সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় দুই শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গভীর রাতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের হামলায় দুই নিরাপত্তা প্রহরী নিহত হয়েছে। সোমবার, (০৫ জানুয়ারী ২০২৬) সকালে উপজেলার কুমিরা নৌঘাট এলাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল মরদেহ দুটি উদ্ধার করেন। এদের মধ্যে একজনের লাশ তিন খণ্ডেক্ষতবিক্ষত এবং আরেকজনের লাশ অক্ষত পাওয়া গেছে।

ডাকাতের হামলায় নিহত দুই নিরাপত্তা প্রহরী হলেন মো. খালেদ প্রমাণিক ও মো. সাইফুল্লাহ। তাদের দু’জনের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর সদর থানার আব্দুল্লাহপুর এলাকায়। তারা সীতাকুণ্ডের কুমিরা নৌঘাট এলাকার কে আর শিপ মেকিং নামক জাহাজভাঙা কারখানায় নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে চাকরি করতেন।

কে আর শিপ মেকিং ইয়ার্ডের ম্যানেজার আবু সাজ্জাদ মুন্না বলেন, গত রোববার দুপুরে কাটিংয়ের জন্য জাহাজভাঙা কারখানায় একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ আনা হয়। গভীর রাতে একদল সংঘবদ্ধ ডাকাত কারখানায় আনা ওই স্ক্র্যাপ জাহাজের মালামাল লুটে হানা দেয়। এ সময় জাহাজ ভাঙা কারখানায় দায়িত্বরত দুই নিরাপত্তা প্রহরী বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে ডাকাতদল তাদের উপর হামলা চালায়। এতে ডাকাতের হামলায় দুই নিরাপত্তা প্রহরী নিহত হয়। গতকাল সকালে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ দুটি উদ্ধার করেন।

শিল্প পুলিশের চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জানিয়েছেন, নিহত দুইজন কুমিরা এলাকার ‘কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড’ নামে একটি জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তাদের লাশ পাওয়া গেছে ওই কারখানা থেকে আনুমানিক ৩৫০ মিটার দূরে একই মালিকের ‘কে আর গ্রিন শিপইয়ার্ড’ নামে আরেকটি জাহাজভাঙা কারখানাসংলগ্ন সাগর উপকূলে। এদের মধ্যে সাইফুলের লাশটি হাত, পা ও মাথা আলাদা খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করেছে বলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান।

ফায়ার সার্ভিসের কুমিরা স্টেশনের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, সকালে খবর পেয়ে আমরা গিয়ে লাশ দুটি উদ্ধার করেছি। কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে রাতে ওই শ্রমিকরা একটি নৌকা (লাল বোট) নিয়ে কারখানার আশপাশে সাগর উপকূলে পাহারা দিচ্ছিলেন, এ সময় ডাকাতদলের হামলায় তারা নিহত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ওই নৌকায় আরও দুই শ্রমিক ছিলেন। তারা আমাদের জানিয়েছেন, ডাকাতদল আক্রমণ করার পর তারা দু’জন পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নিজেদের রক্ষা করেন। এছাড়া খালেক পানিতে ঝাপ দেয় ও সাইফুল ঝাঁপ দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ডাকাতরা সাইফুলকে ধরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে খুন করে। খালেকের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন আমরা দেখিনি। আমাদের ধারণা, ভয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

শিল্প পুলিশের এসপি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ আরও বলেন, কারখানার মালিকপক্ষ আমাদের জানিয়েছে, রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে দুটি নৌকায় করে একদল ডাকাত তাদের শিপইয়ার্ডের দিকে এগিয়ে আসছিল। সাইফুল ও খালেকসহ কয়েকজন শ্রমিক শিপইয়ার্ড থেকে দুটি নৌকা নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে যায়। সেখানে ডাকাতরা দুজনকে হত্যা করেছে। মালিকপক্ষের এই বক্তব্য সত্য কিনা সেটা আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি।

তিনি বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। যে শিপইয়ার্ডে ঘটনা ঘটেছে, লাশ পাওয়া গেছে তার থেকে ৩৫০ মিটার দূরে একই মালিকের আরেকটি শিপইয়ার্ডের পাশে। একটি লাশ তিন খ- অবস্থায় পাওয়া গেছে। আরেকটি অবশ্য অক্ষত পাওয়া গেছে। সার্বিকভাবে আমরা তদন্ত করে দেখছি।

এদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য উল্লেখ করে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, কে আর রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে শিপইয়ার্ডে নতুন জাহাজ তোলার (বিচিং) সময় সিগন্যাল দেয়া একটি নৌকার সঙ্গে জাহাজটির সংঘর্ষ হয়। এতে নৌকাটি জাহাজের নিচে তলিয়ে যায়। এতে দুজন শ্রমিকের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলে তারা মারা যায়।

ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত ও যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম নাজিম উদ্দিন যুক্ত বিবৃতিতে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার জন্য তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, রাতের বেলা ঘন কুয়াশায় জাহাজ বিচিং করার কারণে এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইতোমধ্যে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে প্রচার করে মূল বিষয়কে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এভাবে মূল বিষয় এড়িয়ে গেলে জাহাজভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করে যথাযথ উদ্যোগ নিলে টেকসই ও নিরাপদ জাহাজভাঙা শিল্প নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি