কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ঘুনিয়া পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর তীরে ৪৫ শতক জমিতে হাইব্রিড ফাস্টলেডি জাতের পেঁপে চাষ করে রীতিমতো বাজিমাত করেছেন কৃষক মোহাম্মদ হাসান। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই জমিতে ২০০ পেঁপে গাছ লাগিয়ে কৃষক হাসান তিন মাসের মধ্যে প্রথম ফলন পেয়েছেন। এরপর এই পর্যন্ত তিনি একই বাগান থেকে তিনবার পেঁপে বিক্রি করে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করেছেন।
চকরিয়া উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের সীমানা এলাকা ঘুনিয়া পয়েন্টে (ক্ষেত্রপাল মন্দিরের পাশে) মাতামুহুরী নদীর তীরের জমিতে গড়ে তোলা কৃষক হাসানের পেঁপে বাগানের আশাজাগানিয়া এই গল্প শুনে স্থানীয় কৃষকসহ এলাকাবাসী রীতিমতো হতবাক হয়েছেন।
কৃষক হাসানের পেঁপে বাগানের গল্পের উৎস খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের অনুপ্রেরণা এবং পরামর্শে বীজ গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক অনুমোদিত চট্টগ্রামের মেসার্স শহীদ এগ্রোসিড ফার্মের সাড়াজাগানো হাইব্রিড জাতের ফাস্টলেডি নামক পেঁপে চাষ করেছেন। গবেষণা বলছে, হাইব্রিড জাতের ফাস্টলেডি পেঁপে একটি উন্নত জাতের বীজ। যাহার বৈশিষ্ট্য উচ্চ ফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ এবং উন্নত গুণাগুণের অধিকারী একটি জাত।
জানতে চাইলে কৃষক মোহাম্মদ হাসান বলেন, আমার জমির আশপাশের কৃষকরা প্রতি বছর বিভিন্ন রকম সবজি চাষ করছেন। আমি গতানুগতিক ধারায় চাষাবাদ না করে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে এবার পেঁপে চাষ শুরু করি। ৪৫ শতক জমিতে শহীদ এগ্রোসিড ফার্মের উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ফাস্টলেডি জাতের দুইশত পেঁপে গাছ লাগিয়ে বাগান তৈরি করি।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জমি লাগিয়ত ও বীজ সংগ্রহ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ৬০ হাজার টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে পেঁপে বাগানের গাছ লাগানো শেষ করি। তারপর শুরু হয় পরিচর্যা। এভাবে প্রতিদিন রুটিনমাফিক গাছের পরিচর্যা করতে করতে তিন মাস পেরিয়ে যায়। এরই মধ্যে মে মাসের শুরুতে প্রতিটি গাছে ফলন আসতে শুরু করে। এক মাসের ব্যবধানে বাগানের প্রতিটি গাছের থোকায় থোকায় ঝুলতে থাকে পরিপক্ব পেঁপে। প্রথমবার পেঁপে বিক্রি করে আড়াই লাখ টাকা আয় করি। এরপর এ পর্যন্ত একই বাগান থেকে তিন মাস পরপর তিনবার পেঁপে বিক্রি করা হয়েছে।
ভাগ্যবান কৃষক মোহাম্মদ হাসানের দাবি, এখনও পেঁপে বাগানের পেঁপে গাছগুলো দ-ায়মান রয়েছে। মাসে একবার পেঁপে উঠানোর পর (হারভেস্ট করার পর) নতুন করে ফলন আসছে। অবশ্য এখনকার ফলনগুলো আগের তুলনায় সাইজে ছোট। যেহেতু বাগানের গাছগুলোর বয়স্ক হয়ে উঠেছে, সেহেতু ফলনের সাইজ ছোট হচ্ছে। তিনি বলেন, চাষের শুরু থেকে এই ১১ মাসে সবমিলিয়ে ৮ লাখ টাকার মতো পেঁপে বিক্রি করা হয়েছে। এখনও গাছে রয়েছে দুই টাকার মতো পেঁপে।
মেসার্স শহীদ এগ্রোসিড ফার্মের চকরিয়া অঞ্চলের ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, কয়েকবছর ধরে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ফাস্টলেডি জাতের পেঁপে চাষ করছেন কৃষকরা। একবার গাছ লাগিয়ে একাধিকবার ফলন পাওয়ায় কৃষকরা ফাস্টলেডি জাতের পেঁপে বীজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
তিনি বলেন, চকরিয়া উপজেলার ঘুনিয়া, পৌরসভার মৌলভীরকুম, ভেন্ডিবাজার, বদরখালী ইউনিয়নের প্রভৃতি এলাকা পেরিয়ে বর্তমানে লামা উপজেলার লাইনঝিরি, ফাইতং ইউনিয়ন ও আলীকদমের পাহাড়ি জনপদে এবং দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, মহেশখালী উপজেলায় বিপুল জমিতে ফাস্টলেডি জাতের পেঁপে চাষ করা হয়েছে।
ফাস্টলেডি পেঁপে বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের মেসার্স শহীদ এগ্রোসিড ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের পাহাড় সমতল ভূমিতে যেকোনো সময়ে আবহাওয়ার সঙ্গে সংমিশ্রণে রেখে যাতে চাষ করা যায়, সেই কোয়ালিটি সম্পন্ন উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের বীজ বাছাই করে আমরা আমদানি করে থাকি। যাতে কৃষকরা আমাদের পণ্য ব্যবহার করে আশানুরূপ ফলন উৎপাদন করতে সক্ষম হয়।
অনুরূপভাবে হাইব্রিড জাতের ফাস্টলেডি পেঁপে সেই কোয়ালিটির একটি উচ্চফলনশীল বীজ। এ জাতের একটি পেঁপে গাছে রোপণের তিন মাসের মধ্যে ৪০-৫০টি পেঁপে ধরে। একটি গাছের পেঁপের ওজন ২৫ থেকে ৩০ কেজির বেশি হয়ে থাকে। আবার একবার গাছ লাগালে একাধিকবার ফলন পাওয়া যায়। শুধু চকরিয়া না, সারাদেশে হাইব্রিড জাতের ফাস্টলেডি পেঁপে চাষ কৃষকদের ভাগ্য খুলে দিয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার মো. মহিউদ্দিন বলেন, চকরিয়া উপজেলার প্রতিটি এলাকায় মাটির উর্বরতা শক্তি ভালো। সেকারণে কৃষকরা জমিতে যেকোনো বীজ রোপণ করলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, যেসব কৃষক পেঁপে চাষ করছেন, তারা প্রয়োজন মুহূর্তে চাষের বিষয়ে যেকোনো পরামর্শ চাইলে কৃষি বিভাগের পক্ষথেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।