alt

উপ-সম্পাদকীয়

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

আব্দুল মান্নান খান

: রোববার, ৩১ জুলাই ২০২২

একসময় শিশুদের স্কুলজীবনের শুরুতে অন্যতম প্রধান একটা পাঠ পদ্ধতি ছিল ডাকপড়া। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুদের জন্য তো ছিলই সঙ্গে তার পরের শ্রেণীগুলো যুক্ত করা হতো অনেক সময়। সব স্কুলে এটা ছিল কি না বলতে না পারলেও দেশের ব্যাপক এরিয়াজুড়ে ছিল। অঞ্চলভেদে ভিন্ন নামেও চলে থাকতে পারে। যাদের বয়স এখন পঞ্চাশ তারা জেনে থাকবেন দেখেও থাকতে পারেন গ্রামাঞ্চলে যারা শৈশবে স্কুলে গেছেন। পদ্ধতিটা দেশ স্বাধীনের পরও চলেছে বেশ কিছু বছর।

বই দেখে সাবলীলভাবে মাতৃভাষা উচ্চারণ করে পড়তে আমাদের শিশুদের নবম-দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে সেখানে প্রাইমারি পর্যায়ের কথা তো হিসাবেই আসার কথা না যদিও ভিতটা প্রাইমারিতেই। প্রাইমারি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে তার এক প্রতিবেদনে বলেছে, মানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা চার বছর পিছিয়ে আছে। এর মানে আমাদের শিশুরা প্রথম শ্রেণীতে যা শিখার কথা, তা শিখছে পঞ্চম শ্রেণীতে গিয়ে। ১১ বছরের জীবনে ৪ বছরের শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের। দেশি-বিদেশি সুধী বিশেষজ্ঞজনেরা বলছেন, ‘মাতৃভাষায় পঠনদক্ষতা মানবসম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়তে না পারলে শিক্ষার ভিত শক্ত হয় না। শিশুদের পঠনদক্ষতা ১০ শতাংশ বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে যায়। আর এর অভাব শিশুর ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলে’।

ডাকপড়া ছিল অনেকটা জারি গানের মতো। সবার সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন উচ্চস্বরে যা বলে ছেড়ে দেবে অন্য সবাই তাই বলবে সমস্বরে। তার আগে সবাই কয়েকটা লাইন দিয়ে দাঁড়াবে মানান সই ভাবে। তারপর তাদের ভেতর থেকে একজন সামনে গিয়ে দাঁড়াবে মুখোমুখি হয়ে। যে সামনে গিয়ে দাঁড়াবে বা যাকে পাঠানো হবে তার উচ্চারণ স্পষ্ট হতে হবে প্রথম কথা।

ডাকপড়া শুরু হবে প্রত্যেকটা বর্ণের সঙ্গে কার চিহ্ন অর্থাৎ া ি ী ু ূ ৃ ে ৈ ে া ে ৗ ং ঃ ঁ যুক্ত করে। যে পড়াবে সে বলবে ক-য় আকারে কা, সবাই বলবে ক-য় আকারে কা। সে বলবে, ক-য় হ্রস্বি কারে কি, সবাই বলবে ক-য় হ্রস্বি কারে কি। এভাবে চলবে, ক-য় ী কারে কী, ক-য় ু কারে কু, ক-য় ূ কারে কূ , ক-য় ৃ কারে কৃ, ক-য় ে কারে কে, ক-য় ৈ কারে কৈ, ক-য় ে া কারে কো, ক-য় ে ৗ কারে কৌ, ক-য় ং এ কং, ক-য় ঃ কঃ,ক-য় ঁ কঁ ।

একে ক-র বানানও বলা হতো। এর পরে খ-র বানান চলবে একইভাবে। যেমন খ-য় আকারে খা, খ-য় ি কারে খি, খ-য় ী কারে খী, চলবে একইভাবে খ-য় ঁ খঁ পর্যন্ত। তারপরে গ-র বানান তারপরে ঘ-র বানান এবং শেষ হবে গিয়ে হ-র বানানে যেমন হ-য় আকারে হা, হ-য় ি কারে হি, শেষ হবে হ-য় ঁ হঁ তে গিয়ে। মনে হতে পারে এভাবে পড়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আসলে তা নয় পড়তে শুরু করলে সময় বেশি লাগে না। যারা নবীন যারা ছোট তারা প্রথম প্রথম শুধু লাইনে দাঁড়িয়ে শুনবে পরে মুখ মিলাতে থাকবে। পরে এক দিন দেখা যাবে তারা গলা ছেড়ে বলতে শুরু করেছে ক-য় আকারে কা, ক-য় ি কারে কি। বিষয়টা ছিল ছোটদের জন্য আনন্দের-হৈহুল্লোড়ের। এর মধ্যে একটা ছন্দও কাজ করেছে ভালো। অনেক সময় নতুন নতুন কাউকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। সে হয়তো ক-র বানানটা পুরোই বলে ফেললো। আবার কেউ হয়তো অর্ধেকটা যেয়ে থেমে গেল। এভাবে একটা উচ্ছলতার মধ্যে চলতো ডাক পড়া। একটা আনন্দময় স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব ফুটে উঠতো শিশুদের মধ্যে।

এই ডাক পড়তে ক বর্গ থেকে ঙ, চ বর্গ থেকে ঞ এবং ট বর্গ থেকে ণ বাদ থেকেছে। শেষ দিকে য় ৎ ড় ঢ় ক্ষ এগুলোও ডাক পড়া থেকে বাদ থেকেছে। তারপর নিয়মিত ডাক পড়ার ফলে যখন মুখের জড়তা ভেঙে গেছে সাহস বেড়েছে তখন ওই য় ৎ ড় ঢ় ক্ষ এর উচ্চারণও রপ্ত হয়ে গেছে সহজে।

ডাকপড়া চলতো বেশ একটা ছন্দের তালে তালে আগেই বলেছি। অনেক সময় দুটো মাত্রা একসঙ্গে যুক্ত করে পড়ানো হতো অর্থাৎ একসঙ্গে দুটো কার চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। যেমন ডাক যে পড়াবে সে বলবে, ক-য় আকারে কা, ক-য় ি কারে কি, সবাই একইভাবে এক সঙ্গে বলবে ক-য় আকারে কা, ক-য় ি কারে কি। এ পর্যায়ে এসে ব্যাপারটা আরও ছন্দময় হয়ে উঠতো।

ধারাপাতের ব্যাপারটা দেখা যাক। এক সময় এক থেকে দশ পর্যন্ত পড়ানো হতো এভাবে ১-এ চন্দ্র, সবাই বলবে, ১-এ চন্দ্র, ২-এ পক্ষ, সবাই বলবে-২-এ পক্ষ, এভাবে ৩-এ নেত্র, ৪-এ বেদ, ৫-এ পঞ্চ বান, ৬-এ ৬ ঋতু, ৭-এ সাত সমুদ্র, ৮-এ অষ্ট বসু, ৯-এ নয় গ্রহ, দশে- দশের দিক। ছোট শিশুদের এর কোনটার অর্থ জানার দরকার নেই। তারা ভাঙবে মুখের জড়তা শিখবে উচ্চারণ। পবে যখন শব্দগুলোর অর্থ বুঝবে তখন মজাই পাবে। এর পরের অংশ পড়া হতো এভাবে-১ এর পিঠে ১ দিলে ১১ হয়, সবাই বলবে ১ এর পিঠে ১ দিলে ১১ হয়, ১১-র ১ নামে হাতে ১ রয়, সবাই বলবে ১১-র ১ নামে হাতে ১ রয়, ১এর পিঠে ২ দিলে ১২ হয়, সবাই বলবে ১এর পিঠে ২ দিলে ১২ হয়, ১২-র ২ নামে হাতে ১ রয়। এভাবে হয়তো পুরো শতকিয়া পড়া হয়ে যেতো। আবার এখানেও দুটো একসঙ্গে পড়া হতো যেমন ৬-র পিঠে ১ দিলে ৬১ হয়, ৬১-র ১ নামে হাতে ৬ রয় সবাই বলবে ৬-র পিঠে ১ দিলে ৬১ হয়, ৬১-র ১ নামে হাতে ৬ রয়।

পরে এ দুটোই পরিবর্তিত হয়ে এরকমটা হয়েছিল- প্রথমটা ১-এ চন্দ্র উঠে গিয়ে হয় ১ এক্কে ১. বাকিগুলোও একইভাবে হয় যেমন ২ এক্কে ২, ৩ এক্কে ৩, ৪ এক্কে ৪ এভাবে ১০ পর্যন্ত যেমন ১০ এক্কে ১০। পরের যে কোন অংকের ধরা যাক ৫, এখানে হবে ৫ এক্কে ৫, ৫ দুকুনে ১০, ৩ পাচা ১৫, ৪ পাচা ২০, এভাবে চলবে ১০ পর্যন্ত যেমন ৫ দশে ৫০। ডাক পড়ার নিয়ম ছিল একই।

এই এক্কে শব্দের আক্ষরিক অর্থ থাক আর না থাক বা যাই হোক না কেন ছন্দের মিল ছিল টেকসই। গুণ অঙ্ক করতে এ নামতার ব্যবহার। নামতায় ছন্দ আনতে ছিল এ ডাক পড়া। এক এক্কে এক. তার মানে এককে এক দিয়ে গুণ করলে এক হয়। বারো এক্কে বারো অর্থাৎ বারোকে এক দিয়ে গুণ করলে বারো হয়। যাহোক, শব্দটা যেমন শুনেছি তেমনই তুলে দেয়া হয়েছে। এক্কে বলতে এখানে এক বোঝানো হয়েছে। এর দ্বিতীয় অংশে এসে পিঠে বসে হাতে থাকে এসব আর থাকে না। শুরু হয় এরকম ১ দশ ১ ১১, সবাই বলবে ১ দশ ১ ১১, ১ দশ ২ ১২ সবাই বলে ১ দশ ২ ১২।

এবার বিজাতীয় ভাষা ইংরেজির বেলায় দেখা যাক কেমন ছিল। নিয়ম একই ছিল যেমন- যে ডাক পড়াবে সে বলবে, বি এ বে সবাই বলবে বিএ বে, সে বলবে বিই বি, সবাই বলবে বি ই বি, এভাবে বি আই বাই, বি ও বো, বি ইউ বিউ, বি ওয়াই বাই। এখানে থাকবে ইংরেজি কনসোনেন্ট বর্ণগুলোর সঙ্গে ভাউয়েল বর্ণগুলোর ব্যবহার। এভাবে চলতো কনসোনেন্ট এর প্রতিটা বর্ণকে একে একে পাঁচটা ভাওয়েল এ, ই, আই, ও, ইউ লাগিয়ে উচ্চস্বরে ডাকপড়া। যেমন এম বর্ণটা যদি আমরা ধরি তহলে যেমন হবে, এম এ মে, এম ই মি, এম আই মাই, এম ও মো, এম ইউ মিউ, এম ওয়াই মাই। গোজামিল এখানে আছে। সেটা শিশুশিক্ষার্থীরা সহজেই পরে এড়াতে পারে বলা যায়। যেমন এম এ মে এটা কতটা সঠিক।

দেশে এখন সব শিশুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী তা সরকারি বেসরকারি মাদ্রাসা এবতেদাই নূরানি হাফেজি কি›ডার গার্টেন- প্লে নার্সারি কেজি যেখানেই হোক তারা যাচ্ছে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে প্রি-প্রাইমারি ক্লাস চালু করা হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সব রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়–য়াদের এই ডাকপড়া পদ্ধতির আওতায় আনা গেলে শিক্ষার সঙ্গে #কোমলমতি শিশুরা একটা আনন্দময় পরিবেশে শৈশবটা পার করতে পারবে এবং সবাই যেটা চাচ্ছেন, তা তরান্বিত হবে। সবাই যেটা চাচ্ছেন বলতে আমি প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালে জারিকৃত একটা পরিপত্রের কথা বলছি। সেখানে বলা হয়েছে, ভাষাজ্ঞান বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত পাঠাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বই থেকে একটি প্যারা বা পৃষ্ঠা পঠনের জন্য বাড়ির কাজ দিতে হবে। প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা হাতের লেখা বাড়ি থেকে লিখে আনার জন্য দিতে হবে। ক্লাসে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট শ্রেণী শিক্ষক সব শিশুকে আবশ্যিকভাবে পঠন করাবেন। শিক্ষকরা নিজেরা শিশুদের সঙ্গে উচ্চারণ করে পাঠদান করাবেন, এতে শিক্ষার্থীদের উচ্চারণ জড়তা দূর হবে এবং প্রমিত উচ্চারণ শৈলীর সৃষ্টি হবে’। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এ কাজটা তখন ডাকপড়ার ভেতর দিয়েই হয়ে যেত। বৃহত্তর সুফল পেতে এখনো কাজটা করা যেতে পারে। আশা করা যায় কর্তৃপক্ষ বিষয়টা ভেবে দেখবেন।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

আব্দুল মান্নান খান

রোববার, ৩১ জুলাই ২০২২

একসময় শিশুদের স্কুলজীবনের শুরুতে অন্যতম প্রধান একটা পাঠ পদ্ধতি ছিল ডাকপড়া। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুদের জন্য তো ছিলই সঙ্গে তার পরের শ্রেণীগুলো যুক্ত করা হতো অনেক সময়। সব স্কুলে এটা ছিল কি না বলতে না পারলেও দেশের ব্যাপক এরিয়াজুড়ে ছিল। অঞ্চলভেদে ভিন্ন নামেও চলে থাকতে পারে। যাদের বয়স এখন পঞ্চাশ তারা জেনে থাকবেন দেখেও থাকতে পারেন গ্রামাঞ্চলে যারা শৈশবে স্কুলে গেছেন। পদ্ধতিটা দেশ স্বাধীনের পরও চলেছে বেশ কিছু বছর।

বই দেখে সাবলীলভাবে মাতৃভাষা উচ্চারণ করে পড়তে আমাদের শিশুদের নবম-দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে সেখানে প্রাইমারি পর্যায়ের কথা তো হিসাবেই আসার কথা না যদিও ভিতটা প্রাইমারিতেই। প্রাইমারি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে তার এক প্রতিবেদনে বলেছে, মানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা চার বছর পিছিয়ে আছে। এর মানে আমাদের শিশুরা প্রথম শ্রেণীতে যা শিখার কথা, তা শিখছে পঞ্চম শ্রেণীতে গিয়ে। ১১ বছরের জীবনে ৪ বছরের শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের। দেশি-বিদেশি সুধী বিশেষজ্ঞজনেরা বলছেন, ‘মাতৃভাষায় পঠনদক্ষতা মানবসম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়তে না পারলে শিক্ষার ভিত শক্ত হয় না। শিশুদের পঠনদক্ষতা ১০ শতাংশ বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে যায়। আর এর অভাব শিশুর ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলে’।

ডাকপড়া ছিল অনেকটা জারি গানের মতো। সবার সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন উচ্চস্বরে যা বলে ছেড়ে দেবে অন্য সবাই তাই বলবে সমস্বরে। তার আগে সবাই কয়েকটা লাইন দিয়ে দাঁড়াবে মানান সই ভাবে। তারপর তাদের ভেতর থেকে একজন সামনে গিয়ে দাঁড়াবে মুখোমুখি হয়ে। যে সামনে গিয়ে দাঁড়াবে বা যাকে পাঠানো হবে তার উচ্চারণ স্পষ্ট হতে হবে প্রথম কথা।

ডাকপড়া শুরু হবে প্রত্যেকটা বর্ণের সঙ্গে কার চিহ্ন অর্থাৎ া ি ী ু ূ ৃ ে ৈ ে া ে ৗ ং ঃ ঁ যুক্ত করে। যে পড়াবে সে বলবে ক-য় আকারে কা, সবাই বলবে ক-য় আকারে কা। সে বলবে, ক-য় হ্রস্বি কারে কি, সবাই বলবে ক-য় হ্রস্বি কারে কি। এভাবে চলবে, ক-য় ী কারে কী, ক-য় ু কারে কু, ক-য় ূ কারে কূ , ক-য় ৃ কারে কৃ, ক-য় ে কারে কে, ক-য় ৈ কারে কৈ, ক-য় ে া কারে কো, ক-য় ে ৗ কারে কৌ, ক-য় ং এ কং, ক-য় ঃ কঃ,ক-য় ঁ কঁ ।

একে ক-র বানানও বলা হতো। এর পরে খ-র বানান চলবে একইভাবে। যেমন খ-য় আকারে খা, খ-য় ি কারে খি, খ-য় ী কারে খী, চলবে একইভাবে খ-য় ঁ খঁ পর্যন্ত। তারপরে গ-র বানান তারপরে ঘ-র বানান এবং শেষ হবে গিয়ে হ-র বানানে যেমন হ-য় আকারে হা, হ-য় ি কারে হি, শেষ হবে হ-য় ঁ হঁ তে গিয়ে। মনে হতে পারে এভাবে পড়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আসলে তা নয় পড়তে শুরু করলে সময় বেশি লাগে না। যারা নবীন যারা ছোট তারা প্রথম প্রথম শুধু লাইনে দাঁড়িয়ে শুনবে পরে মুখ মিলাতে থাকবে। পরে এক দিন দেখা যাবে তারা গলা ছেড়ে বলতে শুরু করেছে ক-য় আকারে কা, ক-য় ি কারে কি। বিষয়টা ছিল ছোটদের জন্য আনন্দের-হৈহুল্লোড়ের। এর মধ্যে একটা ছন্দও কাজ করেছে ভালো। অনেক সময় নতুন নতুন কাউকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। সে হয়তো ক-র বানানটা পুরোই বলে ফেললো। আবার কেউ হয়তো অর্ধেকটা যেয়ে থেমে গেল। এভাবে একটা উচ্ছলতার মধ্যে চলতো ডাক পড়া। একটা আনন্দময় স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব ফুটে উঠতো শিশুদের মধ্যে।

