image

নারায়ণগঞ্জ-৫: কালাম-মাকসুদ-মামুনের ত্রিমুখী লড়াই

আফানারা আক্তার, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের ভোটের মাঠ এখন আর স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের কঠিন লড়াইয়ে। ত্রিমুখী সমীকরণে আবুল কালাম, মাকসুদ হোসেন ও এবিএম সিরাজুল মামুন এই তিনজনই একে অন্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন।

শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে বরাবরই হাইভোল্টেজ। প্রতি নির্বাচনেই রাজনৈতিক দলগুলো আসনটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ও পরিচিত মুখকে প্রার্থী করার প্রবণতা বরাবরের মতোই, ব্যতিক্রম হয়নি এই নির্বাচনেও। অধিকাংশ প্রার্থীই পরিচিত ও আলোচিত, যার মধ্যে একজন এই আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য।

নতুন সীমানা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং বন্দর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নÑ বন্দর, কলাগাছিয়া, মুছাপুর, ধামগড় ও মদনপুর নিয়ে আসনটি গঠিত। মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ২৮২ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৮২০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭ জন। এবারের নির্বাচনে ১০ জন প্রার্থী থাকলেও বাস্তবে লড়াই সীমাবদ্ধ তিন জনেই।

আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী আবুল কালাম। তিনি এই আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি মোটামুটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তির, সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রভাবও রয়েছে তার। তিনি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিনের ছেলে। ফলে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারের মাঝে তার পরিচিতি আছে। বিশেষ করে বন্দর উপজেলায়। বন্দরকে তার ‘দূর্গ’ বলেন অনেকে।

তবে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাচাতো ভাই, বন্দর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলসহ স্থানীয় বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার বিরোধ। আর বিভিন্ন কারণে দলের বেশ কিছু শীর্ষ নেতা তার নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় নন, যা তাকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলেছে।

নির্বাচনের শুরুতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন এখন আবুল কালামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে দলটির তৎকালীন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় বহিষ্কৃত হন তিনি। প্রভাবশালী ওসমান বলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন করেও জয়ী হয়ে তিনি ভোটের মাঠে নিজের সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন। সেই নির্বাচনের কারণে ওসমানবিরোধী ভোটের একটি অংশ এখনও তার সঙ্গে রয়েছে।

এছাড়া বন্দরে দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি থাকার সুবাদে তার রয়েছে জনসম্পৃক্ততা ও মাঠপর্যায়ে নিজস্ব কর্মী বাহিনী। সংসদ নির্বাচনে নেমে সুসংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে ভোটের মাঠে আলোড়ন তুলতে পেরেছেন এই প্রার্থী। বিগত দিনের একাধিক মিছিল-সমাবেশ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।

এখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন। তিনি খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। দীর্ঘদিন জেলাপর্যায়ে দলের নেতৃত্বে আছেন। তরুণ সমাজের কাছে তিনি ‘মোল্লা মামুন স্যার’ নামে পরিচিত। আশির দশকেই নারায়ণগঞ্জে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি পান। পাশাপাশি ইসলামিক বক্তা ও ‘স্বচ্ছ’ ভাবমূর্তির এই প্রার্থী এখানে ভোটারদের মধ্যে গুরুত্ব পেয়েছেন।

বন্দর উপজেলায় আবুল কালাম ও মাকসুদ হোসেনের শক্ত অবস্থান থাকলেও শহরে তুলনামূলক কম। আর সিরাজুল মামুনের পরিচিতি নারায়ণগঞ্জ শহরেই বেশি। শহরাঞ্চল থেকেই উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে পারেন তিনি। এছাড়া জোটের প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতসহ শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই তার পক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন। আসনটিতে ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে, যার অধিকাংশই তার ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা। তবে ইসলামী আন্দোলন জোটের বাইরে থাকায় শেষপর্যন্ত ভোটের সমীকরণ কী দাঁড়াবে তা অনেকেই বলতে পারছেন না।

চূড়ান্ত সমীকরণে এই তিন প্রার্থীরই ভোট কাটবেন গণসংহতি আন্দোলনের তারিকুল ইসলাম সুজন ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ।

তরুণ প্রার্থী তারিকুল ইসলাম সুজন রাজনৈতিক জীবনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ও নাগরিক বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন। নির্বাচনী মাঠেও ব্যতিক্রমী প্রচারণার মধ্য দিয়ে ভোটারদের নজর কেড়েছেন। এছাড়া গত জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে তার ও তার দলের নেতাকর্মীদের বিশেষ ভূমিকা ছিল।

ইসলামী আন্দোলন মহানগরের সভাপতি মুফতি মাছুম বিল্লাহ। সজ্জন ও ইসলামিক বক্তা হিসেবে শহরে তার পরিচিতি রয়েছে। তার সাংগঠনিক দক্ষতার দরুণ তৃণমূলে তার প্রভাব আছে। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের নিজস্ব ভোটব্যাংকও আছে। গত সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। নির্বাচনী মাঠে তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি দলীয় ভোটের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী বলে মনে করেন অনেকে।

আসনটিতে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সিপিবির মন্টু চন্দ্র ঘোষ, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের সৈয়দ বাহাদুর শাহ্ মুজাদ্দেদী, বাসদের আবু নাঈম খান বিপ্লব, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের এইচএম আমজাদ হোসেন মোল্লা ও গণঅধিকার পরিষদের মো. নাহিদ হোসেন। ভোটের মাঠে তারাও সোচ্চার ও নিয়মিত প্রচারণা করেছেন।

সবমিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের লড়াই এখন ত্রিমুখী মনে হলেও শেষমুহূর্তে ভোটার উপস্থিতি, দলীয় ঐক্য ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে ফলাফল।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি