রংপুরে শীতের কবল থেকে সুরক্ষা পেতে অনেকেই আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হচ্ছেন। শীত যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, অগ্নিদগ্ধের সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তীব্র শীত, ঘনকুয়াশা ও উত্তরের হিমেল বাতাসে উত্তরাঞ্চলে প্রতিদিনই কমছে তাপমাত্রা। প্রচণ্ড শীতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। চরম বিপাকে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ। শীতের কাপড়ের অভাবে খড়খুটা জ্বালিয়ে উঞ্চতা নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
জানা যায়, শুক্রবার ভোরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে অগ্নিদগ্ধ হাজেরা বেগম (৩৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। নিহত হাজেরা বেগম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিশুগাড়ি ইউনিয়নের আব্দুর রহিমের স্ত্রী। গত ৪ জানুয়ারি দগ্ধ অবস্থায় হাজেরা বেগমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি নিভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, চলতি শীত মৌসুমে নারী, শিশুসহ ৬৫ জন চিকিৎসা নিচ্ছে বার্ন ইউনিটে। এর মধ্যে আগুনে পোড়া রোগী রয়েছে ৫৫ জন। রোগীদের অধিকাংশ আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়ে গেছে বলে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনেরা জানিয়েছেন। ১৪ শয্যার বার্ন ইউনিটে জায়গা না হওয়ায় রোগীদের সার্জারি, মেডিসিনসহ বিভিন্ন বিভাগে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মো. শাহীন শাহ বলেন, গত ১০-১২ দিন থেকে শীতের তীব্রতা বেড়ে গেছে। আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বার্ন ইউনিটের ১৪টি শয্যা অনেক আগে থেকে পূরণ হয়ে গেছে। রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রেখে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। হাসপাতালে দেখা যায়, বার্ন ইউনিটে আগুনে পোড়া মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার খাজেরপাড়ার তাসলিমা আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, তার মজিদা বেগমের পা থেকে কোমর পর্যন্ত ৪০ ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। তিনি খড়ের গাদার পাশে আগুন পোহাচ্ছিলেন। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর কলাগাছির চরের সুফিয়া বেগম (৭৩) নামে এক বৃদ্ধা রান্নাঘরে চুলায় আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে গত ২১ ডিসেম্বর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেন, আগুন পোহাতে গিয়ে গ্রামে নারীরাই বেশি বিপদে পড়ছেন। গ্রামাঞ্চলে নারীরা সাধারণত শাড়ি পরিধান করেন। শীত সইতে না পেরে বাড়ির পাশেই খড়ের মধ্যে আগুন ধরিয়ে তাপ নেয়ার সময় কখন সেই শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে যায়, তা শীতের তীব্রতার কারণে বোঝা যায় না। এক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে। আগুন পোহানো শেষে ভালোভাবে তা নিভিয়ে না ফেললে অজান্তে কেউ আগুনে পুড়ে যেতে পারে।
জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলার মধ্যে একমাত্র বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট রয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর ও গাইবান্ধা জেলার আগুনে পোড়া রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। অথচ ১৪ শয্যার বার্ন ইউনিটে চিকিৎসক আছে একজন সহযোগী অধ্যাপকসহ তিনজন চিকিৎসক। নানা করণে চিকিৎসকরা বিভিন্ন সময় ছুটিতে থাকে।
ডা. শাহীন শাহ বলেন, বার্ন ইউনিটে রোগীর চাপ বাড়ছে। এতে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। ১৪ শয্যার জন্য অন্তত একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও চারজন মিড লেভেল চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ১৪ ওয়ার্ডের বার্ন ইউনিট হলেও অনেক রোগী ভর্তি হন। অতিরিক্ত রোগীদের সার্জারি বিভাগে বার্ন কর্নার করে সেখানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রংপুর মেডিকেলে একটি ১০০ শয্যার বার্ন ইউনিট করছে সরকার। এ জন্য জায়গা নির্ধারিত হয়েছে। পুরনো ভবন ভেঙে ফেলতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ১০তলা ভবনের বার্ন ইউনিটটি হয়ে গেলে অতিরিক্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম পাওয়া যাবে। আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ হবে।