমানে সময়োপযোগী।

তাছাড়া চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর যুক্তিসঙ্গত অনেক কারণ রয়েছে। অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর কারণে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমাও বাড়ানো উচিত। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা না বাড়ালে বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। ফলে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে হতাশ হয়ে পড়বেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে নানা ধরনের অরাজকতার সৃষ্টি হতে পারে। বিপথগামী হতে পারেন অনেকে।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির বিপক্ষে সরকারের ব্যাখ্যা

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির কোন পরিকল্পনা নেই জানিয়ে তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হলে নিয়োগ পরীক্ষা বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও ৩০-এর কম বয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হবে বলে ব্যাখ্যায় জানান তিনি। ৫ এপ্রিল ২০২২ তারিখে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সরকারি দলের হাবিবে মিল্লাতের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নত্তোর টেবিলে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সেশনজট থাকলেও বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সেশনজট নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ১৬ বছরে এসএসসি, ১৮ বছরে এইচএসসি এবং ২৩ বা ২৪ বছরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে থাকে।

সাধারণ প্রার্থীদের জন্য চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর বিধায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরও তারা চাকরিতে আবেদনের জন্য কমপক্ষে ৬ থেকে ৭ বছর সময় পেয়ে থাকে। এ ছাড়া ৩০ বছর বয়সসীমার মধ্যে একজন প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করলে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ১ থেকে ২ বছর সময় লাগলেও তা গণনা করা হয় না।

প্রতিমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি চাকরি হতে অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ হতে ৫৯ বছরে উন্নীত হওয়ায় বর্তমানে কূন্য পদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে চাকরিতে প্রবেশের বয়সমীসা বৃদ্ধি করা হলে বিভিন্ন পদের বিপরীতে চাকরি প্রার্থীদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে বর্তমানে ৩০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সীরা চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ পেলেও অনূর্ধ্ব ৩০ বছরের প্রার্থীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হতে পারে।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

[লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ]

back to top