ঝালকাঠিতে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ২৫ জন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন নারী ও শিশু রয়েছে। শনিবার (২২ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বাসটি ভান্ডারিয়া থেকে জেলা শহর বরিশাল যাচ্ছিল। বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝালকাঠির ছত্রকান্দ এলাকায় যাওয়ার পর বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে সড়কের পাশে পুকুরে পড়ে পানিতে ডুবে যায়। ঘটনাস্থলেই ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
বাসারস্মৃতি পরিবহন নামের এই যাত্রীবাহী বাসটি ৪০ আসনের। বাসটি সকাল ৮.৪৫ মিনিটে ভান্ডারিয়া থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছাড়ে। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠানোর ফলে যাত্রী সংখ্যা হয় প্রায় ৭০/ ৭২ জন। বাসটির ছাদেও বেশ কয়েকজন যাত্রী ছিল। এছাড়া বাসটি অতিদ্রুত চালানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেছেন আহত যাত্রীরা। আহত যাত্রীরা জানিয়েছেন, বাসটি সড়কের পাশে পড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে চালক বাসের সুপারভাইজারের সঙ্গে কি একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। এ সময়ই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে পড়ে যায়।
ঝালকাঠি বাসমালিক সমিতির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মু. নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত বাসের ড্রাইভার এবং সুপারভাইজারের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। হেলপার আকাশকে (১৭) পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনার পরপরই চালক ও সুপাভাইজার বাস থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম মাসুম বলেন, আমি পরিষদে লোকজন নিয়ে বসেছিলাম। হঠাৎ শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি বাসটি পুকুরে পড়ে গেছে। এর মধ্যে পরিষদে যারা ছিল এবং আশপাশের লোকজন ছুটে এসে যেভাবে পেরেছে লোকজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে আহত হওয়া স্থানীয় ইউপি সদস্য ফয়সাল রহমান বাবু বলেন, দুর্ঘটনার সময় আমি পরিষদের সামনেই ছিলাম। পুলিশ এবং দমকলবাহিনী পৌঁছার আগেই আমরা ৫০/৬০ জন মিলে উদ্ধার অভিযান শুরু করি। তিনি বলেন সড়ক-মহাসড়কের পাশে পুকুর থাকার কারণে বাসটি পানিতে তলিয়ে যায়। এতে বেশি যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাসযাত্রী আজাদ হোসেন (৫০) জানান, তিনি লক্ষ্মীপুর থেকে ভান্ডারিয়া এসে বরিশালের উদ্দেশে এ বাসে উঠেন। ভিতরে বসা এবং দাঁড়ানো ৬০/৭০ জন যাত্রী ছিল। বাসে যাত্রীরা একজনের সঙ্গে গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, চালক বাসটি এত দ্রুত চালাচ্ছিলেন যে, অনেক যাত্রী চালককে দ্রুত না চালাতে সাবধান করেছিলেন। কিন্তু চালক কারো কথায় কর্ণপাত না করেই দ্রুত যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে বাসটি কাত হয়ে সড়কের পাশে পুকুরে পড়ে যায়। পুকুরে পড়ার সময় বাসটি একাধিকবার পল্টি খায়।
বাসের আরেক যাত্রী পিয়ারা বেগম (৪৫) জানান, শিশুকন্যা সুমাইয়াকে (৬) নিয়ে চিকিৎসার জন্য বরিশাল যাচ্ছিলেন। তিনি কোন রকমে রক্ষা পেলেও তার শিশুকন্যা রক্ষা পাননি। মেয়ের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে তিনি জানান, যাত্রীদের আপত্তি না শুনে বাসটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চালাচ্ছিলেন চালক। ঘটনাস্থলে আসার পর যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাসটি কাত হয়ে সড়কের ঢালে পড়ে যায়। এরপর কয়েকবার পল্টি খেয়ে পুকুরের পানিতে পড়ে যায়।
