image

শুল্ক নীতি

সুপ্রিম কোর্টের রায় ‘উপেক্ষা’ ট্রাম্পের, কী বলছে আইন?

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক আমদানির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর বড় প্রশ্ন উঠেছে, সুপ্রিম কোর্ট কোনো রায়ে তার আগের শুল্ক নীতিকে সীমিত বা বাতিল করলে, তিনি কি আবার শুল্ক বসাতে পারেন? আইন বলছে, সম্ভব। তবে নির্দিষ্ট শর্তে ও ভিন্ন আইনি ভিত্তিতে। বিষয়টি সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী শুল্ক আরোপের মূল ক্ষমতা কংগ্রেসের। কিন্তু কংগ্রেস বিভিন্ন সময়ে আইন করে সেই ক্ষমতার কিছু অংশ প্রেসিডেন্টকে অর্পণ করেছে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট একেবারে নিজের ইচ্ছায় নয় বরং কংগ্রেস পাস করা আইনের কাঠামোর ভেতর থেকেই শুল্ক আরোপ করেন।

এখানেই আসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা। আদালত সরাসরি শুল্কহার নির্ধারণ করে না। তারা পরীক্ষা করে, প্রেসিডেন্ট যে আইনের অধীনে শুল্ক আরোপ করেছেন, সেটির প্রয়োগ আইনসঙ্গত হয়েছে কি না। যদি আদালত মনে করে আইনটির ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে বা ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করা হয়েছে, তাহলে সেই নির্দিষ্ট আদেশ বাতিল হতে পারে। কিন্তু তাতে প্রেসিডেন্টের সব ধরনের শুল্ক ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না।

ধরা যাক, আদালত বলল, একটি নির্দিষ্ট আইনের অধীনে জারি করা শুল্ক বৈধ নয়। সেক্ষেত্রে প্রশাসন অন্য কোনো আইন ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট শুল্ক আরোপ করতে পারেন:

১. ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্ট (সেকশন ২৩২): জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির যুক্তিতে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক বসানো যায়। যেমন- ইস্পাত বা অ্যালুমিনিয়াম।

২. ট্রেড অ্যাক্ট (সেকশন ৩০১): কোনো দেশ ‘অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ’ করলে তার বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা যায়।

৩. ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট: জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা শুল্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সুপ্রিম কোর্ট যদি একটি আইনের প্রয়োগে আপত্তি তোলে, প্রশাসন অন্য আইনের কাঠামো ব্যবহার করতে পারে। তবে এতে নতুন করে তদন্ত, যুক্তি, নোটিশ ও পরামর্শ প্রক্রিয়া মানতে হয়। শুধু ঘোষণা দিলেই তা টিকে যাবে- এমন নয়। আদালত আবারও পরীক্ষা করবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। আদালত অনেক সময় নীতির বিরোধিতা করে না, বরং দেখে- প্রেসিডেন্ট কি যথাযথ তদন্ত করেছেন, প্রমাণ দেখিয়েছেন, নাকি ক্ষমতা অপব্যবহার করেছেন। যদি প্রক্রিয়াগত ঘাটতি থাকে, প্রশাসন সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন আদেশ জারি করতে পারে।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে বড় ফ্যাক্টর। কংগ্রেস চাইলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করতে নতুন আইন আনতে পারে। আবার সমর্থন থাকলে প্রশাসনের পদক্ষেপ কার্যত শক্তিশালী হয়। ফলে শুল্ক নীতি শুধু আইনি বিষয় নয়- এটি রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও জড়িত।

এবার আসি বাস্তব ঝুঁকিতে। নতুন শুল্ক আরোপ হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা অঙ্গরাজ্যগুলো আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ফলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দেশ পাল্টা শুল্ক দিলে বাণিজ্যযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এতে বিশ্ববাজার ও মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক বাড়ালে স্বল্পমেয়াদে দেশীয় শিল্প কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে। কিন্তু আমদানিনির্ভর শিল্প ও ভোক্তাদের ওপর মূল্যচাপ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে প্রশাসনকে শুধু আইনি নয়, অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।

সব মিলিয়ে আইনের অবস্থান স্পষ্ট। সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দিষ্ট শুল্ক আদেশ বাতিল করতে পারে, কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা সব আইনি পথ বন্ধ করে দিতে পারে না। নতুন ভিত্তি, নতুন যুক্তি ও সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে প্রেসিডেন্ট আবার শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তবে সেটি আবারও বিচারিক পরীক্ষার মুখে পড়বে।

অতএব, প্রশ্নটির সরল উত্তর- হ্যাঁ, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও ট্রাম্প নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে পারেন। কিন্তু সেটি টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে আইনি ভিত্তি, প্রক্রিয়াগত শুদ্ধতা ও রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর। আইন এখানে বাধা নয়; বরং শর্ত আরোপ করে। আর সেই শর্ত কতটা দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করা যায়, সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে নীতির ভবিষ্যৎ।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি