alt

উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গ ভোটের ফল ও মমতার ভবিষ্যৎ

রজত রায়

image
সোমবার, ০৩ মে ২০২১

পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন হলেও কোন সন্দেহ নেই যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের দিকেই গোটা ভারত তো বটেই, উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোও অধীর আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ। কারণটাও অজানা নয়। একদা বামদূর্গ বলে সুবিদিত এবং পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক জননেত্রীর শাসনাধীন পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সুবাদে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আঁতুরঘর বলে চিহ্নিত হয়েও বিজেপির নাগালের বাইরে ছিল।

২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের সময় তারা প্রথমবার বিরাটভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তারপরেই তারা এবারের নির্বাচনে রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য ঝাঁপায়। যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং অন্য হেভিওয়েট নেতারা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে ঘন ঘন এসেছেন, ঘাঁটি গেড়ে বসেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছিল যে এই রাজ্যের গুরুত্ব তাদের কাছে অপরিসীম।

তামিলনাড়ু, কেরালায় হার অনিবার্য্য, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিজয় করা গেলে শুধু মুখ রক্ষাই হবে না, দেশজুড়ে করোনা মোকাবিলায় মোদি সরকারের ব্যর্থতার দায় অনেকটাই ঝেড়ে ফেলা যাবে। সেই সঙ্গে ক্ষমতায় এলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী, তার কিছু নমুনা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নির্বাচনী প্রচারে এসে জানিয়ে গেছেন। ফলে, আশঙ্কার কালো মেঘ জমছিলই। আরও বলা হচ্ছিল যে পশ্চিমবঙ্গের ভোটদাতারা এখন ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যাগুরু হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছেন।

কিন্তু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বোঝা গেল ভোট ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে হয়নি, হয়েছে ‘বিজেপি হঠাও, দেশ বাঁচাও’ জাতীয় সেøাগানের ভিত্তিতে। তাই বিজেপিকে ঠেকাতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমুল কংগ্রেসকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। তাই তৃতীয় শক্তি বাম-কংগ্রেস-আব্বাস সিদ্দিকী জোটকে ভোট দিয়ে বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগাভাগি করার ঝুঁকি নেননি।

আরও দুটি কথা উল্লেখযোগ্য, এবারের ভোটে রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ যারা মুসলমান পরিচয় বহন করেন, তারা নিজেদের ভোট ভাগ করতে দেননি। তাই দীর্ঘদিন ধরে মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও মুর্শিদাবাদ জেলায় কংগ্রেসের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এবার তারা একযোগে কংগ্রেস ছেড়ে মমতার তৃণমুল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের সময় উত্তর মালদহ কেন্দ্রে এই দুই দলের মধ্যে ভোট কাটাকাটির জেরেই বিজেপি প্রার্থী জিতে যান। এবার মুসলমানরা হিসাব কষেই সবাই এক জায়গায় ভোট দিয়েছেন, কারণ এবারের ভোটের লড়াইটা ছিল তাদের কাছে ধর-প্রাণ বাঁচানোর লড়াই। এনআরসি এবং সিএএ জাতীয় সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব হারানোর বিরুদ্ধে লড়াই।

এবারের ভোটের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহিলা ভোটদাতাদের ভূমিকা। মহিলারা কত শতাংশ মমতার দিকে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও বোঝাই যাচ্ছে যে মমতার জনসভায় তাদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, ভোটদাতাদের লাইনে বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতির মধ্যে একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মমতা মেয়েদের জন্য একগুচ্ছ প্রকল্প শুরু করেন। কন্যাশ্রী, সবুজসাথী ইত্যাদির মাধ্যমে মেয়েদের স্কুল কলেজে পড়াশোনার কাল বাড়িয়ে দেয়া ও নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে ঠেকাতে উৎসাহ দেয়া তার অন্যতম। এবার ভোটের মুখে স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগায়। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পে পরিবারের মহিলা সদস্যকেই গৃহকত্রীর সম্মান দিয়ে শুধু তার নামেই কার্ড করা যায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা শুধু তার পরিবারের সদস্য হিসাবে সুবিধা পান। এ ভাবে মহিলাদের সম্মান দেয়ার সুফল মমতা হাতেনাতে পেলেন।

‘বাংলা তার নিজের মেয়েকেই চায়’ জাতীয় স্লোগানের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির কণ্ঠে একের পর এক জনসভা থেকে মমতাকে ব্যঙ্গ করে ‘দিদি, ও দিদি’ বলে ক্রমাগত ডাক সাধারণ মানুষের কাছে যে কুরুচিকর মনে হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। ভাঙ্গা পায়ে প্লাস্টার করে হুইল চেয়ারে বসেই গোটা রাজ্য ঘুরে মমতার সাহসী প্রচার যে রাজ্যের নারী ভোটারদের মন জয় করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

এবারের ভোটে রাজ্যে মোট ভোটদাতাদের সংখ্যা ছিল কমবেশি সাত কোটি ২০ লাখ, তার মধ্যে তিন কোটি ৪৮ লাখ নারী ভোটার। বিজেপিকে ঠেকাতে এরাও মুসলমানদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

ভোট শেষ। ফল ঘোষণাও হয়ে গেছে। মমতা বিপুলভাবে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের বিজেপিকে পরাস্ত করেছেন। এবার কী হতে চলেছে? সংক্ষেপে বলা যায়, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আমরা এখন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন দেখতে পাব বলেই মনে করি। যেমন, মমতাকে এবার জাতীয় রাজনীতিতে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলকে জোটবদ্ধ করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে দেখতে পারি। রাহুল গান্ধী অনেক সুযোগ পেয়েও নিজেকে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পারার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। শরদ পওয়ার বৃদ্ধ, এবং নিজের রাজ্য মহারাষ্ট্রে অবিসংবাদিতভাবে ক্ষমতার অধিকারী নন। তামিলনাড়ুর সদ্য নির্বাচনে জয়ী এমকে স্ট্যালিন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন। তাছাড়া এদের কাউকেই মমতার মতো বিজেপির তৈরি চক্রব্যুহে পড়তে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভার প্রায় সব হেভিওয়েট নেতা দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে মমতাকে ক্রমাগত ব্যক্তিগত আক্রমণ করে গেছেন। তার দলের বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মীকে বেছে বেছে ঠিক ভোটের মুখেই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই), এনফোর্সমেন্ট বিভাগ (ইডি), আয়কর বিভাগ, জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) তদন্তের নামে হয়রানি করতে শুরু করে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত অনেকেরই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। অনেকে তো প্রকাশ্যেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের অভিযোগ এনেছেন।

(কলকাতা)

ছোট মাছের পুষ্টি

ছবি

রবি নিয়োগী : অগ্নিযুগের বিপ্লবী জননেতা

ছবি

গাছ কাটার অপসংস্কৃতি ছাড়ুন শহরটাকে বাসযোগ্য থাকতে দিন

১৬৪ ও ২২ ধারায় জবানবন্দির কপি আসামির পেতে বাধা কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আমলাদের পদায়নের সূচনা?

ইরান ও অপ্রতিরোধ্য ইসরায়েল

থ্যালাসেমিয়া রোধে সচেতনতা জরুরি

করোনাকালে নতুন সংকটে মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা

ছবি

অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের পেতে হবে

ছবি

কমরেড রেবতী মোহন বর্মণ

ছবি

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন, বিজেপি এবং বাংলাদেশের মৌলবাদ

বৈধতা ছাড়া কীভাবে চলছে স্পিডবোট?

ছবি

ভয়ংকর রূপে করোনার ট্রিপল মিউট্যান্ট

ছবি

সুন্দরবনে বারবার আগুন কেন?

নতুন শঙ্কা : ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

পাবনা প্রেসক্লাবের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

রক্তাক্ত মাতৃভাষা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা

করোনাকালে বোধের রোদন

কোভিড-১৯ : মৎস্যজীবীদের দারিদ্র্য ও শোভন বাংলাদেশ

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

ছবি

ঘুঘু ও পায়রা হত্যার বিচার চাই

করোনা ও হেফাজত

ছবি

সরকার উভয় সংকটে

উন্নয়নের নতুন অভিযাত্রা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই যুগ

ছবি

করোনা ক্ষমতার বৃত্ত চেনে না

সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি

দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল

মহামারীর অক্সিজেন বনাম গাছবিমুখ উন্নয়ন

ছবি

মাস্কই বড় ভ্যাকসিন

ছবি

অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনে রক্ত জমাটের ঝুঁকি কতটা উদ্বেগের?

রক্তাক্ত মাতৃভাষা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা

ছবি

আসুন মানবতাবাদের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বিশ্ব গড়ি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কি থমকে গেল?

ছবি

রাসায়নিক গুদাম : ফি বছর মানুষ কেন অঙ্গার হয়?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গ ভোটের ফল ও মমতার ভবিষ্যৎ

রজত রায়

image
সোমবার, ০৩ মে ২০২১

পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন হলেও কোন সন্দেহ নেই যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের দিকেই গোটা ভারত তো বটেই, উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোও অধীর আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ। কারণটাও অজানা নয়। একদা বামদূর্গ বলে সুবিদিত এবং পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক জননেত্রীর শাসনাধীন পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সুবাদে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আঁতুরঘর বলে চিহ্নিত হয়েও বিজেপির নাগালের বাইরে ছিল।

২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের সময় তারা প্রথমবার বিরাটভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তারপরেই তারা এবারের নির্বাচনে রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য ঝাঁপায়। যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং অন্য হেভিওয়েট নেতারা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে ঘন ঘন এসেছেন, ঘাঁটি গেড়ে বসেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছিল যে এই রাজ্যের গুরুত্ব তাদের কাছে অপরিসীম।

তামিলনাড়ু, কেরালায় হার অনিবার্য্য, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিজয় করা গেলে শুধু মুখ রক্ষাই হবে না, দেশজুড়ে করোনা মোকাবিলায় মোদি সরকারের ব্যর্থতার দায় অনেকটাই ঝেড়ে ফেলা যাবে। সেই সঙ্গে ক্ষমতায় এলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী, তার কিছু নমুনা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নির্বাচনী প্রচারে এসে জানিয়ে গেছেন। ফলে, আশঙ্কার কালো মেঘ জমছিলই। আরও বলা হচ্ছিল যে পশ্চিমবঙ্গের ভোটদাতারা এখন ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যাগুরু হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছেন।

কিন্তু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বোঝা গেল ভোট ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে হয়নি, হয়েছে ‘বিজেপি হঠাও, দেশ বাঁচাও’ জাতীয় সেøাগানের ভিত্তিতে। তাই বিজেপিকে ঠেকাতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমুল কংগ্রেসকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। তাই তৃতীয় শক্তি বাম-কংগ্রেস-আব্বাস সিদ্দিকী জোটকে ভোট দিয়ে বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগাভাগি করার ঝুঁকি নেননি।

আরও দুটি কথা উল্লেখযোগ্য, এবারের ভোটে রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ যারা মুসলমান পরিচয় বহন করেন, তারা নিজেদের ভোট ভাগ করতে দেননি। তাই দীর্ঘদিন ধরে মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও মুর্শিদাবাদ জেলায় কংগ্রেসের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এবার তারা একযোগে কংগ্রেস ছেড়ে মমতার তৃণমুল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের সময় উত্তর মালদহ কেন্দ্রে এই দুই দলের মধ্যে ভোট কাটাকাটির জেরেই বিজেপি প্রার্থী জিতে যান। এবার মুসলমানরা হিসাব কষেই সবাই এক জায়গায় ভোট দিয়েছেন, কারণ এবারের ভোটের লড়াইটা ছিল তাদের কাছে ধর-প্রাণ বাঁচানোর লড়াই। এনআরসি এবং সিএএ জাতীয় সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব হারানোর বিরুদ্ধে লড়াই।

এবারের ভোটের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহিলা ভোটদাতাদের ভূমিকা। মহিলারা কত শতাংশ মমতার দিকে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও বোঝাই যাচ্ছে যে মমতার জনসভায় তাদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, ভোটদাতাদের লাইনে বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতির মধ্যে একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মমতা মেয়েদের জন্য একগুচ্ছ প্রকল্প শুরু করেন। কন্যাশ্রী, সবুজসাথী ইত্যাদির মাধ্যমে মেয়েদের স্কুল কলেজে পড়াশোনার কাল বাড়িয়ে দেয়া ও নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে ঠেকাতে উৎসাহ দেয়া তার অন্যতম। এবার ভোটের মুখে স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগায়। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পে পরিবারের মহিলা সদস্যকেই গৃহকত্রীর সম্মান দিয়ে শুধু তার নামেই কার্ড করা যায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা শুধু তার পরিবারের সদস্য হিসাবে সুবিধা পান। এ ভাবে মহিলাদের সম্মান দেয়ার সুফল মমতা হাতেনাতে পেলেন।

‘বাংলা তার নিজের মেয়েকেই চায়’ জাতীয় স্লোগানের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির কণ্ঠে একের পর এক জনসভা থেকে মমতাকে ব্যঙ্গ করে ‘দিদি, ও দিদি’ বলে ক্রমাগত ডাক সাধারণ মানুষের কাছে যে কুরুচিকর মনে হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। ভাঙ্গা পায়ে প্লাস্টার করে হুইল চেয়ারে বসেই গোটা রাজ্য ঘুরে মমতার সাহসী প্রচার যে রাজ্যের নারী ভোটারদের মন জয় করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

এবারের ভোটে রাজ্যে মোট ভোটদাতাদের সংখ্যা ছিল কমবেশি সাত কোটি ২০ লাখ, তার মধ্যে তিন কোটি ৪৮ লাখ নারী ভোটার। বিজেপিকে ঠেকাতে এরাও মুসলমানদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

ভোট শেষ। ফল ঘোষণাও হয়ে গেছে। মমতা বিপুলভাবে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের বিজেপিকে পরাস্ত করেছেন। এবার কী হতে চলেছে? সংক্ষেপে বলা যায়, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আমরা এখন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন দেখতে পাব বলেই মনে করি। যেমন, মমতাকে এবার জাতীয় রাজনীতিতে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলকে জোটবদ্ধ করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে দেখতে পারি। রাহুল গান্ধী অনেক সুযোগ পেয়েও নিজেকে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পারার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। শরদ পওয়ার বৃদ্ধ, এবং নিজের রাজ্য মহারাষ্ট্রে অবিসংবাদিতভাবে ক্ষমতার অধিকারী নন। তামিলনাড়ুর সদ্য নির্বাচনে জয়ী এমকে স্ট্যালিন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন। তাছাড়া এদের কাউকেই মমতার মতো বিজেপির তৈরি চক্রব্যুহে পড়তে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভার প্রায় সব হেভিওয়েট নেতা দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে মমতাকে ক্রমাগত ব্যক্তিগত আক্রমণ করে গেছেন। তার দলের বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মীকে বেছে বেছে ঠিক ভোটের মুখেই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই), এনফোর্সমেন্ট বিভাগ (ইডি), আয়কর বিভাগ, জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) তদন্তের নামে হয়রানি করতে শুরু করে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত অনেকেরই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। অনেকে তো প্রকাশ্যেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের অভিযোগ এনেছেন।

(কলকাতা)

back to top