image
ছবিঃ সংগৃহীত

ইরানের কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের মহড়া

বিদেশী সংবাদ মাধ্যম

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস ‘আব্রাহাম লিংকন’ ইরানের কাছাকাছি অবস্থান করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ইরানের সামরিক কর্মসূচি ও সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী বিক্ষোভ দমনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছে। আর এমন সময়ে বিবিসি ভেরিফাই এ উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা মঙ্গলবার, (১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সুইজারল্যান্ডে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ইরান বলেছে, বৈঠকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ওয়াশিংটন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়।

আব্রাহাম লিংকন নামের বিমানবাহী রণতরিটিতে রয়েছে তিনটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। এ ছাড়া এতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ মোট ৯০টি উড়োজাহাজ এবং প্রায় ৫ হাজার ৬৮০ নৌবাহিনীর সদস্য রয়েছেন। জানুয়ারির শেষ দিকে রণতরিটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছিল, তবে এত দিন পর্যন্ত উপগ্রহ চিত্রে সেটি দেখা যায়নি। এবার উপগ্রহ চিত্রে সেটি ধরা পড়েছে।

ওই চিত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে রণতরিটি ওমান উপকূলের কাছে ইরান থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকেও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এটি ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।

আব্রাহাম লিংকনকে মোতায়েন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়কে আরও স্পষ্ট করেছে।

স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই দেখতে পেয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের সংখ্যা উল্লেখজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের মহাকাশ সংস্থা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আরব সাগরে ওমান উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ মাইল (২৪০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থান করছে।

জানুয়ারিতে জাহাজটি ওই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল বলে জানা গেলেও এত দিন সেটিকে দেখা যায়নি। সাগরে চলাচলকারী জাহাজকে স্যাটেলাইটে (উপগ্রহ) ধারণ করার সক্ষমতা সীমিত। স্থলভাগে থাকা সামরিক সরঞ্জামগুলো উপগ্রহে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হয়।

উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিবিসি ভেরিফাই এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি যুদ্ধজাহাজের অবস্থান শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক শক্তিচালিত নিমিৎজ-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও। এতে তিনটি ডেস্ট্রয়ারসহ হামলা চালানোর সক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম আছে।

এ ছাড়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতাসম্পন্ন আরও দুটি ডেস্ট্রয়ার এবং উপকূলসংলগ্ন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত তিনটি জাহাজও শনাক্ত হয়েছে। এগুলো বর্তমানে উপসাগরের বাহরাইন নেভাল স্টেশনে অবস্থান করছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মার্কিন ঘাঁটির কাছে আরও দুটি ডেস্ট্রয়ার দেখা গেছে আর লোহিত সাগরে রয়েছে আরেকটি ডেস্ট্রয়ার।

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন উড়োজাহাজ চলাচলের বিষয়টিকেও পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিবিসি ফেরিফাই। এতে দেখা গেছে, জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে এফ-১৫ এবং ইএ-১৮ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মার্কিন পণ্যবাহী বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ এবং যোগাযোগসহায়ক উড়োজাহাজের চলাচলও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড গত ৬ ফেব্রুয়ারি আরব সাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে রণতরিটির পাশে ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান, নজরদারি উড়োজাহাজ ও কোস্টগার্ড জাহাজ দেখা যায়। এসব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের স্পষ্ট বার্তা।

জবাবে ইরানও শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে। গতকাল সোমবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী উপসাগরে অবস্থিত হরমুজ প্রণালিতে নৌ মহড়া চালিয়েছে। আইআরজিসির প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুরকে বন্দরে নৌযান পরিদর্শন করতে দেখা যায়। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম পরে একটি জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্যও প্রকাশ করেছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়। ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্জ দ্বীপ থেকেও এ পথ দিয়ে তেল সরবরাহ হয়ে থাকে। হরমুজে ইরানের মহড়া চলাকালে আইআরজিসির প্রধান পাকপুরকে একটি বন্দরে নৌযান পরিদর্শন করতে দেখা গেছে। এরপর একটি জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্য প্রকাশ করা হয়।

মিডনাইট হ্যামার অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। ইরানের সামরিক শক্তি ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। ঝুঁকি নির্ণয়বিষয়ক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সিবিলিনের প্রধান ক্রাম্প বলেন, বর্তমানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং ওই অঞ্চলে থাকা আটটি বিদ্যমান বিমানঘাঁটির সহায়তায় প্রতিদিন প্রায় ৮০০টি অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। এর লক্ষ্য হবে, ইরানের পাল্টা হামলাকে ‘অকার্যকর’ করে দেওয়া।

ক্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা যা দেখছি, তা শুধু হামলার প্রস্তুতি নয়; বরং এটি একটি বিস্তৃত আকারের প্রতিরোধমূলক মোতায়েন; যা প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো বা কমানো যায়।’

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি