alt

উপ-সম্পাদকীয়

আনস্মার্ট চিকিৎসা ও স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ২০ মে ২০২৩

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চেয়েছেন, দেশে এত সুন্দর চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের দেশের রোগী বিদেশে চিকিৎসার জন্য যায়? জামাল উদ্দিন আহমেদ পিটু আমার চাচাতো ভাই। পিটু জাতীয় পর্যায়ের কোন বিখ্যাত লোক না হওয়া সত্ত্বেও দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার উদাহরণ হিসেবে তাকে আমার লেখায় টেনে এনেছি। তার হার্টে হঠাৎ ব্লক শনাক্ত হয়। সে লিখেছে, ‘আত্মশুদ্ধির সময় নাকি ভোর বেলা। তাই লিখছি। আজ তিন দিন হলো ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের বিছানায়া। এনজিওগ্রাম করে জানা গেল হৃদয়ের তিনটি দরজার একটি সম্পূর্ণ বন্ধ, বাকি দুটি ৯৫% বন্ধ। এখন আর রিং পরানোর কোন সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। আমার দ্বারা যারা আঘাত পেয়েছেন তাদের মধ্যে ছোট-বড় সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

আমি বললাম, ‘তোর ভয়ের কোন কারণ নেই, এখন অহরহ হার্ট অপারেশন হচ্ছে, মৃত্যু হার নগণ্য। যেদিন তোর অপারেশন হবে সেই দিন আমি হাসপাতালে থাকব।’ তার চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করছে তার ব্যাচমেট ও বন্ধুরা। পিটু জানাল, তার স্কুল বন্ধু হারুন, যে এখন কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসে ডেপুটি হাইকমিশনার, তার চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। তার সার্জারির নির্ধারিত তারিখ ১১ মে সকাল ৮টা। পিটু আমাকে রাতে ফোন করে অপারেশনের সময়াটি জানিয়েছে।

১১ মে ২০২৩; সকাল ৮টায় আমি বারডেম হাসপাতালে পৌঁছে যাই। কিন্তু দারোয়ান ঢুকতে দেয়া না। ভাবছি, ২০ টাকা হাতে দেব কিনা! ইতঃপূর্বে বকশিস দিয়ে রোগীর আত্মীয়া-স্বজনকে ঢুকতে দেখেছি। দারোয়ানের অন্যত্র ডাক পড়লে সেই সুযোগে ভেতরে ঢুকে গেলাম, একটি অপরাধ করলাম। তারপরও তার ওয়ার্ডে যেতে পারলাম না, আরেক দারোয়ান বাধা দিল। আমার সঙ্গে পিটুর ব্যাচমেট আমাদের গ্রামের কামরুল। কামরুল তাকে ফোন করলে পিটু তার রুমের বাইরে এসে দেখা করল। আমাকে দেখে সে খুব খুশি। সে বলল, ‘ভাই, নিশ্চয়ই নাস্তা করেননি, ক্যান্টিনে যান, ওখানে আমার ছেলেমেয়ে এবং আমাদের গানের গ্রুপের কয়েকজন আছে।’ আমি আর কামরুল বারডেমের ক্যান্টিনে গিয়ে নাস্তা করলাম, পয়াস দিল তার গানের গ্রুপের বন্ধুরা। তার বন্ধুদের মধ্যে সমাপিকাকে আগে থেকেই চিনতাম। সমাপিকা আমার ভাইঝি অরু মহিউদ্দিনের সহকর্মী ছিল, তারা দুজনই এক সময়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) চাকরি করত। তার বন্ধুদের মধ্যে আরেকজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক, জাহিদা গুলশান আরা। তার অন্য বন্ধু শ্রাবনী, পাশা, ফয়াসাল, শানুর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়া পিটু বলল, তার নামটি আমার আব্বা রেখেছিলেন।

আমাদের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজীর জিএমহাট নুরপুর গ্রামে। পিটু আমার আব্বার প্রতিষ্ঠিত জিএম হাট স্কুল থেকে ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাস করে। পিটুর লিখাপড়া করার আর্থিক সামর্থ্য সবল ছিল না। প্রধান শিক্ষক তফাজ্জল হোসেন স্যারসহ অনেকের সমর্থনে তার পক্ষে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। স্কুলের মেধাবী ছাত্র পিটু সব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করত। গানের প্রতিযোগিতায় সে প্রতিবার প্রথম স্থান অধিকার করত। তাকে আমার প্রয়াত ভাই কূটনৈতিক মহিউদ্দিন আহমদ ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্সে একটি চাকরি দিয়েছিল। পিটু ছিল মেজাজী, আপস করত না; তাই বেশি দিন চাকরি করতে পারেনি। এমন চাকরি সে আরও বহু প্রতিষ্ঠানে করেছে। পিটু নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে সাংবাদিকতা করেছে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে তার দক্ষতা ছিল, সে কম্পিউটার সমিতির প্রোগ্রাম অফিসার ছিল। ফটোগ্রাফির ওপরও তার প্রশিক্ষণ ছিল।

পিটুর গানের দল ছিল, নাম ছিল ‘গানের আড্ডা’। পিটু গান লিখত, সুরারোপ করত, নিজে গাইত। হায়দার হোসেনের সেই বিখ্যাত ‘তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি’ গানটি নাকি তার সুরারোপ করা। হায়দার হোসেন নাকি তার গানের দলে ছিলেন, বিট্রে করে আলাদা হয়ে যান এবং গানটি নিজের বলে চালিয়ে দেন। এটা পিটুর কথা, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ আমার হাতে নেই। ভারত-বাংলাদেশ সম্প্রতি পুরস্কার প্রাপ্তির উদযাপনে ‘গানের আড্ডা’ শিল্পকলা একাডেমিতে গত বছর ১৮ জুলাইতে আলোচনা ও গানের অনুষ্ঠান করেছিল, আমি এবং আমার এককালের সহকর্মী আশুতোষ সাহা ও জহিরুল হক উক্ত অনুষ্ঠান উপভোগ করেছি। পিটুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গানের আড্ডায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সভাপতি হিসেবে সে চমৎকার বক্তব্য রাখে এবং অনুষ্ঠানে সে একটি গানও গায়। ১১ মে দুপুর ২টায় তার হার্টের অপরেশন শুরু হয়, রাত ১০টায় শেষ হয়। অনেকবার খোঁজ নিয়েছি, পরদিনও সকালেও খোঁজ নিয়েছি, সবাই বলল, তাকে বেহুঁশ অবস্থায় ২ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। ডাক্তাররা বললেন, পিটু দুর্বল বিধায় হুঁশ আসতে দেরি হচ্ছে। সেকেন্ডের পর মিনিট, মিনিটের পর ঘণ্টা, ঘণ্টার পর দিন পার হয়ে যায়, হুঁশ আর আসে না। তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে, আইসিইউতে কাউকে ঢুকতেও দেয়া হচ্ছে না। আমাদের দেশের আইসিইউর চেয়ে জেলখানাও অনেক ভালো। সিসিইউ বা আইসিইউ নিয়ে আমার কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। বারডেম হাসপাতালে আমার কূটনৈতিক ভাই মহিউদ্দিন আহমদও একবার ভর্তি হয়েছিলেন, তাকে আইসিইউতে নেয়া হলে আর খোঁজ নিতে পারিনি। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সারা রাত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, আর সুযোগ খুঁজছিলাম কিভাবে ভেতরে ঢোকা যায়। রাত তিনটায় একজন নার্স বাইরে বের হলে দরজা খোলা পেয়ে আমি ঢুকে পড়ি, দেখি আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমদের হাত বাঁধা। মহিউদ্দিন ভাই আমাকে দেখে অসহায় হয়ে বললেন, ‘ওরা আমার হাত বেঁধে রেখেছে কেন?’

নানা প্রশ্ন আমাদের মনে জাগছে; তাকে দুবার অপারেশনের টেবিলে নিতে হলো কেন? তাকে কি প্রয়োজনাতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগ করা হয়েছে? চেতনানাশক গ্রহণের মতো সবল কি সে ছিল না? সে কি সার্জারির সময়ই মারা গেল? কেন তাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হলো? দেড় দিন কি ডাক্তার-নার্স শুধু অভিনয় করে গেলেন?

আইসিইউর এক কোণায় একজন নার্সকে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমাতে দেখলাম। আমি তার কাছে গিয়ে ‘সিস্টার’ বলে ডাক দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেগে চিৎকার করে ওঠলেন, ‘আপনি এখানে ঢুকলেন কী করে’। আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার ভাইয়ের হাত বেঁধে রেখেছেন কেন?’ তিনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে বের করে দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠলেন, দারোয়ান ডাকা শুরু করলেন, দারোয়ান ডেকে নাজেহাল করার আগেই আমি বেরিয়ে গেলাম। রোগীর হাত-পা বেঁধে কখনো কখনো রাখতে হয়, কিন্তু আমার ভাইয়ের ক্ষেত্রে হাত বাঁধা হয়েছে নার্সদের ঘুমের সুবিধার্থে।

আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমদকে তার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় বারডেমে ভর্তি করাতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলাম; ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব টাকা জমা না দিলে ভর্তি করা যাবে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিল। আমার ভাইয়ের সাথে ছিলাম আমি আর আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ; তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের চেয়ারম্যান। তিনি তার পরিচয় দিলেন, কিন্তু কাজ হলো না। তারপর তিনি বললেন যে, বারডেমের নির্বাহী প্রধান ডা. এ কে আজাদ খান তার পরিচিত, কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। বাসা থেকে টাকা এনে বা অন্য কোনভাবে টাকা জমা দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমার অসুস্থ ভাই হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে ছিলেন। আইসিইউ বা সিসিইউতে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয় না, সম্ভবত ভিড় এড়ানো এবং ছোঁয়াচে রোগ থেকে রোগীদের রক্ষা করতে এই কড়াকড়ি। একই কারণে আত্মীয়-স্বজনদের হাসপাতালে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা আবশ্যক। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে কোনো কোনো নার্সের সেবার মান এত নিম্নমানের যে তাদের হাতে রোগী রেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোন উপায় নেই; আমার ধারণা, আত্মীয়-স্বজনের সেবা না থাকলে এবং অবৈধ আয়াদের উপস্থিতি না থাকলে বাংলাদেশে সব রোগীই হাসপাতালে মারা যেত।

আমাদের দেশে রোগী এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ডাক্তার আর নার্সদের অসদাচরণ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। শুধু তাদের অসদাচরণের কারণেই গরিব আর নিঃস্ব রোগীরাও শেষ সম্বল বিক্রি করে ভারত আর থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য চলে যায়া। পঙ্গু হাসপাতালে ডাক্তার আর নার্সের চেয়ে দালাল বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও খারাপ। জরুরি প্রয়োজনে নার্সদের ডাকলেও বলবে, ‘যান, আমি আসছি’। আসছি বললেও আসেন না। আবার ডাকতে গেলে মোবাইল থেকে মুখটি তুলে বলবেন, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি, আসছি, একটুও ত্বর সয় না কেন?’ রাগ করা যাবে না, রাগ করলে রোগীর অবস্থা খারাপ করে দেবে। সব নার্স এক জোট, ডাক্তারাও তাদের পক্ষে। কারণ বড় বড় ডাক্তাররা আধা ঘণ্টার জন্য ভিজিটে আসেন, ঝড়ের গতিতে রোগী দেখে দ্রুত তাদের প্রাইভেট ব্যবসায় চলে যান। কোন জবাবদিহিতা নেই। এরাই এরশাদ সাহেবের আমলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন করতে দেননি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি তখন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে ব্যস্ত, তাই এই দুটি রাজনৈতিক দল ডাক্তারদের অন্যায় আবদারে সমর্থন করল। এই সমর্থনের কারণে ডাক্তাররা আজও বেপরোয়া, তাদের ফি আর কমানো গেল না, ডিউটি ফাঁকি দিয়ে তাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস চলতে থাকল অনবিচ্ছিন্নভাবে, জেলা-উপজেলায় পোস্টিং পাওয়া কোন চিকিৎসক সপ্তাহে দুই দিনের বেশি মফস্বলে থাকেন বলে মনে হয় না।

