alt

উপ-সম্পাদকীয়

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্স সর্বস্তরে ডারউইনের তত্ত্ব পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত; এই অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলেমেরা প্রতিবাদ করছেন। এবার যেভাবে প্রতিটি ক্লাসের বই ধরে ধরে ওয়াজ করা হচ্ছে, মসজিদের ইমামগণ বয়ান করছেন তা আগে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। সবার অভিযোগ, ৯২ শতাংশ মুসলমানের ইমাম-আকিদার প্রতিনিধিত্ব করার মতো উপযোগী বিষয়বস্তু স্কুলের পাঠ্য বইতে নেই। হিন্দু লেখকের কয়টি কবিতা, মুসলমানের কয়টি মসজিদ আর বৌদ্ধদের কয়টি প্যাগোডার ছবি বইতে আছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। দিল্লি সালতানাত বলতে মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনকালকে বুঝানো হয়। ‘দিল্লি সালতানাত’ আমলে তুর্কি ও আফগান রাজবংশের শাসকদের বা মোগলদের পাঠ্য বইতে কেন বহিরাগত বলা হলো তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ঝাড়া হচ্ছে। এই বিরোধ আগেও ছিল, কিন্তু এমন তীব্র ছিলো না- কিছুদিন আগেও ‘ও’ দিয়ে ‘ওঝা’ না লিখে ‘ওড়না’ লেখার দাবি ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে। এছাড়াও পাঠ্য বইতে বানান ভুল আছে, অনেক ব্যক্তির ছবি আছে যা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তথ্যের বিভ্রাট আছে। এমন ভুল প্রতি বছরই হয়েছে, কিন্তু এবার মনে হয় ভুলের চেয়ে সমস্যা তৈরি করা হয়েছে বেশি। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ভুল সংশোধনের বারবার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন, দ্রুত সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।

আধুনিক বিজ্ঞানের যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার তার অন্যতম হচ্ছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের তত্ত্ব। এই তত্ত্বকে বিবর্তনবাদ নামে অভিহিত করা হয়। তার তত্ত্ব অনুযায়ী প্রাণীর উদ্ভব, স্থিতি, ধ্বংস হয় ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রক্রিয়ায় অথবা প্রাণীর বুদ্ধির যোগ্যতা ও বাহুবলের সক্ষমতার মাধ্যমে। অন্যদিকে টিকে থাকা প্রাণীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিবর্তিত হচ্ছে; কিন্তু এই বিবর্তন বা পরিবর্তন হয় লাখো কোটি বছরে, একশত বা দুইশত বছরে নয়। ৬ থেকে ৩ কোটি বছর পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে এক শ্রেণির স্তন্যপায়ী প্রাণী গাছে বসবাস করত, যাদের বলা হয় প্রাইমেট। লেমুর, গিবন, ওরাংওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি স্তন্যপায়ী প্রাণিসমূহ প্রাইমেট প্রাণির অন্তর্ভুক্ত। গবেষণার মাধ্যমে ধারণা করা হয় যে, সুদূর অতীতকালের প্রাইমেটদের একটি শাখা থেকে পর্যায়ক্রমে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উদ্ভব হয়েছে। ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীর জন্ম এবং ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে বিবর্তনের ধারায় পৃথিবীতে প্রথম এক কোষী প্রাণীর উদ্ভব হয়, পরে ক্রমান্বয়ে বহু কোষী ও উন্নততর প্রাণীগুলোর সৃষ্টি হয়। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি প্রজাতির যেমন সৃষ্টি হয়েছে তেমনি কোটি কোটি প্রজাতির প্রাণী ধ্বংসও হয়ে গেছে, যাদের ফসিল এখনো পাওয়া যায়। ৩০ লাখ বছর আগের মানুষের ফসিল আবিষ্কার হয়েছে এবং যে ২০ প্রজাতির মানুষের ফসিল আবিষ্কার হয়েছে তার মধ্যে ১৯ প্রজাতির মানুষ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সর্বোচ্চ এক লাখ বছর আগে উদ্ভব হওয়া হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির মানুষেরাই এখনো জীবিত আছে।

বিবর্তন মতবাদকে অধিকাংশ বিজ্ঞানী যুগান্তকারী এক আবিষ্কার ও অকাট্য মতবাদ রূপেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে বিবর্তন মতবাদের বক্তব্য হচ্ছে রাসায়নিক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রথমে প্রোটোভাইরাস, তারপর ভাইরাস, এরপর ব্যাকটেরিয়ার জন্ম। একই প্রক্রিয়ায় লাখ-লাখ বছর ধরে লাখ-লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের সৃষ্টি। মিউটিশনের মাধ্যমে সূক্ষ্ম এক কোষী করোনাভাইরাসের রূপ ও ক্ষমতার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে আলফা, বেটা, ডেল্টা, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে। হোমো সেপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষের উদ্ভব হয় প্রায় ৪. ৫ লক্ষ বছর পূর্বে। ১৮৫৬ সনে নিয়ান্ডারথাল মানবের অস্মীভূত কঙ্কাল পাওয়া যায় জার্মানির নিয়ান্ডারথাল উপত্যকায়। আধুনিক মানুষের সাথে এদের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে; প্রায় ৪০-৩০ হাজার বছর আগে এই প্রজাতির মানুষ পৃথিবী থেকে কোন কারণবশত বিলুপ্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এদের বিলুপ্তির প্রাক্কালে আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানব হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাব হয়, যারা আমাদের মতো দুই পায়ে হেঁটেছে। ডিএনএ টেস্ট এবং জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, বিবর্তনের ধারায় বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আকার ও মেধার বিভিন্ন প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। আধুনিক মানুষের সঙ্গে নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষের সংযোগ আবিষ্কার করে সুইডিশ বিজ্ঞানী সেভান্তে পাবো এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু প্রাণ সৃষ্টির ব্যাপারে ডারউইনের বিবর্তনবাদ ধর্মের সাথে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। ধর্মের সাথে বিরোধ থাকায় এই তত্ত্বের পক্ষে-বিপক্ষে শত শত বই লেখা হয়েছে।

বিজ্ঞান আর ধর্মের মিল না থাকায় ধর্মীয় শাসনে জ্ঞানী-গুণীদের বিপদ হয় সবচেয়ে বেশি। ফরাসি বিপ্লবের আগে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলেই ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাই ধর্মীয় বিধানের যূপকাষ্ঠে বলি হওয়া কোটি কোটি মানুষের আর্তনাদে ইতিহাস ভারাক্রান্ত। ধর্ম মানুষকে সবকিছু জানতে বাধা দেয়, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সংশয়ী হতে নিষেধ করে, জ্ঞানের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। যারা ধর্মযাজকদের কথার অবাধ্য হয়ছে ধর্মের নামে তাদের উপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। তাই স্থির সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণমান পৃথিবীর কথা বলাতে গ্যালেলি গ্যালিলিওকে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, ব্রুনোকে মরতে হয়েছে আগুনের লেলিহান শিখায়, হাইপেশিয়াকে কেটে করা হয়েছে টুকরো টুকরো, যুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিতরণ করায় সক্রেটিসকে জীবন দিতে হয়েছে বিষপানে। সক্রেটিসের যুগ হলে কাজী নজরুল ইসলামকেও বিষ খেয়ে মরতে হতো। তিনি ডারউইনের মতবাদে প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন, ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম।’

ধর্ম এবং বিজ্ঞানের বিরোধ অসংখ্য- বিজ্ঞান বলে সূর্য স্থির, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে; আর ধর্ম বলে পৃথিবী স্থির, সূর্য পৃথিবীকে চক্কর দেয়, সূর্য প্রতি রাতে আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সেজদা করে এবং তার কাছে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি চায়। ধর্ম বলে ছোঁয়াচে বলে কোন রোগ নেই, অথচ সাম্প্রতিককালের করোনাকে ছোঁয়াচে রোগ বলে মানবজাতি স্বীকার করে নিয়ে লকডাউন দিয়েছে। ধর্ম বলে চাঁদের নিজস্ব আলো আছে, বিজ্ঞান বলে নেই। ধর্ম বলে বৃষ্টির আগাম সংবাদ কোন মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানের কল্যাণে পৃথিবীর সর্বত্র এখন বৃষ্টির আগাম সংবাদ শুনে মানুষ ঘরের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। জ্বর আসে জাহান্নামের উত্তাপ থেকে- ধর্মের এই কথা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। উটের মুত্র পান করলে রোগ সারে- ধর্মের এই বিশ্বাসও বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত নয়। জন্মের সময় বাচ্চারা শয়তানের খোঁচায় কাঁদে- ধর্মে বর্ণিত শয়তানের এই কান্ড নবজাতকের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি; জন্মের পর কোন শিশু না কাঁদলে তাকে কাঁদানোর জন্য চিকিৎসক গলদঘর্ম হয়ে যান।

বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির সর্বগ্রাহী প্রভাবে ধর্মগুলো এখন আর আগের মতো বিজ্ঞান চর্চা, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের বিরোধিতা করছে না; ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞানের অনেক উদ্ভাবনকে ধার্মিকেরা মেনে নিচ্ছেন। ইসলাম ধর্মে সুদ গ্রহণ ও প্রদান নিষিদ্ধ, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি শতভাগ সুদনির্ভর। এই হারাম অর্থনীতির অর্থে আমরা জীবন নির্বাহ করছি, কেউ এই সুদ থেকে মুক্ত থাকতে পারছি না। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে বাস করে শতভাগ সুদ মুক্ত থাকা প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান ৪ শতাংশ সুদে আরেক ইসলামিক রাষ্ট্র সউদি আরব থেকে ঋণ নিয়েছে। ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দেহ দানের সংখ্যা দিন দিন বাড?ছে। ধর্ম অনুযায়ী শরীর থেকে রক্ত বের হলেই নাপাক, তাই অনেক আলেমের মতে রক্তদান গ্রহণযোগ্য নয়। কিছুদিন আগেও শুধু অভাবী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাই রক্ত দেয়ার জন্য হাসপাতালের দরজায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো; এখন অনেক সুস্থ ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিয়মিত রক্তদান করে থাকেন, ধর্মের কথা বলে কেউ বাধা দেয় না। ধর্ম মতে কালোজিরা সর্বরোগের মহৌষধ, কিন্তু কালোজিরার ওপর আস্থা রেখে ওষুধ খাওয়া বন্ধ রেখেছেন কতজন মুসলমান? বর্তমান যুগ ছবি ছাড়া অচল, তাই ধর্মের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মানুষ ছবি তুলছে। ধর্মের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মেয়েরা মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলছে, ক্রিকেট খেলছে, আমরা তা দেখছি। নাচ-গান-নাটক-সিনেমা এখন ঘরে ঘরে। অধিকাংশ মুসলমান ধর্মও পালন করেন, আবার হাফপেন্ট পরা পুরুষদের খেলাও দেখেন।

বিজ্ঞান আর ধর্মের মিল না থাকায় ধর্মীয় শাসনে জ্ঞানী-গুণীদের বিপদ হয় সবচেয়ে বেশি

সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে আছে। মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রধান প্রধান ধর্মীয় ব্যাখ্যা সর্বজনীন; প্রায় সব ধর্মই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী, পরকালে বিশ্বাসী, সৃষ্টিকর্তার অখন্ড ক্ষমতায় বিশ্বাসী। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ ধার্মিকেরা বিজ্ঞানের সাথে কিছু সমঝোতা করে চললেও বিবর্তনবাদের সাথে সমঝোতা একেবারেই সম্ভব হয়; কারণ বিবর্তনবাদ যতই বিজ্ঞানভিত্তিক হোক না কেন, এই মতবাদ ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের ইমান-আক্বিদা বিরোধী মতবাদ, এই মতবাদে বিশ্বাস করলে ইমান থাকে না। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, মানবজাতির উৎপত্তি হযরত আদম (আ.) থেকেই শুরু হয়েছে। ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব একান্তভাবে বিশ্বাস-নির্ভর। তাই বিজ্ঞানের সত্য বা যুক্তি দিয়ে এই বিশ্বাস খন্ডন করা যায় না। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতত্ত্বকে অস্বীকার করে বিবর্তনবাদ প্রায় সকল ধর্মকে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছে। ধর্মের তথ্যের ওপর প্রশ্নাতীত বিশ্বাস থাকায় আমরা আর কোন সত্য জানার তাগাদা বোধ করি না; কারণ একই বিষয়ে দুটি সত্য গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই। ধর্মের সাথে না মিললে বিজ্ঞানকে দ্বিধাহীন চিত্তে অস্বীকার করার জন্য আমরা সদা প্রস্তুত।

তবে বিশ্বাস করার প্রবৃত্তি আর সত্যানুসন্ধানের আগ্রহ এক বস্তু নয়। পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীব বিজ্ঞান, জ্যোতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, নৃ-বিজ্ঞানের বহু বিষয়বস্তু ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও এই সকল সাবজেক্ট যারা পড়েছে তারা সবাই ধর্মের সৃষ্টি তত্ত্বের উপর বিশ্বাস হারিয়েছে এমন নজির নেই। জীববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অধিকাংশ মুসলিম ছাত্র একনিষ্ঠ ধার্মিক। তাই বিবর্তনবাদ পড়লেই পথভ্রষ্ট হয় না। প্রকৃতপক্ষে যারা বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তারাই বেশি বেশি বিবর্তনবাদ পড়ছেন; তাদের মধ্যে অনেকেই আবার ইচ্ছাকৃতভাবে বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি বলে ভুল প্রচার করছেন। এই ক্ষেত্রে অনেকে বিশেষ করে স্কুলের সিলেবাস থেকে বিতর্কিত ডারউইন তত্ত্ব বাদ দেওয়ার দাবি করছেন; তাদের যুক্তি হচ্ছে, শিশু বয়সে মস্তিস্কে যা ঢুকে পরিণত বয়সেও জ্ঞান বা প্রবল যুক্তি দ্বারা তা অপসারণ করা যায় না। তাহলে তো ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে এটা সত্য, বিজ্ঞান চর্চায় বাছবিচার করে বিজ্ঞানকে সংক্ষিপ্ত বা বনসাই বানানোর চেষ্টা না করে বরং আমাদের জন্য বিজ্ঞান চর্চা বন্ধ করে দেওয়াই শ্রেয়।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedyeauddin0@gmail.com

আদিবাসীদের মাতৃভাষা রক্ষার লড়াই

মালাকারটোলা গণহত্যা : দুঃসহ স্মৃতি

ছবি

স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা

ছবি

বঙ্গবন্ধুর দর্শন থেকে উৎসারিত স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনা

ছবি

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা

সিপিআই (এম)-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার নেতৃত্বের মূল্যায়ন

ছবি

অরক্ষিত নন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ব্যাংক ও মানুষের আস্থা

চাই ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাবার

ছবি

তিতাস অববাহিকার বিপন্ন কৃষিজমিন

প্রিয়েমশন মামলা সম্পর্কিত আইনি সমস্যা ও সমাধান

ছবি

স্মরণ : মাস্টার’দা সূর্যসেন

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা

খাদ্য পর্যটন : নবদিগন্তের হাতছানি

ধূপখোলা মাঠ রক্ষা করতে হবে

হজ বাণিজ্যিক পণ্য নয়

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব

পশ্চিম বাংলায় নির্বাচন হোক রক্তপাতহীন

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কালক্ষেপণ নয়

ছবি

কৃষিজমি সুরক্ষায় সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন

ঢালচর বনের ঢাল কারা?

গাজীপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

ছবি

আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে বিতর্ক

ছবি

প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার নৈহাটি মডেল

ছবি

কে কিভাবে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানবে?

প্লাস্টিক দূষণ : উদ্বিগ্ন বিশ্ব

ছবি

কাঁদে নদ-নদী

ছবি

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক

বাঁকখালী নদীর মুক্তি ও ন্যায়বিচার

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও আদিবাসী

আগুন আর ভূমিকম্পের বিপদ

নারীর ক্ষমতায়ন ও টেকসই উন্নয়ন

নগর স্থবির, গ্রামে শুরু কর্মচাঞ্চল্য

ছবি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব

নারীর কর্মদক্ষতায় আইসিটি ও স্টেম শিক্ষা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্স সর্বস্তরে ডারউইনের তত্ত্ব পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত; এই অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলেমেরা প্রতিবাদ করছেন। এবার যেভাবে প্রতিটি ক্লাসের বই ধরে ধরে ওয়াজ করা হচ্ছে, মসজিদের ইমামগণ বয়ান করছেন তা আগে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। সবার অভিযোগ, ৯২ শতাংশ মুসলমানের ইমাম-আকিদার প্রতিনিধিত্ব করার মতো উপযোগী বিষয়বস্তু স্কুলের পাঠ্য বইতে নেই। হিন্দু লেখকের কয়টি কবিতা, মুসলমানের কয়টি মসজিদ আর বৌদ্ধদের কয়টি প্যাগোডার ছবি বইতে আছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। দিল্লি সালতানাত বলতে মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনকালকে বুঝানো হয়। ‘দিল্লি সালতানাত’ আমলে তুর্কি ও আফগান রাজবংশের শাসকদের বা মোগলদের পাঠ্য বইতে কেন বহিরাগত বলা হলো তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ঝাড়া হচ্ছে। এই বিরোধ আগেও ছিল, কিন্তু এমন তীব্র ছিলো না- কিছুদিন আগেও ‘ও’ দিয়ে ‘ওঝা’ না লিখে ‘ওড়না’ লেখার দাবি ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে। এছাড়াও পাঠ্য বইতে বানান ভুল আছে, অনেক ব্যক্তির ছবি আছে যা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তথ্যের বিভ্রাট আছে। এমন ভুল প্রতি বছরই হয়েছে, কিন্তু এবার মনে হয় ভুলের চেয়ে সমস্যা তৈরি করা হয়েছে বেশি। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ভুল সংশোধনের বারবার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন, দ্রুত সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।

আধুনিক বিজ্ঞানের যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার তার অন্যতম হচ্ছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের তত্ত্ব। এই তত্ত্বকে বিবর্তনবাদ নামে অভিহিত করা হয়। তার তত্ত্ব অনুযায়ী প্রাণীর উদ্ভব, স্থিতি, ধ্বংস হয় ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রক্রিয়ায় অথবা প্রাণীর বুদ্ধির যোগ্যতা ও বাহুবলের সক্ষমতার মাধ্যমে। অন্যদিকে টিকে থাকা প্রাণীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিবর্তিত হচ্ছে; কিন্তু এই বিবর্তন বা পরিবর্তন হয় লাখো কোটি বছরে, একশত বা দুইশত বছরে নয়। ৬ থেকে ৩ কোটি বছর পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে এক শ্রেণির স্তন্যপায়ী প্রাণী গাছে বসবাস করত, যাদের বলা হয় প্রাইমেট। লেমুর, গিবন, ওরাংওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি স্তন্যপায়ী প্রাণিসমূহ প্রাইমেট প্রাণির অন্তর্ভুক্ত। গবেষণার মাধ্যমে ধারণা করা হয় যে, সুদূর অতীতকালের প্রাইমেটদের একটি শাখা থেকে পর্যায়ক্রমে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উদ্ভব হয়েছে। ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীর জন্ম এবং ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে বিবর্তনের ধারায় পৃথিবীতে প্রথম এক কোষী প্রাণীর উদ্ভব হয়, পরে ক্রমান্বয়ে বহু কোষী ও উন্নততর প্রাণীগুলোর সৃষ্টি হয়। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি প্রজাতির যেমন সৃষ্টি হয়েছে তেমনি কোটি কোটি প্রজাতির প্রাণী ধ্বংসও হয়ে গেছে, যাদের ফসিল এখনো পাওয়া যায়। ৩০ লাখ বছর আগের মানুষের ফসিল আবিষ্কার হয়েছে এবং যে ২০ প্রজাতির মানুষের ফসিল আবিষ্কার হয়েছে তার মধ্যে ১৯ প্রজাতির মানুষ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সর্বোচ্চ এক লাখ বছর আগে উদ্ভব হওয়া হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির মানুষেরাই এখনো জীবিত আছে।

বিবর্তন মতবাদকে অধিকাংশ বিজ্ঞানী যুগান্তকারী এক আবিষ্কার ও অকাট্য মতবাদ রূপেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে বিবর্তন মতবাদের বক্তব্য হচ্ছে রাসায়নিক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রথমে প্রোটোভাইরাস, তারপর ভাইরাস, এরপর ব্যাকটেরিয়ার জন্ম। একই প্রক্রিয়ায় লাখ-লাখ বছর ধরে লাখ-লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের সৃষ্টি। মিউটিশনের মাধ্যমে সূক্ষ্ম এক কোষী করোনাভাইরাসের রূপ ও ক্ষমতার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে আলফা, বেটা, ডেল্টা, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে। হোমো সেপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষের উদ্ভব হয় প্রায় ৪. ৫ লক্ষ বছর পূর্বে। ১৮৫৬ সনে নিয়ান্ডারথাল মানবের অস্মীভূত কঙ্কাল পাওয়া যায় জার্মানির নিয়ান্ডারথাল উপত্যকায়। আধুনিক মানুষের সাথে এদের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে; প্রায় ৪০-৩০ হাজার বছর আগে এই প্রজাতির মানুষ পৃথিবী থেকে কোন কারণবশত বিলুপ্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এদের বিলুপ্তির প্রাক্কালে আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানব হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাব হয়, যারা আমাদের মতো দুই পায়ে হেঁটেছে। ডিএনএ টেস্ট এবং জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, বিবর্তনের ধারায় বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আকার ও মেধার বিভিন্ন প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। আধুনিক মানুষের সঙ্গে নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষের সংযোগ আবিষ্কার করে সুইডিশ বিজ্ঞানী সেভান্তে পাবো এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু প্রাণ সৃষ্টির ব্যাপারে ডারউইনের বিবর্তনবাদ ধর্মের সাথে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। ধর্মের সাথে বিরোধ থাকায় এই তত্ত্বের পক্ষে-বিপক্ষে শত শত বই লেখা হয়েছে।

বিজ্ঞান আর ধর্মের মিল না থাকায় ধর্মীয় শাসনে জ্ঞানী-গুণীদের বিপদ হয় সবচেয়ে বেশি। ফরাসি বিপ্লবের আগে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলেই ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাই ধর্মীয় বিধানের যূপকাষ্ঠে বলি হওয়া কোটি কোটি মানুষের আর্তনাদে ইতিহাস ভারাক্রান্ত। ধর্ম মানুষকে সবকিছু জানতে বাধা দেয়, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সংশয়ী হতে নিষেধ করে, জ্ঞানের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। যারা ধর্মযাজকদের কথার অবাধ্য হয়ছে ধর্মের নামে তাদের উপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। তাই স্থির সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণমান পৃথিবীর কথা বলাতে গ্যালেলি গ্যালিলিওকে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, ব্রুনোকে মরতে হয়েছে আগুনের লেলিহান শিখায়, হাইপেশিয়াকে কেটে করা হয়েছে টুকরো টুকরো, যুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিতরণ করায় সক্রেটিসকে জীবন দিতে হয়েছে বিষপানে। সক্রেটিসের যুগ হলে কাজী নজরুল ইসলামকেও বিষ খেয়ে মরতে হতো। তিনি ডারউইনের মতবাদে প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন, ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম।’

ধর্ম এবং বিজ্ঞানের বিরোধ অসংখ্য- বিজ্ঞান বলে সূর্য স্থির, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে; আর ধর্ম বলে পৃথিবী স্থির, সূর্য পৃথিবীকে চক্কর দেয়, সূর্য প্রতি রাতে আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সেজদা করে এবং তার কাছে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি চায়। ধর্ম বলে ছোঁয়াচে বলে কোন রোগ নেই, অথচ সাম্প্রতিককালের করোনাকে ছোঁয়াচে রোগ বলে মানবজাতি স্বীকার করে নিয়ে লকডাউন দিয়েছে। ধর্ম বলে চাঁদের নিজস্ব আলো আছে, বিজ্ঞান বলে নেই। ধর্ম বলে বৃষ্টির আগাম সংবাদ কোন মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানের কল্যাণে পৃথিবীর সর্বত্র এখন বৃষ্টির আগাম সংবাদ শুনে মানুষ ঘরের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। জ্বর আসে জাহান্নামের উত্তাপ থেকে- ধর্মের এই কথা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। উটের মুত্র পান করলে রোগ সারে- ধর্মের এই বিশ্বাসও বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত নয়। জন্মের সময় বাচ্চারা শয়তানের খোঁচায় কাঁদে- ধর্মে বর্ণিত শয়তানের এই কান্ড নবজাতকের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি; জন্মের পর কোন শিশু না কাঁদলে তাকে কাঁদানোর জন্য চিকিৎসক গলদঘর্ম হয়ে যান।

বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির সর্বগ্রাহী প্রভাবে ধর্মগুলো এখন আর আগের মতো বিজ্ঞান চর্চা, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের বিরোধিতা করছে না; ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞানের অনেক উদ্ভাবনকে ধার্মিকেরা মেনে নিচ্ছেন। ইসলাম ধর্মে সুদ গ্রহণ ও প্রদান নিষিদ্ধ, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি শতভাগ সুদনির্ভর। এই হারাম অর্থনীতির অর্থে আমরা জীবন নির্বাহ করছি, কেউ এই সুদ থেকে মুক্ত থাকতে পারছি না। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে বাস করে শতভাগ সুদ মুক্ত থাকা প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান ৪ শতাংশ সুদে আরেক ইসলামিক রাষ্ট্র সউদি আরব থেকে ঋণ নিয়েছে। ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দেহ দানের সংখ্যা দিন দিন বাড?ছে। ধর্ম অনুযায়ী শরীর থেকে রক্ত বের হলেই নাপাক, তাই অনেক আলেমের মতে রক্তদান গ্রহণযোগ্য নয়। কিছুদিন আগেও শুধু অভাবী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাই রক্ত দেয়ার জন্য হাসপাতালের দরজায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো; এখন অনেক সুস্থ ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিয়মিত রক্তদান করে থাকেন, ধর্মের কথা বলে কেউ বাধা দেয় না। ধর্ম মতে কালোজিরা সর্বরোগের মহৌষধ, কিন্তু কালোজিরার ওপর আস্থা রেখে ওষুধ খাওয়া বন্ধ রেখেছেন কতজন মুসলমান? বর্তমান যুগ ছবি ছাড়া অচল, তাই ধর্মের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মানুষ ছবি তুলছে। ধর্মের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মেয়েরা মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলছে, ক্রিকেট খেলছে, আমরা তা দেখছি। নাচ-গান-নাটক-সিনেমা এখন ঘরে ঘরে। অধিকাংশ মুসলমান ধর্মও পালন করেন, আবার হাফপেন্ট পরা পুরুষদের খেলাও দেখেন।