পানিতে পড়ে যাওয়ার পর জানালা দিয়ে বাস থেকে বের হয়ে আসেন পিয়ারা বেগম। তিনি জানান, আমি কোন রকম জানালা দিয়ে বাস থেকে বেরিয়ে আসি। এরপরই মেয়েকে বাস থেকে টেনে বের করতে গিয়ে দেখি সে বেঁচে নেই। একথা বলতে বলতেই পিয়ারা কান্না করতে করতে বেহুশ হয়ে যাচ্ছিলেন।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য যাত্রী নাইমুল ইসলাম বলেন, আমি ভান্ডারিয়া থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে এই গাড়িতে যাচ্ছিলাম। গাড়ীর ভিতরে এবং ছাদে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে দ্রুত গতিতে যাওয়ার সময় চালক বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এরপরই পুকুরে পড়ে যায়। আমি ৩-৪ মিনিট পানির নিচে থাকার পর জানালা দিয়ে বের হতে পারি।
উদ্ধার কার্যক্রমের বিষয় ঝালকাঠি দমকল বাহিনীর সদস্য মামুন জানান, আমরা গাড়ির ভিতর থেকে এখন পর্যন্ত ১৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করি। আরও কিছু যাত্রীর পা ধরে টানাটানি করলেও তাদের মৃতদেহ আনা যাচ্ছে না। তবে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত মেডিকেল অফিসার ডাক্তার দ্বীন মোহাম্মদ জানান, আমরা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এখানে ১২ জন চিকিৎসক আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দিচ্ছি। এছাড়া মৃতদের শনাক্ত এবং ডাক্তারি পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তাদের স্বজনদের কাছে লাশ দেয়া হবে। তবে আহতদের কাটা এবং ব্যথার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
সদর হাসপাতালে ঝালকাঠি সদর থানার সেকেন্ড অফিসার গৌতম ঘোষ জানান, আমরা এখানে আনা নিহত এবং আহতদের নাম, ঠিকানা, পরিচয় এবং তালিকা করাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি।
নিহত যাদের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন- ১. তারেক রহমান (৪৫) বাবা পান্না মিয়া ভান্ডারিয়া পৌরসভা থানা ভান্ডারিয়া, ২. সালাম মোল্লা (৬০) বাবা মুজাফফর আলী ভান্ডারিয়া পৌরসভা থানা ভান্ডারিয়া ৩. খাদিজা বেগম (৪৩) স্বামী-মৃত মাওলানা নজরুল ইসলাম ৪. খুশবো আক্তার (১৭) বাবা মাও. নজরুল ইসলাম গ্রাম নিজামিয়া থানা রাজাপুর, ৫. শাহীন মোল্লা (২৫) বাবা মৃত সালাম মোল্লা ভান্ডারিয়া পৌরসভা থানা ভান্ডারিয়া, ৬. সুমাইয়া (৬) বাবা জালাল হাওলাদার গ্রাম পশারিবুনিয়া ভান্ডারিয়া ৭. আবদুল্লাহ (৮) বাবা দেলোয়ার হোসেন গ্রাম চর বোয়ালিযা বাখরগঞ্জ ৮. রহিমা বেগম (৬০) স্বামী মৃত লাল মিয়া রিজাভ পুকুর পাড় ভান্ডারিয়া ৯. আবুল কালাম হাওলাদার বাবা মৃত লাল মিয়া হাওলাদার ১০. রিপামনি (২) বাবা রিপন মেহেদীগঞ্জ সদর ১১. আইরিন আক্তার (২২) স্বামী রিপন হাওলাদার মেহেদীগঞ্জ ১২. নয়ন (১৬) বাবা নজরুল ইসলাম বলাইবাড়ি রাজাপুর, ১৩. রাবেয়া বেগম (৮০) স্বামী মৃত ফজলুল হক মৃধা উত্তর শিয়ালকাঠি ভান্ডারিয়া, ১৪. সালমা আক্তার মিতা (৪২) বাবা তৈয়বুর রহমান বাশবুনিয়া কাঠালিয়া।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন- আবুল বাশার কাঠালিয়া, রাসেল মোল্লা ভান্ডারিয়া, ফাতিমা ভান্ডারিয়া, রাসেল ভান্ডারিয়া, মিফতা নলছিটি, রিজিয়া কাঠালিয়া, রিজিয়া কাঠালিয়া, আরজু কাঠালিয়া, মনোয়ারা রাজাপুর, সুইটি ভোলা, রুকাইয়া বাউফল, আজিজুল নলছিটি, আলাউদ্দিন রাজাপুর, সোহেল রাজাপুর, আবুল কালাম রাজাপুর, আকাশ বরগুনা, সোহাগ সাতক্ষিরা, নাঈমুল মঠবাড়িয়া, সিদ্দিকুর বাউফল, মনিরুজ্জামান ভান্ডারিয়া, আল-আমিন ঝালকাঠি, সাব্বির বরিশাল। এছাড়া দুইজনকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে যাদের নাম জানা যায়নি।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ফারাহ্ গুল নিঝুম জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুন শিবলীকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবে।
ঝালকাঠির পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল বলেন, পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন স্যারের পক্ষ থেকে লাশ দাফন ও পরিবহনের জন্য এক লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান ১৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হবে।