এই ডাক পড়তে ক বর্গ থেকে ঙ, চ বর্গ থেকে ঞ এবং ট বর্গ থেকে ণ বাদ থেকেছে। শেষ দিকে য় ৎ ড় ঢ় ক্ষ এগুলোও ডাক পড়া থেকে বাদ থেকেছে। তারপর নিয়মিত ডাক পড়ার ফলে যখন মুখের জড়তা ভেঙে গেছে সাহস বেড়েছে তখন ওই য় ৎ ড় ঢ় ক্ষ এর উচ্চারণও রপ্ত হয়ে গেছে সহজে।

ডাকপড়া চলতো বেশ একটা ছন্দের তালে তালে আগেই বলেছি। অনেক সময় দুটো মাত্রা একসঙ্গে যুক্ত করে পড়ানো হতো অর্থাৎ একসঙ্গে দুটো কার চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। যেমন ডাক যে পড়াবে সে বলবে, ক-য় আকারে কা, ক-য় ি কারে কি, সবাই একইভাবে এক সঙ্গে বলবে ক-য় আকারে কা, ক-য় ি কারে কি। এ পর্যায়ে এসে ব্যাপারটা আরও ছন্দময় হয়ে উঠতো।

ধারাপাতের ব্যাপারটা দেখা যাক। এক সময় এক থেকে দশ পর্যন্ত পড়ানো হতো এভাবে ১-এ চন্দ্র, সবাই বলবে, ১-এ চন্দ্র, ২-এ পক্ষ, সবাই বলবে-২-এ পক্ষ, এভাবে ৩-এ নেত্র, ৪-এ বেদ, ৫-এ পঞ্চ বান, ৬-এ ৬ ঋতু, ৭-এ সাত সমুদ্র, ৮-এ অষ্ট বসু, ৯-এ নয় গ্রহ, দশে- দশের দিক। ছোট শিশুদের এর কোনটার অর্থ জানার দরকার নেই। তারা ভাঙবে মুখের জড়তা শিখবে উচ্চারণ। পবে যখন শব্দগুলোর অর্থ বুঝবে তখন মজাই পাবে। এর পরের অংশ পড়া হতো এভাবে-১ এর পিঠে ১ দিলে ১১ হয়, সবাই বলবে ১ এর পিঠে ১ দিলে ১১ হয়, ১১-র ১ নামে হাতে ১ রয়, সবাই বলবে ১১-র ১ নামে হাতে ১ রয়, ১এর পিঠে ২ দিলে ১২ হয়, সবাই বলবে ১এর পিঠে ২ দিলে ১২ হয়, ১২-র ২ নামে হাতে ১ রয়। এভাবে হয়তো পুরো শতকিয়া পড়া হয়ে যেতো। আবার এখানেও দুটো একসঙ্গে পড়া হতো যেমন ৬-র পিঠে ১ দিলে ৬১ হয়, ৬১-র ১ নামে হাতে ৬ রয় সবাই বলবে ৬-র পিঠে ১ দিলে ৬১ হয়, ৬১-র ১ নামে হাতে ৬ রয়।

পরে এ দুটোই পরিবর্তিত হয়ে এরকমটা হয়েছিল- প্রথমটা ১-এ চন্দ্র উঠে গিয়ে হয় ১ এক্কে ১. বাকিগুলোও একইভাবে হয় যেমন ২ এক্কে ২, ৩ এক্কে ৩, ৪ এক্কে ৪ এভাবে ১০ পর্যন্ত যেমন ১০ এক্কে ১০। পরের যে কোন অংকের ধরা যাক ৫, এখানে হবে ৫ এক্কে ৫, ৫ দুকুনে ১০, ৩ পাচা ১৫, ৪ পাচা ২০, এভাবে চলবে ১০ পর্যন্ত যেমন ৫ দশে ৫০। ডাক পড়ার নিয়ম ছিল একই।

