alt

উপ-সম্পাদকীয়

নেতৃত্বের অন্তর্নিহিত অর্থেই নেতার যোগ্যতা

মাহমুদুল হাছান

: সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২

নেতৃত্ব যা ইংরেজিতে লিডারশিপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোন জাতি, গোষ্ঠী বা দলকে পরিচালনা করার এক অনন্য দক্ষতা হলো নেতৃত্ব। অফিস বা কোন দপ্তর পরিচালনা করতে নেতৃত্বের কথাটি বেশ পরিচিত। নেতৃত্বের সম্পূরক দক্ষতা হিসেবে আরেকটি পরিভাষাও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেটি হলো ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট। আধুনিক অফিস পরিচালনা কৌশলে ‘ব্যবস্থাপনা’ শব্দটি থেকে ‘নেতৃত্ব’ শব্দটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও বহুল ব্যবহৃত। কারণ ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজমেন্ট) ও নেতৃত্ব (লিডারশিপ) কথা দুটির মধ্যে প্রায়গিক অর্থে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা অঙ্গনে খ্যাত ব্যবস্থাপনা কোচ এবং লেখক পিটার এফ ড্রাকার যথার্থই বলেছেন-‘ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার সঠিকভাবে কাজটি করেন আর নেতা বা লিডার সঠিক কাজটি করেন।’ এটি বিশ্বাস করা হয় যে একজন ভালো নেতা সর্বদা একজন ভালো ব্যবস্থাপক হয়ে থাকেন, কিন্তু একজন ভালো ব্যবস্থাপক সর্বদা একজন ভালো নেতা নাও হতে পারেন।

অতএব পরিচালনা পদ্ধতিতে নেতৃত্ব বা লিডারশিপ একটি গ্রহণযোগ্য গুণের নাম যা সমাজ ও জাতি গঠনে বেশ কার্যকর। নেতৃত্ব হলো একজন ব্যক্তির গুণ বা দক্ষতা যা ব্যক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে, তাদের অনুপ্রাণিত করতে এবং তাদের প্রতি আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই নেতৃত্ব গুণ যার মধ্যে আছে তিনি নেতা হিসাবে পরিচিত হন এবং তিনি তার এ দক্ষতা দিয়ে সমাজের অনেক ভালো ভালো পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

অক্সফোর্ড অভিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, সহজ কথায় নেতৃত্ব হলো ঝুঁকি নেওয়া এবং যেকোন পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। নেতারা অন্যদের নতুন এবং ভালো কিছু অর্জন করতে অনুপ্রাণিত করেন। নেতারা উদ্ভাবনের জন্য যে পরিকল্পনা করে থাকেন তা বাস্তবায়নের সকল ব্যবস্থাও নিয়ে থাকেন। তারা সেগুলো করে দায়িত্ববোধ থেকে, বাধ্যবাধকতা হিসাবে নয়। তারা দলের অর্জন এবং শেখার দিকটি বিবেচনা করে সাফল্য পরিমাপ করেন।

নেতৃত্ব হলো সেই ক্ষমতা যা সময়ের সাথে বিকশিত হয় এবং সেটি কেউ কাউকে শেখাতে পারে না, তবে অনুশীলন করে তা অর্জন করতে হয়। নেতৃত্বের গুণটি যাদের মধ্যে আছে, কার্যকরভাবে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা মানুষকে প্রভাবিত করে। অন্য কথায়, এটি এমন সক্ষমতা যা দৃষ্টিকে বাস্তবে পরিণত করে। একজন নেতা এমন একজন ব্যক্তি যিনি অনেক গুণের দ্বারা চিহ্নিত যেমন- দলবদ্ধ কাজ, কঠোর পরিশ্রম, শান্ত, নিঃস্বার্থ, সাহায্যকারী ও কষ্টসহিষ্ণু হওয়া।

একজন নেতা এমন একজন মানুষ যিনি সর্বদা তার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের জন্য চিন্তা করেন এবং যে কোন সমস্যার সমাধান আনতে একটি ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেন। একজন নেতা কখনই নেতিবাচক লোকের অনুসরণ করেন না, বরং তিনিই এমন একজন মানুষ হয়ে থাকেন, যিনি অন্যের ওপর প্রভাব তৈরি করার যোগ্যতা থাকার কারণে লোকেরা তাকে অনুসরণ করে।

অতীতের মহান নেতারা সর্বদা সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের কথা চিন্তা করেছেন। তারা সবসময় সমাজের বাস্তব উদাহরণ ও নিজস্ব অভ্যাস দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন এবং মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। যুগ যুগ ধরে দিবানিশি তারা কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও সহানুভূতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা আপন মহীমায় নিজেদের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একজন মহান নেতা সর্বদা জনগণকে ভালোর জন্য নেতৃত্ব দেন এবং মানুষের ভবিশ্যত গঠনে ব্রতী থাকেন। নেতৃত্ব আসলে কতিপয় গুণের সমষ্টি। একজন ভালো নেতার মধ্যে অবশ্যই কতকগুলো গুণ থাকতে হয়, যেমন- সততা, বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক ও স্নায়ুবিক শক্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহস ও ইচ্ছাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, কৌশল, দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি।

নেতৃত্ব মানেই নিঃস্বার্থতা। এটি ব্যক্তিগত লক্ষ্যের চেয়ে সমাজের লক্ষ্য সম্পর্কে চিন্তা করতে শেখায়। একজন ভাল নেতা সমাজে সর্বদা অনুকরণীয় নেতৃত্ব দেন এবং তার লক্ষ্যগুলোতে মনোনিবেশ করেন।

নেতৃত্ব হলো সহকর্মী বা অনুসারীদের মনের ভাষা বোঝা, তাদের জন্য নিজের স্বার্থকে বিলীন করা ও যেকোন পরিবর্তনের ব্যাপারে সকলের কথা সক্রিয়ভাবে শোনা এবং তা বাস্তবায়ন করতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। নেতৃত্ব হলো অধস্তনদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে পরিচালনা করার কৌশল। এরূপ কৌশল প্রয়োগে অধস্তনদের আবেগ, অনুভূতি ও সমস্যা সম্পর্কে নেতার প্রয়োজনীয় ধারণা থাকতে হয়। অধস্তনরা তাদের নেতাকে পথপ্রদর্শক ও শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে পেতে চান। তাই অধস্তনদের মান, দক্ষতা, দাবি-দাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে নেতার জানা থাকলেই তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভবপর হয়।

একজন নেতার জন্ম নেতা হিসেবে হয় না, অর্থাৎ কেউ নেতা হয়ে পৃথিবীতে জন্মায় না। বরং জন্মের পর যে কেউ অবিরাম প্রচেষ্টা প্রয়োগ করে সে ভালো নেতা হতে পারে। সমাজের ভালোর কথা চিন্তা করেন। নিয়মিত অধ্যাবসায়, নেতৃত্বের মনোবাসনা, অবিরাম সাধনা ও জনমানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে একজন মানুষ প্রকৃত নেতা হয়ে থাকেন।

নেতারা অন্যদের নতুন এবং ভালো কিছু অর্জন করতে অনুপ্রাণিত করেন। নেতারা উদ্ভাবনের জন্য যে পরিকল্পনা করে থাকেন তা বাস্তবায়নের সব ব্যবস্থাও নিয়ে থাকেন

একজন নেতা তার সুনিপুণ নেতৃত্বের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কার্য পরিচালনার নির্দেশনা প্রদান করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। এতে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত সব কর্মী ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতার সূত্রে আবদ্ধ হয়। নেতৃত্বের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অনুসারীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও কাজে মনোনিবেশ।

যোগ্য নেতৃত্ব সর্বদা বিরাজমান পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিবিধান করে। নেতা যে বিশেষ পরিস্থিতিতে কাজ করেন সে পরিবেশ পরিস্থিতিই নেতৃত্বকে সর্বাধিক প্রভাবিত করে। সে কারণে নেতাকে প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এমনভাবে সৃষ্টি করতে হবে যাতে নেতৃত্ব সফল হতে পারে।

যোগ্য নেতৃত্ব সবসময় অধস্তনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যোগাযোগ ছাড়া ফলপ্রসূ নেতৃত্ব সম্ভব নয়। কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে নেতা তার সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা, কর্মপরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনা অধস্তনদের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়া, মনোভাব ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত হন।

নেতৃত্বের সাথে উৎসাহ দান ও প্রভাবিতকরণের যোগসূত্র রয়েছে। যোগ্য নেতা তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণের মাধ্যমে সহকর্মীদের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে কাজ আদায়ের চেষ্টা করেন। এজন্য নেতাকে আর্থিক ও অনার্থিক বিভিন্ন প্রেষণা দানের পদ্ধতি ও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অবগত থাকতে হয়। তাই যোগ্য নেতৃত্ব কর্মস্থলের সহকর্মীদের জন্য একটি অত্যাবশ্যক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।

নেতৃত্ব কৌশলে নেতা কখনও তার সহকর্মীদের মাঝে উঁচু -নিচু মানে ভেদাভেদ রাখেন না। দলবদ্ধ কাজে তিনি সকলকে সমান চোখে দেখেন। ঊর্ধ্বতন বা অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নেতা ভালোভাবে কাজ করতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রে কে সিনিয় বা কে জুনিয়র এ চিন্তা মাথা থেকে দূর করতে না পারলে কাজে সফলতা অর্জন করা যায় না। তবে একজন যোগ্য নেতা সবার প্রতি উপযুক্ত সম্মান দিয়ে তার স্থিরকৃত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ় থাকেন।

নেতৃত্বের সাথে ঝুঁকি গ্রহণ সম্পর্কযুক্ত। নেতা যেহেতু নেতৃত্ব প্রয়োগ করেন, সেহেতু তাকে কাজের দায়িত্ব এবং ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। যেকোন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে থাকে অনেক চ্যালেঞ্জ, নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা। এগুলো কাটিয়ে নেতাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শিক্ষকই একজন নেতা। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঠিক জ্ঞানার্জনের সুযোগ প্রদান করে বুদ্ধিভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নেতা তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অতএব এক্ষেত্রে নেতৃত্ব হলো শিক্ষার গুণগত মান ঠিক রেখে সকল শিক্ষার্থীর প্রতি শেখার সমান অধিকার আদায় করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষই হলেন নেতা। তিনি সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করে সবার উপযুক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সবার কল্যাণে তিনি কাজ করে থাকেন।

সুতরাং এ কথাটি সুস্পষ্ট যে, মহান নেতারা মহান হয়ে জন্মগ্রহণ করেন না, তারা নিঃস্বার্থ হয়ে নিজেকে মহান করে তোলেন। তারা সর্বদা বৃহত্তর চিত্রের কথা চিন্তা করে এবং সর্বদা সমস্যায় থাকা লোকদের সাহায্য করার চেষ্টা করবে। একজন মহান নেতা হতে হলে আপনাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে প্রথমত, তার চারপাশের প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীর প্রতি দয়া দেখান। নেতৃত্বের এ মহান ব্রতগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও অনুশীলন করে যে কেউই হতে পারেন একজন মহান নেতা। যেকোন অফিস-আদালত, কর্পোরেট বা কলকারখানায় একটি সফল ও সুন্দর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, একজন ব্যক্তি পারফেক্ট নেতা হিসেবে নিজেকে গর্বিত করতে পারেন। মোটকথা নেতৃত্বের অন্তর্নিহিত অর্থেই নেতার যোগ্যতার আসল রহস্য বিদ্যমান। সফল নেতার নেতৃত্ব গুণ সবার জন্য হতে পারে অনুকরণীয় এক আদর্শ-এ লক্ষ্যেই নেতাকে কাজ করে যেতে হবে।

[লেখক : প্রিন্সিপাল, ড্যাফোডিল

ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা]

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

ছবি

বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে দেশ

বিএনপি নেতৃত্বের সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই দক্ষ জনসম্পদ

ছবি

অঙ্গদানের অনন্য উদাহরণ

মডেল গ্রাম মুশুদ্দির গল্প

ফাইভ-জি : ডিজিটাল শিল্পযুগের মহাসড়ক

ছবি

স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ছবি

দক্ষিণডিহির স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম জরুরি

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান আর কতকাল

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রধান উপাদান

নিয়মের বেড়াজালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’

নতুন কারিকুলামে বিজ্ঞান শিক্ষা

নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা

খেলার মাঠের বিকল্প নেই

কেমন আছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়

কিছু মানুষের কারণে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

নেতৃত্বের অন্তর্নিহিত অর্থেই নেতার যোগ্যতা

মাহমুদুল হাছান

সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২

নেতৃত্ব যা ইংরেজিতে লিডারশিপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোন জাতি, গোষ্ঠী বা দলকে পরিচালনা করার এক অনন্য দক্ষতা হলো নেতৃত্ব। অফিস বা কোন দপ্তর পরিচালনা করতে নেতৃত্বের কথাটি বেশ পরিচিত। নেতৃত্বের সম্পূরক দক্ষতা হিসেবে আরেকটি পরিভাষাও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেটি হলো ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট। আধুনিক অফিস পরিচালনা কৌশলে ‘ব্যবস্থাপনা’ শব্দটি থেকে ‘নেতৃত্ব’ শব্দটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও বহুল ব্যবহৃত। কারণ ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজমেন্ট) ও নেতৃত্ব (লিডারশিপ) কথা দুটির মধ্যে প্রায়গিক অর্থে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা অঙ্গনে খ্যাত ব্যবস্থাপনা কোচ এবং লেখক পিটার এফ ড্রাকার যথার্থই বলেছেন-‘ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার সঠিকভাবে কাজটি করেন আর নেতা বা লিডার সঠিক কাজটি করেন।’ এটি বিশ্বাস করা হয় যে একজন ভালো নেতা সর্বদা একজন ভালো ব্যবস্থাপক হয়ে থাকেন, কিন্তু একজন ভালো ব্যবস্থাপক সর্বদা একজন ভালো নেতা নাও হতে পারেন।

অতএব পরিচালনা পদ্ধতিতে নেতৃত্ব বা লিডারশিপ একটি গ্রহণযোগ্য গুণের নাম যা সমাজ ও জাতি গঠনে বেশ কার্যকর। নেতৃত্ব হলো একজন ব্যক্তির গুণ বা দক্ষতা যা ব্যক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে, তাদের অনুপ্রাণিত করতে এবং তাদের প্রতি আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই নেতৃত্ব গুণ যার মধ্যে আছে তিনি নেতা হিসাবে পরিচিত হন এবং তিনি তার এ দক্ষতা দিয়ে সমাজের অনেক ভালো ভালো পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

অক্সফোর্ড অভিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, সহজ কথায় নেতৃত্ব হলো ঝুঁকি নেওয়া এবং যেকোন পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। নেতারা অন্যদের নতুন এবং ভালো কিছু অর্জন করতে অনুপ্রাণিত করেন। নেতারা উদ্ভাবনের জন্য যে পরিকল্পনা করে থাকেন তা বাস্তবায়নের সকল ব্যবস্থাও নিয়ে থাকেন। তারা সেগুলো করে দায়িত্ববোধ থেকে, বাধ্যবাধকতা হিসাবে নয়। তারা দলের অর্জন এবং শেখার দিকটি বিবেচনা করে সাফল্য পরিমাপ করেন।

নেতৃত্ব হলো সেই ক্ষমতা যা সময়ের সাথে বিকশিত হয় এবং সেটি কেউ কাউকে শেখাতে পারে না, তবে অনুশীলন করে তা অর্জন করতে হয়। নেতৃত্বের গুণটি যাদের মধ্যে আছে, কার্যকরভাবে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা মানুষকে প্রভাবিত করে। অন্য কথায়, এটি এমন সক্ষমতা যা দৃষ্টিকে বাস্তবে পরিণত করে। একজন নেতা এমন একজন ব্যক্তি যিনি অনেক গুণের দ্বারা চিহ্নিত যেমন- দলবদ্ধ কাজ, কঠোর পরিশ্রম, শান্ত, নিঃস্বার্থ, সাহায্যকারী ও কষ্টসহিষ্ণু হওয়া।

একজন নেতা এমন একজন মানুষ যিনি সর্বদা তার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের জন্য চিন্তা করেন এবং যে কোন সমস্যার সমাধান আনতে একটি ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেন। একজন নেতা কখনই নেতিবাচক লোকের অনুসরণ করেন না, বরং তিনিই এমন একজন মানুষ হয়ে থাকেন, যিনি অন্যের ওপর প্রভাব তৈরি করার যোগ্যতা থাকার কারণে লোকেরা তাকে অনুসরণ করে।

অতীতের মহান নেতারা সর্বদা সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের কথা চিন্তা করেছেন। তারা সবসময় সমাজের বাস্তব উদাহরণ ও নিজস্ব অভ্যাস দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন এবং মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। যুগ যুগ ধরে দিবানিশি তারা কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও সহানুভূতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা আপন মহীমায় নিজেদের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একজন মহান নেতা সর্বদা জনগণকে ভালোর জন্য নেতৃত্ব দেন এবং মানুষের ভবিশ্যত গঠনে ব্রতী থাকেন। নেতৃত্ব আসলে কতিপয় গুণের সমষ্টি। একজন ভালো নেতার মধ্যে অবশ্যই কতকগুলো গুণ থাকতে হয়, যেমন- সততা, বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক ও স্নায়ুবিক শক্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহস ও ইচ্ছাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, কৌশল, দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি।

নেতৃত্ব মানেই নিঃস্বার্থতা। এটি ব্যক্তিগত লক্ষ্যের চেয়ে সমাজের লক্ষ্য সম্পর্কে চিন্তা করতে শেখায়। একজন ভাল নেতা সমাজে সর্বদা অনুকরণীয় নেতৃত্ব দেন এবং তার লক্ষ্যগুলোতে মনোনিবেশ করেন।

নেতৃত্ব হলো সহকর্মী বা অনুসারীদের মনের ভাষা বোঝা, তাদের জন্য নিজের স্বার্থকে বিলীন করা ও যেকোন পরিবর্তনের ব্যাপারে সকলের কথা সক্রিয়ভাবে শোনা এবং তা বাস্তবায়ন করতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। নেতৃত্ব হলো অধস্তনদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে পরিচালনা করার কৌশল। এরূপ কৌশল প্রয়োগে অধস্তনদের আবেগ, অনুভূতি ও সমস্যা সম্পর্কে নেতার প্রয়োজনীয় ধারণা থাকতে হয়। অধস্তনরা তাদের নেতাকে পথপ্রদর্শক ও শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে পেতে চান। তাই অধস্তনদের মান, দক্ষতা, দাবি-দাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে নেতার জানা থাকলেই তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভবপর হয়।

একজন নেতার জন্ম নেতা হিসেবে হয় না, অর্থাৎ কেউ নেতা হয়ে পৃথিবীতে জন্মায় না। বরং জন্মের পর যে কেউ অবিরাম প্রচেষ্টা প্রয়োগ করে সে ভালো নেতা হতে পারে। সমাজের ভালোর কথা চিন্তা করেন। নিয়মিত অধ্যাবসায়, নেতৃত্বের মনোবাসনা, অবিরাম সাধনা ও জনমানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে একজন মানুষ প্রকৃত নেতা হয়ে থাকেন।

নেতারা অন্যদের নতুন এবং ভালো কিছু অর্জন করতে অনুপ্রাণিত করেন। নেতারা উদ্ভাবনের জন্য যে পরিকল্পনা করে থাকেন তা বাস্তবায়নের সব ব্যবস্থাও নিয়ে থাকেন

একজন নেতা তার সুনিপুণ নেতৃত্বের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কার্য পরিচালনার নির্দেশনা প্রদান করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। এতে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত সব কর্মী ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতার সূত্রে আবদ্ধ হয়। নেতৃত্বের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অনুসারীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও কাজে মনোনিবেশ।

