নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বুড়ি তিস্তা নদী পুনঃখনন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতেই আনসার ক্যাম্পে সুপরিকল্পিত, সংঘবদ্ধ ও রাষ্ট্রবিরোধী হামলার পর হামলাকারীরা আনসার সদস্যদের ক্যাম্প থেকে বের করে দিয়ে জবরদখল নেয়, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। দুই দিনব্যাপী তান্ডবের পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য ও জলঢাকা-ডিমলা থানার পুলিশের সহায়তায় আনসার ক্যাম্পটি পুনরুদ্ধার করা হলেও লুট হওয়া গুলি ও মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বুধবার বিকেল থেকে বুড়ি তিস্তা নদীসংলগ্ন আনসার ক্যাম্প ও নদী খনন প্রকল্প এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার দিকে ‘আলীম ও জাহেদুল নামের ২ ব্যক্তি মাইকিং করে লোকজন জড়ো করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই হাজারের বেশি লোক সংঘবদ্ধ হয়ে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায়। এটি কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়; বরং পূর্বপরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলা বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন।
ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পে অবস্থানরত আনসার সদস্যদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে সম্পূর্ণ দখল নেয়। এরপর টিনশেড ও পাকা স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। জানালা-দরজা, জেনারেটর মেশিনসহ সব সরকারি মালামাল খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে আনসার ক্যাম্পটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
হামলায় আনসার বাহিনীর ব্যবহৃত ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছিনতাই, রেশন, পোশাক ও অন্যান্য সরকারি মালামাল লুট করা হয়। একই সঙ্গে নদী খনন প্রকল্পে ব্যবহৃত ৭টি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করে অচল করে দেওয়া হয়। সরকারি ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুই দিনে প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
আনসার সদস্য মো. এনামুল হক জানান, হামলাকারীরা তাদের থাকার কক্ষ, অফিস, আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং রেশন, পোশাক ও নগদ অর্থসহ ব্যক্তিগত মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যবহৃত গুলি ছিনতাই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। ঘটনার ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে একাধিক সাংবাদিক হামলার শিকার হন। আহতদের মধ্যে আনসার সদস্য, সাংবাদিক, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা রয়েছেন।
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান বলেন, এই হামলা ও ভাঙচুরে দুই দিনে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা সরকারি জমি উদ্ধার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। তিনি অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতেই সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতিকারীরা নারকীয় তান্ডব চালালেও তখন কোনো কার্যকর প্রতিরোধ বা আইন প্রয়োগ দেখা যায়নি।
জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়া, পিভিএম বলেন, ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, রেশন ও পোশাক ছিনতাই হয়েছে।
নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম, পিপিএম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। দ্বিতীয় দিনেও দুর্বৃত্তরা নির্বিঘেœ ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালিয়ে আনসার ক্যাম্প দখলে রাখে। পরে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ, বিপুলসংখ্যক সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় ক্যাম্পটি পুনরুদ্ধার করা হয়।
তবে পুনরুদ্ধার হওয়া আনসার ক্যাম্পটি এখন শুধু ভাঙচুরের নারকীয় দৃশ্য বহন করছে। লুট হওয়া ১০ রাউন্ড গুলি ও মালামাল এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতেই আনসার ক্যাম্প দখল, অস্ত্রের গুলি লুট এবং দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর অনুপস্থিতি সব মিলিয়ে ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
অপরাধ ও দুর্নীতি: রেমা-কালেঙ্গায় গোলাগুলির মামলার আসামিদের প্রকাশ্যে বিচরণ
সারাদেশ: বাগেরহাটে আগুনে পুড়ে বৃদ্ধার মৃত্যু