এই এক্কে শব্দের আক্ষরিক অর্থ থাক আর না থাক বা যাই হোক না কেন ছন্দের মিল ছিল টেকসই। গুণ অঙ্ক করতে এ নামতার ব্যবহার। নামতায় ছন্দ আনতে ছিল এ ডাক পড়া। এক এক্কে এক. তার মানে এককে এক দিয়ে গুণ করলে এক হয়। বারো এক্কে বারো অর্থাৎ বারোকে এক দিয়ে গুণ করলে বারো হয়। যাহোক, শব্দটা যেমন শুনেছি তেমনই তুলে দেয়া হয়েছে। এক্কে বলতে এখানে এক বোঝানো হয়েছে। এর দ্বিতীয় অংশে এসে পিঠে বসে হাতে থাকে এসব আর থাকে না। শুরু হয় এরকম ১ দশ ১ ১১, সবাই বলবে ১ দশ ১ ১১, ১ দশ ২ ১২ সবাই বলে ১ দশ ২ ১২।

এবার বিজাতীয় ভাষা ইংরেজির বেলায় দেখা যাক কেমন ছিল। নিয়ম একই ছিল যেমন- যে ডাক পড়াবে সে বলবে, বি এ বে সবাই বলবে বিএ বে, সে বলবে বিই বি, সবাই বলবে বি ই বি, এভাবে বি আই বাই, বি ও বো, বি ইউ বিউ, বি ওয়াই বাই। এখানে থাকবে ইংরেজি কনসোনেন্ট বর্ণগুলোর সঙ্গে ভাউয়েল বর্ণগুলোর ব্যবহার। এভাবে চলতো কনসোনেন্ট এর প্রতিটা বর্ণকে একে একে পাঁচটা ভাওয়েল এ, ই, আই, ও, ইউ লাগিয়ে উচ্চস্বরে ডাকপড়া। যেমন এম বর্ণটা যদি আমরা ধরি তহলে যেমন হবে, এম এ মে, এম ই মি, এম আই মাই, এম ও মো, এম ইউ মিউ, এম ওয়াই মাই। গোজামিল এখানে আছে। সেটা শিশুশিক্ষার্থীরা সহজেই পরে এড়াতে পারে বলা যায়। যেমন এম এ মে এটা কতটা সঠিক।

দেশে এখন সব শিশুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী তা সরকারি বেসরকারি মাদ্রাসা এবতেদাই নূরানি হাফেজি কি›ডার গার্টেন- প্লে নার্সারি কেজি যেখানেই হোক তারা যাচ্ছে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে প্রি-প্রাইমারি ক্লাস চালু করা হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সব রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়–য়াদের এই ডাকপড়া পদ্ধতির আওতায় আনা গেলে শিক্ষার সঙ্গে #কোমলমতি শিশুরা একটা আনন্দময় পরিবেশে শৈশবটা পার করতে পারবে এবং সবাই যেটা চাচ্ছেন, তা তরান্বিত হবে। সবাই যেটা চাচ্ছেন বলতে আমি প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালে জারিকৃত একটা পরিপত্রের কথা বলছি। সেখানে বলা হয়েছে, ভাষাজ্ঞান বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত পাঠাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বই থেকে একটি প্যারা বা পৃষ্ঠা পঠনের জন্য বাড়ির কাজ দিতে হবে। প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা হাতের লেখা বাড়ি থেকে লিখে আনার জন্য দিতে হবে। ক্লাসে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট শ্রেণী শিক্ষক সব শিশুকে আবশ্যিকভাবে পঠন করাবেন। শিক্ষকরা নিজেরা শিশুদের সঙ্গে উচ্চারণ করে পাঠদান করাবেন, এতে শিক্ষার্থীদের উচ্চারণ জড়তা দূর হবে এবং প্রমিত উচ্চারণ শৈলীর সৃষ্টি হবে’। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এ কাজটা তখন ডাকপড়ার ভেতর দিয়েই হয়ে যেত। বৃহত্তর সুফল পেতে এখনো কাজটা করা যেতে পারে। আশা করা যায় কর্তৃপক্ষ বিষয়টা ভেবে দেখবেন।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

back to top