alt

উপ-সম্পাদকীয়

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, হিন্দু রাষ্ট্রের লক্ষ্যে নয়া কৌশল

গৌতম রায়

: শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই তথাকথিত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ স্থাপনের উদ্দেশ্যে যেসব কর্মসূচির ওপর আরএসএস সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তার ভেতর অন্যতম হলো ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’। নরেন্দ্র মোদি একক গরিষ্ঠতায় আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে দুই দফায় সাউথ ব্লকে অধিষ্ঠিত করবার পর ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ লক্ষ্যে প্রধান দুটি কর্মসূচি- ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি; সেই দুটি কাজ ইতোমধ্যেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি করে ফেলেছে। তাই গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির এখন সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতাকে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদে পরিণত করে এমএস গোলওয়ালকরের ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ কায়েম করতে চায়। তাদের এই নয়া ‘রাষ্ট্রবাদী’ তত্ত্বের মূল কথাই হলো মুসলমান মুক্ত ভারত। সেই লক্ষ্যেই নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন, সিএএ, এনআরসি। এই কর্মসূচিকে সফল করতেই তাই এখন প্রথমে গুজরাট, ত্রিপুরাসহ অন্য রাজ্যগুলোর বিধানসভার ভোটকে সামনে রাখলেও মূল টার্গেট হিসেবে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে শোরগোল ফেলে সামাজিক মেরুকরণকে আরও তীব্র, তীক্ষè করে তুলতে চায় গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির।

গুজরাট বিধানসভা ভোটের ঘোষণা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষামাত্র। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হওয়ার আগে গুজরাটের বিজেপি সরকার বিভাজনের তাসটিকে জোরদার করতে সেই রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি জারি করবার উদ্দেশে একটি কমিটি তৈরি করে। প্রশ্ন হলো- যে আইন চালু করতে সংবিধানের উভয় সভার সম্মতি ক্রমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, সেই আইন জারির বিষয়ে একটি রাজ্য সরকারের কি করণীয় থাকে? সংবিধান সংশোধন সংসদের দুই কক্ষ, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাষ্ট্রপতির এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। সেখানে একটি রাজ্য সরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমিটি তৈরি করে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া ছাড়া আর কি করতে পারে?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধির নামে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের মূল আক্রমণস্থল হল মুসলিম ব্যক্তিগত আইন। ভারতের মুসলমান সমাজ যে ব্যক্তিগত আইনের আওতাভুক্ত রয়েছেন, সেটা তাদের প্রতি রাষ্ট্রকর্তৃক বিশেষ কোনো সুযোগ বা সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়। এমন ও নয় যে, এই ব্যক্তিগত আইনের ভিতর দিয়ে মুসলমান সমাজের প্রতি রাষ্ট্র কোনো অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে বা করুণা প্রদর্শন করছে।

‘৪৭ সালে ব্রিটিশের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরকালে যে চুক্তি ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ব্রিটিশের হয়েছিল, সেই চুক্তিতেই মুসলমান সমাজের ব্যক্তিগত আইনগুলো সেই সময়ে যে অবস্থায় রয়েছে, ঠিক সেই অবস্থাতেই স্বাধীন ভারতেও রক্ষিত হবে এই কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছিল। ব্রিটিশের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে চুক্তি, সেই চুক্তিই কিন্তু স্বাধীন ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তি। আজ যদি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির নামে মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইনগুলো নাকচ করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তরের সেই চুক্তিকেই অস্বীকার করা হবে, অস্বীকার করা হবে দেশের সংবিধানকে। সংবিধানের নামে মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেওয়া একটি নির্বাচিত সরকারের কি সেই কাজ করবার এখতিয়ার আছে?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি- এই সাম্প্রদায়িক কর্মসূচিটা গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির স্বাধীনতার পর থেকে এমন ভাবে তুলে ধরেছে যার ফলে সাধারণ মানুষ, যাদের ভিতরে তেমন একটা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নেই, তাদের কেউ ভুল পথে পরিচালিত করে মুসলমানবিদ্বেষী করে তোলা হচ্ছে। ভারতে ফৌজদারি ক্ষেত্রে বিচারের ক্ষেত্রে অভিন্ন বিধি রয়েছে, অথচ আর আরএসএস, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিসহ তাদের সবরকমের সহযোগী সংগঠন প্রথাগত শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মানুষদের ভিতরে প্রচার করে যে, ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রে ও মুসলমানেরা বিশেষ সুযোগ পায়। এভাবেই অতি সাধারণ মানুষদের ভিতরে তারা মুসলমান বিদ্বেষের হলাহল ঢুকিয়ে দেয়।

