alt

উপ-সম্পাদকীয়

লাভ-ক্ষতির হিসাব

এম এ কবীর

: বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

জালানি ঘাটতি মোকাবিলায় ফ্রান্সের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি ইলেক্ট্রিকিট ডি ফ্রান্স (ইডিএফ), ইউটিলিটি কোম্পানি ইঞ্জি ও পেট্রোলিয়াম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টোটাল এনার্জির প্রধান নির্বাহীরা বিদ্যুৎ ব্যয়ে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্সের গ্যাস স্টোরেজ বর্তমানে ৫৯ শতাংশ। এর আগে, গত ১৬ জুন নিউ সাউথ ওয়েলসের বাসিন্দাদের সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাতি বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন।

মানুষের দায়িত্ববোধের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার দায়িত্বহীনতায় সমাজের সমূহ ক্ষতি হয়। মানুষ সম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। একটি ভালো গান সৃষ্টিতে গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীর সমন্বিত চেষ্টা যেমনি দরকার তেমনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সব পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়ক হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, সহিংস সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কিংবা যুদ্ধ ও মারণাস্ত্রের ব্যবহারে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমতসহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যের অন্যায় অনিয়মের নজির টেনে নিজেদের অপকর্মের দৃষ্টান্তকে ব্যাখ্যার বাতাবরণে ঢাকার মতো আত্মঘাতী ও প্রবঞ্চনার পথ পরিহার করেই বরং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আবহ তৈরি করতে পারলে উন্নয়ন অর্থবহ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে উঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের আর্থসামাজিক সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ না আগে মানুষ এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং, একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কান্ডজ্ঞান বৈধ-অবৈধতার উপলব্ধি ও ভালো-মন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে।

রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারিত আছে; কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগ নাকচ করে দেয়। সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার, অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সম্পদের অবৈধ অর্জন ও এ উপলক্ষে নির্মম প্রতিযোগিতা, নিজের ব্যাপারে ষোলআনা জরুরি ভাবলেও অন্যের অধিকার অস্বীকার ও বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।

জাপানে শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক কোম্পানির প্রাণ। সেখানে শ্রমিক যাতে তার সর্বাধিক মনোযোগ কোম্পানির জন্য দিতে পারে সে জন্য স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে সংসারের যাবতীয় দায়দায়িত্ব বহনের ভার। কোম্পানির কাজে সার্বক্ষণিক মনোযোগ দেবে স্বামী। সংসার চালানোর বিষয় নিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফোন যাবে না-বাসা থেকে কোনো ফোন আসবে না কোম্পানিতে। জাপানে নারীদের চাকরি, ব্যবসায়, প্রশাসন, রাজনীতিতে বড় একটা দেখা যায় না। তার কারণ সমাজ তাদের সংসার চালানোর দায়িত্ব দিয়ে পুরুষদের উৎপাদনকর্মে পূর্ণ মনোনিবেশে সহায়তা করার দায়িত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হয়েছে। বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা রকম আলোচনা আছে। আবার রসিকতাও কম হচ্ছে না। মুড়ির ওপর কর কমানো হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এখন ভাতের বদলে বসে বসে মুড়ি খাব। অনেকে বলে থাকেন, দশ টন মুড়ি খেলে এক ফোঁটা রক্ত হয়। এটা প্রমাণিত কোনো তথ্য নয়। তবে কোনো কোনো ডাক্তার বলে থাকেন, মুড়ি একটি নির্দোষ খাবার। এগুলো বাদ দিলেও মুড়ি গ্রামীণ জনপদে ফাস্টফুড হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। খিদে পেলে এক বাটি মুড়ির সঙ্গে গোটা কয়েক কাঁচামরিচ আর পানি খেয়ে নিলে একবেলা চলে যায়।

আমদানি করা ল্যাপটপের ওপর বর্তমানে শতকরা ১৬ ভাগ করারোপ করা আছে। এই বাজেটে খাতটিতে আরও শতকরা ১৫ ভাগ কর আরোপ করে করা হয়েছে শতকরা ৩১ ভাগ। কম্পিউটার সমিতির সভাপতি সুব্রত সরকার বলেছেন, চাহিদার শতকরা ৯০ ভাগ ল্যাপটপই আমদানি করা। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদানের জন্যই আমদানি করা ল্যাপটপের ওপর অধিক কর ধার্য করা হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ল্যাপটপের ব্যবহারকারী প্রধানত শিক্ষার্থীরা। দেশীয় ল্যাপটপ তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না এবং এসব ল্যাপটপের মান কেমন- এসব প্রশ্ন রয়েছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে প্রযুক্তিতে আমাদের জনগণ, বিশেষ করে নবীনরা পিছিয়ে যাক- এটি নিশ্চয়ই কাম্য হতে পারে না। পয়ঃশোধনাগারের আমদানি শুল্ক কমেছে শতকরা ২০ ভাগ। এ ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনায় আনা হয়নি। বিদেশি ল্যাপটপ ব্যবহার করার বদলে বিদেশি কমোড ব্যবহার খুব সুখকর হবে বলে মনে হয় না।

কর অব্যাহতি সুবিধা বাতিল করে শতকরা ৫ ভাগ ভ্যাট বসানো হচ্ছে দেশি রেফ্রিজারেটরের ওপর। এতে দেশি রেফ্রিজারেটরের দাম বাড়বে। দেশে আমদানি করা রেফ্রিজারেটর কেনেন শহরে বসবাসকারী সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা। উল্টোদিকে গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র মানুষ কম দামে দেশি রেফ্রিজারেটর কিনে উন্নয়নের সুফল ভোগ করে। পাওয়ার টিলার উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিবেচনা প্রসূত। কর অব্যাহতির বেলায় বলপয়েন্ট কলমের বলপয়েন্টের ওপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কানে শোনার যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার শুভঙ্করের ফাঁকি। ল্যাপটপের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে বলপয়েন্ট কলমের বলপয়েন্টটির ওপর কর প্রত্যাহার হাস্যকর। একটি বলপয়েন্ট কলমের দাম পাঁচ টাকা। তা হলে এর বলপয়েন্টটির দাম কত?

বিশিষ্ট নিউরো কর্তবিজ্ঞানী মোহাম্মদ সামাদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতি দশজনে একজন কিছুটা হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে সামান্য কয়েকজন কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। তবে দেশে কত মানুষ কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে এবং তাদের ব্যাটারি কতদিন চলে- এ ব্যাপারে কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনুমান নির্ভরভাবে ধরা যায়, দেশে ১০ লাখ লোক কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে। এসব যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির দাম কত টাকা? এই ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার কতজনের কাজে লাগবে? এসব ব্যাটারির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন দু-চারজন আমদানিকারক। তারা কি সাশ্রয়ী সুবিধা ভোক্তাদের দেবেন? বাজেটে রেলের প্রথম শ্রেণীর টিকিট, সিগারেট, বিদেশি পনির ও কফির ওপর শুল্কারোপ করা হয়েছে। ওয়াটার পিউরিফাইয়ার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্য। এর ওপর আমদানির শুল্ক বিদ্যমান শতকরা ১ ভাগ থেকে বাড়িয়ে এক লাফে শতকরা ১০ ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট প্রণয়নকারীরা এ প্রস্তাব উপস্থাপনের আগে ওয়াসার পানি সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নিয়েছেন কি? বিভিন্ন এলাকা থেকে নিত্য অভিযোগ শোনা যায়, ওয়াসার পানি ময়লা ও খাওয়ার অনুপযোগী। এ কথা অস্বীকার করায় ভুক্তভোগীরা একবার ওয়াসার চেয়ারম্যানকে ওই পানি দিয়ে শরবত খাওয়াতে গিয়েছিলেন। অনেক পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমানো হয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক বিদ্যমান শতকরা ২৫ ভাগ থেকে কমিয়ে শতকরা ১ ভাগে নামিয়ে আনার বিষয়টি কারও বোধগম্য নয়। পাচার করা টাকা সামান্য কর দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব নৈতিক ও যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অধিক হতে পারে।

হেলিকপ্টারের মূল্য কমানোর জন্য শুল্ক কমানো হয়েছে। হেলিকপ্টারের ব্যবহার দিনে দিনে বিত্তবানদের কাছে বাড়ছে। এতদিন বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্র মানুষের ভেতর দৃশ্যমান শ্রেণী পার্থক্য খুব একটা ছিল না। তবে আকাশপথে বন্যার পানি দেখা থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা গেলে রাস্তাঘাট মেরামতের দিকে ভবিষ্যতে নজর কমও থাকতে পারে। ব্রাজিলে অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ রাস্তাঘাটে খিদে নিয়ে শুয়ে থাকে। অন্যদিকে শিল্পপতিরা একই শহরে অবস্থিত বাসা থেকে অফিসে যায় হেলিকপ্টারে চড়ে।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি,ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

ছবি

পারিসার সাহস

সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় অনুভূতি

যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের সংস্কৃতি

বন্ধ হোক মানব পাচার

পশ্চিমবঙ্গ : বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যেই চুরি ঘিরে তৎপরতা

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা : নাগরিকদের দুর্গতি ও দুর্ভোগ

মৎস্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

বিকল্প জ্বালানির সন্ধানে

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফেরাতে হবে

tab

উপ-সম্পাদকীয়

লাভ-ক্ষতির হিসাব

এম এ কবীর

বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

জালানি ঘাটতি মোকাবিলায় ফ্রান্সের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি ইলেক্ট্রিকিট ডি ফ্রান্স (ইডিএফ), ইউটিলিটি কোম্পানি ইঞ্জি ও পেট্রোলিয়াম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টোটাল এনার্জির প্রধান নির্বাহীরা বিদ্যুৎ ব্যয়ে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্সের গ্যাস স্টোরেজ বর্তমানে ৫৯ শতাংশ। এর আগে, গত ১৬ জুন নিউ সাউথ ওয়েলসের বাসিন্দাদের সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাতি বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন।

মানুষের দায়িত্ববোধের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার দায়িত্বহীনতায় সমাজের সমূহ ক্ষতি হয়। মানুষ সম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। একটি ভালো গান সৃষ্টিতে গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীর সমন্বিত চেষ্টা যেমনি দরকার তেমনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সব পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়ক হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, সহিংস সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কিংবা যুদ্ধ ও মারণাস্ত্রের ব্যবহারে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমতসহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যের অন্যায় অনিয়মের নজির টেনে নিজেদের অপকর্মের দৃষ্টান্তকে ব্যাখ্যার বাতাবরণে ঢাকার মতো আত্মঘাতী ও প্রবঞ্চনার পথ পরিহার করেই বরং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আবহ তৈরি করতে পারলে উন্নয়ন অর্থবহ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে উঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের আর্থসামাজিক সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ না আগে মানুষ এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং, একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কান্ডজ্ঞান বৈধ-অবৈধতার উপলব্ধি ও ভালো-মন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে।

রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারিত আছে; কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগ নাকচ করে দেয়। সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার, অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সম্পদের অবৈধ অর্জন ও এ উপলক্ষে নির্মম প্রতিযোগিতা, নিজের ব্যাপারে ষোলআনা জরুরি ভাবলেও অন্যের অধিকার অস্বীকার ও বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।

জাপানে শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক কোম্পানির প্রাণ। সেখানে শ্রমিক যাতে তার সর্বাধিক মনোযোগ কোম্পানির জন্য দিতে পারে সে জন্য স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে সংসারের যাবতীয় দায়দায়িত্ব বহনের ভার। কোম্পানির কাজে সার্বক্ষণিক মনোযোগ দেবে স্বামী। সংসার চালানোর বিষয় নিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফোন যাবে না-বাসা থেকে কোনো ফোন আসবে না কোম্পানিতে। জাপানে নারীদের চাকরি, ব্যবসায়, প্রশাসন, রাজনীতিতে বড় একটা দেখা যায় না। তার কারণ সমাজ তাদের সংসার চালানোর দায়িত্ব দিয়ে পুরুষদের উৎপাদনকর্মে পূর্ণ মনোনিবেশে সহায়তা করার দায়িত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হয়েছে। বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা রকম আলোচনা আছে। আবার রসিকতাও কম হচ্ছে না। মুড়ির ওপর কর কমানো হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এখন ভাতের বদলে বসে বসে মুড়ি খাব। অনেকে বলে থাকেন, দশ টন মুড়ি খেলে এক ফোঁটা রক্ত হয়। এটা প্রমাণিত কোনো তথ্য নয়। তবে কোনো কোনো ডাক্তার বলে থাকেন, মুড়ি একটি নির্দোষ খাবার। এগুলো বাদ দিলেও মুড়ি গ্রামীণ জনপদে ফাস্টফুড হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। খিদে পেলে এক বাটি মুড়ির সঙ্গে গোটা কয়েক কাঁচামরিচ আর পানি খেয়ে নিলে একবেলা চলে যায়।

