alt

সাময়িকী

শুদ্ধ সংস্কৃতির মানুষ আবুল হাসনাত

হারিস উদ্দিন

: শনিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২১

সময়ের চলার গতি প্রকৃতির নিয়মে এক হলেও সবার জীবনে সময় একভাবে অতিবাহিত হয় না। আবুল হাসনাতের সাথেও আমার সময়টা যেন দ্রুতই ফুরিয়ে গেলো। এমন কোনও বয়স হয় নাই যার জন্য একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হলো। কথাটা আবুল হাসনাত ও আমার সম্পর্কের কারণেই বলছি। আমরা তো ভালোই ছিলাম। আরোও কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা নিয়মিত যোগাযোগ, গল্প করা- সবকিছুই চলছিলো। হঠাৎ একদিন সকালবেলায় বন্ধু খন্দকার মুনীরুজ্জামান (সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, তিনিও প্রয়াত) টেলিফোনে হাসনাতের অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ আমাকে জানায়। তারিখটা ছিলো ১৫.১০.২০২০। তার আগেরদিন পেটে প্রচ- ব্যথা থাকায় হাসনাতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় গলব্লাডার স্টোনজনিত কারণে ব্যথা হয়ে থাকতে পারে। আরো পরীক্ষার পর পেটে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তার উপর ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেয়। সংক্রমণের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে নিউমোনিয়ার রূপ নেয় এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আস্তে আস্তে কমতে থাকায় ১ নভেম্বর সকাল ৮টায় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। আড্ডা ও গল্প করার অতৃপ্তি রয়েই গেলো আমার মধ্যে। দেশে করোনা সংক্রমণের কারণে হাসপাতাল ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি নাই। শ্বাসকষ্টের অসুবিধা থাকায় আমার ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিলো। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে আবুল হাসনাতের বাড়িতেই আমাদের শেষ আড্ডা বসেছিলো। বইমেলা উপলক্ষে কলকাতা থেকে প্রকাশক পার্থ শংকর বসু ঢাকায় এসেছিলেন। সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, পার্থ ও আমি হাসনাতের বাড়িতে সেই আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। তারপর আর দেখা হয় নাই। টেলিফোনের মাধ্যমেই নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো।

আবুল হাসনাত : প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি

http://sangbad.net.bd/images/2021/November/06Nov21/news/abul-hasnat01.jpg

আবুল হাসনাত / জন্ম : ১৭ জুলাই ১৯৪৫; মৃত্যু : ১ নভেম্বর ২০২০

ছাত্র ইউনিয়নের একাদশ সম্মেলনে আবুল হাসনাতের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬৯ সালের ২রা জুলাই ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে। আমার সাথে তাঁর তখনও কোনও আলাপ হয় নাই। সম্মেলনে তিনি আবারো কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে সামসুদ্দোহা ও নূরুল ইসলাম নাহিদ। তার আগে ছাত্র ইউনিয়নের দশম সম্মেলনেও সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক ও সামসুদ্দোহা কমিটিতে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে নাসিমুন আরা মিনুও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তারা বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেন। ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের দ্বাদশ সম্মেলনে তিনি প্রথম সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর এই শতাব্দির প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালি, ভোলা ও নোয়াখালির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যু হয় প্রায় তিন লক্ষ মানুষের। ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, গাছপালা, হাঁসমুরগি, গরুছাগল। দেখা দেয় খাদ্য ও পানীয়জলের প্রচণ্ড অভাব। ঢাকা থেকে ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে একদল স্বেচ্ছাসেবক লঞ্চে করে ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ করেন। ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সাথে আবুল হাসনাতও এই কার্যক্রমে অংশ নেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার কয়েকটি আসনে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আবুল হাসনাত ন্যাপের প্রার্থী সরদার আঃ হালিমের পক্ষে কাজ করেছেন। আমিও তখন ন্যাপ করি।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা আবুল হাসনাতের সেই ভূমিকাকে ভুলি নাই। ছাত্ররাজনীতির সাথে সাথে ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি দৈনিক সংবাদে চাকরিতে যোগদান করেন

১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার গভীর ষড়যন্ত্র। পূর্বপাকিস্তানের ছাত্রজনতা এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন শুরু করে দেয়। এই আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত উজ্জ্বল। ’৭১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ছাত্র ইউনিয়নের এক বিশাল ছাত্র-জনতার সমাবেশে সামসুদ্দোহা ঘোষণা করেন যে, “৩রা মার্চ ১৯৭১ তারিখে নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বানচাল করা হলে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল শক্তির সরকার গঠন করা হবে। ভুট্টো যোগদান না করলেও অধিবেশন হবে, না হয় স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করা হবে।” এই অনুষ্ঠানে নূরুল ইসলাম নাহিদের অনুপস্থিতির কারণে (বিদেশে থাকায়) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আবুল হাসনাত সেই ছাত্র-জনসভায় সভাপতিত্ব করেন। এটি এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত তখনকার প্রত্যেকটি সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ে ছাত্র ইউনিয়নকে নেতৃত্ব দিয়ে সেসময় আন্দোলনকে আরও বেগবান করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন হাসনাত। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা আবুল হাসনাতের সেই ভূমিকাকে ভুলি নাই। ছাত্ররাজনীতির সাথে সাথে ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি দৈনিক সংবাদে চাকরিতে যোগদান করেন। বেতন খুব বেশি না হলেও মাসশেষে হাতে কিছু টাকা পাওয়া তখনকার দিনে কম সৌভাগ্যের কথা ছিলো না। সেই টাকায় নিজের চলাফেরা, বন্ধুদের অন্তত চা-সিঙ্গারা খাওয়ানোর মধ্যে কম আনন্দ ছিলো না।

সেই সময় সংবাদের মালিক ছিলেন ন্যাপনেতা ও বিশিষ্ট শিল্পপতি আহমদুল কবির। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী এবং শহীদুল্লা কায়সারকে সংবাদের কর্ণধার বলা হতো। পত্রিকাটি স্বাধীন ও প্রগতিশীলতার নীতির ব্যাপারে আপোস করে নাই। পত্রিকার মালিক কোনোদিন সম্পাদকীয় নীতি ও পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেননি। অর্থকষ্ট ছিলো সংবাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও সাংবাদিক ও কর্মচারীবৃন্দ সংবাদকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এর নীতি-আদর্শ ও সরকারবিরোধী ভূমিকার জন্য। সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে ‘সংবাদ’ একটি পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সাহিত্যপাতার বৈচিত্র্যের জন্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের কাছেও আগ্রহের সৃষ্টি করেছিলো পত্রিকাটি। আবুল হাসনাত দীর্ঘদিন বার্তা বিভাগে কাজ করার পর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে এই বিভাগে যোগ দেন। তাঁর সম্পাদনায় সাহিত্যপাতা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সাংস্কৃতিক জাগরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২৯ বছর সংবাদের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে পরবর্তীতে তিনি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে যোগ দেন। সংবাদে তাঁর আর্থিক অর্জন কম হলেও শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির বিবেচনায় অনেক উচ্চতায় তিনি নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলেও গোপনে রাজনৈতিক কাজকর্ম চলছিলো ঠিকই। প্রকাশ্যে অনেকেই ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পার্টির নির্দেশেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্টি প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে। পুরানা পল্টনে অফিস স্থাপন করে ‘একতা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতে থাকে। ১৯৭২ সালে ‘গণসাহিত্য’ নামে আরোও একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করে। পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় আবুল হাসনাতকে। পত্রিকাটি দেখে কলকাতার কালান্তর গোষ্ঠীর মার্ক্সীয় সাহিত্য সাময়িকীর কথা মনে পড়ে। সেই মাসিক পত্রিকাটির নাম ছিলো ‘মূল্যায়ন’। বাংলাদেশের মতো ভারতবর্ষেও রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) প্রভাব কমতে থাকায় পত্রিকাটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ সিপিআই এর পরিচালনায় ‘দৈনিক কালান্তর’-এর প্রকাশনা বিভাগ থেকেই এটি প্রকাশিত হতো। ‘গণসাহিত্য’ও আবুল হাসনাতের সম্পাদনায় একটি পরিচ্ছন্ন মার্ক্সীয় সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তরুণ পাঠক সমাজের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রুচিশীল পত্রিকা হিসেবে দিন দিন এর প্রচার সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের লেখকদের পাশাপাশি কলকাতার প্রগতিশীল লেখকদের লেখাও সেখানে ছাপা হতো। প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় ‘গণসাহিত্য’ ছিলো সত্যিই অপূর্ব। পাবলো পিকাসোর পৃথিবীবিখ্যাত চিত্রকর্ম গোয়ের্নিকাসহ বিখ্যাতসব চিত্রকর্ম ব্যবহৃত হতো ‘গণসাহিত্য’-এর প্রচ্ছদে। এক কথায়, ‘গণসাহিত্য’-এর প্রচ্ছদ সবসময়ই গণমানুষের কথা বলার চেষ্টা করেছে এবং পেয়েছে মানুষের আস্থা।

আবুল হাসনাত একজন সংবাদকর্মী বা সাহিত্য সম্পাদক ছাড়াও ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত কবি ও লেখক। কবি হিসেবে তিনি মাহমুদ আল জামান হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তিনি শুধু মৌলিক কবিতাই রচনা করেননি, অনেক কবিতার অনুবাদও করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। পশতু কবি আজমল খাটকের কবিতাসহ পশতু ভাষার কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেন। ‘পশতু গণমুখী কবিতা’ নামে তা বই হিসাবে প্রকাশ পায় ও অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। ছাত্র রাজনীতি করার সময় পর্যন্ত সিলেটের কবি দিলওয়ারের আরো একটি দীর্ঘ কবিতা পড়ার সুযোগ হয়েছিলো আমার। এছাড়াও হাসনাতের প্রকাশিত সর্বশেষ বইটি ‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’ একটি স্মৃতিচারণামূলক বই। সময়ের বিবেচনায় এটি একটি মূল্যবান দলিল। বইটিতে তিনি তাঁর বাল্যকাল, পুরান ঢাকার স্মৃতি, ছাত্ররাজনীতি, সংবাদের চাকরিজীবন, মুক্তিযুদ্ধ, এবং বাংলাদেশ ও কলকাতার কিছু বিশেষ ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করেছেন- যা নিঃসন্দেহে অনেকের আগ্রহের কারণ হবে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে যোগদানের পর আবুল হাসনাত সমাজে নিজেকে একজন গ্রহণযোগ্য ও দায়বদ্ধ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘কালি ও কলম’ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল সাহিত্যপত্রিকার শূন্যস্থান পুরণ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। প্রবীণ লেখকদের পাশাপাশি নবীনদের মানসম্পন্ন লেখাকেও উৎসাহিত করা হতো ‘কালি ও কলম’-এ। পত্রিকার কাজে বহুবার কলকাতায় গিয়ে সেখানকার বিশিষ্ট শিল্পী-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে আলাপ করে সেখানে পত্রিকাকে আরো মেলে ধরার চেষ্টা করেছেন আবুল হাসনাত। সেই সাথে নিজের পরিচিতির বিস্তৃতি আরো বেড়েছে।

আবুল হাসনাত একজন সার্থক সম্পাদক হিসাবে যেমন অনেক লেখক তৈরি করেছেন, অনেক লেখককে বিকশিত হতে সহযোগিতা করেছেন, তেমনি তিনি নিজেও ছিলেন একজন কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক। যদিও তার লেখক পরিচয় ছাপিয়ে তার সম্পাদক পরিচয়টাই সবার কাছে প্রধান হয়ে উঠেছে। আর তিনিও সম্পাদনার কাজেই বেশি সময় ও মনোযোগ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ। ‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’ আত্মজীবনী গ্রন্থের আগে প্রকাশিত হয় তার একটি প্রবন্ধ সংগ্রহ ‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’। দুটি গ্রন্থেরই প্রকাশক জার্নিম্যান বুকস। জার্নিম্যান বুকস আরও প্রকাশ করেছে তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও ‘কিশোর সমগ্র’। পরিচিতি না পাওয়ার আরেকটি কারণ তিনি কবিতা লিখতেন মাহমুদ আল জামান নামে। এই নামে তিনি ৫টি কিশোর উপন্যাস এবং কিশোরদের জন্য ৩টি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। কবিতাগ্রন্থ গুলো প্রকাশও করেছেন দেরিতে। কবিতা গ্রন্থগুলোর নাম ‘জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক’, ‘কোন একদিন ভুবনডাঙ্গায়’, ভুবনডাঙ্গার মেঘ ও নধর কালো বিড়াল’। কিশোর উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘রানুর দুঃখ, ভালবাসা’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর’, ‘যুদ্ধদিনের পোড়োবাড়ি’ এবং ‘সমুদ্র ও টুকুর গল্প’। ‘সমুদ্র ও টুকুর গল্প’ উপন্যাসের জন্য তিনি অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (স্বর্ণপদক) পান। মাহমুদ আল জামান নামে তার জীবনীগ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘জসীম উদ্দীন’, ‘সূর্যসেন’ ও ‘চার্লি চ্যাপলিন’।

আবুল হাসনাত প্রকাশনার জগতেও দক্ষতার ছাপ রেখে গেছেন। ‘কালি ও কলম’ সম্পাদক একই সঙ্গে বেঙ্গল পাবলিকেশনের নির্বাহী পরিচালকেরও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমৃত্যু সে দায়িত্ব পালন করেন। এখানেও তিনি সুরুচি ও যোগ্যতার ছাপ রাখেন।

উচ্চমান ও সুরুচি সম্পন্ন বেশ কিছু মুল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করে বেঙ্গল পাবলিকেশনকে অতি অল্প সময়ে মানসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা হিসাবে দাঁড় করিয়ে দেন নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসনাত। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই ‘জীবনানন্দ দাশের চারটি উপন্যাস: মূলানুগ পাঠ’ গ্রন্থটির কথা। এর ভূমিকা লেখা ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন ভূমেন্দ্র গুহ।

http://sangbad.net.bd/images/2021/November/06Nov21/news/abul-hasnat02.jpg

সহধর্মিণী নাসিমুন আরা হক মিনুর সঙ্গে আবুল হাসনাত

এই গ্রন্থটি বেঙ্গল পাবলিকেশনের একটি অতিমূল্যবান ও কৃতিত্বপূর্ণ প্রকাশনা। এর পুরো কৃতিত্ব আবুল হাসনাতের। তিনি ছাড়া এই গ্রন্থটি প্রকাশ হতো না। এজন্য আমরা তাঁর কাছে ঋণী হয়ে রইলাম। বেঙ্গল পাবলিকেশনের কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ।

আবুল হাসনাত শুধু একজন সাহিত্য সম্পাদকই ছিলেন না, গ্রন্থ সম্পাদনায়ও তাঁর অনন্য নিপুণতা ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ পাওয়া যায়। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০টি। পুস্তক সমালোচনা ও চিত্র সমালোচনায় তাঁর জুড়ি মেলা ছিলো ভার। তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে পা দিলেই দেখা যায় তাঁর বিশাল সংগ্রহের সব চিত্রকর্ম কি সুন্দরভাবে প্রতিটি দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। বাংলাদেশের কাইয়ুম চৌধুরী, কামরুল হাসান থেকে শুরু করে দুই বাংলার উল্লেখযোগ্য প্রায় সকলের চিত্রকর্মই স্থান পেয়েছে ঘরের কোনও না কোনও দেয়ালে। শুধু চিত্রকর্মই নয়, বই এবং সঙ্গীতের সংগ্রহ তাঁর আরও বিশাল। রাজনীতি ও সাহিত্য সংস্কৃতি ছাড়াও নানা বিষয়ের বই দেখা যায় তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দিজেন্দ্রলাল রায়ের গান, এবং তাঁর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সংগ্রহ থেকে তাঁর সঙ্গীতমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। শান্তিনিকেতনের হস্তশিল্প, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির ঘোড়াসহ নানাপ্রকার শিল্পকর্ম দেখলে তাঁর বাড়িটিকে একটা ছোটখাট যাদুঘর বলে মনে হয়।

ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকার সময়ই তিনি গোপন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। তথ্যগত ভুল কিংবা প্রয়োগের ক্ষেত্রের ভুলে সারাবিশ্বে যখন মার্ক্সীয় অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে, বাংলাদেশেও তাঁর বাতাস বইতে শুরু করে। এখানেও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত ভুলের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকর্মী দলত্যাগ করেন। আবুল হাসনাতকে তারপর থেকে আর পার্টি রাজনীতিতে সক্রিয় দেখিনি। অথচ মুক্তিযুদ্ধে এই পার্টির ছিলো অসাধারণ ভূমিকা। সিপিআইএর মাধ্যমে ভারত সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টাসহ আন্তর্জাতিকভাবে পূর্বইউরোপীয় দেশসমূহের সরকার ও জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা বোঝানোর কাজ অত্যন্ত আন্তরিকভাবে করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সেই উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি ও সরকার, বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলন ও বিভিন্ন কূটনৈতিক মাধ্যম ব্যবহার করে জাতিসংঘের সহানুভূতি আদায় করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন সিপিবি নেতৃবৃন্দ। আবুল হাসনাত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন পার্টির নির্দেশেই। প্রথমে ঢাকা শহর থেকে নরসিংদির রায়পুরা হয়ে শ্রমিকনেতা শহিদুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নবীনগরে পৌঁছান। নরসিংদির রায়পুরায় আরোও অনেক কম্যুনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সাথে দেখা হয় এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ পেয়ে কেউ ঢাকা শহর, কেউ আগরতলা, কেউ বা অন্য জেলায় রওনা হয়ে যান। আবুল হাসনাত আরো কিছু বন্ধুদের নিয়ে শহিদুল্লাহর সাথে আগরতলার পথে রওনা দেন। এই দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন ডাঃ ওয়াজেদুল ইসলাম, ডাঃ সরওয়ার আলী, আলমগীর কবির, শামসুদ্দোহা, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ মোট ১৬ জন।

আবুল হাসনাত একসময় ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে পল্টন ময়দানে ক্রিকেট খেলতেন এবং প্রথম বিভাগের খেলোয়াড় হিসেবে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাছাড়া ওয়ারী, নবাবপুর, নারিন্দা, রায়সাহেব বাজার, লক্ষ্মীবাজার, ভিক্টোরিয়া পার্ক ও সদরঘাটের অনেক কথা তাঁর কাছে শুনেছি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, ঘোড়ার গাড়ি, সংস্কৃতি ও খাবার-দাবার, এবং কথা বলার ধরন সম্বন্ধেও অনেক মজার মজার কথা শুনেছি যার কিছুটা সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত।

আবুল হাসনাতের সংস্পর্শে আমাদের সময় ভালোই কাটছিলো। করোনার কারণে শেষের দিনগুলি অনেকটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অতিবাহিত করি। সবশেষে বলা চলে, বন্ধুর দেখা যখন আর পাবো না, তাঁর চিন্তা ও কর্মকেই বাকিজীবন চেতনায় ধারণ করতে চাই। বন্ধু আবুল হাসনাতের আকস্মিক মৃত্যু আমার জন্য মেনে নেয়া খুবই কঠিন। তার স্মৃতি আমাদের মনে চির জাগরূক থাকবে। তাকে আর আমরা ফিরে পাবো না। তবু কবি, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, চিত্র সমালোচক ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসনাত বেঁচে থাকবেন তার রচনার মধ্যে, তার কাজের মধ্যে। হে বন্ধু বিদায়। (সংক্ষেপিত)

তথ্যসূত্র: ইতিহাসের অল্পকথা (মোঃ শামসুদ্দোহা)

স্মৃতিতে অনুভবে আবুল হাসনাত (মতিউর রহমান সম্পাদিত)

হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে (আবুল হাসনাত)

ছবি

শালুক সাহিত্যসন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিকরণের জোরালো দাবি উত্থাপিত

ছবি

ওবায়েদ আকাশের ১৮টি প্রেমের কবিতা

ছবি

বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা : বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব

ছবি

এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার

ছবি

বিভ্রম

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

একাত্তরের মার্চ এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ছবি

বিদ্রোহীর ‘আমি’ এক পৌরাণিক নায়ক

ছবি

সুফিয়া কামাল ও বিশ শতকের মুসলিম নারী মানস

ছবি

স্থির, দিঘল-দীর্ঘশ্বাস

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কামাল চৌধুরীর কবিতা

ছবি

আগন্তুকের গল্প

ছবি

‘আমার স্বপ্ন ছিল আমি ছবি আঁকব’-তাহেরা খানম

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

tab

সাময়িকী

শুদ্ধ সংস্কৃতির মানুষ আবুল হাসনাত

হারিস উদ্দিন

শনিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২১

সময়ের চলার গতি প্রকৃতির নিয়মে এক হলেও সবার জীবনে সময় একভাবে অতিবাহিত হয় না। আবুল হাসনাতের সাথেও আমার সময়টা যেন দ্রুতই ফুরিয়ে গেলো। এমন কোনও বয়স হয় নাই যার জন্য একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হলো। কথাটা আবুল হাসনাত ও আমার সম্পর্কের কারণেই বলছি। আমরা তো ভালোই ছিলাম। আরোও কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা নিয়মিত যোগাযোগ, গল্প করা- সবকিছুই চলছিলো। হঠাৎ একদিন সকালবেলায় বন্ধু খন্দকার মুনীরুজ্জামান (সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, তিনিও প্রয়াত) টেলিফোনে হাসনাতের অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ আমাকে জানায়। তারিখটা ছিলো ১৫.১০.২০২০। তার আগেরদিন পেটে প্রচ- ব্যথা থাকায় হাসনাতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় গলব্লাডার স্টোনজনিত কারণে ব্যথা হয়ে থাকতে পারে। আরো পরীক্ষার পর পেটে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তার উপর ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেয়। সংক্রমণের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে নিউমোনিয়ার রূপ নেয় এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আস্তে আস্তে কমতে থাকায় ১ নভেম্বর সকাল ৮টায় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। আড্ডা ও গল্প করার অতৃপ্তি রয়েই গেলো আমার মধ্যে। দেশে করোনা সংক্রমণের কারণে হাসপাতাল ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি নাই। শ্বাসকষ্টের অসুবিধা থাকায় আমার ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিলো। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে আবুল হাসনাতের বাড়িতেই আমাদের শেষ আড্ডা বসেছিলো। বইমেলা উপলক্ষে কলকাতা থেকে প্রকাশক পার্থ শংকর বসু ঢাকায় এসেছিলেন। সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, পার্থ ও আমি হাসনাতের বাড়িতে সেই আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। তারপর আর দেখা হয় নাই। টেলিফোনের মাধ্যমেই নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো।

আবুল হাসনাত : প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি

http://sangbad.net.bd/images/2021/November/06Nov21/news/abul-hasnat01.jpg

আবুল হাসনাত / জন্ম : ১৭ জুলাই ১৯৪৫; মৃত্যু : ১ নভেম্বর ২০২০

ছাত্র ইউনিয়নের একাদশ সম্মেলনে আবুল হাসনাতের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬৯ সালের ২রা জুলাই ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে। আমার সাথে তাঁর তখনও কোনও আলাপ হয় নাই। সম্মেলনে তিনি আবারো কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে সামসুদ্দোহা ও নূরুল ইসলাম নাহিদ। তার আগে ছাত্র ইউনিয়নের দশম সম্মেলনেও সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক ও সামসুদ্দোহা কমিটিতে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে নাসিমুন আরা মিনুও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তারা বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেন। ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের দ্বাদশ সম্মেলনে তিনি প্রথম সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর এই শতাব্দির প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালি, ভোলা ও নোয়াখালির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যু হয় প্রায় তিন লক্ষ মানুষের। ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, গাছপালা, হাঁসমুরগি, গরুছাগল। দেখা দেয় খাদ্য ও পানীয়জলের প্রচণ্ড অভাব। ঢাকা থেকে ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে একদল স্বেচ্ছাসেবক লঞ্চে করে ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ করেন। ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সাথে আবুল হাসনাতও এই কার্যক্রমে অংশ নেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার কয়েকটি আসনে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আবুল হাসনাত ন্যাপের প্রার্থী সরদার আঃ হালিমের পক্ষে কাজ করেছেন। আমিও তখন ন্যাপ করি।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা আবুল হাসনাতের সেই ভূমিকাকে ভুলি নাই। ছাত্ররাজনীতির সাথে সাথে ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি দৈনিক সংবাদে চাকরিতে যোগদান করেন

১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার গভীর ষড়যন্ত্র। পূর্বপাকিস্তানের ছাত্রজনতা এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন শুরু করে দেয়। এই আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত উজ্জ্বল। ’৭১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ছাত্র ইউনিয়নের এক বিশাল ছাত্র-জনতার সমাবেশে সামসুদ্দোহা ঘোষণা করেন যে, “৩রা মার্চ ১৯৭১ তারিখে নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বানচাল করা হলে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল শক্তির সরকার গঠন করা হবে। ভুট্টো যোগদান না করলেও অধিবেশন হবে, না হয় স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করা হবে।” এই অনুষ্ঠানে নূরুল ইসলাম নাহিদের অনুপস্থিতির কারণে (বিদেশে থাকায়) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আবুল হাসনাত সেই ছাত্র-জনসভায় সভাপতিত্ব করেন। এটি এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত তখনকার প্রত্যেকটি সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ে ছাত্র ইউনিয়নকে নেতৃত্ব দিয়ে সেসময় আন্দোলনকে আরও বেগবান করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন হাসনাত। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা আবুল হাসনাতের সেই ভূমিকাকে ভুলি নাই। ছাত্ররাজনীতির সাথে সাথে ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি দৈনিক সংবাদে চাকরিতে যোগদান করেন। বেতন খুব বেশি না হলেও মাসশেষে হাতে কিছু টাকা পাওয়া তখনকার দিনে কম সৌভাগ্যের কথা ছিলো না। সেই টাকায় নিজের চলাফেরা, বন্ধুদের অন্তত চা-সিঙ্গারা খাওয়ানোর মধ্যে কম আনন্দ ছিলো না।

সেই সময় সংবাদের মালিক ছিলেন ন্যাপনেতা ও বিশিষ্ট শিল্পপতি আহমদুল কবির। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী এবং শহীদুল্লা কায়সারকে সংবাদের কর্ণধার বলা হতো। পত্রিকাটি স্বাধীন ও প্রগতিশীলতার নীতির ব্যাপারে আপোস করে নাই। পত্রিকার মালিক কোনোদিন সম্পাদকীয় নীতি ও পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেননি। অর্থকষ্ট ছিলো সংবাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও সাংবাদিক ও কর্মচারীবৃন্দ সংবাদকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এর নীতি-আদর্শ ও সরকারবিরোধী ভূমিকার জন্য। সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে ‘সংবাদ’ একটি পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সাহিত্যপাতার বৈচিত্র্যের জন্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের কাছেও আগ্রহের সৃষ্টি করেছিলো পত্রিকাটি। আবুল হাসনাত দীর্ঘদিন বার্তা বিভাগে কাজ করার পর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে এই বিভাগে যোগ দেন। তাঁর সম্পাদনায় সাহিত্যপাতা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সাংস্কৃতিক জাগরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২৯ বছর সংবাদের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে পরবর্তীতে তিনি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে যোগ দেন। সংবাদে তাঁর আর্থিক অর্জন কম হলেও শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির বিবেচনায় অনেক উচ্চতায় তিনি নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলেও গোপনে রাজনৈতিক কাজকর্ম চলছিলো ঠিকই। প্রকাশ্যে অনেকেই ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পার্টির নির্দেশেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্টি প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে। পুরানা পল্টনে অফিস স্থাপন করে ‘একতা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতে থাকে। ১৯৭২ সালে ‘গণসাহিত্য’ নামে আরোও একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করে। পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় আবুল হাসনাতকে। পত্রিকাটি দেখে কলকাতার কালান্তর গোষ্ঠীর মার্ক্সীয় সাহিত্য সাময়িকীর কথা মনে পড়ে। সেই মাসিক পত্রিকাটির নাম ছিলো ‘মূল্যায়ন’। বাংলাদেশের মতো ভারতবর্ষেও রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) প্রভাব কমতে থাকায় পত্রিকাটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ সিপিআই এর পরিচালনায় ‘দৈনিক কালান্তর’-এর প্রকাশনা বিভাগ থেকেই এটি প্রকাশিত হতো। ‘গণসাহিত্য’ও আবুল হাসনাতের সম্পাদনায় একটি পরিচ্ছন্ন মার্ক্সীয় সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তরুণ পাঠক সমাজের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রুচিশীল পত্রিকা হিসেবে দিন দিন এর প্রচার সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের লেখকদের পাশাপাশি কলকাতার প্রগতিশীল লেখকদের লেখাও সেখানে ছাপা হতো। প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় ‘গণসাহিত্য’ ছিলো সত্যিই অপূর্ব। পাবলো পিকাসোর পৃথিবীবিখ্যাত চিত্রকর্ম গোয়ের্নিকাসহ বিখ্যাতসব চিত্রকর্ম ব্যবহৃত হতো ‘গণসাহিত্য’-এর প্রচ্ছদে। এক কথায়, ‘গণসাহিত্য’-এর প্রচ্ছদ সবসময়ই গণমানুষের কথা বলার চেষ্টা করেছে এবং পেয়েছে মানুষের আস্থা।

আবুল হাসনাত একজন সংবাদকর্মী বা সাহিত্য সম্পাদক ছাড়াও ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত কবি ও লেখক। কবি হিসেবে তিনি মাহমুদ আল জামান হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তিনি শুধু মৌলিক কবিতাই রচনা করেননি, অনেক কবিতার অনুবাদও করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। পশতু কবি আজমল খাটকের কবিতাসহ পশতু ভাষার কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেন। ‘পশতু গণমুখী কবিতা’ নামে তা বই হিসাবে প্রকাশ পায় ও অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। ছাত্র রাজনীতি করার সময় পর্যন্ত সিলেটের কবি দিলওয়ারের আরো একটি দীর্ঘ কবিতা পড়ার সুযোগ হয়েছিলো আমার। এছাড়াও হাসনাতের প্রকাশিত সর্বশেষ বইটি ‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’ একটি স্মৃতিচারণামূলক বই। সময়ের বিবেচনায় এটি একটি মূল্যবান দলিল। বইটিতে তিনি তাঁর বাল্যকাল, পুরান ঢাকার স্মৃতি, ছাত্ররাজনীতি, সংবাদের চাকরিজীবন, মুক্তিযুদ্ধ, এবং বাংলাদেশ ও কলকাতার কিছু বিশেষ ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করেছেন- যা নিঃসন্দেহে অনেকের আগ্রহের কারণ হবে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে যোগদানের পর আবুল হাসনাত সমাজে নিজেকে একজন গ্রহণযোগ্য ও দায়বদ্ধ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘কালি ও কলম’ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল সাহিত্যপত্রিকার শূন্যস্থান পুরণ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। প্রবীণ লেখকদের পাশাপাশি নবীনদের মানসম্পন্ন লেখাকেও উৎসাহিত করা হতো ‘কালি ও কলম’-এ। পত্রিকার কাজে বহুবার কলকাতায় গিয়ে সেখানকার বিশিষ্ট শিল্পী-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে আলাপ করে সেখানে পত্রিকাকে আরো মেলে ধরার চেষ্টা করেছেন আবুল হাসনাত। সেই সাথে নিজের পরিচিতির বিস্তৃতি আরো বেড়েছে।

আবুল হাসনাত একজন সার্থক সম্পাদক হিসাবে যেমন অনেক লেখক তৈরি করেছেন, অনেক লেখককে বিকশিত হতে সহযোগিতা করেছেন, তেমনি তিনি নিজেও ছিলেন একজন কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক। যদিও তার লেখক পরিচয় ছাপিয়ে তার সম্পাদক পরিচয়টাই সবার কাছে প্রধান হয়ে উঠেছে। আর তিনিও সম্পাদনার কাজেই বেশি সময় ও মনোযোগ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ। ‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’ আত্মজীবনী গ্রন্থের আগে প্রকাশিত হয় তার একটি প্রবন্ধ সংগ্রহ ‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’। দুটি গ্রন্থেরই প্রকাশক জার্নিম্যান বুকস। জার্নিম্যান বুকস আরও প্রকাশ করেছে তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও ‘কিশোর সমগ্র’। পরিচিতি না পাওয়ার আরেকটি কারণ তিনি কবিতা লিখতেন মাহমুদ আল জামান নামে। এই নামে তিনি ৫টি কিশোর উপন্যাস এবং কিশোরদের জন্য ৩টি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। কবিতাগ্রন্থ গুলো প্রকাশও করেছেন দেরিতে। কবিতা গ্রন্থগুলোর নাম ‘জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক’, ‘কোন একদিন ভুবনডাঙ্গায়’, ভুবনডাঙ্গার মেঘ ও নধর কালো বিড়াল’। কিশোর উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘রানুর দুঃখ, ভালবাসা’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর’, ‘যুদ্ধদিনের পোড়োবাড়ি’ এবং ‘সমুদ্র ও টুকুর গল্প’। ‘সমুদ্র ও টুকুর গল্প’ উপন্যাসের জন্য তিনি অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (স্বর্ণপদক) পান। মাহমুদ আল জামান নামে তার জীবনীগ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘জসীম উদ্দীন’, ‘সূর্যসেন’ ও ‘চার্লি চ্যাপলিন’।

আবুল হাসনাত প্রকাশনার জগতেও দক্ষতার ছাপ রেখে গেছেন। ‘কালি ও কলম’ সম্পাদক একই সঙ্গে বেঙ্গল পাবলিকেশনের নির্বাহী পরিচালকেরও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমৃত্যু সে দায়িত্ব পালন করেন। এখানেও তিনি সুরুচি ও যোগ্যতার ছাপ রাখেন।

উচ্চমান ও সুরুচি সম্পন্ন বেশ কিছু মুল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করে বেঙ্গল পাবলিকেশনকে অতি অল্প সময়ে মানসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা হিসাবে দাঁড় করিয়ে দেন নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসনাত। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই ‘জীবনানন্দ দাশের চারটি উপন্যাস: মূলানুগ পাঠ’ গ্রন্থটির কথা। এর ভূমিকা লেখা ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন ভূমেন্দ্র গুহ।

http://sangbad.net.bd/images/2021/November/06Nov21/news/abul-hasnat02.jpg

সহধর্মিণী নাসিমুন আরা হক মিনুর সঙ্গে আবুল হাসনাত

এই গ্রন্থটি বেঙ্গল পাবলিকেশনের একটি অতিমূল্যবান ও কৃতিত্বপূর্ণ প্রকাশনা। এর পুরো কৃতিত্ব আবুল হাসনাতের। তিনি ছাড়া এই গ্রন্থটি প্রকাশ হতো না। এজন্য আমরা তাঁর কাছে ঋণী হয়ে রইলাম। বেঙ্গল পাবলিকেশনের কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ।

