দেশের দুটি বড় সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। দুটিই চট্টগ্রামে। গ্যাস সংকটের কারণে এই দুটি ইউরিয়া সার কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার (৪ মার্চ) সরকারি নির্দেশনার প্রেক্ষিতে বিকেল থেকে উপরোক্ত কারখানা দুটির উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
বোরো মৌসুমে সারের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়বে কৃষকরা। ধান উৎপাদনে ব্যাঘাত দেখা দিলে আগামী দিনে চালের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতাও বেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর ফলে সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যায় এবং পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, সিইউএফএল স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করে। আর কাফকোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া।
কারখানায় কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা জানান, সার উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে গ্যাসনির্ভর। পর্যাপ্ত চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ছাড়া উৎপাদন চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। কম চাপের গ্যাসে উৎপাদন চালু রাখলে যন্ত্রপাতির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবং সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে কারখানাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই দ্রুত উৎপাদন পুনরায় চালু করে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) আলমগীর রহমান বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। দেশের সবকয়টি সার কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। গ্যাস কোম্পানির সাথে কথা বলে আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিবে সরকার।’
দুটি কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ থাকার বিষেয় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রবিউশন কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী রউস উদ্দীন জানান, ‘কি কারণে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, লাইনের মধ্যে কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে কিনা নাকি অন্য কোন কারণ আছে আমি বিস্তারিত জানি না।’ তবে কারাখানায় পুনরায় গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ‘গ্যাস সংকটের কারণে সাময়িক বন্ধ হলেও আমরা দ্রুত উৎপাদন শুরু করার চেষ্টা করছি।’
রাষ্ট্রায়ত্ত চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা লিমিটেড (সিইউএফএল) ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় এর কার্যক্রম শুরু হয়। অন্যদিকে কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সরকারসহ জাপান, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কের যৌথ মালিকানায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৩ সালে উৎপাদন শুরু করে এবং ১৯৯৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে আসছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাস বন্ধ থাকার পর সিইউএফএল পুনরায় চালু করা হলেও তা ১২ ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সচল রাখতে পারেনি। পরে যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাস সংকটসহ নানা কারণে কয়েক দফায় চালু ও বন্ধের মধ্যে ছিল কারখানাটি। সবশেষ আবারও গ্যাস সংকটে বন্ধ হলো উৎপাদন।
কাফকোও গত বছরের অক্টোবর মাসে অভ্যন্তরীণ সমস্যাজনিত কারণে প্রায় ১৫ দিন উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল। সর্বশেষ গ্যাস সংকটের কারণে এই কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।