আমদানি করা ল্যাপটপের ওপর বর্তমানে শতকরা ১৬ ভাগ করারোপ করা আছে। এই বাজেটে খাতটিতে আরও শতকরা ১৫ ভাগ কর আরোপ করে করা হয়েছে শতকরা ৩১ ভাগ। কম্পিউটার সমিতির সভাপতি সুব্রত সরকার বলেছেন, চাহিদার শতকরা ৯০ ভাগ ল্যাপটপই আমদানি করা। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদানের জন্যই আমদানি করা ল্যাপটপের ওপর অধিক কর ধার্য করা হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ল্যাপটপের ব্যবহারকারী প্রধানত শিক্ষার্থীরা। দেশীয় ল্যাপটপ তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না এবং এসব ল্যাপটপের মান কেমন- এসব প্রশ্ন রয়েছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে প্রযুক্তিতে আমাদের জনগণ, বিশেষ করে নবীনরা পিছিয়ে যাক- এটি নিশ্চয়ই কাম্য হতে পারে না। পয়ঃশোধনাগারের আমদানি শুল্ক কমেছে শতকরা ২০ ভাগ। এ ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনায় আনা হয়নি। বিদেশি ল্যাপটপ ব্যবহার করার বদলে বিদেশি কমোড ব্যবহার খুব সুখকর হবে বলে মনে হয় না।

কর অব্যাহতি সুবিধা বাতিল করে শতকরা ৫ ভাগ ভ্যাট বসানো হচ্ছে দেশি রেফ্রিজারেটরের ওপর। এতে দেশি রেফ্রিজারেটরের দাম বাড়বে। দেশে আমদানি করা রেফ্রিজারেটর কেনেন শহরে বসবাসকারী সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা। উল্টোদিকে গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র মানুষ কম দামে দেশি রেফ্রিজারেটর কিনে উন্নয়নের সুফল ভোগ করে। পাওয়ার টিলার উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিবেচনা প্রসূত। কর অব্যাহতির বেলায় বলপয়েন্ট কলমের বলপয়েন্টের ওপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কানে শোনার যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার শুভঙ্করের ফাঁকি। ল্যাপটপের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে বলপয়েন্ট কলমের বলপয়েন্টটির ওপর কর প্রত্যাহার হাস্যকর। একটি বলপয়েন্ট কলমের দাম পাঁচ টাকা। তা হলে এর বলপয়েন্টটির দাম কত?

বিশিষ্ট নিউরো কর্তবিজ্ঞানী মোহাম্মদ সামাদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতি দশজনে একজন কিছুটা হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে সামান্য কয়েকজন কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। তবে দেশে কত মানুষ কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে এবং তাদের ব্যাটারি কতদিন চলে- এ ব্যাপারে কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনুমান নির্ভরভাবে ধরা যায়, দেশে ১০ লাখ লোক কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে। এসব যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির দাম কত টাকা? এই ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার কতজনের কাজে লাগবে? এসব ব্যাটারির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন দু-চারজন আমদানিকারক। তারা কি সাশ্রয়ী সুবিধা ভোক্তাদের দেবেন? বাজেটে রেলের প্রথম শ্রেণীর টিকিট, সিগারেট, বিদেশি পনির ও কফির ওপর শুল্কারোপ করা হয়েছে। ওয়াটার পিউরিফাইয়ার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্য। এর ওপর আমদানির শুল্ক বিদ্যমান শতকরা ১ ভাগ থেকে বাড়িয়ে এক লাফে শতকরা ১০ ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট প্রণয়নকারীরা এ প্রস্তাব উপস্থাপনের আগে ওয়াসার পানি সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নিয়েছেন কি? বিভিন্ন এলাকা থেকে নিত্য অভিযোগ শোনা যায়, ওয়াসার পানি ময়লা ও খাওয়ার অনুপযোগী। এ কথা অস্বীকার করায় ভুক্তভোগীরা একবার ওয়াসার চেয়ারম্যানকে ওই পানি দিয়ে শরবত খাওয়াতে গিয়েছিলেন। অনেক পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমানো হয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক বিদ্যমান শতকরা ২৫ ভাগ থেকে কমিয়ে শতকরা ১ ভাগে নামিয়ে আনার বিষয়টি কারও বোধগম্য নয়। পাচার করা টাকা সামান্য কর দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব নৈতিক ও যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অধিক হতে পারে।

হেলিকপ্টারের মূল্য কমানোর জন্য শুল্ক কমানো হয়েছে। হেলিকপ্টারের ব্যবহার দিনে দিনে বিত্তবানদের কাছে বাড়ছে। এতদিন বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্র মানুষের ভেতর দৃশ্যমান শ্রেণী পার্থক্য খুব একটা ছিল না। তবে আকাশপথে বন্যার পানি দেখা থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা গেলে রাস্তাঘাট মেরামতের দিকে ভবিষ্যতে নজর কমও থাকতে পারে। ব্রাজিলে অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ রাস্তাঘাটে খিদে নিয়ে শুয়ে থাকে। অন্যদিকে শিল্পপতিরা একই শহরে অবস্থিত বাসা থেকে অফিসে যায় হেলিকপ্টারে চড়ে।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি,ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

back to top