বিজ্ঞান আর ধর্মের মিল না থাকায় ধর্মীয় শাসনে জ্ঞানী-গুণীদের বিপদ হয় সবচেয়ে বেশি

সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে আছে। মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রধান প্রধান ধর্মীয় ব্যাখ্যা সর্বজনীন; প্রায় সব ধর্মই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী, পরকালে বিশ্বাসী, সৃষ্টিকর্তার অখন্ড ক্ষমতায় বিশ্বাসী। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ ধার্মিকেরা বিজ্ঞানের সাথে কিছু সমঝোতা করে চললেও বিবর্তনবাদের সাথে সমঝোতা একেবারেই সম্ভব হয়; কারণ বিবর্তনবাদ যতই বিজ্ঞানভিত্তিক হোক না কেন, এই মতবাদ ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের ইমান-আক্বিদা বিরোধী মতবাদ, এই মতবাদে বিশ্বাস করলে ইমান থাকে না। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, মানবজাতির উৎপত্তি হযরত আদম (আ.) থেকেই শুরু হয়েছে। ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব একান্তভাবে বিশ্বাস-নির্ভর। তাই বিজ্ঞানের সত্য বা যুক্তি দিয়ে এই বিশ্বাস খন্ডন করা যায় না। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতত্ত্বকে অস্বীকার করে বিবর্তনবাদ প্রায় সকল ধর্মকে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছে। ধর্মের তথ্যের ওপর প্রশ্নাতীত বিশ্বাস থাকায় আমরা আর কোন সত্য জানার তাগাদা বোধ করি না; কারণ একই বিষয়ে দুটি সত্য গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই। ধর্মের সাথে না মিললে বিজ্ঞানকে দ্বিধাহীন চিত্তে অস্বীকার করার জন্য আমরা সদা প্রস্তুত।

তবে বিশ্বাস করার প্রবৃত্তি আর সত্যানুসন্ধানের আগ্রহ এক বস্তু নয়। পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীব বিজ্ঞান, জ্যোতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, নৃ-বিজ্ঞানের বহু বিষয়বস্তু ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও এই সকল সাবজেক্ট যারা পড়েছে তারা সবাই ধর্মের সৃষ্টি তত্ত্বের উপর বিশ্বাস হারিয়েছে এমন নজির নেই। জীববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অধিকাংশ মুসলিম ছাত্র একনিষ্ঠ ধার্মিক। তাই বিবর্তনবাদ পড়লেই পথভ্রষ্ট হয় না। প্রকৃতপক্ষে যারা বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তারাই বেশি বেশি বিবর্তনবাদ পড়ছেন; তাদের মধ্যে অনেকেই আবার ইচ্ছাকৃতভাবে বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি বলে ভুল প্রচার করছেন। এই ক্ষেত্রে অনেকে বিশেষ করে স্কুলের সিলেবাস থেকে বিতর্কিত ডারউইন তত্ত্ব বাদ দেওয়ার দাবি করছেন; তাদের যুক্তি হচ্ছে, শিশু বয়সে মস্তিস্কে যা ঢুকে পরিণত বয়সেও জ্ঞান বা প্রবল যুক্তি দ্বারা তা অপসারণ করা যায় না। তাহলে তো ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে এটা সত্য, বিজ্ঞান চর্চায় বাছবিচার করে বিজ্ঞানকে সংক্ষিপ্ত বা বনসাই বানানোর চেষ্টা না করে বরং আমাদের জন্য বিজ্ঞান চর্চা বন্ধ করে দেওয়াই শ্রেয়।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedyeauddin0@gmail.com

back to top