উত্তরের জেলা গাইবান্ধার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার বিশাল চরাঞ্চলে গত তিন দশকে কৃষিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এক সময়ের পরিত্যক্ত ধু-ধু বালুচরে এখন সবুজের সমারোহ; বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফলছে ভুট্টা, মরিচ, পেঁয়াজ ও মিষ্টি কুমড়া। কিন্তু কৃষির এই সোনালী সাফল্যে কৃষকের ঘরে অন্ন জুটলেও ভাগ্যের আকাশে উদয় হয়নি আধুনিকতার সূর্য। শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন আর তথ্য-প্রযুক্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় চরের প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবনমান এখনও প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতোই রয়ে গেছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) তথ্যমতে, গাইবান্ধার ৪টি উপজেলার (সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা) ২২টি ইউনিয়নের ১৩৮টি গ্রাম এখন চরাঞ্চল বেষ্টিত। এই জনপদে প্রায় ৫ লাখ মানুষের বসবাস। গত ৩০ বছরে এখানকার কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তন এলেও নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিতে এই মানুষগুলো দেশের মূল ভূখন্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। ফলে জাতীয় উন্নয়ন সূচকে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অবদান দৃশ্যমান হচ্ছে না।
সরেজমিনে চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, চরের মাটিতে এখন দিনরাত কাজ করছেন কৃষকরা। সাঘাটা উপজেলার দিঘলকান্দি চরের চাষি নুর ইসলাম প্রামাণিক জানান, চাষাবাদে আমরা আগের চেয়ে অনেক উন্নত। বেসরকারি সংস্থার পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তায় বালুচরে প্রচুর ফসল ফলছে। কিন্তু এই কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে নেই আধুনিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। অন্যদিকে, ফুলছড়ি গাবগাছি চরের চাষি ইসমাইল হোসেন বলেন, শস্য উৎপাদন করি ঠিকই, কিন্তু সংরক্ষণের কোনো হিমাগার বা স্থান নেই। বাধ্য হয়ে কম দামে বেচতে হয়, এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি গুণতে হয়।
কৃষি বিপ্লব ঘটলেও নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তর দিঘলকান্দি চরের আব্দুল খালেক প্রামাণিক আক্ষেপ করে বলেন, চরে হাতেগোনা নামে মাত্র কয়েকটা প্রাথমিক স্কুল থাকলেও হাইস্কুল নেই বললেই চলে। যাতায়াতের অভাবে সন্তানদের হাইস্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি। এই সংকটের ফলে হাজারো কিশোর-কিশোরী মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে কৃষি শ্রমিকের খাতায় নাম লিখিয়ে দারিদ্র্যের চক্রে বন্দি হয়ে পড়ছে।
চরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া এখনও ভাগ্যের ব্যাপার। কালুরপাড়া চরের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুর আজিজ মোল্লা জানান, এখানে মানুষ চলে আল্লাহর দয়ায়। আপদ-বিপদ বা প্রসবকালীন জরুরি অবস্থায় নৌকাই একমাত্র ভরসা। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথেই রোগীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থার বেহাল দশা ও নিরাপদ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ এই জনপদের নিত্যসঙ্গী।
দেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগোচ্ছে, চরের মানুষ তখনও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনায় ভোগে। তথ্য-প্রযুক্তির অভাবে কৃষকরা ফসলের সঠিক বাজারদর জানতে পারে না, ফলে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে জিম্মি থাকে। প্রযুক্তির এই ব্যবধান চরের মানুষকে উন্নয়নের মূল গ্রোত থেকে ছিটকে দিচ্ছে।
উন্নয়ন গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম বলেন, দেশের সার্বিক উন্নয়ন সূচক ত্বরান্বিত করতে হলে চরাঞ্চলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলার সুযোগ নেই। শুধু কৃষি নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো উন্নয়নে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য ভাসমান বিদ্যালয়, ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তবেই কৃষি বিপ্লবের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চরের ফসলের মাঠ সবুজ হলেও ৫ লাখ মানুষের ভাগ্য দীর্ঘকাল এই ধূসর বঞ্চনাতেই ঢাকা পড়ে থাকবে, যদি না দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগগ্রহণ করা হয়।