১২ তারিখ বিকালে পিটুর গানের দলের সমাপিকা ফোন করে জানাল, পিটুর আত্মীয়-স্বজনকে হাসপাতালে যেতে বলা হয়েছে। পিটুর ছেলে ও মেয়ে দুই জনের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া এখনো শেষ হয়নি, তারা আগে থেকেই হাসপাতালে ছিল। সংবাদ পেয়ে আমার ভাতিজা আলাউদ্দিন শিমুল সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে পৌঁছায়। পিটুকে দ্বিতীয়বার অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়া। ১২ তারিখ রাত ১১টায় শিমুলের কাছ থেকে জানতে পারি, পিটু মারা গেছে। কিভাবে এই মৃত্যু হলো কিছুই জানি না। কারণ অপারেশনের টেবিলে নেয়ার পর মৃত্যু পর্যন্ত তাকে আমাদের কেউ আর দেখেনি। অপারেশনের জন্য তাকে বেহুঁশ করা হলো, সেই বেহুঁশ অবস্থায়ে পিটু মারা গেল। নানা প্রশ্ন আমাদের মনে জাগছে;- তাকে দুবার অপারেশনের টেবিলে নিতে হলো কেন? তাকে কি প্রয়োজনাতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগ করা হয়েছে? চেতনানাশক গ্রহণের মতো সবল কি সে ছিল না? সে কি সার্জারির সময়ই মারা গেল? কেন তাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হলো? দেড় দিন কি ডাক্তার-নার্স শুধু অভিনয় করে গেলেন? আইসিইউতে থাকাকালীন কোন নার্স পিটুর শারীরিক অবস্থা জানাতে অপরাগতা জানায়, তাদের উত্তর ছিল, ‘আমরা তার সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না, ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন’। ডাক্তারের নাগাল পাওয়া কী সহজ! জিজ্ঞেস করেই বা কী লাভ! এই দেশের ডাক্তারই তো পেটে ব্যান্ডেজ বা কাঁচি রেখে সেলাই করে দেন, তারাই তো ফি নিয়ে রোগীর সাথে দাসীনুদাসের মতো ব্যবহার করেন। এরা প্রেসার গ্রুপ, চটানো যাবে না, কিছু বলাও যাবে না, সব রাজনৈতিক দল এদের সমীহ করে। তাই অবহেলিত চিকিৎসায় পিটুরা মারা যাবে, ডাক্তার-নার্সদের কৈফিয়ত জবাবদিহিতা ছাড়াই। সব রোগী অবশ্যই বাঁচবে না, কিন্তু মৃত্যুর একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা সমীচীন। অবশ্য শুধু চিকিৎসা নয়, দেশের বহু ঘটনা-দুর্ঘটনার যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়া না। শেখ হাসিনা কী করে আনস্মার্ট ডাক্তার-নার্স আর ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ আমলা-ব্যবসায়ী দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বেন তা বোধগম্য নয়।

[ লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ]

হাতের শক্তি ও মহিমা

বাজেট বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ

ছবি

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে

সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুটেরাদের বিচার কি হবে

বাজেট ভাবনায় শঙ্কিত যারা

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যে

জ্ঞানই শক্তি

পরিবেশ নিয়ে কিছু কথা

অগ্নিমূল্যের বাজার : সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিলবে কি?

বেসরকারি স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নৈরাজ্য

যৌতুক মামলার অপব্যবহার

শহীদের রক্তে লেখা ঐতিহাসিক ছয় দফা

রসে ভরা বাংলাদেশ

সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই

দুর্নীতির উৎসমুখ

কানিহাটি সিরিজের বোরো ধান নিয়ে কিছু কথা

নজিরবিহীন বেনজীর

টেকসই উন্নয়ন করতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখে আহমদ

কী বার্তা দিল ভারতের সংসদ নির্বাচন

গরমে প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা

ক্লাইমেট জাস্টিস ফর বাংলাদেশ : শুধু ঋণ বা অনুদান নয়, প্রয়োজন ক্ষতিপূরণ

এখন ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ কী

দুর্নীতি নিয়ে মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া দরকার

গোল্ডেন রাইস কেন বারবার থমকে দাঁড়ায়

প্রাকৃতিক রসগোল্লা

বেড়েই চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

বিপর্যস্ত উপকূল : ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান

রম্যগদ্য : অল্প অল্প ত্যাগ করুন, নইলে বেঘোরে মরুন

ছবি

লোকসভার ভোট এবং ইন্দো-বাংলা সম্পর্ক

ছবি

ব্রজেন দাস : ইতিহাসের এক গৌরবময় নাম

দুর্নীতির বহুমাত্রিক সংকট

দুর্বল ব্যাংকের সদগতি দরকার

তামাকের ব্যবহার বন্ধে সামাজিক আন্দোলন

আত্মহত্যা রোধে পরিবারের ভূমিকা

ব্যাংক খাত নিয়ে কেন এত দুশ্চিন্তা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

আনস্মার্ট চিকিৎসা ও স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ২০ মে ২০২৩

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চেয়েছেন, দেশে এত সুন্দর চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের দেশের রোগী বিদেশে চিকিৎসার জন্য যায়? জামাল উদ্দিন আহমেদ পিটু আমার চাচাতো ভাই। পিটু জাতীয় পর্যায়ের কোন বিখ্যাত লোক না হওয়া সত্ত্বেও দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার উদাহরণ হিসেবে তাকে আমার লেখায় টেনে এনেছি। তার হার্টে হঠাৎ ব্লক শনাক্ত হয়। সে লিখেছে, ‘আত্মশুদ্ধির সময় নাকি ভোর বেলা। তাই লিখছি। আজ তিন দিন হলো ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের বিছানায়া। এনজিওগ্রাম করে জানা গেল হৃদয়ের তিনটি দরজার একটি সম্পূর্ণ বন্ধ, বাকি দুটি ৯৫% বন্ধ। এখন আর রিং পরানোর কোন সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। আমার দ্বারা যারা আঘাত পেয়েছেন তাদের মধ্যে ছোট-বড় সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

আমি বললাম, ‘তোর ভয়ের কোন কারণ নেই, এখন অহরহ হার্ট অপারেশন হচ্ছে, মৃত্যু হার নগণ্য। যেদিন তোর অপারেশন হবে সেই দিন আমি হাসপাতালে থাকব।’ তার চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করছে তার ব্যাচমেট ও বন্ধুরা। পিটু জানাল, তার স্কুল বন্ধু হারুন, যে এখন কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসে ডেপুটি হাইকমিশনার, তার চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। তার সার্জারির নির্ধারিত তারিখ ১১ মে সকাল ৮টা। পিটু আমাকে রাতে ফোন করে অপারেশনের সময়াটি জানিয়েছে।

১১ মে ২০২৩; সকাল ৮টায় আমি বারডেম হাসপাতালে পৌঁছে যাই। কিন্তু দারোয়ান ঢুকতে দেয়া না। ভাবছি, ২০ টাকা হাতে দেব কিনা! ইতঃপূর্বে বকশিস দিয়ে রোগীর আত্মীয়া-স্বজনকে ঢুকতে দেখেছি। দারোয়ানের অন্যত্র ডাক পড়লে সেই সুযোগে ভেতরে ঢুকে গেলাম, একটি অপরাধ করলাম। তারপরও তার ওয়ার্ডে যেতে পারলাম না, আরেক দারোয়ান বাধা দিল। আমার সঙ্গে পিটুর ব্যাচমেট আমাদের গ্রামের কামরুল। কামরুল তাকে ফোন করলে পিটু তার রুমের বাইরে এসে দেখা করল। আমাকে দেখে সে খুব খুশি। সে বলল, ‘ভাই, নিশ্চয়ই নাস্তা করেননি, ক্যান্টিনে যান, ওখানে আমার ছেলেমেয়ে এবং আমাদের গানের গ্রুপের কয়েকজন আছে।’ আমি আর কামরুল বারডেমের ক্যান্টিনে গিয়ে নাস্তা করলাম, পয়াস দিল তার গানের গ্রুপের বন্ধুরা। তার বন্ধুদের মধ্যে সমাপিকাকে আগে থেকেই চিনতাম। সমাপিকা আমার ভাইঝি অরু মহিউদ্দিনের সহকর্মী ছিল, তারা দুজনই এক সময়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) চাকরি করত। তার বন্ধুদের মধ্যে আরেকজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক, জাহিদা গুলশান আরা। তার অন্য বন্ধু শ্রাবনী, পাশা, ফয়াসাল, শানুর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়া পিটু বলল, তার নামটি আমার আব্বা রেখেছিলেন।

আমাদের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজীর জিএমহাট নুরপুর গ্রামে। পিটু আমার আব্বার প্রতিষ্ঠিত জিএম হাট স্কুল থেকে ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাস করে। পিটুর লিখাপড়া করার আর্থিক সামর্থ্য সবল ছিল না। প্রধান শিক্ষক তফাজ্জল হোসেন স্যারসহ অনেকের সমর্থনে তার পক্ষে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। স্কুলের মেধাবী ছাত্র পিটু সব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করত। গানের প্রতিযোগিতায় সে প্রতিবার প্রথম স্থান অধিকার করত। তাকে আমার প্রয়াত ভাই কূটনৈতিক মহিউদ্দিন আহমদ ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্সে একটি চাকরি দিয়েছিল। পিটু ছিল মেজাজী, আপস করত না; তাই বেশি দিন চাকরি করতে পারেনি। এমন চাকরি সে আরও বহু প্রতিষ্ঠানে করেছে। পিটু নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে সাংবাদিকতা করেছে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে তার দক্ষতা ছিল, সে কম্পিউটার সমিতির প্রোগ্রাম অফিসার ছিল। ফটোগ্রাফির ওপরও তার প্রশিক্ষণ ছিল।

পিটুর গানের দল ছিল, নাম ছিল ‘গানের আড্ডা’। পিটু গান লিখত, সুরারোপ করত, নিজে গাইত। হায়দার হোসেনের সেই বিখ্যাত ‘তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি’ গানটি নাকি তার সুরারোপ করা। হায়দার হোসেন নাকি তার গানের দলে ছিলেন, বিট্রে করে আলাদা হয়ে যান এবং গানটি নিজের বলে চালিয়ে দেন। এটা পিটুর কথা, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ আমার হাতে নেই। ভারত-বাংলাদেশ সম্প্রতি পুরস্কার প্রাপ্তির উদযাপনে ‘গানের আড্ডা’ শিল্পকলা একাডেমিতে গত বছর ১৮ জুলাইতে আলোচনা ও গানের অনুষ্ঠান করেছিল, আমি এবং আমার এককালের সহকর্মী আশুতোষ সাহা ও জহিরুল হক উক্ত অনুষ্ঠান উপভোগ করেছি। পিটুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গানের আড্ডায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সভাপতি হিসেবে সে চমৎকার বক্তব্য রাখে এবং অনুষ্ঠানে সে একটি গানও গায়। ১১ মে দুপুর ২টায় তার হার্টের অপরেশন শুরু হয়, রাত ১০টায় শেষ হয়। অনেকবার খোঁজ নিয়েছি, পরদিনও সকালেও খোঁজ নিয়েছি, সবাই বলল, তাকে বেহুঁশ অবস্থায় ২ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। ডাক্তাররা বললেন, পিটু দুর্বল বিধায় হুঁশ আসতে দেরি হচ্ছে। সেকেন্ডের পর মিনিট, মিনিটের পর ঘণ্টা, ঘণ্টার পর দিন পার হয়ে যায়, হুঁশ আর আসে না। তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে, আইসিইউতে কাউকে ঢুকতেও দেয়া হচ্ছে না। আমাদের দেশের আইসিইউর চেয়ে জেলখানাও অনেক ভালো। সিসিইউ বা আইসিইউ নিয়ে আমার কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। বারডেম হাসপাতালে আমার কূটনৈতিক ভাই মহিউদ্দিন আহমদও একবার ভর্তি হয়েছিলেন, তাকে আইসিইউতে নেয়া হলে আর খোঁজ নিতে পারিনি। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সারা রাত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, আর সুযোগ খুঁজছিলাম কিভাবে ভেতরে ঢোকা যায়। রাত তিনটায় একজন নার্স বাইরে বের হলে দরজা খোলা পেয়ে আমি ঢুকে পড়ি, দেখি আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমদের হাত বাঁধা। মহিউদ্দিন ভাই আমাকে দেখে অসহায় হয়ে বললেন, ‘ওরা আমার হাত বেঁধে রেখেছে কেন?’