যোগ্য নেতৃত্ব সর্বদা বিরাজমান পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিবিধান করে। নেতা যে বিশেষ পরিস্থিতিতে কাজ করেন সে পরিবেশ পরিস্থিতিই নেতৃত্বকে সর্বাধিক প্রভাবিত করে। সে কারণে নেতাকে প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এমনভাবে সৃষ্টি করতে হবে যাতে নেতৃত্ব সফল হতে পারে।

যোগ্য নেতৃত্ব সবসময় অধস্তনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যোগাযোগ ছাড়া ফলপ্রসূ নেতৃত্ব সম্ভব নয়। কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে নেতা তার সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা, কর্মপরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনা অধস্তনদের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়া, মনোভাব ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত হন।

নেতৃত্বের সাথে উৎসাহ দান ও প্রভাবিতকরণের যোগসূত্র রয়েছে। যোগ্য নেতা তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণের মাধ্যমে সহকর্মীদের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে কাজ আদায়ের চেষ্টা করেন। এজন্য নেতাকে আর্থিক ও অনার্থিক বিভিন্ন প্রেষণা দানের পদ্ধতি ও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অবগত থাকতে হয়। তাই যোগ্য নেতৃত্ব কর্মস্থলের সহকর্মীদের জন্য একটি অত্যাবশ্যক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।

নেতৃত্ব কৌশলে নেতা কখনও তার সহকর্মীদের মাঝে উঁচু -নিচু মানে ভেদাভেদ রাখেন না। দলবদ্ধ কাজে তিনি সকলকে সমান চোখে দেখেন। ঊর্ধ্বতন বা অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নেতা ভালোভাবে কাজ করতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রে কে সিনিয় বা কে জুনিয়র এ চিন্তা মাথা থেকে দূর করতে না পারলে কাজে সফলতা অর্জন করা যায় না। তবে একজন যোগ্য নেতা সবার প্রতি উপযুক্ত সম্মান দিয়ে তার স্থিরকৃত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ় থাকেন।

নেতৃত্বের সাথে ঝুঁকি গ্রহণ সম্পর্কযুক্ত। নেতা যেহেতু নেতৃত্ব প্রয়োগ করেন, সেহেতু তাকে কাজের দায়িত্ব এবং ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। যেকোন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে থাকে অনেক চ্যালেঞ্জ, নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা। এগুলো কাটিয়ে নেতাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শিক্ষকই একজন নেতা। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঠিক জ্ঞানার্জনের সুযোগ প্রদান করে বুদ্ধিভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নেতা তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অতএব এক্ষেত্রে নেতৃত্ব হলো শিক্ষার গুণগত মান ঠিক রেখে সকল শিক্ষার্থীর প্রতি শেখার সমান অধিকার আদায় করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষই হলেন নেতা। তিনি সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করে সবার উপযুক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সবার কল্যাণে তিনি কাজ করে থাকেন।

সুতরাং এ কথাটি সুস্পষ্ট যে, মহান নেতারা মহান হয়ে জন্মগ্রহণ করেন না, তারা নিঃস্বার্থ হয়ে নিজেকে মহান করে তোলেন। তারা সর্বদা বৃহত্তর চিত্রের কথা চিন্তা করে এবং সর্বদা সমস্যায় থাকা লোকদের সাহায্য করার চেষ্টা করবে। একজন মহান নেতা হতে হলে আপনাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে প্রথমত, তার চারপাশের প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীর প্রতি দয়া দেখান। নেতৃত্বের এ মহান ব্রতগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও অনুশীলন করে যে কেউই হতে পারেন একজন মহান নেতা। যেকোন অফিস-আদালত, কর্পোরেট বা কলকারখানায় একটি সফল ও সুন্দর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, একজন ব্যক্তি পারফেক্ট নেতা হিসেবে নিজেকে গর্বিত করতে পারেন। মোটকথা নেতৃত্বের অন্তর্নিহিত অর্থেই নেতার যোগ্যতার আসল রহস্য বিদ্যমান। সফল নেতার নেতৃত্ব গুণ সবার জন্য হতে পারে অনুকরণীয় এক আদর্শ-এ লক্ষ্যেই নেতাকে কাজ করে যেতে হবে।

[লেখক : প্রিন্সিপাল, ড্যাফোডিল

ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা]

back to top