image
শীত উপেক্ষা করে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি বিলে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবে মেতে উঠেছেন গ্রামবাসী -সংবাদ

সিলেটে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে পলো বাওয়া উৎসব

বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
প্রতিনিধি, সিলেট

সিলেটে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে বাঁশ ও বেতের তৈরি পলো দিয়ে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক ‘পলো বাওয়া উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও শীতের সকালে বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি বিলে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।

তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার ব্যতিক্রম দেখা গেছে। গোয়াহরি বিলে পানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগেই, ইংরেজি নববর্ষের দিনে উৎসবটি আয়োজন করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম হোসেন জানান, বিলের পানি দ্রুত কমে যাওয়ায় গ্রাম পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগাম আয়োজন করা হয়েছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন জানান, বৃহস্পতিবার,( ০১ জানুয়ারী ২০২৬) সিলেটে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত।

গোয়াহরি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এই ঐতিহ্য তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালন করে আসছেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী প্রতিবছর মাঘ মাসের পহেলা তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে পলো বাওয়া উৎসব পালন করা হতো। তবে এবার বিলের পানি কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রায় ১৫ দিন আগেই উৎসবটি পালন করা হয়েছে।

সকাল ১০টার দিকে উৎসব শুরু হওয়ার আগেই গোয়াহরি গ্রামে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের সব বয়সী মানুষ ছাড়াও আশপাশের গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনরা একত্রিত হয়ে বিলে নেমে পলো দিয়ে মাছ শিকারে অংশ নেন। উৎসবটি ঘিরে পুরো এলাকা যেন মিলনমেলায় পরিণত হয়।

তবে বিলে পানির স্বল্পতা এবং শীতের তীব্রতার কারণে অনেক শৌখিন মাছ শিকারি দীর্ঘ সময় পানিতে থাকতে পারেননি। ফলে বেশিরভাগকেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলের মাছের সংখ্যাও কমে গেছে।

এরপরও পলোতে ধরা পড়ে বোয়াল, কাতলা, রুই, কার্ফু, শোল, গণিয়া, মিরকা, কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ।

এবারের উৎসবে সবচেয়ে বড় বোয়াল মাছটি ধরেন মামা বাড়িতে বেড়াতে আসা রাজু আহমদ। তিনি গোয়াহরি গ্রামের আব্দুল মতিনের পরিবারের পক্ষে উৎসবে অংশ নিয়ে বড় বোয়ালের পাশাপাশি একাধিক শোল ও কার্ফু মাছ ধরতে সক্ষম হন।

বাবার সঙ্গে পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিতে আসা পাঁচ বছরের মরিয়ম বেগম হাসিমাখা মুখে বলে, ‘আমার আব্বায় আইজ চাইট্টা মাছ মারছইন।’

প্রবাসী রেজাউল করিম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দেশে এসে পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিয়েছি। বোয়াল-কাতলাসহ কয়েকটি মাছ ধরতে পেরে খুবই ভালো লেগেছে।’

একসঙ্গে মাছ শিকারে অংশ নেয়া লাল মিয়া, ইকবাল হোসেন ও প্রবাসী মনোয়ার হোসেন জানান, শীতের তীব্রতার কারণে অনেকেই বেশিক্ষণ পানিতে থাকতে পারেননি। পাশাপাশি পানির স্বল্পতায় মাছ শিকারও তুলনামূলক কম হয়েছে।

স্থানীয় যুবক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘শীতের মধ্যেও পলো বাওয়া উৎসবে মাছ শিকার করা ঈদের আনন্দের মতোই লাগে। তবে এবার মাছের পরিমাণ অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম।’

শৌখিন মাছ শিকারি সুয়েব খান বলেন, ‘মাছ ধরতে ভালোই লাগছে। তবে বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছই বেশি ধরা পড়ছে।’

গোয়াহরি গ্রামের বাসিন্দা ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী প্রবীণ হাজী তৈমুছ আলী বলেন, ‘আগের মতো এখন আর বিল থেকে মাছ পাওয়া যায় না। বিলটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারপরও দীর্ঘদিন পর এই উৎসবে অংশ নিতে পেরে আনন্দিত।’

গ্রামের আরেক প্রবীণ হাজী আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা সারা বছরই এই বিল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সময়ের পরিবর্তনে বিলে পানি ও মাছ দুটোই কমে গেছে। ফলে এখন অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন।’

ইউপি সদস্য গোলাম হোসেন আরও বলেন, বিলে পানি কমে যাওয়ায় গ্রাম পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার নির্ধারিত সময়ের ১৫ দিন আগেই বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব আয়োজন করা হয়।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা

সম্প্রতি