নানা প্রশ্ন আমাদের মনে জাগছে; তাকে দুবার অপারেশনের টেবিলে নিতে হলো কেন? তাকে কি প্রয়োজনাতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগ করা হয়েছে? চেতনানাশক গ্রহণের মতো সবল কি সে ছিল না? সে কি সার্জারির সময়ই মারা গেল? কেন তাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হলো? দেড় দিন কি ডাক্তার-নার্স শুধু অভিনয় করে গেলেন?

আইসিইউর এক কোণায় একজন নার্সকে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমাতে দেখলাম। আমি তার কাছে গিয়ে ‘সিস্টার’ বলে ডাক দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেগে চিৎকার করে ওঠলেন, ‘আপনি এখানে ঢুকলেন কী করে’। আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার ভাইয়ের হাত বেঁধে রেখেছেন কেন?’ তিনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে বের করে দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠলেন, দারোয়ান ডাকা শুরু করলেন, দারোয়ান ডেকে নাজেহাল করার আগেই আমি বেরিয়ে গেলাম। রোগীর হাত-পা বেঁধে কখনো কখনো রাখতে হয়, কিন্তু আমার ভাইয়ের ক্ষেত্রে হাত বাঁধা হয়েছে নার্সদের ঘুমের সুবিধার্থে।

আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমদকে তার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় বারডেমে ভর্তি করাতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলাম; ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব টাকা জমা না দিলে ভর্তি করা যাবে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিল। আমার ভাইয়ের সাথে ছিলাম আমি আর আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ; তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের চেয়ারম্যান। তিনি তার পরিচয় দিলেন, কিন্তু কাজ হলো না। তারপর তিনি বললেন যে, বারডেমের নির্বাহী প্রধান ডা. এ কে আজাদ খান তার পরিচিত, কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। বাসা থেকে টাকা এনে বা অন্য কোনভাবে টাকা জমা দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমার অসুস্থ ভাই হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে ছিলেন। আইসিইউ বা সিসিইউতে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয় না, সম্ভবত ভিড় এড়ানো এবং ছোঁয়াচে রোগ থেকে রোগীদের রক্ষা করতে এই কড়াকড়ি। একই কারণে আত্মীয়-স্বজনদের হাসপাতালে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা আবশ্যক। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে কোনো কোনো নার্সের সেবার মান এত নিম্নমানের যে তাদের হাতে রোগী রেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোন উপায় নেই; আমার ধারণা, আত্মীয়-স্বজনের সেবা না থাকলে এবং অবৈধ আয়াদের উপস্থিতি না থাকলে বাংলাদেশে সব রোগীই হাসপাতালে মারা যেত।

আমাদের দেশে রোগী এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ডাক্তার আর নার্সদের অসদাচরণ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। শুধু তাদের অসদাচরণের কারণেই গরিব আর নিঃস্ব রোগীরাও শেষ সম্বল বিক্রি করে ভারত আর থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য চলে যায়া। পঙ্গু হাসপাতালে ডাক্তার আর নার্সের চেয়ে দালাল বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও খারাপ। জরুরি প্রয়োজনে নার্সদের ডাকলেও বলবে, ‘যান, আমি আসছি’। আসছি বললেও আসেন না। আবার ডাকতে গেলে মোবাইল থেকে মুখটি তুলে বলবেন, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি, আসছি, একটুও ত্বর সয় না কেন?’ রাগ করা যাবে না, রাগ করলে রোগীর অবস্থা খারাপ করে দেবে। সব নার্স এক জোট, ডাক্তারাও তাদের পক্ষে। কারণ বড় বড় ডাক্তাররা আধা ঘণ্টার জন্য ভিজিটে আসেন, ঝড়ের গতিতে রোগী দেখে দ্রুত তাদের প্রাইভেট ব্যবসায় চলে যান। কোন জবাবদিহিতা নেই। এরাই এরশাদ সাহেবের আমলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন করতে দেননি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি তখন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে ব্যস্ত, তাই এই দুটি রাজনৈতিক দল ডাক্তারদের অন্যায় আবদারে সমর্থন করল। এই সমর্থনের কারণে ডাক্তাররা আজও বেপরোয়া, তাদের ফি আর কমানো গেল না, ডিউটি ফাঁকি দিয়ে তাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস চলতে থাকল অনবিচ্ছিন্নভাবে, জেলা-উপজেলায় পোস্টিং পাওয়া কোন চিকিৎসক সপ্তাহে দুই দিনের বেশি মফস্বলে থাকেন বলে মনে হয় না।

১২ তারিখ বিকালে পিটুর গানের দলের সমাপিকা ফোন করে জানাল, পিটুর আত্মীয়-স্বজনকে হাসপাতালে যেতে বলা হয়েছে। পিটুর ছেলে ও মেয়ে দুই জনের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া এখনো শেষ হয়নি, তারা আগে থেকেই হাসপাতালে ছিল। সংবাদ পেয়ে আমার ভাতিজা আলাউদ্দিন শিমুল সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে পৌঁছায়। পিটুকে দ্বিতীয়বার অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়া। ১২ তারিখ রাত ১১টায় শিমুলের কাছ থেকে জানতে পারি, পিটু মারা গেছে। কিভাবে এই মৃত্যু হলো কিছুই জানি না। কারণ অপারেশনের টেবিলে নেয়ার পর মৃত্যু পর্যন্ত তাকে আমাদের কেউ আর দেখেনি। অপারেশনের জন্য তাকে বেহুঁশ করা হলো, সেই বেহুঁশ অবস্থায়ে পিটু মারা গেল। নানা প্রশ্ন আমাদের মনে জাগছে;- তাকে দুবার অপারেশনের টেবিলে নিতে হলো কেন? তাকে কি প্রয়োজনাতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগ করা হয়েছে? চেতনানাশক গ্রহণের মতো সবল কি সে ছিল না? সে কি সার্জারির সময়ই মারা গেল? কেন তাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হলো? দেড় দিন কি ডাক্তার-নার্স শুধু অভিনয় করে গেলেন? আইসিইউতে থাকাকালীন কোন নার্স পিটুর শারীরিক অবস্থা জানাতে অপরাগতা জানায়, তাদের উত্তর ছিল, ‘আমরা তার সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না, ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন’। ডাক্তারের নাগাল পাওয়া কী সহজ! জিজ্ঞেস করেই বা কী লাভ! এই দেশের ডাক্তারই তো পেটে ব্যান্ডেজ বা কাঁচি রেখে সেলাই করে দেন, তারাই তো ফি নিয়ে রোগীর সাথে দাসীনুদাসের মতো ব্যবহার করেন। এরা প্রেসার গ্রুপ, চটানো যাবে না, কিছু বলাও যাবে না, সব রাজনৈতিক দল এদের সমীহ করে। তাই অবহেলিত চিকিৎসায় পিটুরা মারা যাবে, ডাক্তার-নার্সদের কৈফিয়ত জবাবদিহিতা ছাড়াই। সব রোগী অবশ্যই বাঁচবে না, কিন্তু মৃত্যুর একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা সমীচীন। অবশ্য শুধু চিকিৎসা নয়, দেশের বহু ঘটনা-দুর্ঘটনার যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়া না। শেখ হাসিনা কী করে আনস্মার্ট ডাক্তার-নার্স আর ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ আমলা-ব্যবসায়ী দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বেন তা বোধগম্য নয়।

[ লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ]

back to top