মুসলমান ব্যক্তিগত আইনকে বিকৃতভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরে মুসলমানদের বহু বিবাহ, সেখান থেকে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, এভাবেই ভারতে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে- এসব আজগুবি, মনগড়া, অবৈজ্ঞানিক কথা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির বলে থাকে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ রোধে পন্ডিত জওহরলাল নেহরু যখন হিন্দু কোড বিল আনেন এবং বামপন্থিদের সমর্থনে সেটিকে আইনে পরিণত করেন, তখন গোটা পরিকল্পনার সবথেকে বিরোধিতা করেছিল আরএসএস তাদের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা এবং ভারতীয় জনসঙ্ঘ। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে হিন্দু কোড বিলের সমর্থনে সমাজসেবী রেণুকা রায়েরা সরোজিনী নাইডুর একটি সভার আয়োজন করেছিলেন। সেই সভা গুন্ডা দিয়ে ভন্ডুল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইনের যে বিষয়গুলি ঘিরে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির এত সোচ্চার,তার আসল জায়গাটা হলো- মুসলমানদের বহু বিবাহ ঘিরে অসত্য প্রচার। আজ ভারতের মুসলমান সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভিতরে বহু বিবাহের রেওয়াজ প্রায় নেই-ই। অথচ এই মুসলমানের বহু বিবাহের কথা বলে গ্রামাঞ্চলে, প্রথাগত শিক্ষা না পাওয়া মানুষদের ভিতরে একটা যৌন ঈর্ষা জাগিয়ে তাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে কোথাও আরএসএস সরাসরি, কোথাও বা তাদের হাজার রকমের শাখা সংগঠনগুলো, আর এ কাজে একেবারে সিদ্ধহস্ত হলো আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি। আট-নয়ের দশকে আরএসএসের শাখা সংগঠন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ভুক্ত স্বঘোষিত তথাকথিত সাধুসন্তেরা এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি জানিয়ে মুসলমানদের বহুবিবাহের সুবাদে হিন্দুদের বহু বিবাহ পুনরায় চালুর দাবি পর্যন্ত তুলতে শুরু করেছিল। পুরীর সেই সময়ের শঙ্করাচার্য নিশ্চলানন্দ, যে মেয়েদের বেদপাঠের অধিকার ঘিরে প্রশ্ন তুলে নিজের সস্তার জনপ্রিয়তা এনেছিল, সে হিন্দু পুরুষের বহু বিবাহের জন্যে রীতিমতো সাওয়াল করেছিল। আজ ও সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা সংগঠনে এবং আরএসএসের ‘শাখা’তে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে এই বহুবিবাহ এবং হিন্দু পুরুষের অধিক পুত্রসন্তান উৎপাদনের পক্ষে জনমত গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

পবিত্র ইসলাম বিশ্বাসীদের আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে, বিশেষ করে নারীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে যে আধুনিক অবস্থান নিয়েছে, বিশ্বের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে তা পাওয়া যায় না। পবিত্র ইসলাম মেয়েদের স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত হলে একতরফাভাবে তালাক দেওয়ার অধিকার পর্যন্ত দিয়েছে (সুরা আলবাকারা, আয়াত-২২৭,২২৮)। এ অধিকার বিশ্বের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নারীকে দেয়নি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিবাহে স্ত্রী ধন হিসেবে মুসলমান নারীর, দেনমোহরের যে অধিকার, বিবাহে সম্মতিতে ‘কবুল’ করবার যে অধিকার, তা দেয়নি।

গভীর পরিতাপের বিষয় পবিত্র ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে, সমাজের একটা অংশের মানুষ, মোল্লাতন্ত্রের নামে সেই অধিকার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বঞ্চিত করে চলেছে যুগে যুগে, দেশে দেশে। তার দায় কেন পবিত্র ইসলামের হবে? তার দায় পবিত্র ইসলামের নামে যারা অনৈসলামিক বিষয় চাপিয়ে দিয়ে হজরত মহম্মদ (সা.)-এর উদার, বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাধারাকে ভুলভাবে উপস্থাপিত করে তাদের। আর এসব বিকৃত ব্যাখ্যাকারদের ভাবনাগুলোকেই পবিত্র ইসলামের নির্যাস হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ হিন্দু সমাজের কাছে মুসলমান জনজীবন সম্পর্কে একটা অসত্য, বিকৃত ধারণা তুলে ধরতে চায় গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির।

মুসলমানকে নারীবিদ্বেষী, নারীর ওপর অত্যাচারকারী হিসেবে দেখানো ভারতে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোকেদের স্বভাবজাত মনোবৃত্তি। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাৎক্ষণিক তিন তালাকের বিকৃত উপস্থাপনা করে মুসলমান নারীর প্রতি সহানুভূতির নাম করে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অসত্য উপস্থাপনার ভিতর দিয়ে আরএসএসের এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির রাজনৈতিক কর্মসূচি রাষ্ট্র কর্তৃক শুরু হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আটের দশকে শাহবানু মামলার কালে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে সেই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা একাধিকবার ‘মুসলমান’ শব্দটা তাদের লিখিত রায়ে রেখেছিলেন। প্রশ্ন হলো- হিন্দু সমাজে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর যন্ত্রণা কি তখন কিছু কম ছিল, না আজ কম আছে? কল্যাণী দত্তের ‘পিঞ্জরে বসিয়া’ পড়লেই বোঝা যায় শ্রেণী বিভক্ত সমাজে হিন্দু বিধবা এবং স্বামী পরিত্যক্তাদের যন্ত্রণাটি কোন পর্যায়ের ছিল।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির হিন্দু সমাজকে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে নিত্যনতুন কৌশলে ক্ষেপিয়ে তুলতে ইউনিফর্ম সিভিল কোডকে হাতিয়ার করেছে। কিন্তু মুসলমান সমাজে এ ব্যক্তিগত আইনের নিরাখেই স্বামী পরিত্যক্তা বা বিধবা নারীদের আজ ও সসম্মানে বাপের বাড়িতে রাখবার অনবদ্য প্রথা আছে, সে সম্পর্কে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির কিন্তু নীরব। আজ যদি বাংলার বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে সমীক্ষা চালানো হয়, অসহায় পিতামাতাকে উপার্জনক্ষম মুসলমান সন্তান ওন্ড এজ হোমে রেখে গেছে, হিন্দু সমাজের তুলনায় তার ছবিটা খুবই কম দেখা যাবে। মুসলিম ব্যক্তিগত আইন আজ ও মুসলমানের সামাজিক জীবনে, ব্যক্তি জীবনে সেই সমাজবদ্ধতা রেখেছে, যেখানে হিন্দু সমাজ অতীতে যেমন অসহায় নারীকে বেনারস, বৃন্দাবন ইত্যাদি তীর্থে পাঠাত, এখন বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, মুসলমান সমাজ কিন্তু পরিবারের অসহায় নারীকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাথায় করে রাখে।

নরেন্দ্র মোদি একক গরিষ্ঠতায় আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে দুই দফায় সাউথ ব্লকে অধিষ্ঠিত করবার পর ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ লক্ষ্যে প্রধান দুটি কর্মসূচি- ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি; সেই দুটি কাজ ইতোমধ্যেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি করে ফেলেছে

ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ কি কেবল মুসলমানই পায়? হিন্দুরা পায় না? যদি হিন্দুরা ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ নাই পেত, তাহলে আজও কেন হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সমতা নেই? ভৌগোলিক এলাকা বিশেষে একাংশের হিন্দু উত্তরাধিকারের প্রশ্নে মানছে মিতাক্ষরা, আবার সেই ভূগোলের দোহাই দিয়েই কেন অপর প্রান্তের হিন্দুর উত্তরাধিকার নির্ধারিত হচ্ছে দায়ভাগের দ্বারা? এ তো পিতার সম্পত্তি থেকে মেয়ে বঞ্চিত করবার রাজনৈতিক হিন্দু কৌশল, যুগ যুগ ধরে চলে আসা শয়তানি। কেন হিন্দুদের অভিন্ন উত্তরাধিকার আইনের দাবি তুলবার মুরোদ আরএসএসের নেই? পুরুষতন্ত্রের রাশ আলগা হয়ে পড়বার ভয় পাচ্ছে আরএসএস-বিজেপি?

এখানেই শেষ নয়। আজও হিন্দুদের উত্তরাধিকার আইনে ‘আবিভক্ত হিন্দু পরিবার আইন’-এর মতো চরম লিঙ্গবিভাজনবাদী আইন আছে। এ আইনের জেরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের পিতার সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। অসহায়, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা পরিবারের নারীদের বিনাপয়সার নফরানীতে পরিণত করে। এসব সম্পর্কে কি অভিন্ন দেওয়ানী বিধির দাবিদার আরএসএস-বিজেপি আর তাদের সঙ্গী-সাথীরা একবার সোচ্চার হয়েছে? ভুলে গেলে চলবে না, এনডিএর যে নির্বাচনী ইশতেহারে বিজেপির সঙ্গেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সম্মতি জানিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন, সেই ইশতেহারেও বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দির, ৩৭০ ধারার বিলোপ আর অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা ছিল। আরএসএসের হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে এসব রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে তিনি সহমত নন- এ কথা কিন্তু আজ পর্যন্ত মমতা একটিবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

ছবি

বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে দেশ

বিএনপি নেতৃত্বের সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই দক্ষ জনসম্পদ

ছবি

অঙ্গদানের অনন্য উদাহরণ

মডেল গ্রাম মুশুদ্দির গল্প

ফাইভ-জি : ডিজিটাল শিল্পযুগের মহাসড়ক

ছবি

স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ছবি

দক্ষিণডিহির স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম জরুরি

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান আর কতকাল

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রধান উপাদান

নিয়মের বেড়াজালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’

নতুন কারিকুলামে বিজ্ঞান শিক্ষা

নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা

খেলার মাঠের বিকল্প নেই

কেমন আছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়

কিছু মানুষের কারণে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, হিন্দু রাষ্ট্রের লক্ষ্যে নয়া কৌশল

গৌতম রায়

শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই তথাকথিত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ স্থাপনের উদ্দেশ্যে যেসব কর্মসূচির ওপর আরএসএস সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তার ভেতর অন্যতম হলো ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’। নরেন্দ্র মোদি একক গরিষ্ঠতায় আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে দুই দফায় সাউথ ব্লকে অধিষ্ঠিত করবার পর ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ লক্ষ্যে প্রধান দুটি কর্মসূচি- ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি; সেই দুটি কাজ ইতোমধ্যেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি করে ফেলেছে। তাই গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির এখন সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতাকে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদে পরিণত করে এমএস গোলওয়ালকরের ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ কায়েম করতে চায়। তাদের এই নয়া ‘রাষ্ট্রবাদী’ তত্ত্বের মূল কথাই হলো মুসলমান মুক্ত ভারত। সেই লক্ষ্যেই নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন, সিএএ, এনআরসি। এই কর্মসূচিকে সফল করতেই তাই এখন প্রথমে গুজরাট, ত্রিপুরাসহ অন্য রাজ্যগুলোর বিধানসভার ভোটকে সামনে রাখলেও মূল টার্গেট হিসেবে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে শোরগোল ফেলে সামাজিক মেরুকরণকে আরও তীব্র, তীক্ষè করে তুলতে চায় গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির।

গুজরাট বিধানসভা ভোটের ঘোষণা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষামাত্র। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হওয়ার আগে গুজরাটের বিজেপি সরকার বিভাজনের তাসটিকে জোরদার করতে সেই রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি জারি করবার উদ্দেশে একটি কমিটি তৈরি করে। প্রশ্ন হলো- যে আইন চালু করতে সংবিধানের উভয় সভার সম্মতি ক্রমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, সেই আইন জারির বিষয়ে একটি রাজ্য সরকারের কি করণীয় থাকে? সংবিধান সংশোধন সংসদের দুই কক্ষ, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাষ্ট্রপতির এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। সেখানে একটি রাজ্য সরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমিটি তৈরি করে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া ছাড়া আর কি করতে পারে?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধির নামে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের মূল আক্রমণস্থল হল মুসলিম ব্যক্তিগত আইন। ভারতের মুসলমান সমাজ যে ব্যক্তিগত আইনের আওতাভুক্ত রয়েছেন, সেটা তাদের প্রতি রাষ্ট্রকর্তৃক বিশেষ কোনো সুযোগ বা সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়। এমন ও নয় যে, এই ব্যক্তিগত আইনের ভিতর দিয়ে মুসলমান সমাজের প্রতি রাষ্ট্র কোনো অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে বা করুণা প্রদর্শন করছে।

‘৪৭ সালে ব্রিটিশের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরকালে যে চুক্তি ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ব্রিটিশের হয়েছিল, সেই চুক্তিতেই মুসলমান সমাজের ব্যক্তিগত আইনগুলো সেই সময়ে যে অবস্থায় রয়েছে, ঠিক সেই অবস্থাতেই স্বাধীন ভারতেও রক্ষিত হবে এই কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছিল। ব্রিটিশের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে চুক্তি, সেই চুক্তিই কিন্তু স্বাধীন ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তি। আজ যদি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির নামে মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইনগুলো নাকচ করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তরের সেই চুক্তিকেই অস্বীকার করা হবে, অস্বীকার করা হবে দেশের সংবিধানকে। সংবিধানের নামে মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেওয়া একটি নির্বাচিত সরকারের কি সেই কাজ করবার এখতিয়ার আছে?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি- এই সাম্প্রদায়িক কর্মসূচিটা গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির স্বাধীনতার পর থেকে এমন ভাবে তুলে ধরেছে যার ফলে সাধারণ মানুষ, যাদের ভিতরে তেমন একটা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নেই, তাদের কেউ ভুল পথে পরিচালিত করে মুসলমানবিদ্বেষী করে তোলা হচ্ছে। ভারতে ফৌজদারি ক্ষেত্রে বিচারের ক্ষেত্রে অভিন্ন বিধি রয়েছে, অথচ আর আরএসএস, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিসহ তাদের সবরকমের সহযোগী সংগঠন প্রথাগত শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মানুষদের ভিতরে প্রচার করে যে, ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রে ও মুসলমানেরা বিশেষ সুযোগ পায়। এভাবেই অতি সাধারণ মানুষদের ভিতরে তারা মুসলমান বিদ্বেষের হলাহল ঢুকিয়ে দেয়।

মুসলমান ব্যক্তিগত আইনকে বিকৃতভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরে মুসলমানদের বহু বিবাহ, সেখান থেকে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, এভাবেই ভারতে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে- এসব আজগুবি, মনগড়া, অবৈজ্ঞানিক কথা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির বলে থাকে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ রোধে পন্ডিত জওহরলাল নেহরু যখন হিন্দু কোড বিল আনেন এবং বামপন্থিদের সমর্থনে সেটিকে আইনে পরিণত করেন, তখন গোটা পরিকল্পনার সবথেকে বিরোধিতা করেছিল আরএসএস তাদের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা এবং ভারতীয় জনসঙ্ঘ। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে হিন্দু কোড বিলের সমর্থনে সমাজসেবী রেণুকা রায়েরা সরোজিনী নাইডুর একটি সভার আয়োজন করেছিলেন। সেই সভা গুন্ডা দিয়ে ভন্ডুল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইনের যে বিষয়গুলি ঘিরে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির এত সোচ্চার,তার আসল জায়গাটা হলো- মুসলমানদের বহু বিবাহ ঘিরে অসত্য প্রচার। আজ ভারতের মুসলমান সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভিতরে বহু বিবাহের রেওয়াজ প্রায় নেই-ই। অথচ এই মুসলমানের বহু বিবাহের কথা বলে গ্রামাঞ্চলে, প্রথাগত শিক্ষা না পাওয়া মানুষদের ভিতরে একটা যৌন ঈর্ষা জাগিয়ে তাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে কোথাও আরএসএস সরাসরি, কোথাও বা তাদের হাজার রকমের শাখা সংগঠনগুলো, আর এ কাজে একেবারে সিদ্ধহস্ত হলো আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি। আট-নয়ের দশকে আরএসএসের শাখা সংগঠন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ভুক্ত স্বঘোষিত তথাকথিত সাধুসন্তেরা এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি জানিয়ে মুসলমানদের বহুবিবাহের সুবাদে হিন্দুদের বহু বিবাহ পুনরায় চালুর দাবি পর্যন্ত তুলতে শুরু করেছিল। পুরীর সেই সময়ের শঙ্করাচার্য নিশ্চলানন্দ, যে মেয়েদের বেদপাঠের অধিকার ঘিরে প্রশ্ন তুলে নিজের সস্তার জনপ্রিয়তা এনেছিল, সে হিন্দু পুরুষের বহু বিবাহের জন্যে রীতিমতো সাওয়াল করেছিল। আজ ও সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা সংগঠনে এবং আরএসএসের ‘শাখা’তে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে এই বহুবিবাহ এবং হিন্দু পুরুষের অধিক পুত্রসন্তান উৎপাদনের পক্ষে জনমত গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

পবিত্র ইসলাম বিশ্বাসীদের আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে, বিশেষ করে নারীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে যে আধুনিক অবস্থান নিয়েছে, বিশ্বের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে তা পাওয়া যায় না। পবিত্র ইসলাম মেয়েদের স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত হলে একতরফাভাবে তালাক দেওয়ার অধিকার পর্যন্ত দিয়েছে (সুরা আলবাকারা, আয়াত-২২৭,২২৮)। এ অধিকার বিশ্বের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নারীকে দেয়নি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিবাহে স্ত্রী ধন হিসেবে মুসলমান নারীর, দেনমোহরের যে অধিকার, বিবাহে সম্মতিতে ‘কবুল’ করবার যে অধিকার, তা দেয়নি।

গভীর পরিতাপের বিষয় পবিত্র ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে, সমাজের একটা অংশের মানুষ, মোল্লাতন্ত্রের নামে সেই অধিকার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বঞ্চিত করে চলেছে যুগে যুগে, দেশে দেশে। তার দায় কেন পবিত্র ইসলামের হবে? তার দায় পবিত্র ইসলামের নামে যারা অনৈসলামিক বিষয় চাপিয়ে দিয়ে হজরত মহম্মদ (সা.)-এর উদার, বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাধারাকে ভুলভাবে উপস্থাপিত করে তাদের। আর এসব বিকৃত ব্যাখ্যাকারদের ভাবনাগুলোকেই পবিত্র ইসলামের নির্যাস হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ হিন্দু সমাজের কাছে মুসলমান জনজীবন সম্পর্কে একটা অসত্য, বিকৃত ধারণা তুলে ধরতে চায় গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির।

মুসলমানকে নারীবিদ্বেষী, নারীর ওপর অত্যাচারকারী হিসেবে দেখানো ভারতে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোকেদের স্বভাবজাত মনোবৃত্তি। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাৎক্ষণিক তিন তালাকের বিকৃত উপস্থাপনা করে মুসলমান নারীর প্রতি সহানুভূতির নাম করে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অসত্য উপস্থাপনার ভিতর দিয়ে আরএসএসের এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির রাজনৈতিক কর্মসূচি রাষ্ট্র কর্তৃক শুরু হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আটের দশকে শাহবানু মামলার কালে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে সেই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা একাধিকবার ‘মুসলমান’ শব্দটা তাদের লিখিত রায়ে রেখেছিলেন। প্রশ্ন হলো- হিন্দু সমাজে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর যন্ত্রণা কি তখন কিছু কম ছিল, না আজ কম আছে? কল্যাণী দত্তের ‘পিঞ্জরে বসিয়া’ পড়লেই বোঝা যায় শ্রেণী বিভক্ত সমাজে হিন্দু বিধবা এবং স্বামী পরিত্যক্তাদের যন্ত্রণাটি কোন পর্যায়ের ছিল।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির হিন্দু সমাজকে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে নিত্যনতুন কৌশলে ক্ষেপিয়ে তুলতে ইউনিফর্ম সিভিল কোডকে হাতিয়ার করেছে। কিন্তু মুসলমান সমাজে এ ব্যক্তিগত আইনের নিরাখেই স্বামী পরিত্যক্তা বা বিধবা নারীদের আজ ও সসম্মানে বাপের বাড়িতে রাখবার অনবদ্য প্রথা আছে, সে সম্পর্কে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির কিন্তু নীরব। আজ যদি বাংলার বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে সমীক্ষা চালানো হয়, অসহায় পিতামাতাকে উপার্জনক্ষম মুসলমান সন্তান ওন্ড এজ হোমে রেখে গেছে, হিন্দু সমাজের তুলনায় তার ছবিটা খুবই কম দেখা যাবে। মুসলিম ব্যক্তিগত আইন আজ ও মুসলমানের সামাজিক জীবনে, ব্যক্তি জীবনে সেই সমাজবদ্ধতা রেখেছে, যেখানে হিন্দু সমাজ অতীতে যেমন অসহায় নারীকে বেনারস, বৃন্দাবন ইত্যাদি তীর্থে পাঠাত, এখন বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, মুসলমান সমাজ কিন্তু পরিবারের অসহায় নারীকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাথায় করে রাখে।

নরেন্দ্র মোদি একক গরিষ্ঠতায় আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে দুই দফায় সাউথ ব্লকে অধিষ্ঠিত করবার পর ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ লক্ষ্যে প্রধান দুটি কর্মসূচি- ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি; সেই দুটি কাজ ইতোমধ্যেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি করে ফেলেছে

ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ কি কেবল মুসলমানই পায়? হিন্দুরা পায় না? যদি হিন্দুরা ব্যক্তিগত আইনের সুযোগ নাই পেত, তাহলে আজও কেন হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সমতা নেই? ভৌগোলিক এলাকা বিশেষে একাংশের হিন্দু উত্তরাধিকারের প্রশ্নে মানছে মিতাক্ষরা, আবার সেই ভূগোলের দোহাই দিয়েই কেন অপর প্রান্তের হিন্দুর উত্তরাধিকার নির্ধারিত হচ্ছে দায়ভাগের দ্বারা? এ তো পিতার সম্পত্তি থেকে মেয়ে বঞ্চিত করবার রাজনৈতিক হিন্দু কৌশল, যুগ যুগ ধরে চলে আসা শয়তানি। কেন হিন্দুদের অভিন্ন উত্তরাধিকার আইনের দাবি তুলবার মুরোদ আরএসএসের নেই? পুরুষতন্ত্রের রাশ আলগা হয়ে পড়বার ভয় পাচ্ছে আরএসএস-বিজেপি?

এখানেই শেষ নয়। আজও হিন্দুদের উত্তরাধিকার আইনে ‘আবিভক্ত হিন্দু পরিবার আইন’-এর মতো চরম লিঙ্গবিভাজনবাদী আইন আছে। এ আইনের জেরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের পিতার সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। অসহায়, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা পরিবারের নারীদের বিনাপয়সার নফরানীতে পরিণত করে। এসব সম্পর্কে কি অভিন্ন দেওয়ানী বিধির দাবিদার আরএসএস-বিজেপি আর তাদের সঙ্গী-সাথীরা একবার সোচ্চার হয়েছে? ভুলে গেলে চলবে না, এনডিএর যে নির্বাচনী ইশতেহারে বিজেপির সঙ্গেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সম্মতি জানিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন, সেই ইশতেহারেও বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দির, ৩৭০ ধারার বিলোপ আর অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা ছিল। আরএসএসের হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে এসব রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে তিনি সহমত নন- এ কথা কিন্তু আজ পর্যন্ত মমতা একটিবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

back to top