কুড়িগ্রামের উলিপুরে নজির হোসেন ও নুর আলম দুই ভাই প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় গড়ে তুলেছেন দড়ি তৈরির কারখানা। নাম দিয়েছেন নজির হোসেন দড়ি ঘর। কারখানাটি গড়েছেন উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের রাজবল্লভ গ্রামে নিজবাড়িতেই। দড়ির কারখানা দেখতে প্রতিদিন এলাকাবাসী ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে ভীড় করেন।
গ্রামীণ এলাকায় দড়ির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হবে এতদিন কেউ ভাবতেই পারেননি। তবে অর্থের অভাবে কারখানা বড় পরিসরে চালাতে পারছেন না মালিক দুই ভাই। সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা পেলে কারখানাটি ভালোভাবে চালানো যেত বলে জানান তারা।
জানা যায়, উদ্যোক্তা নজির হোসেন (৩৮) সংসারের অভাবের তাড়নায় ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান। সেখানে মুন্সীগঞ্জের মুক্তাপুর এলাকায় একটি দড়ির কারখানায় ৬ হাজার টাকা বেতনে শ্রমিকের কাজ নেন। সে সময় ছোট ভাই নুর আলম (২৮) ৮ম শ্রেণীতে পড়াশোনা করত। ৫ বছর পর বড় ভাই ছোট ভাইকে ওই কারখানায় মেকানিক্সের কাজ নিয়ে দেন। দুই ভাই সেখানে প্রায় ১৫ বছর চাকরি জীবন কাটান। সেখানে থেকে চাকরি করে তেমন কোনো উন্নতি করতে না পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজ বাসায় দড়ির কারখানা দেয়ার সিদ্ধান্তে ২০০৯ সালে বাসায় ফিরে আসেন। চেষ্টা চলে কারাখানা তৈরির। কিন্তু টাকার অভাবে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না কারখানার মেশিন ক্রয়ের। এবার বাবার সহায়তায় জমি বন্দক, ধারদেনা ও ঋণ করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিয়ে মেশিন ক্রয় করে নিয়ে এসে নিজ বাড়িতে ২০২৪ সালে দড়ির কারখানা দেন। বর্তমানে তাদের কারখানায় দুজন শ্রমিকসহ মোট চারজন কাজ করছেন। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মেশিনে বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে দড়ি। এ সুতা নিয়ে আসেন ঢাকার মুন্সীগঞ্জ থেকে। আধাপাকা টিনশেড ঘরের মেঝেতে ১৫টি মেশিন বসানো হয়েছে। মেশিন চলে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। সেখানে নারী শ্রমিকরা কাজে ব্যস্ত তদারকি করছেন নজির হোসেন নিজেই। সেখানে বিভিন্ন রঙের পাতলা ও মাঝারি সাইজের দড়ি তৈরি হচ্ছে। চাকরি ছেড়ে আসা দুই ভাইয়ের চোখে মুখে হতাশার ছাপ এখনও কাটেনি। প্রতি মাসে আয়ের বিপরীতে লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। পুঁজির অপর্যাপ্ততা ও বৈদ্যুতিক লোডশেডিংয়ের কারণে এখনও তারা স্বনির্ভর ও স্বচ্ছল হতে পারে নাই। তাদের স্বপ্ন একদিন তাদের কারখানা অনেক বড় হবে। দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা। কারখানায় কাজ করতে আসা শ্রমিক জোসনা বেগম ও রওশন আরা জানান, আমাদের গ্রামে দড়ি তৈরির কারখানা গড়ে উঠবে কখনও ভাবতে পারি নাই। এটি তৈরি হওয়াতে বাড়িতে থেকে গিয়ে প্রতিদিন ২৫০ টাকা করে মজুরি পাচ্ছি। তাই দিয়ে দুই বছর থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই চলছি। কারখানায় দড়ি উৎপাদন কম হওয়ায় আমরা মজুরি কম পাচ্ছি। দড়ি উৎপাদন বাড়াতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। তারা সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। কারখানা বড় হলে অনেক অসহায় ও বেকার কাজ করে খেতে পারবে বলে জানান তারা।
উদ্যোক্তার বাবা নুর মুহাম্মদ জানান, দুই ভাই মিলে বাড়িতে দড়ির কারখানা তৈরি করেছে। জমি বন্ধক, ধারদেনা ও ঋণ করে মেশিন কিনে নিয়ে এসেছে। কারখানা চালাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা পুঁজি। আমি এলাকার একটি দাখিল মাদ্রাসায় অফিস সহায়ক পদে সামান্য বেতনে চাকরি করছি। কারখানা চালাতে যে অর্থের প্রয়োজন তা আমার পক্ষে জোগান দেয়া সম্ভব না। যদি সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাওয়া যেত তাহলে কারখানাটির উৎপাদন বাড়ত। এলাকার অনেক বেকার ও অসহায় লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হত। উদ্যেক্তা নজির হোসেন জানান, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় বাবার জমি বন্ধক ও আত্মীয় স্বজনদের কাছে ঋণ করে দুই ভাই মিলে দড়ির কারখানা তৈরি করি। অর্থের অভাবে কারখানা চালানো অনেক কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কেজি দড়ি উৎপাদন হচ্ছে। যা আয় হয় তা দিয়ে শ্রমিকের বেতনাদি দেয়া ও সুতা ক্রয় করতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। সংসার পরিচালনা করা অনেক কষ্টকর হয়ে গেছে।
তবে সরকারিভাবে অর্থ সহযোগিতা করলে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হত। কারখানা বড় করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে স্বপ্ন পুরন করা সম্ভব হত। তিনি আরও বলেন, কারখানার তৈরি ফিতা ও দড়ি গ্রামাঞ্চলে গরু, ছাগল, ভেড়া বাঁধতে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে ভ্যান, ট্রলি ও ট্রাকে মালামাল বাঁধার কাজে ব্যবহৃত হয়। গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোলেমান মিয়া জানান, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় দড়ির কারখানা তৈরি করে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন নজির হোসেন ও নুর আলম দুই ভাই। এ কারখানা চালাতে অনেক টাকার প্রয়োজন। তারা কারখানা পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় দড়ির কারখানা আছে জেনে অনেক ভালো লাগল। দড়ি কারখানার উদ্যেক্তা যে কোনো প্রয়োজনে আসলে তাকে সু-পরামর্শ প্রদান করা হবে।
কুড়িগ্রাম বিসিকের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, উদ্যেক্তা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে কারখানা পরিদর্শন করে সার্বিক সহযোগিতা করার ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।