image
রাাজশাহী : বোতলে সংরক্ষণ করা বীজ দেখাচ্ছেন নারী -সংবাদ

বীজের ভাণ্ডারে টিকে আছে গ্রাম, এক নারীর হাতে হাজার দিনের ফসল

শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬
জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

মানুষের ইতিহাসে প্রথম ভাণ্ডার ছিল মাটির হাঁড়ি, আর তার ভেতরে জমা থাকত আগামী দিনের স্বপ্ন বীজ। সেই স্বপ্ন আগলে রাখার ভার যুগ যুগ ধরে বহন করে এসেছে নারীরাই। মানবসভ্যতার সূচনালগ্নে যে হাত বীজ মুঠোয় নিয়েছিল, সেই হাত ছিল নারীর। বাজার, মুনাফা আর করপোরেট কৃষির দাপটে আজ যখন বীজ নিজেই পণ্য, তখন গ্রামবাংলার এক কোণে কৃষাণী সুলতানার হাতে বীজ ফিরে পাচ্ছে তার আত্মপরিচয়। তার কমিউনিটি বীজ ব্যাংক কেবল সংরক্ষণের স্থান নয়, এটি স্মৃতির আশ্রয়, ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। এখানে বীজ ঘোরে হাত থেকে হাতে, বিশ্বাসের বিনিময়ে; জন্ম নেয় এমন এক অর্থনীতি, যেখানে মুনাফার চেয়ে মূল্যবান নিরাপদ খাদ্য, আর পুঁজির চেয়ে শক্তিশালী মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। সুলতানার এই নীরব সংগ্রাম প্রমাণ করে যেখানে নারী নেতৃত্ব দেয়, সেখানে কৃষি টিকে থাকে; আর কৃষি টিকে থাকলেই টিকে থাকে একটি জাতির আত্মা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের বিলনেপাল পাড়া গ্রামের কৃষাণী মোসা. সুলতানা খাতুন ও তার পরিবার। প্রাচীন সেই প্রথা টিকিয়ে রাখতে এই নারীকে স্থানীয়ভাবে দেশীয় উদ্ভিদের বীজ সংরক্ষণে সহযোগিতা করছেন বেসরকারি গবেষণা উন্নয়ন সংস্থা বারসিক।

কৃষকদের উৎসাহিত করতে তিনি কৃষি প্রতিবেশ বিদ্যা শিখন কেন্দ্রে গড়ে তুলেছেন কমিউনিটি বীজ ব্যাংক। রবিশস্য থেকে শুরু করে সোয়াস গুড়গুড়ি (আলকুশি), আমলকী, তুলসি, কালকাসিন্দা, খেসারি, যব, কাউন, তিসি, বিভিন্ন জাতের ধান, শাক-সবজি, ফুল, ফল, বনজ, ফলজ ও ওষুধি বীজ এবং গাছসহ তার সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে ১৮৫ জাতের বীজ। এই কমিউনিটি বীজ ব্যাংক থেকে বীজ নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে বীজ দিয়ে বীজ বিনিময় করেন। মানে ফসল করার পর যখন বীজ হয়, তখন ধার করা বীজ ফেরত দেয়া হয়। লক্ষ্য দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণ ও জাত টিকিয়ে রাখা। প্রতিবেশীরা বাড়ির আঙিনা অথবা পতিত জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী বীজ নিয়ে বপন করেন। আবার মৌসুম শেষে সেখান থেকে আবার বীজ সংগ্রহ করেন। এভাবে সারা বছর বাড়িতে বিভিন্ন নিরাপদ ও পুষ্টিকর শাক-সবজি উৎপাদন করেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভার্মিকম্পোস্ট সার ও জৈব বালাইনাশক (পরিবেশবান্ধব কীটনাশক) ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন। তার এসব কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নানা পদের বীজ সংরক্ষণ করছেন ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষক। বীজ সংরক্ষণের ফলে পরিবারগুলোর যেমন শাকসবজির চাহিদা মিটছে, অন্য দিকে সেসব সবজি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন তারা। এছাড়া নারীদের অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষের সমতা, নারীদের কাজের মূল্যায়ন ও সমাজে তাদের গুরুত্ব এবং নারী নেতৃত্ব তৈরিসহ বিভিন্ন জনসচেতনামূলক কাজ করছেন তিনি।

তালুক ধর্মপুর গ্রামের কৃষাণী শিল্পী বেগম বলেন, আমরা নিজেরা দেশীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করি, সেই বীজ থেকেই চারা উৎপাদন করে শাক-সবজি চাষ করি। পাড়ার যাদের যে বীজ প্রয়োজন হয়, তারা কমিউনিটি বীজ ব্যাংক থেকে নিয়ে যায় আবার উৎপাদিত ফসলের বীজ সেখানে জমা রাখে। এতে বাড়িতে বারো মাসই সবজি থাকে। বাজার থেকে সবজি কিনতে হয় না। অন্যদেরকেও দেওয়া যায়। শাক-সবজির কখনও ঘাটতি হয় না। আর বাড়ির এসব শাকসবজি নিরাপদ ও বিষমুক্ত হয়।

উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, নারীরা নিজেদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দেশীয় জাতকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করছেন। আগে আমাদের মা-চাচি, দাদা-দাদিরা বাড়িতে দেশীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করতেন। কালের আবর্তে তা হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় জাতের বীজ থেকে হওয়া গাছে পোকা কম হয়। এ কারণে তাতে সার ও কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না তেমন। কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত দেশীয় ফসলের বীজ যদি নিজেরা সংরক্ষণ করে তাহলে জাতগুলো টিকে থাকবে। এর ফলে ওই পরিবারগুলো নিরাপদ সবজিসহ পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা উন্নয়ন সংস্থা বারসিকর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বীজ সার্বভৌমত্ব, বীজের অধিকার নিশ্চিত করতে কমিউনিটি পর্যায়ে এরকম গড়ে উঠা বীজ ব্যাংকগুলো দেশের স্থায়ীত্বশীল কৃষির উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারিভাবে দেশি বীজ সুরক্ষায় এরকম কমিউনিটি ভিত্তিক দেশি বীজের জীন ব্যাংক তৈরি করতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ এমএ মান্নান বলেন, আগেকার দিনে কৃষকের বাড়িতে সংরক্ষিত থাকতো বিভিন্ন ফসলের বীজ। উৎপাদিত সবজি থেকে পরের বছর বপণের জন্য কৃষক বিভিন্ন মাটির পাত্রে বীজ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি অন্যদের কাছে বিনিময়ও করতো কিন্তু নানা কারণে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। নারীদের দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণের এমন উদ্যোগ সত্যিই বেশ প্রশংসনীয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি বীজ ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষির এতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রহণকৃত উদ্যোগগুলো দেখে ভালো লাগলো। এই উদ্যোগগুলো উপজেলার অন্যান্য গ্রামে বিস্তার করলে গ্রামের কৃষাণ-কৃষাণীরা অনেক উপকৃত হবে। উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা কৃষি সম্প্রসারণে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এ ধরনের সৎ উদ্যোগের পাশে কৃষি অফিসের সব ধরনের সহযোগিতা সর্বদা অব্যাহত থাকবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» আত্রাইয়ে ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপÍার

সম্প্রতি