আবুল হাসনাত শুধু একজন সাহিত্য সম্পাদকই ছিলেন না, গ্রন্থ সম্পাদনায়ও তাঁর অনন্য নিপুণতা ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ পাওয়া যায়। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০টি। পুস্তক সমালোচনা ও চিত্র সমালোচনায় তাঁর জুড়ি মেলা ছিলো ভার। তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে পা দিলেই দেখা যায় তাঁর বিশাল সংগ্রহের সব চিত্রকর্ম কি সুন্দরভাবে প্রতিটি দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। বাংলাদেশের কাইয়ুম চৌধুরী, কামরুল হাসান থেকে শুরু করে দুই বাংলার উল্লেখযোগ্য প্রায় সকলের চিত্রকর্মই স্থান পেয়েছে ঘরের কোনও না কোনও দেয়ালে। শুধু চিত্রকর্মই নয়, বই এবং সঙ্গীতের সংগ্রহ তাঁর আরও বিশাল। রাজনীতি ও সাহিত্য সংস্কৃতি ছাড়াও নানা বিষয়ের বই দেখা যায় তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দিজেন্দ্রলাল রায়ের গান, এবং তাঁর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সংগ্রহ থেকে তাঁর সঙ্গীতমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। শান্তিনিকেতনের হস্তশিল্প, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির ঘোড়াসহ নানাপ্রকার শিল্পকর্ম দেখলে তাঁর বাড়িটিকে একটা ছোটখাট যাদুঘর বলে মনে হয়।

ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকার সময়ই তিনি গোপন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। তথ্যগত ভুল কিংবা প্রয়োগের ক্ষেত্রের ভুলে সারাবিশ্বে যখন মার্ক্সীয় অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে, বাংলাদেশেও তাঁর বাতাস বইতে শুরু করে। এখানেও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত ভুলের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকর্মী দলত্যাগ করেন। আবুল হাসনাতকে তারপর থেকে আর পার্টি রাজনীতিতে সক্রিয় দেখিনি। অথচ মুক্তিযুদ্ধে এই পার্টির ছিলো অসাধারণ ভূমিকা। সিপিআইএর মাধ্যমে ভারত সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টাসহ আন্তর্জাতিকভাবে পূর্বইউরোপীয় দেশসমূহের সরকার ও জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা বোঝানোর কাজ অত্যন্ত আন্তরিকভাবে করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সেই উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি ও সরকার, বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলন ও বিভিন্ন কূটনৈতিক মাধ্যম ব্যবহার করে জাতিসংঘের সহানুভূতি আদায় করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন সিপিবি নেতৃবৃন্দ। আবুল হাসনাত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন পার্টির নির্দেশেই। প্রথমে ঢাকা শহর থেকে নরসিংদির রায়পুরা হয়ে শ্রমিকনেতা শহিদুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নবীনগরে পৌঁছান। নরসিংদির রায়পুরায় আরোও অনেক কম্যুনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সাথে দেখা হয় এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ পেয়ে কেউ ঢাকা শহর, কেউ আগরতলা, কেউ বা অন্য জেলায় রওনা হয়ে যান। আবুল হাসনাত আরো কিছু বন্ধুদের নিয়ে শহিদুল্লাহর সাথে আগরতলার পথে রওনা দেন। এই দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন ডাঃ ওয়াজেদুল ইসলাম, ডাঃ সরওয়ার আলী, আলমগীর কবির, শামসুদ্দোহা, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ মোট ১৬ জন।

আবুল হাসনাত একসময় ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে পল্টন ময়দানে ক্রিকেট খেলতেন এবং প্রথম বিভাগের খেলোয়াড় হিসেবে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাছাড়া ওয়ারী, নবাবপুর, নারিন্দা, রায়সাহেব বাজার, লক্ষ্মীবাজার, ভিক্টোরিয়া পার্ক ও সদরঘাটের অনেক কথা তাঁর কাছে শুনেছি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, ঘোড়ার গাড়ি, সংস্কৃতি ও খাবার-দাবার, এবং কথা বলার ধরন সম্বন্ধেও অনেক মজার মজার কথা শুনেছি যার কিছুটা সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত।

আবুল হাসনাতের সংস্পর্শে আমাদের সময় ভালোই কাটছিলো। করোনার কারণে শেষের দিনগুলি অনেকটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অতিবাহিত করি। সবশেষে বলা চলে, বন্ধুর দেখা যখন আর পাবো না, তাঁর চিন্তা ও কর্মকেই বাকিজীবন চেতনায় ধারণ করতে চাই। বন্ধু আবুল হাসনাতের আকস্মিক মৃত্যু আমার জন্য মেনে নেয়া খুবই কঠিন। তার স্মৃতি আমাদের মনে চির জাগরূক থাকবে। তাকে আর আমরা ফিরে পাবো না। তবু কবি, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, চিত্র সমালোচক ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসনাত বেঁচে থাকবেন তার রচনার মধ্যে, তার কাজের মধ্যে। হে বন্ধু বিদায়। (সংক্ষেপিত)

তথ্যসূত্র: ইতিহাসের অল্পকথা (মোঃ শামসুদ্দোহা)

স্মৃতিতে অনুভবে আবুল হাসনাত (মতিউর রহমান সম্পাদিত)

হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে (আবুল হাসনাত)

back to top