alt

উপ-সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শেখর ভট্টাচার্য

: বৃহস্পতিবার, ০৪ আগস্ট ২০২২
image

অর্থনৈতিক সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কাকে রাজনৈতিক সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে

বাংলাদেশ দ্রুতই শ্রীলঙ্কায় পরিণত হতে যাচ্ছে- এ বিষয়টির পক্ষে নানারকম অপযুক্তি দিয়ে একশ্রেণীর মানুষ রাজপথ, টিভি টক শো, ইউটিউব চ্যানেল এবং সংবাদপত্রের পাতা সরগরম করে তুলছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের ইউটিউব চ্যানেলে একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আকারে ইঙ্গিতে বাংলাদেশ যে অচিরেই শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে- এ বিষয়ে তিনি প্রায় নিশ্চিত বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সরকার কেন এ বিষয়টিকে চেপে রাখছে- এজন্য তিনি হতাশা প্রকাশ করলেন বলে মনে হলো।

যে সময়ে কানাডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ভিজুয়াল ক্যাপিটালিস্ট’ তাদের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে জানিয়েছে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ৪১তম এবং এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, তখনই বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা হওয়ার স্লোগানকে আরও জোরদার করে তোলা হচ্ছে। ভিজুয়্যাল ক্যাপিটালিস্টের জরিপে দেখা যায় ১০৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক জিডিপির ভিত্তিতে ১৯১ দেশের তালিকায় ৩৯৭ বিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ৪১তম স্থানে। ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে তালিকায় ভারতের অবস্থান ছয়ে। এতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের জিডিপি”র আকার ৩৯৭ বিলিয়ন বা ৩৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র ভারতই বাংলাদেশের উপরে রয়েছে। দেশটির জিডিপির আকার ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার। বৈশ্বিক তালিকায় ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ। জিডিপির ভিত্তিতে শীর্ষ ৫০ দেশের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া আর কোন দেশ নেই।

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা হতেই পারে- তবে এ তুলনা করার সময় বিবেচনায় রাখতে হবে দুটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বাস্তব প্রেক্ষিতকে। মনে রাখতে হবে শ্রীলংকা ২০০৬ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধে যুক্ত ছিলো, সেই গৃহযুদ্ধের অবসানের পর থেকেই শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে ধস নামা শুরু হয়। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির তুলনামূলক অবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার মোট ঋণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু দেশটির মোট জনসংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ, সে হিসাবে শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট ঋণ ৪৯.৪৫ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৩ লাখ, সেই হিসাবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ২৯২.১১ ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয়গুণ বেশি। করোনা মহামারিতে শ্রীলঙ্কার রেমিট্যান্স পৌঁছেছে তলানিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটির রেমিট্যান্স ছিল ৮.৫ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ছিল ২৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা শ্রীলঙ্কার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

রপ্তানি আয় কমে যাওয়াকে বিশেষজ্ঞরা শ্রীলংকার সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার রপ্তানি আয় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৩৮.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শ্রীলঙ্কার চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি। মার্চ ২০২২ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রিজার্ভের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৪৪.৪০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ শ্রীলঙ্কার চেয়ে ২২ গুণ বেশি। ‘অর্গানিক কৃষি’ চালুর কারণে শ্রীলঙ্কার কৃষিজ উৎপাদন কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রমেই খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে। শুধুমাত্র কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনের কারণেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চমক জাগানিয়া পতনের সম্ভাবনা খুব কম।

ভূ-রাজনীতির প্রভাব কোন দেশের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ অর্থনীতি কোন সংকটে পড়বে না। বিরাট জলাশয়ে যখন বাতাসের প্রাবল্যে ঢেউ ওঠে সে ঢেউয়ের প্রভাব জলাশয়ের কেন্দ্র থেকে শুরু করে জলাশয়ের তীর পর্যন্ত এসে পৌঁছায়। ইউক্রেন যুদ্ধের এই ক্রান্তি কালে দেশের সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজের সদস্য, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সকলে মিলে ইতিবাচক ভাবে যখন সরকারের নেয়া পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আর কী কী পদক্ষেপ যোগ করা যায় সেরকম পরামর্শ দেয়ার কথা ছিলো- সেই সময়ে অনেক রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের সদস্য যথাযথ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হচ্ছে না। বৈশ্বিক সংকটকে তারা সরকার পতনের সুযোগ হিসাবে বিবেচনা করছেন। জনগণের শক্তির ওপর আস্থা হারিয়ে বিশ্বসংকট প্রবল হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ভুল পদক্ষেপ নেবে, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট ঘনীভূত হবে এবং সেই সুযোগে তারা ক্ষমতায় আসীন হবেন, এরকম একটি অগণতান্ত্রিক এবং নিষ্ঠুর পথে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে।

যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অমঙ্গল কামনা করছেন, শুধুমাত্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য এবং তথ্য, উপাত্ত, যুক্তি ছাড়া কথা বলছেন তাদেরকে শ্রীলঙ্কার আজকের দুরবস্থার জন্য ২০১৯ সালের দুটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে বলি। এ দুটি ঘটনাকেই মূলত শ্রীলঙ্কার দুরবস্থার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১৯ সালে কলম্বোয় তিনটি হোটেল ও তিনটি গির্জায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটলে মৃত্যু হয় ২৫৩ জনের। এরপর শ্রীলঙ্কায় পর্যটন শিল্পে ধস নামা শুরু হয়। জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশ। তাতে করে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ বাড়ে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটান প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে নিজেই। জনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে এক ধাক্কায় মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য করেন। এর প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়ে। এক বছরেই দেশটির ভ্যাট আদায় কমে যায় প্রায় ৫০ শতাংশ। এর পরপরই শুরু হয় কোভিড সংক্রমণ। পরের দুই বছরে প্রবাসী আয়, পর্যটন, রপ্তানি- সবকিছুই কমে যায়।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকট ঘনীভূত হয়েছে অপ্রয়োজনীয়, অলাভজনক ঋণ গ্রহণের কারণে। গত দশ বছরের ঋণের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, চীনের কাছ থেকেই শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট ঋণের ১০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা চীনের কাছ থেকে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট (টাকা নিতে হলে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হবে সেই দেশ থেকে) ধরনের ঋণ নিয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের সুদের হার অনেক বেশি। সেসব ঋণ সুদে-আসলে পরিশোধ করতে গিয়েই এখন বিপদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। এদিকে বাংলাদেশের ছোট-বড় সব প্রকল্পেই কিন্তু বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, জাইকাসহ অন্য উন্নয়ন সংস্থার ঋণ এবং নিজের অর্থ যোগ করেছে। এসব সংস্থার সুদের হার খুবই কম। অনেক বছর ধরে শোধ করা যায়। কোনো কোনো ঋণ অবশ্য পরবর্তী সময়ে অনুদান হিসেবে অন্য প্রকল্পেও যোগ করে দেয়া হয়। বিশেষ করে জাইকার বেশির ভাগ ঋণের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়ে থাকে।

একসময় সামাজিক সূচকে শ্রীলঙ্কা ছিলো এ অঞ্চলের সেরা। শিক্ষার গুণাগুণেও ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় পোশাক খাতের রপ্তানি প্রথম শুরু হয়েছিল এই শ্রীলঙ্কা থেকেই। অনেক পর্যটকেরও পছন্দের জায়গা ছিল শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কার আজকের এই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার জন্য মূলত অদুরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি, পরিবার বা গোষ্ঠীতন্ত্রকে অনেকটা দায়ী করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নেয়া মেগাপ্রকল্প পদ্মাসেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, কোনটিকে অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না; বাংলাদেশের হাতে নেয়া প্রকল্পগুলো প্রতিটিই উৎপাদনের সঙ্গে সংযুক্ত। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সঙ্গে সঙ্গে রিটার্ন আসবে। দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। কর্মসংস্থান হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

আইএমএফের মতে, বৈদেশিক ঋণের হার জিডিপির ৫৫ শতাংশ বেশি হলে অর্থনীতিতে বিপদ ঘনিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের হার জিডিপির ১৩ শতাংশ, সুতরাং এক্ষেত্রেও আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধের দিক থেকে নিরাপদ অবস্থানে আছে। তবে বৈশ্বিক যে কোন বিষয় থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হলে একই রকম সংকটে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। মেগা প্রকল্প গ্রহণে আমাদের সতর্ক হতে হবে। প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করতে হবে, তবে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের ঋণ গ্রহণকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট রীতিতে কোন অবস্থাতেই ঋণ নেয়া যাবে না। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অতি সতর্ক হতে হবে। সর্বোপরি বৈশ্বিক সংকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন না।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শেখর ভট্টাচার্য

image

অর্থনৈতিক সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কাকে রাজনৈতিক সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে

বৃহস্পতিবার, ০৪ আগস্ট ২০২২

বাংলাদেশ দ্রুতই শ্রীলঙ্কায় পরিণত হতে যাচ্ছে- এ বিষয়টির পক্ষে নানারকম অপযুক্তি দিয়ে একশ্রেণীর মানুষ রাজপথ, টিভি টক শো, ইউটিউব চ্যানেল এবং সংবাদপত্রের পাতা সরগরম করে তুলছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের ইউটিউব চ্যানেলে একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আকারে ইঙ্গিতে বাংলাদেশ যে অচিরেই শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে- এ বিষয়ে তিনি প্রায় নিশ্চিত বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সরকার কেন এ বিষয়টিকে চেপে রাখছে- এজন্য তিনি হতাশা প্রকাশ করলেন বলে মনে হলো।

যে সময়ে কানাডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ভিজুয়াল ক্যাপিটালিস্ট’ তাদের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে জানিয়েছে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ৪১তম এবং এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, তখনই বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা হওয়ার স্লোগানকে আরও জোরদার করে তোলা হচ্ছে। ভিজুয়্যাল ক্যাপিটালিস্টের জরিপে দেখা যায় ১০৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক জিডিপির ভিত্তিতে ১৯১ দেশের তালিকায় ৩৯৭ বিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ৪১তম স্থানে। ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে তালিকায় ভারতের অবস্থান ছয়ে। এতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের জিডিপি”র আকার ৩৯৭ বিলিয়ন বা ৩৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র ভারতই বাংলাদেশের উপরে রয়েছে। দেশটির জিডিপির আকার ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার। বৈশ্বিক তালিকায় ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ। জিডিপির ভিত্তিতে শীর্ষ ৫০ দেশের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া আর কোন দেশ নেই।

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা হতেই পারে- তবে এ তুলনা করার সময় বিবেচনায় রাখতে হবে দুটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বাস্তব প্রেক্ষিতকে। মনে রাখতে হবে শ্রীলংকা ২০০৬ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধে যুক্ত ছিলো, সেই গৃহযুদ্ধের অবসানের পর থেকেই শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে ধস নামা শুরু হয়। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির তুলনামূলক অবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার মোট ঋণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু দেশটির মোট জনসংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ, সে হিসাবে শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট ঋণ ৪৯.৪৫ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৩ লাখ, সেই হিসাবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ২৯২.১১ ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয়গুণ বেশি। করোনা মহামারিতে শ্রীলঙ্কার রেমিট্যান্স পৌঁছেছে তলানিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটির রেমিট্যান্স ছিল ৮.৫ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ছিল ২৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা শ্রীলঙ্কার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

রপ্তানি আয় কমে যাওয়াকে বিশেষজ্ঞরা শ্রীলংকার সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার রপ্তানি আয় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৩৮.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শ্রীলঙ্কার চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি। মার্চ ২০২২ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রিজার্ভের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৪৪.৪০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ শ্রীলঙ্কার চেয়ে ২২ গুণ বেশি। ‘অর্গানিক কৃষি’ চালুর কারণে শ্রীলঙ্কার কৃষিজ উৎপাদন কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রমেই খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে। শুধুমাত্র কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনের কারণেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চমক জাগানিয়া পতনের সম্ভাবনা খুব কম।

ভূ-রাজনীতির প্রভাব কোন দেশের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ অর্থনীতি কোন সংকটে পড়বে না। বিরাট জলাশয়ে যখন বাতাসের প্রাবল্যে ঢেউ ওঠে সে ঢেউয়ের প্রভাব জলাশয়ের কেন্দ্র থেকে শুরু করে জলাশয়ের তীর পর্যন্ত এসে পৌঁছায়। ইউক্রেন যুদ্ধের এই ক্রান্তি কালে দেশের সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজের সদস্য, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সকলে মিলে ইতিবাচক ভাবে যখন সরকারের নেয়া পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আর কী কী পদক্ষেপ যোগ করা যায় সেরকম পরামর্শ দেয়ার কথা ছিলো- সেই সময়ে অনেক রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের সদস্য যথাযথ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হচ্ছে না। বৈশ্বিক সংকটকে তারা সরকার পতনের সুযোগ হিসাবে বিবেচনা করছেন। জনগণের শক্তির ওপর আস্থা হারিয়ে বিশ্বসংকট প্রবল হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ভুল পদক্ষেপ নেবে, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট ঘনীভূত হবে এবং সেই সুযোগে তারা ক্ষমতায় আসীন হবেন, এরকম একটি অগণতান্ত্রিক এবং নিষ্ঠুর পথে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে।

যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অমঙ্গল কামনা করছেন, শুধুমাত্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য এবং তথ্য, উপাত্ত, যুক্তি ছাড়া কথা বলছেন তাদেরকে শ্রীলঙ্কার আজকের দুরবস্থার জন্য ২০১৯ সালের দুটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে বলি। এ দুটি ঘটনাকেই মূলত শ্রীলঙ্কার দুরবস্থার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১৯ সালে কলম্বোয় তিনটি হোটেল ও তিনটি গির্জায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটলে মৃত্যু হয় ২৫৩ জনের। এরপর শ্রীলঙ্কায় পর্যটন শিল্পে ধস নামা শুরু হয়। জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশ। তাতে করে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ বাড়ে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটান প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে নিজেই। জনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে এক ধাক্কায় মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য করেন। এর প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়ে। এক বছরেই দেশটির ভ্যাট আদায় কমে যায় প্রায় ৫০ শতাংশ। এর পরপরই শুরু হয় কোভিড সংক্রমণ। পরের দুই বছরে প্রবাসী আয়, পর্যটন, রপ্তানি- সবকিছুই কমে যায়।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকট ঘনীভূত হয়েছে অপ্রয়োজনীয়, অলাভজনক ঋণ গ্রহণের কারণে। গত দশ বছরের ঋণের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, চীনের কাছ থেকেই শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট ঋণের ১০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা চীনের কাছ থেকে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট (টাকা নিতে হলে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হবে সেই দেশ থেকে) ধরনের ঋণ নিয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের সুদের হার অনেক বেশি। সেসব ঋণ সুদে-আসলে পরিশোধ করতে গিয়েই এখন বিপদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। এদিকে বাংলাদেশের ছোট-বড় সব প্রকল্পেই কিন্তু বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, জাইকাসহ অন্য উন্নয়ন সংস্থার ঋণ এবং নিজের অর্থ যোগ করেছে। এসব সংস্থার সুদের হার খুবই কম। অনেক বছর ধরে শোধ করা যায়। কোনো কোনো ঋণ অবশ্য পরবর্তী সময়ে অনুদান হিসেবে অন্য প্রকল্পেও যোগ করে দেয়া হয়। বিশেষ করে জাইকার বেশির ভাগ ঋণের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়ে থাকে।

একসময় সামাজিক সূচকে শ্রীলঙ্কা ছিলো এ অঞ্চলের সেরা। শিক্ষার গুণাগুণেও ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় পোশাক খাতের রপ্তানি প্রথম শুরু হয়েছিল এই শ্রীলঙ্কা থেকেই। অনেক পর্যটকেরও পছন্দের জায়গা ছিল শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কার আজকের এই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার জন্য মূলত অদুরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি, পরিবার বা গোষ্ঠীতন্ত্রকে অনেকটা দায়ী করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নেয়া মেগাপ্রকল্প পদ্মাসেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, কোনটিকে অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না; বাংলাদেশের হাতে নেয়া প্রকল্পগুলো প্রতিটিই উৎপাদনের সঙ্গে সংযুক্ত। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সঙ্গে সঙ্গে রিটার্ন আসবে। দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। কর্মসংস্থান হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

আইএমএফের মতে, বৈদেশিক ঋণের হার জিডিপির ৫৫ শতাংশ বেশি হলে অর্থনীতিতে বিপদ ঘনিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের হার জিডিপির ১৩ শতাংশ, সুতরাং এক্ষেত্রেও আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধের দিক থেকে নিরাপদ অবস্থানে আছে। তবে বৈশ্বিক যে কোন বিষয় থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হলে একই রকম সংকটে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। মেগা প্রকল্প গ্রহণে আমাদের সতর্ক হতে হবে। প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করতে হবে, তবে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের ঋণ গ্রহণকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট রীতিতে কোন অবস্থাতেই ঋণ নেয়া যাবে না। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অতি সতর্ক হতে হবে। সর্বোপরি বৈশ্বিক সংকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন না।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

back to top