image

পর্যটন ও দৃষ্টিনন্দন এলাকা শ্রীমঙ্গলের রাধানগর

রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

সবুজ পাহাড়, বিস্তৃত চা-বাগান আর নীল আকাশের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা শ্রীমঙ্গল আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক প্রায় বিস্মৃত ইতিহাস ব্রিটিশ আমলের এক দূরদর্শী জমিদার পরিবারের অবদান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে রাধানগর।

রাধানগর নামটি অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে আছে রাধানাথ দেব চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন প্রভাবশালী জমিদার। তার আদি নিবাস ছিল বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার ভূবীরবাগ এলাকায়, যা সে সময় সিলেট বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে তার পরিবার শ্রীমঙ্গলে এসে বসতি স্থাপন করে এবং এই অঞ্চলের সামাজিক ও ভৌগোলিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাধানাথ দেব চৌধুরী শুধু একজন জমিদারই ছিলেন না; তিনি ছিলেন পরিকল্পিত নগরায়নের একজন অগ্রদূত। শ্রীমঙ্গলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তিনি শহরের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান ওল্ড মার্কেট এলাকায় তিনি একটি বৃহৎ ও সুদৃশ্য বাসভবন নির্মাণ করেন। পাশাপাশি স্টেশন রোড, ঘরানী এলাকা এবং হবিগঞ্জ রোডসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জমির মালিকানাও ছিল তার হাতে।

যদিও কালের প্রবাহে এসব জমির বড় একটি অংশ বিক্রি হয়ে যায়, তবুও শ্রীমঙ্গলের প্রাথমিক নগর কাঠামো গঠনে তার প্রভাব আজও ইতিহাসে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। শ্রীমঙ্গলের তৎকালীন ডলুছড়া পাহাড় এলাকায় রাধানাথ দেব চৌধুরী প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করেন। সে সময় অঞ্চলটি ছিল পাহাড়, ঘন বন ও প্রাকৃতিক জলধারায় ঘেরা। ধীরে ধীরে এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড তার নামানুসারেই পরিচিত হয়ে ওঠে—রাধানগর। এই নাম কেবল একটি এলাকার পরিচয় নয়; এটি শ্রীমঙ্গলে পরিকল্পিত বসতি ও সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠার এক প্রাচীন দর্শনের প্রতীক।

শিক্ষা বিস্তারে রাধানাথ দেব চৌধুরীর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। তিনি তার পিতার স্মৃতিতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাতার নামে একটি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলেন- যা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল উদ্যোগ।

পরবর্তীতে তার পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী পিতার স্মরণে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এই শিক্ষামূলক উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।

এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই রাধানগরে গড়ে ওঠে সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার এক সমৃদ্ধ পরিমণ্ডল। ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন এলাকাটির সামাজিক জীবনে প্রাণসঞ্চার করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাধানগরের বিস্তীর্ণ জমির মালিকানা ধীরে ধীরে চৌধুরী পরিবারের হাতছাড়া হয়ে যায়। প্রথমে স্থানীয় দখলদারদের কাছে, পরে বড় বিনিয়োগকারীদের হাতে যায় এসব জমি।

বর্তমানে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক রিসোর্ট, হোটেল, ভিলা ও পর্যটনকেন্দ্র। হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা শ্রীমঙ্গলকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে নতুনভাবে পরিচিত করেছে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ।

পর্যটননির্ভর অর্থনীতির ফলে রাধানগরের মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। স্থানীয় বাসিন্দারা হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও সেবা খাতে যুক্ত হয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নারী ও তরুণরা হোমস্টে, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তবে এই দ্রুত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, পানি সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে- যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাধানগরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ওপর। প্রকৃতি ও চা-বাগান সংরক্ষণ, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং ঐতিহাসিক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা- এসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে এই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। রাধানগর আজ ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক জীবন্ত সংযোগস্থল। নবীগঞ্জ উপজেলার ভূবীরবাগ এলাকা থেকে আগত রাধানাথ দেব চৌধুরীর স্বপ্ন ও উদ্যোগ থেকে শুরু করে ডলুছড়া পাহাড় এলাকায় গড়ে ওঠা এই জনপদের আধুনিক রূপান্তর- সব মিলিয়ে রাধানগর শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

রাধানগর শুধু একটি ভৌগোলিক নাম নয় এটি ইতিহাস, মানুষের শ্রম এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের এক জীবন্ত দলিল।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি