শ্রীমঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাসে যে কয়েকটি জনপদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও তাদের মধ্যে অন্যতম। অরণ্য, পাহাড় ও হাওরের প্রাকৃতিক বেষ্টনিতে গড়ে ওঠা এই জনপদ একসময় ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সপ্তগ্রামের ইতিহাস মূলত যুক্ত হয়ে আছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিকিৎসাশাস্ত্রবিদ চক্রপাণি দত্ত ও তার উত্তরসূরি দত্ত বংশের সঙ্গে।
চক্রপাণি দত্ত ছিলেন চিকিৎসাশাস্ত্রের কালজয়ী গ্রন্থ চক্রদত্তের প্রণেতা। খ্রিস্টিয় ত্রয়োদশ শতকে সিলেটের তৎকালীন শাসক গৌড় গোবিন্দ দূরারোগ্য উদর রোগে আক্রান্ত হলে রাজমহিষীর আকূল আবেদনে চক্রপাণি দত্ত সিলেটে আগমন করেন। তার সুচিকিৎসায় রাজা আরওগ্য লাভ করেন। ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে বৃদ্ধ চক্রপাণি দত্ত তার তিন পুত্র- উমাপতি, মহীপতি ও মুকুন্দকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে আসেন। গঙ্গাহীন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসে অনিচ্ছুক হওয়ায় তিনি নিজে প্রত্যাবর্তন করলেও মহীপতি ও মুকুন্দকে এদেশে রেখে যান।
রাজা গৌড় গোবিন্দ মহীপতিকে দক্ষিণ শূর এবং মুকুন্দকে গোয়ার নামক জনপদের শাসনভার প্রদান করেন। দক্ষিণ শূর ছিল এক বিস্তৃত অঞ্চল- উত্তরে বরাক নদী, পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণে পাহাড়ঘেরা এবং দক্ষিণে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। মহীপতি হাইল হাওরের পশ্চিম প্রান্তে বসত গড়ে তোলেন এবং পূর্ব বাসস্থানের স্মৃতিতে জনপদের নামকরণ করেন ‘সপ্তগ্রাম’। আজও দক্ষিণ শূরের স্মৃতিবাহী উত্তরসূরি গ্রাম হিসেবে সপ্তগ্রামের অস্তিত্ব টিকে আছে। মহীপতির উত্তরাধিকার কল্যাণ দত্তের শাসনামলে সপ্তগ্রাম ত্রিপুরার রাজার অধীনে চলে যায়। কল্যাণ দত্ত সামন্ত রাজা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলেও তার পরিবার নানা রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যায়। তার পুত্রদের নামে একাধিক গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও ইতিহাসের নিদর্শন বহন করে। এই বংশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন শ্রীবৎস দত্ত। তিনি গৌড়ের নবাব হুসেন শাহের ত্রিপুরা অভিযানে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ত্রিপুরা বিজয়ের পর নবাব তাকে ভানুগাছ, ছয়ছিরি, ইটা, পাচাউন ও পুটিজুরি পরগনার অধিকার প্রদান করেন এবং ‘দত্ত খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তার বড় ভাই ভব দত্ত পরিচিত ছিলেন ‘বড়দত্ত খান’ নামে।
শ্রীবৎস দত্তের পুত্র হরিদাস দত্ত সপ্তগ্রাম ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেন। ইতিহাসে জানা যায়, বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের অন্তর্গত ভূনবীর গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীবৎস দত্তের পুত্র হরিদাস দত্ত। তিনি তাঁর বসতবাড়ির সংলগ্ন এলাকায় একটি শ্রী বাসুদেব মন্দির নির্মাণ করেন। বৌদ্ধ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই মন্দিরটি আজও দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে, যদিও মন্দিরের শ্রী বাসুদেব মূর্তি বহু আগেই চুরি হয়ে গেছে। হরিদাস দত্তের পরবর্তী উত্তরাধিকার কালী কুমার দত্ত চৌধুরী ভূনবীর জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। জমিদারির ঐশ্বর্য আজ আর নেই, তবে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রাচীন বাসুদেব মন্দিরটি এখনো নিজ মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। জমিদার কালী কুমার দত্ত চৌধুরী ১৮৯৬ সালে নিজ বাড়িতে এলাকার শিশুদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য ভূনবীর এমই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯১৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। পরবর্তীতে এটি দশরথ উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে পুনর্গঠিত হয়।
জমিদার বাড়ির শেষ প্রজন্মের মধ্যে ভূবন দত্ত চৌধুরী বাংলাদেশে এবং প্রমোদ দত্ত চৌধুরী (রবি) ভারতের শিলচরে ১৯৯০-এর দশকে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের পরবর্তী উত্তরসূরিদের অনেকেই দেশান্তরী হন। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুরে বসবাসরত বিশ্বজিৎ দত্ত চৌধুরী (টুটু) ও তার সন্তানরা; স্বর্গীয় স্বপন দত্ত চৌধুরীর সন্তান দীপ দত্ত চৌধুরী ও ববি দত্ত চৌধুরী; আসামের করিমগঞ্জ জেলার সুপ্রাকান্দিতে বসবাসরত বীরেন্দ্র কিশোর দত্ত চৌধুরীর সন্তানরা, যারা বর্তমানে আসামের রাজধানী গৌহাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
এই বংশেরই এক কন্যা ইন্দিরা দত্ত চৌধুরী ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর শ্রীমঙ্গলের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গল ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাম রাজনীতির পুরোধা, প্রবীণ সাংবাদিক এবং আশির দশকে শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সহধর্মিণী। রাজনৈতিক আন্দোলন, প্রগতিশীল সাংবাদিকতা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ভূমিকা শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। তবে বিনোদবিহারী দত্ত চৌধুরী ও মৃত্যুঞ্জয় দত্ত চৌধুরীর বংশধরদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে ওই জমিদার বাড়িতে বসবাস করছেন জনৈক সুনীল দেবের পরিবার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- এই প্রাচীন শ্রী বাসুদেব মন্দিরে আজও প্রতি বছর নিয়মিত বাৎসরিক পূজা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতাকে বহন করে চলেছে।
সপ্তগ্রাম ও শ্রী বাসুদেব মন্দির তাই কেবল একটি স্থান বা স্থাপনা নয়—এটি প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন এক জীবন্ত ইতিহাস। সংরক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার অভাবে এই ঐতিহ্য আজ বিস্মৃতির পথে, তবু প্রাচীন ইট-পাথর আর লোককথার স্মৃতিই জানান দেয়- সপ্তগ্রাম এখনও ইতিহাসের মানচিত্রে এক নীরব কিন্তু গৌরবময় উপস্থিতি।
সারাদেশ: আক্কেলপুরে ভাজা বিক্রেতার আত্মহত্যা